বুধবার, ১৭ Jun ২০২৬, ০২:৩৪ অপরাহ্ন

মু‘তাযিলা মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ 

-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম* 


(৫ম কিস্তি)  

মু‘তাযিলাদের আবির্ভাব ও তাদের চিন্তাধারার প্রসারের কারণসমূহ

মু‘তাযিলা সম্প্রদায়ের আবির্ভাব এবং তাদের চিন্তাধারার বিস্তারের বিভিন্ন কারণ রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম  হলো:

১. মুসলিমদের মধ্যে মতবিরোধের সমস্যার সমাধান

বিজয়ের গতি থেমে যাওয়া এবং মুসলিমদের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর তাদের মধ্যে নানা সামাজিক সমস্যা দেখা দেয়। এসব সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা যরূরী হয়ে পড়ে, যা ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এই সমস্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল এমন লোকদের অবস্থা, যারা বড় গুনাহ (কবিরা গুনাহ) করে, যা শিরক (মুশরিক হওয়া) ছাড়া অন্য কিছু। কারণ, মুসলিম নেতৃত্বে মতভেদের কারণে এবং খলীফা উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাহাদাত ও আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সঙ্গে জামাল যুদ্ধে এবং পরে মুয়াবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে বড় গুনাহে লিপ্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। মুসলিমরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে একে অপরকে কাফের বলে দোষারোপ করতে থাকে। এরপর, মুসলিমরা ফতেহের কাজ থেকে সরে গিয়ে পরস্পরকে গালাগাল ও দোষারোপে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফতে হওয়ার পর মুসলিমরা মরুভূমির সীমাবদ্ধ পরিসর থেকে এক বিস্তৃত সমাজে প্রবেশ করে, যেখানে অনেক বিলাসিতা, আমোদ-প্রমোদের উপকরণ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ ছিল।

এই অবস্থায় বিশেষ করে আলেম ও বিদ্বানদের মন ক্ষুণ্ন হয়। তারা দেখতে পান, মুসলিমরা খোলামেলা গুনাহ করছে, এমনকি একে অপরকে হত্যা করছে বিনা কারণে। এই বিষয়গুলো তাদের ভাবিয়ে তোলে, তাই তারা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করে, যার ফলে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়, বিতর্ক বাড়ে এবং নানা মতের উদ্ভব ঘটে।

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আহ এর মতে, ‘যারা বড় গুনাহ করে, কিন্তু শিরক করে না, তারা মুমিন। তাদের গুনাহ তাদের ঈমান থেকে বের করে দেয় না এবং তারা কাফেরও হয় না, কারণ ঈমানের মূল ভিত্তি (তাছদীক তথা বিশ্বাস ও হৃদয় দ্বারা স্বীকৃতি) তাদের মধ্যে আছে। তবে, তারা তাদের গুনাহর জন্য শাস্তি পাবে। দলীল হিসেবে তারা পেশ করেন মহান আল্লাহর বাণী, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও ছাহাবীদের অবস্থান।

মহান আল্লাহ আল-কুরআনের অসংখ্য জায়গায় গুনাহগারদের ঈমানদার বা মুমিন বলে সম্বোধন করেছেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الۡقِصَاصُ فِی الۡقَتۡلٰی ‘হে ঈমানদারগণ! হত্যার ব্যাপারে তোমাদের ওপর কিছাছ (প্রতিশোধ) ফরয করা হয়েছে’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৭৮)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, یٰۤاَیُّہَا  الَّذِیۡنَ  اٰمَنُوۡا تُوۡبُوۡۤا  اِلَی اللّٰہِ تَوۡبَۃً  نَّصُوۡحًا ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করো’ (সূরা আত-তাহরীম : ৮)।

নবী (ﷺ)-এর যুগ থেকে ছাহাবাদের সময় পর্যন্ত গোটা মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্য ছিল যে, এমন মুসলিম ব্যক্তি যদি মারা যায় যে প্রকাশ্য গুনাহ করত, কিন্তু তাওবা করেনি, তবুও তাঁরা তাঁর জানাজা পড়ত, তাঁর জন্য দু‘আ করত এবং মুসলিম কবরস্থানে দাফন করত। অথচ তাঁরা তাঁর অবস্থাও জানত।

খারিজিগণ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের এই মতকে গ্রহণ করেনি। তারা কুরআন-সুন্নাহ পরিত্যাগ করে নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে অন্য মত পোষণ করে। তারা বিশ্বাস করতো যে, ‘ছোট হোক বা বড়, যে কোনো গুনাহের কারণে ব্যক্তি কাফের হয়ে যায় এবং এর ফলে গুনাহগার ব্যক্তি চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। কারণ, তারা মনে করত, আমল ছাড়া ঈমান সম্পূর্ণ হয় না’।[১]

খারিজিগণ যেমন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মতের বিরোধিতা করেছে, তেমনি মুরজিয়ারা খারিজিদের মত প্রত্যাখ্যান করে আরেকটি মত পেশ করে, যা খারিজিদের প্রতি একটি প্রতিক্রিয়া স্বরূপ। তারা বলে, ‘নিশ্চয় ঈমান হলো দ্বীনের মূল এবং আমল ঈমানের অংশ নয়, তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, কোনো ব্যক্তি যদি বড় গুনাহও করে, তবুও সে মুমিন। আর তার গুনাহর বিচার ক্বিয়ামতের দিনে আল্লাহ করবেন। তারা বিশ্বাস করত যে, ঈমান থাকলে কোনো গুনাহ ক্ষতি করতে পারে না, যেমন কুফরের সঙ্গে কোনো নেক আমল উপকার করে না’।[২]

এরপর, ইসলামী ফের্কাগুলোর মধ্যে মতভেদ বাড়ে, তর্ক-বিতর্ক তীব্র হয় এবং বসরা ও অন্যান্য জায়গার মসজিদে মতবিনিময় ও বিতর্কের আসর বসতে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিল হাসান বসরী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আসর। এই পরিবেশেই মু‘তাযিলা দল আবির্ভূত হয়।

মুসলিম সমাজে যারা বড় গুনাহ করে, তাদের বিষয়ে প্রচলিত মতগুলো সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না, তাই নতুন মত প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। তখন হাসান বসরীর শিষ্য ওয়াছিল বিন ‘আতা মনে করলেন, তিনি পূর্ববর্তী মতগুলোর চেয়ে উত্তম মত দিতে পারবেন। তিনি মনে করতেন যে, আমল ঈমানের অংশ। আর কুরআন ও হাদীছ অনুযায়ী, যারা প্রকৃত মুমিন, কাফের বা মুনাফিক্ব এদের বৈশিষ্ট্য একজন বড় গুনাহকারী ব্যক্তির উপর প্রযোজ্য হয় না। তাই তিনি মত দেন, বড় গুনাহকারী ব্যক্তি মুমিনও নয়, কাফেরও নয়; বরং ঈমান ও কুফরের মাঝখানের একটি অবস্থানে আছে।

আমরা আগেই বর্ণনা করেছি, যখন এক ব্যক্তি হাসান বসরী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আসরে এসে বড় গুনাহকারীর বিষয়ে মত জানতে চায় কারণ, সে খারিজি ও মুরজিয়া উভয়ের বিপরীত মত দেখেছিল, তখন হাসান বসরী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উত্তর দেওয়ার আগেই ওয়াছিল বিন ‘আতা উত্তর দেন এবং বলেন, বড় গুনাহকারী ব্যক্তি মুমিন নয়, কাফেরও নয়’। তারপর তিনি উঠে মসজিদের এক কোণায় গিয়ে বসে যান। সেখানে ‘আমর ইবনু উবাইদ এবং আরও অনেকে তার সঙ্গে যোগ দেন। তখন হাসান বসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, ‘ওয়াছিল আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল’। এখান থেকেই ওয়াছিল ও তার অনুসারীদের বলা হয় মু‘তাযিলা।

বলা যায় যে, তৎকালিন সময়ে বিভিন্ন ফেতনার আবির্ভাব ঘটে। মু‘তাযিলারা এসব সমস্যার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করে এবং এমন মত তৈরি করে যা তারা মনে করেছিল সবাইকে সন্তুষ্ট করবে, সবাই গ্রহণ করবে এবং মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টোটা। তারা এমন সব মত ও নতুন আক্বীদা তৈরি করেছিল, যা কুরআন ও হাদীছের বিরোধী ছিল এবং সালাফদের বিপরীত ছিল। ফলে মুসলমানরা তাদের এসব বিদ‘আত ও বিভ্রান্ত মতবাদ রুখতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং মূল সমস্যাগুলোর সমাধান থেকে দূরে সরে যায়। তবুও এটুকু বলা যায়, মুসলিম সমাজে যে সংকট ও দ্বন্দ্ব ছিল, সেটিই এই ফের্কার (মু‘তাযিলা) জন্ম নেওয়ার পটভূমি তৈরি করেছিল এবং সেই সাথে তাদের চিন্তা ও মতবাদ প্রচার ও প্রসার লাভের সুযোগ করে দিয়েছিল, যেমনটা অন্য বিভ্রান্ত ফের্কাগুলোর ক্ষেত্রেও ঘটেছে।[৩]

২. অন্যান্য ধর্মের প্রভাব

আরব উপদ্বীপে ইসলামের সূর্যোদয় ঘটেছিল; কিন্তু ইসলাম কেবল ওই উপদ্বীপেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, অচিরেই মুসলমানরা সেখান থেকে বেরিয়ে যুদ্ধের মাধ্যমে পূর্বপ্রাচ্যের অধিকাংশ অঞ্চলকে নিজেদের অধীনে নিয়ে আসে। তারা যেসব দেশ জয় করেছিল, সেখানে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ বাস করত।

সিরিয়া ও মিশরে খ্রিস্টধর্ম ও ইয়াহুদীধর্ম ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল, আর ইরাক ও পারস্যে ছিল দ্বৈতবাদ, জরথুস্ট্রবাদসহ অন্যান্য মতবাদ। তাই মুসলমানদের ওই ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে বসবাস করতে হয়েছিল এবং তাদের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রাখতেই হতো। এর ফলে মুসলমানরা তাদের চিন্তাধারা ও মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং এই নির্বিচার মেলামেশা ও প্রভাবের কারণে ইসলামে কিছু বিশ্বাস ঢুকে পড়ে, যা পূর্ববর্তী ইসলামি নেতারা কখনো অনুমোদন করতেন না এবং যা তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য ছিল না।

এই প্রভাব বিভিন্ন উপায়ে প্রকাশ পায়। এর মধ্যে একটি ছিল প্রাচীন কিছু গ্রন্থের অনুবাদ, যা মূলত পারস্য, ভারত, গ্রিক ও রোমানদের জ্ঞান ও দর্শনভিত্তিক গ্রন্থ ছিল। এসব গ্রন্থে এমন সব বিজ্ঞান ও দর্শনের উপাদান ছিল, যা মুসলিমদের বিশ্বাসে প্রভাব ফেলে এবং তাদের বিতর্কে জড়িয়ে ফেলে, যেখানে মু‘তাযিলাদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বড়, কারণ তারা ‘কালাম’ বা ধর্মীয় যুক্তিবিদ্যার ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিল।

আরেকটি উপায় ছিল: অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলামে প্রবেশ। তারা নানা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আসত, যা মুসলমানদের বিশ্বাসে প্রভাব ফেলত। এই ধর্মান্তরিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল।

কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করে তাদের পূর্ব বিশ্বাস ত্যাগ করলেও, তারা না জেনেই কিছু পুরনো বিশ্বাস ছড়িয়ে দেয়, যা মুসলিমদের চিন্তাধারায় প্রভাব ফেলে।

কেউ ইসলাম গ্রহণ করে প্রকৃত ঈমান আনে না, বরং পার্থিব স্বার্থে অর্থ বা পদ পাওয়ার জন্য। আবার কেউ কেউ ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ থেকে ইসলাম গ্রহণ করে, যারা পরাজিত হয়েছে এবং তাদের রাজত্ব ধ্বংস হয়েছে, সেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা নিয়ে তারা ইসলাম গ্রহণ করে, কিন্তু অন্তরে ইসলাম বিদ্বেষ পোষণ করতে থাকে। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এবং এমন সব চিন্তা-ধারা ছড়ায়, যা ইসলামি বিশ্বাসের পরিপন্থী, ইসলামকে বিকৃত করার ও দুর্বল করার উদ্দেশ্যে।

আরেকদল ছিল যারা তাদের নিজ ধর্মে অটল থাকে, কারণ ইসলাম তাদের উপাসনার স্বাধীনতা দিয়েছিল এবং যতক্ষণ তারা জিজিয়া (কর) দিত, ততক্ষণ তাদের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করত না।

যখন উমাইয়া খিলাফতের শাসন শক্তিশালী হলো এবং তাদের শাসনব্যবস্থা বিস্তৃত হলো, তখন দেখা গেল যে, আরবদের প্রশাসনিক দক্ষতা যথেষ্ট নয়। তাই তারা বাধ্য হয় শিক্ষিত অমুসলিমদের ওপর নির্ভর করতে, যারা পারস্য ও বাইজান্টাইন সভ্যতা থেকে জ্ঞান অর্জন করেছিল। তাদেরকে দাফতরিক কাজে নিযুক্ত করা হয়। এইভাবে তারা মুসলমানদের মাঝে বসবাস করত এবং তাদের সঙ্গে মেলামেশা করত। এই মেলামেশা চিন্তা-ভাবনার আদান-প্রদান ঘটায়, আর চিন্তা ও মতামত খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ বলা যায়, অন্যান্য ধর্মগুলোর চিন্তাধারা ও বিশ্বাস মু‘তাযিলা মতবাদের আবির্ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এটি জানা যায় যে, ওই ধর্মগুলোর অনুসারীরা মুসলমানদের মধ্যে এমন সব গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় (আধ্যাত্মিক) প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, যা মুসলমানদের চিন্তায় আগে কখনো আসেনি। তবে ইসলামের প্রথম যুগের সালাফ এসব প্রশ্ন নিয়ে ভীত ছিলেন ও সেগুলো থেকে দূরে থাকতেন এবং সাধারণ মানুষকেও এসব বিষয়ে আলোচনা করতে নিষেধ করতেন। কারণ তারা কুরআন ও হাদীছকেই জীবন পরিচালনার জন্য যথেষ্ট মনে করতেন, তাই তারা মনে করতেন অন্য কোনো অতিরিক্ত ধর্মীয় গবেষণার দরকার নেই।

কিন্তু এসব ধর্মীয় প্রশ্ন নিয়ে গবেষণা বন্ধ থাকেনি বেশি দিন। অচিরেই মুসলমানদের মধ্যে কিছু মানুষ উঠে আসে, যাদের মধ্যে ছিল সাহস ও জানার আগ্রহ। তারা এসব প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করে এবং ইসলামের শিক্ষার সাথে এসবের তুলনা করতে থাকে। এই ব্যক্তিরাই ছিলেন ‘মু‘তাযিলা’ এবং তাদের পূর্বসূরীরা ছিলেন ‘ক্বাদরিয়া’ বা ‘জাহমিয়া’ মতবাদের অনুসারীরা।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইয়াহুদিদেরও মু‘তাযিলা মতবাদের উদ্ভবের পেছনে কিছুটা প্রভাব ছিল। কারণ তারাই ‘কুরআন সৃষ্ট’ মতবাদটি ছড়িয়ে দিয়েছিল। ইবনুল আছির বর্ণনা করেন, এই মতবাদ সর্বপ্রথম প্রচার করেছিলেন লাবিদ ইবনুল আসাম, যিনি ছিলেন নবী মুহাম্মদের (ﷺ)-এর শত্রু এবং তিনি বিশ্বাস করতেন যে, তাওরাত সৃষ্টি।[৪] পরে তার ভাগিনা তালুত তার থেকে এই মতটি গ্রহণ করে কুরআন সৃষ্টি বিষয়ে রচনা করেন। সেই প্রথম ব্যক্তি, যে ইসলামের মধ্যে এই ধরণের চিন্তা নিয়ে আসে। তালুত ছিল একজন জিন্দিক (নাস্তিক) এবং সে তার নাস্তিকতা ছড়িয়ে দেয়।[৫]

খতীব আল-বাগদাদি উল্লেখ করেন যে, বিশর আল-মারিসি, যিনি ছিলেন একজন মুরজিয়া ও মু‘তাযিলা মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা এবং কুরআন সৃষ্ট মতবাদের বড় একজন সমর্থক, তার পিতা ছিলেন একজন ইয়াহুদী, যিনি কুফায় রং মেশানোর কাজ করতেন।

তবে যেসব ধর্মের প্রভাব ছিল, তার মধ্যে খ্রিস্টধর্ম ছিল মু‘তাযিলা মতবাদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী।

উমাইয়া খেলাফতের সময় বহু খ্রিস্টান উচ্চ পদে নিয়োগ পান। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সারজুন ইবনু মনসুর নামক এক রোমান খ্রিস্টান। তিনি প্রথমে উমাইয়াদের জন্য কাজ করেন, পরে ১১২ হিজরিতে চাকরি ছেড়ে দেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের (জেরুজালেমের) কাছে একটি খ্রিস্টান সন্ন্যাস আশ্রমে যোগ দেন, যেখানে তিনি বাকি জীবন ধর্মীয় গবেষণা ও বই লেখায় কাটান।

মুসলমানদের এই খ্রিস্টানদের সঙ্গে মেলামেশা এমনভাবে ঘনিষ্ঠ ছিল যে, এটা কোনোভাবেই প্রভাবহীন ছিল না। বরং যখন মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে ধর্মীয় তর্ক-বিতর্ক শুরু হলো, তখন এটি আরও গভীর প্রভাব ফেলল। একপক্ষে খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম প্রমাণে যুক্তি দিত, অন্যদিকে মুসলমানরা ইসলামকে সমর্থন করত। তা বুঝা যায় ইয়াহইয়া আদ-দিমাশকির রচনাসমূহ থেকে, যেখানে তিনি মুসলিম-খ্রিস্টানদের মধ্যে ঘটে যাওয়া ধর্মীয় বিতর্কের বিভিন্ন উদাহরণ উল্লেখ করেছেন।

প্রখ্যাত ওরিয়েন্টালিস্ট স্কাইফোর্ট উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াহইয়া আদ-দিমাশকি একটি বই রচনা করেন খ্রিস্টধর্মকে রক্ষার পক্ষে, যা ছিল আরব ও খ্রিস্টানের মধ্যে কথোপকথনের আকারে লেখা। এতে প্রমাণিত হয় যে, প্রাথমিক উমাইয়া শাসকরা ধর্মীয় বিষয়ে সহনশীল ছিলেন। তারা এমন বিতর্কে বাধা দেননি। এই বিতর্ক ও আলোচনা কিছু সময় বন্ধ থাকলেও, আব্বাসি খলিফা আল-মামুনের সময় তা আবার শুরু হয়। আর এগুলোর কারণে মুসলমানরা খ্রিষ্টানদের থেকে কিছু আক্বীদা গ্রহণ করে থাকে।

মাকরিযি বর্ণনা করেন, ইসলামে প্রথম ব্যক্তি যিনি ‘ক্বাদর’ (মানবের স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মক্ষমতা) বিষয়ে কথা বলেন, তিনি ছিলেন মা‘বাদ আল-জুহানি। তিনি এ ধারণাটি গ্রহণ করেন এক খ্রিস্টান সৈনিক (আসওয়ারা) থেকে, যার নাম ছিল ‘আবু ইউনুস’ এবং যিনি পরিচিত ছিলেন ‘আসওয়ারি’ নামে।[৬]

ইবনু কুতাইবা বর্ণনা করেন, মা‘বাদের পর ‘ক্বাদর’ মতবাদের সবচেয়ে বড় প্রচারক ছিলেন গাইলান আদ-দিমাশকি। তিনি ছিলেন একজন ‘কিপ্টিক খ্রিস্টান’, এজন্য তাকে বলা হতো ‘গাইলান আল-কিব্টি। এটি তার খ্রিস্টান উৎসের স্পষ্ট ইঙ্গিত।[৭]

মু‘তাযিলা মতবাদের ওপর খ্রিস্টানদের প্রভাবের আরও একটি বড় প্রমাণ হলো, মু‘তাযিলা মতবাদের অনেক বিশ্বাস ও চিন্তাধারার সঙ্গে খ্রিস্টান পণ্ডিত ‘ইয়াহইয়া আদ-দিমাশকি’-এর মতবাদ ও ধর্মীয় আলোচনার অনেক মিল দেখা যায়। এই মিল কেবল একটি-দু’টি বিষয়ে নয়, বরং অনেকগুলো মৌলিক ধর্মীয় বিষয়ে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। এটি কাকতালীয় বা শুধুই চিন্তার মিল বলে ধরে নেওয়া অসম্ভব।  ইয়াহইয়া আদ-দিমাশকি বলতেন,

‘আল্লাহ্ হলেন কল্যাণের উৎস ও মঙ্গলময় সত্তা এবং সব ধরনের নৈতিকতা ও সৎকর্ম তাঁর পক্ষ থেকে দানস্বরূপ, যার মাধ্যমে মানুষ ভাল কাজ করার সক্ষমতা লাভ করে। যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে সহায়তা না থাকত, তবে কেউ কখনও কোনো ভাল কাজ করতে পারত না’।[৮]

মু‘তাযিলারা এই ধারণার সঙ্গে একমত ছিল। তারা বলত, ‘আল্লাহ কখনও মন্দ করেন না, বরং তিনি কেবল ভালোই করেন এবং তাঁকে কখনও মন্দ বা অন্যায়ের ক্ষমতা রাখেন এমন বলে বর্ণনা করা যায় না’।

ইয়াহইয়া আদ-দিমাশকি বিশ্বাস করতেন, ‘আল্লাহ প্রতিটি সৃষ্টির জন্য যা সবচেয়ে ভালো, তা-ই নির্ধারণ করেন’। অর্থাৎ প্রত্যেক অস্তিত্বের জন্য যা সবচেয়ে উপকারী, আল্লাহ তা-ই করেন। অনুরূপভাবে মু‘তাযিলা দলের বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যা করেন, তা অবশ্যই তাদের মঙ্গলের জন্য হয়ে থাকে এবং আল্লাহ এমন কিছু করেন না, যা তাদের ক্ষতি বা দুর্ভোগ ডেকে আনে।[৯]

এই বিষয়গুলো স্পষ্ট করে যে, খ্রিস্টান ধর্মীয় চিন্তা ও বিতর্কের একটি গভীর প্রভাব পড়েছিল মুসলিম চিন্তাবিদদের ওপর। বিশেষ করে মু‘তাযিলাদের ওপর, যারা ধর্মীয় প্রশ্নে যুক্তি, ন্যায়বিচার, স্বাধীন ইচ্ছা ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করে চিন্তাধারা গড়ে তোলে।

৩. আল্লাহর ছিফাত (গুণাবলী) অস্বীকার

ইয়াহিয়া আল্লাহর চিরন্তন গুণাবলিকে অস্বীকার করতেন। তার যুক্তি ছিল, আমরা আল্লাহকে নির্ধারণ করতে পারি না, তাঁর প্রকৃতিকে বুঝতে পারি না; কারণ, প্রাকৃতিক সত্তা কখনো অতিপ্রাকৃতিক সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে না। আল্লাহ আমাদের সেই ক্ষমতাও দেননি যে, আমরা তাঁকে চিনতে বা বুঝতে পারব। যারা আল্লাহর জন্য চিরন্তন অস্তিত্ব, জীবন, শ্রবণ, দৃষ্টিশক্তি, এসব গুণ নির্ধারণ করেন, তারা বড় ভুল করেন। কারণ, এই গুণাবলী ধরলে আল্লাহর মধ্যে সংযোজন বা গঠন ধরা পড়ে অর্থাৎ তিনি যেন বিভিন্ন অংশ দিয়ে গঠিত, যা আল্লাহর ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবৈধ ও অসম্ভব। আল্লাহ এক, তিনি কোনো অংশ দিয়ে গঠিত নন। তবে, যদি আমরা এই গুণগুলো আল্লাহর সম্পর্কে ব্যবহার করি, তাহলে সেগুলোকে শুধুমাত্র নেতিবাচক অর্থে নিতে হবে। যেমন: যদি বলি, তিনি চিরন্তন অর্থাৎ, তিনি সৃষ্ট নন এবং বিনাশশীল নন। যদি বলি, তিনি ভালো অর্থাৎ তিনি মন্দ কিছু করেন না।

এই ভাবধারাকেই মু‘তাযিলা সম্প্রদায় গ্রহণ করে এবং তাওহীদ তথা একত্ববাদ নামে তাদের পাঁচটি মূল আক্বিদার মধ্যে একটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।

ইয়াহিয়া আদ-দিমাশকী আল্লাহর দেহ ধারণ ও সাদৃশ্যের (তাশবিহ) প্রশ্নে বলেন, বাইবেল সহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে এমন অনেক শব্দ বা বাক্য আছে যেগুলো আল্লাহকে মানুষের মতো করে তুলে ধরে (যেমন: হাত, চোখ, বসা ইত্যাদি)। সাধারণ মানুষের কথাবার্তাতেও আল্লাহর সম্পর্কে এমন শব্দ ব্যবহৃত হয়, যা তাঁকে সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করে। তাই, যেসব শব্দ বা বাক্যে আল্লাহর দেহ বা সৃষ্টির মতো গুণ বোঝানো হয়েছে, তাদের রূপক (মাজাজ) বা প্রতীক হিসেবে বুঝতে হবে। এসব শব্দ মানুষকে আল্লাহর ধারণা বুঝাতে সাহায্য করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, আক্ষরিক অর্থে নয়। তাই এগুলোর ব্যাখ্যা ও রূপান্তরিত অর্থ করতে হবে। যেমন আল্লাহর শ্রবণ-এর অর্থ হচ্ছে তিনি দু‘আ গ্রহণ করতে প্রস্তুত। আল্লাহ্‌র চোখ-এর অর্থ তিনি সবকিছু জানেন ও পর্যবেক্ষণ করেন।

এই নীতির ভিত্তিতেই মু‘তাযিলারা আল্লাহর আরশে হওয়া (ইস্তিওয়া), আগমন (মাজি), দুনিয়ায় অবতরণ (নুযূল), শ্রবণ, দৃষ্টিশক্তি, বাকশক্তি ইত্যাদি বিষয়ে হাদীছ ও কুরআনের আয়াতগুলো অস্বীকার করে বা রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করে।[১০]

বাতিল ফের্কার প্রভাব ও মুতাযিলাদের উৎপত্তি

এই আলোচনার মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মু‘তাযিলা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ও চিন্তাধারার পেছনে অন্যান্য ধর্মের, বিশেষ করে ইয়াহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাব ছিল। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল খ্রিস্টানদের পক্ষ থেকে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, মু‘তাযিলারা সরাসরি অন্য ধর্মের অনুসারীদের থেকে প্রভাবিত হননি বরং তাদের আগে কিছু দল এইসব ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে সেগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করে। এই প্রভাবপ্রাপ্ত দল ছিল দু’টি।

১. কুরআন সৃষ্ট এবং চিরন্তনতা অস্বীকারকারী দল

এই দলের প্রথম ব্যক্তি ছিলেন ‘আল-জা‘দ ইবনু দিরহাম’ (الجعد بن درهم), যিনি তার মতবাদ প্রকাশ করেন হিশাম ইবনু আব্দুল মালিক-এর সময়ে। তার চিন্তাগুলো গ্রহণ করেন এবং আরও প্রসারিত করেন ‘আল-জাহম ইবনু সফওয়ান (الجهم بن صفوان)। জাহম ইবনু সাফওয়ান জাবরিয়া ছিলেন, মানুষের কোনো স্বাধীন ইচ্ছা বা কর্মক্ষমতা নেই বলে বিশ্বাস করতেন। আল্লাহ্‌র গুণাবলী (সিফাত) অস্বীকার করতেন। কুরআনকে সৃষ্ট বলতেন। জান্নাত-জাহান্নাম চিরস্থায়ী নয়, তারা একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আল্লাহকে দেখা যাবে না বলে বিশ্বাস করতেন। শারী‘আত আসার আগেই মানুষ নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে সত্য-অসত্য চিনতে পারবে, এমন বিশ্বাস করতেন। তার মতবাদ খোরাসানের তিরমিযে ছড়িয়ে পড়ে।

২. তাক্বদীর অস্বীকারকারী দল

এই দল (ক্বাদারিয়্যাহ) বিশ্বাস করত যে, মানুষ নিজেই তার কাজের জন্য দায়ী এবং তার কর্মে পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। এই দলের প্রথম ব্যক্তির নাম ‘উমর আল-মাকছূছ’ (عمر المقصوص), যিনি ৮০ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দেমাশকে (দামেশকে) প্রকাশ্যে ক্বদরের কথা বলেন। তাকে বনি উমাইয়ারা হত্যা করে, এই অভিযোগে যে, তিনি খলিফাকে বিভ্রান্ত করেছিলেন। এরপর আসেন ‘মা‘বাদ আল-জুহানী’ (معبد الجهني), যিনি বসরায় ক্বদর সম্পর্কে কথা বলেন। তিনি হাসান আল-বসরির সঙ্গে উঠাবসা করতেন। তার চিন্তাধারায় প্রভাবিত হন।

‘আমর ইবন উবাইদ (عمرو بن عبيد), যিনি পরে একজন প্রখ্যাত মু‘তাযিলা নেতা হন। বসরার লোকেরা ‘আমর ইবন উবাইদের কারণে ক্বদর অস্বীকারের পথে চলতে থাকে। পরে আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ান-এর আদেশে হাজ্জাজ তাকে গ্রেফতার করে শাস্তি দিয়ে হত্যা করেন।

এরপর আরেক ব্যক্তি হলেন ‘গাইলান আদ-দিমাশকী’ (غيلان الدمشقي)। তিনি মা‘বাদ-এর কাছ থেকে ক্বদর অস্বীকারের মতবাদ গ্রহণ করেন। তাকে তলব করেন খলীফা ‘উমর ইবনু আব্দুল আযীয, যিনি ৯৯ হিজরিতে খিলাফত লাভ করেন এবং ১০১ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। উমর তাকে প্রথমে উপদেশ দেন এবং পরে শুনে যে, সে তার মতবাদে আবার ফিরে গেছে, তাকে ফের ডেকে পাঠিয়ে পরীক্ষা করেন। যদি সে তাওবা না করত, তাহলে খলীফা তাকে হত্যা করতেন। সে তাওবা করে, ফলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং খলীফা সকল জায়গায় নির্দেশ দেন এই মতবাদ প্রচার না করার জন্য। কিন্তু খলীফার মৃত্যুর পর, গিলান আবার ক্বদর সম্পর্কে কথা বলতে শুরু করেন।

এরপর হিশাম ইবন আব্দুল মালিক তাকে ধরে এনে তার দুই হাত ও দুই পা কেটে ফেলে হত্যা করেন এবং দিমাশকের ফটকে তাকে শূলবিদ্ধ করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। বলা হয়, তাকে জীবিত অবস্থায় শূলবিদ্ধ করা হয়েছিল।

জা‘দ-এর অনুসারীরা কুরআন সৃষ্ট এবং আল্লাহর গুণাবলী অস্বীকার করত, এই চিন্তা ছিল ইরাক ও শাম (সিরিয়া)-এ। জাহম খোরাসানে একই চিন্তা প্রচার করে। ক্বাদরিয়্যারা বসরায় মানুষের স্বাধীনতা ও কর্মক্ষমতা প্রমাণ করে। এই সমস্ত মতাদর্শের প্রেক্ষাপটে মু‘তাযিলা সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে বসরায়। মু‘তাযিলাদের শিক্ষাদীক্ষা ছিল এই সমস্ত প্রবাহিত চিন্তার একটি মিশ্রণ। তারা কাদরিয়্যাদের মতো তাক্বদীর অস্বীকার করে। জাহমিয়াদের মতো আল্লাহর গুণাবলী অস্বীকার ও কুরআনের সৃষ্টত্বে বিশ্বাস করে। তবে তারা মানুষের স্বাধীনতা অস্বীকার এই বিষয়ে জাহমিয়াদের সঙ্গে একমত নয়, বরং তারা এর প্রতিবাদ করে।

জাহমিয়া ও কাদরিয়ার চিন্তার উত্তরাধিকারী

জাহমিয়া সম্প্রদায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং ক্বাদারিয়্যারও অস্তিত্ব নেই, তবে তাদের শিক্ষাগুলো এখনো মু‘তাযিলা সম্প্রদায়ের মাধ্যমে সংরক্ষিত আছে। মু‘তাযিলারা এই মতবাদগুলো গ্রহণ করে ব্যাখ্যা করেছে, প্রসারিত করেছে এবং বিশদভাবে আলোচনা করেছে। এই কারণে বলা যায়, মু‘তাযিলা হচ্ছে জাহমিয়া ও ক্বাদরিয়া দলের চিন্তাধারার উত্তরাধিকারী।

উমাইয়্যা ও আব্বাসীয় খলীফাদের সমর্থন

মু‘তাযিলা দল আবির্ভূত হয় উমাইয়া খিলাফতের সময়ে। তারা লক্ষ্য করেছিল যে, তাদের আগের কিছু দল যেমন ক্বাদরিয়া, খলীফাদের রোষানলে পড়ে নির্যাতিত, বিতাড়িত এবং হত্যাকৃত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝে যায়, তাদের টিকে থাকতে হলে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন দরকার, যার সাহায্যে তারা নির্ভয়ে নিজেদের মতবাদ প্রচার করতে পারবে। এই চিন্তার বাস্তবায়নে তারা বহু দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দেয়, যা প্রায় এক শতাব্দী স্থায়ী হয় এবং অবশেষে ক্ষমতাসীনদের সমর্থন পেতে সক্ষম হয়।

মু‘তাযিলারা উমাইয়া খলিফাদের ঘনিষ্ঠতা পেতে তৎপর হয়। তারা প্রথমে ইয়াজিদ[১১] ইবনু আল-ওয়ালিদ ইবনু আব্দুল মালিক-এর চারপাশে সমবেত হয়। ইয়াজিদ ছিলেন ক্বাদারিয়া মতবাদের অনুসারী।[১২] ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, أن اليزيد حين ولي الخلافة دعا الناس إلى القدر، وحملهم عليه ‘যখন ইয়াজিদ খলিফা হলেন, তিনি মানুষকে ক্বদর (তাক্বদীর অস্বীকার) মতবাদে আহ্বান করেন এবং চাপ প্রয়োগ করেন’।[১৩]

অতঃপর তারা মারওয়ান ইবন মুহাম্মাদ-এর সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে, যিনি ছিলেন উমাইয়া খেলাফতের শেষ খলিফা। ইবনুল আসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, إن مروان كان يلقب بالجعدي، لأنه تعلم من الجعد بن درهم مذهبه في خلق القرآن، ونفي القدر ‘মারওয়ানকে আল-জা‘দী উপাধি দেওয়া হতো, কারণ তিনি জা‘দ ইবনু দিরহাম থেকে কুরআন সৃষ্ট এবং ক্বদর অস্বীকারের মতবাদ শিখেছিলেন’।[১৪] ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, জা‘দের চিন্তা লোকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, কারণ তিনি ছিলেন মারওয়ান ইবনু মুহাম্মাদের শিক্ষক’। তবুও, মু‘তাযিলারা তখনও সমাজে খুব কমসংখ্যক এবং নিন্দিত ছিল।

যখন উমাইয়াদের পতন হয় এবং আব্বাসীয় খেলাফত শুরু হয়, মু‘তাযিলারা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে দ্বিতীয় আব্বাসী খলীফা আবূ জাফর আল-মানসুর-এর সময়। মু‘তাযিলা নেতা আমর ইবন উবাইদ ছিলেন খলীফা আল-মানসুরের বন্ধু। মানুসূরের পর আল মাহদী যখন ক্ষমতায় আসেন, তিনি নাস্তিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালান। তিনি ১৬৭ হিজরিতে তাদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ ও হত্যা শুরু করেন। ফলে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দেয়। আবার যখন খলিফা হারুন আর-রশীদ ক্ষমতায় আসেন, মু‘তাযিলারা আবার ক্ষমতার কাছাকাছি আসতে থাকে। তবে খলীফা হারূন এবং তার ছেলে খলীফা আল-আমীনের সময় মু‘তাযিলাদের সংকোচন হয়। তাদের প্রভাব কমে যায়। কেননা তারা দু’জনেই ছিলেন বেশি ধর্মনিষ্ঠ ও কঠোর। ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,إن الأمين أقصى الجهمية وتتبعهم بالحبس والقتل ‘আল-আমীন জাহমিয়া মতাদর্শীদের বিতাড়িত করেছিলেন এবং গ্রেফতার ও হত্যার মাধ্যমে দমন করেছিলেন’।[১৫]

তবে আল-মামুনের শাসনামলে মু‘তাযিলাদের স্বর্ণযুগ ছিল। কিন্তু যখন আল-আমীনের ভাই আল-মামুন খিলাফত গ্রহণ করেন, তখন মু‘তাযিলাদের জন্য সৌভাগ্যের দ্বার খুলে যায়। কারণ আল-মামুন নিজেকে মু‘তাযিলা মতবাদের একজন আলেম মনে করতেন। তিনি তাদের সমর্থন দেন, ঘনিষ্ঠ করেন এবং তাদের মধ্যে থেকে মন্ত্রী ও উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। তিনি আলোচনার সভা (মুনাযারা) আয়োজন করতেন, যেখানে মু‘তাযিলা আলেমদের অন্যান্য ইসলামি ফক্বীহ ও আলেমদের সাথে বিতর্ক করাতেন, যেন একটি অভিন্ন মতামতে পৌঁছানো যায়। তার শেষ জীবনে তিনি অত্যন্ত কঠোরতা আরোপ করেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ফক্বীহদের মু‘তাযিলা মতবাদ গ্রহণ করতে এবং তাদেরকে ‘কুরআন সৃষ্ট’ বলতে বাধ্য করেন। অনেকে ভয়ে ও হুমকিতে পড়ে মনে বিশ্বাস না থাকলেও মু‘তাযিলা মত গ্রহণ করে। আবার অনেকেই কারাবরণ, নির্যাতন ও কষ্ট সহ্য করেও নিজের বিশ্বাসে অটল থাকে। এই ফিতনা (মহা-পরীক্ষা) চলতে থাকে। পরবর্তী খলীফা আল-মু‘তাসিম ও আল-ওয়াসিক তাদের পূর্বসূরি আল-মামুনের নীতি অনুসরণ করেন এবং দমননীতি অব্যাহত রাখেন।

অবশেষে খলীফা আল-মুতাওয়াক্কিল এই ফিতনার অবসান ঘটান এবং মানুষকে বিশ্বাসের স্বাধীনতা দেন। তিনি মু‘তাযিলাদের দমন করেন এবং তাদের প্রতি অমার্জিত মনোভাব প্রকাশ করেন।[১৬]

পরিশেষে বলা যায় যে, নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা মু‘তাজিলাদের উত্থানের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই পৃষ্ঠপোষকতা তাঁদের সমাজে মর্যাদা এনে দেয়, তাঁদের মতবাদকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাঁদের চিন্তাধারা বিস্তৃত হয়। পূর্বে তাঁদের মতবাদ সীমিত ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তা ব্যাপক হয়ে ওঠে এবং এতে নতুন নতুন ধারা যোগ হয়, যা আগে ছিল না।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* পি-এইচ. ডি গবেষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

তথ্যসূত্র :
[১]. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৩৪।
[২]. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৩৪।
[৩]. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৩৪।
[৪]. আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আশ-শাইবানি, আল-ইলাল ও ওয়া মা‘রিফাতুর রিজাল, তাহক্বীক্ব : ওয়াসি উল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আব্বাস, ১ম খণ্ড (রিয়াদ : দারুল খানী, ২য় সংস্করণ, ১৪২২ হি.), পৃ. ৬৮; ইবনু তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসুল জাহমিয়্যাহ ফী তা’সীসি বিদ‘ঈহিমিল কালামিয়্যাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড (সঊদী আরব : বাদশাহ ফাহাদ কুরআন মুদ্রন কমপ্লেক্স, ১৪২৬ হি.), পৃ. ৩১৬।
[৫]. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৩৮।
[৬]. أن أول من تكلم بالقدر في الإسلام هو معبد الجهني أخذ ذلك عن نصراني من الأساورة يقال له أبو يونس، ويعرف بالأسواري  -দ্র. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৩৯।
[৭]. أن غيلان الدمشقي أكبر داعية إلى القدر بعد الجهني، كان قبطيا، ولذا يدعون غيلان القبطي -প্রাগুক্ত।
[৮]. إن الله خير، ومصدر كل خير، وأن الفضيلة هبة منه تعالى، بها أصبح الإنسان قادرا على فعل الخير، فلولا المعونة الإلهية لما استطاع أحد أن يأتي شيئا من الخير أبدا. -দ্র. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৩৯।
[৯]. প্রাগুক্ত।
[১০]. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৪০।
[১১]. ইয়াযিদ ইবনু আল-ওয়ালিদ (যিনি তৃতীয় ইয়াজিদ নামেও পরিচিত) ছিলেন উমাইয়া খলিফা, যিনি ৭৪৪ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ৩ বা ৪ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ছয় মাস শাসন করেছিলেন। তিনি ছিলেন উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের পুত্র এবং ইয়াযিদ দ্বিতীয়ের নাতি। তাঁর শাসনামল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ছিল এবং তিনি শাসনকালে মারা যান।
[১২]. জামালুদ্দীন আবুল হাজ্জাজ, তাহযীবুল কামাল ফী আসমাইর রিজাল, ৪র্থ খণ্ড (বৈরূত : মুওয়াসসাসাতুর রিসালাহ, ১৪১৩ হি.), পৃ. ৪২১; মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৪২।
[১৩]. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৪২।
[১৪]. যারকালী আদ-দিমাশক্বী, আল-আ‘লাম, ২য় খন্ড (দারুল ‘ইলমি, ৫ম সংস্করণ, ২০০২ হি.), পৃ. ১২০; মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৪২।
[১৫]. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৪৩।
[১৬]. প্রাগুক্ত।




আত্মহত্যাকারীর শারঈ বিধান - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ইমাম মাহদী, দাজ্জাল ও ঈসা (আলাইহিস সালাম) -এর আগমন সংশয় নিরসন (৬ষ্ঠ কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
মাযহাবী গোঁড়ামি ও তার কুপ্রভাব (শেষ কিস্তি) - অনুবাদ : রিদওয়ান ওবাইদ
ইসলামী জামা‘আতের মূল স্তম্ভ (৮ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
ইখলাছই পরকালের জীবনতরী (২য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
ভ্রান্ত ফের্কাসমূহের ঈমান বনাম আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ঈমান : একটি পর্যালোচনা - ড. আব্দুল্লাহিল কাফী বিন লুৎফর রহমান মাদানী
ছালাতে একাগ্রতা অর্জনের ৩৩ উপায় (৫ম কিস্তি) - আব্দুল হাকীম বিন আব্দুল হাফীজ
নফল ছালাত - আল-ইখলাছ ডেস্ক
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায় (২য় কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
ছয়টি মূলনীতির ব্যাখ্যা (শেষ কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আযীযুর রহমান
সুখময় সৌভাগ্যের মৃত্যু লাভের উপায় (৭ম কিস্তি) - ওমর ফারুক বিন মুসলিমুদ্দীন

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ