দাওয়াহ ও জ্ঞানচর্চার আসরে একজন ত্বলিবুল ইলমের আদব সম্পর্কিত গ্রন্থসমূহ পাঠদানের অপরিহার্যতা
- সংকলন ও অনুবাদ : আব্দুল হাকীম মাদানী*
আমরা আমাদের সম্মানিত দাঈগণকে জোর দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছি যে, আবশ্যকীয়ভাবে একজন ত্বলিবুল ইলমের আদব বিষয়ক গ্রন্থসমূহ নিয়ে পাঠচক্র ও প্র্যাকটিক্যাল কোর্স আয়োজন করা হোক। যেসব গ্রন্থে ছাত্রের আদব, শিক্ষকের আদব, মাজলিসের আদব, দারস-তাদরীসের আদব এবং মতভেদের আদব আলোচনা করা হয়েছে। তা আমাদের দাওয়াতী ও জ্ঞানচর্চার বাস্তব প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে যরূরী হয়ে উঠেছে। বিশেষত আমাদের এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মাঝে।
ত্বলিবুল ইলমের আদব সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহের গুরুত্বের কারণে আলেমরা প্রথম যুগ থেকেই আজ পর্যন্ত এর ওপর নিরন্তর রচনা করে আসছেন। প্রথম দিককার যেসব ইমাম এ বিষয়ে রচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-
ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ২০৪ হি.) তিনি তাঁর জিমাঊল ইলম (جماع العلم) গ্রন্থে এ প্রসঙ্গ আলোচনা করেছেন। যুহাইর ইবনু হারব (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ২২৩ হি.) তাঁর কিতাবুল ইলম (كتاب العلم), আবু আব্দুল্লাহ আল-মুহাসিবী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ২৪৩ হি.) কিতাবুল ইলম, ইমাম আল-আজুরী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৩৬০ হি.) আখলাকুল উলামা (أخلاق العلماء), আখলাকু হামালাতিল কুরআন (أخلاق حملة القرآن) এবং আশ-শারীআহ (الشريعة)- গ্রন্থে এসব বিষয় উল্লিখিত হয়েছে।
ইমাম খতীব আল-বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৪৬৩ হি.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-‘জামিঊল আখলাকির রাবী (الجامع الأخلاق الراوي), একইসাথে আর-রিহলাহ ফি তলাবিল ইলমি (الرحلة في طلب العلم) এবং তাক্বয়ীদুল ইলম (تقييد العلم)-গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন।
আন্দালুসের হাফেয ইবনু আব্দিল বার (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৪৬৩ হি.) ‘জামিঊ বায়ানিল ‘ইলমি ও ফাযলিহি (جامع بيان العلم وفضله) এবং আদাবুল মুজালাসাহ (آداب المجالسة) গ্রন্থে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
অনুরূপভাবে ইমাম সাম‘আনী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৪৮৯ হি.), আদাবুল ইমলাই ওয়াল ইস্তিমলাই (آداب الإملاء والاستملاء), ইমাম যারনূজী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৫৯৩ হি.) তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ তা‘লীমুল মুতা‘আল্লিম ওয়া তারীকুত তা‘আল্লুক (تعليم المتعلم وطريق التعلم), ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৬৭৬ হি.) রচিত আত-তিবইয়ান ফি আদাবি হামালাতিল কুরআন (التبيان في آداب حملة القرآن), হাফেয ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৭৪৮ হি.) রচিত যাগলুল ইলম (زغل العلم), শায়খ বদরুদ্দীন ইবনু জামা‘আহ (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৭৩৩ হি.) রচিত তাজকিরাতুস সামি‘ ওয়াল মুতাকাল্লিম ফি আদাবিল আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (تذكرة السامع المتكلم في آداب العالم والمتعلم), ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ১২৫০ হি.) আদাবুত তলাব (أدب الطلب), পশ্চিম আফ্রিকার মহান আলেম ওসমান ইবনু ফূদী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ১২৩৩ হি.) এবং তাঁর ভাই আব্দুল্লাহ ইবনু ফূদী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ১২৪৪ হি.)- তারা তাঁদের বিভিন্ন গ্রন্থে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় আলোচনা করেছেন।
পরবর্তীতে সমসাময়িক যুগে আমর আব্দুল মুনঈম সালীম, শায়খ বকর আবূ যায়দ, সালীম ইবনু ঈদ আল-হিলালী, শায়খ আব্দুল আযীয ইবনু কাসিম, শায়খ সুলাইমান, শায়খ শরীফ ইবনু সালিহ আল-হুসাইনী, অধ্যাপক মুহাম্মাদ আস-সানী ওমর, শাইখ আব্দুর রহমান বাগাওর (রাহিমাহুমুল্লাহ)- তারা সবাই এ বিষয়ে রচনা গুরুত্বপূর্ণ করেছেন।
এছাড়া শায়খ ছালিহ ইবনু আব্দুল্লাহ আল-উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর শিক্ষা কার্যক্রমে এ বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন।
অন্যান্য আলেমরাও তাঁদের গ্রন্থসমূহে এ বিষয়ের বিভিন্ন দিক আলোচনা করেছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ইমাম শাতেবী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর আল-মুআফাকাত (الموافقات) গ্রন্থে শিক্ষার্থীকে শিক্ষা ও তারবিয়াহর প্রয়োজনীয়তার উপর অমূল্য আলোচনা করেছেন।
এতসব মহান আলেমদের প্রচেষ্টা যদি কোনো কিছুর সাক্ষ্য দেয় ও প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব দেয়, তবে সেটি হলো- এই ইলমের গুরুত্ব জেনে নেওয়া আবশ্যক, ইলমের গভীরে প্রবেশ করার আগে এবং এ ময়দানে অগ্রগতি সাধনের পূর্বশর্ত হিসেবে। আমাদের সালাফে ছলেহীন ইলম অর্জনের আগে আদব শিখতে ও শেখাতে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং তাঁদের ছাত্রদেরও এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিতেন। এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় তাঁদের বহু উক্তি থেকে। যেমন-
হাসান আল-বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,إن الرجل ليخرج في آداب نفسه الستين ثم الستين ‘নিশ্চয়ই মানুষ তার নিজের আদব শিক্ষা করার জন্য ষাটবার যাত্রা করত’।[১]
ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,كان الرجل إذا أراد أن يكتب الحديث تأدّب وتعبّد قبل ذلك بعشرين سنة ‘মানুষ যখন হাদীছ লিখতে চাইত, সে তার আগে বিশ বছর আদব ও ইবাদতে ব্যয় করত’।[২]
প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ মাখলাদ ইবনুল হুসাইন (রাহিমাহুল্লাহ) আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ)-কে বলেছিলেন,نحن إلى كثير من الأدب أحوج منا إلى كثير من الحديث ‘আমরা বহু হাদীছের ইলম শেখার চেয়ে বহু আদবের ইলম শেখা বেশি প্রয়োজনীয়’।[৩]
ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মা তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, اذهب إلى ربيعة وتلعم من أدبه قبل علمه ‘রাবী‘আহর কাছে যাও এবং তার থেকে প্রথমে আদব শিখো, তারপর জ্ঞান’।[৪]
ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ) নিজেও এক কুরাইশী যুবককে বলেছিলেন, تعلم الأدب قبل أن تتعلم العلم ‘জ্ঞান শেখার আগে আদব শিখো’।[৫]
ইবরাহীম ইবনু হাবীব ইবনুশ শহীদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমার বাবা আমাকে বললেন, হে ছেলে! ফক্বীহ ও আলেমদের কাছে যাও, তাঁদের থেকে শিক্ষা নাও, তাঁদের আদব-আখলাক্ব ও জীবনযাপন থেকে গ্রহণ করো। এটা আমার কাছে বহু হাদীছ শেখার চেয়ে প্রিয়’।[৬]
কেউ তার ছেলেকে বলেছিলেন, يا بني لأن تتعلم بابا من الأدب أحب إلي من أن تتعلم سبعين بابا من أبواب العلم ‘হে ছেলে! তুমি যদি আদবের একটি অধ্যায় শিখতে পারো, তা আমার কাছে সত্তরটি ইলমের অধ্যায় শিখার চেয়েও বেশি প্রিয়’।[৭]
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদের (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর নিকট ছাহাবায়ে কেরাম যেতেন, তাঁর চেহারা, আচার-আচরণ ও চলাফেরা দেখতেন এবং তাঁর অনুসরণ করতেন।[৮]
হাফেয ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মজলিসে পাঁচ হাজার মানুষ উপস্থিত থাকত, এর মধ্যে পাঁচশ লিখত এবং বাকিরা তাঁর আচার-আচরণ ও আদব গ্রহণ করত’।[৯]
উপরিউক্ত গ্রন্থসমূহ ও সালাফের উক্তিগুলোর আলোকে- আমাদের বর্তমান দাওয়াতী ও প্রাক্টিক্যাল বাস্তবতায় বিশেষতঃ আমাদের পদ্ধতিতে এক গুরুতর ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর মূল কারণ হলো, আমরা ভিত্তি স্থাপনের আগে ছাদ নির্মাণ করছি। ফলে দাওয়াতী ও বাস্তবিক পরিমণ্ডলে সংকট, হঠকারী ফাতাওয়া, জ্ঞানের আসনে বসার হুড়োহুড়ি, মিথ্যা উপাধি গ্রহণ, দাওয়াতের মহান দাঈ ও আলেমদের অবমাননা ও তাঁদের কৃতিত্বে আঘাত হানা ইত্যাদি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। কেননা, যদি আমরা এ গ্রন্থসমূহ এবং সালাফের জীবনধারা গভীরভাবে বিবেচনা করতাম, তবে সেগুলো আমাদের শেখাতো।
ইলমের সাথে আদব, ইলমের মর্যাদা, এর শর্ত ও দায়িত্ব, আলেমদের সাথে আদব, তাঁদের মর্যাদা জানা, তাঁদের ভুল-ত্রুটি ও মতভেদকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হয়, বাস্তবিক ইলমী মজলিসের আদব, কিভাবে জ্ঞান অর্জন শুরু করতে হয়, কার কাছ থেকে করতে হয়, কোন গ্রন্থ থেকে শুরু করতে হয়, কখন ইলম প্রচার করতে হয়, দাওয়াত দিতে হয়, মানুষকে কী শেখাতে হয় ইত্যাদি এসব কিছু। সুতরাং যে পথ ভুল নিল, সে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। সেটা কম হোক বা বেশি।
পরিশেষে বলব, আদব হলো ইলমের অলংকার, আর ইলম হলো উম্মাহর জীবনের প্রাণ। ইলমকে আদব ছাড়া গ্রহণ করলে তা উপকারের বদলে অপকারও বয়ে আনতে পারে। তাই আমাদের পূর্বসূরী সালাফে ছলেহীন ইলমের আগে আদব শিখাতেন এবং শিখতেন। বর্তমান দাওয়াতী ও প্রাক্টিক্যাল বাস্তবতায় আমরা যদি এ মৌলিক ভিত্তিকে উপেক্ষা করি তবে সংকট, বিভাজন ও অবক্ষয় কখনোই কাটবে না। অতএব, এখনই সময় আমাদের মসজিদ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, দাওয়াতী আসর ও বাস্তবিক পরিমণ্ডলে আদাবুল ইলম বিষয়ক গ্রন্থসমূহ পুনরুজ্জীবিত করা, সেগুলোর আলোকে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলা এবং সালাফে ছলেহীনের সেই সুন্নাহকে ফিরিয়ে আনা। কেননা, যারা ইলমের পথে আদবের আলো জ্বালাতে পারে, তারাই প্রকৃতপক্ষে ইলমের বরকত ও দাওয়াতের সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সেই তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!!
* অনার্স, হাদীছ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
তথ্যসূত্র :
[১]. তাফসীর ইবনে কাসীর, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২০৫।
[২]. হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৩৬১।
[৩]. মাদারিজুস সালিকীন, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৫৬।
[৪]. তারতীবুল মাদারিক, ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৯।
[৫]. হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৩৩০।
[৬]. আল-জামিউল আখলাকির রাবী, পৃ. ১৭৯।
[৭]. তাযকিরাতুস সামি ওয়াল মুতাকাল্লিম, পৃ. ৩-৬।
[৮]. ইবনু সাল্লাম, গরীবুল হাদীছ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৮৩।
[৯]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১১তম খণ্ড, পৃ. ৩১৬।
প্রসঙ্গসমূহ »:
দাওয়াত