প্রশ্ন (১) : এমপিও ভুক্ত বেসরকারী স্কুলের শিক্ষকদের বেতন থেকে প্রতি মাসে ১০% করে টাকা কেটে রাখা হয় এবং চাকুরি শেষে সর্বশেষ বেতন স্কেলের ১০০ মাসের সমপরিমাণ টাকা দেয়া হয়। উক্ত টাকা কি হালাল হবে?
উত্তর : উক্ত টাকা হালাল নয়। কেননা প্রভিডেন্ট ফান্ড (Provident Fund) একটি সূদী পদ্ধতি। চাকুরীজীবীরা শতকরা হারে যে অর্থ ফান্ডে জমা করেন তা মূলত ঋণ স্বরূপ এই কোম্পানীকে দেয়া হয়ে থাকে। আর ঋণ দিয়ে বেশি নেয়া স্পষ্টই সূদ। এই অর্থকে চক্রবৃদ্ধি আকারে কাজে লাগিয়ে অবসর গ্রহণকালে কর্মচারীকে বিশাল অঙ্কের টাকা প্রদান করা হয় (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১৩তম খণ্ড, পৃ. ৫২০)। তাই যদি জমা করার বিষয়টি স্বেচ্ছাধীন হয়, তাহলে জমা করা যাবে না। আর যদি বাধ্যতামূলক হয়, সেক্ষেত্রে জমাকৃত অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব রাখতে হবে এবং এককালীন টাকাটা পাওয়ার পর মূলধন থেকে সূদটা বিয়োগ করতে হবে। কেননা ইসলাম সকল প্রকারের সূদকে হারাম করেছে (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৭৫-২৭৯)।অনেকে বলে থাকেন যে, এটা তো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একটি অবসর উপহার (Retirement gift), যা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পাথেয় স্বরূপ দেয়া হয়ে থাকে। যদি তাই হয়, তাহলে যে সমস্ত কর্মচারী প্রভিডেন্ট ফান্ডে অর্থ জমা করেন না, তাদের কেন দেয়া হয় না, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোম্পানী কেন ভাবে না। সুতরাং একে উপহার বলার কোন প্রশ্নই আসে না (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়েমাহ, ১৩তম খণ্ড, পৃ. ৫১০-৫১৫)।মূলত এগুলো হারামকে হালাল করার একটা ঘৃণিত অপচেষ্টা মাত্র। সর্বোপরি কর্মচারী চাইলে তার এ্যাকাউন্টকে পুরোপুরি সূদমুক্ত রাখার আবেদনও করতে পারে। বিধায় ইচ্ছা করলে সে সূদের একটি টাকাও ভক্ষণ করতে বাধ্য নয়। তাই কোন যুক্তিতে প্রভিডেন্ট ফান্ডের সূদকে হালাল বলার উপায় নেই।প্রশ্নকারী : শফিকুল ইসলাম, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন (২) : আমি বিয়ের আগে যেনায় লিপ্ত ছিলাম। বিয়ের পর থেকে ভুল বুঝতে পেরে আমি খুবই অনুতপ্ত। আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন? কিভাবে তওবাহ করলে উক্ত পাপ ক্ষমা হবে?
উত্তর : নিঃসন্দেহে যেনা কাবীরা গুনাহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَ سَآءَ سَبِیۡلً ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট অভ্যাস’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৩২)। কোন ব্যক্তি মুমিন থাকাবস্থায় যেনা করে না। কারণ সে সময় তার থেকে ঈমানের নূরকে ছিনিয়ে নেয়া হয় (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৭৫, ৫৫৭৮, ৬৭৭২, ৬৮১০)। ইসলামী শরী‘আতে যেনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই অবিবাহিত কোন পুরুষ যদি ব্যভিচার করে, তাহলে তাকে একশ’ বেত্রাঘাত করা হবে এবং এক বছরের জন্য এলাকা থেকে বিতাড়িত করতে হবে (সূরা আন-নূর : ২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯০: আবূ দাঊদ, হা/৪৪১৫; তিরমিযী হা/১৪৩৪)। আর বিবাহিত নারী-পুরুষ যেনায় লিপ্ত হলে তাকে রজম করতে হবে তথা পাথর দিয়ে মেরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৭০-৫২৭১, ৬৮২৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯১)। এতদ্ব্যতীত ক্বিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করবে (ছহীহ বুখারী, হা/৭০৪৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২২৭৫)। আর ধর্ষণের শাস্তি সাথে সাথে মৃত্যুদণ্ড দেয়া (সূরা আল-মায়েদাহ : ৩৩)।এমতাবস্থায় কর্তব্য হল- দ্রুত উত্তম তওবাহ করা। আর তা হচ্ছে, এ জন্য লজ্জিত হওয়া, অনুতপ্ত হওয়া এবং এই জঘন্যকর্ম পরিত্যাগ করা। আর ভবিষ্যতে কখনো এ ধরনের হারাম কর্মে জড়িত না হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা। যে ব্যক্তি স্বচ্ছ ও পবিত্র অন্তরে একনিষ্ঠ ও একাগ্রতার সাথে খালেছ তওবা করে আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আয-যুমার : ৫৩; সূরা আল-ফুরক্বান : ৬৮-৭০; ইবনু বায, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৩৬৪; ইসলাম সুওয়াল জাওয়াব, ফাতাওয়া নং-২৭১১৩, ২৩৪৮৫)।প্রশ্নকারী : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
প্রশ্ন (৩) : সহবাসের ক্ষেত্রে কোন্ কোন্ বিষয় নিষিদ্ধ? বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর লজ্জাস্থানে মুখ দেয়া যাবে কি?
উত্তর : শরী‘আতে সহবাসের কিছু শিষ্টাচার ও নীতিমালা নির্দেশ করা হয়েছে। যেমন,(ক) প্রসবোত্তর স্রাব অথবা ঋতু স্রাব থাকাকালীন সহবাস করা হারাম (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২২২)। নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঋতুবতী নারীর সাথে সহবাস করে সে মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা (কুরআন) অবিশ্বাস করে’ (তিরমিযী, হা/১৩৫; ইবনু মাজাহ, হা/৬৩৯, সনদ ছহীহ)। তবে এমতাবস্থায় শুধু সহবাস ছাড়া অন্যান্য সব কাজ করা যাবে (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০২)। তাই কেউ যদি এই অবস্থায় সঙ্গম করে, তাহলে তার উপর কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে।(খ) স্ত্রীর পায়ুপথে সঙ্গম করা হারাম। বর্তমানে যাকে ‘এন্যাল সেক্স’ বা পায়ূ সেক্স বলে। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, مَنْ أَتَى امْرَأَتَهُ فِيْ دُبُرِهَا فَقَدْ بَرِئَ مِمَّا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘যে তার স্ত্রীর পশ্চাদদ্বারে সঙ্গম করে, সে যেন আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক মুহাম্মদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর নাযিলকৃত দ্বীন হতে মুক্ত হয়ে গেল’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৯০৪; তিরমিযী, হা/১৩৫; ইবনু মাজাহ, হা/৬৩৯, সনদ ছহীহ)। এমনকি আল্লাহ তা‘আলা তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না এবং সে অভিশপ্ত (তিরমিযী, হা/১১৬৬; ইবনু মাজাহ, হা/১৯২৩, সনদ হাসান; আবূ দাঊদ, হা/২১৬২, সনদ হাসান)। অতএব স্ত্রীর পায়ুপথে সঙ্গম করা কোনক্রমেই বৈধ নয়। এটা অসভ্য ও বিজাতীয়দের ঘৃণ্য অপকর্ম।(গ) স্বামী-স্ত্রীর লজ্জাস্থানে মুখ লাগানো নাজায়েয। যাকে বর্তমানে ‘ওরাল সেক্স’ বলে। মুখ গহ্বর কিংবা জিহ্বা দ্বারা একে অপরের যৌনাঙ্গ চুষা (Suck) বা লেহন করা। যা কোন সভ্য ও রুচিশীল মানুষের আচরণ হতে পারে না। এটা অপবিত্র এবং অন্যজন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা অপবিত্র বস্তুসমূহকে হারাম করেছেন (সূরা আল-আ‘রাফ : ১৫৭)। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘নিজের কোন অনিষ্টতা বা ক্ষতি এবং পরস্পরে কারোর ক্ষতি করা যাবে না’ (ইবনু মাজাহ, হা/২৩৪০,২৩৪১; সনদ ছহীহ, ছহীহুল জামে‘, হা/৭৫১৭; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৫০; বিস্তারিত দ্র. : ইসলাম ওয়েব, ফাতাওয়া নং-২১৪৬, ৫০৭০৮)। এটা রুচিহীন, বিকারগ্রস্ত বেহায়া জাতির অপকর্ম।(ঘ) রামাযান মাসের দিনের বেলায় ছিয়াম থাকাবস্থায় সহবাস করা হারাম (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৭)। কেউ যদি ছিয়াম অবস্থায় সঙ্গম করে, তাহলে তার উপর কাফফারা অপরিহার্য।(ঙ) হজ্জ বা ওমরার ইহরাম অবস্থায় সঙ্গম করা হারাম (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৯৭)।(চ) যৌন মিলনের গোপন রহস্য ফাঁস করা হারাম (ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৩৭; বিস্তারিত দ্র. : ইসলাম সুওয়াল জাওয়াব, ফাতাওয়া নং-৫৫৬০)।প্রশ্নকারী : তাহমীদ, সৈয়দপুর, নীলফামারী।
প্রশ্ন (৪) : যেখানে পানির ব্যবস্থা নেই সেখানে পেশাব করার পর শুধু টিস্যু পেপার দিয়ে পবিত্র হওয়া যাবে কি?
উত্তর : ওযূ, গোসল, এস্তেঞ্জা সবই পানি দিয়েই পবিত্রতা অর্জনের সাথে সম্পর্কিত। যদি এগুলো কোন একটির ক্ষেত্রে পানি না পাওয়া যায়, তাহলে শরী‘আত তার জন্য অনুমতি দিয়েছে যে, আর তা হল- তায়াম্মুম করে পবিত্র হওয়া এবং ঢিলা কুলুখ দিয়ে এস্তেঞ্জা করা। তবে পানির উপস্থিতিতে ওযর ছাড়া তায়াম্মুম চলে না। আবার পানি থাকতে ঢিলা কুলুখ দিয়েও ইস্তিঞ্জা করা যাবে না। পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জনের জন্য মহান আল্লাহ কূবাবাসীর প্রশংসা করেছেন (সূরা আত-তাওবাহ : ১০৮; ইবনু মাজাহ, হা/৩৫৫, সনদ ছহীহ)। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘যখন তোমরা বাথরুমে যাও তখন ৩টি পাথর দ্বারা এস্তেঞ্জা কর’ (আবূ দাঊদ, হা/৪০, সনদ হাসান)। সুতরাং পানির অনুপস্থিতিতে টিস্যু, কাপড়, পাথর, ঢিলা ইত্যাদি দ্বারা ইস্তেঞ্জা করাতে কোন সমস্যা নেই (শায়খ ইবনু বায, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ১০ম খণ্ড, পৃ. ৩৭)।প্রশ্নকারী : ইমদাদুল্লাহ শাহ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
প্রশ্ন (৫) : এক মেয়ে কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে এমন একজন ছেলেকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু তার মা চায় না, বরং তার জন্য এই দু‘আ করেন যে, সে যেন মারা যায়। ইদানিং মেয়েটি অসুস্থ। এটা কি বদদু‘আর ফল? এক্ষেত্রে করণীয় কী?
উত্তর : কোন কারণ ছাড়াই পিতা-মাতা যদি সন্তানের উপর রাগান্বিত হয়, সেক্ষেত্রে সন্তানের কোন গুনাহ হবে না ইনশাআল্লাহ। তবে এক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে রাজি করার চেষ্টা করতে হবে এবং আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা নিতে হবে। কোন কারণে ভুল হয়ে গেলে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে এবং সৎ ও কল্যাণের দু‘আর আবেদন করতে হবে। তাছাড়া পিতা-মাতার অকারণে সন্তানের উপর বদ-দু‘আ করা জায়েয নয়। জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,لَا تَدْعُوْا عَلَى أَنْفُسِكُمْ وَلَا تَدْعُوْا عَلَى أَوْلَادِكُمْ وَلَا تَدْعُوْا عَلَى أَمْوَالِكُمْ لَا تُوَافِقُوْا مِنَ اللهِ سَاعَةً يُسْأَلُ فِيْهَا عَطَاءٌ فَيَسْتَجِيْبُ لَكُمْ.‘তোমরা তোমাদের উপর এবং তোমাদের সন্তানদের উপর এবং নিজের ধন-সম্পদের উপরও বদ দু‘আ করো না। এমন যেন না হয় যে, তোমরা এমন মুহূর্তে বদ দু‘আ করবে যখন আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া হয়, আর তা কবুল হয়ে যায়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০৯; ইসলাম ওয়েব, ফাতাওয়া নং -২৯৬০৫৩)।উল্লেখ্য, বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবক ও পাত্র-পাত্রী উভয়েরই সম্মতি অপরিহার্য। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ ‘অভিভাবক ব্যতীত বিয়ে সম্পন্ন হতে পারে না’ (আবূ দাঊদ, হা/২০৮৫; তিরমিযী, হা/১১০১; ইবনু মাজাহ, হা/১৮৮১)। অর্থাৎ অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিবাহ হলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে কুমারী মেয়েদের নীরবতাই তার অনুমতি (ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৪৬, ৫১৩৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪২০)।প্রশ্নকারী : লাইছা আফরিন লিসা, মতিহার, রাজশাহী।
প্রশ্ন (৬) : আমার চাচা আমার সামনে আমার মাকে গালিগালাজ করে। তাই আমি আল্লাহর কসম করে বলি যে, সে মারা গেলে তার জানাযায় আমি যাব না। এ রকম কসম করা যাবে কি?
উত্তর : এ রকম কসম খাওয়া উচিত নয়। কারণ কোন মুসলিম ব্যক্তি মারা গেলে তার জানাযায় শরীক হওয়া তার অধিকার (ছহীহ বুখারী, হা/৬২৩৫)। এখন এই কসমের কাফ্ফারা আদায় করতে হবে। নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘কোন কিছুর ব্যাপারে যদি শপথ কর আর তা ছাড়া অন্য কিছুর ভিতর কল্যাণ দেখতে পাও, তবে নিজ শপথের কাফ্ফারা আদায় করে তাত্থেকে উত্তমটি গ্রহণ কর’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৬২২, ৭১৪৬, ৭১৪৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৫২; ইসলাম ওয়েব, ফাতাওয়া নং-৩১০৯১২)। কাফফরা হল, দশজন মিসকীনকে মধ্যম মানের খাদ্যদান, যা স্ত্রী-পরিবারকে খাওয়ানো হয় অথবা তাদেরকে বস্ত্রদান অথবা একজন ক্রীতদাস মুক্তকরণ। আর এগুলো করা তার সামর্থ্য না থাকলে তার জন্য তিনদিন ছিয়াম পালন করা (সূরা আল-মায়িদাহ : ৮৯)। উল্লেখ্য, ঝগড়ার সময় গালিগালাজ করা, অশ্রাব্য ও অশালীন ভাষা প্রয়োগ করা মুনাফিকি আচরণ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৯)।প্রশ্নকারী : নাঈম, দুপচাঁচিয়া, বগুড়া।
প্রশ্ন (৭) : জোরপূর্বক ধর্ষণ করলে এক মহিলা গর্ভবতী হয় এবং অবৈধ বাচ্চা হয়, যার বাবার পরিচয় নেই। এদিকে অবৈধ সন্তান নাকি ইসলাম বিদ্বেষী হয়। আবার বাচ্চাকে হত্যা করাও যাবে না। এমতাবস্থায় করণীয় কী?
উত্তর : ধর্ষণের সন্তান ও ব্যভিচারের সন্তানের বিধান একই। আর সেটা হল- ঐ সন্তান তার মায়ের বংশের দিকে সম্বন্ধিত হবে (ইসলাম ওয়েব, ফাতাওয়া নং-৭৫০১, ২৮৯২৭৬)। ধর্ষণের সন্তান বলেই যে, ইসলাম বিদ্বেষী হবে এমন দাবী সঠিক নয়। কেননা শতশত বৈধ পিতা-মাতার এমন সন্তানও আল্লাহদ্রোহী ও ইসলাম বিদ্বেষী হয়। মূলত এজন্য অভিভাবকগণ দায়ী। তারা যদি সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে সন্তানদেরকে লালন-পালন করত, তাহলে হয়তো তারা ভালো হতে পারত। কেননা প্রতিটি নবজাতকই ফিতরাত (তাওহীদের) উপর জন্মলাভ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতার কারণে সে ইয়াহূদী, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজারী হয় (ছহীহ বুখারী, হা/১৩৮৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৫৮)।উল্লেখ্য, শক্তি প্রয়োগ করে, জোরপূর্বকভাবে কোন মহিলার মান-সম্ভ্রম, ইজ্জত-আব্রু ছিনিয়ে নেয়াকে ধর্ষণ বলে। শরী‘আতের দৃষ্টিতে সামগ্রিকভাবে ধর্ষণ একটি মহাপাপ ও গর্হিত অপরাধ। এর শাস্তি সরাসরি মৃত্যুদ-। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি (সূরা আল-মায়িদাহ : ৩৩; বিস্তারিত দ্র. : ইসলাম সুওয়াল জাওয়াব, ফাতাওয়া নং-৭২৩৩৮)। উল্লেখ্য যে, ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ধর্ষিতাকে মোহরে মিসল দিতে হবে (আল-মুয়াত্ত্বা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭৩৪)। তবে এক্ষেত্রে ধর্ষক এককভাবে শাস্তি ভোগ করবে, ধর্ষিতার কোন শাস্তি হবে না’ (সূরা আন-নূর : ৩৩; ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৪৯)।প্রশ্নকারী : মাহমুদুল হাসান, সঊদী আবর।
প্রশ্ন (৮) : ডিফেন্সে চাকরি করতে হলে ট্রেনিংয়ের ছয় মাস নিয়মিত দাড়ি ক্লিন সেভ করতে হয়। আবার ট্রেনিং সম্পূর্ণ করে দাড়ি রাখার সুযোগ আছে। সাময়িকভাবে দাড়ি কেটে এই চাকুরী করা যাবে কি?
উত্তর : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অবাধ্যতা করে বা ইসলামের কোন বিধানকে অমান্য করে কোন কোম্পানী বা সংস্থায় চাকুরী করা বৈধ নয়। তবে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশের সরকার যদি তাকে বাধ্য করে, তা স্বতন্ত্র বিষয়। এক্ষেত্রে অবশ্যই আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখা ঈমানের দাবী (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ২-৪; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩৪)।ইসলামের নির্দেশনা হল দাড়ি লম্বা করা। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, خَالِفُوا الْمُشْرِكِيْنَ وَفِّرُوا اللِّحَى وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ ‘তোমরা মুশরিকদের উল্টো করবে। দাড়ি লম্বা রাখবে এবং গোঁফ ছোট করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৯২, ৫৮৯৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৯, ৪৮৮-৪৯২)। উক্ত হাদীছ উল্লেখ করে শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘দাড়ি ক্লিন সেভ করা বা ছোট করা কোনটাই জায়েয নয়। আলহামদুলিল্লাহ সঊদী সরকার সৈনিকদের বা অন্য কাউকেই দাড়ি কাটার নির্দেশ দেয় না। কিন্তু কিছু দেশের সরকার তাদের সেনাবাহিনীদের দাড়ি কাটতে আদেশ করে। সেক্ষেত্রে তাদের এই শরী‘আত বিরোধী আদেশ মানা যাবে না এবং উত্তম পন্থায় তাদের বিরোধিতা করতে হবে’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৬৮ এবং ৮ম খণ্ড, পৃ. ৩৭৪)।প্রশ্নকারী : আব্দুল্লাহ, পাবনা।
প্রশ্ন (৯) : মুসলিম হয়েও যারা মসজিদ ভাঙ্গে কিংবা পুড়িয়ে দেয়, তাদের জন্য বদ-দু‘আ করা যাবে কি?
উত্তর : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, مَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنۡ مَّنَعَ مَسٰجِدَ اللّٰہِ اَنۡ یُّذۡکَرَ فِیۡہَا اسۡمُہٗ وَ سَعٰی فِیۡ خَرَابِہَا ‘যে আল্লাহর মসজিদসমূহে তাঁর নাম স্মরণ করতে বাধা দেয় ও তার ধ্বংস-সাধনে প্রয়াসী হয়, তার থেকে বড় সীমালংঘনকারী আর কে হতে পারে?’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১১৪)। অত্র আয়াতে মসজিদ ধ্বংসকারী, ছালাত ও যিকিরে বাধা প্রদানকারী ব্যক্তিকে সর্বাধিক বড় যালিম ও অপরাধী বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আর যালিমের জন্য বদ-দু‘আ করা জায়েয। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘মন্দ কথা প্রকাশ করাকে আল্লাহ পসন্দ করেন না; তবে যার উপর যুলুম করা হয়েছে তার কথা স্বতন্ত্র। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (সূরা আন-নিসা : ১৪৮)। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, কারোর জন্য বদ-দু‘আ করা আল্লাহ পসন্দ করেন না। তবে মাযলূম ব্যক্তি যালিমের বিরুদ্ধে বদ-দু‘আ করতে পারে, এক্ষেত্রে আল্লাহ ছাড় দিয়েছেন। যদিও ধৈর্যধারণ করা অধিক উত্তম’ (ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৪২; ইসলাম ওয়েব, ফাতাওয়া নং-২৪৮৪১৬)।প্রশ্নকারী : মাজহারুল ইসলাম, বগুড়া।
প্রশ্ন (১০) : রামাযান মাসে প্রতিদিন মসজিদে মুছল্লীদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা যাবে কি?
উত্তর : সম্মিলিতভাবে মসজিদে ইফতার করা দোষণীয় নয়। বিশেষ করে মুসাফির ব্যক্তিদের সুবিধার্থে প্রত্যেক মসজিদেই ইফতারের ব্যবস্থা থাকা উচিত। তবে পরিবারের সঙ্গে ইফতার করার মধ্যেও সংখ্যাতীত কল্যাণ নিহিত আছে। শায়খ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘মসজিদে জামা‘আতবদ্ধভাবে ইফতার করার মধ্যে অপরিসীম কল্যাণ নিহিত আছে। যেমন, মুসলিমদের ঐক্যবন্ধন, আত্মার মিলন, ঐক্যের সমীকরণ বা একজাতীয়করণ, পরস্পরের পরিচিতি, সংহিত চেতনার পুনরুত্থান ইত্যাদি। অনুরূপভাবে স্বীয় গৃহে পরিবারের সঙ্গে ইফতার করার মধ্যেও অগনিত সুখসমৃদ্ধি আছে। যেমন, পরিবারের সদস্যদের একত্রীকরণ, ছিয়ামের বিধি-বিধান নিয়ে আলোচনা করা, সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসার বন্ধন বৃদ্ধি করা, সন্তানদের পানাহার ও বার্তালাপের শিষ্টাচার শেখানো, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনকে সুদৃঢ় করা ইত্যাদি। সুতরাং পরিবারের মালিকের উপর এই দু’য়ের মধ্যে সমতা বজায় রাখা অপরিহার্য। সেজন্য পরিবারের সঙ্গে ইফতার করার জন্য কিছুদিন নির্ধারণ করা দরকার। আবার মসজিদে জামা‘আতবদ্ধভাবে ইফতার করার জন্যও কিছুদিন নির্দিষ্ট করা দরকার। যাতে উভয় কল্যাণেরই অধিকারী হতে পারে (ইসলাম সুওয়াল জাওয়াব, ফাতাওয়া নং-৩৮২৬৪)। এছাড়া প্রয়োজনে মসজিদে খাওয়া, পান করা ও ঘুমানো জায়েয (ইবনু মাজাহ, হা/৩৩০০, সনদ ছহীহ; ইবনু বায, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ১৫তম খণ্ড, পৃ. ৪৩৯; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২৯০)।প্রশ্নকারী : সাদিকুর রহমান, মিরপুর-৬, ঢাকা।
প্রশ্ন (১১) : স্ত্রীকে ত্বালাক্ব দেয়ার পর যদি স্ত্রী জানতে না পারে এবং স্বামী লিখিতও না দেয়, তাহলে ত্বালাক্ব হবে কি?
উত্তর : ত্বালাক্ব হয়ে যাবে। ফাত্বিমাহ বিনতু ক্বায়স (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, أَنَّ أَبَا عَمْرِو بْنَ حَفْصٍ طَلَّقَهَا الْبَتَّةَ وَهُوَ غَائِبٌ فَأَرْسَلَ إِلَيْهَا وَكِيْلُهُ بِشَعِيْرٍ فَسَخِطَتْهُ ...‘আবূ আমর ইবনু হাফছ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) (তার স্বামী) অনুপস্থিতিতেই তাকে বায়েন ত্বালাক্ব দেন । এরপর সামান্য পরিমাণ যবসহ উকীলকে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। এতে তিনি তার স্বামীর উপর ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট হন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৮০)। শায়খ ছালিহ আল-উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ত্বালাক্বের ক্ষেত্রে স্ত্রীর উপস্থিতি ও সম্মতি যরূরী নয়। স্বামী তার স্ত্রীর অজ্ঞাতসারে ও অনুপস্থিতিতেও ত্বালাক্ব দিতে পারে। অতঃপর স্ত্রী সেই ত্বালাক্বে রাজি থাকুক বা না থাকুক, ত্বালাক্ব হয়ে যাবে (ফাতাওয়া লিক্বা আশ-শাহরী, লিক্বা নং-৫৫)।প্রশ্নকারী : জুনায়েত, হাটহাজার, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন (১২) : সন্তান হিসাবে পিতা-মাতার ভরণপোষণ করা কি মেয়েদের জন্য ফরয? যেখানে তাদের কোন ভাই নেই এবং সকল বোন বিবাহিত। তাদের আর্থিক সঙ্গতি ভালো। যদি মা-বাবাকে নিজস্ব গৃহে রাখা হয় এবং তাদের টাকার ও অন্য সেবার ব্যবস্থা করা হয়, তবে কি গুনাহ হবে? কারণ অনেক সময় সাধারণ বিষয়ে পিতা-মাতা অভিমান করে এবং সন্তানকে কষ্ট দেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ কি সন্তানের উপর নাখোশ হবেন?
উত্তর : পুত্র সন্তান ও কন্যা সন্তান উভয়ের জন্যই পিতা-মাতার খিদমাত করা অপরিহার্য। বিবাহের পূর্বে ও পরে সব সময়ই পিতা-মাতার অধিকার অব্যাহত থাকে। বিবাহের পরেও স্বামীর ঘর থেকে পিতা-মাতার খবরাখবর নেয়া মেয়ের দায়িত্ব। তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৭, ২৭৮২, ৫৯৭০, ৭৫৩৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৫)। এ ব্যাপারে বাধা প্রদান করা স্বামীর জন্য বৈধ নয়। মেয়ে সাবলম্বী হলে স্বেচ্ছায় পিতা-মাতাকে আর্থিক সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু স্বামীর অর্থ বা সম্পত্তি থেকে সহযোগিতা করতে হলে স্বামীর নিকট থেকে অনুমতি নেয়া অপরিহার্য। কেননা শ্বশুর-শাশূড়ীর খরচ বহন করা জামাইয়ের উপর যরূরী নয়। তবে জামাই যদি সাবলম্বী হয়, সেক্ষেত্রে মানবিকতার খাতিরে উদারতা প্রদর্শন করা দরকার (ইসলাম সুওয়াল জাওয়াব, ফাতাওয়া নং-১২২১৪, ২১৭৩৭)।অন্যদিকে যদি পিতা-মাতা কোন কারণ ছাড়াই সন্তানের উপর রাগান্বিত হন, তাহলে সন্তানের কোন গুনাহ হবে না। আল্লাহ নাখোশ হবেন না। কিন্তু সর্বদা পিতা-মাতাকে রাজি করার চেষ্টা করতে হবে। তাছাড়া অকারণে সন্তানদের উপর বদ-দু‘আ করা জায়েয নয় (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০৯; ইসলাম ওয়েব, ফাতাওয়া নং-২৯৬০৫৩)।প্রশ্নকারী : আহমাদ, ঢাকা।
প্রশ্ন (১৩) : ওয়াইফাই লাইন যদি শেয়ারে নেয়া হয়। তন্মধ্যে কেউ ইন্টারনেটে হারাম কাজ করে এবং কেউ ভালো কাজ করে। এমতাবস্থায় খারাপ কাজের পাপের ভাগ কি সবাইকে নিতে হবে?
উত্তর : এতে কোন সন্দেহ নেয় যে, ক্বিয়ামাতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজ নিজ পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। সেদিন আল্লাহ তা‘আলা কারোর উপর বিন্দুমাত্র যুলুম করবেন না এবং কেউ অন্য কারো পাপের বুঝাও বহন করবে না (সূরা আল-আন‘আম : ১৬৪)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ’ (সূরা আত-তূর : ২১; সূরা আল-মুদ্দাছছির : ৩৮; ইসলাম সুওয়াল জাওয়াব, ফাতাওয়া নং ৩১৮৬৯৮)। তবে কেউ যদি কাউকে গুনাহের কাজে সহযোগিতা করে, উৎসাহিত করে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বাধা প্রদান না করে, তবে সেও তার গুনাহে অংশীদার হবে (সূরা আল-মায়িদাহ : ২)। যেহেতু পাপের কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোনভাবেই সাহায্য করা যাবে না, তাই সামর্থ্য থাকলে নিজস্ব কানেকশন নেয়াই উত্তম হবে।প্রশ্নকারী : মাহফুজুর রহমান, হড়গ্রাম, রাজশাহী।
প্রশ্ন (১৪) : অনেকেই বাড়িতে গৃহস্থালী কাজ (থালা-বাসন ধোঁয়া, ঝাড়– দেয়া, রান্না করা প্রভৃতি) করা অবস্থায় মোবাইল বা কোন ডিভাইসে কুরআন তিলাওয়াত শুনেন। এভাবে কাজ চলাকালীন অবস্থায় তিলাওয়াত শুনলে নেকি হবে কি?
উত্তর : কর্মব্যস্ততার সময় রেডিও অথবা টেপ রেকর্ডার থেকে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করা দোষণীয় নয়। আর এটা আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশের বিরোধীও নয় (সূরা আল-আ‘রাফ : ২০৪)। কর্মব্যস্ত ব্যক্তিকে যথাসাধ্য চুপ থাকতে হবে এবং মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে (ছালেহ আল-ফাওযান, আল-মুনতাক্বা মিন ফাতাওয়া, প্রশ্ন নং-৪৩৭)।এ প্রসঙ্গে শায়খ ছালিহ আল-উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘অমনোযোগী ও উদাসীন অবস্থায় টেপ-রেকর্ডার বন্ধ রাখাই উচিত। কেননা এটা কাফিরদের বৈশিষ্ট্য। সুতরাং যখন তুমি লক্ষ্য করবে যে, লোকেরা তিলাওয়াতের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছে না, বরং তারা নিজেদের মধ্যে বার্তালাপে ব্যতিব্যস্ত, তখন তুমি টেপ-রেকর্ডার বন্ধ রাখবে’। তিনি আরো বলেন, ‘টেপ-রেকর্ডারে হলেও কুরআনের তিলাওয়াত চলাকালীন অমনোযোগী হওয়া বেয়াদবি। সেই জন্য আমরা বলব, যখন আপনি শুনার জন্য অবসর সময় পেয়েছেন, তখন শুনুন আর যখন আপনি ব্যস্ত তখন বন্ধ রাখুন’ (লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-১৪৬ এবং লিক্বা নং-১৯৭, প্রশ্ন নং-২৬)। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘অনেক মানুষই কুরআনের মর্যাদা, সম্মান ও আদব সম্পর্কে উদাসীন। অতএব তিলাওয়াত চলাকালীন হাসি-ঠাট্টা, কথাবার্তা ও বিশৃঙ্খলা বর্জন করা যরূরী (আত-তিবয়ান ফী আদাবি হামলাতুল কুরআন, পৃ. ৯২)।প্রশ্নকারী : উম্মে ফাহিম, রাজশাহী।
প্রশ্ন (১৫) : হঠাৎ মৃত্যু আল্লাহর গযব স্বরূপ। আবূ দাউদের ৩১১০ নং হাদীছের ব্যাখ্যা জানতে চায়।
উত্তর : ‘হঠাৎ মৃত্যু আল্লাহর গযব স্বরূপ’ মর্মে বর্ণিত আবূ দাঊদের হাদীছটি ছহীহ, না-কি যঈফ তা নিয়ে মুহাদ্দিছদের মাঝে মতভেদ রয়েছে (ফাৎহুল বারী, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৫৪)। এমনকি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হঠাৎ মৃত্যু থেকে পানাহ চাইতেন মর্মে বর্ণিত দু‘আটিও ছহীহ নয়। অন্য হাদীছে এসেছে, ‘হঠাৎ মৃত্যু মুমিনদের জন্য রহমত কিন্তু পাপিদের জন্য গযব’। মারফূ‘ সূত্রে অনেকেই হাদীছকে যঈফ বললেও মাওকূফ সূত্রে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) ও আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত আছারটি ছহীহ (বায়হাক্বী, ৬৩৬৫)। মুমিন ব্যক্তি সর্বদা প্রস্তুত থাকে মৃত্যুর জন্য। তাই মৃত্যু হঠাৎ আসলেও তার নাজাতের জন্য কোন সমস্যা নেই। আর যারা পাপী হঠাৎ মৃত্যুতে তাদের উপর আযাব নেমে আসতে পারে। কারণ তারা পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে পারেনি। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত এ দু‘আটি বেশি বেশি পড়া-اللهم إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ زَوَالِ نِعْمَتِكَ وَتَحَوُّلِ عَافِيَتِكَ وَفُجَاءَةِ نِقْمَتِكَ وَجَمِيْعِ سَخَطِكَ.‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আপনার নে‘মতের হ্রাস প্রাপ্তি, আপনার শান্তির বিবর্তন, আপনার শাস্তির হঠাৎ আক্রমণ এবং আপনার সমস্ত অসন্তোষ হতে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৩৯; মিশকাত, হা/২৪৬১)।প্রশ্নকারী : নয়ন, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
প্রশ্ন (১৬) : চেয়ারে বসে ছালাত আদায় করা যাবে কি? যদি যায়, তবে চেয়ার কাতারের কোথায় রাখতে হবে?
উত্তর : দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করতে না পারলে চেয়ারে বসে ছালাত আদায় করতে পারবে। শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে বা চেয়ারে বসে ছালাত আদায়কারীর উপর রুকূর তুলনায় সিজদাহতে একটু বেশি অবনত হওয়া অপরিহার্য। রুকূ অবস্থায় হস্তদ্বয়কে উরুদ্বয়ের উপর রাখা সুন্নাত। সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য সিজদাহ অবস্থায় হস্তদ্বয়কে মাটিতে রাখা ওয়াজিব। আর যদি সামর্থ্যবান না হয়, তবে উরুদ্বয়ের উপরেই রাখবে। কেননা নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমি সাতটি অঙ্গের দ্বারা সিজদাহ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। ললাট, নাসিকা, হস্তদ্বয়, হাঁটুদ্বয় এবং পদযুগলের আঙ্গুলসমূহ দ্বারা। আর আমরা যেন চুল ও কাপড় গুটিয়ে না নিই’ (ছহীহ বুখারী, হা/৮১২)।আর যে সমস্ত অপারগ ব্যক্তি চেয়ারে বসে ছালাত আদায় করছে, তারা না পারলেও কোন দোষ নেয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, فَاتَّقُوا اللّٰہَ مَا اسۡتَطَعۡتُمۡ ‘তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর’ (সূরা আত-তাগাবূন : ১৬)। এতদ্ব্যতীত শরী‘আতের নির্দেশিত কোন বিষয়কে সাধ্যানুসারে মেনে চলার ব্যাপারে নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশনা প্রদান করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৭২৮৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৩৭; ইবনু বায, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ১২তম খণ্ড, পৃ. ২৪৫-২৪৬)।ইমরান ইবনু হুছাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার অর্শরোগ ছিল। তাই আমি নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর খিদমতে এ অবস্থায় ছালাত আদায় করার পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, صَلِّ قَائِمًا فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ ‘দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করবে, তা না পারলে বসে করবে। যদি তাও না পার তাহলে একপাশে শুয়ে আদায় করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১১১৭; তিরমিযী, হা/৩৭১; আবূ দাঊদ, হা/৯৫২)।উক্ত হাদীছ সম্পর্কে সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি বলেন, ‘দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করতে অসমর্থ ব্যক্তি মাটিতে বা চেয়ারে বসে ছালাত আদায় করবে এবং ঝুঁকে রুকু ও সিজদাহ করবে। আর সিজদাহতে রুকূর তুলনায় একটু বেশি অবনত হবে। তবে কোন অবস্থাতেই বালিশে সিজদাহ করা জায়েয না (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৩৬০)। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, মুসলিমরা এ বিষয়ে ঐকমত্য যে, যখন মুছল্লী ছালাতের কোন বিধান পালন করতে অপারগ হবে, যেমন ক্বিয়াম, ক্বিরাত, রুকু, সিজদাহ, ক্বিবলা নির্ধারণ করা ইত্যাদি, তখন সে তার সাধ্যানুযায়ী উক্ত বিধানটি আদায় করবে’ (ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৪৩৭)।এক্ষণে বসার প্রকৃত অর্থ পরিষ্কার করা যরূরী। শায়খ ছালেহ আল-উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এক্ষেত্রে চার জানু বা পদযুগলের উপর নিতম্ব রেখে বসা অপরিহার্য নয়, বরং সে তার সুবিধার্থে ইচ্ছামত বসতে পারে। কেননা নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘দাঁড়িয়ে না পারলে বসে ছালাত আদায় করবে। কিন্তু তিনি বসার কোন পদ্ধতি নির্ধারণ করেননি’ (শারহুল মুমতি‘, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৪৬২)।উক্ত হাদীছে যমীনে বসার কথা বলা হয়নি, বরং তাকে শুধু বসার কথা বলা হয়েছে, সেটা যমীনের উপর বসা হতে পারে, আবার চেয়ারের উপর বসাও হতে পারে। আরবের লোকেরা চেয়ারের উপর উপবেশিত হওয়াকেও ‘বসা’ বলে থাকে (ছহীহ বুখারী, হা/৬৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৭৯; নাসাঈ, হা/৯৩-৯৪, ৫৩৭৭; আবূ দাঊদ, হা/১১১, সনদ ছহীহ)। অতএব নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাঁড়াতে অক্ষম ব্যক্তিকে বসার অনুমতি দিয়েছেন এবং তিনি বসাকে মাটির সঙ্গে নির্দিষ্ট করেননি। সুতরাং কোন প্রমাণ ছাড়াই একটা স্বাধীন বিষয়কে সীমিত করা এবং প্রশস্ত বিষয়কে সংকোচিত করা অনুচিত। চেয়ারে বসে ছালাত আদায় করাকে বিদ‘আত বলেছেন, এমন কোন জ্ঞানী মুফতিকে আমরা জানি না (ইসলাম ওয়েব, ফাতাওয়া নং-১৩৫৩৪৬)।‘কাতারের কোথায় চেয়ার রাখতে হবে’ এ সম্পর্কে আলেমগণ বলেন, ‘বসে ছালাত আদায়কারী ব্যক্তি যেখানে নিতম্ব রাখেন সেখানেই চেয়ার রাখতে হবে, কাতারের আগে বা পিছে করা যাবে না (আসনাল মাত্বালিব, ১ম খণ্ড, পৃ. ২২২; তুহফাতুল মুহতাজ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫৭; শারতু মুনতাহাল ইদারাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭৯; ইসলাম সুওয়াল জাওয়াব, ফাতাওয়া নং-৫০৬৮৪, ৩৬৭৩৮, ৯৩০৭)।প্রশ্নকারী : ছালাহ উদ্দিন, ভানপুর, গোদাগাড়ী, রাজশাহী।
প্রশ্ন (১৭) : আমি নিয়মিত ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকার মধ্যে কুরবানী করি। এ বছর আমি কুরবানীর জন্য একটি গরু মানত করেছি। যখন গরুটি ক্রয় করেছিলাম তখন তার মূল্য ছিল ৩০,০০০ টাকা। কিন্ত বর্তমানে গরুটি অনেক মোটাতাজা হয়েছে, যার মূল্য এখন প্রায় দেড় লাখেরও বেশি। যদিও আমার সামর্থ্য এত না। এখন গরুটি বিক্রয় করে আমার সামর্থ্যরে মধ্যে অন্য প্রাণী কুরবানী করতে পারব কি?
উত্তর : কোন ব্যক্তি কুরবানী করার মানত করলে তার জন্য মানত পূর্ণ করা অপরিহার্য (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৭০; ছহীহ বুখারী, হা/৬৬৯৫-৬৬৯৬, ৬৬৭০)। যেহেতু কুরবানী আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম, তাই এই মানত পূর্ণ করা অপরিহার্য (মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৭৯)। কুরবানী করার নিয়তে কোন পশু নির্ধারণ করলে, শারঈ কোন কারণ ছাড়া (যেমন অসুস্থ হওয়া) ঐ নির্ধারিত পশু পরিবর্তন করা যাবে না। যদি কেউ বলে যে, আমি অমুক গরুটি কুরবানী করব, তাহলে সেই গরুটি কুরবানী করা তার জন্য অপরিহার্য (ইসলাম ওয়েব, ফাতাওয়া নং-১০০৪৩৬)। এমনকি প্রসিদ্ধ চার ইমাম এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন (আল-মুগনী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৪৪৪; আল-মাজমূঊ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৪২৩; রওযাতুত ত্বালিবীন, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২০৮; আল-বাহরুর রাইক্ব, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৯৯; আয-যাখীরাহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৫৪)।উল্লেখ্য, কুরবানীর নিয়তে কোন পশু ক্রয় করাকে নির্ধারিত করা বলতে বোঝায়। অর্থাৎ কুরবানীর নিয়তে কোন পশু ক্রয় করার পর সেটাকে বিক্রয় বা অন্য কোন কাজে লাগানো যাবে না। এমনকি নির্ধারণ করার পর যব্হের পূর্বে ঐ পশু বাচ্চা প্রসব করলে, তাকেও কুরবানী করতে হবে (আশ-শারহুল কাবীর, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৫৫৯; আল-ইনসাফ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৫; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১১তম খণ্ড, পৃ. ৪০২)।প্রশ্নকারী : আব্দুল মুহীত্ব, পাবনা।
প্রশ্ন (১৮) : মৃত ব্যক্তির জন্য জামাই, ছেলের বউ বা অন্য যে কেউ যদি দান করেন, তবে সেই ব্যক্তির কোন উপকার হবে কি?
উত্তর : উপকার হবে। কোন মানুষ মারা গেলে মুসলিমদের উচিত তার জন্য দু‘আ করা। কারণ আমরা সবাই পরস্পরের দু‘আর মুখাপেক্ষী। মৃত ব্যক্তির উপকার হয় এমন যত কাজ আছে তার মধ্যে অন্যতম হল তার পক্ষ থেকে ছাদাক্বাহ করা। উক্ববা ইবনু আমির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّ الصَّدَقَةَ لَتُطْفِئُ عَنْ أَهْلِهَا حَرَّ الْقُبُوْرِ ‘নিশ্চয় ছাদাক্বাহ মৃত ব্যক্তির কবরে জ্বলতে থাকা আগুন ধপ করে নিভিয়ে দেয়’ (ত্বাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর, হা/৭৮৮; সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৩৪৮৪)।হাদীছে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে কিন্তু কোন আত্মীয়-স্বজনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়নি। অর্থাৎ যেকেউ দান করলেই হবে। শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সকল বিদ্বান এ বিষয়ে একমত যে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে মুসলিমদের যে কেউ দান করলে সে দানে উপকার হয়। যেমন কেউ মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে যদি দাসমুক্ত করে, অর্থ-সম্পদ দান করে তাহলে তেমন উপকার হবে যেমন দু‘আ করলে তার উপকার হয়। চাই সে তার কোন নিকটাত্মীয় হোক অথবা অন্য কেউ হোক। যেমন জানাযার ছালাতে নিকটাত্মীয় বা অন্য কেউ দু‘আ করে থাকে’ (মাজমূঊল ফাতাওয়া, ২৪তম খণ্ড, পৃ. ৩৬৭)।প্রশ্নকারী : বদরুল ইসলাম, ফতেহপুর, মান্দা, নওগাঁ।
প্রশ্ন (১৯) : কোন ব্যক্তি টাকা ধার নিয়ে সময়মত টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। যাকাত দেয়ার সময় উক্ত টাকা বাদ দিয়ে যাকাত দিলে হবে কি? উল্লেখ্য, যে টাকা ধার দেয়, সে দেয়ার সময়ই নিয়ত করে যে, যদি সেই ব্যক্তি কোন কারণে টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে উক্ত টাকা সে যাকাতের টাকা ধরে বাদ দিবে। এটা কি শরী‘আত সম্মত?
উত্তর : উক্ত নিয়মে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করার লক্ষ্যে যাকাতের টাকা থেকে কর্তন করে ঋণ পরিমাণ টাকা কর্তন করা যাবে। কেননা যাকাতের ৮টি খাতের মধ্যে একটি খাত হল ঋণগ্রস্ত। আর অসহায় অক্ষম ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যাকাত পাওয়ার হক্বদার (ইকনা‘, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৭৯)।প্রশ্নকারী : ফাতেহ উল-হাসান, মিরপুর, ঢাকা।
প্রশ্ন (২০) : আল্লাহ তা‘আলাকে রব হিসাবে মানা বলতে কী বুঝায়? মক্কার কাফেররা কি আল্লাহ তা‘আলাকে রব্ব হিসাবে মেনে নিয়েছিল?
উত্তর : আল্লাহকে রব হিসাবে মেনে নেয়া বলতে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা, জীবন ও মৃত্যুদাতা হিসাবে মেনে নেয়া। ৩ প্রকার তাওহীদের একটি প্রকার তাওহীদে রুবূবিয়্যাহ। শুধু ১ম প্রকার তাওহীদকে যারা মেনে চলত এবং বর্তমানেও মানে তারা মহান আল্লাহকে রব হিসাবে মেনে নিয়েছে। মক্কার কাফেররা ১ম তাওহীদকে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু ২য় প্রকার তাওহীদ উলূহিয়্যাহ বা সকল ইবাদতে মহান আল্লাহকে একক গণ্য করা এই তাওহীদকে তারা অস্বীকার করত বলেই তারা কাফের। তারা আল্লাহকে রব হিসাবে মানত সে বিষয়ে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘হে নবী! আপনি জিজ্ঞেস করুন, আসমান ও যমীন থেকে তোমাদের কে রিযিক দান করেন? অথবা তোমাদের কান-চোখের মালিক কে? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেইবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থা করেন? তখন তারা বলে উঠে, আল্লাহ। আপনি বলুন, তোমরা তারপরও ভয় করছ না?’ (সূরা ইউনুস : ৩১)। বর্তমানেও এ ধরনের লোকের সংখ্যা কম নয়।প্রশ্নকারী : আযহার উদ্দিন, ছাগলনাইয়া, ফেনী।
প্রশ্ন (২১) : এক জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু জমির দলীল হয়নি। উক্ত জায়গায় ছালাত আদায় করা যাবে কি?
উত্তর : মসজিদের জন্য শর্ত হল, সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া। তাই দ্রুত ওয়াকফ করে দেয়া উচিত। এক্ষণে যারা দাতা তারা যদি নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে সেখানে ছালাত হবে না। কারণ দান করার পর যদি বলে আমি মসজিদ তৈরি করেছি বা আমার মসজিদ এমন কথা বললে এ ধরণের মসজিদে ছালাত আদায় না করাই উত্তম। মূল বিষয় হল জমির দলীল হতে হবে, বিশেষ করে জুমু‘আর ছালাত আদায় করতে হলে মসজিদের নামে রেজিস্ট্রি হতে হবে এবং মালিকানামুক্ত হতে হবে। কারণ অনেকে মসজিদ তৈরি করে দেয়ার পরও তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি খাটাতে চাই আবার অনেক সময় গর্ব করে বলতে থাকে যে, এটা আমি বা আমরা তৈরি করেছি।যেহেতু জোরপূর্বক দখলকৃত জমির উপর নির্মিত মসজিদে ছালাত আদায় করা যাবে না। এমনকি গণ্ডগোলের জমি বলা হয় এমন মসজিদেও ছালাত আদায় করা যাবে না (ছহীহ বুখারী, হা/৩১৯৮)। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘বিদ্বানগণের ঐকমত্যে এ ধরণের মসজিদের ছালাত আদায় করা হারাম’ (আল-মুহায্যাব, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৬৩-৬৪; শাবাকাতুল ইসলামিয়্যাহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৪৭৭৮, ফৎওয়া নং-৭২৯৬)। তাই এগুলো থেকে মুক্ত থাকার জন্যই মসজিদের জমি ওয়াক্ফ করা আবশ্যক। ওয়াকফের জন্য প্রক্রিয়াধীন মসজিদে ছালাত আদায়ে কোন বাধা নেই।প্রশ্নকারী : সাদ্দাম হোসেন, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।
প্রশ্ন (২২) : ছিয়াম অবস্থায় সহবাস ব্যতীত স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করা যাবে কি?
উত্তর : ছিয়াম অবস্থায় স্ত্রীর সাথে স্বাভাবিক উঠা-বসা বা মেলামেশা করাতে কোন বাধা নেই। তবে সর্বদা ছিয়ামের বিষয়টি খেয়াল রাখা উচিত। স্বাভাবিক মেলামেশাতে যদি ছায়েমের বীর্যপাত হয়, তাহলে ছওম নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ছওম অবস্থায় এ ধরণের মেলামেশা পরিহার করতে হবে। বিশেষ করে রামাযানে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। যেমন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিয়াম অবস্থায় চুমু খেতেন এবং গায়ে গা লাগাতেন। তবে তিনি তার প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে তোমাদের চেয়ে অধিক সক্ষম ছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৯২৭)। উক্ত হাদীছের শেষ বাক্য দ্বারা বুঝা যায় যে, এক্ষেত্রে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে সাধারণ মানুষের তুলনা করলে চলবে না। সুতরাং দূরে থাকাই উত্তম।প্রশ্নকারী : শাফীউল কারীম, গাজীপুর।
প্রশ্ন (২৩) : তারাবীহর ছালাতে কুরআন খতম করা যাবে কি?
উত্তর : তারতীলসহ ধীরস্থিরতার সাথে তেলাওয়াত করে তারাবীহর ছালাতে কুরআন খতম করা ভাল। নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে তারাবীহর ছালাতে কুরআন খতমের বিষয়টি প্রমাণিত নয়। কারণ নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাত্র তিনদিন জামা‘আত সহকারে ক্বিয়ামুল লাইল কিংবা তারাবীহর ছালাত আদায় করেছিলেন। তবে তিনি এক রাক‘আতেই সূরা আল-বাক্বারাহ, সূরা আন-নিসা ও সূরা আলে ‘ইমরান পড়ে (ছহীহ মুসলিম, হা/৭৭২) বরং লম্বা ক্বিরায়াত ও খতমে কুরআনের দিকেই ইঙ্গিত করে গেছেন। তাছাড়া রামাযান মাসে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও জিবরীল (আলাইহিস সালাম) একে অপরকে কুরআন শুনাতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৬, ১৯০২, ৩২২০, ৩৫৫৪, ৪৯৯৭; মুসলিম হা/৩২০৮)। ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) তো এই লম্বা ক্বিরাআতে ক্লান্ত হয়ে ভেবেই বসেছিলেন যে, তিনি বসে যাবেন নতুবা এই ছালাতই ছেড়ে দিবেন (ছহীহ বুখারী, হা/১১৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৭৩)।তারাবীহতে সালাফগণ কত চমৎকারভাবে কুরআন খতম করতেন তা ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন (জালাউল আফহাম, পৃ. ৪০২-৪০৩)। ইমাম ইবনু কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেন যে, ফযল ইবনু যিয়াদ আহমাদ ইবনু হান্বাল (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আমি কি তারাবীহর ছালাতে কুরআন খতম করব, না-কি বিতরের ছালাতে? প্রতুত্তরে তিনি বললেন, তারাবীহর ছালাতে’ (আল-মুগনী, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৯৬)।খতমে তারাবীহ সম্পর্কে শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ধীরস্থিরতার সাথে শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ চিন্তা করে কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে খতম তারাবীহ পড়া ভালো। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) পসন্দ করতেন যে, রামাযান মাসে ইমাম মুক্তাদীদের পুরো কুরআন শুনাবে। এ আমল সালাফে ছালিহীনের যুগ থেকে চলে আসছে। কিন্তু একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা ও ধীরস্থিরতাকে ত্যাগ করে, দ্রুতগতিতে তুফানের বেগে তিলাওয়াত করে, খতম না করাই উত্তম’ (ইবনু বায, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ১১তম খণ্ড, পৃ. ৩৩১-৩৩৩)।শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তারাবীহতে কুরআন খতম করা ইমামের প্রতি ওয়াজিব নয়। কেননা মহান আল্লাহ বলেন ‘তোমাদের জন্য যা সহজসাধ্য তাই পাঠ কর’ (সূরা আল-মুযযাম্মিল : ২০)। অতঃপর তিনি বলেন, ‘যদি ইমাম তারাবীহর ছালাতে এই উদ্দেশ্যে কুরআন খতম করে যে, তার পিছনে অংশগ্রহণকারী মুছল্লীবৃন্দ মহান আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কিতাব শ্রবণ করবে তবে তা অতি উত্তম হবে’ (ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দার্ব, ১৬১/১৬)। উল্লেখ্য, তারাবীহর ছালাত জামা‘আত সহকারে আদায় করা উত্তম (তিরমিযী, হা/৮০৬;, আবূ দাঊদ, হা/১৩৭৫, সনদ ছহীহ; ইসলাম সুওয়াল ও জাওয়াব, প্রশ্ন নং-৪৮৯৫৭ )।প্রশ্নকারী : আব্দুল্লাহ, বগুড়া।
প্রশ্ন (২৪) : ছালাত সঠিক হওয়ার পরেও ইমাম যদি সাহু সিজদা দেন তাহলে কি ছালাত হবে?
উত্তর : ছালাতে সাহু সিজদার বিধান হল- কোন ওয়াজিব ছুটে গেলে, রুকু-সিজদা বা রাক‘আত কমবেশী হলে বা কোন সন্দেহ হলে সাহু সিজদা দিতে হয়। সেক্ষেত্রে ইমাম ছাহেব সাহু সিজদা কেন দিলেন তা ইমাম ছাহেবই জানেন। বাহ্যিক কোন ভুল না হলেও তার ভিতরে সন্দেহের কারণে দিয়েছে। এর কোনটি না হলে ইমাম ছাহেব সাহু সিজদা দিতে পারবে না। দিলে তিনি তার সীমাতিক্রম করবেন। তবে এক্ষেত্রে ইমাম বা মুক্তাদির ছালাতে কোন ক্ষতি হবে না। ব্যক্তিগতভাবে ইমাম ছাহেবকে জবাবদিহি করতে হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘যে এমন কোন কর্ম করল অথচ তাতে আমাদের নির্দেশনা নেই সে কর্ম প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)।প্রশ্নকারী : ফেরদৌস, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি।
প্রশ্ন (২৫) : কেউ কুরআনকে বা নবীকে অপমান করলে, তাকে প্রকাশ্যে হত্যার বিধান ইসলামে আছে কি?
উত্তর : কোন মুসলিম যদি নবীকে গালি দেয় অথবা কুরআনকে অপমানসূচক কোন মন্তব্য করে, তাহলে সে মুরতাদ বা কাফের হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রুপ করছিলে? তোমরা ওযর পেশ করো না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করেছ’ (সূরা আত-তওবা : ৬৫-৬৬)। নবী-রাসূলকে গালি দিলে তাদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে তা বাস্তবায়ন করবে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি।রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে এমন ঘটনা ঘটলে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার হত্যাকে বৈধতা দিয়েছিলেন। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, একজন লোকে দু’সন্তানের মা ছিল যা কলিজার টুকরার ন্যায়। কিন্তু সেই স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে গালাগালি করত। ছাহাবী তাকে নিষেধ করলেও মহিলা তা শুনত না। ধমক দিলেও শুনত না। একদিন রাতে সে আর সহ্য করতে না পেরে তার উপর উঠে কুড়াল জাতীয় একটি অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করল। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ক্বিছাছ গ্রহণ করেননি (মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৮০৪৪, সনদ ছহীহ)।প্রশ্নকারী : নিয়ামুল হাসান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
প্রশ্ন (২৬) : সাধারণ মানুষ বা আলেম সমাজ যারা সালাফী আক্বীদার, তারা কি নিজের নামের শেষে সালাফী নামটি ব্যবহার করতে পারে?
উত্তর : প্রত্যেক মুমিন-মুত্তাক্বির প্রথম ও গর্বের পরিচয় মুসলিম। কোন মুসলিমই এই লকবটি তাদের নামের আগে-পরে বসাই না। সালাফী নামটিও এমনই। সালাফী বলতে বুঝায় পূর্বসূরী ছাহাবী, তাবেঈ, তাবেঈ-তাবেঈদের অনুসরণে শরী‘আতকে মূল্যায়ন করা। শায়খ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সবাই তো নিজেকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ দাবি করে। এর চেয়ে সালাফী বলাই উত্তম, এ বিষয়ে আপনি কী মনে করেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘সালাফিরা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং সালাফী কারো নামের সাথে সম্পৃক্ত করাতে কোন দোষ নেই। তারা ছাহাবী, তাবেঈর অনুসারী, আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে। তারা তো বাতিলের দিকে নিসবাত করেনি; সত্য ও উপযুক্ত সম্বন্ধের দিকেই সম্পৃক্ত করেছে (ইবনু বায, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ২৮তম খণ্ড, পৃ. ৫০)।প্রশ্নকারী : আব্দুল্লাহ, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
প্রশ্ন (২৭) : আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় ৯ বছর। প্রথম সন্তান মেয়ে হয়ে মারা গেছে। এটা কি আমার জন্য কোন বিপদ? সন্তান লাভের কোন বিশেষ আমল আছে কি?
উত্তর : মহান আল্লাহ যখন চাইবেন মানুষের সন্তান তখনই হবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা-সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাশীল’ (সূরা আশ-শূরা : ৪৯-৫০)। আর সন্তান শিশু অবস্থায় মারা যাওয়া কল্যাণের লক্ষণ। কেউ সন্তুষ্ট থাকলে অতি বিলাপ না করে ধৈর্যধারণ করলে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা তার জন্য জান্নাতের মাঝে প্রশংসার ঘর নির্মাণ করেন (তিরমিযী, হা/১০২১; মিশকাত, হা/১৭৩৬; সনদ হাসান, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৪০৮)। সন্তান না হওয়া কখনোই কোন বিপদের আলামত নয়। প্রথমত উভয়ের শারীরিক কোন সমস্যা আছে কি না ডাক্তারের কাছে সে বিষয়ে আলাপ করে ধৈর্যের সাথে আল্লাহর কাছেই চাওয়া। সন্তান লাভের আমল বলতে নবী-রাসূলকে আল্লাহর শিখিয়ে দেয়া পদ্ধতিই সর্বোত্তম; তা হল- দু‘আ করা, একান্ত আল্লাহর কাছেই চাওয়া, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া (সূরা আন-নূহ : ১০-১৩)।প্রশ্নকারী : তানযিলা, কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রশ্ন (২৮) : আমি বাংলাদেশ জেলে কারারক্ষী পদে (সৈনিক পদে ভর্তি হয়ে) চাকুরী করি। সাধারণ পদে কিছুদিন ডিউটি পালন করার পর খেলোয়াড় (খেলোয়াড় কোটায়) হিসাবে চাকুরি শুরু করেছি। পেশা হিসাবে এটা করা কি সঠিক হয়েছে? আমি চাইলে অন্য বিভাগেও চাকুরী করতে পারব।
উত্তর : ইসলাম শর্তসাপেক্ষে কিছু খেলাকে জায়েয করেছে। ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এমন প্রত্যেক খেলা-ধূলা, যা শারীরিকভাবে কোন ক্ষতিসাধন করে না এবং ধর্মীয় কাজেও কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না, তা বৈধ’ (আল-মুগনী, ১৪তম খণ্ড, পৃ. ১৫৭)। এই অনুমতি শুধু সাময়িক বৈধ বিনোদনের উদ্দেশ্যে দেয়া হয়েছে। কিন্তু যদি কেউ খেলা-ধূলাকেই বা বিনোদনকেই জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বানিয়ে নেয় এবং এটাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করে, তখন তা হালাল বা বৈধ থেকে হারাম বা মাকরূহের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। যেমন নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,وَكُلُّ شَيْءٍ يَلْهُوْ بِهِ الرَّجُلُ بَاطِلٌ إِلَّا رَمْيَهُ بِقَوْسِهِ وَتَأْدِيْبَهُ فَرَسَهُ وَمُلَاعَبَتَهُ امْرَأَتَهُ.‘এমন প্রত্যেক জিনিস যা মানুষকে উদাসীন ও দ্বীন বিমুখ করে তোলে, তা পরিত্যাজ্য। শুধু তীরন্দাজী করা, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং নিজ স্ত্রীর সাথে প্রেম বিনিময় করা ব্যতীত’ (দারিমী, হা/২৪৪৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৩০০,১৭৩৩৭ ‘শুআইব আল-আরনাঊত্ব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সমস্ত তথ্য ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এই হাদীছটি হাসান পর্যায়ের)। ইমাম শাত্বিবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এমন খেলা-ধূলা, যা নিষিদ্ধের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং নিষিদ্ধকরণের কোন কারণও সংঘঠিত হয়নি, তা মুবাহ বা অনুমোদনযোগ্য। কিন্তু এটি নিন্দিত কাজ। আলেমগণ এর উপর সন্তুষ্ট নন। বরং তাঁরা এটা অপসন্দ করেন যে ‘কোন একজন ব্যক্তি সামাজিক ও মানবিক সংস্কারমূলক কাজে নিয়োজিত না হয়ে, তার মূল্যবান সময় এমন একটি কাজে ব্যয় করে, যার মধ্যে ইহকাল ও পরকালের জন্য কোন কল্যাণ নেই’ (আল-মুওয়াফাক্বাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ২০৪-২০৫)। সুতরাং কোন মুসলিমের জন্য এটা কখনই শোভনীয় নয় যে, সে তার অমূল্য ও বহুমুখী জীবনটাকে শুধু খেলা-ধূলার মাধ্যমে বিনষ্ট করে ফেলবে।অতএব স্পোর্ট ডিপার্টমেন্টে কিছু সুবিধা থাকলেও একে পেশা হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না। কেননা তা নিন্দিত ও সন্দেহযুক্ত।প্রশ্নকারী : আব্দুল্লাহ, গাজীপুর।
প্রশ্ন (২৯) : যদি কেউ তার স্ত্রীকে একসাথে তিন ত্বালাক্ব দেয়, তখন তার জন্য করণীয় কী?
উত্তর : যদি কেউ তার স্ত্রীকে এক বৈঠকে তথা একসাথে তিন ত্বালাক্ব প্রদান করে, তাহলে তা এক ত্বালাক্ব হিসাবেই গণ্য হবে। এটাই শরী‘আতের সিদ্ধান্ত। তাই কেউ তার স্ত্রীকে এক সঙ্গে তিন ত্বালাক্ব দিলে সংসার করতে পারবে। তবে এক সঙ্গে তিন ত্বালাক্ব প্রদান করা শরী‘আত বিরোধী কাজ, গর্হিত অন্যায় এবং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহকে অবজ্ঞা করার শামিল। সেজন্য কেউ এ ধরনের অন্যায় করলে তাকে তওবা করতে হবে।আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, كَانَ الطَّلاَقُ عَلَى عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبِىْ بَكْرٍ وَسَنَتَيْنِ مِنْ خِلَافَةِ عُمَرَ طَلَاقُ الثَّلَاثِ وَاحِدَةً ‘রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে এবং আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে ও ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফাতের প্রথম দু’ বছর পর্যন্ত তিন ত্বালাক্ব এক ত্বালাক্বই সাব্যস্ত হত’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৭২)।ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রুকানার পিতা ‘আবদু ইয়াযীদ ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠী উম্মু রুকানাকে ত্বালাক্ব দেন এবং মুযাইনাহ গোত্রের এক মহিলাকে বিয়ে করেন। একদা ঐ মহিলা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বলল, তার স্বামী সহবাসে অক্ষম। যেমন আমার মাথার চুল অন্য চুলের কোন উপকারে আসে না। সুতরাং আপনি আমার ও তার মাঝে বিচ্ছেদ করিয়ে দিন। নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এতে অসন্তুষ্ট হন এবং রুকানা ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠীকে ডেকে আনেন। এরপর তিনি সেখানে উপস্থিত লোকজনকে বলেন, তোমরা কি লক্ষ্য করেছ যে, এদের মধ্যে অমুক অমুকের অঙ্গের সাথে মিল রয়েছে? তারা বলল, হ্যাঁ। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আবদু ইয়াযীদকে বলেন, তুমি তাকে ত্বালাক্ব দাও। সুতরাং তিনি তাকে ত্বালাক্ব দিলেন। তিনি বলেন, তুমি রুকানার মা ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠীকে পুনরায় গ্রহণ কর। তিনি বলেন, আমি তো তাকে তিন ত্বালাক্ব দিয়েছি, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তিনি বলেন, আমি তা জানি, তুমি তাকে গ্রহণ কর। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, ‘হে নাবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের ত্বালাক্ব দিবে, তখন তাদের ইদ্দতকালের প্রতি লক্ষ্য রেখে ত্বালাক্ব দিবে’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ১)।ইমাম আবূ দাঊদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, নাফি‘ ইবনু উজাইর ও ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আলী ইবনু ইয়াযীদ ইবনু রুকানা হতে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত হাদীছে রয়েছে, রুকানা তার স্ত্রীকে ত্বালাক্ব দিলে নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে পুনরায় ঐ স্ত্রীকে গ্রহণ করতে আদেশ দেন। এটা অধিকতর সঠিক (আবূ দাঊদ, হা/২১৯৬, সনদ হাসান)।অন্যত্র আবুস সাহ্বা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, একদা আবুস সাহ্বা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে বললেন,أَتَعْلَمُ إِنَّمَا كَانَتِ الثَّلَاثُ تُجْعَلُ وَاحِدَةً عَلَى عَهْدِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبِىْ بَكْرٍ وَثَلَاثًا مِنْ إِمَارَةِ عُمَرَ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ نَعَمْ‘আপনি কি জানেন, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে এবং আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে একত্রে তিন ত্বালাক্বকে এক ত্বালাক্ব গণ্য করা হত এবং ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে তিন ত্বালাক্ব গণ্য করা হত? ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, হ্যাঁ (আবূ দাঊদ, হা/২২০০, সনদ ছহীহ)।উল্লেখ্য, ত্বালাক্বের পরিমাণ ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এমনটি করেছিলেন। আর এটা ছিল তাঁর ইজতিহাদ, যা থেকে পরে তিনি ফিরে এসেছিলেন। তাছাড়া ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ইজতিহাদের চেয়ে সুন্নাহকে গ্রহণ করা ছহীহ। যেমনটি আলিমগণ বলেছেন (ইবনু বায, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ২১তম খণ্ড, পৃ. ২৭৪; আলবানী, মাজমূঊ ফাতাওয়া, পৃ. ১৫২-১৫৪)। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া বোর্ডও অনুরূপ ফৎওয়া প্রদান করেছে (ফাতাওয়া লাজনা আদ-দায়েমাহ, ২০তম খণ্ড, পৃ. ১৬৩-১৬৪)।উল্লেখ্য, ত্বালাক্ব মূলত ইদ্দতের ত্বালাক্ব, আকস্মিক বা যুগপৎ ত্বালাক্ব নয়। স্বামী-স্ত্রীকে অবশ্যই নির্ধারিত ইদ্দত গণনা করতে হবে। এজন্য কমপক্ষে তিন ঋতু মুক্তির তিন মাস স্বামী অবকাশ পাবেন যে, তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ঘর করতে পারবেন কি-না। এছাড়াও স্ত্রীকে স্বামীগৃহেই অবস্থান করতে হবে। এর দ্বারা উভয়কে পুনর্মিলনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২২৯; সূরা আত-ত্বালাক্ব : ১)। অতএব স্ত্রীকে একসাথে তিন ত্বালাক্ব প্রদান করলে এক ত্বালাক্ব সংঘটিত হবে (উছায়মীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, পৃ. ১৯)। এমতাবস্থায় তারা ঘর-সংসার করতে পারবে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ যেন না হয় তার জন্য সচেতন থাকতে হবে।প্রশ্নকারী : মাসঊদ, সিলেট।
প্রশ্ন (৩০) : মহিলারা কি কুরবানীর পশু যব্হ করতে পারে?
উত্তর : মহিলারা কুরবানীর পশুসহ যেকোন হালাল পশু যব্হ করতে পারবে (ছহীহ বুখারী, হা/২৩০৪; মিশকাত হা/৪০৭২)।প্রশ্নকারী : আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ, বরিশাল।