ইসলামী রাষ্ট্রে শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা: একটি পর্যালোচনা
- মূসা ইবরাহীম বিন রঈসুদ্দীন*
ভূমিকা
আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত বিধানাবলী ও ব্যবস্থাই হলো শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার মূল কেন্দ্রবিন্দু। যা স্বত-সিদ্ধ বিধান হিসাবে স্বীকৃত। এজন্য সকল নবী ও রাসূল আল্লাহর বিধি-বিধানের দিকে আহ্বান করেছেন এবং এর মাধ্যমে মানব সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করেছেন। আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মাধ্যমেও আল্লাহর দেয়া জীবন বিধান ইসলামকে পরিপূর্ণ করে বিশ্ব জগতের জন্য তাকে শান্তি ও নিরাপত্তার নবী হিসাবে প্রেরণ করেছেন। তাই তিনি সকল মানুষের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে শান্তি ও নিরাপত্তাই প্রতিষ্ঠা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা শান্তির দ্বীন হিসাবেও ইসলামের নামকরণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ہُوَ سَمّٰىکُمُ الۡمُسۡلِمِیۡنَ ‘তিনি তোমাদেরকে পূর্ব থেকেই মুসলিম হিসাবে নামকরণ করেছেন’ (সূরা আল-হজ্জ : ৭৮)। তাছাড়ও মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে ‘রাহমাতুল লিল ‘আলামীন’ তথা বিশ্ব জগতের রহমত ও করুণার মূর্ত প্রতীক হিসাবে প্রেরণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَ مَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ اِلَّا رَحۡمَۃً لِّلۡعٰلَمِیۡنَ ‘আমরা আপনাকে বিশ্ব জগতের রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ১০৭)। তাই রাসূলের উদ্দেশ্য ছিল শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদিকে মানবতার ইহকালীন শান্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরদিকে তাদেরকে পরকালের প্রশস্থ জীবনে চূড়ান্ত শান্তির আবাস ভূমি জান্নাতে প্রবেশ করানো।
রাসূল (ﷺ)-এর জন্মের পূর্ববর্তী সময় ছিল অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, ভয়-ভীতি, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদির মধ্যে নিমজ্জিত। আল্লাহ তা‘আলা সেই চিত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, وَ اِنۡ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ ‘তারা যদিও ইতোপূর্বে সুস্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে ছিল’ (সূরা আলে ইমরান: ১৬৪)। অন্ধকারে নিমজ্জিত পৃথিবীর সেই ক্রান্তি লগ্নেই নবী (ﷺ) শান্তি ও নিরাপত্তার মশাল নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন। হাজার হাজার বছরের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, যুল্ম, ভীতি, নিরাপত্তাহীনতা, শোষণ ও বর্বরতার আগ্নেয়গিরি মুহূর্তের মধ্যেই নিভে গিয়েছিল। তাঁর আলোতে বিশ্বজগৎ আলোকিত হয়েছিল। তাঁর জন্ম থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি স্তরে তিনি শান্তি, নিরাপত্তা, ন্যায়-নীতি ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পুরিপুরি সক্ষম হয়েছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, ৯০ ভাগ মুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে এদেশে শান্তি ও নিরাপত্তার সেই সোনার হরিণটি আজ খুঁজে পাওয়া যায় না। কোথায় শান্তি ও নিরাপত্তার লেশমাত্রা পাওয়া যায় না। এজন্য শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা হওয়া যরূরী।
১.১ শান্তি ও নিরাপত্তা পরিচিতি
মানব জীবনের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শান্তি ও নিরাপত্তা। আরবীতে ‘সালাম’ শব্দের অর্থ ‘শান্তি’।[১] এ অর্থে আল্লাহ তা‘আলার একটি গুণবাচক নাম হলো ‘আস্-সালাম’ (সর্বময় শান্তি)।[২] যেমন ছালাত শেষে দু‘আর মধ্যে পড়তে হয়, ‘আল্লাহুম্মা আংতাস সালাম, ওয়া মিংকাস সালাম ..., অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আপনিই মহাশান্তি, আপনার নিকট থেকেই শান্তি ...’।[৩] অপরদিকে ‘ঈমান’ শব্দের মধ্যেও রয়েছে ‘আমন’, যার অর্থ, নিরাপত্তা; সমাজ ও সমাজের সকল মানুষের শান্তি অনুভব করা এবং স্বাচ্ছন্দ্য জীবন যাপন করার পরিবেশ থাকাই হল নিরাপত্তা। যেখানে কোন ধরন ও প্রকারের ভীতি, সন্ত্রস্ততা ও অস্থিরতার লেশমাত্র উপস্থিত থাকবে না। অভিধানবেত্তাগণ الأمن শব্দটি কয়েকটি অর্থে ব্যবহার করেছেন। যেমন,
(١) عدم الخيانة فالأمن
والأمان والأمانة والمنة نقيض الخوف ولذا يقال أمن فلان يأمن أمنا وأمنا إذا لم
يقف وقد أمنته ضد أخفته ورجل أمنته أو يأمن من
كل واحد وقيل يأمنه الناس ولا يخافون غائلته
১. ‘বিশ্বাসঘাতকতা না করা : الأمن শব্দটি الأمن والأمان والأمانة والمنة বিভিন্নভাবে পড়া যায়। আম্ন হল, ভয় এর বিপরীত। এজন্য বলা হয়ে থাকে, أمن فلان يأمن أمنا وأمنا অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি নিরাপত্তা লাভ করল, যখন সে দাঁড়ায়নি। কখনো ‘নিরাপত্তা’ বলতে ‘ভয়’-এর বিপরীতকে বুঝায়। (যেমন বলা হয়ে থাকে) ব্যক্তিটির নিরাপত্তা অথবা সেই ব্যক্তি প্রত্যেকের চেয়ে নিরাপদ এবং এও বলা হয়ে থাকে যে, মানুষেরা তার থেকে নিরাপদ থাকে, তারা তার থেকে বিপদের আশঙ্কা করে না’।[৪]
ورجل أُمَنَةٌ وأَمَنَةٌ أي يأمَنُ كُلَّ أحدٍ وقيل يأمنه الناس ولا يخافون غائلته ‘ أُمَنَةٌ وأَمَنَةٌ উভয়ভাবেই পড়া যায়। অর্থাৎ সে লোকটি প্রত্যেককে নিরাপদ রাখে এবং বলা হয়ে থাকে, তার থেকে মানুষেরা নিরাপদ থাকে এবং তারা তার থেকে বিপদের আশঙ্কা করে না’।[৫]
(٢) التصديق : فأصل الإيمان التصديق وهو مصدر
أمن يؤمن إيمانا فهو مؤمن وقد اتفق أهل العلم علي ما يذكر ابن منظور : أن الإيمان
معناه التصديق وضد الكذب وقيل التكذيب ويقال رجل أمنة للذي يصدق كل ما يسمع ولا
يكذب بشئ وأمن بالشئ صدق به وأمن كذب من أخبره.
২. ‘সত্যায়ন করা : الإيمان এর মূল হলো التصديق বা সত্যায়ন করা। এটি أمن يؤمن إيمانا فهو مؤمن এর মাছদার। ইবনু মানযূর (রাহিমাহুল্লাহ) এ প্রসঙ্গে যা বলেছেন সে ব্যাপারে আহলে ইলম ঐকমত্য করেছেন। নিশ্চয় ‘ঈমান’ অর্থ التصديق বা সত্যায়ন করা, যা মিথ্যার বিপরীত। বলা হয়ে থাকে, মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। যেমন ঐ ব্যক্তিকে বিশ্বস্ত বলা হয়, যে ব্যক্তি যা শুনে সত্যসত্যি তাই বলে, তার সাথে মিথ্যা মিশ্রিত করে না। যা সত্য বলা হয়েছে সে বিষয়ে সে নিরাপত্তা অর্জন করেছে এবং সে মিথ্যা থেকে নিরাপদ থেকেছে, যে বিষয়ে তাকে সংবাদ দেয়া হয়েছে’।[৬]
(٣) الحفظ : فقد قيل إن الأمنة وهي جمع أمين
هم الحفظة والمفرد الحافظ وأصل الحفظ الأمن من خوف الضياع وقيل هو الحافظ الحارس
والمأمون هو من يتولي رقابة الشئ والحفاظ عليه.
৩. সংরক্ষণ করা : বলা হয়ে থাকে, الأمنة শব্দটি أمين এর বহুবচন। এখানে الحفظة শব্দটি বহুবচন যার একবচন حافظ। আর الحفظ এর মূল হল, নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় থেকে নিরাপদ থাকা এবং বলা হয়ে থাকে, الحافظ হল, এমন জিম্মাদার ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি যিনি কোন কিছুর তত্ত্বাবধান করেন এবং তা সংরক্ষণ করেন।[৭]
(٤) الطمأنينة : فالرجل الأمنة هو من يطمئن
ألي كل واحد ويثق بكل أحد. وكذالك الرجل الأمنة وأمن البلد هو من يطمئن به أهله.
৪. ‘প্রশান্তি : এমন বিশ্বস্ত ব্যক্তি, যে প্রত্যেকের নিকট প্রশান্তির কারণ হয় এবং প্রত্যেকের কাছে বিশ্বস্ত হয়। অনুরূপভাবে বিশ্বস্ত ব্যক্তি ও শহরের বিশ্বস্ত ব্যক্তি হলেন, যার দ্বারা তার পরিবার প্রশান্তিতে থাকে’।[৮]
(٥) عدم الخيانة : فالأمين هو المؤتمن وهو
الذي لا يخون وقيل الأمين هو المأمون وأمنتة علي كذا وائتمنته بمعني لأن يؤمن أذاه
وقد تقع الأمانة علاوة علي ذلك علي الطاعة والعبادة والوديعة والبقاء والأمان.
৫. খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা না করা: অতঃপর আমীন হলেন এমন বিশ্বাসী, যিনি কখনো খিয়ানত করেন না এবং বলা হয়ে থাকে, আমীন হলেন এমন বিশ্বস্ত ব্যক্তি, এ বিষয়ে যার বিশ্বস্ততা রয়েছে এবং তা সন্তোষজনক। অর্থাৎ তার ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকা। কখনো কখনো আমানত অতিরিক্ত হিসাবে আনুগত্য, ইবাদত, জিম্মাদারী, স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা অর্থের উপরও বুঝায়’।[৯]
(٧ ) الدين : فالرجل
الأمين أيضا هو الذي له دين وقيل مأمون به ثقة ويقال أمنتك وأمنك أي دينك وخلقك
والتاجر الأمين هو ذو الدين والفضل.
৬. দ্বীন : বিশ্বস্ত ব্যক্তি হলেন, যার মধ্যে দ্বীন রয়েছে এবং বলা হয়ে থাকে, ব্যক্তিটি সে বিষয়ে বিশ্বস্ত এবং এও বলা হয়ে থাকে যে, তোমার আমানত এবং বিশ্বস্ততা অর্থাৎ তোমার দ্বীন ও চরিত্র। বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী হলেন, যিনি দ্বীন ও অনুগ্রহশীল’।[১০]
পারিভাষিক অর্থ বর্ণনায় ড. ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্দুল মুহসিন আত-তুরকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
وهو الأمن الذي يعني السلامة والاطمئنان النفسي، وانتفاء الخوف على حياة الإنسان، أو على ما تقوم به حياته من مصالح وأهداف وأسباب ووسائل، أي ما يشمل أمن الإنسان الفرد، وأمن المجتمع
‘আম্ন বা নিরাপত্তা হল, অন্তরের শান্তি ও আস্থা এবং মানব জীবনে ভয়হীনতা অথবা মানব জীবনে সন্ধি, উদ্দেশ্য, কারণ ও মাধ্যমসমূহ বাস্তবায়নে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া। এককথায়, একজন ব্যক্তি ও তার সমাজের সার্বিক নিরাপত্তাকে আম্ন বলা হয়’।[১১]
মুসলিমরা প্রথম মুসলিম সমাজের সূচনা থেকেই এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এ বিশ্বাস পোষণ করে এসেছে যে, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহই সমাজব্যবস্থার মূল ভিত্তি এবং এর ওপরই সমাজের কাঠামো প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং ইসলাম কেবল একটি ধর্মীয় আক্বীদা নয়; বরং এটি নৈতিকতা, চরিত্র ও আচরণবিধির একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা এবং ব্যক্তি ও সমাজের জন্য একটি সামাজিক জীবনব্যবস্থা। সমাজের ভেতরে ব্যক্তি ও ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সম্পর্ক, মুসলিম সমাজ ও অন্যান্য সমাজের পারস্পরিক সম্পর্কÑ তা সে শান্তিপূর্ণ হোক বা বৈরীÑ তারা ইসলাম মেনে চলুক বা ভিন্ন বিশ্বাসে আস্থাশীল হোকÑ সব ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই ইসলাম দিকনির্দেশনা প্রদান করে। অতএব পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহতে যা এসেছেÑ সেটিই ইসলামের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি।
১.২ ইসলামে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব
ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবতার জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তার গুরুত্ব অপরিসীম। মানবতার সকল ক্ষেত্রে সকল প্রকার উন্নতি, সমৃদ্ধি এবং সার্বিক ও সর্বজনীন অগ্রগতির ভিত্তি হল শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা। এ দিকে ইঙ্গিত করেই মহান আল্লাহ খাদ্যের নিশ্চয়তার সাথে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানকে মানুষের জন্য তাঁর করুণা ও অনুগ্রহ বলে ব্যক্ত করেছেন। তিনি মক্কাবাসীদের লক্ষ্য করে বলেন,
فَلۡیَعۡبُدُوۡا رَبَّ ہٰذَا الۡبَیۡتِ ۙ﴿۳﴾الَّذِیۡۤ اَطۡعَمَہُمۡ مِّنۡ جُوۡعٍ ۬ۙ وَّ اٰمَنَہُمۡ مِّنۡ خَوۡفٍ
‘তারা যেন অবশ্যই এই ঘরের (কা‘বা ঘর) মালিকের ‘ইবাদাত করে, যিনি তাদেরকে ক্ষুধার সময় খাদ্য এবং ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন’ (সূরা আল-কুরাইশ : ৩-৪)। ইসলামী শরী‘আতের উদ্দেশ্যসমূহের অন্যতম উদ্দেশ্য হল নিরাপত্তা বিধান করা। বিশেষজ্ঞগণ অত্যন্ত যরূরী ও অত্যাবশ্যক উদ্দেশ্যকে ৬টি বিষয়ের নিরাপত্তা বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন। সেগুলো হলো; ধর্ম, জীবন, বংশ, সম্পদ, বুদ্ধিমত্তা ও সম্মানের সংরক্ষণ করা ও এগুলোর নিরাপত্তা বিধান করা। ফলে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং মানুষ পরিপূর্ণ শান্তি ও তৃপ্তির সাথে বসবাস করবে। মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে, ভাল মানুষ সুখ-শান্তিতে জীবনযাপন করবে আর দুর্বল মানুষও যেখানে ভালেবাসা, সহযোগিতা বন্ধুত্বভাব অর্জন করবে।
১.২.১ আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ পালন
ইসলাম মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছে। এ ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশনা সুস্পষ্ট। তিনি উদাত্ত আহ্বান করেছেন যে, হে মানব সকল! তোমরা সৃষ্টিকর্তার বিধি-বিধান ও ব্যবস্থার সাথে একমত পোষণ কর। তাতে সকল মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। নিরাপত্তা লাভ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
تَعَالَوۡا اِلٰی کَلِمَۃٍ سَوَآءٍۢ بَیۡنَنَا وَ بَیۡنَکُمۡ
‘তোমরা এমন একটি কথার (ব্যবস্থা) দিকে আস, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান’ (সূরা আলি ‘ইমরান : ৬৪)। আল্লাহর এ আহ্বানে তারা যদি সাড়া না দেয় তাহলে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায়ের স্বার্থে তাদেরকে তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, لَکُمۡ دِیۡنُکُمۡ وَلِیَ دِیۡنِ ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য আর আমার ধর্ম আমার জন্য’ (সূরা আল-কাফিরুন : ৬)। শুধু তাই নয়, অশান্তি, অস্থিরতা ও ভীতির অবস্থা, বিশৃংখলা, বিপর্যয়ের সৃষ্টি যাতে না হয় ও নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয় সেজন্য যারা অন্যান্য ধর্ম, দেব-দেবতা ও ব্যবস্থার অনুসরণ করে থাকে তাদেরকে গালি দিতে পর্যন্ত নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, وَ لَا تَسُبُّوا الَّذِیۡنَ یَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ ‘যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের ডাকে তোমরা তাদেরকে গালি দিও না’ (সূরা আল-আন‘আম : ১০৮)। এছাড়া নবী করীম (ﷺ) এ বিষয়টিকে আরো সূক্ষ্ম ও সর্বজনীনভাবে পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, الْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ ‘প্রকৃত মুমিন হল সে ব্যক্তি যার কাছে মানুষরা তাদের রক্ত ও সম্পদের নিরাপত্তা লাভ করে’।[১২] এ শান্তির ভাব তৈরি ও বজায় রাখার জন্য আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সুন্দর পন্থা শিখিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, كُوْنُوْا عِبَادَ اللهِ إِخْوْانًا ‘তোমরা সকলে আল্লাহর বান্দা হিসাবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও’।[১৩]
১.২.২. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অনুসরণ
ইসলাম ও নবীর বিদ্যালয় থেকে মানব জাতির যে প্রজন্ম শিক্ষা অর্জন করেছে, আবার নিষ্ঠার সাথে যারা তাদের অনুসরণ করেছে এবং করছে তারা সকলেই এর চির শাশ্বত মহান শিক্ষার সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে কার্যকরী করেছে। এমনকি ঘোষিত যুদ্ধের ময়দানেও তারা দুর্বল, বৃদ্ধ, নারী, শিশু ও নিরীহ সাধারণ মানুষদের সাথে অসদাচরণ করতেন না। গাছ, শস্য ফল-ফলাদি ইত্যাদি নষ্ট করতেন না। তারা ইসলাম ও তাদের নবীর শিক্ষা ও যুদ্ধ নীতির সামান্যতম সীমালঙ্ঘনও করতেন না। নিহত ব্যক্তির অঙ্গহানি করতেন না। মরদেহের সাথে অসম্মানজনক ব্যবহার করতেন না। প্রতিপক্ষ শক্তি যখন সন্ধি করার ইচ্ছা ব্যক্ত করতো তখন আল্লাহর নির্দেশের আলোকে সঙ্গে সঙ্গেই মুসলিমগণ তাদের সাথে সন্ধি করে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اِنۡ جَنَحُوۡا لِلسَّلۡمِ فَاجۡنَحۡ لَہَا وَ تَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ ؕ اِنَّہٗ ہُوَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ ‘তারা যদি সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে আপনিও তার দিকে ঝুঁকে পড়বেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করবেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’ (সূরা আল-আনফাল : ৬১)। আর চুক্তিবদ্ধ পক্ষের সাথে কখনো আগে চুক্তি ভঙ্গ করতেন না।
ইসলাম নিরস্ত্র বেসামরিক লোকদের সাথে যুদ্ধ করতে নিষেধ করে। বরং সশস্ত্র ব্যক্তিরাও যদি চুক্তিতে এগিয়ে আসে তাহলে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন,
فَاِنِ اعۡتَزَلُوۡکُمۡ فَلَمۡ یُقَاتِلُوۡکُمۡ وَ اَلۡقَوۡا اِلَیۡکُمُ السَّلَمَ ۙ فَمَا جَعَلَ اللّٰہُ لَکُمۡ عَلَیۡہِمۡ سَبِیۡلًا
‘অতঃপর তারা যদি তোমাদের কাছ থেকে সরে দাঁড়ায়, তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে এবং তোমাদের নিকট শান্তি প্রস্তাব করে তবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা অবলম্বনের পথ রাখেননি’ (সূরা আন-নিসা : ৯০)।
১.২.৩ ন্যায়বিচারই নিরাপত্তা
রক্তপাত এড়ানো এবং শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টির মহৎ উদ্দেশ্য ও দূরদৃষ্টি নিয়ে সাথীদের চরম ক্ষোভ ও অসমর্থন থাকা সত্ত্বেও নতজানু ও স্পষ্টত অপমানজনক শর্তগুলো মেনে নিয়ে আল্লাহর নবী (ﷺ) হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন। মক্কা বিজয়ের সময়েও নবী (ﷺ), তাঁকে ও তাঁর সাথী মুসলিমদের যারা অবর্ণনীয় নির্যাতন করেছে, জীবন, ধন-সম্পদ কেড়ে নিয়েছে, তাদেরকেও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। এ সবকিছুই ছিল শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। রক্তপাত, ধন-সম্পদের ক্ষতি সাধন, ভীতিকর, অস্বস্তিকর, বিশৃংখলা সৃষ্টির পথকে রুদ্ধ করে দেয়। এজন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবতার প্রতি সম্মানবোধের প্রতি ইসলামের সর্বোচ্চ গুরুত্ব এই পর্যায় পৌঁছেছে যে, কোন মানুষকে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে হত্যার দোষে দোষী হওয়ার অপরাধে হত্যা করার কারণ ছাড়া যদি হত্যা করা হয়, তাতে যেন সকল মানুষকে হত্যা করার শামিল হয়। পক্ষান্তরে একজন মানুষকে জীবিত রাখা যেন সকল মানুষকে জীবিত রাখা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
مَنۡ قَتَلَ نَفۡسًۢا بِغَیۡرِ نَفۡسٍ اَوۡ فَسَادٍ فِی الۡاَرۡضِ فَکَاَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِیۡعًا ؕ وَ مَنۡ اَحۡیَاہَا فَکَاَنَّمَاۤ اَحۡیَا النَّاسَ جَمِیۡعًا
‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণ ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন সকল মানুষকেই হত্যা করলো আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৩২)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
وَ لَا تَقۡتُلُوا النَّفۡسَ الَّتِیۡ حَرَّمَ اللّٰہُ اِلَّا بِالۡحَقِّ ؕ وَ مَنۡ قُتِلَ مَظۡلُوۡمًافَقَدۡ جَعَلۡنَا لِوَلِیِّہٖ سُلۡطٰنًا
‘আর আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না। কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমরা তার প্রতিকারের অধিকার দিয়েছি’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৩৩)। এখানে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে, ‘যথার্থ কারণ ছাড়া’ ন্যায়সঙ্গতভাবে এ বিষয়টি নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র ও এর বিচার বিভাগ। এর অর্থ কোনভাবেই এটা নয় যে, ব্যক্তি আইন নিজের হাতে তুলে নেবে। তাহলে তো সমাজে আরো বেশি বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে, যা ইসলামী নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট, গাজীপুর।
তথ্যসূত্র :
[১]. ডা. জাকির নায়েক, লেকচার সমগ্র, (ঢাকা : সোলেমানীয় বুক হাউস, ৫ম মুদ্রণ, জানুয়ারী, ২০১৫), পৃ. ৮৬১।
[২]. তিরমিযী, হা/৩৫০৭; মিশকাত, হা/২২৮৮।
[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৯১; আবূ দাঊদ, হা/১৫১২; মিশকাত, হা/৯৬০।
[৪]. মুস্তফা মাহমুদ মানজুদ, আল-আব‘আদুস সিয়াসাতি লি মাফহূমিল আমনি ফিল ইসলাম, পৃ. ৩০।
[৫]. আবুল হাসান আলী ইবন ইসমা‘ঈল ইবন সীদাহ, আল-মুহকামু ওয়াল মুহীতুল ‘আযাম, ১০তম খণ্ড, পৃ. ৪৯২; লিসানুল আরব, ১৩ তম খণ্ড, পৃ. ২১; মাকাইসুল লুগাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৩৮।
[৬]. আল-আব‘আদুস সিয়াসাতি লি মাফহূমিল আমনি ফিল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০; লিসানুল আরব, ১৩ তম খণ্ড, পৃ. ২১।
[৭]. আল-আব‘আদুস সিয়াসাতি লি মাফহূমিল আমনি ফিল ইসলাম, পৃ. ৩০।
[৮]. আল-আব‘আদুস সিয়াসাতি লি মাফহূমিল আমনি ফিল ইসলাম, পৃ. ৩০-৩১।
[৯] তদেব, পৃ. ৩১।
[১০] তদেব।
[১১] ড. ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্দুল মুহসিন আত-তুরকী, আল-আমনু ফী হায়াতিন নাস ওয়া আহমিয়াতিহি ফিল ইসলাম, পৃ. ৭।
[১২]. মুহাম্মাদ ইবন ইয়াযীদ আল-কাযভীনী, সুনানু ইবনি মাজাহ, ২য় খণ্ড (বৈরূত : দারুল ফিকর, তা.বি.), পৃ. ১২৯৮, হাদীছ নং-৩৯৩৪।
[১৩]. মুহলিম ইবনুল হাজ্জাজ আবুল হুসাইন আল-কুশাইরী আন-নাইসাপুরী, সহীহ মুসলিম, ৪র্থ খণ্ড (বৈরূত : দারু ইহইয়াইত তুরাসিল ‘আরাবী, তা.বি.), পৃ. ২৫৫৮, হাদীছ নং-২৫৫৮; আহমাদ ইবন হাম্বল আবূ ‘আব্দিল্লাহ আশ-শাইবানী, আল-মুসনাদ, ২য় খণ্ড (কায়রো : মুওয়াসাসাতু কুরতুবা, তা.বি.), পৃ. ৪৬৫, হাদীছ নং-১০০০২।