বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৭:২৬ অপরাহ্ন

প্রবৃত্তিপূজারী বিদ‘আতীদের সাথে উঠাবসা : সালাফী উলামার সতর্কবাণী

- মূল : শায়খ রাবিঈ বিন হাদী আল-মাদখালী
- অনুবাদক : শুয়াইব বিন আহমাদ*



পরম করুনাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য। ছালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন, ছাহাবায়ে কেরাম এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত যারা তাঁর হেদায়াত অনুসরণ করে চলবে, তাদের সকলের উপর। অতঃপর নিশ্চয় সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হলো মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পথ নির্দেশনা। আর নিকৃষ্ট বিষয় হলো দ্বীনের মধ্যে নতুনভাবে উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ। দ্বীনের প্রতিটি নব-উদ্ভাবিত বিষয়ই বিদ‘আত, আর প্রত্যেক বিদ‘আতের পরিণামই গোমরাহী। সুতরাং একজন মুসলিমের জন্য আবশ্যক হলো- কুরআন ও সুন্নাহকে মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরার মতো দৃঢ়ভাবে ধারণ করা। একই সঙ্গে বিদ‘আত থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে থাকা এবং যে সব কারণ মানুষকে বিদ‘আতের দিকে ঠেলে দেয়; যেমন বিদ‘আতিদের সঙ্গে মেলামেশা, তাদের সাথে ওঠাবসা কিংবা হৃদ্যতাপূর্ণ বন্ধুত্ব স্থাপন করা, এসব থেকেও নিজেকে সংযত রাখা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 

لَا تَجِدُ قَوۡمًا یُّؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ  یُوَآدُّوۡنَ مَنۡ حَآدَّ اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ  وَ لَوۡ کَانُوۡۤا  اٰبَآءَہُمۡ  اَوۡ اَبۡنَآءَہُمۡ  اَوۡ  اِخۡوَانَہُمۡ  اَوۡ عَشِیۡرَتَہُمۡ ؕ اُولٰٓئِکَ  کَتَبَ فِیۡ قُلُوۡبِہِمُ الۡاِیۡمَانَ وَ اَیَّدَہُمۡ  بِرُوۡحٍ مِّنۡہُ ؕ وَ یُدۡخِلُہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ  فِیۡہَا ؕ رَضِیَ اللّٰہُ  عَنۡہُمۡ وَ رَضُوۡا عَنۡہُ ؕ اُولٰٓئِکَ حِزۡبُ اللّٰہِ ؕ اَلَاۤ اِنَّ  حِزۡبَ اللّٰہِ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ

‘আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় তুমি পাবে না যারা ভালোবাসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারীদেরকে, হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই অথবা তাদের জ্ঞাতি গোষ্ঠি। তাদের অন্তরে (আল্লাহ) ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা; তিনি তাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর দল। জেনে রেখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে’ (সূরা আল-মুজাদালাহ : ২২)।

মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَ لَا تَرۡکَنُوۡۤا اِلَی الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا فَتَمَسَّکُمُ النَّارُ ۙ وَ مَا لَکُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ مِنۡ اَوۡلِیَآءَ ثُمَّ  لَا  تُنۡصَرُوۡنَ ‘আর যালিমদের প্রতি ঝুকে পড়না, অন্যথায় তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে, আর আল্লাহ ছাড়া তোমরা কোন সাহায্যকারী পাবে না, অতঃপর তোমাদেরকে কোন সাহায্যও করা হবে না’ (সূরা হুদ : ১১৩)।

বিদ‘আতীদের সাথে ওঠাবসা থেকে সতর্কবাণী

বিদ‘আতীদের সঙ্গে ওঠাবসা থেকে সতর্ক করার ব্যাপারে নবী (ﷺ)-এর বহু হাদীছ রয়েছে। তন্মধ্যে :

১. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ ‘মানুষ যাকে ভালোবাসবে, সে তারই সাথী হবে’।[১]

২. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ ‘মানুষ তার বন্ধুর ধ্যান-ধারণার অনুসারী হয়ে থাকে। সুতরাং তোমাদের সকলেরই খেয়াল রাখা উচিত, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে’।[২]

৩. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেছেন, الأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ ، فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا ائْتَلَفَ، وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ ‘সমস্ত রূহ সেনাবাহিনীর মত একত্রিত ছিল। সেখানে তাদের যে সমস্ত রূহের পরস্পর পরিচয় ছিল, এখানেও তাদের মধ্যে পরস্পর পরিচিতি থাকবে। আর সেখানে যাদের মধ্যে পরস্পর পরিচয় হয়নি, এখানে তাদের মধ্যে পরস্পর মতভেদ ও মতবিরোধ থাকবে’।[৩]

৪. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেছেন,  

مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالسَّوْءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِيرِ ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةً ، وَنَافِخُ الْكِيرِ إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةً

‘সৎসঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হল, কস্তুরীওয়ালা ও কামারের হাপরের ন্যায়। কস্তুরীওয়ালা হয়ত তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার নিকট হতে তুমি কিছু কিনবে, অথবা তার নিকট হতে তুমি সুবাস পাবে। আর কামারের হাপর হয়ত তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার নিকট হতে দুর্গন্ধপাবে’।[৪]

বিদ‘আতীদের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ ও তাদের বর্জনের ব্যাপারে ইজমা (ঐকমত্য)

বিদ‘আতীদের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ ও তাদের বর্জনের ব্যাপারে ইজমা (ঐকমত্য) হয়েছে। ইমাম বাগাভী (রাহিমাহুল্লাহ) কা‘ব ইবনু মালিক, মুরারা ইবনু রাবী‘ ও হিলাল ইবনু উমাইয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘটনার ব্যাখ্যায় বলেন, ‘ছাহাবায়ে কিরাম, তাবেঈন, তাদের অনুসারী এবং আহলুস সুন্নাহর আলেমগণ সকলেই এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, বিদ‘আতিদের সঙ্গে শত্রুতা রাখা এবং তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা আবশ্যক’।[৫]

বিদ‘আতীদের সাথে চলাফেরা/ওঠাবসা সম্পর্কে সালাফ ও আলেমগণের বক্তব্য

প্রথমত : আবূ হাতিম ইমাম ইবনু হিব্বান (রাহিমাহুল্লাহ) ‘সৎ সঙ্গীর সঙ্গে থাকা ও অসৎ সঙ্গী থেকে বিরত থাকার’ অধ্যায়ে বলেন, ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি সৎ লোকদের সঙ্গ অবলম্বন করে এবং অসৎ লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করে। কারণ সৎ লোকদের সাথে ভালোবাসা দ্রুত গড়ে ওঠে এবং দেরিতে ভাঙে। আর অসৎ লোকদের সাথে ভালোবাসা দ্রুত ভেঙে যায় এবং দেরিতে গড়ে ওঠে। অসৎ লোকদের সঙ্গ সৎ লোকদের ব্যাপারে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করে। যে অসৎদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, সে তাদের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না...। তাই বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হলো সন্দেহজনক লোকদের থেকে দূরে থাকা। যেমনিভাবে সৎ লোকদের সঙ্গ কল্যাণ বয়ে আনে, তেমনি অসৎ লোকদের সঙ্গ অকল্যাণ ডেকে আনে’।

তিনি আরও বলেন, ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি নিজের সম্মান কলুষিত করে না। অসৎ লোকদের সান্নিধ্যে থেকে নিজেকে অকল্যাণের পথে অভ্যস্ত করে না। সে নিজের সম্মান রক্ষার ব্যাপারে গাফিল হয় না এবং সৎ লোকদের সঙ্গ গ্রহণের মাধ্যমে নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ ও প্রশিক্ষিত করে। কারণ অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষের মধ্যে এমন অনেক বিষয় প্রকাশ পায়, যা বাহ্যিক রূপের সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে থাকে’।

তিনি আরও বলেন, ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনোই অসৎ লোকদের সঙ্গ গ্রহণ করে না। কেননা মন্দ সঙ্গীর সান্নিধ্য আগুনের টুকরোর মতো, যা অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষের জন্ম দেয়। এমন মানুষের ভালোবাসা কখনো স্থির থাকে না। অঙ্গীকারেও সে বিশ্বস্ত নয়। আর মানুষের সৌভাগ্যের চারটি নিদর্শনের মধ্যে রয়েছেÑস্ত্রী অনুগত হওয়া, সন্তান নেককার হওয়া, ভাই-বন্ধুরা সৎ হওয়া এবং নিজের রিযিক নিজ দেশেই পাওয়া। আর যে সঙ্গীর কাছ থেকে কোনো কল্যাণ অর্জিত হয় না, তার সঙ্গে ওঠাবসার চেয়ে কুকুরের সঙ্গে থাকা অধিক উত্তম। কারণ মন্দ সঙ্গীর সান্নিধ্যে থাকা ব্যক্তি নিরাপদ নয়। ঠিক যেমন, যে ব্যক্তি মন্দ স্থানে যাতায়াত করে, সে অবধারিতভাবেই সন্দেহের পাত্র হওয়া থেকে নিরাপদ থাকে না’।[৬]

দ্বিতীয়ত : ইমাম হাফেয আবূ আব্দুল্লাহ উবাইদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু হামদান ইবনু বাত্তা (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর গ্রন্থ ‘আল-ইবানাহ আন শারী‘আতিল ফিরক্বাতিন নাজিয়াহ ওয়া মুজানাবাতিল ফিরাকিল মাযমূমাহ’-এ ‘যারা হৃদয়কে রোগাক্রান্ত করে এবং ঈমানকে নষ্ট করে এমন লোকদের সঙ্গ গ্রহণ থেকে সতর্কবার্তা’ শীর্ষক অধ্যায়ে ৩৫৯-৫২৪ নম্বর পর্যন্ত বহু নছ বর্ণনা করেছেন। এর মধ্য থেকে আমি নিম্নোক্ত বর্ণনাগুলো নির্বাচন করেছি;

৩৬৯. আবূ কিলাবাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

لَا تُجَالِسُوا أَصْحَابَ الْأَهْوَاءِ , فَإِنِّي لَا آمَنُ أَنْ يَغْمِسُوكُمْ فِي ضَلَالَتِهِمْ  أَوْ يَلْبِسُوا عَلَيْكُمْ بَعْضَ مَا تَعْرِفُونَ

‘তোমরা প্রবৃত্তির অনুসারীদের সঙ্গে বসো না। কেননা আমি আশঙ্কা করি, তারা তোমাদেরকে তাদের ভ্রান্তির মধ্যে ডুবিয়ে দেবে অথবা তোমরা যে বিষয়গুলো জানো ও চেনো, সেগুলোর কিছু বিষয়ে তোমাদের মধ্যে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে দেবে’।

৩৭১. আমর ইবনু কাইস (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

لَا تُجَالِسْ صَاحِبَ زَيْغٍ , فَيُزِيغَ قَلْبَكَ

‘এ কথা বলা হতো, তুমি বিভ্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে বসো না; কেননা সে তোমার হৃদয়কে বিভ্রান্ত করে দেবে’।

৩৭৬. ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন,

لَا تُجَالِسْ أَهْل الْأَهْوَاءِ , فَإِنَّ مُجَالَسَتَهُمْ مُمْرِضَةٌ لِلْقُلُوبِ

‘তোমরা প্রবৃত্তির অনুসারীদের (বিদ‘আতিদের) সঙ্গে বসো না। কেননা তাদের সঙ্গে বসা হৃদয়কে রোগাক্রান্ত করে দেয়’।

৩৭৮. আল-হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,لَا تُجَالِسُوا أَهْلَ الْأَهْوَاءِ , فَإِنَّ مُجَالَسَتَهُمْ مُمْرِضَةٌ لِلْقُلُوبِ ‘তোমরা প্রবৃত্তির অনুসারীদের (বিদ‘আতীদের) সঙ্গে বসো না। কেননা তাদের সঙ্গে বসা হৃদয়কে রোগাক্রান্ত করে দেয়’।

৩৯৫. আবূ খালিদ (রাহিমাহুল্লাহ) আমর ইবনু কাইস আল-মুলাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণনা করে বলেন,لَاتُجَالِسْ صَاحِبَ زَيْغٍ فَيُزِيغُ قَلْبُكَ ‘এ কথা বলা হতো, তুমি বিভ্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে বসো না; নচেৎ সে তোমার হৃদয়কে বিভ্রান্ত করে দেবে’।

৪০০. আল-হাসান ও মুহাম্মাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলতেন,

لَا تُجَالِسُوا أَصْحَابَ الْأَهْوَاءِ وَلَا تُجَادِلُوهُمْ وَلَا تَسْمَعُوا مِنْهُمْ

‘তোমরা প্রবৃত্তির অনুসারীদের সঙ্গে বসো না, তাদের সঙ্গে বিতর্কে জড়িও না এবং তাদের কথাও শুনিও না’।

৪০৩. আসমা (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করে বলেন,

دَخَلَ رَجُلَانِ عَلَى مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ مِنْ أَهْلِ الْأَهْوَاءِ، فَقَالَا: يَا أَبَا بَكْرٍ نُحَدِّثُكَ، قَالَ: لَا، قَالَا: فَنَقْرَأُ عَلَيْكَ آيَةً مِنْ كِتَابِ اللَّهِ عز وجل، قَالَ: لَا، لَتَقُومَنَّ عَنِّي أَوْ لَأَقُومَنَّهُ

‘প্রবৃত্তির অনুসারীদের মধ্য থেকে দু’জন লোক মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে এসে বলল, হে আবূ বকর! আমরা আপনাকে একটি হাদীস শোনাতে চাই’। তিনি বললেন, না। তারা বলল, তাহলে আমরা আল্লাহর কিতাব থেকে একটি আয়াত পড়ি? তিনি বললেন, না। তোমরা এখান থেকে উঠে যাও, নতুবা আমি নিজেই উঠে যাব’।

৪০৭. আইয়ূব আস-সাখতিয়ানী (রাহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে বর্ণিত,

أَنَّ رَجُلًا مِنْ أَصْحَابِ الْأَهْوَاءِ قَالَ لِأَيُّوبَ السِّخْتِيَانِيِّ يَا أَبَا بَكْرٍ؟ أَسْأَلُكَ عَنْ كَلِمَةٍ قَالَ: فَوَلَّى أَيُّوبُ، وَجَعَلَ يُشِيرُ بِإِصْبَعِهِ: وَلَا نِصْفِ كَلِمَةٍ وَلَا نِصْفِ كَلِمَةٍ "

‘প্রবৃত্তির অনুসারীদের একজন আইয়ূব সাখতিয়ানী (রাহিমাহুল্লাহ)-কে বলল, হে আবূ বকর! আমি আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। তখন আইয়ূব (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর দুই আঙুল দিয়ে ইশারা করে বললেন, অর্ধেক কথাও নয়, অর্ধেক কথাও নয়’।

৪২৬. ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-কাত্তান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

لَمَّا قَدِمَ سُفْيَانُ الثَّوْرِيُّ الْبَصْرَةَ: جَعَلَ يَنْظُرُ إِلَى أَمْرِ الرَّبِيعِ يَعْنِي ابْنَ صُبَيْحٍ، وَقَدْرَهُ عِنْدَ النَّاسِ، سَأَلَ: أَيُّ شَيْءٍ مَذْهَبُهُ؟ قَالُوا: مَا مَذْهَبُهُ إِلَّا السُّنَّةُ قَالَ: مَنْ بِطَانَتُهُ؟ قَالُوا: أَهْلُ الْقَدَرِ قَالَ: هُوَ قَدَرِيٌّ

‘যখন সুফইয়ান আস-সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) বসরায় আগমন করলেন, তখন তিনি রাবিঈ অর্থাৎ ইবনু সুবাইহÑএর অবস্থা ও মানুষের কাছে তার মর্যাদা লক্ষ্য করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার আক্বীদা কী? লোকেরা বলল, সুন্নাহ ছাড়া তার আর কোনো মত নেই। তিনি বললেন, তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী কারা? তারা বলল, কদরপন্থীরা। তখন তিনি বললেন, তাহলে সে ক্বাদারী’।

শায়খ (গ্রন্থকার) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলার রহমত বর্ষিত হোক সুফইয়ান আস-সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উপর। তিনি প্রজ্ঞার কথা বলেছেন এবং সত্য বলেছেন। তিনি জ্ঞানের ভিত্তিতে কথা বলেছেন। আর তা কিতাব ও সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। সেই প্রজ্ঞার সঙ্গেও মিলেছে, যা বাস্তবতা দ্বারা উপলব্ধি করা যায় এবং অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ও বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরা যা চিনতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা নিজেদের সম্প্রদায় ব্যতিরেকে অন্য কাউকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না, তারা তোমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সংকুচিত হবে না; এবং তোমরা যাতে বিপন্ন হও তারা তাই কামনা করে’ (সূরা আলে ইমরান : ১১৮)।

৪৩৪. ফুযাইল ইবনু ইয়ায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

الْأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ، فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا ائْتَلَفَ، وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ، وَلَا يُمْكِنُ أَنْ يَكُونَ صَاحِبُ سُنَّةٍ يُمَالِي صَاحِبَ بِدْعَةٍ إِلَّا مِنَ النِّفَاقِ

‘রূহসমূহ হচ্ছে সংগঠিত সৈনিকদল। সেগুলোর মধ্যে যেগুলো পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত ছিল, সেগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হবে; আর যেগুলো পরস্পরের সঙ্গে অপরিচিত ছিল, সেগুলো পরস্পরের বিরোধিতা করবে। সুতরাং কোনো সুন্নাহর অনুসারী ব্যক্তি কোনো বিদ‘আতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারে না। এটা হলে তা কেবল নিফাক্ব থেকেই হয়ে থাকে’।

শায়খ (গ্রন্থকার) বলেন, ‘ফুযাইল (রাহিমাহুল্লাহ) সত্যই বলেছেন। কেননা আমরা বিষয়টি বাস্তবেও প্রত্যক্ষ করি’।

৪৩৫. ইমাম আওযায়ী (রাহিমাহুল্লাহ)-কে বলা হলো,

قِيلَ لِلْأَوْزَاعِيِّ: إِنَّ رَجُلًا يَقُولُ: أَنَا أُجَالِسُ أَهْلَ السُّنَّةِ، وَأُجَالِسُ أَهْلَ الْبِدَعِ، فَقَالَ الْأَوْزَاعِيُّ: هَذَا رَجُلٌ يُرِيدُ أَنْ يُسَاوِيَ بَيْنَ الْحَقِّ وَالْبَاطِلِ

‘এক ব্যক্তি বলে, আমি সুন্নাহর অনুসারীদের সঙ্গেও বসি এবং বিদ‘আতিদের সঙ্গেও বসি। তখন আওযায়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, ‘এ ব্যক্তি সত্য ও মিথ্যার মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়’।

শায়খ (গ্রন্থকার) বলেন, ‘আওযায়ী (রাহিমাহুল্লাহ) সত্যই বলেছেন। আমি বলি, নিশ্চয়ই এমন ব্যক্তি সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে জানে না; কুফর ও ঈমানের মধ্যেও পার্থক্য করতে জানে না। এ ধরনের লোকদের ব্যাপারেই কুরআন নাযিল হয়েছে এবং মুস্তাফা (ﷺ) থেকে সুন্নাহ বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর যখন তারা ঈমানদারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন বলেÑআমরা ঈমান এনেছি; আর যখন তারা তাদের শয়তানদের সঙ্গে একান্তে মিলিত হয়, তখন বলেÑনিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি’ (সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত ১৪)।

৪৪১. মুসলিম ইবনু ইয়াসার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

لَا تُمَكِّنُ صَاحِبَ بِدْعَةٍ مِنْ سَمْعِكَ فَيَصُبُّ، فِيهَا مَا لَا تَقْدِرُ أَنْ تُخْرِجَهُ مِنْ قَلْبِكَ

‘কোনো বিদ‘আতিকে তোমার কান পর্যন্ত পৌঁছাতে দিও না, নচেৎ সে তোমার অন্তরে এমন কিছু ঢেলে দেবে, যা পরবর্তীতে তুমি সেখান থেকে বের করতে সক্ষম হবে না’।

৪৫৭. ইসমাঈল আত্ব-তুসি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইবনুল মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ) আমাকে বললেন,يَكُونُ مَجْلِسُكَ مَعَ الْمَسَاكِينِ، وَإِيَّاكَ أَنْ تَجْلِسَ مَعَ صَاحِبِ بِدْعَةٍ ‘তোমার বসা-চলা হোক মিসকীনদের সঙ্গে। আর সাবধান! কোনো বিদ‘আতির সঙ্গে বসবে না’।

মোট একশ পঁয়ষট্টি জন সুন্নাহর আলিমগণের মাঝে মাত্র তেরোজন আলিমের বক্তব্য তুলে ধরা হলো। যাদের সকলেই বিদ‘আতিদের সঙ্গে বসা ও মেলামেশা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। এই সতর্কতা এসেছে নবী (ﷺ)-এর সেই সব বর্ণনার ভিত্তিতে, যেখানে বিদ‘আত ও খেয়ালখুশির অনুসারীদের সঙ্গে মেলামেশা ও ঘনিষ্ঠতা থেকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এছাড়াও এটি এসেছে তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বাস্তব উপলব্ধির আলোকে। কারণ তাঁরা ভালোভাবেই জানতেন, বিদ‘আতিদের সঙ্গে ওঠাবসা যারা করে, তাদের ঈমান ও অন্তরের ওপর তা কতটা গভীর ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

তৃতীয়ত : ইমাম খাত্তাবী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘সুনানু আবী দাউদ’-এর ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ‘তুমি কেবল মুমিনের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করবে, আর তোমার খাবার যেন কেবল মুত্তাক্বী ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ যেন না খায়’ এই হাদীছের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘আসলে মুত্তাক্বী নয় এমন ব্যক্তির সঙ্গ গ্রহণ করতে নবী (ﷺ) নিষেধ করেছেন এবং তার সঙ্গে মেলামেশা ও একসাথে খাওয়া থেকেও সতর্ক করেছেন। কারণ একসাথে খাওয়া-দাওয়া করলে হৃদয়ে ঘনিষ্ঠতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ তিনি বলতে চান, যে ব্যক্তি তাক্বওয়া ও পরহেযগারির অধিকারী নয়, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করবে না, তাকে এমন সঙ্গী বানাবে না যার সঙ্গে একসাথে খাবে বা যার সঙ্গে সময় কাটাবে।[৭]

এছাড়া তিনি ‘আত্মাসমূহ একত্রিত সৈন্যদল’Ñএই হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘নবী (ﷺ) বুঝিয়েছেন যে, আত্মাসম্পন্ন দেহসমূহ দুনিয়াতে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয় বা পরস্পরের বিরোধিতা করে, এটা নির্ভর করে সৃষ্টির শুরুতেই তাদের প্রকৃতি যেভাবে গঠিত হয়েছে তার ওপর। যাদের প্রকৃতিতে সাদৃশ্য রয়েছে, তাদের মাঝে এমনিতেই ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, আর যাদের মাঝে বৈসাদৃশ্য রয়েছে, তাদের মধ্যে স্বভাবগতভাবেই দূরত্ব ও বিরোধিতা দেখা দেয়। এই কারণেই দেখা যায়, নেক ও সৎ ব্যক্তি তার মতো নেক লোকদের ভালোবাসে, তাদের সান্নিধ্যে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আর যারা তার বিপরীত, তাদের থেকে সে স্বভাবতই দূরে থাকে। ঠিক একইভাবে পাপী ও দুষ্কৃতকারী ব্যক্তি তার মতো লোকদের সঙ্গ পছন্দ করে, তাদের কাজকে সুন্দর মনে করে এবং নেক লোকদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয় ও বিমুখ থাকে।[৮]

চতুর্থত : ইমাম আবুল কাসিম হিবাতুল্লাহ ইবনুল হাসান ইবনু মানসুর আল-লালকাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর কিতাব ‘শারহু উসূলিল ই‘তিকাদ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ’-এ সুন্নাহর বহু আলিম থেকে অসংখ্য বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। যা ২৩১ থেকে ৩১৩ নম্বর পর্যন্ত বিস্তৃত। তন্মধ্যে;

২৩১. আবুল জাওযা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,لَأَنْ يُجَاوِرَنِي قِرَدَةٌ وَخَنَازِيرُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ يُجَاوِرَنِي أَحَدٌ مِنْهُمْ. يَعْنِي أَصْحَابَ الْأَهْوَاءِ ‘বানর ও শূকর আমার প্রতিবেশী হওয়া আমার কাছে বেশি প্রিয়; এর চেয়ে যে, এদের মধ্য থেকে কেউ আমার প্রতিবেশী হবে’। এখানে ‘এদের’ বলতে তিনি খেয়ালখুশি ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের (আহলুল আহওয়া) বুঝিয়েছেন।

২৩৯. সাবিত ইবনুল ‘আজলান বলেন, ‘আমি আনাস ইবনু মালিক, ইবনুল মুসাইয়্যিব, হাসান আল-বসরী, সাঈদ ইবনু জুবাইর, আশ-শা‘বী, ইবরাহীম আন-নাখাঈ, ‘আতা ইবনু আবী রাবাহ, তাউস, মুজাহিদ, আব্দুল্লাহ ইবনু আবী মুলাইকাহ, আয-যুহরী, মাখহূল, কাসিম আবু আব্দুর রহমান, ‘আতা আল-খুরাসানী, সাবিত আল-বুনানী, হাকাম ইবনু ‘উতবা, আইয়ুব আস-সাখতিয়ানি, হাম্মাদ, মুহাম্মদ ইবনু সিরীন, আবু ‘আমির, (তিনি অর্থাৎ সাবিত আবু বকর আস-সিদ্দীক (রাযি.)-কেও পেয়েছিলেন) এছাড়াও ইয়াযীদ আর-রাক্কাশী ও সুলাইমান ইবনু মূসাÑএদের সকলের সান্নিধ্য লাভ করেছি। তারা সকলেই আমাকে জামা‘আত অর্থাৎ আহলুস সুন্নাহর ঐক্য আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিতেন এবং খেয়ালখুশি ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের (আহলুল আহওয়া) থেকে দূরে থাকতে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। বাকিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এরপর তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, ‘হে আমার ভাতিজা! এই মসজিদে হেঁটে আসার চেয়ে অধিক আশাব্যঞ্জক ও অধিক নির্ভরযোগ্য কোনো আমল নেই’।

বিরাশি জন আলিমের মাঝে কেবল কয়েকজনের কথা উল্লেখ করা হলো। যাঁদের বক্তব্য ও অবস্থান সালাফে ছলিহীনের মানহাজ স্পষ্ট করার জন্য ইমাম লালকাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন এবং বিদ‘আত ও খেয়ালখুশির অনুসারীদের ব্যাপারে তাঁদের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছেন।

পঞ্চমত : ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) পূর্বোল্লিখিত হাদীছের অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এই বাণীর ‘সৎ সঙ্গীর উদাহরণ...’-ব্যাখ্যায় বলেন, ‘এর মধ্যে সৎকর্মশীল, কল্যাণকামী, ভদ্রতা ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী, তাক্বওয়াবান, জ্ঞানী ও শিষ্টাচারসম্পন্ন লোকদের সঙ্গে ওঠাবসার ফযীলত প্রমাণিত হয়। একই সঙ্গে এতে অসৎ লোক, বিদ‘আতি, মানুষের গীবতকারী, অতিমাত্রায় পাপাচারী ও কর্মহীন বা অলসতাপূর্ণ জীবনযাপনকারী এবং এ ধরনের অন্যান্য নিন্দনীয় শ্রেণির লোকদের সঙ্গে মেলামেশা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে’।[৯]

ষষ্ঠত : শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘রাফেযী ব্যক্তি কাউকে কপটতা (মুনাফিক্বী) অবলম্বন করা ছাড়া সঙ্গ দেয় না। কারণ তার অন্তরে যে দ্বীন রয়েছে, তা একটি বিকৃত দ্বীন। যা তাকে মিথ্যা বলা, বিশ্বাসঘাতকতা করা, মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা এবং তাদের ক্ষতি কামনা করতে প্ররোচিত করে। সে তাদের ব্যাপারে কোনো অনিষ্ট করতে কসুর করে না এবং যে কোনো ক্ষতি করার সক্ষমতা তার থাকলে, সে তা করতে বিরত থাকে না। সে এমন লোকদের কাছেও ঘৃণিত হয়, যারা তাকে প্রকৃতভাবে চেনে না। এমনকি কেউ যদি নাও জানে যে সে রাফেযী, তবুও তার চেহারায় মুনাফিক্বীর আলামত এবং কথাবার্তার ভঙ্গিতে কপটতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। এ কারণেই তাকে দেখা যায়, দুর্বল মানুষদের সঙ্গে এবং যাদের তার প্রয়োজন নেই, তাদের সাথে। সে তাদের সঙ্গে কৃত্রিমভাবে সদ্ভাব প্রদর্শন করে। কারণ তার অন্তরে যে কপটতা বাসা বেঁধে আছে, সেটাই তার হৃদয়কে দুর্বল করে দিয়েছে।

মুমিনের রয়েছে ঈমানের মর্যাদা ও সম্মান। কেননা প্রকৃত সম্মান তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনদেরই জন্য নির্ধারিত। অথচ এরা অন্য সকলের বিপরীতে কেবল নিজেদেরকেই ঈমানদার বলে দাবি করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রাসূলগণকে এবং যারা ঈমান এনেছে, তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে সাহায্য করব এবং সেদিনও, যেদিন সাক্ষীগণ দাঁড়াবে’ (সূরা আল-গাফির : ৫১)।

কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, মুসলিমদের বিভিন্ন দলের মধ্যে এরা সাহায্য ও নুসরাত থেকে সবচেয়ে দূরে এবং লাঞ্ছনা ও পরিত্যক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগণ্য। এর মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুসলিমদের মধ্যে এ দলটিই মুনাফিক্বির সবচেয়ে নিকটবর্তী এবং ঈমান থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করছে। এর স্পষ্ট প্রমাণ হলো, প্রকৃত মুনাফিক্বরা, যারা মূলত নাস্তিক এবং যাদের অন্তরে আদৌ কোনো ঈমান নেই, তারা স্বভাবতই রাফেযীদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর রাফেযীরাও অন্য সকল দলের তুলনায় এদের দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আত্মাগণ হলো সাজানো সৈন্যদল; যেগুলোর মধ্যে পারস্পরিক পরিচয় ও সাদৃশ্য রয়েছে, তারা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হবে; আর যেগুলোর মধ্যে অমিল ও বৈসাদৃশ্য রয়েছে, তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে’।[১০]  আর ইবনু মাস‘উদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ‘মানুষকে তার সঙ্গী-সাথীদের মাধ্যমেই যাচাই করো’।[১১]

এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, রাফেযীদের আত্মা ও মুনাফিক্বদের আত্মার মধ্যে প্রকৃত অর্থেই গভীর মিল ও সাদৃশ্য বিদ্যমান। একটি যৌথ বৈশিষ্ট্য ও পারস্পরিক সামঞ্জস্য তাদেরকে একত্র করে। এর মূল কারণ হলো, রাফেযীদের মধ্যে মুনাফিক্বির উপাদান বিদ্যমান; আর মুনাফিক্বি তো বহু শাখা ও বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি।

এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায় ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীছ থেকে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘চারটি গুণ যার মধ্যে বিদ্যমান, সে খাঁটি মুনাফিক্ব। আর যার মধ্যে এসবের কোনো একটি গুণ থাকে, তার মধ্যে মুনাফিক্বির একটি শাখা থাকে, যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে: কথা বললে মিথ্যা বলে, আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, আর বিবাদে লিপ্ত হলে সীমালঙ্ঘন করে’।[১২]

তিনি (শাইখুল ইসলাম) আরও বলেন, ‘সঙ্গ, বৈবাহিক সম্পর্ক এবং ভ্রাতৃত্ব এসব কেবল আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যশীল লোকদের সঙ্গেই বৈধ। অর্থাৎ আল্লাহ যা উদ্দেশ্য করেছেন, সেই আনুগত্য ও তাক্বওয়ার ভিত্তিতেই এসব সম্পর্ক স্থাপিত হবে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সুনানে বর্ণিত এই হাদীছ থেকেÑ ‘তুমি কেবল মুমিনের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করবে, আর তোমার খাবার যেন কেবল মুত্তাক্বী ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ না খায়’।[১৩]

অন্য আরেক হাদীছে এসেছে, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধ্যান-ধারণার অনুসারী হয়ে থাকে। সুতরাং তোমাদের সকলেরই খেয়াল রাখা উচিত, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে’।[১৪]

সপ্তমত : ইমাম আশ-শাতিবী (রাহিমাহুল্লাহ) বিদ‘আতিদের ব্যাপারে সতর্কবার্তা সংক্রান্ত বহু আছার উল্লেখ করার পর বলেন, ইয়াহইয়া ইবনু আবি কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘পথে যদি তোমার কোনো বিদ‘আতির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, তবে অন্য পথ ধরে চলে যাবে’। আবূ কিলাবা (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণনা করে বলেন, ‘তোমরা খেয়াল-খুশির অনুসারীদের সঙ্গে বসো না এবং তাদের সঙ্গে বিতর্কেও লিপ্ত হয়ো না। কারণ আমি আশঙ্কা করি, তারা তাদের গোমরাহিতে তোমাদের ডুবিয়ে দেবে এবং যা তোমরা আগে জানতে, সেটাকেই তোমাদের কাছে বিভ্রান্ত করে তুলবে’। এছাড়াও তিনি ইবরাহীম (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণনা করে বলেন, ‘তোমরা প্রবৃত্তির অনুসারীদের সঙ্গে বসো না এবং তাদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলো না। কারণ আমি ভয় করি, তোমাদের অন্তরগুলো উল্টে যেতে পারে’। এ বিষয়ে আরও বহু আছার রয়েছে।

এ বক্তব্যকে আরও শক্তিশালী করে সেই বর্ণনা, যা নবী (ﷺ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধ্যান-ধারণার অনুসারী হয়ে থাকে। সুতরাং তোমাদের সকলেরই খেয়াল রাখা উচিত, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে’।[১৫]

এর কারণও স্পষ্ট এবং আবূ কিলাবা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কথার মধ্যেই এর প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। কোনো ব্যক্তি সুন্নাহর কোনো বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাসের ওপর রয়েছে। অতঃপর প্রবৃত্তির অনুসারী কেউ একজন তার সামনে এমন কোনো ব্যাখ্যা বা ধারণা পেশ করে, যা শব্দের বাহ্যিক অর্থের ভেতরে পড়লেও তার কোনো মূল ভিত্তি নেই। অথবা সে নিজের মতামত থেকে তাতে অতিরিক্ত কোনো শর্ত যোগ করে দেয়। ফলে তার অন্তর তা গ্রহণ করে নেয়। এরপর যখন সে পূর্বে যা জানত, সেদিকে ফিরে তাকায়, তখন সেটাকে সে অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখতে পায়। এরপর হয়তো সে বিষয়টি বুঝতে পারে এবং জ্ঞানের মাধ্যমে তা প্রত্যাখ্যান করে। অথবা সে তা প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম হয় না। অথবা সে বিষয়টি আদৌ অনুভবই করে না; ফলে ধ্বংসপ্রাপ্তদের সঙ্গেই এগিয়ে চলে।[১৬]

অষ্টমত : ইমাম ইবনু হাজর আল-আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘উক্ত হাদীছে (মানুষ তার বন্ধুর ধ্যান-ধারণার অনুসারী হয়ে থাকে। সুতরাং তোমাদের সকলেরই খেয়াল রাখা উচিত, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে) এমন ব্যক্তির সঙ্গে বসা থেকে নিষেধ করা হয়েছে, যার সান্নিধ্যে দ্বীন ও দুনিয়া উভয় দিক থেকেই ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। আর একই সঙ্গে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে এমন ব্যক্তির সঙ্গে বসতে, যার সান্নিধ্যে দ্বীন ও দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রেই উপকার পাওয়া যায়।[১৭]

নবমত : ইমাম আস-সান‘আনী (রাহিমাহুল্লাহ) এই হাদীছের (অথবা তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে) ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘খারাপ সঙ্গীর অবস্থাও এমন। হয়তো সে তোমার দ্বীনের ক্ষতি করবে এবং তার আগুনে তোমাকে পুড়িয়ে দেবে, অথবা সে তোমার জন্য দুশ্চিন্তা ও সংকীর্ণতা বয়ে আনবে। এতে কু-সঙ্গী থেকে দূরে থাকার এবং সৎ সঙ্গীর নিকটবর্তী হওয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে’।

আর আলী ইবন আবি তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘পাপাচারীর সঙ্গ গ্রহণ করো না। কারণ সে তার কাজকে তোমার কাছে শোভন করে তুলে ধরে এবং সে চায়, তুমি তার মতোই হয়ে যাও’।

আরও বলা হয়, ‘দুষ্ট লোকদের সঙ্গে বসা থেকে সতর্ক থাকো। কারণ তোমার স্বভাব অজান্তেই তাদের কাছে চুরি হয়ে যাবে’।[১৮]

দশমত : আল-আজীমাবাদী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘উক্ত হাদীছে সৎলোক ও আলিমদের সান্নিধ্যে থাকা এবং তাদের সঙ্গে ওঠা-বসার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কারণ তাদের সঙ্গ দুনিয়া ও আখিরাত, উভয় ক্ষেত্রেই উপকার বয়ে আনে। পাশাপাশি দুষ্ট ও পাপাচারীদের সঙ্গ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেননা তাদের সঙ্গ দ্বীন ও দুনিয়া, উভয় দিক থেকেই ক্ষতিকর’।[১৯]

সুতরাং আমি (লেখক) বলব, এ সকল ভয়াবহতা থেকে বাঁচানোর জন্যই আমরা সালাফি যুবসমাজকে খেয়াল-খুশির অনুসারীদের সঙ্গে মেলামেশা, তাদের সান্নিধ্যে স্বস্তি খোঁজা এবং তাদের ওপর নির্ভর করা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করি। তাদের উচিত, পূর্ববর্তীদের অবস্থা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। অনেকেই নিজের ওপর ভরসা করে মনে করত, সে পথভ্রষ্টদের হেদায়াত করবে এবং তাদের বিচ্যুতি ও গোমরাহি থেকে ফিরিয়ে আনবে; কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সে নিজেই টালমাটাল হয়ে পড়ে, দিশেহারা হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিদ‘আতিদের কোলে গিয়ে পতিত হয়।

ইসলামের ইতিহাসের একেবারে প্রারম্ভকাল থেকেই এমন অভিজ্ঞতা বিদ্যমান। ছাহাবীদের সন্তানদের মধ্য থেকে যারা ইবনু সাবা-এর ওপর ভরসা করেছিল, তারা গোমরাহিতে পতিত হয়েছিল। আবার ছাহাবী ও তাবেঈনদের সন্তানদের মধ্য থেকে যারা মুখতার ইবনু আবি উবাইদ-এর ওপর ভরসা করেছিল, তারাও গোমরাহিতে নিপতিত হয়েছিল। আর আমাদের এই যুগেও এমন বহু লোক রয়েছে, যারা পথভ্রষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বিদ‘আতিদের ওপর নির্ভর করেছে; ফলে তারা গোমরাহদের ফাঁদে আটকা পড়েছে।

এমন সংখ্যা শুধু অনেক নয়, বরং অসংখ্য। তাদের মধ্য থেকে আমরা ইমরান ইবনু হিত্তানের ঘটনাটি উল্লেখ করি। তিনি ছিলেন, আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তিনি খারিজি মতাবলম্বী এক নারীর প্রতি আকৃষ্ট হন। উদ্দেশ্য ছিল, তাকে বিয়ে করে সুন্নাহর পথে ফিরিয়ে আনবেন। তাই তিনি তাকে বিয়ে করেন। কিন্তু বাস্তবে সেই তাকে বিদ‘আতের মধ্যে ফেলে দেয়। অথচ তিনি মনে করেছিলেন, তার মাধ্যমেই সেই বিদ‘আতি নারী হেদায়াত পাবে।

এখনও বহু লোক রয়েছে, যারা নিজেদের সালাফি মানহাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করে এবং বলে, ‘আমি প্রবৃত্তির অনুসারী বা বিদ‘আতিদের মাঝে প্রবেশ করছি তাদের হেদায়াত করার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই তাদের ফাঁদে পড়ে যায়।

আব্দুর রহমান ইবনু মুলজিম এবং ইমরান ইবনু হিত্তান, উভয়েই এক সময় সুন্নাহর অনুসারী ছিল। পরে তারা গোমরাহিতে পতিত হয়। আব্দুর রহমান ইবন মুলজিমের পাপাচার তাকে এমন পর্যায়ে পৌঁছে দেয় যে, সে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে হত্যা করে। আর ইমরান ইবনু হিত্তানের পাপাচার তাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায় যে, সে এই হত্যাকারীর প্রশংসায় কবিতা রচনা করে। (আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন)।  সে বলে, ‘এক মুত্তাক্বীর আঘাত, যার দ্বারা সে আরশের অধিপতির সন্তুষ্টি ছাড়া কিছুই কামনা করেনি’।

আমি যখনই তাকে স্মরণ করি, তখন মনে হয়Ñআল্লাহর কাছে সৃষ্টির মধ্যে সেই সবচেয়ে ভারী পাল্লার অধিকারী। কী সম্মানিত সেই সম্প্রদায়Ñযাদের কবর পাখিদের উদর; তারা তাদের দ্বীনের সঙ্গে কোনো জুলুম ও আগ্রাসন মেশায়নি। এভাবেই সে এই অপরাধীর প্রশংসায় আরও নিকৃষ্ট কবিতার পঙ্‌ক্তি রচনা করেছিল। আল্লাহ আপনাদের সবাইকে কল্যাণ দান করুন।

এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, হাদীছের ইমামদের অন্যতম আব্দুর রাজ্জাক (রাহিমাহুল্লাহ) জাফর ইবনু সুলায়মান আদ-দাবঈ-এর ইবাদত ও যুহদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার সান্নিধ্যে স্বস্তি অনুভব করেন। ফলে তিনি তাশাইয়্যু‘ (শিয়াপন্থা)-র ফাঁদে পড়ে যান।

অনুরূপভাবে আবূ যার আল-হারাওয়ী। যিনি ছহীহ গ্রন্থসমূহের রাবী ছিলেন এবং হাদীছের একজন খ্যাতনামা আলিম। তিনি আদ-দারাকুতনী কর্তৃক আল-বাকিল্লানী-এর প্রশংসায় বলা একটি কথায় প্রভাবিত হন। সেই প্রশংসাসূচক কথাটিই তাকে আশ‘আরীদের ফাঁদে টেনে নেয়। পরিণামে তিনি আশ‘আরী মতবাদের একজন দাঈ হয়ে ওঠেন। তার মাধ্যমেই উত্তর আফ্রিকায় আশ‘আরী মতবাদ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানকার মানুষ তার প্রতি অনুরক্ত হয়, তার কাছে আসে, তার সাথে সাক্ষাৎ করে। আর তিনি তাদের মধ্যে আশ‘আরী মানহাজ প্রচার করেন। অথচ তার আগে তারা কেবল সালাফী মানহাজই জানত। এভাবে তিনি তাদের জন্য এক মন্দ প্রথা চালু করেন। আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করি।

এ প্রসঙ্গে নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হেদায়াতের দিকে আহ্বান করে, তার জন্য তার অনুসারীদের সমপরিমাণ সওয়াব রয়েছে; তাদের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না। আর যে ব্যক্তি গোমরাহির দিকে আহ্বান করে, তার ওপর ক্বিয়ামত পর্যন্ত তার অনুসারীদের সমপরিমাণ গুনাহ বর্তাবে; তাদের গুনাহ থেকেও কিছুই কমানো হবে না’। আল্লাহ তা‘আলার কাছে আমরা নিরাপত্তা প্রার্থনা করি।

এছাড়াও ইমাম বায়হাক্বী (রাহিমাহুল্লাহ)-ও কিছু পথভ্রষ্ট লোকের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। যেমন ইবনু ফূরক ও তার মতো আরও অন্যরা। অথচ তিনি ছিলেন হাদীছের একজন শীর্ষস্থানীয় আলিম। তবু শেষ পর্যন্ত তিনি আশ‘আরী মতবাদে প্রবেশ করেন।

এখন গভীরভাবে ভেবে দেখুন, যে ব্যক্তি নিজেই অজ্ঞ, অথচ নিজের ওপর অতি মাত্রায় ভরসা করে এবং আত্মপ্রবঞ্চনায় ডুবে থাকে; যার কাছে এমন কোনো ইলমই নেই, যা তাকে সুরক্ষা দিতে পারে, সে তো এদের তুলনায় শতগুণ বেশি বিদ‘আতে পতিত হওয়ার যোগ্য।

আর বর্তমান যুগে ওযাদের আমরা নিজেরাই চিনতাম তাদেরও এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। তারা একসময় সালাফী মানহাজের ওপরই ছিল। কিন্তু যখন তারা বিদ‘আতিদের সঙ্গে মিশে গেল, তখন তারা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ল। কারণ বর্তমান সময়ের বিদ‘আতিদের আছে নানা কৌশল, আছে সংগঠিত কার্যক্রম, আছে নানা পদ্ধতি। যেগুলো হয়তো অতীতে শয়তানরাও জানত না। এখন তারা এসব কৌশল ও পদ্ধতি রপ্ত করেছে এবং ভালোভাবেই জানে, কীভাবে মানুষকে ধোঁকা দিতে হয়।

সমসাময়িক বিদ‘আতিদের কৌশলগুলোর একটি হলো, তারা বলে, ‘তুমি পড়বে, সত্যটা নেবে আর মিথ্যাটা ছেড়ে দেবে’। অথচ বহু যুবকই সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য জানে না, সত্য-মিথ্যা চেনার সক্ষমতাও তাদের নেই। ফলে তারা সত্য মনে করে মিথ্যার মধ্যেই পড়ে যায়, আর সত্যকে মিথ্যা ভেবে প্রত্যাখ্যান করে। এভাবে সবকিছুই তার কাছে উল্টে যায়।

এ প্রসঙ্গে হুযাইফা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই পরিপূর্ণ গোমরাহি হলো, যে সত্যকে তুমি আগে চিনতে, তা অস্বীকার করা; আর যে মিথ্যাকে তুমি আগে অস্বীকার করতে, তাকে সত্য বলে গ্রহণ করা’।

ফলে আপনি দেখতে পাবেন, যে ব্যক্তি একসময় সালাফী ময়দানে বা সালাফীগণের পথেই চলছিল। কিন্তু বুঝতেই পারবেন না, হঠাৎ সেই দুর্ভাগা মানুষটি ঘুরে যাবে। দেখবেন, সে আহলুস সুন্নাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যা একসময় তার কাছে অস্বীকৃত ছিল, তাই এখন গ্রহণযোগ্য হয়ে গেছে। আর যা গ্রহণযোগ্য ছিল, তাই হয়ে গেছে অস্বীকৃত। এটিই তো পরিপূর্ণ গোমরাহি, সর্বোচ্চ গোমরাহি। তাই আমরা সালাফী যুবসমাজকে বিদ‘আতিদের দ্বারা প্রতারিত হওয়া এবং তাদের দিকে ঝুঁকে পড়া থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করছি।



* অধ্যয়নরত, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ মাদীনা, সৌদি আরব।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৬৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪০।
[২]. মুসনাদে আহমদ, হা/৮০২৮; আবূ দাউদ, হা/৪৮৩৩; আত-তিরমিযী, হা/২৩৭৮।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৩৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৩৮।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৩৪; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬২৮।
[৫]. শারহুস সুন্নাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ২২৭।
[৬]. রওদাতুল উক্বালা, পৃ. ৯৯-১০৩।
[৭]. মা‘আলিমুস সুনান, ৪র্থ সংস্করণ, পৃ. ১১৫।
[৮]. প্রাগুক্ত।
[৯]. শারহুন নববী আলাল মুসলিম, ১৬তম খণ্ড, পৃ. ১৭৮।
[১০]. শারহুন নববী আলাল মুসলিম, ১৬তম খণ্ড, পৃ. ১৭৮।
[১১]. প্রাগুক্ত।
[১২]. মিনহাজুস সুন্নাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৪২৫-৪২৭।
[১৩]. প্রাগুক্ত।
[১৪]. প্রাগুক্ত; মাজমূঊ ফাতাওয়া, ১৫তম খণ্ড, পৃ. ৩২৭।
[১৫]. মিনহাজুস সুন্নাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৪২৫-৪২৭।
[১৬]. ইমাম আশ-শাতিবী, আল-ই‘তিসাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭২-১৭৩।
[১৭]. ফাতহুল বারি, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩২৪।
[১৮]. শারহুল জামি‘ আছ-ছাগীর, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৫২১।
[১৯]. আউনুল মা‘বূদ, ১৩তম খণ্ড, পৃ. ১৭৮।




গাযওয়াতুল হিন্দ : একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ - হাসিবুর রহমান বুখারী
ইসলামী তাবলীগ বনাম ইলিয়াসী তাবলীগ (২য় কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ইসলামে পর্দার বিধান (২য় কিস্তি) - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ছালাতের সঠিক সময় ও বিভ্রান্তি নিরসন (শেষ কিস্তি) - মাইনুল ইসলাম মঈন
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কারে আলিমগণের গৃহীত মূলনীতিসমূহ: একটি পর্যালোচনা (৩য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
আল-কুরআনে মানুষ: মর্যাদা ও স্বরূপ বিশ্লেষণ - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
যাদুটোনার শারঈ সমাধান (শেষ কিস্তি) - মাসঊদুর রহমান
মসজিদ: ইসলামী সমাজের প্রাণকেন্দ্র (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
আল-কুরআনের ব্যাপারে অমুসলিমদের মিথ্যা অভিযোগ ও তার খণ্ডন - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
মুসলিম উম্মাহর বিভ্রান্তির কারণ ও উত্তররেণর উপায় - হাসিবুর রহমান বুখারী
তাওহীদ প্রতিষ্ঠার উপায় (শেষ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ঐক্যের মর্যাদা ও মানদণ্ড - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ