ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায়
- হাসিবুর রহমান বুখারী*
(২য় কিস্তি)
আরকটি হাদীছ হল- ‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোন ভালো সুন্নাহ প্রবর্তন করে’।[১] এটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, একজন অনারব ব্যক্তিও বলতে লজ্জা পাবে; অর্থাৎ তারা এর অর্থ করেন, ‘যে ইসলামে কোন ভালো বিদ‘আত উদ্ভাবন করে’- এ বিষয়েও আমরা পূর্বে দীর্ঘ আলোচনা করেছি।
আমি এখন অন্য আরেকটি হাদীছের দিকে ফিরে আসছি। ছাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘খাদ্য গ্রহণকারীরা যেভাবে খাবারের পাত্রের চতুর্দিকে একত্র হয়, অচিরেই বিজাতিরা তোমাদের বিরুদ্ধে সেভাবেই একত্রিত হবে। এক ব্যক্তি বলল, সেদিন আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে কি এরূপ হবে? তিনি বললেন, না, বরং তোমরা সেদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে, কিন্তু তোমরা হবে প্লাবনের স্রোতে ভেসে যাওয়া আবর্জনার মত। আর আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে তোমাদের পক্ষ থেকে আতঙ্ক দূর করে দিবেন, আর তিনি তোমাদের অন্তরে নিক্ষেপ করবেন ‘আল-ওয়াহন’। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ‘আল-ওয়াহন’ কী? তিনি বললেন, দুনিয়ার মোহ এবং মৃত্যুকে অপসন্দ করা’।[২]
এই হাদীছ আমাদের কাছে দাবি করে যে, আমরা পরিশুদ্ধ ইসলামের ভিত্তিতে তারবিয়্যা (সঠিক শিক্ষাদান ও চরিত্রগঠন)-এর প্রতি গুরুত্ব দিই। এর অন্তর্ভুক্ত হল- আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় না করা, আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কাউকে ভয় না করা এবং এমন হওয়া, যেমন রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির দৃষ্টান্ত এক দেহের ন্যায়, দেহের কোন অঙ্গ অসুস্থ হলে সমগ্র দেহ নিদ্রাহীনতা ও জ্বরে তার সাথে সাড়া দেয়’।[৩] এখন প্রশ্ন হল- মুসলিমরা আজ তাদের বিভিন্ন দল ও সংগঠনে বিভক্ত হওয়ার কারণে কি এই একটিমাত্র হাদীছ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে- অর্থাৎ তারা কি একটি দেহের মত হয়েছে? দুঃখজনকভাবে, না। না তাছফিয়্যাহ যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, না তারবিয়্যাহ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। বরং তারা বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন জামা‘আতের সদস্য- কিতাব ও সুন্নাহ এবং সালাফে ছালিহীনের মানহাজের ভিত্তিতে তাদের মধ্যে কোন সুদৃঢ় বন্ধন নেই। আমি বিশ্বাস করি, যে কোন জামা‘আত যদি এই ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে তা অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্যর্থ হবে। গত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিছু জামা‘আত ষাট-সত্তর বছর ধরে মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শ্লোগান দিচ্ছে, অথচ কিছু আরব দেশে তারা আধুনিক রাজনৈতিক পদ্ধতিতে ঠিক এই অবস্থায় রয়েছে- ‘জায়গায় দাঁড়িয়ে ঘুরপাক খাওয়া’! চলাফেরা আছে, কিন্তু অগ্রগতি নেই! কারণ কী? কবি যেমন বলেছেন,
أوردها سعدٌ وسعدٌ مُشتمِلْ
ما هكذا يا سعد تٌورد الإبِلْ
‘সা‘দ উটগুলোকে পানি পানের ঘাটে আনল, কিন্তু সে নিজেই বিভ্রান্ত; হে সা‘দ! এভাবে উটকে পানি পান করাতে হয় না’। আর কিছু?[৪]
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রতিভাত হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হল- (১) অনেক মুসলিম তাওহীদুল ইবাদাহ, আল্লাহর হাকিমিয়্যাত (সর্বময় কর্তৃত্ব) ও তাঁর নাম-গুণাবলীর সঠিক ধারণা সম্পর্কে অজ্ঞ। ফলে দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণে দুর্বলতা দেখা দেয়। (২) বিদ’আত ও কুসংস্কারের প্রভাবে যখন দ্বীনের বিশুদ্ধ রূপ অক্ষুণ্ন থাকে না, তখন আমল ও দাওয়াহ উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়ে। (৩) দুনিয়ামুখী মানসিকতা, দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা ও মৃত্যুভয় মুসলিম উম্মাহকে দুর্বল করে দিচ্ছে। (৪) আক্বীদা বিশুদ্ধ না হলে ঐক্যও স্থায়ী হয় না, ফলে দলাদলি বাড়ে, শক্তি ক্ষয় হয়।
সমাধানের পথ হল- (১) তাছফিয়্যাহ অর্থাৎ ঈমান ও আক্বীদাকে পরিশুদ্ধি করা। কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকে আক্বীদা ও আমলকে শিরক, বিদ‘আত ও ভ্রান্ত চিন্তা থেকে মুক্ত করা। (২) তারবিয়্যাহ অর্থাৎ সঠিক শিক্ষা ও উত্তম চরিত্রগঠন- ব্যক্তি ও সমাজকে ঈমান, তাক্বওয়া, সাহস ও আত্মত্যাগের মানসে গড়ে তোলা। (৩) সালাফে ছালিহীনের মানহাজে প্রত্যাবর্তন- ছাহাবী, তাবিঈন ও তাঁদের অনুসারীদের বোঝাপড়া অনুযায়ী দ্বীনকে অনুধাবন করা। সংক্ষেপে বলা যায়, আক্বীদা ও চিন্তার সংস্কার ছাড়া কেবল রাজনৈতিক স্লোগান বা সংগঠন দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ভিত মজবুত না হলে দালান টেকে না।
(২) দ্বীনহীনতা ও ধর্মবিমুখতা
আজ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হল- শরী‘আতের অনুসারী না হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
اَلَّذِیۡنَ اِنۡ مَّکَّنّٰہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَوُا الزَّکٰوۃَ وَ اَمَرُوۡا بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ نَہَوۡا عَنِ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَ لِلّٰہِ عَاقِبَۃُ الۡاُمُوۡرِ
‘আমরা তাদেরকে পৃথিবীতে (তামকীন) ক্ষমতা দান করলে তারা ছালাত ক্বায়িম করে, যাকাত প্রদান করে এবং সৎ কাজের আদেশ দেয় ও অসৎকার্য হতে নিষেধ করে। আর সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর আয়ত্তে’ (সূরা আল-হজ্জ : ৪১)। আলোচ্য আয়াতে ইসলামী রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। যার বাস্তবায়ন খিলাফতে রাশিদা ও প্রথম শতাব্দীর ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তাঁরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঐ সমস্ত উদ্দেশ্য সাধন করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আর যার কারণে তাঁদের রাজ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা বিস্তার লাভ করেছিল, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও ছিল এবং মুসলিমরা মাথা উঁচু করে জীবন-যাপন করতে পেরেছিলেন। আজও সঊদী আরবে- আলহামদুলিল্লাহ- ঐ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়া হয়। যার বরকতে পৃথিবীর মধ্যে সঊদী আরব শান্তি ও নিরাপত্তার দিক দিয়ে একটি শ্রেষ্ঠ ও আদর্শ দেশ বলে পরিচিত।
বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে সফল রাষ্ট্র ক্বায়িম করার জন্য বড় হৈচৈ ও হাঙ্গামা শোনা যায় এবং প্রত্যেক ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনায়করা সফল রাষ্ট্রের দাবিও করে থাকেন। কিন্তু প্রত্যেক ইসলামী রাষ্ট্রে অশান্তি, বিশৃংখলা, হত্যা, লুঠতরাজ, দুর্নীতি ও অবনতি ব্যাপক হয়ে আছে এবং অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে চলেছে। এর একমাত্র কারণ এই যে, তাঁরা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান না মেনে পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ (ধর্মহীন) বিধান দ্বারা সাফল্য অর্জন করতে চান। যা আকাশ স্পর্শ করা ও বাতাসকে মুষ্ঠিবদ্ধ করার মত অবাস্তব অপচেষ্টা। যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম দেশগুলোতে কুরআনের বর্ণিত নিয়মানুসারে ছালাত প্রতিষ্ঠা ও যাকাত প্রদান ব্যবস্থা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধাদানের বিধান বাস্তবায়ন না করা হবে এবং এ লক্ষ্যকে রাজনীতির অন্যান্য কার্যের উপর অগ্রাধিকার না দেয়া হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সফল রাষ্ট্র ক্বায়িম করার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
(৩) দ্বীনি জ্ঞানের ও সঠিক মানহাজের অভাব
কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ছহীহ জ্ঞান না থাকলে চরমপন্থা বা উদারপন্থা- উভয়ই ক্ষতিকারক। শাইখ আল্লামা মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) ও জিজ্ঞাসাকারীদের প্রশ্নোত্তরের আলোকে ‘ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি সুন্দর রূপরেখা সঠিক পরিস্ফুটিত হয়েছে’। সংক্ষেপে আলোচনাটি উপস্থাপন করা হল-
শাইখ : রাসূল (ﷺ) বলেছেন- ’যদি তোমরা এমন-এমন কাজ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেবেন’। সেটাই ঘটেছে। তাহলে চিকিৎসা কী? দ্বীনে ফিরে আসুন। কিন্তু আপনারা তো ফিরছেন না!- সূদ আছে, ঘুষ আছে, অশ্লীলতা আছে, পাপাচার আছে, ব্যভিচার আছে, বার (মদের আসর) আছেÑ আরও কত কিছু! এমতাবস্থায় আপনারা ইয়াহুদীদের সাথে যুদ্ধ করতে চান? কীভাবে সম্ভব?
প্রশ্নকারী : তাহলে বর্তমান সময়ে আমাদের করণীয় কী?
শাইখ : মহান আল্লাহ বলেন, اِنۡ تَنۡصُرُوا اللّٰہَ یَنۡصُرۡکُمۡ وَ یُثَبِّتۡ اَقۡدَامَکُمۡ ‘যদি তোমরা আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পাদ্বয় দৃঢ়-প্রতিষ্ঠিত রাখবেন’ (সূরা মুহাম্মাদ : ৭)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে’। আপনি এখানে আপনার উস্তাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলাচ্ছেন- কিন্তু এই উচ্ছ্বাস জ্ঞান দ্বারা সমর্থিত নয়, বুদ্ধি দ্বারা সমর্থিত নয়, আমল দ্বারাও সমর্থিত নয়। মাফ করবেন! ইসলামে ভণ্ডামি (নিফাক্ব) বৈধ নয়। আপনি বলছেন- সব মানুষ প্রস্তুত! এই পাপাচারী ও দুষ্কৃতিকারীরা কি আপনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না? যদি সত্যিই আপনার যুদ্ধ করার প্রস্তুতি থাকত, তাহলে যাদের নিয়ে আমরা একটু আগে কথা বলছিলাম তাদের সঙ্গে আপনি দাঁড়াতেন। কিন্তু এখানে ঈমান নেই, বস্তুগত প্রস্তুতিও নেই। আপনি কি শুধু আপনার চশমা আর অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করতে চান? অস্ত্র কোথায়?
প্রশ্নকারী : বড় কেউ, একজন নেতা- তিনি তো আমাকে দিকনির্দেশনা দেবেন!
শাইখ : সেই বড় কে? আপনার মাথার উপর তো আপনার শাসক আছে- তিনি কোথায়? এখন আপনি নিজেই নিজের ব্যাপারটি দেখুন- আপনি ও আপনার মত লোকেরা শরী‘আতের সীমারেখার মধ্যে চলছেন কি? বড় নেতা কি আপনাকে বলে ছালাত আদায় করো না? বলে কি সময় মত ছালাত আদায় করো না? বলে কি তোমার স্ত্রীকে ইউরোপীয়/পশ্চিমাদের মত বেপর্দা করে বের করতে?- এসব তো বলে না। অথচ এখন পুরো জাতি- অল্প কয়েকজন ছাড়া- শরী‘আতের বাইরে চলছে। আপনি কী বলছেন? আপনি স্বপ্নের জগতে বাস করছেন! আপনারা বিজয় চানÑ কিন্তু বিজয় শর্তসাপেক্ষ: ‘যদি তোমরা আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন’। সুতরাং যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য না করো, আল্লাহও তোমাদের সাহায্য করবেন না- এটাই বাস্তবতা। কিন্তু আপনারা এমন এক জাতি, যারা সত্যকে উপেক্ষা করে। আপনি এখন বলছেন যে- জাতি তাদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত- এসব ফাঁকা কথা! কোন জাতি? আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি- জাতির অধিকাংশ কি সৎ, না-কি অসৎ? যাদের আপনি প্রশংসা করছেন- তারা সৎ, না-কি অসৎ?
প্রশ্নকারী : আছে, কিছু অসৎও আছে।
শাইখ : ‘আছে’- এটি কি উত্তর? আমি তো স্পষ্ট প্রশ্ন করেছি- সৎ, না-কি অসৎ? ‘আছে’- এই শব্দ আমি বুঝি না। আমি নির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছি- আপনি, সে, আর অন্যরা- আপনাদের কারোর কাছেই কোন স্পষ্ট উত্তর নেই! কারণ আপনারা নববী প্রেসক্রিপশন (নবীর দেখানো চিকিৎসা) দিয়ে নিজেদের সংশোধন করতে চান না। তাই যেখানে আছেন, সেখানেই থেকে যান!
প্রশ্নকারী : অনুগ্রহ করে আমাদের কিছু ধাপ বলে দিন।
শাইখ : আহ! এতক্ষণে একটি ভালো প্রশ্ন করেছেনÑ এখন আমি পথটা বুঝেছি। আপনাদের জন্য যা যরূরী তা হল, সর্বপ্রথম আপনারা দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করবেন এবং সেই অনুযায়ী আমল করবেন। দেখুন, উত্তরে আমি আপনার সাথে একটু ভুল করেছিলাম- শিখুন এবং আমল করুন।
প্রশ্নকারী : এত অনেক লম্বা প্রসেস মনে হচ্ছে- এর চেয়ে বেশি আর কী বলব!
শাইখ : তাহলে সংক্ষিপ্ত পথ কী? আমাদের কাছে তো দীর্ঘ পথ ছাড়া আর কিছুই নেই। দেখাও তো সেই সংক্ষিপ্ত পথ!
প্রশ্নকারী : না, আমি আপনাকে দেখাতে চাই- ইয়াহুদীরা কীভাবে বাস্তবায়ন করে।
শাইখ : প্রিয় ভাই, আমি তো বলেছি- তারা এখানে পৌঁছেছে কারণ তারা দিন-রাত পরিশ্রম করেছে। এখন আমরা কী করতে চাই? কোথা থেকে শুরু করব? আল্লাহ আপনাদের হিদায়াত দিন- আমরা কি অজ্ঞতা থেকে শুরু করব, না-কি জ্ঞান থেকে? এখন আপনি বলবেন- জ্ঞান থেকে।
প্রশ্নকারী : অবশ্যই জ্ঞান থেকে।
শাইখ : কুফর থেকে, না-কি ঈমান থেকে? এখন আপনি বলবেন- ঈমান থেকে। আগেও তো বলেছেন! (হাসি)
প্রশ্নকারীরা : (হাসি)
শাইখ : হে লোকেরা! তাহলে চলুন- জ্ঞান ও ঈমান নিয়েই এগোই। আর ঈমান সবসময় আমলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘সময়ের শপথ, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; তবে তারা নয় যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে, সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে’ (সূরা আল-আছর)। আমি কি আপনাকে স্পষ্টভাবে বলব না? আমি, আপনি- আমরা তো আত্মীয়ের মত! এটি আমার দ্বীন, আমি আপনাদের উপদেশ দিচ্ছি, না আপনারা আমাকে উপদেশ দিচ্ছেন। পার্থক্যটা কি দেখছেন না? আমি আপনাদের উপদেশ দিচ্ছি, কিন্তু আপনারা আমার উপদেশ গ্রহণ করছেন না। আর আপনারা আমাকে এমন কোন উপদেশও দিচ্ছেন না যা আমি গ্রহণ করতে পারি। আপনারা বলছে- এই পথ দীর্ঘ। আর আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি- হ্যাঁ, এই পথ দীর্ঘ, আর এটাই ঈমান ও ইসলামের পথ। আর যদি এই পথ পসন্দ না হয়, তাহলে আমাদের সেই সংক্ষিপ্ত পথ দেখান! কিন্তু আপনারা দেখাচ্ছেন না, তাহলে আমরা আপনাদের সাথে কীভাবে চলব? সংক্ষিপ্ত পথ কী? হ্যাঁ, আমাদের পথ দীর্ঘ- ঠিক, ঠিক, ঠিক; লাখ বার ঠিক! কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত পথ কী, যা আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে- যে লক্ষ্যটি সবার কাছেই কাক্সিক্ষত ও স্বীকৃত? সেই সংক্ষিপ্ত পথ কী ঈমান ছাড়া? তুমি বলবে- না। জ্ঞান ছাড়া? তুমি বলবে- না। তাহলে?
প্রশ্নকারী : ঈমান ও জ্ঞান ছাড়া কীভাবে সম্ভব?
শাইখ : আমি তো আপনাকেই জিজ্ঞেস করছি! আপনি বলছেন- না, না। তাহলে এই দীর্ঘ পথের জন্য যখন ঈমান ও আমল দরকার, সংক্ষিপ্ত পথের জন্য কী দরকার?
প্রশ্নকারী : নিশ্চয় ঈমান ও আমল।
শাইখ : এটাই তো! চলুন হে লোকেরা, উঠে পড়ুন- আমাদের শামে (সিরিয়ায়) একটা প্রবাদ আছে: ‘তার হাত ধরা পড়ে গেছে!’ (অর্থাৎ যুক্তিতে ধরা পড়েছে)...’।[৫]
সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনা থেকে পরিস্ফুটিত হয় যে, (১) সঠিক তাওহীদ, ঈমান ও আল্লাহর হাকিমিয়্যাত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে ইসলামী শাসনের মূল ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়। (২) রাসূল (ﷺ) কীভাবে দাওয়াহ, তারবিয়্যাহ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধাপগুলো অতিক্রম করেছেন- তা না জানলে মানুষ আবেগপ্রবণ বা বিচ্ছিন্ন পথ গ্রহণ করে। যেমন, সীরাতে নববীর মধ্যে নববী দাওয়াহর ধাপগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছেÑ মাক্কী পর্যায়ে আক্বীদা গঠন, তারপর মাদানী পর্যায়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। (৩) সালাফে ছালিহীনের মানহাজ না জানলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) এবং শাইখ মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বারবার আক্বীদা ও ছহীহ সুন্নাহর ভিত্তিতে সংস্কারের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। (৪) অনেক সময় রাজনৈতিক আবেগ জ্ঞানের স্থানে বসে যায়। কিন্তু শরী‘আত প্রতিষ্ঠা একটি ইবাদত- এটি কেবল আবেগ নয়, বরং গভীর চিন্তা ও হিকমাহর বিষয়।
অতএব উত্তরণের জন্য প্রয়োজন- ছহীহ আক্বীদা শিক্ষা, ক্বুরআন-সুন্নাহর গভীর অধ্যয়ন, সালাফদের মানহাজ অনুসরণ, ধৈর্য ও হিকমাহর সাথে সমাজ সংস্কার, ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে’ (সূরা আর-রা‘দ : ১১)।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* মুর্শিদাবাদ, ভারত।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ মুসলিম হা/১০১৭; নাসাঈ, হা/২৫৫৪; ইবনু মাজাহ, হা/২০৩।
[২]. আবূ দাঊদ, হা/৪২৯৭।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০১১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮৬; ছহীহুল জামি‘, হা/৫৮৪৯।
[৪]. রিহলাতুন নূর, ক্যাসেট- ৩১।
[৫]. সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান-নূর, ক্যাসেট-৫১৭, অডিও থেকে সংরক্ষিত।