শনিবার, ১৩ Jun ২০২৬, ০৫:১৯ অপরাহ্ন

সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব 

-হাসিবুর রহমান বুখারী* 


(৯ম কিস্তি) 

নবম চক্রান্ত

সুন্নাহ বিরোধী কুরানিস্ট বা আহলে কুরআন নামক অন্ধবিশ্বাসীরা দাবী করে যে, ‘হাদীছ বা সুন্নাত মানার কারণেই আজ মুসলিম উম্মাহ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে’! তাদের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ হল- ‘পবিত্র কুরআনুল কারীম ঐক্যের প্রতি আহ্বান করে, উম্মাতের ঐক্য, একাত্মতা গঠন, একতাবদ্ধ থাকার প্রতি এবং উম্মাহর শক্তি একত্রীকরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এবং যা-ই সেই ঐক্যের পথে প্রতিবন্ধক হতে পারে তা দূর করার নির্দেশ দিয়েছে। সুতরাং সমস্ত সংগঠনের দেহ ও শক্তিকে একত্রিত করা এবং সকলকে একই ছাতার ছায়াতলে একীভূত করা যরূরী। আর এমন সবকিছুই নির্মূল করতে হবে যা এই ঐক্য বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে, যেমন মুসলিমদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী কিছু সুন্নাহ এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক হাদীছ!’ নাউযুবিল্লাহ![১]

পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে পলায়নকারী, সুন্নাহ বিরোধীদের একজন কুখ্যাত ইবলীস, পথভ্রষ্ট আহলে কুরআনের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ‘লাহোরের আব্দুল্লাহ জাকরালাবী’ বলে,

لا ترتفع الفرقة والتشتت عن المسلمين، ولن يجمعهم لواء، ولا يضمهم مكتب فكر موحد ما بقوا متمسكين بروايات زيد وعمر

‘মুসলিমদের মধ্য থেকে বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা দূরও হবে না, এবং তাদেরকে কোন একটি পতাকার তলদেশে একত্রিত করাও সম্ভব হবে না, এবং তাদের একক চিন্তাধারার অধীনে আনাও সম্ভব নয়- যতক্ষণ পর্যন্ত তারা যায়িদ ও উমারের (অর্থাৎ অমুক অমুক ব্যক্তির) বর্ণনাগুলোকে আঁকড়ে ধরে থাকবে’।[২] এই চক্রান্ত ও অপব্যাখ্যার ব্যাখ্যা করে অপর একজন সুন্নাহ বিরোধী কুখ্যাত ইবলীস ‘হাশমত আলী খালীফাহ আব্দুল্লাহ’ বলেছে,

لن تتحقق وحدة المسلمين ما لم يتركوا كتبهم الموضوعة في طاعة الرسول صلى الله عليه وسلم، ولن يروا سبيل الرقي والتقدم ما لم يمح عنهم التشتت والفرقة

‘মুসলিমদের ঐক্য ততক্ষণ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে না, যতক্ষণ না তারা রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্যের উদ্দেশ্যে সংকলিত তাদের মনগড়া বইগুলো পরিত্যাগ করবে। আর তারা কখনোই উন্নতি ও অগ্রগতির পথ দেখতে পাবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্য থেকে বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা মুছে ফেলা হবে’।[৩] সুন্নাহ বিরোধীদের আরেকজন কুখ্যাত ইবলীস পারভেজ বলেছে,

(قد فاق تقديس هذه الكتب (كتب السنة) كل التصورات البشرية، مع أنها جزء من مؤامرة أعجمية، إستهدفت النيل من الإسلام وأهله) ويعلل ذلك فيقول: (فما أصحاب الصحاح الستة الا جزء من تلك المؤامرة، لذا نجدهم إيرانيين جميعا، لا وجود لساكن الجزيرة بينهم، والشيء المحير للعقول أن العرب لم يسهموا في هذا العمل البناء، بل أسندوا جمع الأحاديث وتدوينها إلى العجم، حتى تم بناؤ هذا الصرح المؤامر)

‘এই গ্রন্থগুলোর (হাদীছের গ্রন্থসমূহ) প্রতি মানুষের যে পরিমাণ সম্মান, শ্রদ্ধা ও পবিত্রতা আরোপিত হয়েছে, তা মানবিক কল্পনার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অথচ এই গ্রন্থগুলো আসলে অনারবদের (আজমীদের) ষড়যন্ত্রের একটি অংশ, যার লক্ষ্য ছিল ইসলাম এবং মুসলিমদের ক্ষতি সাধন’।[৪] সে এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছে, ‘ছিহাহ সিত্তাহ (অর্থাৎ হাদীছের প্রসিদ্ধ ছয়টি গ্রন্থ- ছহীহ বুখারী, ছহীহ মুসলিম, সুনানুত তিরমিযী, সুনানু আবী দাঊদ, সুনানুন নাসাঈ, সুনানু ইবনে মাজাহ)-এর রচয়িতাগণও এই ষড়যন্ত্রেরই অংশ; তাই আমরা দেখি- তারা সবাই ইরানীয়, তাদের মধ্যে কেউই আরব উপদ্বীপের বাসিন্দা নন এবং বুদ্ধিমত্তাকে যা বিস্মিত করে তোলে তা হল- আরবরা এই গঠনমূলক কাজে (হাদীছ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ) কোন অবদান রাখেনি, বরং তারা হাদীছ সংকলন ও লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব অনারবদের (আজমীদের) হাতে ছেড়ে দেয়, যতক্ষণ না এই ‘ষড়যন্ত্রমূলক ভিত্তি’ সম্পূর্ণ হয়।[৫]

জবাব

এই পথভ্রষ্ট দলের অপবাদ বা বিভ্রান্তির দু’টি দিক প্রকাশিত হয়েছে।

১. তারা দাবি তোলে যে, হাদীছ বা সুন্নাহর বিভিন্ন ধরনের বিধানই ইসলামী দলের মধ্যে বিভাজনের কারণ! কারণ এর ভিন্ন ভিন্ন বিধান ও ব্যাখ্যার জন্য মুসলিমদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, যদি মুসলিমদের অন্তর থেকে সুন্নাহর মহত্ত্ব ও পবিত্রতা মুছে ফেলা যেত, তাহলে মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হত এবং একটি পতাকার অধীনে একত্রিত হত

২. তারা দাবি করে, সুন্নাহ আসলে একটি অনারবীয় (আজমী) ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের নকশা তৈরি করেছে ইরান বা পারস্যের লোকেরা। কারণ, ছিহাহ সিত্তাহ (অর্থাৎ হাদীছের প্রসিদ্ধ ছয়টি গ্রন্থের) রচয়িতারা সকলেই পারস্য অঞ্চলের বাসিন্দা, আরব উপদ্বীপের কেউ নন। তাদের মতে, এই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই পারস্য ইসলাম কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত কাসরাদের (পারস্য সম্রাটদের) সাম্রাজ্যের প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়েছে।

(ক) প্রথম পয়েন্টের জবাবে আমরা বলব- এটি একেবারেই ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক প্রস্তাব। কারণ, যদি সুন্নাতকে দ্বীন ইসলাম থেকে সরিয়ে দিলেই মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারত, তাহলে কুরআনপন্থীরা (আহলে কুরআনরা) শুধু কুরআনুল কারীম মেনে অন্ততপক্ষে নিজেরা তো ঐক্যবদ্ধ হতে পারত! কিন্তু বাস্তব হল- অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মধ্যেই বহু দল গড়ে উঠেছে এবং তাদের নেতারাও বিভিন্ন বিপরীতমুখী, পরস্পর বিরোধী মতামত প্রকাশ করে চলেছে। উদাহরণ স্বরূপ ছালাতকেই নিন- যা তাদের মধ্যে বিভেদের এক বাস্তব চিত্র। তাদের কারো মতে দিনে ও রাতে মোট পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করতে হয়, কারো মতে চারবার, আরেকজন বলে তিনবার, আবার অন্য কেউ বলে দিনে ও রাতে মাত্র দু’বার। আবার কেউ বলে ছালাত মানে দু‘আ, তাই এর কোন নির্ধারিত পদ্ধতি বা নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই! এবং এদের প্রত্যেকেই দাবি করে যে, এটাই ‘কুরআনের ছালাত’।

আর ছালাতের ভিতরের বিষয়ে- যেমন: রাক‘আতের সংখ্যা ও পদ্ধতিগত ভিন্নতায় তাদের মধ্যে যত মতবিরোধ আছে, তা তো বলাই বাহুল্য। বাস্তবতা হল- তাদের প্রকৃতি ও স্বভাব আল্লাহ তা‘আলার শরী‘আতের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য স্বীকার করেনি, আল্লাহর বিধানের সামনে আত্মসমর্পণ ও তা মেনে চলাকে গ্রহণ করেনি। কারণ শরী‘আত তাদেরকে নিজেদের খেয়াল-খুশি ও শয়তানী কামনা পূরণে বাধা দেয় এবং সস্তা খ্যাতির পেছনে দৌড়াতে ও তুচ্ছ জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটতে নিরুৎসাহিত করে। তাই তারা তাদের চক্রান্তমূলক ভ্রান্ত বিশ্বাসগুলোকে এমন এক পাতলা আবরণে ঢেকে রেখেছে, যা সত্য ও বাস্তবতার সামনে টিকে থাকতে পারে না, বরং সামান্য প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই তা উন্মোচিত হয়ে পড়ে। সামান্য বিরোধিতার সামনেই তা ভেঙে পড়ে।

সর্বোপরি, তারা মুসলিমদের মধ্যে যে ছোটখাটো মতভেদ রয়েছে- সেগুলোকে কেন্দ্র করে তারা ভুলের স্বীকার হয়েছে- তারা সেগুলোকে এমন সুউচ্চ পর্বতের মত ভেবেছে, যেগুলো অতিক্রম করা অসম্ভব। অথচ যদি এরা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এসব ফিক্বহী মতভেদগুলোর দিকে আন্তরিকতার সহিত দৃষ্টিপাত করত, যেগুলো দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে গঠিত- তাহলে তাদের কাছে ইসলামী শরী‘আতের গভীরতা, এর বিস্তৃত উদারতা ও সর্বজনীন সহনশীলতা স্পষ্ট হয়ে যেত, এবং তারা উপলব্ধি করতে পারত যে আল্লাহর কিতাব, রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ ও সেগুলো থেকে আহরিত শরী‘আতের বিধানসমূহ মানবজাতির সকল প্রয়োজন পূরণের জন্য যথেষ্ট ও উপযোগী।

অতএব অ-কুরআনবাদীদের (অর্থাৎ যারা শুধু ক্বুরআন নয়, বরং কুরআনের সাথে সাথে সুন্নাহকেও মানে) মধ্যে মতভেদগুলো ইসলামের মূল ভিত্তি, স্তম্ভ, বিধান বা শিকড়কে স্পর্শ করে না। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে ফক্বীহদের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই- যেমন: ছালাত আদায় করার ব্যাপারে, যাকাত দেয়া ও হজ্জ করা ইত্যাদি বিষয়ে। বরং মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয় দলীল বোঝার ক্ষেত্রে, সেখান থেকে বিধান আহরণ করার ব্যাপারে এবং সেই দলীলকে বিভিন্ন অবস্থায় কীভাবে প্রয়োগ করা হবে- এসব বিষয়ে মতপার্থক্য মাত্র। উদাহরণ স্বরূপ: ফক্বীহগণ (ইসলামী আইনবিদরা) মতভেদ করেছেন যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু যদি ভাল ক্বারী হয়, সে ইমামতি করতে পারবে কি-না? কেউ তা বৈধ বলেছেন, কেউ নিষিদ্ধ করেছেন, আবার কেউ ফরয ছালাত ও নফল ছালাতের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তবে এ বিষয়ে সবাই একমত যে- যিনি ইমাম তিনিই মুছল্লীদের ছালাতের নেতৃত্ব দিবেন। এভাবেই অন্যান্য বিষয়েও মতভেদ হয়েছে।[৬]

এই প্রসঙ্গে কুখ্যাত ইবলীস পারভেজ তার পূর্ববর্তী কুরআনবাদী অর্থাৎ আহলে কুরআনদের মতপার্থক্য সম্পর্কে বলেছে- যেহেতু সে তাদের সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানে- সেই বলেছে: ‘তারা অর্থাৎ পূর্বের আহলে কুরআনরা আল্লাহর কিতাবকে এমনভাবে ছিন্নভিন্ন করেছে যে, তা পুনরায় একত্রিত করা সম্ভব নয় এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তাদের মত কেউ নেই। এমনকি এই তত্ত্ব, মতবাদ (অর্থাৎ কুরআন থেকেই সবকিছু আহরণ করা হবে) থেকে বিভিন্ন দলের উদ্ভব হওয়া খুবই সম্ভব ছিল, অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহর বর্তমান ফির্কাগুলোর মত বহু দল-উপদল জন্ম নেয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু মুসলিম জনসাধারণ তাদের প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়নি’।[৭]

ইতিহাস সাক্ষী মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত ঐক্য দেখা গিয়েছিল সেই যুগে- যখন ছাহাবী, তাবীঈন ও ইমামগণ কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুসারে একত্রিত ছিলেন। তাঁদের ভিতরে মতভেদ থাকলেও সেটা ছিল বৈচিত্রপূর্ণ ইজতিহাদ, বিভেদ নয়। কিন্তু যখন হাদীছকে অবহেলা বা অস্বীকার করা শুরু হল, তখনই বিভ্রান্তি ও দ্বন্দ্ব বেড়ে গেল। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- সকল মতভেদ কিন্তু বিভেদ নয়। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী নাবী ও রাসূলদের মাঝে কোন বিভেদ ছিল না। তাঁরা পরস্পর অভিন্ন ছিলেন। যদিও শরী’আতের বিধি-বিধান সবার এক ছিল না, পার্থক্য ও বিভিন্নতা ছিল। কিন্তু তা ছিল দলীলভিত্তিক, খেয়ালখুশি ভিত্তিক -নাউযুবিল্লাহ- ছিল না। সুতরাং বোঝা গেল, শাখাগত বিষয়ে দলীলভিত্তিক মতপার্থক্য বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা নয়। আমরা সবাই জানি যে, দাঊদ (আলাইহিস সালাম) ছিলেন আল্লাহর নবী। তাঁর পুত্র সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)ও নবী ছিলেন। একটি বিচারের রায় সম্পর্কে দু’জনের মাঝে ইজতিহাদগত মতপার্থক্য হল। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে তাঁদের মতপার্থক্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন,

وَ دَاوٗدَ وَ سُلَيْمٰنَ اِذْ يَحْكُمٰنِ فِي الْحَرْثِ اِذْ نَفَشَتْ فِيْهِ غَنَمُ الْقَوْمِ١ۚ وَ كُنَّا لِحُكْمِهِمْ شٰهِدِيْنَۗۙ۰۰۷۸ فَفَهَّمْنٰهَا سُلَيْمٰنَ١ۚ وَ كُلًّا اٰتَيْنَا حُكْمًا وَّ عِلْمًا١ٞ وَّ سَخَّرْنَا مَعَ دَاوٗدَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَ الطَّيْرَ١ؕ وَ كُنَّا فٰعِلِيْنَ.

‘এবং স্মরণ কর দাঊদ ও সুলাইমানের কথা, যখন তারা বিচার করছিল শস্য ক্ষেত সম্পর্কে, তাতে রাত্রিকালে প্রবেশ করেছিল কোন সম্প্রদায়ের মেষ, আর আমরা প্রত্যক্ষ করছিলাম তাদের বিচার। আমরা সুলাইমানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, এবং তাদের প্রত্যেককে আমরা দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আমরা পর্বত ও পক্ষীকুলকে দাঊদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, ওরা তার সাথে আমাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত; আমরাই ছিলাম এই সবের কর্তা’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ৭৮-৭৯)।

এখানে সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর ইজতিহাদ যে তাঁর ইচ্ছা মোতাবেক ছিল সেদিকেই আল্লাহ তা‘আলা ইশারা করেছেন। তবে পিতাপুত্র উভয়ের প্রশংসা করেছেন। তো এখানে ইজতিহাদের পার্থক্য হয়েছে, কিন্তু বিভেদ হয়নি। এই পার্থক্যের আগেও যেমন পিতাপুত্র দুই নবী এক ছিলেন, তেমনি পার্থক্যের পরও। এ আয়াত থেকে পরোক্ষভাবে ন্যায়বিচারের এই মূলনীতিও জানা যায় যে, দু’জন বিচারপতি যদি একটি মোকদ্দমার ফায়সালা করেন এবং দু’জনের ফায়সালা বিভিন্ন হয়, তাহলে যদিও একজনের ফায়সালাই সঠিক হবে। তবুও দু’জনেই ন্যায়বিচারক বিবেচিত হবেন। তবে এখানে শর্ত হচ্ছে বিচার করার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা উভয়ের মধ্যে থাকতে হবে। তাদের কেউ যেন অজ্ঞতা ও অনভিজ্ঞতা সহকারে বিচারকের আসনে বসে না যান। রাসূল (ﷺ) হাদীছে একথা আরো বেশী সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করে দিয়েছেন। আমর ইবনুল ‘আছ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত। তিনি রাসূল (ﷺ)-কে এ কথা বলতে শুনেছেন যে,

إذا حَكَمَ الحاكِمُ فاجْتَهَدَ ثُمَّ أصابَ فَلَهُ أجْرانِ، وإذا حَكَمَ فاجْتَهَدَ ثُمَّ أخْطَأَ فَلَهُ أجْرٌ

‘কোন বিচারক ইজতিহাদে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছলে তার জন্য আছে দু’টি পুরস্কার। আর বিচারক ইজতিহাদে ভুল করলে তার জন্যও রয়েছে একটি পুরস্কার। অর্থাৎ যদি বিচারক নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ফায়সালা করার পূর্ণ প্রচেষ্টা চালান, তাহলে সঠিক ফায়সালা করার ক্ষেত্রে তিনি দু’টি প্রতিদান পাবেন এবং ভুল ফায়সালা করলে পাবেন একটি প্রতিদান’।[৮] অন্য হাদীছে এসেছে, বুরাইদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন,

‏الْقُضَاةُ ثَلَاثَةٌ قَاضِيَانِ فِي النَّارِ وَقَاضٍ فِي الْجَنَّةِ رَجُلٌ قَضَى بِغَيْرِ الْحَقِّ فَعَلِمَ ذَاكَ فَذَاكَ فِي النَّارِ وَقَاضٍ لاَ يَعْلَمُ فَأَهْلَكَ حُقُوقَ النَّاسِ فَهُوَ فِي النَّارِ وَقَاضٍ قَضَى بِالْحَقِّ فَذَلِكَ فِي الْجَنَّةِ

‘বিচারকগণ তিন প্রকারের হয়ে থাকে। দুই প্রকারের বিচারক হচ্ছে জাহান্নামী এবং এক প্রকার বিচারক হচ্ছে জান্নাতী। জেনেশুনে যে বিচারক অন্যায় রায় প্রদান করে সে হচ্ছে জাহান্নামী। সত্যকে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি না করেই যে বিচারক মানুষের অধিকারসমূহ নস্যাৎ করে সে লোকও জাহান্নামী। আর যে বিচারক ন্যায়সঙ্গতভাবে ফায়সালা প্রদান করে সে জান্নাতের অধিবাসী’।[৯]

ইমাম ইবনু কাছীর, ইমাম কুরতুবী ও অন্য মুফাসসিরগণ ঘটনাটির বিবরণ এভাবে দিয়েছেন যে, দুইজন লোক দাঊদ (আলাইহিস সালাম) কাছে উপস্থিত হয়। তাদের একজন ছিল ছাগলপালের মালিক ও অপরজন শস্যক্ষেত্রের মালিক। শস্যক্ষেত্রের মালিক ছাগলপালের মালিকের বিরুদ্ধে দাবী করল যে, তার ছাগপাল রাত্রিকালে আমার শস্যক্ষেত্রে চড়াও হয়ে সম্পূর্ণ ফসল বিনষ্ট করে দিয়েছে, কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি। সম্ভবতঃ বিবাদী স্বীকার করে নিয়েছিল এবং ছাগলপালের মূল্য ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মূল্যের সমান ছিল। তাই দাঊদ (আলাইহিস সালাম) রায় দিলেন যে, ছাগলপালের মালিক তার সমস্ত ছাগল শস্যক্ষেত্রের মালিককে অর্পন করুক। কেননা, ফিক্বহ এর পরিভাষায় ‘যাওয়াতুল কিয়াম’ অর্থাৎ যেসব বস্তু মূল্যের মাধ্যমে আদান প্রদান করা হয়, সেগুলো কেউ বিনষ্ট করলে তার জরিমানা মূল্যের হিসাবেই দেয়া হয়। ছাগলপালের মূল্য বিনষ্ট ফসলের মূল্যের সমান বিধায় বিধি মোতাবেক এই রায় দেয়া হয়েছে। বাদী ও বিবাদী উভয়ই দাঊদ (আলাইহিস সালাম)-এর আদালত থেকে বের হয়ে আসলে দরজায় তাঁর পুত্র সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বিচারের রায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা তা শুনিয়ে দেয়। সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) বলেন, আমি রায় দিলে তা ভিন্নরূপ হত এবং উভয়পক্ষের জন্য উপকারী হত। তারপর তিনি পিতা দাউদের কাছে উপস্থিত হয়ে তাকে এ কথা জানালেন। দাঊদ (আলাইহিস সালাম) বলেন, এই রায় থেকে উত্তম এবং উভয়ের জন্য উপকারী রায়টা কী? সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি ছাগলপাল শস্যক্ষেত্রের মালিককে দিয়ে দিন। সে এগুলোর দুধ, পশম ইত্যাদি দ্বারা উপকৃত হতে থাকুক এবং ক্ষেত ছাগলপালের মালিককে অর্পণ করুন। সে তাতে চাষাবাদ করে শস্য উৎপন্ন করবে। যখন শস্যক্ষেত ছাগলপালে বিনষ্ট করার পূর্বের অবস্থায় পৌছে যাবে তখন শস্যক্ষেত্র তার মালিককে এবং ছাগলপাল ছাগলের মালিককে প্রত্যার্পণ করুন। দাঊদ (আলাইহিস সালাম) এই রায় পসন্দ করে বললেন, বেশ এখন এই রায়ই কার্যকর হবে। অতঃপর তিনি উভয়পক্ষকে ডেকে দ্বিতীয় রায় কার্যকর করলেন।[১০]

সুতরাং বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতার রূপরেখাগুলো ভালোভাবে জেনে নেয়া যরূরী। আর তা হল:
(১) দ্বীন ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ না হওয়া, ইসলামের বিরোধিতা করা বা ইসলাম থেকে বহির্ভূত হয়ে যাওয়া-এগুলো সর্বাবস্থায় দ্বীনের ক্ষেত্রে বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা। তাওহীদ এবং দ্বীনের অন্যান্য মৌলিক বিষয়, যেগুলোকে পরিভাষায়: ‘যরূরিয়্যাতে দ্বীন’ বলে, তার কোন একটির অস্বীকার বা অপব্যাখ্যা হচ্ছে ইরতিদাদ (মুরতাদ হওয়া), যা দ্বীনের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতার জঘন্যতম প্রকার। এ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় দ্বীন ইসলামকে মনে প্রাণে গ্রহণ করা।
(২) দ্বীন ইসলাম গ্রহণের পর কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী আক্বীদাসমূহ বোঝার ক্ষেত্রে খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে ছাহাবীগণের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া, এটাই বিচ্ছিন্নতা। হাদীছের মধ্যে কঠিন ভাষায় এর নিন্দা করা হয়েছে এবং তা থেকে বাঁচার জন্য দু’টি জিনিসকে দৃঢ়ভাবে ধারণের আদেশ করা হয়েছে, কুরআনুল কারীম ও ছহীহ সুন্নাহ। তাঁদের পথ থেকে যারাই বিচ্যুত হয়েছে তারাই এই বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছে। অতঃপর কোন দল ও ফির্ক্বার জন্ম দিলে তা তো আরো মারাত্মক।
(৩)  শাখাগত বিষয়ে মুজতাহিদ ইমামগণের যে মতপার্থক্য, যাকে ফিক্বহী মাযহাবের মতপার্থক্য বলে, তা দ্বীনের বিষয়ে বিচ্ছিন্নতা নয়। আগেও এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। কারণ ফিক্বহের এই মাযহাবগুলো তো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আর ইমামগণেরই মাযহাব। এগুলো ‘বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং গন্তব্যে পৌঁছার একাধিক পথ, যা স্বয়ং গন্তব্যের মালিকের পক্ষ হতে স্বীকৃত ও অনুমোদিত। ফির্ক্বা ও ফিক্বহী মাযহাবের পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হওয়া খুবই দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক বিষয়। ছাহাবায়ে কিরামের যুগেও ফিক্বহী মতপার্থক্য ছিল, অথচ তাঁরা খেয়ালখুশির মতভেদ কখনো সহ্য করতেন না। তাদের কাছে এ জাতীয় মতভেদকারীদের উপাধি ছিল ‘আহলুল আহওয়া’ অর্থাৎ খেয়াল-খুশির অনুসারী বা বিকৃত মতাবলম্বী। ‘আহলুল বিদ‘আ ওয়ায যলালাহ’ অর্থাৎ বিদ‘আত ও বিভ্রান্তির অনুসারীরা বা বিদ‘আতপ্রবণ ও বিভক্তিকামী লোকেরা।

আসলে এই বক্তব্য শুনতে আকর্ষণীয় হলেও, তা ইতিহাস ও বাস্তবতার দিক থেকে অপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর। কারণ, মুসলিমদের মধ্যে মতভেদ ও বিভাজন এসেছে মূলত (১) কুরআনের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা ও মতানৈক্য থাকার কারণে। এদিকে পবিত্র কুরআনও ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে। অপরদিকে একেকজন কুরআনিস্ট একেক রকম ব্যাখ্যা দেয়। সুতরাং ‘শুধু কুরআন’ বললেই ঐক্য আসে না। (২) প্রাথমিক যুগেই (ছাহাবীদের পর থেকে) অনেক মতভেদ ছিল রাজনৈতিক কারণে, হাদীছের কারণে নয়। যেমনঃ খারেজী, শী‘আ, ইত্যাদি মতবাদের উত্থান- এগুলো প্রথমে রাজনৈতিক দল ছিল। (৩) মানব প্রকৃতির ভিন্নতা ও বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা। একেকজন মানুষ একেকভাবে বুঝবে- এটা স্বাভাবিক।

তাই কুরআন ও হাদীছের বোধভিত্তিক ভিন্নমত সব যুগেই থাকবে। যদি হাদীছ না মানা হতো, তবে কি ঐক্য আসত? না। বরং বিপরীতটা ঘটত। আহলে কুরআন সম্প্রদায়ের মধ্যেই এখন একাধিক মতবাদ আছে। কারণ, কুরআনের ব্যাখ্যা তাদের একে অপরের সাথে মিলে না। তাই কেউ বলে ছালাত ৩ বার, কেউ বলে ২ বার, কেউ বলে কুরআনে ছালাতের পরিমাণ, পরিধি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেনি, তাই ছালাত বাধ্যতামূলকও নয়! সুতরাং, হাদীছ না মানলে ঐক্য নয়, বরং আরো বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। কারণ তখন কুরআনের শব্দের অর্থ নির্ধারণ করার কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা থাকবে না। সুতরাং প্রমাণিত হল যে, মুসলিম উম্মাহর বিভাজনের কারণ হাদীছ নয়, বরং মানুষের ভিন্ন ব্যাখ্যা ও মানসিক প্রবণতা। বরং হাদীছ ও সুন্নাহই একমাত্র নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা, যা উম্মাহকে এক সূত্রে বাঁধতে সক্ষম।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


তথ্যসূত্র :
[১]. আল-কুরআনিয়্যীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৩৮।
[২]. মাজাল্লাতু ইশা‘আতিল কুরআন, পৃ. ৩৯, ১৩২১ হিজরীর শা‘বান ও ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর সংখ্যা।
[৩]. মাজাল্লাতু ইশা‘আতিল কুরআন, পৃ. ১০, ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাস, সংখ্যা নং ১৫।
[৪]. শাহিকারে রিসালাত, পৃ. ৪৪৬।
[৫]. মাক্বামে হাদীছ, পৃ. ২২।
[৬]. আল-কুরআনিয়্যীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৪০।
[৭]. ফির্ক্বাহ আহলে কুরআন, পৃ. ১০।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৬।
[৯]. আবূ দাঊদ, হা/৩৫৭৩; তিরমিযী, হা/১৩২২; ইবনে মাজাহ, হা/২৩১৫; ছহীহুল জামি‘, হা/৪৪৪৭; ইরওয়াউল গালীল, হা/২৬১৪।
[১০]. তাফসীরে ইবনে  কাছীর, ফাতহুল ক্বাদীর, তাফসীরে ক্বুরত্বুবী ১১শ খণ্ড, পৃ, ৩০৭-৩১৯, এবং অন্যান্য তাফসীরের কিতাবও দেখে নেয়া যায়।




ইসলামী রাষ্ট্রে শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা: একটি পর্যালোচনা (২য় কিস্তি) - মূসা ইবরাহীম ইবনু রঈসুদ্দীন
অল্পে তুষ্ট (২য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ছয়টি মূলনীতির ব্যাখ্যা (শেষ কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজ (৩য় কিস্তি) - ড. মেসবাহুল ইসলাম
ক্রোধের ভয়াবহতা ও তার শারঈ চিকিৎসা - হাসিবুর রহমান বুখারী
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (১৩তম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
সূদ-ঘুষ ও অবৈধ ব্যবসা (৩য় কিস্তি) - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
রামাযান মাস : এক মহামূল্যবান নে‘মত - অনুবাদ: সাইনুল ইসলাম বিন শাহজাহান আলী
আধুনিক যুগে দাওয়াতী কাজের পদ্ধতি (৩য় কিস্তি) - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
শরী‘আত অনুসরণের মূলনীতি (৪র্থ কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ঐক্যের মর্যাদা ও মানদণ্ড - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ফিতনা পরিচিতি ও আমাদের করণীয় (শেষ কিস্তি) - আব্দুল হাকীম বিন আব্দুল হাফীজ

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ