বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কারে আলিমগণের গৃহীত মূলনীতিসমূহ: একটি পর্যালোচনা
- ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
(৮ম কিস্তি)
৭. প্রতিভাদীপ্ত ও আল্লাহভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা (Establishing talented and pious leadership)
ধর্মীয় সংস্কারের চ্যালেঞ্জিং এ কাজ সুষ্ঠু ও সফলতার সাথে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন একজন দক্ষ ও সাহসী নেতা। যিনি হবেন প্রতিভাদীপ্ত, তাক্বওয়া সম্পন্ন, ন্যায়পরায়ণ, দূরদর্শী, দৃঢ়প্রত্যয়ী ও অত্যন্ত সাহসী। মূলত নেতৃত্ব হলো- নেতার সেই সকল নৈতিক ও ও চারিত্রিক গুণাবলী, যা অন্যদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে অনুপ্রেরণা দিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে এবং অন্যদের কর্মধারা প্রভাবিত করে ও অন্যদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে।[১] এ কারণে নেতৃত্বকে সামাজিক গুণ হিসেবে অভিহিত করা হয়। যোগ্য নেতৃত্বের ফলে সংস্কার আন্দোলন অতি দ্রুত উন্নতি লাভ করে। আবার অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে আন্দোলন ধ্বংস হয়। এছাড়া নেতৃত্বের পদস্খলন হলে সমাজের পদস্খলন আবশ্যক হয়ে পড়ে। যুগে যুগে আল্লাহ যে কয়টি হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে সমাজকে ধ্বংস করে দিয়েছেন তার প্রধান কারণ ছিল দুনিয়াপূজারী ও নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী হটকারী নেতৃত্ব। তাদের কারণেই সমাজের সাধারণ মানবতা ধ্বংসে পতিত হয়েছিল। সুতরাং বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন প্রতীভাদীপ্ত ও আল্লাহভীরু নেতৃত্ব।
জাহিলী সমাজের তমসাচ্ছন্ন দিকভ্রান্ত জাতিকে সত্য পথে ফিরিয়ে আনার জন্য আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে নেতৃত্বের অসাধারণ গুণাবলী দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ شَاہِدًا وَّ مُبَشِّرًا وَّ نَذِیۡرًا-وَّ دَاعِیًا اِلَی اللّٰہِ بِاِذۡنِہٖ وَ سِرَاجًا مُّنِیۡرًا
‘হে নবী! আমরা আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে। এছাড়া তাঁর নির্দেশে তাঁর দিকে আহ্বানকারী হিসেবে এবং উজ্জ্বল প্রদীপ রূপে’ (সূরা আল-আহযাব : ৪৫-৪৬)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَ مَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ اِلَّا رَحۡمَۃً لِّلۡعٰلَمِیۡنَ ‘আমরা আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ১০৭)। উক্ত আয়াতদ্বয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছয়টি বৈশিষ্ট্যে কথা বলা হয়েছে। যথা: তাঁর উম্মতের ভাল-মন্দ কর্মের সাক্ষী, সুসংবাদদাতা, ভয় প্রদর্শনকারী, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী, উজ্জ্বল নমুনা এবং অনুগ্রহশীল।[২] তাই একজন যোগ্য নেতাকে নেতৃত্বসুলভ ও সকল উত্তম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া যরূরী। যাতে করে তাকে অনুসরণ করা হয়। কেননা ইসলামে আল্লাহ তা‘আলা এবং রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্যের সাথে সাথে যোগ্য নেতৃত্বেরও আনুগত্যের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَ اَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ وَ اُولِی الۡاَمۡرِ مِنۡکُمۡ ۚ فَاِنۡ تَنَازَعۡتُمۡ فِیۡ شَیۡءٍ فَرُدُّوۡہُ اِلَی اللّٰہِ وَ الرَّسُوۡلِ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ ذٰلِکَ خَیۡرٌ وَّ اَحۡسَنُ تَاۡوِیۡلًا
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে যিনি ঊলুল আমর তার। যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়, তবে সে বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনয়ন করে থাক। এটাই কল্যাণকর ও শ্রেষ্ঠ পরিসমাপ্তি’ (সূরা আন-নিসা : ৫৯)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর ছাহাবীদেরকে অছিয়াত করে বলেন, أُوصِيْكُمْ بِتَقْوَى اللهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ عَبْدًا حَبَشِيًّا ‘আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতির অছিয়ত করছি এবং তোমাদের (আমীরের) আদেশ শুনতে ও মান্য করতে উপদেশ দিচ্ছি, যদিও তিনি একজন হাবশী গোলাম হন’।[৩]
ইসলামী শরী‘আতে নেতার আনুগত্য করা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোন আদর্শ বিজয়ের আবশ্যিক পূর্বশর্ত হলো যথাযথভাবে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য পোষণ করা। এ আনুগত্যের সামান্য ঘাটতি থাকলে সফলতা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। নিম্নের হাদীছে নেতৃত্বের আনুগত্যের স্পষ্ট ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে। ‘আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত,
أَنَّ النَّبِىَّ ﷺ بَعَثَ جَيْشًا وَأَمَّرَ عَلَيْهِمْ رَجُلًا فَأَوْقَدَ نَارًا وَقَالَ ادْخُلُوْهَا فَأَرَادُوْا أَنْ يَدْخُلُوْهَا وَقَالَ آخَرُوْنَ إِنَّمَا فَرَرْنَا مِنْهَا فَذَكَرُوْا لِلنَّبِىِّ ﷺ فَقَالَ لِلَّذِيْنَ أَرَادُوْا أَنْ يَدْخُلُوْهَا لَوْ دَخَلُوْهَا لَمْ يَزَالُوْا فِيْهَا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَقَالَ لِلآخَرِيْنَ لَا طَاعَةَ فِىْ مَعْصِيَةٍ إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِى الْمَعْرُوْفِ
‘একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি ক্ষুদ্র সেনাদল পাঠালেন এবং এক ব্যক্তিকে তাঁদের ‘আমীর’ নিযুক্ত করে দিলেন। তিনি (আমীর) আগুন জ্বালালেন এবং বললেন, তোমরা এতে প্রবেশ কর। কতক লোক তাতে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল। তখন অন্যরা বলল, আমরা তো (মুসলিম হয়ে) আগুন থেকে পালাতে চেয়েছি। অতঃপর তারা এ ঘটনা নবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট জানাল। তখন যারা আগুনে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন তাদেরকে বললেন, যদি তারা তাতে প্রবেশ করত তাহলে ক্বিয়ামত পর্যন্তই সেখানেই থাকত। আর অন্যদেরকে বললেন, আল্লাহর নাফরমানীর কাজে কোনরূপ আনুগত্য নেই। আনুগত্য করতে হয় কেবল ন্যায়সঙ্গত কাজে’।[৪]
যোগ্য নেতাকে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শক্তিতে বলিয়ান হতে হয়। আর আধ্যাত্মিক শক্তি ও নৈতিক উন্নয়নের জন্য তাক্বওয়া অবলম্বনের কোন বিকল্প নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সহ তাঁর পরবর্তীতে যারাই মুসলিম জাতির নেতৃত্ব প্রদান করেছেন তারা সকলেই মজবুত তাকওয়ার অধিকারী ছিলেন। আর সমাজ সংস্কারের জন্য একজন যোগ্য নেতার দৃঢ় ঈমান ও তাক্বওয়া অর্জনের গুণাবলী খুবই যরূরী। দ্বীনের প্রথম মুজাদ্দিদ ও পঞ্চম খলীফা খ্যাত ‘উমার ইবনু ‘আব্দিল ‘আযীয (৬১-১০১ হি./৬৮১-৭২০ খ্রি.) (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন তাক্বওয়া ও সহজ সরল জীবনের প্রতিচ্ছবি। তাঁর অনন্য গুণ হলো আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে তাঁর প্রতি অনুগত থাকা ও জান্নাতের তীব্র বাসানা। যুবক ‘উমার ইবনু ‘আব্দিল ‘আযীয (ﷺ)-এর দৃঢ় ঈমান ও আল্লাহভীতি তাঁকে আল্লাহর পথে অনুগত করে রেখেছিল।[৫] অনুরূপভাবে শায়খুল ইসলাম ‘আল্লামা ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (৬৬১-৭২৮ হি./১২৬৩-১৩২৮ খ্রি.)ও (রাহিমাহুল্লাহ) তাক্বওয়ার উপর ভিত্তি করেই সংস্কার কাজ পরিচালনা করেছেন।[৬] তিনি অতুলনীয় তাক্বওয়ার উপর ভিত্তি করে ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি, দর্শনশাস্ত্র, ইতিহাস, গণিত, রসায়ন এবং বিজ্ঞান শাখার প্রায় সকল শাখা সহ মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে ‘ইলমী জাগরণের মাধ্যমে সার্বিক সংস্কার কার্যক্রমে যোগ্য নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন।
সংস্কার আন্দোলনের ক্ষেত্রে ক্রসেড বিজেতা সুলতান ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী (১১৩৮-১১৯৩ খ্রি.) এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি ছিলেন সর্বোত্তম সাংগঠনিক যোগ্যতা ও অতুলনীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নেতৃত্বের অধিকারী। তিনি কেবল সিপাহসালার ও বিজেতাই ছিলেন না; বরং জনপ্রিয় নেতা ও সকলের কাছেই গ্রহণযোগ্য সিপাহীও ছিলেন। কয়েক শতাব্দী পর বিক্ষিপ্ত ও বিস্তৃত ইসলামী রাজ্যকে তিনি জিহাদের পতাকাতলে সমবেত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে মুসলিম বিশ্ব একটি সুসংগঠিত সংগ্রাম পরিচালনা করে, যার লক্ষ্যই ছিল মুসলিম উম্মাহর হেফাযত করা। বায়তুল মাক্বদিছ বিজয়ের প্রাক্কালে সুলতান ছালাহুদ্দীন খ্রিষ্টান জগতের মোবাবেলায় মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন যুদ্ধের পর তিনি হিত্তিন তথা ফিলিস্তীন প্রান্তরে ১৪ই রবীউল আউয়াল ৫৮৩ হিজরী মুতাবেক ৪ঠ জুলাই ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ক্রসেডার খ্রিষ্টানদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে সুলতান ছালাহুদ্দীন আইয়ূবের উদারতা, মহত্ত্ব ও ইসলামী চরিত্রের কথা উল্লেখ করে ঐতিহাসিক লেনপুল বলেন,
"If the taking jerusalem were the only fact known about saladin, it were enough to prove him the most chivalrous and great-hearted conqueror of this own and perhaps of any age".
‘সুলতান ছালাহুদ্দীনের সমস্ত গুণের ভেতর কেবল এ একটি গুণের কথা যদি দুনিয়া জানত, যদি জানতে পারত তিনি কিভাবে জেরুজালেমকে অনুগৃহীত করেছিলেন, তাহলে তারা একবাক্যে স্বীকার করত, সুলতান ছালাহুদ্দীন কেবল তার যুগের নন, বরং সর্বযুগের সর্বাপেক্ষা উন্নত মনোবলসম্পন্ন হৃদয়বান মানুষ এবং বীরত্ব ও ঔদার্যের জীবন্ত প্রতীক ছিলেন’।[৭]
ইসলামী পুনর্জাগরণে তার নেতৃত্বের প্রভাব ছিল অতুলনীয়। তিনি ইসলামকে সংরক্ষণ ও আল্লাহর রাস্তায় কাজ করা ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতেন না। ঐতিহাসিক লেনপুল যথার্থই বলেছেন,
"All the strength of Christendom concentrated in the third Crusade had not shaken Salasdin`s power. His soldiers many have murmured at their long months of hard and perilous service year after year, but they never refused to come to his summons and lay down their lives in his cause...."
‘তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধে সমগ্র খ্রিষ্টানজগতের মিলিত শক্তি মুসলিমদের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু ছালাহুদ্দীনের শক্তিতে তারা এতটুকু চিড় ধরাতে পারেনি। ছালাহুদ্দীনের সৈন্যরা মাসের পর মাস কঠিন পরিশ্রম এবং বছরের পর বছর বিপদসঙ্কুল খেদমতে নিয়োজিত থাকার কারণে ক্লান্তি ও অবসাদে ভেঙে পড়েছিল বটে, কিন্তু তাদের মুখে অভিযোগের লেশমাত্র ছিল না। তলব মাত্র হাজির হতে এবং একটি নেক কাজে নিজেদের জীবন কুরবানী দিতে তাদের কেউ পিছপা হয়নি’।[৮] একটু পরে তিনি বলেন,
"Kurds, Turkmans, Arabs and Egyptians, they were all Moslems and his servants when he called. In spite of their differences of race, their national jealousies and tribal pride, he had kept them togeher as one host-not without difficulty and twice or thrice, a critical waver."
‘কুর্দ, তুর্কমেন, আরব, মিশরীয় সমস্ত মুসলিমই ছিল সুলতানের খাদেম। তলব মাত্রই তারা খাদেমের মতই সুলতানের খেদমতে এসে হাজির হত। কে কোন্ বংশের কিংবা কে কোন্ জাতিগোষ্ঠীর, সেদিকে তাদের লক্ষ্য ছিল না। বর্ণ, বংশ, গোত্রগত বৈপরীত্য সত্ত্বেও সুলতান তাদেরকে এমন একটি অখণ্ড ও ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত করেছিলেন যে, গোটা বাহিনী যেন এক আত্মায় বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন। মনে হত সবাই যেন একই জাতিগোষ্ঠীর সদস্য’।[৯]
সাইয়িদ ইমাম আহমাদ শহীদ বেরীলভী (১২০১-১২৪৬ হি./১৭৮৬-১৮৩১ খ্রি.) (রাহিমাহুল্লাহ) ও শাহ ইসমাঈল শহীদ (১১৯৩-১২৪৬ হি./১৭৭৯-১৮৩১ খ্রি.) (রাহিমাহুল্লাহ) আল্লাহভীরু ও উন্নত নৈতিকতা সম্পন্ন নেতৃত্বের অধিকারী ছিলেন। যাদের যোগ্য ও ত্যাগী নেতৃত্বের কারণে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের ভীত কেঁপে ওঠে।
যোগ্য নেতার নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় সাইয়িদ আবুল হাসান আলী নদভী (মৃ. ১৯৯৯ খ্রি.) বলেন, ‘সামাজিক জীবনের দায়িত্ব সম্পাদন একটি বিরাট ধর্মীয় বিপ্লবের নেতৃত্ব, মুসলমানদের- যাদের মধ্যে বিভিন্ন স্বভাব, বিভিন্ন যোগ্যতা ও বিভিন্ন মেজাজের লোক রয়েছে, তাদের এক বিরাট দলের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব সম্পাদনের জন্য অত্যন্ত প্রশস্ত এবং বিভিন্নমুখী যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রয়োজন। যেহেতু সমাজে বিচিত্র রুচি, বিভিন্ন যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা-সম্পন্ন ব্যক্তির সমাবেশ ঘটে থাকে, সুতরাং এটাকে পরিচালনার জন্য জাগ্রত মেধা, উন্নত মস্তিষ্ক, মহা-উদ্যমী, প্রশস্ত হৃদয়, উদার ধৈর্যশীল, জ্ঞানী, বিবেকবান ও সূক্ষ্মদর্শী ব্যক্তিই যোগ্যতম। যিনি বিভিন্ন প্রকৃতি ও পরস্পরবিরোধী গুণসম্পন্ন লোকদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মশালা ও বিভাগ পরিচালনা করতে সক্ষম, যিনি দ্বীনী উন্নয়ন ও সাফল্যের লক্ষ্যে হরেক রকমের যোগ্যতা, প্রতিভা ও পারদর্শিতার মূল্য দিতে পারেন, প্রত্যেক স্তরের যোগ্যতাসম্পন্ন লোককে গঠন করার মাধ্যমে তার এমন উৎকর্ষ সাধনের ক্ষমতা রাখেন, যার দ্বারা তার সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হয় এবং যিনি এমন লোক হন যে, তার সংস্পর্শে এসে কোন লোকই নিজেকে অকেজো বা বেকার মনে করতে পারে না, তিনিই সমাজকে সফল নেতৃত্ব প্রদান করতে পারেন। ...
যিনি শত সহস্র কাজের ভিড়, নানা ঝামেলা ও একাধিক কর্মক্ষেত্রের কারণে কখনও বিরক্ত বা দিশাহারা হবেন না। বরং সকল দিকে সমভাবে লক্ষ্য রাখবেন এবং প্রতিটি কাজকর্ম সুন্দর, সুশৃঙ্খলভাবে সমাধা করবেন। যে কর্মক্ষেত্র যেভাবে প্রয়োজন সেভাবেই পরিচালিত করবেন। কেবল একদিকে ঝুঁকে পড়ে আত্মহারা হয়ে যাবেন না, যাতে অন্যান্য কর্মক্ষেত্র স্পন্দন হারিয়ে ফেলে। ...
এমনিভাবে সাধারণ্যে সাক্ষাৎ প্রদানের বেলায়ও তিনি অত্যন্ত উদার হবেন। বিভিন্ন যোগ্যতা ও নানান প্রকৃতির লোক যখন একাধিক প্রয়োজনে একেক উদ্দেশ্যে আগমন করবে, তখন তাদের প্রত্যেকর সাথে যথাযোগ্য আচরণ করবেন। ফলে প্রত্যেকের অন্তরে এ ধারণা স্থান লাভ করবে যে, যতখানি গভীর সম্পর্ক আমার সাথে আছে তা এমন সব ব্যক্তির সম্পর্ক অপেক্ষা উচ্চে ও ঊর্ধ্বে, যারা আমার চেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ও সর্বদা তার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন’।[১০]
উপরিউক্ত আলোচনায় সংস্কার আন্দোলনের জন্য তাক্বওয়াসম্পন্ন যোগ্য নেতৃত্বের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। তাই যদি যোগ্য নেতৃত্ব নির্ধারণ করা যায়, তাহলে সংস্কার আন্দোলনের সফলতা উন্মোচিত হবে। বাংলাদশেও ধর্মীয় সংস্কার কার্যক্রমে সুশৃঙ্খলভাবে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য বিভিন্ন সময় অসংখ্য যোগ্য আল্লাহভীরু ‘আলিমের আগমন ঘটেছে। যাদের প্রতীভাদীপ্ত যোগ্য নেতৃত্ব এবং নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলীর মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে। ফলে মুসলিম সমাজ থেকে প্রচলিত শরী‘আতের মনগড়া ব্যাখ্যা, শিরক-বিদ‘আত, কুসংস্কার, তাক্বলীদ বা অন্ধ অনুসরণ, হিন্দুয়ানী প্রথা-বিশ্বাস, অনৈসলামি কর্মকাণ্ডসমূহ, ভ্রান্তমতের প্রভাব, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, পুঁজিতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র, মহাজনী প্রথা, কুসীদ প্রথা বা সূদী কারবার প্রভৃতি কখনো হ্রাস পেয়েছে, আবার কখনো বাধার সম্মুখীন হয়েছে কিংবা কখনো কখনো সমূলে উৎপাটিত হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তি হলেন, মাওলানা হাজী শরীয়াতুল্লাহ (১১৯৬-১২৫৬ হি./১৭৮১-১৮৪০ খ্রি.), সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীর (১১৯৭-১২৪৬ হি./১৭৮২-১৮৩১ খ্রি.), মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮ খ্রি.), মাওলানা আব্দুল্লাহেল বাকী (১৮৮৬-১৯৫৬ খ্রি.), মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফী আল-কুরাইশী (১৩১৮-১৩৮০ হি./১৯০০-১৯৬০ খ্রি.), মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (১৯১৮-১৯৮৭ খ্রি.) প্রমুখ অন্যতম।
৮. নিবেদিতপ্রাণ একদল প্রশিক্ষিত কর্মী গঠন (Formation of a dedicated team of Trained staff)
নিবেদিতপ্রাণ একদল প্রশিক্ষিত কর্মী সংস্কার আন্দোলনের ভিত্তিস্বরূপ। যোগ্য নেতার হাতে কোন দায়িত্ব অর্পিত হলেও যদি নিবেদিতপ্রাণ কর্মীবাহিনী না থাকে, তাহলে উদ্দেশ্য অর্জন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। যদি একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ ড্রাইভারের সাথে কিছু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হেলপার না থাকে, তাহলে যেমন ড্রাইভার একটি গাড়ি সুন্দরভাবে ও নিরাপদে গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে না। তেমনিভাবে নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বাহিনী ব্যতীত শুধু একজন নেতার মাধ্যমে কোন কাজ, সংস্থা ও সংগঠনকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এজন্য বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে পরিলচালনার জন্য যোগ্য নেতৃত্বের সাথে সাথে নিবেদিতপ্রাণ একদল প্রশিক্ষিত কর্মী গঠন করা প্রয়োজন। যারা পারস্পরিক ভ্রাতৃসুলভ ঈমানী সম্পর্ক, মজবুত ঈমান, আল্লাহভীতি, আদর্শের সুস্পষ্ট জ্ঞান, পূর্ণ আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, কর্মস্পৃহা, সাহসিকতা, চারিত্রিক মাধুর্য, হক্বের পক্ষে সদা সোচ্চার, কর্মসূচি ও কর্মপদ্ধতির যথার্থ অনুধাবন এবং দ্বীমুখী নীতি থেকে মুক্তা থাকা সহ প্রভৃতি গুণে গুণান্বিত হবেন। তাইতো দেখা যায় যে, প্রত্যেক নবী-রাসূলের কর্মীবাহিনী ছিল। যারা তাদের কর্মীদের তাযকিয়া বা পরিশুদ্ধি এবং তারবিয়্যাহ বা পরিচর্যার মাধ্যমে যোগ্য করে গড়ে তুলেছিলেন। হাদীছে এসেছে,
عَنِ ابْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ مَا مِنْ نَبِىٍّ بَعَثَهُ اللهُ فِىْ أُمَّةٍ قَبْلِىْ إِلَّا كَانَ لَهُ فِىْ أُمَّتِهِ حَوَارِيُّوْنَ وَأَصْحَابٌ يَأْخُذُوْنَ بِسُنَّتِهِ وَيَقْتَدُوْنَ بِأَمْرِهِ ثُمَّ إِنَّهَا تَخْلُفُ مِنْ بَعْدِهِمْ خُلُوْفٌ يَقُوْلُوْنَ مَا لَا يَفْعَلُوْنَ وَيَفْعَلُوْنَ مَا لَا يُؤْمَرُوْنَ فَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِيَدِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِلِسَانِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِقَلْبِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَيْسَ وَرَاءَ ذَلِكَ مِنَ الْإِيْمَانِ حَبَّةُ خَرْدَلٍ
ইবন মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমার পূর্বে আল্লাহ এমন কোন নবীকে তাঁর উম্মতের মধ্যে প্রেরণ করেননি, যাদের মধ্যে তাঁর জন্য ‘হাওয়ারী’ এবং সাথীবৃন্দ ছিল না। তারা তাদের নবীর সুন্নাত গ্রহণ করত এবং তাঁর আদেশ-নিষেধের অনুসরণ করত। অতঃপর এমন সব লোক তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো, তারা এমন কথা বলত, যা নিজেরা করত না। নিজেরা এমন কাজ করত, যার নির্দেশ তাদের দেয়া হয়নি। অতএব যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজের হাত দ্বারা জিহাদ করবে, সে মুমিন। যে ব্যক্তি যবান দ্বারা জিহাদ করবে, সেও মুমিন এবং যে ব্যক্তি অন্তর দ্বারা জিহাদ করবে, সেও মুমিন। এরপর এক সরিষাদানা পরিমাণও ঈমান নেই’।[১১]
মূসা (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর সাথীগণ সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আল্লাহর রহমতে ফেরাঊন বাহিনীর উপর্যপুরী অস্বীকৃতি ও হঠকারিতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। পরিশেষে তাঁদেরকে আল্লাহ বিজয়ী করেন এবং ফেরাঊন ও তার কাফির বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।[১২] ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এরও কর্মী বাহিনী ছিল, যারাও পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য একত্রে সংগ্রাম করেন।[১৩] অনুরূপভাবে আল্লাহ দ্বীন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ছাহাবীগণও কঠিন ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
তাদের সম্পর্কে প্রখ্যাত গবেষক ও ঐতিহাসিক সাইয়িদ আবুল হাসান ‘আলী নদভী (মৃ. ১৯৯৯ খ্রি.) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বৈঠক থেকে তাদের দৃঢ়তা ও সংহতি, প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রেজামন্দির সত্যিকার কামনা এবং এ পথে নিজেদের মিটিয়ে দেয়ার অভ্যাস, জান্নাতের প্রতি অনুরাগ, ‘ইলম তথা জ্ঞানের প্রতি লোভ ও আকর্ষণ এবং দ্বীনের উপলব্ধি ও আত্মজিজ্ঞাসার গুণ লাভ করে। তারা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আনুগত্য করতেন। যে অবস্থায় থাকুক না কেন, তাঁরা আল্লাহর রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এসব লোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে ১০ বছরে ২৭ বার জিহাদের জন্য বেরিয়েছেন এবং তাঁর হুকুমে শতাধিক অভিযানে গমন করেছেন। তাদের পক্ষে দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কহীনতা খুবই সহজসাধ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। পরিবার-পরিজনের জন্য দুঃখ-কষ্ট ও বিপদাপদ সহ্য করায় তারা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতিটি কথা মেনে নেয়া তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল’।[১৪]
একটু পরে তিনি আরো বলেন, ‘তারা বিপদে-আপদে যেমন ঘাবড়ে যেতেন না, তেমনি কোন নে‘আমত বা অনুগ্রহ পেয়েও ফুলে উঠতেন না। দারিদ্র্য তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারত না। সম্পদ তাদেরকে নাফরমানীতে উসকে দিতে পারত না। ব্যবসা-বাণিজ্য তাদের গাফিল বা অলস বানাতে পারত না। কোন শক্তিকেই তারা ভয় পেতেন না। প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক, তাতে দমে যেতেন না। আল্লাহর যমীনে দর্পভরে চলার কল্পনাও তাঁরা করতেন না। ভাংচুর করা কিংবা ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হওয়ার ধারণাও তাদের মনে স্থান পেত না। মানুষের জন্য তারা ছিলেন ন্যায় ও সুবিচারের মানদণ্ড। তাঁরা ইনসাফের পতাকাবাহী ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলার সাক্ষী ছিলেন আর সাক্ষ্য স্বয়ং তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে গেলেও, এমনকি পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিপক্ষে হলেও তারা বিন্দুমাত্র পরোয়া করতেন না। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তার গোটা যমীনকেই তাদের পদতলে নিক্ষেপ করলেন এবং সমগ্র পৃথিবী তাদের করতলে সমর্পণ করলেন। তখন তারা গোটা পৃথিবীরই সংরক্ষক ও আল্লাহর দ্বীনের আহ্বায়কে পরিণত হলেন। এমনকি তাদেরকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর স্থলাভিষিক্ত বানালেন’।[১৫]
বাংলাদেশে সংস্কার আন্দোলনের জন্য অনুরূপ প্রশিক্ষিত একদল কর্মী গড়ে তোলা প্রয়োজন। যারা জাহিলিয়াতের ময়দানে ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ প্রতিকূল পরিবেশে যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হন, তখন ধৈর্যের বাঁধনকে আরো শক্ত করেন। আর যখন তাকে দ্বীনি বসন্ত স্বাগত জানায়, তখন তিনি আল্লাহর সামনে অবনত মস্তকে হৃদয় নিংড়ানো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাই কোন কর্মী সাফল্যের সোপানে দাঁড়িয়ে যেকোন অনৈতিক কাজকে সিংহের আক্রমণের চেয়েও বেশী ভয় পান। তিনি যেকোন মুহূর্তে জীবন দিতে প্রস্তুত থাকেন, কিন্তু আদর্শকে কখনো জলাঞ্জলি দেন না। কারণ আদর্শ চির অম্লান।
বাংলাদেশে সংস্কার কার্যক্রমের কর্মীদের পারম্পরিক সম্পর্কের দৃঢ়তা ও পরস্পর আমানতের সন্দেহ দূর করার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ দু’টিতে ঘাটতি দেখা দিলে ঐক্যবদ্ধ শক্তি যেমন বিনষ্ট হবে, তেমনি সংস্কার কার্যক্রমের সফলতা ব্যর্থ হবে। যা কখনো কাম্য নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছাহাবীগণ ধ্বংসাত্মক এ বিষয়গুলোর ব্যাপারে বেশী সোচ্চার ছিলেন। তাঁরা পারস্পরিক সম্পর্ককে সর্বদা পরকালীন স্বার্থে অটুট রাখতেন এবং অন্যের আমানতে সন্দেহপ্রবণ থেকে দূরে ছিলেন। আনছার ও মুহাজিরদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,
لِلۡفُقَرَآءِ الۡمُہٰجِرِیۡنَ الَّذِیۡنَ اُخۡرِجُوۡا مِنۡ دِیَارِہِمۡ وَ اَمۡوَالِہِمۡ یَبۡتَغُوۡنَ فَضۡلًا مِّنَ اللّٰہِ وَ رِضۡوَانًا وَّ یَنۡصُرُوۡنَ اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ ؕ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الصّٰدِقُوۡنَ- وَ الَّذِیۡنَ تَبَوَّؤُ الدَّارَ وَ الۡاِیۡمَانَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ یُحِبُّوۡنَ مَنۡ ہَاجَرَ اِلَیۡہِمۡ وَ لَا یَجِدُوۡنَ فِیۡ صُدُوۡرِہِمۡ حَاجَۃً مِّمَّاۤ اُوۡتُوۡا وَ یُؤۡثِرُوۡنَ عَلٰۤی اَنۡفُسِہِمۡ وَ لَوۡ کَانَ بِہِمۡ خَصَاصَۃٌ ؕ۟ وَ مَنۡ یُّوۡقَ شُحَّ نَفۡسِہٖ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ
‘এ ধন-সম্পদ দেশত্যাগী নিঃস্বদের জন্য, যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি লাভের অন্বেষণে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্যার্থে নিজেদের বাস্তুভিটা ও ধন-সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারাই সত্যবাদী। যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদীনায় বসবাস করেছিল এবং ঈমান আনয়ন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে, মুহাজিরদের যা দেয়া হয়েছে, তজ্জন্য তার অন্তর ঈর্ষাপোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত তারাই সফলকাম’ (সূরা আল-হাশর: ৮-৯)।
তাই বাংলাদেশে মুসলিম সমাজের সার্বিক সংস্কার সাধনের জন্য যোগ্য নেতা এবং প্রশিক্ষিত ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীবাহিনীর সমন্বিত প্রয়াস অত্যন্ত জরুরী। যা উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রস্ফুটিত হয়েছে। এজন্য এদেশে সংস্কারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এমন কর্মীবাহিনী গঠন করা দরকার, যারা ছাহাবীগণের আদলে দৃঢ় ঈমান, তাক্বওয়া ও ‘আমলের পাবন্দী হবেন এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ী হবেন। তাহলেই সংস্কার আন্দোলনের কাক্সিক্ষত সফলতা দরজায় এসে কড়া নাড়বে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ‘আলিমসমাজও নিবেদিতপ্রান কর্মীবাহিনী তৈরি করেছেন এবং সংস্কার কাজের আঞ্জাম দিয়েছেন। যেমন,
মাওলানা হাজী শরীয়াতুল্লাহ (১১৯৬-১২৫৬ হি./১৭৮১-১৮৪০ খ্রি.) মক্কা থেকে ১৮০২ সালে দেশে ফিরে আসার পর সমাজ সংস্কার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এসময় তিনি দারস-তাদরীস, তাযকিয়া ও তারবিয়াতের মাধ্যমে জনগোষ্ঠী তৈরি করার কাজে মনোনিবেশ করেন। তিনি তাদের মাঝে ইসলামের সঠিক ও সৌন্দর্যগুলো তুলে ধরেন এবং ইসলামী শরী‘আতের আবশ্য পালনীয় দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো শিক্ষাদানে রত থাকেন। এভাবে তিনি অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মীবাহিনী গঠন করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ‘ফারায়েজী আন্দোলন’-এর মাধ্যমে উক্ত কর্মীবাহিনীও সমাজ সংস্কারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যথেষ্ট অবদান রাখেন।[১৬]
সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীর (১১৯৭-১২৪৬ হি./১৭৮২-১৮৩১ খ্রি.) অনুরূপ কর্মী তৈরির প্রচেষ্টা করেন। তিনি কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মুসলিম সমাজে দা‘ওয়াহ সম্প্রসারণ এবং ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংস্কার কাজ শুরু করেন। তখন ক্রমান্বয়ে অসংখ্য লোক তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এভাবে তিনি একদল সাহসী ও প্রশিক্ষিত কর্মী গঠন করতে সক্ষম হন। অতঃপর তিতুমীর তাদের সঙ্গে নিয়ে নারিকেলবাড়িয়ার বাঁশের কেল্লা কেন্দ্র থেকে হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে বীরদর্পে যুদ্ধ করেন। যদিও আধুনিক ও উন্নত সশস্ত্র জমিদার বাহিনীর সাথে লাঠিসোটা, তলোয়ার ও তীর-বল্লমের মত বলা যায় নিরস্ত্র তিতুমীর বাহিনী পরাজয় বরণ করেন এবং শাহাদাত বরণ করেন কিন্তু তিনিও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী গঠনের মাধ্যমে সংস্কার কাজ করেছিলেন।[১৭] অনুরূপভাবে মাওলানা বেলায়েত আলী (১২০৫-১২৬৯ হি./১৭৯০-১৮৫২ খ্রি.), মাওলানা এনায়েত আলী (১২০৭-১২৭৪ হি./১৭৯৩-১৮৫৮ খ্রি.), মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮ খ্রি.), মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফী আল-কুরাইশী (১৩১৮-১৩৮০ হি./১৯০০-১৯৬০ খ্রি.), মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (১৯১৮-১৯৮৭ খ্রি.) এবং প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আবদুল বারী (১৯৩০-২০০৩ খ্রি.) সহ প্রমুখ ‘উলামায়ে কিরাম ধর্মীয় সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যোগ্য কর্মী গঠন করেন।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
তথ্যসূত্র :
[১] মোঃ লুৎফর রহমান ও এ. কে. এম শওকত আলী খান, সমাজ মনোবিজ্ঞান (ঢাকা : গ্রন্থ কুটির, ২০০৯ খ্রি.), পৃ. ২২২; ড. এমাজউদ্দীন আহমাদ, উচ্চ মাধ্যমিক পৌরনীতি (ঢাকা : বাংলাদেশ বুক কর্পোরেশন লিমিটেড, ১ম প্রকাশ, জুলাই ১৯৯৮), পৃ. ৩০৯।
[২] তাইসীরুল কারীমির রহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান, পৃ. ৬৬৭।
[৩] ইমাম আবূ দাঊদ, আস-সুনান, পৃ. ৮৩২, হাদীছ নং-৪৬০৭, ‘সুন্নাহ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৬।
[৪] ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল, আল-মুসনাদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৪, হাদীছ নং-৭২৪; ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, পৃ. ১১৬৪, হাদীছ নং-৭২৫৭ ‘খবরে ওয়াহেদ’ অধ্যায়-৯৫, অনুচ্ছেদ-১; ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, পৃ. ৬০৯, হাদীছ নং-১৮৪০; মিশকাতুল মাসাবীহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৫৬, হাদীছ নং-৫৯৫৪।
[৫] আল্লামা সাইয়িদ আবুল হাসান ‘আলী আন-নাদভী, রিজালুল ফিকরী ওয়াদ দা‘ওয়াতি ফিল ইসলাম, ১ম খণ্ড (বৈরূত : দারু ইবনি কাসীর, ১৪২৮ হি./২০০৭ খ্রি.), পৃ. ৬৮-৬৯।
[৬] ইসলাম ইবন ‘ঊমাইসী আল-হুসামী আল-‘আবাদী, সীরাতু শাইখিল ইসলাম (ইবন তাইমিয়্যাহ) হিকায়াতিহি মা‘আ আবনাই যামানিহি (‘আম্মান : দারু ইবনি কাসীর, ১ম সংস্করণ ১৪২৭হি./২০০৬ খ্রি.), পৃ. ৫৫-৫৬।
[৭] মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?, পৃ. ১৬৮।
[৮] প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৯।
[৯] প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৯-১৭০।
[১০] প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৯-১৭০।
[১১] ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, পৃ. ৪১, হাদীছ নং-৫০ ‘ঈমান’ অধ্যায়-১, অনুচ্ছেদ-২০; ইমাম বায়হাকী, সুনানুল কুবরা, ১০তম খণ্ড, পৃ. ৯০, হাদীছ নং-১৯৯৬৫; মিশকাতুল মাসাবীহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৪, হাদীছ নং-১৫৭।
[১২] সূরাহ আশ-শু‘আরা : ৬০-৬৭।
[১৩] সূরাহ আস-সাফ : ১৪।
[১৪] মাযা খাসিরা ‘আলিমু বি ইনহিতাতিল মুসলিমীন, পৃ. ৮৪-৮৫।
[১৫] প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৫।
[১৬] মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, বাংলায় মুসলিম পুনর্জাগরণে ‘আলিম ও বুদ্ধিজীবীগণের ভূমিকা, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (অপ্রকাশিত থিসিস), জুন ২০১২, পৃ. ২৪১-২৫৫।
[১৭] হাজী শরীয়ত উল্লাহ’র ফারায়েজী আন্দোলন, পৃ. ৬, ৮-১১।
প্রসঙ্গসমূহ »:
সমাজ-সংস্কার