ইসলামী রাষ্ট্রে শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা: একটি পর্যালোচনা
- মূসা ইবরাহীম বিন রঈসুদ্দীন*
(৩য় কিস্তি)
ঘ. শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার কর্মপদ্ধতি
১. তাক্বওয়া
তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি শান্তি ও নিরাপত্তাপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থার মূল নেয়ামক। আর تقوي (তাক্বওয়া) শব্দটি আরবী।وقاية (বিকায়াহ) হতে এর উৎপত্তি। অর্থ : অনিষ্টকর ও কষ্টদায়ক বস্তু হতে আত্মরক্ষা করা, দূরে থাকা, মুক্তি, নিষ্কৃতি, সতর্কতা ও ভয়ভীতি ইত্যাদি।[১] সাধারণ অর্থে আল্লাহভীতিকে ‘তাক্বওয়া’ বলা হয়। শারঈ অর্থে- আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে ভীত হয়ে তাঁর নির্র্দেশিত ও রাসূল (ﷺ) প্রদর্শিত পথে জীবন পরিচালনা করা, জীবনের কোন ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলার হুকুম যেন লঙ্ঘিত না হয়, এরকম সতর্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্কতার সাথে চলার নামই তাক্বওয়া।[২]
কেউ কেউ বলেন, ব্যক্তি ও সমষ্টিগত জীবনে ইসলামী বিধানে নিষিদ্ধ সকল প্রকার বাক্য, কার্য ও চিন্তা পরিহার করে আখিরাতে পরিত্রাণ লাভের আশায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী জীবনাদর্শ বাস্তবায়ন করাকে ‘তাক্বওয়া’ বলা হয়। তাত্ত্বিক অর্থে তাক্বওয়া বলা হয়, আল্লাহভীতি জনিত মানব মনের সেই অনুভূতিকে, যা তার জীবনের সকল ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আত্মপ্রকাশ করে। কোন কোন বিশেষজ্ঞ বলেন, যে সকল ভাব, প্রবৃত্তি অথবা কর্র্র্র্র্র্ম আধ্যাত্মিক অথবা পরজগতে ক্ষতিকর এবং যে সমস্ত কার্র্যকলাপ দৃশ্যতঃ অবৈধ বলে মনে না হলেও পরিণতিতে মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে, সে সকল ভাব, প্রবৃত্তি ও কার্র্যকলাপ হতে নিজেকে রক্ষা করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করাকে তাক্বওয়া বলে। আর তাক্বওয়ার গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিকে ‘মুত্তাক্বী’ বলা হয়।[৩] একবার ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ‘উবাই ইবন কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট তাক্বওয়ার ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনি কি কখনও এমন পথ অতিক্রম করেছেন, যেটি খুবই সংকীর্ণ এবং যে পথের দুই দিকেই কাঁটাপূর্ণ গাছ দ্বারা আচ্ছাদিত? তদুত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ। ‘উবাই ইবন কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তখন বললেন, এমতাবস্থায় আপনি কিভাবে পথ অতিক্রম করেছেন? জবাবে ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, খুবই সতর্কতার সাথে কাপড় ও শরীর বাঁচিয়ে সে পথ অতিক্রম করেছি। ‘উবাই ইবন কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, এটাই ‘তাক্বওয়া’।[৪]
তাক্বওয়ার গুরুত্ব
মানুষের ব্যক্তি ও সমষ্টি জীবনে ইসলামী জীবনাদর্শ বাস্তবায়ন সম্পূর্ণরূপে তাক্বওয়ার উপর নির্ভরশীল। তাক্বওয়া ব্যতীত কোন ব্যক্তির পক্ষে ইহজগতে সৎ ও কল্যাণকর কার্য সম্পাদন করা ও পরজগতে মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয়। কারণ মানব মন সর্বক্ষণ অসৎ ও অনিষ্টকর কার্যাদি সম্পাদন করতে প্রলুব্ধ করে এবং আল্লাহদ্রোহীতায় লিপ্ত হওয়ার জন্য প্ররোচিত করে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, اِنَّ النَّفۡسَ لَاَمَّارَۃٌۢ بِالسُّوۡٓءِ ‘নিশ্চয় মানব মন সর্বদা অনিষ্টকর কাজ করার জন্য নির্দেশ দেয়’ (সূরা ইউসুফ : ৫৩)।
নফসকে উদ্ধত আচরণ হতে রক্ষা করার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাক্বওয়া। অর্থাৎ তাক্বওয়া অবলম্বনের মাধ্যমে মানব জাতি নফসকে সংযত করে যাবতীয় মানবিক গুণে গুণান্বিত হতে পারে। কোন ব্যক্তি যখন তার নফসকে নিষ্কলুষ করার উদ্দেশ্যে তাক্বওয়ার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, তখন নফস তার মজ্জাগত স্বভাব অর্র্র্র্র্র্র্র্র্থাৎ অনিষ্টকর কাজের প্রতি নির্দেশ করার যোগ্যতা পরিত্যাগ করে মন্দ কাজের প্রতি তিরস্কার করার যোগ্যতা অর্জন করে। এমতাবস্থায় সে আর মন্দ কাজের প্রতি প্ররোচনা যোগায় না, বরং নফস মন্দ কাজ করতে উদ্যত হলে সে বিরত রাখার জন্য তিরস্কার করতে থাকে। মনের এ অবস্থাকে আল-কুরআনে ‘নফসে লাউওয়ামাহ’ (نفس لوامة) অর্থাৎ ‘তিরস্কারকারী মন’ হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। যখন কোন ব্যক্তি নফসের এ অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট না হয়ে তাকে আরও সঠিক এবং নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস অব্যাহত রাখে, তখন নফস তিরস্কারের স্তর অতিক্রম করে এমন স্তরে উপনীত হয় যে, সেখানে সে প্রশান্ত ও নিরুদ্বেগ মন-মানসে রূপান্তরিত হয়ে যায়। এ অবস্থায় সে শুধু সৎ ও কল্যাণকর কাজের প্রতি অনুপ্রেরণা প্রদান করতে থাকে। মনের এ অবস্থাকে আল-কুরআনে (نفس مطمئنة) ‘নফসে মুত্বমাইন্নাহ’ অর্থাৎ ‘প্রশান্ত মন’ হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।[৫] এ অবস্থায় তাক্বওয়া অবলম্বনকারীর মনে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা সর্বদ্রষ্টা, সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা। মানুষ যত নির্জনে এবং অন্ধকারে কোন বাক্য, কার্য ও চিন্তা করুক না কেন আল্লাহ তা‘আলা তা অবশ্যই অবহিত। এটা তার ঈমানে পরিণত হয়ে যায়। এ ঈমান ও বিশ্বাসের কারণে একজন মুত্তাক্বী ব্যক্তি তার বাক্যে, কার্যে ও চিন্তায় পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ তা‘আলার বিধান অনুসরণ করে চলে।[৬]
তাক্বওয়ার প্রতিদান
১. আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি লাভ
হিংসা ও অহংকারে ইবলীস মানব জাতির শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করে এবং এজন্য সে আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সিজদা করা হতে বিরত থাকে। তার এ উদ্ধত আচরণের জন্য আল্লাহ তা‘আলা তাকে নিজ দরবার হতে বিতাড়িত করে দেন এবং সে শয়তানে রাজীমে পরিণত হয়। সে তার এ বিপর্র্র্যয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের সংকল্পের কথা ঘোষণা করে বলেছিল,
لَاُغۡوِیَنَّہُمۡ اَجۡمَعِیۡنَ-اِلَّا عِبَادَکَ مِنۡہُمُ الۡمُخۡلَصِیۡنَ
‘আমি তাদের সকলকে পথভ্রষ্ট করে ছাড়ব। কিন্তুআপনার একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে ছাড়া’ (সূরা ছোয়াদ : ৮২)। তাক্বওয়াশীল ব্যক্তিকে শয়তান প্ররোচিত করতে পারে না। কারণ আল্লাহ তার সাথে থাকেন (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৯৪)।
২. সম্মান ও মর্যাদা লাভ
ইসলাম পূর্ব জাহেলী যুগে মর্যাদা ও সম্মানের জন্য বংশ-কৌলীন্য ও অর্থ-সম্পদকে মানদণ্ড হিসাবে স্থির করা হয়েছিল। তদপ্রেক্ষিতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টি করে মানুষের একটি বৃহদাংশকে সকল প্রকার মানবিক অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়েছিল। রাসূল (ﷺ) এ যুল্মের অবসান ঘটিয়ে বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেন, ‘সকল মানুষ এক আদমের সন্তান। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি হতে’।[৭] তিনি বংশ-কৌলীন্য ও অর্থ-সম্পদের স্থলে তাক্বওয়াকে মর্যাদা ও সম্মানের মানদণ্ড স্থির করে ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহ তা‘আলার দরবারে অধিকতর সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাক্বওয়া সম্পন্ন’ (সূরা আল-হুজুরাত : ১৩)।
৩. সৎকর্ম কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত
তাক্বওয়া যাবতীয় ইবাদতের মূল বলে গণ্য। তাক্বওয়া বিহীন কোন ইবাদত আল্লাহ তা‘আলার নিকট কবুল হয় না। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক ইবাদতের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান হল উহার খোসার ন্যায় এবং তাক্বওয়া হল উহার শাস। এ কারণে মুনাফিকদের কোন ইবাদত আল্লাহ তা‘আলার দরবারে কবুল হয় না। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা মুত্তাক্বীদের পক্ষ থেকে কবুল করেন’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ২৭)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَنۡ یَّنَالَ اللّٰہَ لُحُوۡمُہَا وَ لَا دِمَآؤُہَا وَ لٰکِنۡ یَّنَالُہُ التَّقۡوٰی مِنۡکُمۡ ‘কুরবানীর গোশত ও রক্ত আল্লাহ তা‘আলার দরবারে পৌঁছায় না, বরং যা পৌঁছায় তা হল তোমাদের তাক্বওয়া’ (সূরা আল-হজ্জ : ৩৭)।
৪. জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ এবং জান্নাত লাভের মাধ্যম
প্রত্যেক মানুষের ইহজগতের কাজের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে তার পরজগতের স্থান নির্ধারণ করা হবে। যার সৎকর্র্র্মের পরিমাণ বেশী হবে, তাকে জান্নাত প্রদান করা হবে। পক্ষান্তরে যার অসৎ কর্মের পরিমাণ বেশী হবে, তাকে জান্নাতে নিক্ষেপ করা হবে। তাক্বওয়া এ ক্ষেত্রে খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে এবং ভাল কাজ সম্পাদনে অনুপ্রেরণা যোগায়। এভাবে খারাপ বর্জন এবং ভাল কাজের মাধ্যমে তাক্বওয়া পূর্ণতা লাভ করে। এ প্রেক্ষিতে মুত্তাক্বীদের যেমন জাহান্নাম হতে মুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তেমনি তাকে জান্নাত লাভের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ اَمَّا مَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّہٖ وَ نَہَی النَّفۡسَ عَنِ الۡہَوٰی- فَاِنَّ الۡجَنَّۃَ ہِیَ الۡمَاۡوٰی
‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবার ভয়ে ভীত হল এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ হতে দূরে রাখল, নিশ্চয় জান্নাত হবে তার আবাসস্থল’ (সূরা আন-নাযি‘আত : ৪০-৪১)। এমনকি এই তাকওয়ার কারণেই মানুষ বেশী জান্নাতে প্রবেশ করবে।[৮]
৫. রিযিকের প্রশস্ততা ও ষড়যন্ত্র হতে সুরক্ষা
প্রত্যেক মানুষ তার জীবনে পর্র্র্যাপ্ত রিযিক, সুখ-স্বাচ্ছন্দময় জীবনধারা পসন্দ করে। আর যারা তাক্বওয়ার গুণে গুণান্বিত হয়, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে রিযিক দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ مَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مَخۡرَجًا-وَّ یَرۡزُقۡہُ مِنۡ حَیۡثُ لَا یَحۡتَسِبُ
‘যে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে, আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য চলার পথ করে দেন এবং রিযিকের ব্যবস্থা এমনভাবে করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ২-৩)। প্রত্যেক মানুষ তার কাজকর্মে সহজসাধ্যতা, ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় নিরাপত্তা এবং পরকালে সফলতা লাভ করতে চায়। আর যারা তাক্বওয়া অবলম্বনকারী আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ষড়যন্ত্র হতে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,
وَ اِنۡ تَصۡبِرُوۡا وَ تَتَّقُوۡا لَا یَضُرُّکُمۡ کَیۡدُہُمۡ شَیۡـًٔا
‘যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং তাক্বওয়া অবলম্বন কর, তবে তাদের কোন ষড়যন্ত্র তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না’ (সূরা আলে ইমরান : ১২০)।
৬. গুনাহ মাফ করা হয় ও আসমান-যমীনের নে‘মত উন্মুক্তকরণ
মানুষ অনেক সময় শয়তানের চক্রান্তে পড়ে এবং নফসের তাড়নায় বিপথগামী হয়ে যায়। এরপর সে যদি তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে তাক্বওয়ার নীতি অবলম্বন করে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে মাফ করে দেন। এ সম্পর্কে আল- কুরআনে বর্র্ণিত হয়েছে-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ تَتَّقُوا اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّکُمۡ فُرۡقَانًا وَّ یُکَفِّرۡ عَنۡکُمۡ سَیِّاٰتِکُمۡ وَ یَغۡفِرۡ لَکُمۡ ؕ وَ اللّٰہُ ذُو الۡفَضۡلِ الۡعَظِیۡمِ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর, তবে তিনি তোমাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। বস্তুতঃ আল্লহ তা‘আলা অসীম অনুগ্রহের অধিকারী’ (সূরা আল-আনফাল : ২৯)। যারা তাক্বওয়ার গুণে গুণান্বিত হবে আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য আসমান ও যমীনের নে‘মতরাজি উন্মুক্ত করে দিবেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,
وَ لَوۡ اَنَّ اَہۡلَ الۡقُرٰۤی اٰمَنُوۡا وَ اتَّقَوۡا لَفَتَحۡنَا عَلَیۡہِمۡ بَرَکٰتٍ مِّنَ السَّمَآءِ وَ الۡاَرۡضِ
‘যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের প্রতি আসমান ও যমীনের নে‘মতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ৯৬)।
উপরিউক্ত আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, তাক্বওয়া সার্বিকভাবে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার সোপান। যে জাতি যতবেশী তাক্বওয়ার বলে বলিয়ান সে জাতি ততবেশী উন্নত, সমৃদ্ধ ও শান্তি ও নিরাপত্তার অগ্রবর্তী। সুতরাং দেশের সকল নাগরিককে তাক্বওয়ার অধিকারী হওয়া যরূরী।
২. জনসচেতনতা
সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তার গুরুত্ব এবং তার ইতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে সকল স্তরের মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। যাতে সমাজের প্রতিটি মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তা কী ও ত প্রতিষ্ঠায় বাধা-বিপত্তিগুলো স্পষ্ট হয় এবং তার প্রচার-প্রসারের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়। বিষয়টি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। কেননা এদেশের জনগণ ধর্মভীরু এবং সচেতন। তাদেরকে যদি শান্তি-শৃঙ্খল ও নিরাপত্তার ইহকালীন ও পরকালীন উপকারিতা বুঝানো দেয়া যায়, তাহলে তা সময় সাপেক্ষ হলেও অসম্ভব নয়। এজন্য নিম্নোক্ত পন্থাগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে-
প্রথমতঃ মসজিদে খুৎবার সাহায্য গ্রহণ। বছরে বায়ান্ন দিন এলাকার জনগণ মসজিদে জুম‘আর ছালাতে শামিল হন। এ জুম‘আর ছালাতের খুৎবায় বিভিন্ন বিষয়ের অবতারণা করা হয়। সে সব বিষয়ের পাশাপাশি যদি ইমাম সাহেবগণ শান্তি নিরাপত্তা উপকারিতার দিকগুলো বুঝিয়ে দেন, তাহলে ধীরে ধীরে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হবে।
দ্বিতীয়তঃ দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়ায মাহফিল, তাফসীর মাহফিল, ইসলামী জালসা, তা‘লীমী বৈঠক, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে বরেণ্য ওলামায়ে কেরাম, যুগশ্রেষ্ঠ মুফাসসির এবং খ্যাতনামা অভিজ্ঞ পণ্ডিত ব্যক্তিগণ বক্তব্য রেখে থাকেন। এসব অনুষ্ঠানে নানা বয়স, পেশা, শিক্ষা ও পদমর্যাদার বহুলোকের সমাগম হয়ে থাকে। সুতরাং এসব অনুষ্ঠানে যদি শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতার কুফল এবং তার পরিণতির কথা বিশদভাবে বুঝিয়ে বক্তব্য রাখা যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে আলোড়ন সৃষ্টি হবে এবং জনমত গড়ে উঠবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সুচিন্তিত ও সুবিন্যস্ত পরিকল্পনা।
তৃতীয়তঃ পাঠ্যসূচীতে শান্তি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়াবলী প্রবর্তন করা। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শান্তি ও নিরাপত্তার উপকারিতা এবং না থাকার কুফল ও তার পরিণতির বিষয় সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান দানের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা শিক্ষা কারিকুলাম ও সিলেবাসে থাকতে হবে। এছাড়া এ সংক্রান্ত বিষয়ে উচ্চতর গবেষণাকে উৎসাহিত করতে হবে।
চতুর্থতঃ সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করা যেতে পারে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গণমানুষকে সচেতন করতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারে। এজন্য শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার বিভিন্ন শাখায় শান্তি ও নিরাপত্তার ব্যাপারে দর্শক, শ্রোতা ও পাঠক হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা যেতে পারে।
পঞ্চমতঃ শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক পোষ্টার। পোষ্টার, লিফলেট ও স্টিকারের মাধ্যমে জনমত সৃষ্টি করা যায়। একটি লোক নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য স্থানে তার ময়লা-আবর্জনা ফেলে কিন্তু সেখানে যদি ‘নির্ধারিত স্থানে আপনার আবর্জনা ফেলুন’ নামে কোন পোস্টার থাকে, তাহলে এটি হতে পারে শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠার একটি পোষ্টারের ভাষা। এ ধরনের পোষ্টার ও লিফলেট মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়, অনুভূতিকে আকর্ষণ করে। সুতরাং দেশের সার্বিক ক্ষেত্রে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য এ ধরনের পোষ্টার, লিফলেট ও স্টিকার লিখে বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশন, উন্মুক্ত জমায়েতের স্থান, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে লাগিয়ে এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা যেতে পারে।
৩. অন্যায়ের প্রতিরোধ
শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং আদর্শ সমাজ গঠনের জন্য অন্যায়ের প্রতিরোধ বিষয়টির গুরুত্ব অপরিসীম। বিষয়টি উপলব্ধি করেই লুক্বমান হাকীম (রহ.) তাঁর পুত্র সন্তানকে সৎকাজের প্রতি আদেশ ও অসৎকাজের প্রতি নিষেধের নসীহত প্রদান করেন। যা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করে মহান আল্লাহ জগদ্বাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন,
یٰبُنَیَّ اَقِمِ الصَّلٰوۃَ وَ اۡمُرۡ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ انۡہَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَ اصۡبِرۡ عَلٰی مَاۤ اَصَابَکَ ؕ اِنَّ ذٰلِکَ مِنۡ عَزۡمِ الۡاُمُوۡرِ
‘হে প্রিয় বৎস! ছালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ কর ও অসৎকাজ হতে নিষেধ কর এবং আপদে-বিপদে ধৈর্যধারণ কর, নিশ্চয় এটি দৃঢ় সংকল্পের কাজ’ (সূরা লুক্বমান : ১৭)।
গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
নির্ভেজাল তাওহীদ ও ইসলামের বিশুদ্ধ আক্বীদা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ‘সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ’ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধানতম অবলম্বন। এক্ষেত্রে প্রয়োজন নিবেদিত প্রাণ, তাক্বওয়াশীল ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কতিপয় কর্মী ও দাঈ ইলাল্লাহ। যাদের হাতেই রচিত হবে বিশ্ব মানবতার শান্তিময় সৌধের স্বচ্ছ ও সুদৃঢ় ভিত্তি।
ইসলামী শরী‘আতে এর মর্যাদা অসীম বলে স্বীকৃত। এমনকি আল্লাহ তা‘আলা কোন কোন স্থানে এটাকে ঈমানের পূর্বে উল্লেখ করেছেন। অথচ ঈমান হল দ্বীনের মূলনীতি ও ইসলামী শরী‘আতের মূলভিত্তি। মহান আল্লাহ বলেন,
کُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ
‘তোমরাই সর্বোত্তম জাতি। মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনবে’ (সূরা আলি ‘ইমরান : ১১০)।
বর্তমান যুগে দেশে মন্দ-পাপাচারের বাহুল্যতা, বিশৃঙ্খলা-হানাহানি, খুন-রাহাজানি, সূদ-ঘুষ, যেনা-ব্যাভিচার, প্রতারণা-ছলনা, হিংসা-বিদ্বেষ, ইর্ষা-অহংকার ও বিভক্তির ভয়ানক আক্রমণে জর্জরিত। উপরিউক্ত করুণ প্রেক্ষাপট থেকে বেরিয়ে না আসলে নির্ভেজাল তাওহীদী দাওয়াত নষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহর অধিকার ভুলুণ্ঠিত হবে। আল্লাহকে অপমান করা হবে। সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। ফলে এক অনিবার্য হুমকির মুখে পতিত হবে মুসলিম উম্মাহ। অতএব মানবতাকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করা এবং অকল্যাণ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পালন হবে সফলতার একমাত্র মানদণ্ড। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلۡتَکُنۡ مِّنۡکُمۡ اُمَّۃٌ یَّدۡعُوۡنَ اِلَی الۡخَیۡرِ وَ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ
‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকবে, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎকাজের আদেশ করবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম’ (সূরা আলি ‘ইমরান : ১০৪)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তুমি বিনয় ও ক্ষমা পরায়ণতার নীতি অবলম্বন কর, লোকদেরকের সৎ কাজের আদেশ দাও এবং মূর্খদেরকে এড়িয়ে চল’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ১৯৯)। ‘মুমিন নারী-পুরুষ একে-অপরের বন্ধু, তারা সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করে’ (সূরা আত-তওবাহ : ৭১)। হাদীছে এসেছে, ‘আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে,
مُرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ وَانْهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ قَبْلَ أَنْ تَدْعُوْا فَلَا يُسْتَجَابَ لَكُمْ
‘তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অন্যায় কাজ হতে নিষেধ কর দু‘আ করার পূর্বে, যখন তা কবুল হবে না’।[৯]
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট, গাজীপুর।
তথ্যসূত্র :
[১]. ইবন মানযূর, লিসানুল আরব, ১ম খণ্ড (কায়রো : দারুল হাদীস, ২০০৩ খ্রি.), পৃ. ৬১৫।
[২]. অধ্যাপক মাওলানা এ.কিউ.এম. ছিফাতুল্লাহ, সিয়ামে রমযান ও তাক্ওয়া (অগ্রপথিক সংকলন-৩, সিয়াম ও রমযান, মুহাম্মদ আবূ তাহের সিদ্দিকী সম্পাদিত, ই.ফা.বা.২০১২, খৃ.), পৃ. ৫৬।
[৩]. অগ্রপথিক সংকলন-৩, সিয়াম ও রমযান, পৃ. ৫৫।
[৪]. আবুল ফিদা ইসমা‘ঈল ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম, ১ম খণ্ড (দারু তাইয়েবা, ১৪২০ হি.), পৃ. ১৬৪।
[৫]. সূরা আল-ফজর, আয়াত : ২৭।
[৬]. মোঃ ওয়াজিদুর রহমান ও মোঃ শাহাবুদ্দিন, ইসলামী শিক্ষা পরিচিতি, ২য় খণ্ড (ঢাকা : পূর্বদেশ পাবলিকেশন্স, ১৯৯৪), পৃ. ২-৫।
[৭]. সুনানুত তিরমিযী, প্রাগুক্ত, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৭৩৫, হাদীছ নং-৩৯৫৬; আহমাদ ইবন হাম্বল, আল-মুসনাদ, প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৬১, হাদীছ নং-৮৭২১।
[৮]. সুনানুত তিরমিযী, প্রাগুক্ত, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৬৩, হাদীছ নং-২০০৪; আল-মুসতাদরাক আলাছ ছহীহাইন, প্রাগুক্ত, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৬০, হাদীছ নং-৭৯১৯।
[৯]. সুনানু ইবনি মাজাহ, প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৩২৭, হাদীছ নং-৪০০৪।