বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে তরুণদের সতর্কীকরণ
- মুহাম্মাদ ইবনু নাছির আল-উরাইনি (রাহিমাহুল্লাহ)
- অনুবাদ : মাসঊদুর রহমান*
(৩য় কিস্তি)
কাফের সাব্যস্ত করার বিধান
‘তাকফির’ তথা কাফের সাব্যস্ত করা হল একটি শারঈ বিধান, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধানের উপর নির্ভর করে। হালাল, হারাম, ওয়াজিব বা আবশ্যক বিষয়গুলো যেমন আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের উপর নির্ভর করে, ঠিক তেমনি তাকফিরের বিষয়টিও তাই। কুফর হিসেবে সাব্যস্ত কথা ও কাজ দ্বীন-ধর্ম থেকে বহিষ্কারকারী বড় কুফর হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
যেহেতু কাউকে কাফের ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূলের উপর নির্ভর করে, তাই কাউকে কাফের ঘোষণা করা ঠিক নয়, তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া, যার কুফরি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা স্পষ্ট।
সুতরাং গুরুত্বপূর্ণ এই বিধানের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সন্দেহ ও অনুমান যথেষ্ট নয়। কেননা সন্দেহের কারণে শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে যে ক্ষতিটা হয়, তা কাফের সাব্যস্ত করার মাধ্যমে হওয়া ক্ষতি হতে কম। সুতরাং কারো কাফের হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে তা সাব্যস্ত করা হতে পরিহার করাই উত্তম। এজন্য যে ব্যক্তি কাফের নয়, তার ব্যাপারে কাফের হুকুম লাগানোর ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সতর্ক করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,أَيُّمَا امْرِئٍ قَالَ لأَخِيهِ يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا إِنْ كَانَ كَمَا قَالَ وَإِلاَّ رَجَعَتْ عَلَيْهِ ‘কেউ তার ভাইকে কাফির বলে সম্বোধন করলে উভয়ের একজনের উপর তা ফিরে আসবে। যাকে কাফির বলা হয়েছে, সে কাফির হলো তো হলোই, নতুবা কথাটি বক্তার উপরই ফিরে আসবে’।[১]
কুরআন মাজিদ ও হাদীছে এমন কিছু দলীল রয়েছে, যার দ্বারা কতিপয় কথা, কাজ ও বিশ্বাস কুফরি হিসেবে সাব্যস্ত হয়। আবার দেখা যায়, উক্ত ব্যক্তির মধ্যে এমন কিছু গুনাবলী রয়েছে, যা তার কুফরি হওয়া থেকে বাধা প্রদান করে।
এই বিধানটি শরী‘আতের অন্যান্য বিধানের মতোই, যা তার কারণ, শর্তসমূহ এবং তার বাধাকে দূরীভূত না করা পর্যন্ত পরিপূর্ণতা লাভ করে না। যেমন- ওয়ারিশ হওয়ার কারণ হলো আত্মীয়তা। অথচ ওয়ারিশ আত্মীয় হওয়ার পরও বাধা থাকার কারণে সম্পদ পাবে না। আর বাধাটা হলো দ্বীনের ভিন্নতা।
কখনো বা একজন মুসলিম রাগে, আনন্দে বা ভুলবশত এমন কোনো কথা বলে, যা কুফরের মতো মনে হয়, কিন্তু আসলে সে কাফের হয়ে যায় না, কেননা সে কাফের হবে, এই উদ্দেশ্যে উক্ত কথা বলেনি। যেমন হাদীছে এসেছে, এক ব্যক্তি আনন্দে বলেছিল, اللهم أنت عبدي وأنا ربك ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার দাস, আমি তোমার রব’।[২] আসলে সে অতি আনন্দের কারণে ভুল করে এভাবে বলেছিল। বিধায় তাড়াহুড়ো করে কাফের সাব্যস্ত করা খুবই বিপজ্জনক। কেননা এর সাথে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িয়ে আছে। যেমন, তার রক্ত, ধনসম্পদ হালাল হওয়া, ওয়ারিশ থেকে বঞ্চিত, বিবাহ বাতিল হওয়া ছাড়াও অনেক কিছু বিষয়। সুতরাং কীভাবে একজন মুমিনের ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহের ভিত্তিতে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে? বিশেষ করে যদি কোন শাসকের (উলুল-আমর) ব্যাপারে কাফের ট্যাগ লাগানো হয়, তাহলে এটা আরো বেশি সমস্যা, কেননা এর প্রভাবে বড় বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ ও রক্তপাত ঘটে এবং দেশ ও জনগণের মধ্যে ফেতনা ও অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে নবী (ﷺ) কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন,الا أن تروا كفراً بواحاً عندكم فيه من الله برهان ‘কিন্তু যদি স্পষ্ট কুফরী দেখ, তোমাদের কাছে আল্লাহর তরফ থেকে যে বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান, তাহলে আলাদা কথা’।[৩]
এখানে ‘إلا أن تروا’ বলে সরাসরি দেখার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। শুনা বা গুজবে কান দেওয়া নয়। সুতরাং শুধু ধারণা বা গুজব যথেষ্ট হবে না। ‘بواحاً’ এমনিভাবে দ্বারা কুফরি টা স্পষ্ট হতে হবে। সুতরাং যে কুফরিটা স্পষ্ট নয়, তা কুফুরি বলে সাব্যস্ত করা যথেষ্ট হবে না। ‘عندكم فيه من الله برهان’ ঠিক একইভাবে এর ব্যাখ্যা হলো কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য দলীল থাকতে হবে। বিধায় কোন দুর্বল, সন্দেহজনক দলীল দ্বারা কাউকে কাফের সাব্যস্ত করা যাবে না। ‘ من الله’ দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, কোন আলেমের কথা এখানে ধর্তব্য নয়, যদি তার বক্তব্যের পক্ষে কুরআন ও হাদীছ থেকে স্পষ্ট দলীল না থাকে। হতে পারে তিনি জ্ঞান ও আমানতদারিতার দিক থেকে অনেক উচ্চ মর্যাদার অধিকারী।
একজন আলেম, জ্ঞান এবং বিশ্বাসযোগ্যতার দিক থেকে যতই বেশি হোক না কেন, আল্লাহর কিতাব বা তাঁর রাসূলের সুন্নাহ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ না থাকলে তার কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত। এই শর্তসমূহ বা নিয়মাবলী বিষয়টির গুরুত্ব নির্দেশ করে (৩/৪/১৪১৯ হিজরী তারিখে ৯২তম অধিবেশনে তাকফিরের ঘটনা সম্পর্কে সিনিয়র আলেমদের কাউন্সিলের বিবৃতি)।
শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সংক্ষিপ্ত কথা হলো, যখন কেউ কাউকে উপদেশ দেয়, তখন তার উচিত, প্রমাণসহকারে উপদেশ দেওয়া এবং প্রমাণ ছাড়া কথা না বলা।
পাশাপাশি নিজস্ব ফাহাম বা বোধগম্যতা ও বিবেক বুদ্ধির ভিত্তিতে কোন ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়ার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা। কাউকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করা বা কাউকে ইসলামে অন্তর্ভুক্ত করা দ্বীনের সবচেয়ে বড় বিষয়গুলোর মধ্যে একটি। অন্যান্য বিষয়ের মত আমরা এই বিষয়টি ও ব্যাখ্যা করার যথেষ্ট চেষ্টা করেছি।[৪]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কুফর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর হক্ব। যা দলীল দ্বারা সাব্যস্ত। সুতরাং এটা কারো কথা দ্বারা সাব্যস্ত হয় না। যে ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) কাফের সাব্যস্ত করে, সে উভয় দিক থেকে কাফের হয়ে যায়।
কোন একজন ইমাম বলেন, এক হাজার কাফের কে জীবিত রেখে দেওয়া যতটা ভুল, তার চাইতে বড় ভুল হলো একজন মুসলিমের রক্তপাত ঘটানো বা তাকে হত্যা করা।
অপর এক ইমাম বলেছেন, এক হাজার কাফেরকে জীবিত রেখে দেওয়ার ভুল একজন মুসলিমের রক্তপাতের ভুলের চেয়েও খারাপ।
৪. ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা
ওয়াদা পূরণ করা ইসলামের উৎকৃষ্ট নীতি, যে ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা আদেশ ও উৎসাহ প্রদান করেছেন এবং প্রশংসা করেছেন। বিশ্বাসঘাতকতা এবং প্রতারণা হল নিন্দনীয় নীতি, যা ইসলামী আইনে নিষিদ্ধ এবং মানব প্রকৃতিতেও ঘৃণ্য। বিশ্বাসঘাতকতার সবচেয়ে বড় ধাপ বা স্তরগুলির মধ্যে একটি হল মানুষকে হত্যা করা যা মহান আল্লাহ হারাম করেছেন। তবে শরী‘আত অনুমোদিত কারণ ব্যতীত। মহান আল্লাহ চার শ্রেণীর মানুষকে হত্যা করা হারাম করেছেন। ১. মুসলিম ২২. জিম্মি অমুসলিম বা কাফের, যে জিজিয়া বা কর দিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস করে। ৩. এমন কাফের, যার সাথে চুক্তি রয়েছে। ৪. এমন কাফের, যাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে।
মুসলিমদের ক্ষেত্রে, এটা স্পষ্ট। যে ব্যক্তি আমাদের নিকট তার ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারটি প্রকাশ করে, তাকে হত্যা করা হারাম।
এমনকি যদি সে এমন অবাধ্যমূলক কাজ করে, যা কুরআন হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। বরং তার উক্ত কাজের মাধ্যমে সে হত্যার যোগ্য, তবুও তাকে হত্যা করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,مَن قَتَلَ مُعاهَدًا لَمْ يَرِحْ رائِحَةَ الجَنَّةِ، وإنَّ رِيحَها تُوجَدُ مِن مَسِيرَةِ أرْبَعِينَ عامًا ‘যে ব্যক্তি কোন জিম্মীকে কতল করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না। যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব হতে পাওয়া যাবে’।[৫] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, لايَزَالَ الْمُؤْمِنُ فِي فُسْحَةٍ مِنْ دِينِهِ مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًا ‘মুমিন তার দ্বীনের ব্যাপারে পূর্ণ স্বস্তিতে থাকে, যে পর্যন্ত না সে হারাম পন্থায় রক্তপাত ঘটায়’।[৬] ইবনু উমর য বলেন,
إِنَّ مِنْ وَرَطَاتِ الْأُمُورِ الَّتِي لاَ مَخْرَجَ لِمَنْ أَوْقَعَ نَفْسَهُ فِيهَا سَفْكَ الدَّمِ الْحَرَامِ بِغَيْرِ حِلِّهِ
‘যেসব বিষয়ে কেউ নিজেকে জড়িয়ে ফেলার পরে তার ধ্বংস থেকে নিজেকে রক্ষা করার কোনো উপায় পায় না, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হালাল ছাড়া হারাম রক্ত প্রবাহিত করা (অর্থাৎ অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করা)’।[৭]
চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তির রক্ত হারাম এবং তার রক্তপাত ঘটানো কবিরা গুনাহ। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তাকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের সুঘ্রাণ ও পাবে না’। নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে এমন ব্যক্তির ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, وَ اِنۡ اَحَدٌ مِّنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ اسۡتَجَارَکَ فَاَجِرۡہُ حَتّٰی یَسۡمَعَ کَلٰمَ اللّٰہِ ثُمَّ اَبۡلِغۡہُ مَاۡمَنَہٗ ؕ ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ قَوۡمٌ لَّا یَعۡلَمُوۡنَ ‘মুশরিকদের মধ্য হতে যদি কেহ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাহলে তুমি তাকে আশ্রয় দান কর, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়; অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও’ (সূরা আত-তাওবা : ৬ )। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
ذِمَّةُ الْمُسْلِمِينَ وَاحِدَةٌ يَسْعَى بِهَا أَدْنَاهُمْ فَمَنْ أَخْفَرَ مُسْلِمًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لاَ يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُ صَرْفًا وَلاَ عَدْلاً
‘এখানকার সকল মুসলিমের নিরাপত্তা একই স্তরের। একজন নিম্ন স্তরের লোকও (অন্যকে) নিরাপত্তা দিতে পারবে। যদি কেউ অন্য মুসলিমের প্রদত্ত নিরাপত্তাকে লঙ্ঘন করে, তাহলে তার উপর আল্লাহর, ফেরেশতা মন্ডলীর ও সকল মানুষের লা‘নাত। আল্লাহ তাঁর ফরজ ও নফল কোন ইবাদাতই গ্রহণ করবেন না’।[৮] অপর বর্ণনায় এসেছে, উম্মে হানি (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,
ذَهَبْتُ إِلَى رَسُوْلِ اللهِ ﷺ عَامَ الْفَتْحِ فَوَجَدْتُهُ يَغْتَسِلُ وَفَاطِمَةُ ابْنَتُهُ تَسْتُرُهُ فَسَلَّمْتُ عَلَيْهِ فَقَالَ مَنْ هَذِهِ فَقُلْتُ أَنَا أُمُّ هَانِئٍ بِنْتُ أَبِيْ طَالِبٍ فَقَا لَ مَرْحَبًا بِأُمِّ هَانِئٍ فَلَمَّا فَرَغَ مِنْ غُسْلِهِ قَامَ فَصَلَّى ثَمَانِيَ رَكَعَاتٍ مُلْتَحِفًا فِيْ ثَوْبٍ وَاحِدٍ فَقُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ ﷺ زَعَمَ ابْنُ أُمِّيْ عَلِيٌّ أَنَّهُ قَاتِلٌ رَجُلًا قَدْ أَجَرْتُهُ فُلَانُ بْنُ هُبَيْرَةَ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ قَدْ أَجَرْنَا مَنْ أَجَرْتِ يَا أُمَّ هَانِئٍ
‘মক্কা বিজয়ের বছর আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট গেলাম। তখন তাঁকে এমন অবস্থায় পেলাম যে, তিনি গোসল করছিলেন এবং তাঁর মেয়ে ফাতিমাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তাঁকে পর্দা করছিলেন। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন কে? আমি বললাম, আমি উম্মু হানী বিনতে আবূ তালিব। তখন তিনি বললেন, মারহাবা হে উম্মু হানী! যখন তিনি গোসল হতে ফারেগ হলেন, একখানি কাপড়ে শরীর ঢেকে দাঁড়িয়ে আট রাক‘আত ছালাত আদায় করলেন। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমার সহোদর ভাই আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হুবাইরার অমুক পুত্রকে হত্যা করার সংকল্প করেছে, আর আমি তাকে আশ্রয় দিয়েছি। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, হে উম্মু হানী! তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছো, আমিও তাকে আশ্রয় দিয়েছি’।[৯]
নবী (ﷺ) মহিলার নিরাপত্তাকে বৈধতা দিয়েছেন। সুতরাং আমাদের মধ্যে থাকা যে সকল কাফেরদের নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে, তাকে রক্তপাত করা নিষিদ্ধ তথা তার রক্ত হারাম। ১৪১৭ হিজরির সফর মাসের দশ তারিখ বুধবার রাতে আল-খোবারে(সঊদী আরবের দাম্মাম শহরের নিকটবর্তী একটি বহুতল ভবন কমপ্লেক্সে) বোমা হামলার ঘটনাটি আমরা এভাবেই জানি যে, সেখানে এমন লোক বাস করত, যাদের রক্ত ও সম্পত্তি সুরক্ষিত ছিল। উক্ত হামলার ফলে ১৮ জনেরও বেশি মানুষ মারা যায় এবং ৩৮৬ জন আহত হয়, যার মধ্যে মুসলিম, শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ এবং যুবকরাও ছিলেন। ফলস্বরূপ প্রচুর অর্থ ও বাসস্থানের ক্ষতি হয়। কোন সন্দেহ নেই যে, এই কাজটি ইসলামী শরী‘আত তথা বিধান, বিবেক বা সাধারণ জ্ঞান কোনটিই স্বীকৃতি দেয় না।
ইসলামী বিধান : আপনি কুরআনের আয়াত ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদীছ অবশ্যই শুনেছেন, যা দ্বারা মুসলমানের রক্ত ও সম্পত্তি হারাম সাব্যস্ত হয়। এমনকি যে সকল কাফেরদের সাথে চুক্তি বা তাদেরকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে, এই ব্যক্তিদের সম্মান করা ইসলাম ধর্মের সৌন্দর্যগুলোর মধ্যে একটি। তাদেরকে দেওয়া চুক্তির উপর ভিত্তি করে এই ব্যক্তিদের সম্মান করার জন্য তাদেরকে ভালোবাসা, আনুগত্য বা সমর্থন কোনটিই প্রয়োজন হয় না। তবে ওয়াদা বা চুক্তি পূরণ করা আবশ্যক। কেননা এই মর্মে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
বিবেক বা যুক্তি : একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনও কোন হারাম কাজে জড়িত হবে না, কারণ তিনি এর খারাপ পরিণতি ও পরিণাম সম্পর্কে জানেন এবং তিনি কোন বৈধ কাজেও জড়িত হবে না, যতক্ষণ না তিনি এর প্রতিদান স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন। যেহেতু নবী (ﷺ) একজন মানুষের ভালো কথা বলা বা চুপ থাকাকে ঈমানের শর্ত বা পূর্ণতা হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। সেহেতু কোনো মানুষের ভালো কাজ করা বা অন্যায় থেকে বিরত থাকাটাও ঈমানের শর্ত বা পূর্ণতাকে নির্দেশ করে (শায়েখ উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ১২/২/১৪১৭ হিজরীর জুমু‘আর খুত্ববা থেকে)।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৯।
[২]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৪৭।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৭০৫৬।
[৪]. আদ-দুরারুস সুন্নিয়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ২১৭।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৩১৬৬।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৬২।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৬৩।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩০০।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৩১৭১।