শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬, ০৫:৩০ পূর্বাহ্ন

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায় 

- হাসিবুর রহমান বুখারী* 


ভূমিকা 

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি মূলত দাওয়াহ, তাযকিয়া, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের সামগ্রিক প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত। ইসলামী ইতিহাসে আমরা খিলাফাতে রাশিদার যুগে এর একটি আদর্শ রূপ দেখেছি। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নানা বাস্তব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। নিচে সংক্ষেপে তা তুলে ধরা হল। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো হল-

(১) তাওহীদ, আক্বীদাহ ও দ্বীনি চিন্তার দুর্বলতা

অবাক হতে হয়! যে জাতি একদা উন্নত শিক্ষা ও সংস্কৃতির পিপাসা মিটিয়েছে, তারা আজ কেন পিপাসার্ত! যে জাতি দুনিয়াকে সভ্যতা ও সামাজিকতার পাঠ পড়িয়েছে, আজ তারা কেন অসভ্য ও অসামাজিক অপবাদে অপবাদিত? যে মুসলিমদের কাছ থেকে মনুষ্যত্ববোধ, পারিবারিক ও সামাজিক সুশিক্ষা, উত্তম আদর্শ ও চরিত্রের পাঠ নেয়ার জন্য তৎকালীন ইউরোপ চাতক পাখির ন্যায় চেয়ে থাকত, আজ সেই মুসলিমরাই অবহেলার পাত্রে পরিণত হয়েছে! কারণ একটাই- আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের আদর্শ ও ইতিহাস ভুলে গিয়েছি। আমরা তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছি। তাই চলুন, আমরা একটু পিছিয়ে যায়, পিছিয়ে যায় আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে। ধারণ করি স্বর্ণ যুগের সেই অমূল্য আদর্শকে, পরিধান করি পরিপূর্ণ ঈমানের পোশাক, জাগিয়ে তুলি নববী যুগের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক বিপ্লব। ইনশাআল্লাহ, পুনরায় আমরা আমাদের হারানো ঐতিহ্য, মানসম্মান, গুরুত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি ফিরে পাব।

ঈমান ও আমলে শিরকের মিশ্রণ অত্যন্ত ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক। তা সত্ত্বেও মানব জাতি এর ভয়াবহতা সম্পর্কে উদাসীন। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ لَمۡ یَلۡبِسُوۡۤا اِیۡمَانَہُمۡ بِظُلۡمٍ  اُولٰٓئِکَ لَہُمُ الۡاَمۡنُ وَ ہُمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ

‘তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই সুপথগামী যারা ঈমান এনেছে এবং এরপর ঈমানকে যুল্মের (শিরকের) সাথে মিশ্রিত করেনি’ (সূরা আল-আন’আম : ৮২)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি স্বীয় ঈমানের সাথে কোন প্রকার শিরক মিশ্রিত করে তার কোন নিরাপত্তা নেই। এ আয়াত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, জনসাধারণের মধ্যে যারা কোন পীর, জ্বিন, ওয়ালী বা মাযার ইত্যাদিকে মনোবাঞ্ছা পূরণকারী বলে বিশ্বাস করে এবং তারা মনে করে যে, আল্লাহর ক্ষমতা যেন তাদেরকে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই মুশরিক। তারা আল্লাহর রুবূবিয়্যাতে শিরক করল। অনুরূপভাবে যারা ক্ববরবাসী, ওয়ালী, মাযার, জ্বিন ইত্যাদিকে আহ্বান করে, সাজদাহ্ করে, সাহায্য চায়, মানত করে, তাদের উদ্দেশ্যে যব্হ করে তারা সবাই মুশরিক। তাদের কারোর-ই নিরাপত্তা নেই। তারা আল্লাহর উলূহিয়্যাতে শিরক করল এবং তাওবাহ না করে মারা গেলে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে।

দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে মানুষ তাদের চিরশত্রু শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে যে-সব অপরাধে লিপ্ত হয় তন্মধ্যে মারাত্মক অপরাধ হচ্ছে শিরক। এর ফলে একজন মুসলিম তার অজান্তেই ইসলাম ও আল্লাহর নিরাপত্তা থেকে বেরিয়ে যায়। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে লক্ষ্য করে বলেছেন,

لَئِنۡ  اَشۡرَکۡتَ لَیَحۡبَطَنَّ عَمَلُکَ وَ  لَتَکُوۡنَنَّ  مِنَ  الۡخٰسِرِیۡنَ

‘আপনি যদি শিরক করেন, তা হলে আপনার আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অমত্মর্ভুক্ত হয়ে যাবেন’ (সূরা আয-যুমার : ৬৫)। রাসূল (ﷺ) থেকে কোন শিরক সংঘটিত না হওয়া সত্ত্বেও এবং তিনি আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয়ভাজন বান্দা হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে এভাবে অনেকটা ধমকের সুরে সম্বোধন করে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এ কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে- তাঁর উম্মাতদেরকে এ কথা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়া যে, এ অপরাধ যার দ্বারাই সংঘটিত হবে, আল্লাহ তা‘আলা সে ব্যক্তির যাবতীয় সৎকর্ম নিষ্ফল করে দেবেন এবং সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

এ আয়াত দ্বারা এ কথা সহজেই অনুমেয় যে, বিশুদ্ধ ঈমান তথা শিরকমুক্ত আক্বীদাহ ও বিশ্বাসই হচ্ছে আখিরাতে সৎকর্মের প্রতিদান প্রাপ্তির এবং দুনিয়াতে নিরাপত্তা প্রাপ্তির পূর্বশর্ত। সে জন্য কুরআনুল কারীমে শিরকমুক্ত বিশুদ্ধ ঈমানকে এমন একটি গাছের সাথে তুলনা করা হয়েছে যার শিকড় প্রোথিত রয়েছে মাটির অনেক গভীরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর কোন ক্ষতি করতে পারে না বলে সর্বদা যেমনি তা পত্র-পল্লব আর ফুলে-ফলে সুশোভিত থাকে, শিরকমুক্ত বিশুদ্ধ ঈমানের অধিকারীর ঈমানও তেমনি আখিরাতে আমলের পত্র-পল্লব ও ফুলে-ফলে সুশোভিত থাকবে। কোন মুশরিকের ক্ষেত্রে এমনটি হবে না। অতঃপর ঘোষিত হচ্ছে যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানের সাথে যুলুম অর্থাৎ শিরককে সংমিশ্রিত করেনি, শান্তি ও নিরাপত্তার অধিকারী তো তারাই এবং তারাই সঠিক পথে পরিচালিত। তারা ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করেছিল এবং সেই ইবাদতকে শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রেখেছিল। তাই দুনিয়া ও আখিরাত তাদের-ই অধিকারে রয়েছে।

দুনিয়ার অশান্তি ও পরকালের শাস্তির কবল থেকে নিরাপদ ও নিশ্চিত তারাই হতে পারে, যারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে, তারপর সে ঈমানের সাথে কোনরূপ যুলুমকে মিশ্রিত করেনি। ছহীহ হাদীছের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে, এ আয়াত নাযিল হলে ছাহাবায়ে কিরাম চমকে উঠেন এবং আরয করেন, হে আল্লাহ রাসূল (ﷺ)! আমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে পাপের মাধ্যমে নিজের উপর যুল্ম করেনি? এ আয়াতে শাস্তির কবল থেকে নিরাপদ হওয়ার জন্য ঈমানের সাথে যুল্মকে মিশ্রিত না করার শর্ত বর্ণিত হয়েছে। এমতাবস্থায় আমাদের মুক্তির উপায় কী? রাসূল (ﷺ) উত্তরে বললেন, তোমরা আয়াতের প্রকৃত অর্থ বুঝতে সক্ষম হওনি। আয়াতে ‘যুল্ম’ বলতে ‘শিরক’কে বুঝানো হয়েছে। দেখ, অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, اِنَّ الشِّرۡکَ لَظُلۡمٌ  عَظِیۡمٌ ‘নিশ্চিত শিরক সর্বাধিক বড় যুলম’।[১] কাজেই আয়াতের অর্থ এই যে, যে ব্যক্তি ঈমান আনে, অতঃপর আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী এবং তার ইবাদাতে কাউকে অংশীদার স্থির না করে, সে শাস্তির কবল থেকে নিরাপদ ও সুপথপ্রাপ্ত।

যারা সত্যিকার অর্থে ঈমান এনেছে এবং সেই ঈমানের ছদ্মবেশে কোন খারাপ কাজ করেনি, প্রকৃত শান্তি তাদের জন্যই রয়েছে। ঈমান আনা বলতে আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা, তাঁর শাস্তির ভয় করা, তাঁর উপর ভরসা করা, আল্লাহ যে বিধিবিধান দিয়েছেন তাই আমাদের জন্য সর্বোত্তম- এই কথাকে মনেপ্রাণে আঁকড়ে ধরে, এর গভীরতা উপলব্ধি করে, আল্লাহর জন্য আল্লাহর নাম নিয়ে শরী‘আতের পথে আসা এবং আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে সরে আসা বোঝায়। অথচ আজ আমাদের দেশের নেতারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মাযার থেকে দু’আ নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন! নির্বাচন শেষে বুজুর্গদের মাযারে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে দেশ পরিচালনা শুরু করেন এবং আরো গুটি কয়েক দিবসের সৃষ্টি করে। প্রশ্ন হল- এরূপ নেতাদের দ্বারা কি আদৌ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?

বরকত প্রাপ্তি, কল্যাণ কামনা ও দু’আ নেয়ার উদ্দেশ্যে মাযারে গমন করা বা কোন ক্ববরকে উদ্দেশ্য করে সফর করা জায়েয নয়, বরং সফর করা যায় তিনটি মসজিদের উদ্দেশ্যে। অতঃপর শ্রদ্ধা নিবেদন করা, পুষ্পস্তবক অর্পণ করা এগুলো হারাম ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।[২] সমগ্র উম্মাতের সর্বসম্মতিক্রমে ক্ববরের উপর মসজিদ ও ঘর-বাড়ি নির্মাণ করা, পাকা করা, তার উপর লেখা, ছালাত আদায় করা, দু‘আ চাওয়া, শ্রদ্ধা নিবেদন করা, পুষ্পস্তবক অর্পণ করা  প্রদীপ জ্বালানো হারাম। মনে রাখতে হবে, ক্ববরের উপরে নির্মিত মসজিদে ছালাত জায়েয হবে না, বরং এ জাতীয় নির্মাণ হারাম’।[৩] আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর যে রোগে মৃত্যু হয়েছিল, সে রোগাবস্থায় তিনি বলেছিলেন, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের নবীদের ক্ববরকে মসজিদে পরিণত করেছে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, সে আশঙ্কা না থাকলে তাঁর অর্থাৎ নবী (ﷺ)-এর ক্ববরকে উন্মুক্ত রাখা হত, কিন্তু আমি আশঙ্কা করি যে, (উন্মুক্ত রাখা হলে) একে মসজিদে পরিণত করা হবে।[৪] জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) ক্ববর পাকা করতে, ক্ববরের উপর বসতে এবং ক্ববরের উপর গৃহ নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন।[৫]

শিরকমুক্ত জীবন-যাপনে নিরাপত্তা ও দ্বীনকে আকড়ে ধরার প্রাপ্তি সচক্ষে দেখতে চাইলে একবার সঊদী আরবের দিকে দৃষ্টিপাত করা দরকার। এ আহ্বান শুনার পর, অনেকেই হয়তো সঊদী আরবের দালালী করার অপবাদ আরোপ করবে। তবুও নিন্দাকারীর নিন্দার ভয়কে উপেক্ষা করে সত্য কথা তুলে ধরা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমরা এ কথা বলছি না যে, সঊদী আরবের সব মানুষই ফেরেস্তা, তারা সবাই জান্নাতী। মানুষ হিসাবে প্রত্যেকের মধ্যেই দোষত্রুটি থাকা স্বাভাবিক, তাদের মধ্যেও আছে। তবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছ মানার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে তারা সবার চাইতে এগিয়ে আছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিংশ শতাব্দীতে পুরো বিশ্ব জুড়ে ইসলামফোবিয়ার ব্যাপক উত্থান হয়েছে। ইসলাম ধর্ম ব্যতীত বর্তমান বিশ্বে আরো যত ধর্ম আছে, প্রত্যেকের ধর্মবিশ্বাস, ধর্মচর্চা, আচার-আচরণ, রীতিনীতি, বিধি-বিধান ও নিয়মাবলী ভিন্ন ভিন্ন। তাদের আপোসে এত বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্ধেষ পোষণ করার ক্ষেত্রে কিন্তু বিশ্বের সকল বিধর্মীরা একত্রিত হয়ে যায়। সকল অমুসলিম ইসলাম ও মুসলিমদের বিরোধীতায় একজোট।

অনুরূপভাবে ইসলাম ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন দলের মধ্যেও কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য আছে। কুরআন ও সুন্নাহকে বুঝার ও মানার ক্ষেত্রে বেশকিছু বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু তাওহীদের দেশ সঊদী আরবের বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে সমস্ত দল একজোট হয়ে যায়। অর্থাৎ মোদ্দাকথা হল বিশ্বের সমস্ত বিধর্মীরা ইসলামের বিরুদ্ধে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করে। আর ইসলাম ধর্মের নামে তৈরিকৃত প্রায় সবকটি দেশ ও দলই সঊদী আরবের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করে। মিথ্যা খবর প্রচার করে সঊদী আরবকে বদনাম করার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে। আল্লাহ তা‘আলার কোটি কোটি শুকরিয়া যে, এত হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতার পরেও সঊদী আরব এখনো বাতিলের বিরুদ্ধে টিকে রয়েছে। কারণ একটাই সঊদী আরব তাওহীদের দেশ, তারা শিরকের বিরুদ্ধে অত্যধিক কঠোর এবং বিদ‘আতের বিরুদ্ধে সর্বদা সজাগ। তাদের প্রত্যেক ঘরে ঘরে কুরআনের চর্চা আছে। প্রত্যেক মসজিদে জামা‘আতের পর নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা হয়। শাইখ ছালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) সঊদী আরব সম্পর্কে বলেছেন, ‘এটি একটি বরকতময় রাষ্ট্র। সাউদ পরিবারের রাষ্ট্র বা কর্তৃত্বাধীন। তাওহীদ বা একেশ্বরবাদের রাষ্ট্র এবং এখানে বিশুদ্ধ ইসলামী আইন বাস্তবায়িত হয়, ভালোর আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা হয়। এই রাষ্ট্র দু’টি মহৎ পবিত্র মসজিদের সেবা প্রদান করে (অর্থাৎ তাদের যত্ন নেয়), যারা হজ্জ ও উমরাহ পালন করে এবং যারা আল্লাহর তাওফীক্বে তাদের কাছে মেহমান স্বরূপ আসেন তাদের নিরাপত্তার প্রতি ও উচ্চ মর্যাদার প্রতি সম্যক খেয়াল রাখা হয়। এটি সঊদী আরব সহ অন্যান্য ইসলামিক বিশ্বে ইসলামী দাওয়াত প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করে। এটি সর্বত্র দরিদ্র ও দুস্থ মুসলিমদের সাহায্য করার জন্য উদারভাবে ব্যয় করে এবং মুসলিমদের সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতপক্ষে, এই রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রকৃত ইসলামী আইনের আনুগত্যের শপথের উপর, ঐক্য রক্ষা করা, অপরাধী এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী শাস্তি কার্যকর করার জন্য, যা ধর্ম, সম্মান, সম্পদ, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে। ঐক্য ছাড়া নিরাপত্তা আসতে পারে না এবং ইসলামী শাসক ছাড়া কোন ঐক্য হতে পারে না’।

শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি যা বলছি তা আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি- প্রকৃতপক্ষে, আমি বর্তমান পৃথিবীতে এমন কোন দেশকে জানি না, যেখানে আল্লাহর আইন প্রয়োগ করা হয়, যেভাবে এই পবিত্র ভূমিতে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। আমি বলতে চাচ্ছি সঊদী আরবের আরব সাম্রাজ্যের কথা। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা আমাদের উপর আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ, যে আমরা এই দেশের অধিবাসী। তাই আসুন আমরা আজ যে অবস্থায় আছি তা সংরক্ষণ করি, বরং আসুন আমরা আজকে যা করছি তার চেয়ে বেশী আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করি। আমি পরিপূর্ণতার দাবি করছি না, তবে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরাই শীর্ষে আছি। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আমাদের অনেক কিছুই বর্জিত, তবে আমরা আরও ভাল করতে পারি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, কারণ আমরা অন্যান্য দেশ সম্পর্কে যা জানি তার তুলনায় আমরা অনেকটাই এগিয়ে। আমরা দরিদ্রদের পাশে থাকি, ভীতিগ্রস্থ মানুষদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করি, অজ্ঞদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করি এবং এই ইসলামী রাষ্ট্রে সকলেই সম্মানের সহিত বসবাস করি। বিশুদ্ধ ইসলাম ধর্মকে আঁকড়ে ধরার কারণে আজ আমরা অনেকেরই চক্ষুশূল। বিদ্বেষপূর্ণ লোকদের অন্তরে আমাদের প্রতি ক্রোধ জেগে ওঠে। তারা চায় আমরা যে অবস্থায় আছি তার অস্তিত্ব বন্ধ হয়ে যাক...! [৬]

শাইখ আহমাদ ইবনু উমার ইবনু সালিম বাযমূল (রাহিমাহুল্লাহ) ও শাইখ ছালিহ আল-লুহাইদান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘এই দেশ ইসলামের প্রাণকেন্দ্র এবং পবিত্র স্থান। এটি শান্তি ও নিরাপত্তার অনেক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যার মিল বিশ্বে খুঁজে পাওয়া যায় না। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বর্তমান বিশ্বের সরকারগুলোর মধ্যে এটিই সেরা। এর অর্থ এই নয় যে, এটি নিখুঁত, এ কথা কেউ বলে না যে এটি নিখুঁত, বরং এর মধ্যেও ভুল রয়েছে, তবে তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সে কারণে, দেশের মধ্যে ও বাহিরে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয, সে যেন দৃঢ়তার সহিত সত্যের উপর অটল থাকে এবং নির্যাতিতদের সাহায্য করে। তাওহীদের বিশুদ্ধ আক্বীদাহ গ্রহণ করে এবং নির্ধারিত ইসলামী আইন প্রণয়ন করে।[৭]

শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আল্লাহ্ তা‘আলা বাদশাহ আব্দুল আযীযের জন্মের মাধ্যমে  মুসলিমদের সীমাহীন উপকার করেছেন। তিনি ঐক্য এনেছেন, সত্যকে উত্থাপন করেছেন, তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর পথে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। যার ফলে প্রচুর জ্ঞান, প্রচুর বরকত, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, সত্যকে সাহায্য করা, সত্যের প্রচার করা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আল্লাহর দিকে ডাকা অর্থাৎ তাওহীদ, সুন্নাহ ও সালাফদের পথে আহ্বান জানিয়েছেন। অতঃপর তাঁর পরে তাঁর সন্তানরাও এই পথেই হাঁটতে থাকে। তাঁরাও সত্য প্রতিষ্ঠায়, ন্যায়বিচারের প্রচারে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এই সঊদী রাষ্ট্র একটি বরকতময় রাষ্ট্র। আল্লাহ সত্য ধর্মকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর মাধ্যমে ঐক্য এনেছেন এবং দুর্নীতির পথ বন্ধ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মাধ্যমে যমীনে নিরাপত্তা আনয়ন করেন এবং সেখানে মহান নে‘মত সংঘটিত হয়, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গণনা করতে পারে না’।[৮]

বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আরব উপদ্বীপে এবং সমস্ত মুসলিম ভূখণ্ডে নিরাপত্তা ও বরকত রক্ষা করেন এবং তিনি তাওহীদের রাষ্ট্র অর্থাৎ সঊদী আরবের সাম্রাজ্যকে সংরক্ষণ করেন’।[৯]

সঊদী বাদশাহ সাউদ ইবনু আব্দিল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘সর্বপ্রথম আমাদের যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত তা হল- আমরা সকলেই আল্লাহর রজ্জু অর্থাৎ কিতাব ও সুন্নাহকে দৃঢ়তার সহিত আঁকড়ে ধরি এবং আমরা আমাদের দেশের মধ্যে সেই উপায়গুলোকে কাজে লাগাই, যা সমাজের সমস্ত ব্যক্তির হৃদয়ে বিশুদ্ধ তাওহীদের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং যাতে সবাই আন্তরিকভাবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে’।[১০]

তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতের চেতনা দুর্বল হলে ব্যক্তি ও সমাজ ইসলামী আদর্শে দৃঢ় থাকতে পারে না। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হল- আক্বীদা ও চিন্তার দুর্বলতাÑ এ বক্তব্যটি মূলত ‘তাছফিয়্যাহ ও তারবিয়্যাহ’ নীতির সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা খুবই জোর দিয়ে তুলে ধরেছিলেন শাইখ আল্লামা মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)। নিম্নে আলোচনাটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হল-

প্রশ্নকারী : ‘সম্মানিত শাইখ! এ ধরনের বিশৃঙ্খলা ও বিচ্যুতি মূলক আহ্বানের মূল কারণ হল- মানহাজের অস্পষ্টতা। বিশেষ করে প্রত্যেক মুসলিমই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা রাখে, কিন্তু এই মহান লক্ষ্য অর্জনের পথ অনেকের কাছেই অজ্ঞাত ও অস্পষ্ট রয়ে গেছে। তাই মহোদয় যদি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঠিক পদ্ধতি এবং এ বিষয়ে যে সকল ধারণা মানুষের মনে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত, সেগুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরলে উপকৃত হতাম’। এর উত্তরে শাইখ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি মনে করি, এর উত্তর আগেই দেয়া হয়েছে- আল্লাহ্ আপনাকে বরকত দিনÑ যখন আমরা বলেছি, অবশ্যই ‘তাছফিয়্যাহ ও তারবিয়্যাহ’ (আত্মপরিশুদ্ধি ও শিক্ষাদান) অপরিহার্য। ‘তাছফিয়্যাহ’র জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন ইসলামী দেশের পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ আলিমদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এরপরÑ বরং এর সাথে সাথেই- প্রয়োজন মুসলিমদেরকে সেই পরিশুদ্ধ ইসলামের উপর আমল করার জন্য তারবিয়্যাহ অর্থাৎ সঠিক শিক্ষায় গড়ে তোলা। শুরুর বিন্দু এখান থেকেই। আমি একটু আগেই এ অর্থ উল্লেখ করেছি এবং আমরা গত বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বারবার ও পুনঃপুন এ কথাই বলে আসছি। এটাই আমাদের দাওয়াত অবশ্যই তাছফিয়্যাহ ও তারবিয়্যাহ। অন্য দলগুলোর কাছে না আছে তাছফিয়্যাহ, না আছে তারবিয়্যাহÑ বরং তারা এমন এক ইসলামের উপর রয়েছে যার কোন স্বতন্ত্র সত্তা নেই, প্রত্যেকে তার নিজস্ব মানহাজ বা পূর্বপুরুষদের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে যা পেয়েছে তার উপরই নির্ভর করছে। মুসলিমদের পুনর্জাগরণ ও প্রতিষ্ঠা এই দুই ভিত্তি ছাড়া কখনো সম্ভব নয়, এ দুই ভিত্তির সঠিকতা নিয়ে কোন মুসলিমই বিতর্ক করতে পারে না। আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আমার এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। এখন সময় অনুকূল নয় যে, এ উপলক্ষে আমরা পূর্বের বহু বক্তৃতা আবার পুনরাবৃত্তি করি। উদাহরণস্বরূপ : ‘তাছফিয়্যাহ ও তারবিয়্যাহ’-এর গুরুত্ব প্রমাণে আমরা রাসূল (ﷺ)-এর দু’টি হাদীছ বর্ণনা করিÑ যথা:

প্রথম হাদীছ : আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘যখন তোমরা ‘ঈনাহ’[১১] পদ্ধতিতে ব্যবসা করবে, গরুর লেজ আঁকড়ে ধরবে (অর্থাৎ কৃষিকাজ ও দুনিয়াবী কাজে অতিমাত্রায় নিমগ্ন হবে), কৃষিকাজেই সন্তুষ্ট থাকবে এবং জিহাদ ছেড়ে দিবে তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা ও অপমান চাপিয়ে দিবেন। তোমরা তোমাদের দ্বীনে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহ তোমাদেরকে এই অপমান থেকে মুক্তি দিবেন না।[১২] আমি বলতাম, এই হাদীছে রাসূল (ﷺ) স্পষ্ট করেছেন যে, মুসলিমরা যখন এমন-এমন কাজ করবেÑ তিনি কয়েকটি হারাম কাজের উদাহরণ উল্লেখ করেছেনÑ তখন আল্লাহ তাদের উপর অপমান চাপিয়ে দেবেন, যা তিনি তাদের থেকে দূর করবেন না, যতক্ষণ না তারা তাদের দ্বীনের দিকে ফিরে আসে। এখানে তিনি রোগ এবং তার প্রতিকারÑ উভয়ই উল্লেখ করেছেন। আমাদের জন্য এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল. প্রতিকারটি, আর তা হল দ্বীনের দিকে প্রত্যাবর্তন। আর আপনারা ভালো করেই জানেন, আজ দ্বীন সম্পর্কে নানা ধারণা বিদ্যমান- শুধু শারঈ বিধানেই নয়, বরং আক্বীদার ক্ষেত্রেও, এমনকি আক্বীদার মূল ভিত্তি অর্থাৎ তাওহীদের ক্ষেত্রেও।

এখনও লক্ষ লক্ষ মুসলিম আমাদের সঙ্গে বসবাস করে, আমাদের সঙ্গে ছালাত আদায় করে, ছিয়াম পালন করে, হজ্জ পালন করেÑ কিন্তু তারা মনে করে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ হল ‘আল্লাহ ছাড়া কোন প্রকৃত মা’বূদ নেই’। তারা তাওহীদুল ইবাদাহ বা তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ বোঝে না, তাওহীদুল আসমা ওয়াছ ছিফাত তো অনেক দূরের কথা।  সুতরাং দ্বীনের দিকে প্রত্যাবর্তন বলতে সেই অর্থই বোঝায়, যে অর্থে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী (ﷺ)-এর উপর নাযিল করেছিলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নে‘মত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসাবে পসন্দ করলাম’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৩)। আর কতই না সুন্দর বর্ণনা এসেছে ছহীহ বুখারী-তে যে, এক ইয়াহুদী আলিম আমীরুল মুমিনীন উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে এসে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন অথবা বলল, হে উমার! আল্লাহর কিতাবে একটি আয়াত আছে, তা যদি আমাদের অর্থাৎ ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের উপর অবতীর্ণ হত, তবে আমরা তার অবতরণের দিনটিকে ঈদের দিন হিসাবে গ্রহণ করতাম। তিনি বললেন, কোন্ আয়াত? সে এই আয়াতটি উল্লেখ করল। তখন উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, এটি তো ঈদের দিনেই এবং আরাফার ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছেÑ অর্থাৎ জুমু’আর দিনে। এই ইয়াহুদী আলিম এর মাধ্যমে ইসলামের মহিমা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহ মুসলিমদের উপর অনুগ্রহ করেছেন এবং এই দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে তাঁদের উপর নে‘মত সম্পূর্ণ করেছেন। এ কারণেই ‘ইমামু দারিল হিজরাহ’ ইমাম মালিক ইবনু আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামে এমন কোন বিদ‘আত প্রবর্তন করে, যাকে সে ভালো মনে করে- সে যেন এই দাবি করল যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) রিসালাতের খিয়ানত করেছেন’। নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক!

অতঃপর তিনি আল্লাহ তা‘আলার বাণী পাঠ করতে বলেন এবং এই আয়াতটি উল্লেখ করেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৩)। এ আয়াত উল্লেখ করার পর তিনি বলেন, ‘এই উম্মতের পরবর্তীরা কেবল সেই মাধ্যমেই সংশোধিত হবে, যে মাধ্যমে এদের পূর্বসূরীরা সংশোধিত হয়েছিল। সুতরাং, যা সে সময় দ্বীন ছিল নাÑ তা আজও দ্বীন হতে পারে না’। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। যা তখন দ্বীন ছিল না, তা আজ দ্বীন হয়ে গেছে! যা আক্বীদা ছিল না, তা আজ আক্বীদা হয়ে গেছে! যা শারঈ বিধান ছিল না, তা আজ বিধান হয়ে গেছে! যা আচরণ ও নৈতিকতা ছিল না, তা আজ আচরণ ও নৈতিকতা হয়ে গেছে! এ সবই ইঙ্গিত করে যে, দ্বীনের মধ্যে যা কিছু প্রবেশ করেছে- যার বিস্তারিত আপনারা জানেনÑ সেগুলো থেকে এই দ্বীনকে অবশ্যই পরিশুদ্ধ (তাছফিয়্যাহ) করতে হবে।

আর এই তাছফিয়্যাহ তখনই সম্ভব, যখন হাজার হাজার বিশেষজ্ঞ মুসলিম আলিম একত্রিত হবেনÑ যাদের প্রত্যেকেই তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষ: কেউ তাফসীরে, কেউ হাদীছে, কেউ ফিক্বহে, কেউ ভাষাবিদ্যায়- ইত্যাদি। কারণ এ সবই ফারযে কিফায়ার অন্তর্ভুক্ত। যদি কিছু লোক তা আদায় করে, তবে অন্যদের থেকে দায়িত্ব উঠে যায়। তাহলে কি আজ এমন কোন জামা’আত (দল) আছে, যাদের সম্পর্কে আমরা অনুভব করতে পারি যে, মুসলিম আলিমরা এই ফারযে কিফায়ার দায়িত্ব আদায় করছেন? আমি মনে করি, ‘এ ক্ষেত্রে বিরাট ঘাটতি রয়েছেÑ অত্যন্ত বড় ঘাটতি’। আমরা ‘তাছফিয়্যাহ’ বলতে এ কথাই বুঝাই। কারণ রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘যখন তোমরা এমন-এমন কাজ করবে, তখন প্রতিকার হল- দ্বীনের দিকে ফিরে আসা’। কিন্তু কোন দ্বীন? নিঃসন্দেহে সেই দ্বীন, যা কুরআনুল কারীমে উল্লেখিত হয়েছে। অতএব, আমাদের অবশ্যই মুসলিমদেরকে দ্বীনের সেই ধারণার দিকে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হতে হবে, দ্বীনের যে ধারণা ছিল ছাহাবায়ে কিরাম, তাবিঈন এবং তাঁদের অনুসারীদের যুগে। এই হাদীছ ইঙ্গিত করে যে, দ্বীনের মধ্যে যা কিছু অচেনা ও বহিরাগত বিষয় প্রবেশ করেছে, সেগুলো থেকে দ্বীনকে অবশ্যই পরিশুদ্ধ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হল- আজ অধিকাংশ মুসলিম আলিম তাদের কুকীর্তিগুলোকে ‘বিদ’আতে হাসানাহ’ (ভালো বিদ’আত) বলে থাকেন। তাঁরা অনেক হাদীছকে তার প্রকৃত ব্যাখ্যা ছাড়া ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং ভিন্নভাবে তা’বীল (ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ) করেন।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)


* মুর্শিদাবাদ, ভারত।

তথ্যসূত্র :
[১]. সূরা লুক্বমান : ১৩; ছহীহ বুখারী, হা/৪৬২৯, ৬৯১৮।
[২]. মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ,  ২৭/১৮৭-৮৯; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১/৪২৯ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৩৪৪৬৪।
[৩]. ইক্বতিযাঊছ ছিরাত্বিল মুস্তাক্বীম, ২/২৬৭; মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ২৪/৩১৮, ২৭/৪৪৮ ও ৩১/১১; আল-মুহাল্লা, ৩/৩৪৭; তাফসীরে কুরতুবী, ১০/৩৮১; ইগাছাতুল লাহফান, ১/৩৬২; ই‘লামুল মুওয়াক্বক্বিঈন, ৩/১৬৮; নাইলুল আওত্বার, ৪/১০৪; আযওয়াউল বায়ান, ২/৩০২; মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৩/২২১; মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে উছাইমীন, ১৭/২১২; তালখীছু আহকামিল জানায়িয, পৃ. ৮৪।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৩০, ১৩৯০, ৩৪৫৩, ৪৪৪৩, ৫৮১৫, ৪৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৫২৯, ৫৩০-৫৩১।
[৫]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭০, ২১৩৫-৩১৩৭; আবূ দাঊদ, হা/৩২২৫; তিরমিযী, হা/১০৫২; নাসাঈ, হা/২০২৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪১৪৯, ১৪১৪৯, ১৪৬৪৭।
[৬]. শাইখ আহমদ বাযমূল, দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃ. ১১।
[৭]. দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃ. ১৪।
[৮]. দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃ. ৯-১০।
[৯]. দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃ. ১২।
[১০]. দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃ. ৪১।
[১১]. ‘ঈনাহ’ হল- প্রকত মূল্যের চেয়ে ধারে অধিক মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করা। যেমন কেউ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দশ টাকায় কিছু বিক্রি করল এবং ঐ সময় শেষ হওয়ার পর তা আট টাকায় কিনে নিল।
[১২]. আবূ দাঊদ, হা/৩৪৬২; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১১।




প্রসঙ্গসমূহ »: রাজনীতি
কুরআন মাজীদের উপর বিদ‘আতের আবরণ - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ইত্তিবাউস সুন্নাহর প্রকৃতি ও স্বরূপ - হাসিবুর রহমান বুখারী
ইসলামে রোগ ও আরোগ্য (৪র্থ কিস্তি) - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
সালাফী মানহাজের মূলনীতিসমূহ (শেষ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামে পর্দার বিধান - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
আল-কুরআনে মানুষ: মর্যাদা ও স্বরূপ বিশ্লেষণ - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
ঐক্যের মর্যাদা ও মানদণ্ড - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
মু‘তাযিলা মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কারে আলিমগণের গৃহীত মূলনীতিসমূহ: একটি পর্যালোচনা (৩য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
বিদ‘আত পরিচিতি (৮ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব - হাসিবুর রহমান বুখারী
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (১৮তম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ