ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায়
- হাসিবুর রহমান বুখারী*
(৩য় কিস্তি)
৪. বিচ্ছিন্নতা ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি
‘ইসলাম’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে- ঈমান, তাক্বওয়া, ন্যায়বিচার, ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের ভিত্তিতে প্রকৃত মানুষ গঠন করতে চায়। যদি মুসলিমরা নিজেদের মধ্যেই হিংসা, বিদ্বেষ ও রক্তপাতে মেতে থাকে, তাহলে ইসলামী রাষ্ট্র তো দূরের কথা, সুস্থ সমাজ গঠনও কঠিন হয়ে পড়বে। ইসলামের ভিত্তিই হল- ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়নীতিÑরক্তপাত নয়! ইতিহাস সাক্ষী- মাদীনাতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে নবী (ﷺ) প্রায় ১৩ বছর মক্কায় মানুষ গড়েছেন, তাদের আক্বীদা সংশোধন করেছেন, উত্তম চরিত্র গঠন করেছেন, মুহাজির ও আনছারের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছেন, প্রতিশোধপ্রবণ গোত্রীয় মানসিকতা ভেঙেছেন, ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, তারপর রাষ্ট্র এসেছে। রাষ্ট্র এসেছে পরে, আগে এসেছে ঈমানী ঐক্য। স্বাভাবিকভাবেই যখন মানুষের মধ্যে তাক্বওয়ার ঘাটতি, মাযহাব/দলীয় অন্ধতা, রাজনৈতিক স্বার্থ, ক্ষমতার লোভ, দলীয় উগ্রতা, বাইরের শক্তির প্রভাব বাড়ে, তখন ইসলামের মূল চেতনা দুর্বল হয়ে যায়। অতএব আক্বীদা ও আমলের সংশোধন, পরস্পরের প্রতি সহনশীলতা, ন্যায় ও আমানতদার নেতৃত্ব, শিক্ষা ও উত্তম চরিত্র গঠন এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ব্যতীত ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা- নদীর স্রোতকে বিপরীতমুখী প্রবাহিত করার মতই সাধ্যাতীত। সুতরাং যদি মুসলিমরা নিজেদের সংশোধন না করে, তাহলে শুধু ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ নাম দিলেই সেটা ইসলামী হবে না বরং রাষ্ট্র তখনই ইসলামী হবে, যখন মানুষের হৃদয় ইসলামী হবে।
দলাদলি, মতভেদ ও পারস্পরিক সহনশীলতার অভাব ঐক্যকে বিনষ্ট করে। অথচ ঐক্যের গুরুত্ব-মাহাত্ম্য সামনে রেখেই ইসলাম গৃহত্যাগ বা বৈরাগ্যবাদকে হারাম ঘোষণা করেছে। ঐক্য ও সংহতি মুসলিম জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ঐক্যবদ্ধভাবে জীবনযাপন করা মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য। ইসলামে ঐক্যের গুরুত্ব অপরিসীম। সংঘবদ্ধভাবে জীবন পরিচালনা করা ইসলামের নির্দেশনা। এ সর্ম্পকে মহান আল্লাহ বলেন, وَ اعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللّٰهِ جَمِيْعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوْا ‘হে মুমিনগণ! তোমারা আল্লাহর রজ্জুকে (ইসলাম) আঁকড়ে ধর (ঐক্যবদ্ধ হও) এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)। ঐক্য সর্ম্পকে আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
وَ لَا تَكُوْنُوْا كَالَّذِيْنَ تَفَرَّقُوْا وَ اخْتَلَفُوْا مِنْۢ بَعْدِ مَا جَآءَهُمُ الْبَيِّنٰتُ١ؕ وَ اُولٰٓىِٕكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيْمٌۙ
‘তোমরা সেসব লোকদের মত হয়ো না, যাদের কাছে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য নিদর্শন আসার পরও তারা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং নানা ধরনের মতানৈক্য সৃষ্টি করেছে, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৫)।
ঐক্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনুল কারীমের এতো নির্দেশনা থাকার পরও বর্তমানে মুসলিম সমাজে ঐক্যের বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হয়। মুসলিম জাতি এক প্রাণ, এক দেহ, এই চেতনাবোধ দিনে দিনে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। ইসলামে মুসলিমদের পারস্পরিক সর্ম্পক ভ্রাতৃত্বের। এ সর্ম্পকের ভিত্তি ইসলামের একটি স্তম্ভের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে কেউ তার স্বীকৃতি দিবে সেই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হবে। এই ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য বজায় রাখার ব্যাপারে মহান আল্লাহ এবং রাসূল (ﷺ) জোর তাকীদ দিয়েছেন। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেন,
عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الْوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الاِثْنَيْنِ أَبْعَدُ مَنْ أَرَادَ بُحْبُوحَةَ الْجَنَّةِ فَلْيَلْزَمِ الْجَمَاعَةَ مَنْ سَرَّتْهُ حَسَنَتُهُ وَسَاءَتْهُ سَيِّئَتُهُ فَذَلِكَ الْمُؤْمِنُ.
‘তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শয়তান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দু’জন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে ব্যক্তি জান্নাতের সর্বোত্তম অংশে বসবাস করে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরে। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্ আমল কষ্ট দেয় সেই হল প্রকৃত ঈমানদার’।[১]
পৃথিবীতে যারা যতবেশী ঐক্যবদ্ধ, সুসংগঠিত তারা ততবেশী শক্তিশালী ও মর্যাদাবান। পক্ষান্তরে যারা বিচ্ছিন্ন, দলত্যাগী তারা দুর্বল ও উপেক্ষিত। ইসলাম কখনো বিচ্ছিন্নতাকে সমর্থন করে না। পারিবারিক চৌহদ্দি থেকে শুরু করে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও মুসলিমদের পারস্পরিক ঐক্য, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বমূলক সুদৃঢ় বন্ধন দেখতে চায়। সেই লক্ষ্যে সব মুসলিমকে এক কাতারে এনে ঘোষণা করেছে, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই’ (সূরা আল-হুজুরাত : ১০)। নু‘মান ইবনু বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন,
تَرَى الْمُؤْمِنِيْنَ فِيْ تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ كَمَثَلِ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى.
‘পারস্পরিক দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মুমিনরা একটি দেহের মতই। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাত জাগে এবং জ্বরে অংশ নেয়’।[২]
বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতার পরিণতি কী এবং একতার সুফল কীÑ তা ইসলাম স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছে। জাহিলী যুগে আরবের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থার মত রাজনৈতিক অবস্থাও ছিল খুবই দুর্বল। রাজনৈতিক দুরবস্থার মূলে ছিল বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা। তারা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত ছিল। একদলের সঙ্গে অন্য দলের সংঘাত-সংঘর্ষ লেগেই থাকত। আধিপত্য ধরে রাখতে কখনো একদল অন্য দলের সঙ্গে জুটবদ্ধ হত বটে, কিন্তু সমগ্র আরব এক হয়ে নিজেদের রাষ্ট্র সংরক্ষণ কিংবা জাতীয়তা রক্ষার মিশনে কখনো এক হত না। কিছুসংখ্যক শহরে বসবাস করলেও অধিকাংশ আরব ছিল যাযাবর। আরবদের এহেন দুর্বলতার সুযোগে সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল সেই সময়ের দু’টি পরাশক্তি রোম ও পারস্য। কখনো কখনো সে সুযোগ গ্রহণ করত দক্ষিণের রাজ্যগুলোও। আরবরা ছিল দাবার ঘুঁটির মত। কিন্তু ইসলাম এসে তাদের ঐক্যবদ্ধ করে সুগঠিত করে। এক আল্লাহ তা‘আলার উপর বিশ্বাসী হওয়ার তাকীদ দেয়। তাদের কাছে পাঠানো রাসূলকে অনুসরণের নির্দেশ দেয়। কুরআনুল কারীমের ছায়াতলে আসতে বলে। ধীরে ধীরে তারা সে ডাকে সাড়া দেয়। আলোকিত হয় ইসলামের আলোয়। ফলস্বরূপ পরবর্তীতে তাঁরা দেখেছিলেন শুধুই বিজয়ের ইতিহাস। তাই ইসলাম মুমিনদের দ্বীন-ধর্ম আঁকড়ে ধরে ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে এবং অতীতের দুরবস্থার কথাও স্মরণে রাখার তাকীদ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ اعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللّٰهِ جَمِيْعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوْا١۪ وَ اذْكُرُوْا نِعْمَتَ اللّٰهِ عَلَيْكُمْ اِذْ كُنْتُمْ اَعْدَآءً فَاَلَّفَ بَيْنَ قُلُوْبِكُمْ فَاَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهٖۤ اِخْوَانًا١ۚ وَ كُنْتُمْ عَلٰى شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَاَنْقَذَكُمْ مِّنْهَا١ؕ كَذٰلِكَ يُبَيِّنُ اللّٰهُ لَكُمْ اٰيٰتِهٖ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُوْنَ
‘তোমরা সকলে আল্লাহর রশি (ধর্ম বা কুরআন)-কে শক্ত করে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর, তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করলেন। ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুণ্ডের (দোযখের) প্রান্তে ছিলে, অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তা হতে তোমাদেরকে উদ্ধার করেছেন। এরূপে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শন স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)।
ইসলামের এই নির্দেশ মুমিনরা (ছাহাবায়ে কিরাম) এতটাই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন, যার নজির পৃথিবীতে বিরল। মদীনার আনছার সম্প্রদায় মক্কার মুহাজির সম্প্রদায়ের প্রতি যে ভ্রাতৃত্ব আর সৌহার্দ প্রদর্শন করেছিলেন তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত প্রশংসিত উপাখ্যান হয়ে থাকবে। নিজেদের নিত্যব্যবহার্য আসবাবপত্র, আহার-পানীয়, ঘরবাড়ি, ক্ষেতখামার, পোশাক-আশাকসহ সবকিছু মুহাজিরদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের ভাষায় বলেন, وَ الَّذِیۡنَ مَعَہٗۤ اَشِدَّآءُ عَلَی الۡکُفَّارِ رُحَمَآءُ بَیۡنَہُمۡ ‘আর তার (মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর) সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন’ (সূরা আল-ফাত্হ : ২৯)।
তাঁরা ভোগে নয়, ত্যাগে বিশ্বাসী ছিলেন। নিজের উপর অন্য মুমিনকে প্রাধান্য দিতেন। মুসলিমদের ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা আর সহমর্মিতার ইতিহাস বিস্ময়কর। সেই ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা আর ঐক্যের ফলকে দাঁড়িয়েই মুসলিমরা এক দিন বিশ্ব জয় করছিলেন। শত্রুর মোকাবিলায় যারা ছিলেন সীসাঢালা প্রাচীর সদৃশ। ফলাফলও ছিল ঈর্ষণীয়। মদীনার ছোট্ট রাষ্ট্রটিকে তাঁরা বিস্তৃত করেছিলেন অর্ধ পৃথিবীব্যাপী। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ইয়াহুদী ও মুনাফিক্ব চক্রের কূটচালে তৃতীয় খলীফা উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সময়ে মুসলিমদের ঐক্যে ফাটল ধরে। চতুর্থ খলীফা আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর আমলে এসে ঐক্যের গোড়ায় বড় আঘাত লাগে। সে আঘাতে বিক্ষিপ্ত হতে থাকে মুসলিমরা। উদ্ভব হয় নতুন নতুন দল-উপদলের। শী‘আ, খারেজী, রাফিযীর মত নানা ভ্রান্ত ফির্ক্বার। শক্তি হারাতে থাকে ইসলাম। ঐক্য আর সম্প্রীতির বাণী ভুলে মুসলিমরা হতে থাকে বিচ্ছিন্ন। সেই ধারা আজও বহমান। তাই মুসলিমদের উপর জেঁকে বসেছে শত্রুরা। পৃথিবীর নানা প্রান্তে নির্যাতন করে চলছে যুগের পর যুগ, দশকের পর দশক ধরে। তবু মুসলিমরা কেউ কারও সঙ্গে এক হতে রাজি নয়। ক্ষমতা, অর্থ আর সম্মানের মোহে বিভোর হয়ে আছে। যত দ্রুত এই অবস্থার অবসান ঘটবে, ততই মঙ্গল হবে এই উম্মাহর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ وَ لَا تَنَازَعُوۡا فَتَفۡشَلُوۡا وَ تَذۡہَبَ رِیۡحُکُمۡ وَ اصۡبِرُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰہَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ
‘আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর ও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করো না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি ও প্রতিপত্তি বিলুপ্ত হবে। আর তোমরা ধৈর্যধারণ কর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন’ (সূরা আল-আনফাল : ৪৬)।
আল্লাহ তা‘আলার বিস্ময়কর নিদর্শন হল- জাহিলরা যখন আল্লাহর কিতাবের উপর একতাবদ্ধ থাকা ও রাসূল (ﷺ)-এর উপর অর্পিত শরী‘আতকে আঁকড়ে ধরা বর্জন করল তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা, বিক্ষিপ্ততা ও হানাহানি সৃষ্টি করে তাদেরকে পরীক্ষায় ফেললেন। আর তারা নিজেদের বাতিলকে নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠল। এটাই তাদের শাস্তি। কেননা মানুষ বাতিল নিয়ে আনন্দিত হলে তা আর পরিত্যাগ করে না। অপরদিকে যখন বাতিলের প্রতি আনন্দবোধ থাকে না, সন্দেহ জাগে তখন এক্ষেত্রে তাওবাহ করা ও ফিরে আসার সম্ভবনা থাকে। কিন্তু যখন বাতিলকে নিয়ে শান্তি পায় ও আনন্দিত হয় তখন ব্যক্তির মাঝে পরিবর্তন ঘটে না। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে বাতিলপন্থীদের শাস্তি। কেননা যে হক্ব পরিত্যাগ করে, সে বাতিলের পরীক্ষায় পড়ে। আর যে একতাবদ্ধ থাকা বর্জন করে, সে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত, হানাহানি ও সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার পরীক্ষায় পড়ে। তাই দ্বীন ও দুনিয়াবী বিষয়ে ভিন্নমতের ঐসব মানুষের মাঝে কেবল শত্রুতা, গোঁড়ামি ও বিদ্বেষ পাওয়া যায়। কখনো কখনো নিজেরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়। আর যারা কুরআন ও সুন্নাহকে একত্রে আঁকড়ে ধরে, তাদের মাঝে হৃদ্যতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয় এবং পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে দেখা যায়। তারা যেন একটি দেহের মত। তাই কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা ব্যতীত কোন নিরাপত্তা নেই। আর কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ ছাড়া কোন ঐক্যও নেই। এ ছাড়া যা কিছু আছে সবই বিভেদ ও শাস্তি। যারা নিজেদের কথা অনুযায়ী মুসলিমদেরকে একতাবদ্ধ দেখতে চায়, তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যদি মুসলিমদের ঐক্য কামনা করেই থাক, তাহলে আক্বীদার ক্ষেত্রে এক হও। রাসূল (ﷺ) যা নিয়ে এসেছেন সে একত্বে ও আক্বীদার উপর সবাই এক হয়ে যাও। আর এটা আমাদের কারামাত, এটা আমাদের ছূফীমত ও এটা আমাদের শী‘আমত- এসব বলে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করো না।
আদতে ইসলাম তাওহীদের দ্বীন এবং ঐক্যের ধর্ম। এখানে শিরকের সুযোগ নেই এবং অনৈক্য ও বিভেদের অবকাশ নেই। ইসলামে ঐক্যের ভিত্তি হচ্ছে তাওহীদ অর্থাৎ এক আল্লাহর ইবাদত ও এক আল্লাহর ভয়। এই তাওহীদপন্থী সমাজকে ইসলাম আদেশ করে ছীরাতে মুস্তাক্বীম ও মুমিনদের আদর্শের উপর একতাবদ্ধ থাকার, নিজেদের ঐক্য ও সংহতি এবং সৌহার্দ ও সম্প্রীতি রক্ষা করার, ইজমা ও মুমিনদের পথের বিরোধিতা পরিহার করার এবং এমন সব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার- যা উম্মাহর একতা বিনষ্ট করে এবং সম্প্রীতি ধ্বংস করে।
পূর্ববর্তী মুমিনদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে কুফর এবং পরস্পর কলহ-বিবাদে লিপ্ত হওয়া হারাম ও কাবীরা গুনাহ। বিষয়টি যদিও দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট এবং উম্মাহর সর্বসম্মত আক্বীদা, তবুও পুনস্মরণের স্বার্থে কিছু আয়াত ও হাদীছ উল্লেখ করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মোটামুটি আটটি সূরার সর্বমোট ২৭টি আয়াত রয়েছে। এখানে কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হল। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ اِنَّ ہٰذِہٖۤ اُمَّتُکُمۡ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً وَّ اَنَا رَبُّکُمۡ فَاتَّقُوۡنِ - فَتَقَطَّعُوۡۤا اَمۡرَہُمۡ بَیۡنَہُمۡ زُبُرًا ؕ کُلُّ حِزۡبٍۭ بِمَا لَدَیۡہِمۡ فَرِحُوۡنَ - فَذَرۡہُمۡ فِیۡ غَمۡرَتِہِمۡ حَتّٰی حِیۡنٍ
‘নিশ্চয় তোমাদের এই জাতি একই জাতি (তাওহীদের জাতি) এবং আমিই তোমাদের প্রতিপালক, অতএব তোমরা আমাকে ভয় কর। কিন্তু তারা নিজেদের দ্বীনকে নিজেদের মাঝে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে, বহু ভাগে বিভক্ত করেছে, প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে, তা নিয়েই আনন্দিত। সুতরাং তুমি কিছুকালের জন্য তাদেরকে স্বীয় বিভ্রান্তিতে থাকতে দাও’ (সূরা আল-মুমিনূন : ৫২-৫৪; সূরা আল-আম্বিয়া : ৯২-৯৩)। উপরিউক্ত আয়াতে নবীগণ যে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন তা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে জাতি একটিই। আর তা হচ্ছে- তাওহীদের জাতি। সূরা ইউনুস: ১৯ ও সূরা আল-বাক্বারা ২১৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, ‘সমস্ত মানুষ প্রথমে এক জাতিই ছিল, অতঃপর তারা কুফর ও শিরকের মধ্যে লিপ্ত হয়ে মতভেদ সৃষ্টি করল’। শিরক হল মানুষের নিজেদের মনগড়া কর্ম। কেননা, প্রথমে এর কোন অস্তিতত্ত্বই ছিল না। সকল মানুষ একই দ্বীন ও একই পথের পথিক ছিল। আর সে পথ হল- ইসলামের পথ, যার আসল ভিত্তি হল তাওহীদ। নূহ (আলাইহিস সালাম) পর্যন্ত মানুষ সেই তাওহীদের উপর অটল ছিল। পরবর্তীতে তাদের মাঝে তাওহীদে মতবিরোধ সৃষ্টি হয় এবং কিছু মানুষ আল্লাহর সাথে অন্যদেরকেও উপাস্য, প্রয়োজন পূরণকারী এবং দুঃখ-কষ্ট মোচনকারী ভাবতে আরম্ভ করে।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* মুর্শিদাবাদ, ভারত।
তথ্যসূত্র :
[১]. তিরমিযী, হা/২১৬৫; ইবনু মাজাহ, হা/২৩৬৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১৪।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০১১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮৬।