মঙ্গলবার, ১৪ Jul ২০২৬, ০৬:৫১ পূর্বাহ্ন

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায় 

- হাসিবুর রহমান বুখারী* 


(৫ম কিস্তি) 

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে নৈতিক অবক্ষয় বড় বাধা কেন?

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে নৈতিক অবক্ষয় বা চরিত্রগত অধঃপতন একটি বড় বাধা। কারণ, ইসলামী রাষ্ট্র কেবল আইন, শাসনব্যবস্থা বা রাজনৈতিক ক্ষমতার নাম নয়, বরং তা ন্যায়, আমানতদারিতা, তাক্বওয়া, সত্যবাদিতা এবং উত্তম চরিত্রের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। বিষয়টি কয়েকটি দিক থেকে বোঝা যায়। যেমন-

(১) সৎ মানুষ ছাড়া সৎ সমাজ গঠন সম্ভব নয়

আসলে সৎ মানুষ ছাড়া সৎ পরিবার গড়ে উঠে না, সৎ পরিবার ছাড়া সৎ সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় না, আর সৎ সমাজ ছাড়া ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র ব্যক্তি থেকেই শুরু হয়। ব্যক্তি সৎ হলে পরিবার সৎ হয়, পরিবার সৎ হলে সমাজ সৎ হয়, আর সমাজ সৎ হলে রাষ্ট্রও সৎ ও কল্যাণময় হয়। সুতরাং সৎ মানুষই সৎ পরিবার, সৎ সমাজ ও সৎ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। তাই ইসলামে রাষ্ট্র সংস্কারের আগে ব্যক্তি ও সমাজ সংস্কারের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাসূল (ﷺ) প্রথমে মানুষের আক্বীদা, আখলাক্ব ও চরিত্র গঠন করেছিলেন, এরপর ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنَّ اللّٰہَ  لَا یُغَیِّرُ مَا بِقَوۡمٍ حَتّٰی یُغَیِّرُوۡا مَا بِاَنۡفُسِہِمۡ ‘নিশ্চয় আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে’ (সূরা আর-রা‘দ : ১১)।

যদি জনগণের মধ্যে মিথ্যা, দুর্নীতি, প্রতারণা, সূদ, ঘুষ, অশ্লীলতা ও অন্যায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যায়। পৃথিবীর যে কোন দেশ ও সমাজ যত বেশী সততা, নৈতিকতা ও নীতিজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ দিয়ে সমৃদ্ধ হবে, সে দেশ ও সমাজ তত বেশী আদর্শ ও ন্যায়নিষ্ঠ হিসাবে পরিচিতি লাভ করবে। পৃথিবীর প্রধান সকল ধর্ম মতে ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণের কথা বলা হয়েছে। সকল দেশের প্রচলিত আইনে অন্যায়-গর্হিত কাজ মাত্রাভেদে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে বিবেচিত। সে কারণে সার্বিক জীবনে মুমিনকে সত্যবাদিতা অবলম্বন করতে হবে। হাসান ইবনু আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূল (ﷺ) থেকে এই কথা স্মরণ রেখেছি যে, دَعْ مَا يَرِيْبُكَ إِلَى مَالَا يَرِيْبُكَ فَإِنَّ الصِّدْقَ طُمَأنِيْنَةٌ وَإِنَّ الْكِذْبَ رِيْبَةٌ ‘যে বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয়, তা পরিত্যাগ করে যাতে সন্দেহের অবকাশ নেই তা গ্রহণ কর। কেননা সত্য হচ্ছে প্রশান্তি আর মিথ্যা হচ্ছে সন্দেহ’।[১] সততাই শক্তি ও বল। সততা উৎকৃষ্ট পন্থা। সততা ছাড়া জীবনে কোন লক্ষ্য, উদ্দেশ্য বা গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। আমাদের প্রতি আল্লাহর অসংখ্য নে‘মতের মধ্যে সবচেয়ে বড় নে‘মত হল-‘ঈমান’। ঈমান ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির নিশ্চয়তা দেয়। মানসিক প্রশান্তি অর্জনে ঈমানের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। মানুষ তার ঈমানের স্তর অনুযায়ী সে প্রশান্তি অনুভব করে। তার ঈমান বৃদ্ধির সাথে সাথে মানসিক প্রশান্তি ও তৃপ্তি বাড়বে। তার প্রতিটি কাজে ঈমানের স্বাদ অনুভব করবে। ঈমান মুমিনের জীবনে মানসিক প্রশান্তির নিশ্চয়তা দেয়। সে কারণে একজন মুমিনের ব্যক্তি জীবনে ঈমানের প্রভাবটা বেশ উল্লেখযোগ্য। যেখানে সততা তার ঈমান ও আমল পরিশুদ্ধ করতে সহায়ক ভূকিা পালন করে।

(২) নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়

মানুষের অন্তরে তাক্বওয়া না থাকলে কেবল আইন প্রয়োগ করে সমাজকে সঠিক পথে রাখা যায় না। ইসলামে বাহ্যিক আইনের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধির উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। ইসলামে দেশের আইন মানা মূলত ওয়াজিব যতক্ষণ সেই আইন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর নির্দেশনার বিরোধী না হয়। কেননা, মানুষ যদি আইন না মানে, তাহলে সমাজে বিশৃঙ্খলা, সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পায়। মানুষের জান-মাল ও সম্মান হুমকির মুখে পড়ে। দুর্নীতি, প্রতারণা ও আইন লঙ্ঘনের কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট হয়। আইন অমান্য করার প্রবণতা মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও শৃঙ্খলাবোধ কমিয়ে দেয়। অন্যদের মধ্যেও আইন ভাঙার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে। তাই যে আইন শরী‘আতের বিরোধী নয়, তা অমান্য করা গুনাহের কারণ হতে পারে। কারণ ইসলাম শৃঙ্খলা, অঙ্গীকার রক্ষা এবং বৈধ কর্তৃপক্ষের আনুগত্যের শিক্ষা দেয়।

নবী (ﷺ) বলেন, احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ ‘যা তোমার জন্য কল্যাণকর তা অর্জনে তুমি আগ্রহী হও’।[২] অনুরূপভাবে রাসূল (ﷺ) বলেন, لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ ‘নিজের কোন অনিষ্টতা বা ক্ষতি এবং পরস্পরে কারোর ক্ষতি করা যাবে না’।[৩] আইন অমান্য ব্যাপক আকার ধারণ করলে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়। অপরাধ, অরাজকতা ও জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। তাই মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا ‘আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা কর না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু’ (সূরা আন-নিসা : ২৯)।

আইন একটি সমাজের মধ্যে সামাজিক শৃঙ্খলা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য একটি কাঠামো প্রদান করে। রাষ্ট্র নিয়ম এবং সীমানা স্থাপন করে যা ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর মধ্যে আচরণ এবং মিথস্ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। যখন লোকেরা আইন মেনে চলে, তখন এটি বিশৃঙ্খলা, সংঘাত প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে উৎসাহিত করে। আইনগুলো মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা এবং সুরক্ষার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। রাষ্ট্র নিশ্চিত করে যে প্রত্যেকের সাথে ন্যায্য এবং ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা হয়, বৈষম্য, অপব্যবহার এবং ক্ষতি প্রতিরোধ করে। আইন মেনে চলার মাধ্যমে, জনগণের নিজেদের এবং অন্যদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে অবদান রাখে।

যখন মানুষের আইনী ব্যবস্থার ন্যায্যতা এবং কার্যকারিতার উপর বিশ্বাস থাকে, তখন এটি সমাজের সামগ্রিক কার্যকারিতাকে শক্তিশালী করে এবং ন্যায়বিচারের বোধকে উন্নীত করে। আইন মানুষকে তাদের কর্মের জন্য জবাবদিহি করার জন্য একটি প্রক্রিয়া প্রদান করে। রাষ্ট্র বে-আইনি আচরণের পরিণতি প্রতিষ্ঠা করে, যারা আইন ভঙ্গ করে তাদের উপযুক্ত শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। আইন মেনে চলার মাধ্যমে, জনগণ ন্যায়বিচারের নীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এবং একটি ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত সমাজে অবদান রাখে। আইন অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্র একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রদান করে যা বাণিজ্যকে সমর্থন করে, ভোক্তাদের রক্ষা করে এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতার প্রচার করে। ব্যবসায়িক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত আইন অনুসরণ করে, ব্যক্তিরা একটি সুস্থ এবং টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অবদান রাখে। সংক্ষেপে, দেশের বৈধ আইন অমান্য করলে ব্যক্তি আইনি ও সামাজিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, আর ব্যাপকভাবে আইন অমান্য হলে সমাজ ও রাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতেও বৈধ আইন মেনে চলা শৃঙ্খলা ও জনকল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

(৩) নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে ঐক্য নষ্ট হয়

হিংসা, বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা ও দলাদলি মুসলিম সমাজকে দুর্বল করে। ফলে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় ঐক্য গড়ে উঠে না। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হল- ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংস্কার। যখন মানুষের ঈমান, তাক্বওয়া ও চরিত্র উন্নত হবে, তখন ইসলামী আদর্শভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হবে। তাই নৈতিক অবক্ষয় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান বাধা হিসাবে বিবেচিত হয়। পূর্বে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

(৪) নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে দুর্নীতি (Corruption) মাথা চাড়া দিয়ে উঠে

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,

وَ لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ وَ تُدۡلُوۡا بِہَاۤ اِلَی الۡحُکَّامِ لِتَاۡکُلُوۡا فَرِیۡقًا مِّنۡ اَمۡوَالِ النَّاسِ بِالۡاِثۡمِ وَ اَنۡتُمۡ  تَعۡلَمُوۡنَ

‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের ধনসম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কর না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে ঘুষ দিও না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৮)। দুর্নীতি ন্যায়বিচার ধ্বংস করে এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করে। রাজনৈতিক ও সরকারী প্রশাসনে দুর্নীতি বলতে সাধারণত ঘুষ, বল প্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন, প্রভাব বা ব্যক্তি বিশেষকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে অফিস আদালতকে ব্যক্তিগত স্বার্থ লাভের জন্য অপব্যবহার করাকে বুঝায়।

দুর্নীতির মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা লাভবান হলেও সামগ্রিকভাবে সমাজ ও অর্থনীতির উপর এর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তাই সার্বিক বিচারে দুর্নীতি সব সময়ই পরিত্যাজ্য। সুতরাং সরকারি-বেসরকারি সকল পর্যায়ে ঘুষ, বলপ্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন বা ব্যক্তি বিশেষের অবৈধ ও অসংগত সুবিধা গ্রহণ এবং নীতি বিরুদ্ধ সকল কাজকেই দুর্নীতি বলা হয়। বর্তমানে সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ জীবনযাত্রার প্রায় সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি এক মহা বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এ জঘন্য ব্যাধির করাল গ্রাসে সম্ভাবনাময় দেশের ভবিষ্যৎ ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। বর্তমান সমাজে দুর্নীতির অবস্থান এতই শক্তিশালী যে দেশের সাধারণ মানুষ দুর্নীতির কাছে অসহায় হয়ে একে তাদের ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছে। দুর্নীতি এখন শুধু কোন এক সেক্টরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে দুর্নীতি মাকড়সার জালের মত বিস্তার লাভ করেছে। দুর্নীতি একটি সামাজিক অভিশাপ। কোন জাতির ধ্বংসের পূর্বে তাদের মধ্যে দুর্নীতি মহামারীর মত বিস্তার লাভ করে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বিভিন্ন যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিকে শাস্তি দেয়ার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে আল-কুরআনে বলেন,

الَّذِیۡنَ طَغَوۡا فِی الۡبِلَادِ- فَاَکۡثَرُوۡا فِیۡہَا الۡفَسَادَ- فَصَبَّ عَلَیۡہِمۡ رَبُّکَ سَوۡطَ عَذَابٍ-اِنَّ رَبَّکَ لَبِالۡمِرۡصَادِ

‘যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছে এবং তাতে বড় বেশি দুর্নীতি করেছে, তখন তাদের উপর তোমার রব শাস্তির কশাঘাত হানলেন। নিশ্চয় তোমার রর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন’ (সূরা আল-ফাজর : ১১-১৪)। এই আয়াতে বলা হচ্ছে যে, যখন দেশে আইন ও অধিকারের সীমালঙ্ঘিত হয়, মহান আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধাচরণ করা হয় এবং এই দুর্নীতি বিস্তারের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয় তখন আল্লাহ তা‘আলা ঐ দেশ ও জাতির উপর অসন্তুষ্ট হন এবং পরীক্ষা স্বরূপ তাদেরকে নানাভাবে শাস্তি দেন।

আজ সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতির দাপট দেখতে পাই। বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, অবৈধ সিন্ডিকেট বা অসৎ ফায়দা হাসিলের জন্য ব্যবসায়িক দুষ্টচক্র সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হচ্ছে, খাদ্য, ঔষধ, নির্মাণ সামগ্রীসহ নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সকল ভোগ্যপণ্যে ভেজাল মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। চাকুরীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অথবা সরকারি-বেসরকারি অফিসে কোন সুবিধা লাভের ক্ষেত্রে ঘুষের লেনদেন এখন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরীক্ষায় নকল, ভোটে কারচুপি, দলীল-দস্তাবেজে জালিয়াতি, শিক্ষাকে বাণিজ্য বানানো, অবৈধ দখলদারী, অযোগ্য লোককে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান, আর্থিক অনিয়ম ইত্যাদি সকল প্রকার দুর্নীতি ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। ইসলাম এ সবকিছুকেই হারাম ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُکُمۡ اَنۡ تُؤَدُّوا الۡاَمٰنٰتِ اِلٰۤی اَہۡلِہَا ۙ وَ اِذَا حَکَمۡتُمۡ بَیۡنَ النَّاسِ اَنۡ تَحۡکُمُوۡا بِالۡعَدۡلِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ نِعِمَّا یَعِظُکُمۡ بِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ سَمِیۡعًۢا بَصِیۡرًا 

‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে প্রত্যার্পণ করতে। আর তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে। আল্লাহ্ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন তা কতই না উৎকৃষ্ট! নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’ (সূরা আন-নিসা : ৫৮)। মহান আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, وَ لَا تَلۡبِسُوا الۡحَقَّ بِالۡبَاطِلِ وَ تَکۡتُمُوا الۡحَقَّ وَ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ‘আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত কর না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন কর না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ৪২)। ভেজাল, জালিয়াতি ও সকল সামাজিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর এই হুকুম আমাদের মেনে চলতেই হবে। কারণ, বহু আয়াতে অমান্যকারীদের জন্য শাস্তির বাণী উচ্চারিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تَعۡتَدُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰہَ  لَا یُحِبُّ الۡمُعۡتَدِیۡنَ ‘তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘণকারীদের ভালোবাসেন না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৯০)। এই সীমা আইনের সীমা, ধর্মের সীমা, অধিকারের সীমা বা ধৈর্যের সীমা হতে পারে। হতে পারে তা ক্ষেতের আইল অথবা রাস্তার দু’পাশের সীমানা, নদীর তীর অথবা বাড়ী-ঘর নির্মাণের আইনগত সীমানা। ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের সীমাও এর আওতায় আসতে পারে। এ জন্যই প্রত্যাশার সীমা ছাড়িয়ে লোভে পড়ে হালাল রুজি ছেড়ে হারাম সম্পদ অর্জনও সীমালঙ্ঘন বটে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

فَکُلُوۡا مِمَّا رَزَقَکُمُ اللّٰہُ حَلٰلًا طَیِّبًا ۪ وَّ اشۡکُرُوۡا نِعۡمَتَ اللّٰہِ  اِنۡ  کُنۡتُمۡ  اِیَّاہُ تَعۡبُدُوۡنَ

‘আল্লাহ তোমাদের হালাল ও পবিত্র যা দিয়েছেন তা হতে আহার কর এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও নে‘মতের জন্য শুক্র কর। যদি তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করে থাক’ (সূরা আন-নাহল : ১১৪)। যেহেতু রাষ্ট্রীয় আইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা, ঘুষ দেয়া ও নেয়া সবই নিষিদ্ধ, তাই এ থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। নতুবা তা মানুষের অধিকার নষ্ট করা ও রাষ্ট্রের সাথে ধোঁকা হবে। অথচ রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي  ‘যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা করে, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়’।[৪] ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন যে, كَرِهُوا الْغِشَّ وَقَالُوا الْغِشُّ حَرَامٌ ‘আলিমদের মতানুযায়ী প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি খুবই জঘন্য অপরাধ এবং তাঁরা বলেছেন, প্রতারণা করা হারাম’।[৫] জারির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَنْ لَا يَرْحَمْ الناسَ ، لَا يَرْحَمْهُ اللهُ عزَّ و جلَّ ‘যে লোক মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে না, আল্লাহ তার উপর দয়া করেন না’।[৬] আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেন, المُؤمنُ غِرٌّ كَريْمٌ، والفاجِرُ خِبٌّ لَئيمٌ ‘মুমিন ব্যক্তি সহৃদয় ও ভদ্রস্বভাবের হয়ে থাকে আর পাপীষ্ট ব্যক্তি প্রতারক ও নীচ প্রকৃতির হয়ে থাকে’।[৭]

দুর্নীতিও এক ধরনের ধোঁকাবাজি যা মানুষের হক নষ্ট করে এবং প্রকৃত হক্বদার প্রতারিত হয়ে থাকে। তাই দুর্নীতি করা জাহান্নামী বান্দাদের কাজ। আনাস বিন মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, نُهِينَا أَنْ يَبِيعَ حَاضِرٌ لِبَادٍ ‘আমাদেরকে গ্রামের উৎপাদিত পণ্য এককভাবে খরিদ করে নিয়ে শহুরেদের কাছে বিক্রয় (অবৈধ সিন্ডিকেট বা ব্যবসায়িক দুষ্টু চক্র) ব্যবস্থা (তৈরি করতে) নিষেধ করা হয়েছে’।[৮] অপর হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, لَا يَبِيْعُ حَاضِرٌ لِبَادٍ، دَعُوا النَّاسَ يَرْزُقُ اللهُ بَعْضَهُمْ مِنْ بَعْضٍ ‘কোন শহরবাসী (এককভাবে অবৈধ সিন্ডিকেট বা ব্যবসায়িক দুষ্টু চক্র করে) গ্রামবাসীর পণ্য বিক্রি করবে না। মানুষকে ছাড় দাও, যাতে তারা একে অপরের মধ্যে স্বাধীন লেনদেন করে রিযিক্ব হাসিল করতে পারে’।[৯] বস্তুত দুর্নীতি একটি অনেক বড় গুনাহ। এ থেকে ফিরে আসার একমাত্র পথ হচ্ছে আখিরাতের চিন্তা করে মহান আল্লাহর সতর্কবাণী ও রাসূল (ﷺ) কর্তৃক যে সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে তা অন্তরে ধারণ করে দেশের ভালো মানুষ তথা মহান আল্লাহর ভালো বান্দা হওয়ার চেষ্টা করা। এটা আমাদের সকলেরই দায়িত্ব।

অনেক সময় জীন জাতীয় শয়তানের সাথে মানুষ জাতীয় শয়তান মিলিত হয়ে মানুষকে হারাম পথে নিয়ে যাবার জন্য মনের মধ্যে আবেদন সৃষ্টি করে। এই শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এই কুমন্ত্রণার স্বরূপ উন্মোচন করে মহান আল্লাহ বলেন,

اَلشَّیۡطٰنُ یَعِدُکُمُ الۡفَقۡرَ وَ یَاۡمُرُکُمۡ بِالۡفَحۡشَآءِ ۚ وَ اللّٰہُ یَعِدُکُمۡ مَّغۡفِرَۃً مِّنۡہُ  وَ فَضۡلًا ؕ وَ اللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

‘শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৬৮)। কাজেই আসুন! আমরা সমাজের সর্বস্তর থেকে দুর্নীতি দূর করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি এবং এ লক্ষ্যে কাজ করি। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক্ব দিন। আমীন!!

(৫) নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে অন্যায় ও যুলুম বৃদ্ধি পায়

নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে সমাজে অন্যায়, অবিচার ও যুলম বৃদ্ধি পায়। যখন মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, সততা ও নৈতিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে যায়, তখন দুর্নীতি, প্রতারণা, শোষণ ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যায় সমাজে ভয়, ঘৃণা ও বিভক্তি সৃষ্টি করে। সেই জন্য কারোর জন্য অন্যের উপর যে কোনভাবে যুলম, অত্যাচার অথবা অন্যায়মূলক আক্রমণ হারাম ও কাবীরা গুনাহ। কাউকে মারা, হত্যা করা, আহত করা, গালি দেয়া, অভিসম্পাত করা, ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া, দুর্বলের উপর হাত উঠানো চাই সে হোক নিজের কাজের ছেলে কিংবা নিজের কাজের মেয়ে অথবা নিজ স্ত্রী-সন্তান, তেমনিভাবে জোর করে কারোর কোন অধিকার হরণ ইত্যাদি যুলমেরই অন্তর্গত।

যুলুম পারস্পরিক বন্ধুত্ব বিনষ্ট করে। আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বৈরিতা সৃষ্টি করে। মানুষের মাঝে হিংসা ও বিদ্বেষের জন্ম দেয় এবং এরই কারণে ধনী ও গরীবের মাঝে ধীরে ধীরে ঘৃণা ও শত্রুতা জেগে উঠে। তখন উভয় পক্ষই দুনিয়ার বুকে অশান্তি নিয়েই জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। আল্লাহ তা‘আলা যালিমদের জন্য জাহান্নামে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। যা তাকে গ্রহণ করতেই হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اِنَّاۤ اَعۡتَدۡنَا لِلظّٰلِمِیۡنَ نَارًا ۙ اَحَاطَ بِہِمۡ سُرَادِقُہَا ؕ وَ اِنۡ یَّسۡتَغِیۡثُوۡا یُغَاثُوۡا بِمَآءٍ کَالۡمُہۡلِ یَشۡوِی الۡوُجُوۡہَ ؕ بِئۡسَ الشَّرَابُ ؕ وَ سَآءَتۡ  مُرۡتَفَقًا

‘আমরা যালিমদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছি। যার বেষ্টনী তাদেরকে পরিবেষ্টন করে থাকবে। তারা পানি চাইলে তাদেরকে দেয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানি। যা তাদের মুখমণ্ডল পুড়িয়ে দিবে। এটা কতই না নিকৃষ্ট পানীয় এবং সে জাহান্নাম কতই না নিকৃষ্ট আশ্রয়’ (সূরা আল-কাহ্ফ : ২৯)।

কেউ কেউ কোন যালিমকে অনায়াসে মানুষের উপর যুলম করতে দেখলে এ কথা ভাবে যে, হয়তো বা সে ছাড় পেয়ে গেল। তাকে আর কোন শাস্তিই দেয়া হবে না। না, ব্যাপারটা কখনোই এমন হতে পারে না। বরং আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্বিয়ামতের দিনের কঠিন শাস্তির অপেক্ষায় রেখেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ لَا تَحۡسَبَنَّ اللّٰہَ غَافِلًا عَمَّا یَعۡمَلُ الظّٰلِمُوۡنَ ۬ؕ اِنَّمَا یُؤَخِّرُہُمۡ لِیَوۡمٍ تَشۡخَصُ  فِیۡہِ  الۡاَبۡصَارُ- مُہۡطِعِیۡنَ مُقۡنِعِیۡ رُءُوۡسِہِمۡ لَا یَرۡتَدُّ اِلَیۡہِمۡ  طَرۡفُہُمۡ ۚ وَ اَفۡـِٕدَتُہُمۡ  ہَوَآءٌ

‘তুমি কখনো মনে কর না যে, যালিমরা যা করে যাচ্ছে আল্লাহ তা‘আলা সে ব্যাপারে গাফিল। বরং তিনি তাদেরকে সুযোগ দিচ্ছেন ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত। যে দিন সবার চক্ষু হবে স্থির বিস্ফারিত। সে দিন তারা ভীত-বিহবল হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে ছুটোছুটি করবে। তাদের চক্ষু এতটুকুর জন্যও নিজের দিকে ফিরবে না এবং তাদের অন্তর হবে একেবারেই আশা শূন্য’ (সূরা ইবরাহীম : ৪২-৪৩)।

কারোর মধ্যে বিনয় ও নম্রতা না থাকলেই সে কারোর উপর উদ্যত ও আক্রমণাত্মক হতে পারে। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা সকলকে বিনয়ী ও নম্র হতে আদেশ করেন। রাসূল (ﷺ) একদা খুত্ববা দিতে গিয়ে বলেন,

وَإِنَّ اللهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوْا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ، وَلَا يَبْغِيَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ

‘আল্লাহ তা‘আলা এ মর্মে আমার নিকট অহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা নম্র ও বিনয়ী হও, যাতে করে একের অন্যের উপর গর্ব করার পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় এবং একের অন্যের উপর অত্যাচার বা আক্রমণাত্মক আচরণ করার সুযোগ না আসে’।[১০] আবূ মাসঊদ আনছারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

كُنْتُ أَضْرِبُ غُلَامًا لِيْ، فَسَمِعْتُ مِنْ خَلْفِيْ صَوتًا : اعْلَمْ، أَبَا مَسْعُوْدٍ ! لَلهُ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَيْهِ، فَالْتَفَتُّ فَإِذَا هُوَ رَسُوْلُ اللهِ، فَقُلْتُ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! هُوَ حُرٌّ لِوَجْهِ اللهِ، فَقَالَ: أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَلَفَحَتْكَ النَّارُ أَوْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ

‘আমি আমার একটি গোলামকে মারছিলাম এমতাবস্থায় পেছন থেকে শুনতে পেলাম, কে যেন আমাকে বড় আওয়াজে বলছেন, শুনো, হে আবূ মাসঊদ! তুমি এর উপর যতটুকু ক্ষমতাশীল তার চাইতেও অনেক বেশি ক্ষমতাশীল আল্লাহ তা‘আলা তোমার উপর। অতঃপর আমি (পেছনে) তাকিয়ে দেখি, তিনি হচ্ছেন স্বয়ং রাসূল (ﷺ)। অতএব আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! একে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য স্বাধীন করে দিলাম। তখন রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি যদি এমন না করতে তা হলে তোমাকে জাহান্নামের অগ্নি স্পর্শ করত অথবা পুড়িয়ে দিত’।[১১] হিশাম ইবনু হাকীম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেন, إِنَّ اللهَ يُعَذِّبُ الَّذِيْنَ يُعَذِّبُوْنَ النَّاسَ فِيْ الدُّنْيَا ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ওদেরকে শাস্তি দিবেন যারা দুনিয়াতে মানুষকে (অন্যায়ভাবে) শাস্তি দেয়’।[১২]

আল্লাহ তা‘আলা অত্যাচারী ও কারোর উপর অন্যায়মূলক আক্রমণকারীর শাস্তি দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন। উপরন্তু আখিরাতের শাস্তি তো তার জন্য প্রস্তুত আছেই। আবূ বাকরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেন,

مَا مِنْ ذَنْبٍ أَجْدَرُ أَنْ يُّعَجِّلَ اللهُ لِصَاحِبِهِ الْعُقُوْبَةَ فِيْ الدُّنْيَا مَعَ مَا يَدَّخِرُ لَهُ فِيْ الْآخِرَةِ مِنَ الْبَغْيِ وَقَطِيْعَةِ الرَّحِمِ

‘দু’টি গুনাহ ছাড়া এমন কোন গুনাহ নেই যে গুনাহগারের শাস্তি আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতেই দিবেন এবং তা দেয়াই উচিত, উপরন্তু তার জন্য আখিরাতের শাস্তি তো আছেই। গুনাহ দু’টি হচ্ছে। যথা: (১) অত্যাচার তথা কারোর উপর অন্যায়মূলক আক্রমণ (২) আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী’।[১৩]

(৬) নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে স্বজনপ্রীতি (Nepotism) বৃদ্ধি পায়

আত্মীয়দের অন্যায়ভাবে অগ্রাধিকার দেয়াকে স্বজনপ্রীতি বলে। নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে যোগ্যতা, ন্যায়পরায়ণতা ও আমানতদারিতার পরিবর্তে আত্মীয়তা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এর ফলে স্বজনপ্রীতি (ঘবঢ়ড়ঃরংস) বৃদ্ধি পায়, যোগ্য ব্যক্তিরা বঞ্চিত হয় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার ও সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যখন নৈতিকতা দুর্বল হয়ে যায়, তখন যোগ্যতার পরিবর্তে আত্মীয়তা ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়, যা অন্যায় ও বৈষম্যকে উৎসাহিত করে। রাসূল (ﷺ) খুত্ববার মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন,

إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوْا إِذَا سَرَقَ فِيْهِمُ الشَّرِيْفُ- تَرَكُوْهُ، وَإِذَا سَرَقَ فِيْهِمُ الضَّعِيْفُ أَقَامُوْا عَلَيْهِ الْحَدَّ، وَايْمُ اللهِ، لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ ابْنَةَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا

‘তোমাদের পূর্বের জাতিসমূহ ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, যখন তাদের মধ্যে কোন বিশিষ্ট লোক চুরি করত, তখন তারা তাকে শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দিত। অন্যদিকে যখন কোন সাধারণ লোক চুরি করত, তখন তার উপর হদ্দ জারি করত। আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত তাহলে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম’।[১৪] এতে বোঝা যায় যে, আইনের ক্ষেত্রে সমতা না থাকলে রাষ্ট্র টিকে না। সামাজিক অঙ্গনে স্বজনপ্রীতি একটি মারাত্মক ব্যাধি। স্বজনপ্রীতি সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে একটি হাদীছ এসেছে। নবী করীম (ﷺ) আমাদের বলেছেন, إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ بَعْدِى أَثَرَةً وَأُمُوْرًا تُنْكِرُوْنَهَا- ‘আমার পরে তোমরা অবশ্যই স্বজনপ্রীতিকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করবে এবং এমন কিছু বিষয় দেখতে পাবে, যা তোমরা পসন্দ করবে না’।[১৫]

কোন সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাতিত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সত্য সাক্ষ্য দানে অবিচল থাক এবং কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর, যা আল্লাহভীতির অধিকতর নিকটবর্তী। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সকল কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৮)।

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, مَنْ نَصَرَ قَوْمَهُ عَلَى غَيْرِ الْحَقِّ، فَهُوَ كَالْبَعِيْرِ الَّذِيْ رُدِّيَ، فَهُوَ يُنْزَعُ بِذَنَبِهِ- ‘যে ব্যক্তি তার গোত্রের লোকদেরকে অন্যায়ভাবে সাহায্য করে, সে ঐ উটের মত, যেটিকে গর্তে পড়ার পর তার লেজ ধরে টানা হচ্ছে’।[১৬] অর্থাৎ লেজ ধরে টেনে উটকে উদ্ধার করা যেমন সম্ভব নয়, ঐরূপ ব্যক্তিকে তেমন জাহান্নাম থেকে বাঁচানোও কঠিন।

স্বজনপ্রীতির কারণে যোগ্য ব্যক্তি থাকতেও অযোগ্য লোকেরা দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। হাদীছে এসেছে, আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘একদিন রাসূল (ﷺ) লোকেদের সাথে কথা বলছিলেন। এমন সময় এক বেদুইন এসে প্রশ্ন করল, ক্বিয়ামত কখন হবে? উত্তরে তিনি বললেন, আমানত যখন নষ্ট করা হবে তখন ক্বিয়ামতের প্রতীক্ষা কর। লোকটি প্রশ্ন করল, তা কিভাবে নষ্ট করা হবে? তিনি বললেন, কাজের দায়িত্ব যখন অনুপযুক্ত লোককে দেয়া হবে তখন ক্বিয়ামতের প্রতীক্ষা কর।[১৭] বর্তমান যুগ স্বার্থপরতার যুগ। ব্যক্তিস্বার্থ, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব যেন সর্বত্র অনুপ্রবেশ করেছে। এ কারণে যোগ্য ব্যক্তিরা তাদের নায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের কারণে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আল্লাহ আমাদেরকে অন্তরের এই ধ্বংসাত্মক রোগ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!!

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* মুর্শিদাবাদ, ভারত।

তথ্যসূত্র :
[১]. তিরমিযী, হা/২৫১৮।
[২]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৬৬৭; ইবনু মাজাহ, হা/৭৯, ৪১৬৮।
[৩]. ইবনু মাজাহ, হা/২৩৪০, ২৩৪১; ছহীহুল জামি‘, হা/৭৫১৭; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৫০।
[৪]. ছহীহ মুসলিম, হা/১০১-১০২, ১৮৪-১৮৫; আবূ দাঊদ, হা/৩৪৫২; ইবনু মাজাহ, হা/২২২৪।
[৫]. তিরমিযী, হা/১৩১৫।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৭৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩১৯; তিরমিযী, হা/১৯২২।
[৭]. তিরমিযী, হা/১৯৬৪; আবূ দাঊদ, হা/৪৭৯০।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/২১৬১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫২৩; নাসাঈ, হা/৪৪৯৩, ৪৪৯৪।
[৯]. তিরমিযী, হা/১২২৩।
[১০]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৬৫।
[১১]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৫৯।
[১২]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬১৩।
[১৩]. আবূ দাঊদ, হা/৪৯০২; তিরমিযী, হা/২৫১১; ইবনু মাজাহ, হা/৪২৮৬।
[১৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৭৫।
[১৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৭০৫২; তিরমিযী, হা/২১৯০।
[১৬]. আবূ দাঊদ, হা/৫১১৭।
[১৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৯৬।




প্রসঙ্গসমূহ »: নীতি-নৈতিকতা রাজনীতি
শরী‘আত অনুসরণের মূলনীতি (২য় কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ইসলামী তাবলীগ বনাম ইলিয়াসী তাবলীগ (শেষ কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ছয়টি মূলনীতির ব্যাখ্যা (৪র্থ কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
ইয়ামানের কুখ্যাত জঙ্গীগোষ্ঠী হুতী শী‘আদের মুখোশ উন্মোচন - শায়খ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী
রামাযান : কুরআন নাযিলের মাস - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ছালাতের সঠিক সময় ও বিভ্রান্তি নিরসন (৩য় কিস্তি) - মাইনুল ইসলাম মঈন
বিদ‘আত পরিচিতি (৩২তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ঘুম ও রাত্রিকালীন দু‘আ ও যিকর - আবূ মাহী
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৯ম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
আধুনিক যুগে দাওয়াতী কাজের পদ্ধতি (২য় কিস্তি) - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
আল-কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত (৭ম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইসলামে দারিদ্র্য বিমোচনের কৌশল - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ