আল্লাহর পথে দাওয়াত : গুরুত্ব ও ফযীলত
-আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ*
ভূমিকা
আল্লাহর যমীনে তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য দাওয়াতের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা, দাওয়াত ছাড়া দ্বীন প্রতিষ্ঠার চিন্তাও করা যায় না। সমাজ সংস্কার, মানুষের আক্বীদা ও আমলের সংশোধন এসবের মূল চাবিকাঠি হলো দাওয়াত। অনুরূপভাবে সমাজে কল্যাণ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় দাওয়াতের কোনও বিকল্প নেই। আজকের এই নব্য জাহিলী সমাজে আল্লাহ বিমুখ মানুষকে আল্লাহমুখী এবং কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী সমাজকে ইসলামী সমাজে রূপদানের জন্য দ্বীনের বিশুদ্ধ দাওয়াতী কার্যক্রম এক অনন্য মিশন।
মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য আজ যেভাবে বাতিল মতাদর্শ ও চিন্তার প্রচারণা চলছে এমনি মুহূর্তে আপোষহীনভাবে দ্বীনের প্রকৃত দাওয়াত দেয়া সত্যিই চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। তাই এ প্রবন্ধে আমরা দাওয়াতের পরিচয়, গুরুত্ব, ফযীলত, ভিত্তি, মূলনীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করব, যা আমাদেরকে দ্বীনের এ মহান দায়িত্ব সম্পর্কে গভীর উপলব্ধিতে পৌঁছাতে সহায়তা করবে ইনশাআল্লাহ।
দাওয়াতের পরিচয়
‘দাওয়াত’ (دعوة) একটি আরবী শব্দ, বহুবচনে دعوات; যার অর্থ দাওয়াত, আহ্বান, ডাকা, আমন্ত্রণ, আবেদন, দাবী ইত্যাদি। এখানে দাওয়াত বলতে বুঝায় আল্লাহর দিকে আহ্বান। দাওয়াতের পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদানে মনীষীগণ ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
الدعوة إلى الله هي الدعوة إلى الإيمان به، وبما جاءت به رسله، بتصديقهم فيما أخبروا به، وطاعتهم فيما أمروا
‘আল্লাহর দিকে দাওয়াত হলো তাঁর প্রতি এবং তাঁর রাসূল যা নিয়ে এসেছেন, তার প্রতি ঈমান আনা এবং তিনি যেসব বিষয় খবর দিয়েছেন সেসব সত্য বলে স্বীকার করা, আর তাঁরা যেসব আদেশ দিয়েছেন তা মান্য করা’।[১] ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
الدعوة هي الدعاء إلى الله، أي الدعاء إلى الإيمان به وتوحيده والعمل بما شرعه لعباده
‘দাওয়াত হলো আল্লাহর দিকে ডাকা, অর্থাৎ তাঁর প্রতি ঈমান আনা, তাঁকে একক হিসেবে স্বীকার করা এবং তাঁর বান্দাদের জন্য যে বিধান দেয়া হয়েছে, তা অনুসারে আমল করার দিকে আহ্বান করা’।[২]
দাওয়াতের গুরুত্ব
দাওয়াত ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত এবং রাসূলগণের প্রধান দায়িত্ব। কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে দাওয়াতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।
১. দাওয়াতের মিশন নিয়েই নবী-রাসূলগণের আগমন
আদম (আলাইহিস সালাম) থেকে শুরু করে শেষনবী মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত সকল নবী-রাসূলের মূল দায়িত্বই ছিল মানুষের কাছে আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেওয়া। সকল নবী-রাসূল দাওয়াতের দায়িত্ব নিয়েই দুনিয়ার বুকে আগমন করেছিলেন এবং তারা তা সম্পাদনও করেছিলেন যথাযথভাবে। মহান আল্লাহ বলেন,
قُلۡ ہٰذِہٖ سَبِیۡلِیۡۤ اَدۡعُوۡۤا اِلَی اللّٰہِ ۟ؔ عَلٰی بَصِیۡرَۃٍ اَنَا وَ مَنِ اتَّبَعَنِیۡ ؕ وَ سُبۡحٰنَ اللّٰہِ وَ مَاۤ اَنَا مِنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ
‘(হে নবী!) আপনি বলুন, ‘এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই’ (সূরা ইউসুফ : ১০৮)। আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দাওয়াতের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা প্রদান করে বলেন, یٰۤاَیُّہَا الرَّسُوۡلُ بَلِّغۡ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ ؕ وَ اِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلۡ فَمَا بَلَّغۡتَ رِسَالَتَہٗ ‘হে রাসূল! আপনার প্রতিপালক থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা পৌঁছে দিন। যদি তা না করেন, তবে আপনি রিসালতের দায়িত্ব আদায় করলেন না’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৬৭)।
২. দাওয়াত শুধুই নবীদের কাজ নয়, বরং উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রত্যেকের দায়িত্ব
উম্মতে মুহাম্মাদীকে আল্লাহ তা‘আলা বিশ্বমানবতার জন্য শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মনোনীত করেছেন। শুধু জাতিগত পরিচয়ের কারণে নয়, বরং এই শর্তে যে, তারা সৎকাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর প্রতি অকুণ্ঠ ঈমান রাখবে। এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই উম্মাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় এবং বিশ্বমানবতার কাছে ইসলামের শান্তিময় দাওয়াত পৌঁছে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, کُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করবে’ (সূরা আলে ইমরান : ১১০)।
৩. জানার পরিধি কম হলেও দাওয়াত দেয়া আবশ্যক
দাওয়াত কেবল আলিম বা জ্ঞানী মানুষের দায়িত্ব নয়; বরং যে মুসলিম দ্বীনের যতটুকু জানে, তাই অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়া তার দায়িত্ব। জ্ঞান অল্প হলেও তা গোপন না রেখে সঠিকভাবে পৌঁছে দেয়া ফরয। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, بَلِّغُوْا عَنِّىْ وَلَوْ آيَةً، وَحَدِّثُوْا عَنْ بَنِىْ إِسْرَائِيْلَ وَلَا ئَرَجَ، وَمَنْ كَذَبَ عَلَىَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ ‘আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও। আর বানী ইসরাঈলের কাহিনী বর্ণনা কর, তাতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে ব্যক্তি আমার উপর স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে মিথ্যারোপ করে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে প্রস্তুত করে নেয়’।[৩]
৪. পথহারা মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য দাওয়াতের অপরিসীম গুরুত্ব
আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টিকালে মুক্ত ইচ্ছা দিয়েছেন, তাই অনেকেই ভুল পথে চলে যায়। দাওয়াতই সেই মাধ্যম, যা মানুষকে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। মহান আল্লাহ বলেন,
اُدۡعُ اِلٰی سَبِیۡلِ رَبِّکَ بِالۡحِکۡمَۃِ وَ الۡمَوۡعِظَۃِ الۡحَسَنَۃِ وَ جَادِلۡہُمۡ بِالَّتِیۡ ہِیَ اَحۡسَنُ ؕ اِنَّ رَبَّکَ ہُوَ اَعۡلَمُ بِمَنۡ ضَلَّ عَنۡ سَبِیۡلِہٖ وَ ہُوَ اَعۡلَمُ بِالۡمُہۡتَدِیۡنَ
‘তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান কর হিকমতের মাধ্যমে, উত্তম উপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে বিতর্ক কর এমন উপায়ে যা সবচেয়ে উত্তম। নিশ্চয়ই তোমার রব যাকে তার পথে ভ্রান্ত করেছেন, সে সম্পর্কে সর্বোত্তম জানেন, আর যে সঠিক পথে আছে, সে সম্পর্কেও সর্বোত্তম জানেন’ (সূরা আন-নাহল : ১২৫)।
৫. দাওয়াত হচ্ছে সমাজে কল্যাণ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম
দাওয়াত কেবল ব্যক্তিগত হেদায়াতের জন্য নয়, বরং সামাজিক কল্যাণ এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। মানুষকে সৎকর্মের দিকে আহ্বান করা সমাজে নৈতিকতা ও সদাচার বাড়ায়। অসৎকর্ম ও অন্যায় থেকে বিরত রাখা সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। মহান আল্লাহ বলেন, وَلۡتَکُنۡ مِّنۡکُمۡ اُمَّۃٌ یَّدۡعُوۡنَ اِلَی الۡخَیۡرِ وَ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল অবশ্যই থাকতে হবে, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দিবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে। তারাই হলো সফলকাম’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৪)।
দাওয়াতের ফযীলত
দাওয়াতের কাজ ইসলামে অত্যন্ত মহৎ ও বরকতময় ইবাদত। দ্বীন ইসলামে দাওয়াতের ফযীলত অপরিসীম। নিচে প্রধান কয়েকটি ফযীলত উল্লেখ করা হলো।
১. আল্লাহর পথে দাওয়াত হচ্ছে সর্বোত্তম কথা
একজন মুমিন যখন আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকেন, সে কেবল জ্ঞানের কাজই করছে না, বরং সর্বোচ্চ মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করছে। তাই আল্লাহ তা‘আলা তার দাওয়াতকে সর্বোত্তম কথাবার্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,
وَ مَنۡ اَحۡسَنُ قَوۡلًا مِّمَّنۡ دَعَاۤ اِلَی اللّٰہِ وَ عَمِلَ صَالِحًا وَّ قَالَ اِنَّنِیۡ مِنَ الۡمُسۡلِمِیۡنَ
‘কথার দিক দিয়ে কে উত্তম সেই ব্যক্তি ছাড়া, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, ‘আমি অবশ্যই মুসলিম’ (সূরা ফুসসিলাত : ৩৩)।
২. দাওয়াতী কাজ দুনিয়ার সম্পদের চেয়েও মহামূল্যবান
অল্প সময়ের দাওয়াতী কাজও দুনিয়ার সকল সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। কারণ, এটা আখিরাতের পুঁজি, যেখানে লাভ চিরস্থায়ী। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,لَغَدْوَةٌ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيْهَا ‘আল্লাহর পথে একটি সকাল অথবা একটি সন্ধ্যা ব্যয় করা দুনিয়া ও এর মধ্যে যা কিছু আছে, তার চেয়েও উত্তম’।[৪] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,فَوَاللهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا، خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ ‘আল্লাহ যদি তোমার মাধ্যমে একজন মানুষকেও হেদায়াত দান করেন, তবে তা তোমার জন্য লাল উট (অর্থাৎ আরবদের কাছে সবচেয়ে দামী সম্পদ) পাওয়ার চেয়েও উত্তম’।[৫] অর্থাৎ একজন মানুষের অন্তরকে সত্যের দিকে ফিরিয়ে আনা পুরো দুনিয়ার সম্পদের চেয়েও মহামূল্যবান।
৩. দাওয়াত প্রদানকারী সওয়াব পায় অনুসারীদের সমপরিমাণ
দাওয়াতের প্রভাব যদি স্থায়ী হয় এবং অন্যরা তা অনুসরণ করে, তাহলে প্রত্যেক অনুসারীর আমলের সওয়াব দাওয়াতকারীর আমলনামায় জমা হয়, তবুও কারো সওয়াব কমে না। এটি এক প্রকার জারিয়াহ সওয়াব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى، كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا ‘যে ব্যক্তি হেদায়াতের পথে আহ্বান করে, সে তার অনুসারীদের মতোই সওয়াব পাবে, আর তাদের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না’।[৬]
৪. নবীদের উত্তরসূরি
নবীরা কোন সম্পদ রেখে যাননি, বরং রেখে গেছেন ইলম ও দাওয়াতের আমানত। যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সে নবীদের কাজের অংশীদার হয়। এজন্য দাওয়াতকারীরা মানুষের জন্য রহমত, হেদায়াত ও কল্যাণের উৎস। মহান আল্লাহ বলেন,
یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ شَاہِدًا وَّ مُبَشِّرًا وَّ نَذِیۡرًا . وَّ دَاعِیًا اِلَی اللّٰہِ بِاِذۡنِہٖ وَ سِرَاجًا مُّنِیۡرًا
‘হে নবী! আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী, আল্লাহর অনুমতিতে তাঁর দিকে আহ্বানকারী এবং দীপ্তিমান প্রদীপ হিসেবে’ (সূরা আল-আহযাব : ৪৫, ৪৬)।
৫. উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যম
দাওয়াত সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদা লাভ করার মাধ্যম। অন্যত দাওয়াত ছাড়া শ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদা পাওয়া যাবে না। মুসলিম সমাজ যখন সৎকাজ প্রচার বন্ধ করে এবং অসৎকাজ থামাতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা আর শ্রেষ্ঠ থাকে না, বরং অপমানিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, کُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ ‘তোমরা মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম উম্মাহ। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখ এবং আল্লাহর উপর ঈমান রাখ’ (সূরা আলে ইমরান : ১১০)।
৬. দাওয়াত প্রদানকারীর জন্য ফেরেশতাদের দু‘আ
যারা মানুষকে হেদায়াত ও কল্যাণের দিকে আহ্বান করে, তাদের জন্য সমগ্র সৃষ্টি, বিশেষত নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা দু‘আ করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ وَأَهْلَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ حَتَّى النَّمْلَةَ فِىْ جُحْرِهَا وَحَتَّى الْحُوْتَ لَيُصَلُّوْنَ عَلَىْ مُعَلِّمِ النَّاسِ الْخَيْرِ
‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা, তাঁর ফেরেশতাগণ এবং আসমান ও যমীনের অধিবাসীরা, এমনকি পিপীলিকা তার গর্তে এবং মাছ মানুষকে উত্তম শিক্ষা প্রদানকারীর জন্য দু‘আ করে।[৭]
৭. দাওয়াত জান্নাতে যাওয়ার কারণ
আখিরাতে চূড়ান্ত সফলতা তথা জান্নাত তাদেরই জন্য, যারা দাওয়াতের কাজ করে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلۡتَکُنۡ مِّنۡکُمۡ اُمَّۃٌ یَّدۡعُوۡنَ اِلَی الۡخَیۡرِ وَ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ
‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল অবশ্যই থাকতে হবে, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দিবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে। তারাই হলো সফলকাম’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৪)।
দাওয়াতের মূল ভিত্তি
দাওয়াত শুধু দু’টি জিনিসের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। যথা-
১. মহাগ্রন্থ আল-কুরআন
আল-কুরআন হলো আল্লাহর বাণী, যা প্রত্যক্ষভাবে মানবজাতির দিকনির্দেশনার জন্য নাযিল করা হয়েছে। এটি জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ সংবিধান এবং ইসলামের মূল উৎস। মহান আল্লাহ বলেন, ذٰلِکَ الۡکِتٰبُ لَا رَیۡبَ ۚۖۛ فِیۡہِ ۚۛ ہُدًی لِّلۡمُتَّقِیۡنَ ‘এটা ঐ কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাক্বীদের জন্য পথ নির্দেশ’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২)। সুতরাং দাওয়াতের মূল উৎস অবশ্যই কুরআন হতে হবে, আল্লাহ যা আদেশ করেছেন, যা নিষেধ করেছেন, তা মানুষের কাছে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করাই দাওয়াতের প্রথম ও প্রধান ভিত্তি।
২. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ তথা হাদীছ
আল-কুরআনের পর ইসলামের দ্বিতীয় মূল ভিত্তি হলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ, অর্থাৎ তাঁর কথাবার্তা, কাজকর্ম ও অনুমোদন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুরআনের ব্যাখ্যাকারী এবং বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগকারী ছিলেন। বিদায় হজ্জের সময় নবী করীম (ﷺ) ছাহাবায়ে কেরামকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিয়ে যান, যাতে ইসলামের চিরন্তন দাওয়াতের মূলনীতির ভিত্তি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বিদায় হজ্জের ভাষণে তিনি বলেন,تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابُ اللهِ وَسُنَة رَسُولِهِ ‘আমি তোমাদের মাঝে দু’টি বস্তু রেখে যাচ্ছি, যেগুলোকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ’।[৮] এই হাদীছ থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, একজন মুসলিমের জীবন পরিচালনার জন্য কুরআনের পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করাও অপরিহার্য। সুন্নাহ ছাড়া কুরআনের পূর্ণতা উপলব্ধি করা যায় না এবং সুন্নাহই কুরআনের জীবন্ত ব্যাখ্যা।
দাওয়াতের মূলনীতি
আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) দাওয়াতের ক্ষেত্রে কিছু মূলনীতি ও নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যেগুলো অনুসরণ করলে দাওয়াতী কার্যক্রম হবে সফল, সুফলদায়ক এবং কল্যাণকর। নিচে কিছু মূলনীতি উল্লেখ করা হলো।
১. ইখলাসের সাথে দাওয়াত দেয়া
দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। লোক দেখানো, অর্থনৈতিক লাভ বা খ্যাতির উদ্দেশ্যে দাওয়াত কোন উপকারে আসবে না। মহান আল্লাহ বলেন, وَ مَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوا اللّٰہَ مُخۡلِصِیۡنَ لَہُ الدِّیۡنَ ۬ۙ حُنَفَآءَ ‘আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তারই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে’ (সূরা আল বাইয়্যিনাহ : ৫)। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ ‘নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল’।[৯]
২. জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি সহ দাওয়াত দেয়া
সঠিক দাওয়াত দিতে হলে কুরআন, হাদীছ, ইসলামী আক্বীদা ও মানুষের অবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞান থাকা আবশ্যক। যার জ্ঞান নেই, তার দাওয়াত বিপজ্জনক, মানুষকে বিভ্রান্ত করার সম্ভাবনা বেশি। মহান আল্লাহ বলেন, قُلۡ ہٰذِہٖ سَبِیۡلِیۡۤ اَدۡعُوۡۤا اِلَی اللّٰہِ عَلٰی بَصِیۡرَۃٍ ‘বলুন, এটাই আমার পথ আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই’ (সূরা ইউসুফ : ১০৮)।
৩. হিকমত বা প্রজ্ঞার সাথে দাওয়াত দেয়া
হিকমত মানে পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করা। কখনও নম্র ভাষা, কখনও কঠোরতা, কখনও সরলতা এসবই হিকমাহর অংশ। মহান আল্লাহ বলেন, اُدۡعُ اِلٰی سَبِیۡلِ رَبِّکَ بِالۡحِکۡمَۃِ ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর হিকমতের মাধ্যমে’ (সূরা আন-নাহল : ১২৫)।
৪. উত্তম উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত দেয়া
দাওয়াতের ভাষা হতে হবে কোমল, হৃদয়স্পর্শী ও নাছীহাতপূর্ণ। মানুষকে অপমান বা রূঢভাবে সমালোচনা না করে তাদেরকে উপলব্ধি করিয়ে উপদেশ দিতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
اُدۡعُ اِلٰی سَبِیۡلِ رَبِّکَ بِالۡحِکۡمَۃِ وَ الۡمَوۡعِظَۃِ الۡحَسَنَۃِ ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর হিকমত এবং উত্তম উপদেশের মাধ্যমে’ (সূরা আন-নাহল : ১২৫)।
৫. দাওয়াতে নম্রতা ও কোমলতা প্রদর্শন করা
দাওয়াতের ক্ষেত্রে রূঢতা মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে ফেরআউনের মত এক অত্যাচারীর কাছেও আল্লাহ কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দেন। মহান আল্লাহ বলেন, فَقُوۡلَا لَہٗ قَوۡلًا لَّیِّنًا ‘ তোমরা তার সাথে নরম কথা বলবে’ (সূরা ত্বা-হা : ৪৪)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ ‘নম্রতা যেকোনো কিছুর সঙ্গে থাকলে তা তাকে শোভিত করে’।[১০]
৬. দাওয়াতের ক্ষেত্রে ধৈর্য ও সহনশীলতা বজায় রাখা
মানুষ সহজে পরিবর্তন গ্রহণ করে না। দাওয়াত প্রদানকারীকে মানুষ অবজ্ঞা করবে, বিদ্রুপ করবে, তবুও ধৈর্য হারানো যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, فَاصۡبِرۡ کَمَا صَبَرَ اُولُوا الۡعَزۡمِ مِنَ الرُّسُلِ ‘অতএব তুমি ধৈর্যধারণ করো, যেমন দৃঢপ্রতিজ্ঞ রাসূলগণ ধৈর্য ধরেছিলেন’ (সূরা আল-আহকাফ : ৩৫)।
৭. বিতর্কের প্রয়োজন হলে উত্তম বিতর্ক করা
যাদের সাথে মতভেদ আছে, তাদের সাথে উত্তমভাবে যুক্তি বা আলোচনা করতে হবে। গালাগালি, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অহংকার দিয়ে নয়, বরং কুরআন, হাদীছ ও যুক্তির আলোকে বুঝাতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَ جَادِلۡہُمۡ بِالَّتِیۡ ہِیَ اَحۡسَنُ ‘তাদের সাথে বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়’ (সূরা আন-নাহল : ১২৫)।
৮. দাওয়াতের আগে নিজের মধ্যে উত্তম আদর্শ লালন করা
দাওয়াত প্রদানকারী যদি নিজেই আমল না করে, তাহলে তার কথার কোনো প্রভাব থাকে না। নিজের আচার-আচরণ দিয়ে মানুষকে দাওয়াত দিতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, لَقَدۡ کَانَ لَکُمۡ فِیۡ رَسُوۡلِ اللّٰہِ اُسۡوَۃٌ حَسَنَۃٌ ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’ (সূরা আল-আহযাব : ২১)।
৯. দাওয়াত গ্রহণে জবরদস্তি বা বল প্রয়োগ না করা
ব্যক্তিকে জোর করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা ইসলামে নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন, لَاۤ اِکۡرَاہَ فِی الدِّیۡنِ ‘দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৫৬)।
১০. পর্যায়ক্রমে ধাপে ধাপে দাওয়াত দেয়া
তাওহীদ থেকে শুরু করে তারপর ছালাত, তারপর যাকাত এভাবে ইসলামের দাওয়াত ধাপে ধাপে দিতে হবে। হাদীছে এসেছে, ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখন মু‘আয (ইবনু জাবাল)-কে শাসনকর্তা হিসেবে ইয়ামান দেশে পাঠান, তখন বলেছিলেন, ‘তুমি আহলে কিতাব লোকদের নিকট যাচ্ছো। সেহেতু প্রথমে তাদের আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দিবে। যখন তারা আল্লাহর পরিচয় লাভ করবে, তখন তাদের তুমি বলবে যে, আল্লাহ দিন-রাতে তাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয করে দিয়েছেন। যখন তারা তা আদায় করতে থাকবে, তখন তাদের জানিয়ে দিবে যে, আল্লাহ তাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন, যা তাদের ধন-সম্পদ হতে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হবে’।[১১]
১১. আল্লাহর সাহায্য চাওয়া ও তাঁর উপর ভরসা
হেদায়াত একমাত্র আল্লাহর হাতে। একজন দাঈ নিজের দায়িত্ব আদায় করবে, আর ফলাফলের জন্য আল্লাহর কাছে দু‘আ করবে ও তাঁর উপর ভরসা করবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাদীসে বলেন, اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِقَوْمِي؛ فإنَّهُمْ لا يَعْلَمُونَ ‘হে আল্লাহ! আমার কওমকে ক্ষমা করুন, নিশ্চয়ই তারা জানে না’।[১২]
দাওয়াতের পদ্ধতি
ইসলামী দাওয়াত কেবল মসজিদ বা মাহফিলভিত্তিক একটি কাজ নয়; বরং এটি এক বিস্তৃত ও বহুমুখী প্রচেষ্টা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ জীবনে যেমন বিভিন্ন উপায়ে দাওয়াত দিয়েছেন, তেমনি আজকের যুগে প্রযুক্তি ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েও এই দাওয়াতী দায়িত্ব পালন করা যায়।
১. মৌখিকভাবে কথার মাধ্যমে দাওয়াত
মুখের কথা ও বক্তৃতার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা দাওয়াতের সবচেয়ে পুরনো এবং প্রভাবশালী মাধ্যম। ছোট বড় ইসলামী সম্মেলন, জালসা, মাহফিল, আলোচনা সভা, সেমিনার, খুত্ববা ইত্যাদির মাধ্যমে ইসলামী জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
২. লিখনির মাধ্যমে দাওয়াত
কলমের শক্তিকে ব্যবহার করে দাওয়াত প্রচার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইসলামী বই পুস্তক রচনা, বিনামূল্যে বা স্বল্প মূল্যে বই বিতরণ, পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখন, ইসলামী সাময়িকী প্রকাশ, অনারবদের আরবীতে লিখিত কুরআন, হাদীছ ও ইসলামী বই অনুবাদ করে শিক্ষিত লোকের নিকট প্রচার, লিফলেট বিতরণ এবং পোষ্টার লিখনের মাধ্যমে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিভিন্ন রাজাকে ইসলাম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাতে ছাহাবীদের মাধ্যমে লিখিত পত্র ও দলীল প্রেরণ করেছেন। যেমন: হিরাকল, কিসরা, নাজ্জাশী ইত্যাদি।
৩. শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে দাওয়াত
ইসলামী জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে ইসলামের সঠিক আক্বীদা ও আমল শিক্ষা দেওয়া যায়। স্কুল, মাদরাসা, কলেজে দ্বীনি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষিত সমাজকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানানো। যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বদর যুদ্ধের বন্দিদেরকে শিক্ষার বিনিময়ে মুক্তি দিয়েছিলেন, যা ছিল শিক্ষাকে দাওয়াতের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার সূচনা।
৪. মসজিদের ইমাম ও খত্বীবের মাধ্যমে দাওয়াত
ইমাম ও খত্বীবরা প্রতিদিন মুছল্লীদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান। তারা যদি কুরআন-হাদীছের আলোকে ছোট ছোট বক্তৃতা, উপদেশ ও মাস’আলা বর্ণনা করেন, তবে তা অত্যন্ত কার্যকর হয়ে ওঠে।
৫. বাহাস ও মুবাহাসার মাধ্যমে দাওয়াত
ভ্রান্ত বিশ্বাস বা বিদ‘আতের মোকাবেলায় ছহীহ আক্বীদা প্রতিষ্ঠা করতে হলে, সুস্থ ও প্রমাণভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন। বাহাস মুবাহাসার মাধ্যমে দ্বীনের সঠিক দিক নির্দেশনা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। যার ফলে ভ্রান্ত আক্বীদা বিশ্বাসের অবসান ঘটে এবং মানুষের নিকট ইসলামের সঠিক সিদ্ধান্ত পৌঁছে যায়। দাওয়াতের ক্ষেত্রে এটা হিকমাহ ও উত্তম বিতর্কের অংশ।
৬. দ্বীনি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে দাওয়াত
মসজিদ, মাদরাসা, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, দাওয়াহ একাডেমী ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে সুসংগঠিতভাবে দাওয়াতী কাজ চালানো যায়। একেকটি প্রতিষ্ঠান হাজারো মানুষকে সঠিক জ্ঞান ও নৈতিকতা শিক্ষা দিতে পারে।
৭. আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে দাওয়াত
বর্তমান যুগে টিভি, রেডিও, ইউটিউব, ওয়েবসাইট, সোশ্যাল মিডিয়া (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম, ইত্যাদি) দাওয়াতের জন্য বিরাট মাধ্যম। অনলাইনে ইসলামী ভিডিও, লেকচার, অডিও সিরিজ, পোস্টার ও ফেস্টুন তৈরি করে অতি সহজেই হাজার হাজার মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছানো সম্ভব।
পর্যায়ক্রমে যাদের নিকট দাওয়াত পৌঁছানো আবশ্যক
কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকে দাওয়াতের ক্ষেত্র ধাপে ধাপে বিস্তৃত। ইসলামী ইতিহাসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও ছাহাবায়ে কেরাম যে ক্রমে দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন, সেটিই আমাদের জন্য উত্তম অনুসরণীয়।
১. নিজের পরিবার-পরিজনের নিকট
ইসলামী দাওয়াতের শুরু হোক নিজ ঘর থেকে। সন্তান, স্ত্রী, ভাই-বোন, বাবা-মা তাদের সবার প্রতি রয়েছে আমাদের প্রথম দায়িত্ব। মহান আল্লাহ বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَ اَہۡلِیۡکُمۡ نَارًا ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর’ (সূরা আত-তাহরীম : ৬)।
২. আত্মীয়-স্বজনদের নিকট
আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাদের আমরা ভালোবাসি, কিন্তু দ্বীনের দাওয়াত দেয়া হয় না। অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাওয়াত শুরু করেছিলেন তাঁর নিকটতম আত্মীয়দের দিয়ে। মহান আল্লাহ বলেন, وَ اَنۡذِرۡ عَشِیۡرَتَکَ الۡاَقۡرَبِیۡنَ ‘আপনি আপনার নিকটতম আত্মীয়-স্বজনদের সতর্ক করুন’ (সূরা আশ-শু’আরা : ২১৪)। আত্মীয়দের হেদায়াতের জন্য আমাদের ব্যস্ত থাকা উচিত, কারণ তারা আমাদের দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হন এবং আমাদের কথা গুরুত্ব সহকারে শোনেন।
৩. নিজ সমাজ ও আশেপাশের লোকদের নিকট
আমরা যে সমাজে বাস করি, তার শান্তি-শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও আল্লাহভীতির ওপরই নির্ভর করে একটি কল্যাণকর পরিবেশ। তাই সমাজের প্রতি দাওয়াত একটি যরূরী কর্তব্য। মহান আল্লাহ বলেন, وَ لِتُنۡذِرَ اُمَّ الۡقُرٰی وَ مَنۡ حَوۡلَہَا ‘(এই কুরআন আমি নাযিল করেছি) যাতে আপনি মক্কাবাসী এবং তাদের পার্শ্ববর্তী লোকদের সতর্ক করতে পারেন’ (সূরা আল-আন‘আম : ৯২)। প্রতিবেশী, সহকর্মী, বন্ধু ও সমাজের সকল স্তরের মানুষ সবার কাছেই ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে। কারণ সমাজ গড়ার কাজ শুধু রাষ্ট্রের নয়, আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
৪. সমগ্র মানবজাতির নিকট
ইসলাম বিশ্বজনীন ধর্ম। কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে দাওয়াত নিয়ে এসেছেন, তা কোনো একটি জাতি বা ভূখণ্ডের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য। মহান আল্লাহ বলেন, وَلۡتَکُنۡ مِّنۡکُمۡ اُمَّۃٌ یَّدۡعُوۡنَ اِلَی الۡخَیۡرِ ‘তোমাদের মধ্যে একটি দল অবশ্যই থাকতে হবে, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান জানাবে’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৪)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, کُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে’ (সূরা আলে ইমরান : ১১০)। ইসলাম কেবল মুসলমানদের ধর্ম নয়, বরং মানবতার মুক্তির বার্তা। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত, জীবনের সর্বত্র ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেওয়া।
পরিশেষে বলব, দাওয়াত হলো ইসলামের প্রাণস্পন্দন, মানুষের জন্য কল্যাণের ডাক এবং মুক্তির দিশা। এটি শুধু আলেম বা দাঈর দায়িত্ব নয়; বরং প্রতিটি মুসলিমের জন্য এটি একটি মহান কর্তব্য, যা তার ক্ষমতা, জ্ঞান ও অবস্থান অনুযায়ী পালনীয়। দাওয়াতের মাধ্যমে আমরা অন্যদের আল্লাহর পথে আহ্বান করি, তাদের হেদায়াতের পথ প্রদর্শন করি এবং সমাজে ন্যায়, সততা ও সত্য প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখি। দাওয়াতের মাধ্যমে আমরা শুধু অন্যকে হেদায়াতের পথে নিয়ে আসি না, বরং নিজের ও পরিবারের জন্যও আল্লাহর বরকত, সওয়াব এবং সন্তুষ্টি অর্জন করি ফা- লিল্লাহিল হামদ। সুতরাং, কল্যাণ ও মুক্তির পথে দাওয়াতকে আমাদের জীবনের মূল ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা উচিত। মহান আল্লাহ আমাদেরকে একনিষ্ঠ দাঈ ইলাল্লাহ হিসাবে কবুল করুন-আমীন!!
* দাওরায়ে হাদীছ, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা। অধ্যয়নরত, আক্বীদা ও দাওয়াহ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
তথ্যসূত্র :
[১]. ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৫তম খণ্ড, পৃ. ১৫৭।
[২]. শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৫৯।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৬১।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/২৭৮৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৮১।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৩০০৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৪০৬।
[৬]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৭৪।
[৭]. তিরমিযী, হা/২৬৮৫, সনদ ছহীহ।
[৮]. মুয়াত্ত্বা, হা/৩৩৩৮।
[৯]. ছহীহ মুসলিম, হা/১।
[১০]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৯৪।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/১৪৫৮।
[১২]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৭৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭৯২।