বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৬:১১ অপরাহ্ন

তরুণদের বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে সতর্কীকরণ

- মুহাম্মাদ ইবনু নাছির আল-উরাইনি (রহ.)*
- অনুবাদ : মাসঊদুর রহমান


(৬ষ্ঠ কিস্তি)

১৪০০ হিজরীতে মসজিদে হারামে হামলার ঘটনাটি সন্ত্রাসবাদের আরেকটি উদাহরণ, তবে  এটাকে প্রতিহত করা হয়েছিল। এ জন্য সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্যÑ  আলহামদুলিল্লাহ। অতঃপর  রাষ্ট্রের আন্তরিক ব্যক্তি এবং বীর সৈন্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছিল তাদেরকে মহান আল্লাহর আইন অনুসারে বিচার করা হয়েছে এবং প্রত্যেকেই তাদের প্রাপ্য শাস্তি পেয়েছে। তারা লাঞ্ছনা ও অপমান ছাড়া আর কিছুই পায়নি।

সন্ত্রাসবাদের আরেকটি উদাহরণ হল- রিয়াদের আল-উলিয়ায় একটি বিপথগামী ও আক্রমণাত্মক গোষ্ঠীর দ্বারা সংঘটিত জঘন্য ও অপরাধমূলক বোমা হামলা, যা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এর ফলে অনেক নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছিল, সম্পত্তি ও দামী সম্পদ ধ্বংস হয়েছিল এবং জনগণকে আতঙ্কিত করা হয়েছিল। খুবই কষ্ট ও চিন্তার বিষয় ছিল যখন ঘোষণা করা হয়েছিল যে অপরাধীরা সবাই ছিল সঊদীয়ান। অতঃপর আল্লাহর বিচার তাদের উপর কার্যকর করার মাধ্যমে তারা এই জঘন্য পরিণতির মুখোমুখি হয়েছে। উল্লেখ্য, এই দেশটির উপর বিভিন্ন ধরনের ফেতনা ও বালা মুসিবত অব্যাহত রয়েছে। কেননা এই দেশটি সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ্যবস্তু এবং অন্য দেশের তুলনায় এটার উপর তাদের  মনোযোগ অনেক বেশি। কেননা অন্যান্য দেশের চেয়ে এই দেশে রয়েছে অনেক কল্যাণ, নে‘মত ও মর্যাদায় সমৃদ্ধশীল। এরপর বিশ্বাসঘাতক সন্ত্রাসীরা ১৪১৭ হিজরিতে অতীতে পূর্ব প্রদেশের ‘খোবারে’ বোমা হামলার চেয়েও বেশি শক্তিশালী বোমা হামলা চালায়, যার ফলে মুসলিম এবং আশ্রীতদের হত্যা ও আহত, নিরপরাধ ব্যক্তিদের আতঙ্কিত করা হয় এবং ব্যাপক দুর্নীতি হয়। আমরা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের দেশ এবং মুসলিমদের ভূমিকে প্রতিটি বিশ্বাসঘাতক থেকে রক্ষা করেন।

আফসোসের বিষয় হল- এই চরমপন্থীরা কিছুতেই থেমে থাকবে না। তাই তারা সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে জঘন্য পথ বেছে নিয়েছে। এজন্য তারা আমাদের দেশের অন্যতম বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যক্তিত্ব, মহামান্য প্রিন্স মুহাম্মাদ বিন নায়েফ (হাফিযাহুল্লাহ) এর ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। অবশেষে ঐ অপরাধীকে হত্যা করা হয়েছিল। কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছিল। মহান আল্লাহ তাঁর নিজ অনুগ্রহে তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। ফলে বিদ্বেষপূর্ণ চক্রান্তকারীরা হতাশ হয়েছিল। এভাবেই নিকটতম ও দূরবর্তী এই ঘৃণ্য সন্ত্রাসবাদের অধ্যায়গুলো প্রকাশিত হতে থাকে, যার প্রত্যেকটি শত্রুদের দ্বারা সংগঠিত এবং সমর্থিত। যদিও তারা  আমাদের এই বিজয়কে অভিনন্দন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে নিন্দা জানিয়েছে।  কিন্তু আমাদের জেনে রাখা ভালো যে, প্রতিটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার পেছনে তারাই রয়েছে।

স্থানীয় সন্ত্রাসীরা তাদের এই জঘন্য কাজগুলো নিজ থেকে করেনি, বরং তাদের নিজেদের মধ্যে যারা খারিজী মতাদর্শ গ্রহণ করেছিল, তাদের নিকট থেকে দ্বীনের প্রতি উৎসাহিত হয়ে  করেছে। এই ব্যক্তিরা জিহাদ, দাওয়াহ এবং সংস্কারের আড়ালে বই, টেপ রেকর্ড, গোপন বৈঠক  এবং কিছু নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে যেখানে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তিরা লেখে, যারা তাদেরকে সঠিক ইসলামী জ্ঞান ছাড়াই ধর্মের প্রতি উসকানি দিয়ে থাকে। দুর্ভাগ্যবশত, তাদের এই  অভিভাবকত্বহীনতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল, যার ফলে তারা তাদের পিতামাতার কথা বিবেচনা না করেই এই মন্দ কাজগুলো করতে প্ররোচিত হয়েছিল। তাদের পিতামাতা তাদের এমন কাজ থেকে নিষেধ করেছিল,  জ্ঞানী বিচক্ষণ প্রখ্যাত আলেমগণও তাদের নিষেধ করেছিলেন। বিধায় এই সকল আলেমদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় যে, তাদের বোধগম্যতার অভাব রয়েছেÑ এজন্য তারা অস্ত্র হাতে নিতে নিষেধ করে, যুদ্ধ অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করে ইত্যাদি অভিযোগের মাধ্যমে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।

 এই অভিযোগগুলোর উদ্দেশ্য ছিল তাদের কাছে থাকা ইসলামী আইনকে তুচ্ছ করা। ঐ ব্যক্তিরা তাদের নিন্দনীয় কাজের এবং তার ফলে সৃষ্ট ব্যাপক দুর্নীতির পরিণতি ভোগ করুক, যা দেশ ও দেশের মানুষের ক্ষতি করেছে। এছাড়া এই ভ্রান্ত ধারণাগুলোর মোকাবিলা করা এবং যাদের ওপর আল্লাহ আমাদের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তাদের সাথে আন্তরিক ও বিশ্বস্ততার সাথে এর উৎসগুলো নির্মূল করার জন্য কাজ করা আমাদের কর্তব্য। স্মরণ রাখতে হবে যে, এটা শুধু শ্লোগানের বিষয় নয়। আমাদের উচিত তাদের সাথে মেলামেশা ও কথাবার্তা বলা এবং ভালো কল্যাণকর কাজে তাদেরকে সহযোগিতা করা। তবে এই কাক্সিক্ষত কল্যাণ অর্জনের জন্য কর্ম-পদ্ধতি ও কৌশলগুলো অবশ্যই বৈধ উপায়ে হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

ۘ وَ تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَ التَّقۡوٰی ۪ وَ لَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَ الۡعُدۡوَانِ ۪ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ  شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ

‘সৎ কাজ করতে ও সংযমী হতে তোমরা পরস্পরকে সাহায্য কর। তবে পাপ ও শক্রতার ব্যাপারে তোমরা একে অপরকে সাহায্য কর না।  আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা’ (সূরা আল-মায়েদাহ: ২)।

শায়খ আব্দুল আযীয ইবনু আব্দুল্লাহ আলুশ শায়খ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, আমরা এমন এক সন্ত্রাসী মতাদর্শের সম্মুখীন হয়েছি যা ইসলামী বিশ্বের অনেক অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং, আমাদের অবশ্যই মাঝে মাঝে খুতবায় কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও মতাদর্শের বিরুদ্ধে আলোচনা করা উচিত। পাশাপাশি সমাজের মানুষদেরকে সঠিক পথ দেখানো এবং তাদেরকে শত্রুদের ফাঁদ ও বিপদ থেকে এবং মিথ্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে সতর্ক করাও আমাদের কর্তব্য। আমাদের উচিত তাদের দ্বীন-ধর্ম ও পার্থিব জীবনের জন্য যা কল্যাণকর ও উত্তম, তাদেরকে সেদিকে পরিচালিত করা, বিশেষ করে যখন এই যুগে নানা  ফিতনা, নতুন নতুন মতবাদ ও প্রথা, কুসংস্কার, প্রলোভন এবং অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়েছে’। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন আমরা আমাদের দ্বীন-ধর্ম, নেতৃত্ব, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি, ঐক্য এবং কল্যান অর্জনের ব্যাপারে হলুদ সাংবাদিক, গণমাধ্যম এবং শত্রুদের বাধার সম্মুখীন হচ্ছি। বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, বিপদজনক মতবাদ, ভুলভাল মতামত ও ভ্রষ্ট গণমাধ্যমের অভিযান তো আছেই। সুতরাং, দ্বীন প্রচারকগণকে অবশ্যই জাতির ক্ষতি করে এমন সবকিছু সম্পর্কে সচেতন থাকতে বলা, মন্দ থেকে জাতিকে সতর্ক করা এবং তা পরিহার করতে বলা উচিত। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির ভুল উল্লেখ করে তাকে অতিরঞ্জিত করা বা তার মানহানি না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। কেননা আমাদের মূল উদ্দেশ্য হল নবী (ﷺ)-এর আদর্শ অনুসরণ করে আন্তরিকভাবে জাতিকে উপদেশ প্রদান করা। কেননা নবী (ﷺ) যখন কোন ব্যক্তিকে উপদেশ দিতেন বা তিরস্কার করতেন, তখন তিনি সাধারণীকরণ করে বলতেন,

مَا بَالُ أَقْوَامٍ يَشْتَرِطُوْنَ شُرُوْطًا لَيْسَ فِيْ كِتَابِ اللهِ مَنْ اشْتَرَطَ شَرْطًا لَيْسَ فِيْ كِتَابِ اللهِ

‘লোকদের কী হলো, তারা এমন সব শর্ত করে যা আল্লাহর কিতাবে নেই’।[১]

সন্ত্রাসীরা যা করে তা হলো বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদেরকে ভীতি প্রদর্শন। তারা তাদের এই জঘন্য কাজে যুবক-বৃদ্ধ কিংবা নারীর মধ্যে কোন ভেদাভেদ করে না। অথচ তারা দাবি করে যে, এটি ইসলাম ও জিহাদের অংশ। ইসলাম এ ব্যাপারে নির্দোষ, কারণ ইসলাম নারী, শিশু, বৃদ্ধ ব্যক্তিদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছে, এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

وُجِدَتْ امْرَأَةٌ مَقْتُوْلَةً فِيْ بَعْضِ مَغَازِيْ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فَنَهَى رَسُوْلُ اللهِ ﷺ عَنْ قَتْلِ النِّسَاءِ وَالصِّبْيَانِ

‘কোন এক যুদ্ধে জনৈকা মহিলাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মহিলা ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেন’।[২]

সন্ত্রাসীদের কথিত জিহাদ ও সংস্কারের মাধ্যমে কত নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং কত নিষিদ্ধ রক্তপাত অন্যায় ও আগ্রাসীভাবে ঘটেছে!? সত্য হলো, তারা যা সংস্কার করতে চেয়েছিল, তাকেই কলুষিত করেছে, ইসলামের ক্ষতি করেছে এবং বিশ্বের সামনে এর সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। অথচ রাসূল (ﷺ) বলেছেন, الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ ‘মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে’।[৩]

মহান আল্লাহ সব ধরনের শত্রুদের হতে মুসলিম জাতিকে রক্ষা করুন। আমীন!!


* শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৫৬; আল-জাজিরা, ৪ সফর ১৪৩২ হিজরী।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৩০১৫।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/১০।




প্রসঙ্গসমূহ »: যুবসমাজ শিশু-কিশোর
যাদের জন্য জান্নাত ওয়াজিব - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
সুন্নাতের আলো বিদ‘আতের অন্ধকার (১০ম কিস্তি) - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
ইসলামী উত্তরাধিকার আইন: উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ ধারা - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
ইসলামী ভ্রাতৃত্বের গুরুত্ব ও মূল্যায়ন - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
দুর্নীতি হ্রাসে শিক্ষার ভূমিকা - মোঃ শফিকুল ইসলাম
পরবর্তীদের তুলনায় সালাফদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব (৪র্থ কিস্তি) - অনুবাদ : আযহার বিন আব্দুল মান্নান
মসজিদ: ইসলামী সমাজের প্রাণকেন্দ্র (৮ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
মাযহাবী গোঁড়ামি ও তার কুপ্রভাব (৪র্থ কিস্তি) - অনুবাদ : রিদওয়ান ওবাইদ
পরবর্তীদের তুলনায় সালাফদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব (৩য় কিস্তি) - অনুবাদ : আযহার বিন আব্দুল মান্নান
ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজ - ড. মেসবাহুল ইসলাম
ইসলামী জামা‘আতের মূল স্তম্ভ (৩য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
আল-কুরআনে মানুষ: মর্যাদা ও স্বরূপ বিশ্লেষণ (শেষ কিস্তি) - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ