শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন

 নক্ষত্র গড়ার কারিগর : মহীয়সী আম্মুদের গল্প

-আযহারুল ইসলাম মাদানী*



ভূমিকা

ইতিহাসের ধুলামলিন পাতায় এমন কিছু জননীর নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা আছে, যারা ছিলেন ইসলামের একেকটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। যখনই উম্মাহর আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা দেখা দিয়েছে, তখনই এই মহীয়সী মায়েরা তাদের কোল থেকে উপহার দিয়েছেন একেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। যারা কেবল মা ছিলেন না, ছিলেন একেকটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষালয়। তাঁদের চিন্তা, চেতনা আর নির্ঘুম রাতের প্রতিটি তাসবীহ ছিল দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য। আজ যখন মুসলিম উম্মাহ আবার এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তখন এই প্রজন্মের মায়েদের জন্য সেই সোনালী ইতিহাসের মায়েরা হতে পারেন শ্রেষ্ঠ প্রেরণা। চলুন ফিরে দেখি সেইসব নক্ষত্র-নির্মাতা মায়েদের হৃদয়স্পর্শী উপাখ্যান।

১. বাগদাদের হিমশীতল ভোরে এক ত্যাগী জননী  

বাগদাদের হিমশীতল ভোরে এক ত্যাগী জননী ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আম্মু। হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ লগ্ন। বাগদাদের হাড়কাঁপানো শীতের রাতে যখন শহরবাসী গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন এক জননী জেগে থাকতেন তাঁর সন্তানকে উম্মাহর ইমাম হিসাবে গড়ে তোলার স্বপ্নে। তিনি সাফিয়্যাহ বিনতে আব্দুল মালেক আশ-শায়বানিয়্যাহ। স্বামীহারা এই নারী দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়েও ছেলের শিক্ষার প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন।

ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) স্মৃতিচারণ করেন, ‘মাত্র ১০ বছর বয়সে মা আমাকে কুরআন হিফয করান’।[১] তিনি আরও বলেন, ‘শৈশবে মা আমাকে ফজরের আগেই জাগিয়ে গরম পানি দিয়ে ওযূ করিয়ে দিতেন। অন্ধকার রাতে পর্দার আড়ালে থেকে আমার হাত ধরে অনেক দূরের মসজিদে নিয়ে যেতেন এবং মাঝে মাঝে দুপুর পর্যন্ত মসজিদের দরজায় আমার অপেক্ষায় বসে থাকতেন’। ষোলো বছর বয়সে এই মা-ই ছেলের হাতে ১০টি যবের রুটি আর লবণের থলে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাবা! হাদীছ অন্বেষণে বেরিয়ে পড়ো, এ যাত্রা তো আল্লাহর দিকেই হিজরত’।[২] ৭০ বছর বয়সেও ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) যখন ওযূ করতেন, মায়ের সেই মমতাময়ী স্মৃতির কথা ভেবে তাঁর দু’চোখ ভিজে উঠত।

২. আদব ও শিষ্টাচারে এক অনন্যা মা

আদব ও শিষ্টাচারে এক অনন্যা মা ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আম্মু। মদীনার প্রখর রোদে যে নক্ষত্রটি ‘ইমামু দারিল হিজরাহ’ হিসাবে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন, তাঁর পেছনে ছিলেন মা আলিয়া বিনতে শারীক আল-আজদীয়্যাহ। তিনি কেবল ছেলেকে মাদরাসায় পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি। তিনি ছোট্ট মালেককে রাজকীয় পোশাক ও পাগড়ি পরিয়ে দিয়ে বলতেন, اذهب إلى ربيعة فتعلم من أدبه قبل علمه ‘যাও বাবা! রাবি’আহ এর কাছে গিয়ে আগে তাঁর ‘আদব’ (শিষ্টাচার) শেখো, তারপর তাঁর জ্ঞান গ্রহণ করো’।[৩] এই আদব ও শিষ্টাচারের শিক্ষাই তাঁকে জ্ঞানের পাহাড়ে পরিণত করেছিল।

৩. দু‘আয় দৃষ্টি ফেরানো মা

দু‘আয় দৃষ্টি ফেরানো মা ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আম্মু। ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) ১৯৪ হিজরীতে যখন জন্ম নিলেন, তখন কে জানত এই শিশুটিই একদিন হাদীছ শাস্ত্রের সম্রাট হবে? কিন্তু শৈশবেই তিনি তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। দুনিয়ার চিকিৎসা যখন ব্যর্থ হলো, মা তখন আরজি পেশ করলেন আসমানের মালিকের কাছে। রাতের নিস্তব্ধতায় যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ত, মা তখন চোখের জলে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে যেতেন। দীর্ঘ কান্নাকাটির পর একদিন তিনি স্বপ্নে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে দেখলেন, যিনি সুসংবাদ দিয়ে বললেন, يا هذه، قد رد الله على ابنك بصره لكثرة بكائك ولكثرة دعائك ‘হে নারী! তোমার অধিক কান্নাকাটির কারণে আল্লাহ তোমার ছেলের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছেন’। সকালে জেগে মা দেখলেন তাঁর অন্ধকার পৃথিবী আলোয় ভরে উঠেছে। কৃতজ্ঞতায় তিনি ছেলেকে নিয়ে মক্কায় পাড়ি জমান।[৪] এই সেই মা, যাঁর দু‘আর বরকতে আমরা আজ পেয়েছি ‘ছহীহুল বুখারী’।

৪. নিঃস্ব মায়ের বিশ্বজয়ী স্বপ্ন

নিঃস্ব মায়ের বিশ্বজয়ী স্বপ্ন ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আম্মু। ফাতেমা আল-আযদীয়্যাহ ছিলেন প্রখর মেধা ও অটল সংকল্পের এক প্রতিচ্ছবি। স্বামীহারা এই মা অভাবের তাড়নায় গাযা থেকে মক্কায় আসেন। ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘শিক্ষককে দেয়ার মত কিছুই আম্মুর ছিল না। আমি পরিত্যক্ত হাড় ও চামড়ায় হাদীছ লিখে রাখতাম’।[৫] মাত্র ৭ বছরে কুরআন এবং ২০ বছরের আগেই ফৎওয়া প্রদানের যোগ্যতা অর্জনকারী এই ইমামের প্রতিটি সফলতার পেছনে ছিল তাঁর মায়ের তিল তিল করে জমানো সাধনা।[৬]

৫. সুতা কেটে ইলমের প্রদীপ জ্বালানো মা

সুতা কেটে ইলমের প্রদীপ জ্বালানো মা সুফিয়ান ছাওরী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আম্মু। হাদীছ জগতের আমীরুল মুমিনীন সুফিয়ান ছাওরীকে গড়ে তুলতে তাঁর মায়ের অবদান ছিল অবিশ্বাস্য। তিনি নিজে সুতা কেটে সুতলি বানিয়ে তা বিক্রি করে ছেলের পড়ার খরচ চালাতেন। মা তাঁকে বলতেন, ‘হে প্রিয় বৎস! তুমি ইলম অর্জন কর। আমার পরিশ্রমই তোমার খরচের জন্য যথেষ্ট’।[৭] মা তাঁকে সাবধান করে বলতেন, ‘বৎস! যখন দশটি শব্দ শিখবে তখন নিজের চরিত্রের দিকে তাকিয়ে দেখ, তোমার গাম্ভীর্য ও তাক্বওয়া বেড়েছে কি-না। যদি না বাড়ে, তবে এই ইলম কেবল তোমার অমঙ্গলই বয়ে আনবে’।[৮]

৬. উম্মাহর তরে উৎসর্গিত প্রাণ

উম্মাহর তরে উৎসর্গিত প্রাণ ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আম্মু। যখনই ইসলামের শত্রু মোকাবিলায় কিংবা জ্ঞান বিতরণে ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) ব্যস্ত থাকতেন, তখন মা তাঁকে আরও উৎসাহিত করতেন। দূরে থাকার অজুহাত দিয়েই মা যখন চিঠি লিখলেন, মা তখন প্রতি উত্তরে লিখেছিলেন, ‘হে আমার কলিজার টুকরো! আল্লাহর শপথ, ইসলাম ও মুসলিমদের খেদমতের জন্যই আমি তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছি এবং প্রতিপালন করেছি। আমার কাছে তোমার নৈকট্যের চেয়ে ইসলামের বিজয় অনেক বেশি প্রিয়। আমি আল্লাহর দরবারে হিসাব নিব, যদি তুমি দ্বীনের খেদমতে কোন ত্রুটি কর’।[৯]

৭. ভোরের ঘুম ভাঙানিয়া মা

ভোরের ঘুম ভাঙানিয়া মা নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খান (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আম্মু। ভারতবর্ষের প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ছিদ্দীক হাসান খান তাঁর শৈশবের কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘৭ বছর বয়সে যখন আযানের শব্দে আমার ঘুম ভাঙত না, মা তখন আমার মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে ওযূ করিয়ে মসজিদে পাঠিয়ে দিতেন। বাড়িতে ছালাত আদায়ের কোন সুযোগই তিনি আমাকে দিতেন না’।[১০] এই সেই নক্ষত্র, যাঁর কিতাব আজ সারা বিশ্বে হাদীছের শিক্ষার্থীদের তৃষ্ণা মেটায়।

উপসংহার

আজ আমাদের দায়বদ্ধতা! সুবহানাল্লাহ! ইতিহাসের এই মহীয়সী আম্মুরা প্রমাণ করে গেছেন যে, একটি জাতির মেরুদণ্ড কেবল পাঠ্যবইয়ে নয়, বরং মায়ের কোল থেকেই তৈরি হয়। ওহে আধুনিক যুগের মায়েরা! উম্মাহ আজ এক ঘোর সংকটে। অসংখ্য মাযলূম মুসলিম আজ আপনাদের সন্তানদের পানে চেয়ে আছে। কবে আপনার সন্তান তারেক বিন যিয়াদ হয়ে ছুটে আসবে? কবে তারা ছালাউদ্দিন আইয়ূবী হয়ে বাতিলের কালো হাত গুড়িয়ে দিবে? কবে তারা মুহাম্মাদ বিন কাসেম হয়ে নিপীড়িত বোনদের রক্ষায় গর্জে উঠবে? একবার অন্তত যুবক সন্তানটির চোখের দিকে তাকিয়ে বলুন, ‘হে বৎস! কেবল ক্যারিয়ার গড়ার জন্য আমি তোমাকে গর্ভেধারণ করিনি। জেগে ওঠো! দ্বীনের পতাকাকে উড্ডীন কর‘। মহান আল্লাহ আমাদের মায়েদের অন্তরে এমন ঈমানী চেতনা জাগিয়ে দিন, যা থেকে আবার জন্ম নেবে ইতিহাসের সেই সোনালী নক্ষত্ররা- আমীন!!


* ভাইস প্রিন্সিপ্যাল, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী

তথ্যসূত্র :
[১]. আল-মিসক ওয়াল ‘আনবার, পৃ. ৫৮০।
[২]. বাতালুল মিহনাহ, পৃ. ৩।
[৩]. আল-মাদারিক, পৃ. ১১৫।
[৪]. হাদইউস-সারী মুকাদ্দিমা ফাতহুল বারী, পৃ. ৪৭৭-৪৯৪। 
[৫]. তারিখে দামেস্ক, ৫১তম খণ্ড, পৃ. ২৭৫। 
[৬]. আদাবুশ শাফেঈ, পৃ. ৩১। 
[৭]. মাফাতিহুস সা‘আদাতিয যাওজিয়্যাহ, পৃ. ২৩৯। 
[৮]. সাহমি, তারিখে জুরজান, পৃ. ৪৪৯-৪৫০। 
[৯]. মাজমূঊল ফাতাওয়া, ৪৮তম খণ্ড, পৃ. ২৮। 
[১০]. আ‘লামুল মুয়াল্লিফীন, পৃ. ২০১। 




প্রসঙ্গসমূহ »: যুবসমাজ শিশু-কিশোর
মুহাররম ও আশূরা : গুরুত্ব, করণীয় ও বর্জনীয় - আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ
তাওহীদ প্রতিষ্ঠার উপায় - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
তারুণ্যের উপর সন্ত্রাসবাদের হিংস্র ছোবল : প্রতিকারের উপায় (শেষ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
মসজিদ: ইসলামী সমাজের প্রাণকেন্দ্র (৩য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
সালাফী মানহাজের মূলনীতিসমূহ (শেষ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
তওবার গুরুত্ব ও ফযীলত (শেষ কিস্তি) - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
আল-কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত (১০ম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
আল-কুরআন সম্পর্কে অমুসলিম মনীষীদের মূল্যায়ন - রাফিউল ইসলাম
মুসলিম বিভক্তির কারণ ও প্রতিকার (শেষ কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ইসলামী উত্তরাধিকার আইন: উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ ধারা (২য় কিস্তি) - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (২২তম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (২৪তম কিস্তি)   - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ