রবিবার, ০৭ Jun ২০২৬, ১১:১৫ অপরাহ্ন

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায় 

-হাসিবুর রহমান বুখারী* 


(৪র্থ কিস্তি) 

(৫) নৈতিক অবক্ষয়

ইসলামের দৃষ্টিতে নৈতিক অবক্ষয় একটি ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়। এটি শুধু ব্যক্তি নয়, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রÑ সবকিছুকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ইসলামী রাষ্ট্র কেবল রাজনৈতিক কাঠামোর নাম নয়, এটি মূলত নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও তাক্বওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত একটি সমাজব্যবস্থা। তাই যদি মানুষের চরিত্র ও সমাজের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়, তাহলে শুধু রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলালেই প্রকৃত পরিবর্তন আসে না। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাসনামলে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার উদাহরণ আজও স্মরণীয়Ñ কারণ তিনি আগে মানুষ ও সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে শক্ত করেছিলেন। নৈতিক অবক্ষয় থাকলে আইন প্রয়োগ হয় পক্ষপাতদুষ্টভাবে, বিচারব্যবস্থা হয় দুর্বল, নেতৃত্ব হয় দুর্নীতিগ্রস্ত, নষ্ট হয় জনগণের আস্থা। তাই প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় ব্যক্তি থেকে পরিবার, সমাজ তারপর রাষ্ট্র।

ধর্মবোধের প্রকৃত ভিত্তিই হল নৈতিকতা। এ জন্য ইসলামে নৈতিকতার গুরুত্ব ও প্রাধান্য সবচেয়ে বেশী। নৈতিকতা কোন ব্যক্তির মধ্যে এমন আচরণ, যা অপরের প্রতি ক্ষমা ও মার্জনা, উদারতা ও দানশীলতা, ধৈর্য, বিনয় ও নম্রতা ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত হওয়াকে বুঝায়। এক কথায় পূণ্যাবলী সঠিক বিকাশ ও উৎকর্ষতা সাধনই নৈতিকতা। আর এটিই সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার রক্ষাকবচ। যে সমাজের মানুষের মাঝে নৈতিকতাবোধ যতটা বেশী হবে সে সমাজের মানুষ ততটাই শান্তি ও নিরাপত্তা উপভোগ করবে। সমাজ জীবনে বসবাসরত প্রত্যেক মানুষের মাঝে দেখা দেয় প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি আর স্নেহমমতা। এ সবের উন্মেষ ঘটে তখনই যখন মানুষের মাঝে নৈতিকতাবোধ থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ আমাদের মাঝে নৈতিকতা লোপ পেয়েছে। বিলুপ্ত হয়েছে ন্যায়পরয়ণতার সিংহদ্বার। আর নৈতিকতা বর্জিত সমাজে দেখা দেয় ব্যক্তিগত, দলগত বা জাতীয় জীবনে সংঘাত, হিংসা-বিদ্বেষ, হানা-হানি, গীবত ও পরশ্রীকাতরতা। সৃষ্টি হয় একে অপরকে পর্যুদস্ত করার বাসনা। ফলে সৃষ্টি হয় নৈতিকতার অবক্ষয়।

নৈতিক অবক্ষয়ের মৌলিক কারণ হল- দ্বীনি শিক্ষার অভাব: ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। সকল কালের সকল মানবের জন্য যুগোপযোগী একটি জীবন বিধান। কর্মহীন শিক্ষা যেমন অবাস্তব, ধর্মহীন শিক্ষাও তেমনই ফলদায়ক নয়। কেবল ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির পথনির্দেশনা রয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষাকে সংকোচন করে কখনো নৈতিক শিক্ষা আশা করা যায় না। সঠিক সময়ে সমাজের সকলকে ধর্মীয় শিক্ষা না দেয়া গেলে তাদের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি এবং নৈতিকতা ও নীতিবোধ জাগ্রত হতে পারে না। তাই ধর্মীয় শিক্ষার অভাবকে নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ বলা হয়।

ইসলাম ধর্মের নিক্তিতে নৈতিক শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। আদতে ইসলাম ধর্মের প্রত্যেক পরতে পরতে নৈতিক শিক্ষার আহ্বান রয়েছে। জীবন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র- সর্বক্ষেত্রে ইসলাম নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। সাধারণত নৈতিক শিক্ষা বলতে বুঝায় উত্তম আদর্শ, সততা, হিতাহিত জ্ঞান, সমাজের কল্যাণকর বিধান, ন্যায়-অন্যায়, কর্তব্য-অকর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা, আচার-আচরণ ও নীতিবিষয়ক যে শিক্ষা, তাকেই নৈতিক শিক্ষা বলে। আর মূল্যবোধ বলতে বুঝায় সামাজিক ন্যায়নীতি, শুভময়, কল্যাণকর প্রভৃতি বিষয়ে মানবিক চেতনা ও ঔচিত্যবোধ। সাধারণত ইসলাম ধর্মের শিক্ষাগুলোই নৈতিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।

নৈতিকতার সঙ্গে মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিদিনের কথা, ব্যবহার, মুচকি হাসি, একটুখানি সহায়তা, একটু স্নেহের বাক্য, অসহায়ের প্রতি একটুখানি দয়া প্রদর্শন, নম্রতা প্রকাশ, সৌজন্যতা প্রকাশ ইত্যাদির মাধ্যমেই মানুষের নৈতিক শিক্ষা বিকশিত হয়। আলহামদুলিল্লাহ্ এই বৈশিষ্ট্যসমূহের কোন একটি ইসলাম বহির্ভূত নয়। বরং প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্য জীবনে বাস্তবায়ন করার জন্য ইসলাম সীমাহীন গুরুত্বারোপ করেছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, একজন আদর্শ মুসলিম কখনোই অনৈতিক হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের আগমন-ই হয়েছে মানুষকে উত্তম আদর্শ, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়ার জন্য।

রাসূল (ﷺ)-এর আগমনের পূর্বে মক্কা তথা সমস্ত আরব ছিল- ‘দুষ্কর্ম, অপরাধ ও পাপে জর্জরিত’। অধিকাংশ আরববাসী- জুয়া, মদ্যপান, যিনা, ব্যভিচার, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, হিংসা-বিদ্বেষ, মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি, হত্যা এবং প্রতিহিংসা পরায়ণতার মত জঘন্য, অমানবিক ও ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপে যুক্ত ছিল। এ সমস্ত অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য এবং সমাজে পরিবর্তনের বিপ্লব সৃষ্টি করার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ও উন্নতমানের হাতিয়ারের। এরূপ ডুবন্ত ও কদর্য সমাজকে সংস্কার, সংশোধন এবং রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন ছিল বাহুবল, জনসমর্থন এবং একটি সক্রিয় সংগঠনের। কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলা এসবের মোকাবেলা করার জন্য সবকিছুর সমতুল্য একটি হাতিয়ার প্রদান করলেন, যার নাম হল ‘শিক্ষা’। যার মাধ্যমে নবী (ﷺ) অতি অল্প সময়ে মধ্যে সমাজ সংশোধনের একটি বিশাল বড় আন্দোলন তৈরি করেছিলেন। ২১শে রমাযান সোমবার ক্বদরের রাত্রিতে ফেরেশতা জিবরীলের আগমন হল। হীরা গুহার মধ্যে ধ্যানমগ্ন মুহাম্মাদকে বললেন, إِقْرَأْ ‘পড়’। তিনি বললেন, مَا أَنَا بِقَارِئٍ ‘আমি পড়তে জানি না’। অতঃপর তাকে বুকে চেপে ধরলেন ও বললেন, পড়। কিন্তু একই জবাব, ‘পড়তে জানি না’। এভাবে তৃতীয়বারের চাপ শেষে তিনি পড়তে শুরু করলেন,

اِقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الَّذِیۡ خَلَقَ -خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ عَلَقٍ ۚ-اِقۡرَاۡ وَ رَبُّکَ الۡاَکۡرَمُ - الَّذِیۡ عَلَّمَ بِالۡقَلَمِ -عَلَّمَ الۡاِنۡسَانَ مَا لَمۡ  یَعۡلَمۡ

‘পড়’ তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’। ‘সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে’। ‘পড় এবং তোমার প্রভু বড়ই দয়ালু’। ‘যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দান করেছেন’ এবং ‘তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না’ (সুরা আল-আলাক্ব : ১-৫)।

সুতরাং বুঝা গেল যে, ইসলাম আগমনের সঙ্গে সুশিক্ষার সম্পর্ক খুবই পুরাতন ও সুগভীর। ইসলামী সমাজ তথা মুসলিমদের সঙ্গে সুশিক্ষার সম্পর্ক যতদিন গভীর ছিল, ততদিন তারা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত জাতি, সেই সময় তাদের মর্যাদা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নতি দেখে ইউরোপীয়রা ঈর্ষা করত এবং ততদিন সমাজে শান্তির বাতাবরণ প্রতিষ্ঠিত ছিল। যখনই মুসলিমদের সঙ্গে সুশিক্ষার সম্পর্ক শিথিল হতে শুরু করেছে, তখনই তারা নিম্নগামিতার দিকে ধাবিত হতে শুরু করেছে। আমাদের দেশে পুঁথিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার বাড়লেও প্রসার হচ্ছে না সুশিক্ষার। সুশিক্ষা হল সেই শিক্ষা যে শিক্ষা মানুষকে মিথ্যা, অন্যায় ও অসৎ পথ পরিহার করতে শেখায়।

দেশে আশানুরূপভাবে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ বৃদ্ধির সঙ্গে শিক্ষাসাফল্যের সামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে না। একদিকে বাড়ছে শিক্ষার হার ও শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা, অন্যদিকে সমাজে বাড়ছে মূল্যবোধের অবক্ষয়, হচ্ছে নৈতিকতার অধঃপতন। বাড়ছে অশ্লীলতা, নারী নির্যাতন, দুর্নীতি ও নানা রকমের অপরাধপ্রবণতা। এসব অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে যেমন সাধারণ অশিক্ষিত মানুষ যুক্ত আছেন, তেমনি শিক্ষিত মানুষও। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে অনৈতিক, অমানবিক ও অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে শিক্ষিত মানুষের সংশ্লিষ্টতাই বেশি দেখা যাচ্ছে। বলতে গেলে, শিক্ষিত মানুষের সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ ঠেকেছে তলানিতে। অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোতে তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা। সবকিছুর মূলেই রয়েছে আল্লাহভীরুতা, ধর্মীয় শিক্ষা বা নৈতিক শিক্ষার অভাব। একটি সমাজের দুরন্ত বিকাশের জন্য প্রয়োজন আদর্শ ও মনুষ্যত্ব বোধসম্পন্ন মানুষ। আর একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত হওয়ারও পূর্বশর্ত হল নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানবসম্পদ। দেশে শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি হলেও নৈতিক, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষ প্রত্যাশা মত তৈরি হচ্ছে না বললেই চলে। আর সে কারণেই পিতা-পুত্র, পুত্র-মাতা কিংবা কন্যা-পিতা পরস্পরকে খুন করছে-এমন খবরও আমাদের পড়তে হয়।

চলমান এ অবক্ষয় থামাতে হলে সবার আগে প্রয়োজন আল্লাহভীরুতা, নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের চর্চা। যে ব্যক্তির মধ্যে তাক্বওয়া থাকে, নৈতিক শিক্ষা থাকে, মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে- ছোট অপরাধেও তার বিবেক নাড়া দেয়। অনন্য মানবিক গুণাবলীর সমষ্টি হচ্ছে নৈতিকতা বা নীতিবোধ। ধর্মকে ভিত্তি করে মানুষ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় যে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি মেনে চলে। এই নিয়মগুলো মেনে চলার প্রবণতা, মানসিকতা, নীতির চর্চাই হল নৈতিকতা।

প্রাথমিকভাবে শিশুদের নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা শুরু হয় তার পরিবার থেকেই। অনৈতিক ও মূলবোধ গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকা, সত্য বলা, কর্তব্যবোধ ও শৃঙ্খলা, সৎকাজ করা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন, আত্মত্যাগের মনোভাব, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা এবং সমাজ তথা রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ বা পরিবেশদূষণ ইত্যাদি বিষয়ে একজন শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় তার পরিবার থেকেই। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের অধিকাংশ পরিবারেই এখন আর এসব সুনীতির চর্চা হয় না। বিশ্বায়নের এ যুগে ভোগবাদী জীবনদর্শনে প্রভাবিত অভিভাবকদের একটি বড় অংশই তাদের সন্তানদের আলোকিত মানুষ হওয়ার পরিবর্তে এমনভাবে গড়ে তুলতে চান-যেন সে লেখাপড়া করে ভালো উপার্জনক্ষম হয়, সচ্ছল জীবনযাপন করতে পারে। এ কাজে সন্তানদের উপযুক্ত করার জন্য অনেক সময় অভিভাবকরাই জড়িয়ে পড়েন অনৈতিক কাজে। পকেট ভর্তি ঘুস নিয়ে বাড়ি ফিরে সন্তানের পড়াশোনার খরচের জোগান দেন। এমন অভিভাবকের কাছ থেকে কি সন্তানরা আদৌ কোন নৈতিকতা ও ন্যায়পরায়ণতার শিক্ষা অর্জন করবে?

সুতরাং আমাদের প্রত্যেকেরই আল্লাহভীরুতা, ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার চর্চা করা উচিত। আল্লাহভীরুতা ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব হলে সমাজে অশান্তি দেখা দেয়। সামাজিক অসাম্য, অবিচার, সীমাহীন দুর্নীতি, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সমাজজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে, যার ফলে মানবকল্যাণ ব্যাহত হয়। যুদ্ধগ্রহ, হত্যা, লুন্ঠন ও সন্ত্রাস বেড়ে যায়। নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অভাব আছে বলেই বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অশান্তি ও নৈরাজ্য বিরাজ করছে। এমতাবস্থায় প্রত্যেকের উচিত নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা করা।  ইসলাম ধর্মের আলোকে এমন প্রত্যেক শিক্ষা যা মানুষের জন্য কল্যাণকর ও উপকারী তা গ্রহণ করা নিশ্চিতরূপে বৈধ। যতক্ষণ না তা কোন দলীল দ্বারা হারাম প্রমাণিত হয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘তিনি পৃথিবীর সব কিছুই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৯)। রাসুল (ﷺ) বলেছেন, احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ ‘যা তোমার জন্য কল্যাণকর তা অর্জনে তুমি আগ্রহী হও’।[১] এক্ষণে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে নৈতিক অবক্ষয়ের ভয়াবহতা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল-

(১) নৈতিকতা ইসলামের মূল ভিত্তি। মহান আল্লাহ বলেন,

اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُ بِالۡعَدۡلِ وَ الۡاِحۡسَانِ وَ اِیۡتَآیِٔ ذِی الۡقُرۡبٰی وَ یَنۡہٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ  وَ الۡمُنۡکَرِ وَ الۡبَغۡیِ ۚ یَعِظُکُمۡ   لَعَلَّکُمۡ   تَذَکَّرُوۡنَ

‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা আদল (ন্যায়পরায়ণতা), ইহসান (সদাচরণ) ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন, তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর’ (সূরা আন-নাহল : ৯০)। এ আয়াত প্রমাণ করে ইসলাম মূলত ন্যায়, সততা ও উত্তম চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত। ‘আদল’ এর প্রসিদ্ধ অর্থ ন্যায়পরায়ণতা (সুবিচার)। অর্থাৎ, ঘর-পর সকলের ব্যাপারে সুবিচার করা। কারো সাথে শত্রুতা, ঝগড়া, ভালোবাসা বা আত্মীয়তার কারণে সুবিচার যেন প্রভাবিত না হয়। এর দ্বিতীয় অর্থ মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা এবং কোন ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করা, এমন কি দ্বীনের ব্যাপারেও। কেননা, দ্বীনের মধ্যে সীমা অতিক্রম বা অতিরঞ্জন করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। পক্ষান্তরে এর বিপরীতে দ্বীনের মধ্যে অলসতা করাও অপসন্দনীয়। ‘ইহসান’ এর একটি অর্থ সদাচরণ, ক্ষমা ও মাফ করা। দ্বিতীয় অর্থ অনুগ্রহ করা, ওয়াজিব (প্রাপ্য) অধিকারের চেয়ে বেশি দেয়া বা ওয়াজিব (কর্তব্য) কাজের অধিক করা। যেমন কোন শ্রমিকের পারিশ্রমিক ঠিক হয়েছে একশ’ টাকা, কিন্তু দেয়ার সময় একশ’ দশ বা বিশ টাকা দেয়া। একশ’ টাকা দেয়া এটি ওয়াজিব (প্রাপ্য) অধিকার, আর এটাই সুবিচার, আর দশ বিশ টাকা বেশি দেয়া। এটাই হল ইহসান বা অনুগ্রহ। সুবিচার দ্বারা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু সদাচরণ ও অনুগ্রহ প্রদর্শন দ্বারা সমাজে অধিক সৌন্দর্য, সৌহার্দ্য ত্যাগ-তিতিক্ষার স্পৃহা সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে ফরয কাজ সম্পাদন করার সাথে সাথে নফল কাজে আগ্রহী হওয়া কর্তব্যের চাইতে বেশি আমল। যার দ্বারা আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ হয়। ইহসানের তৃতীয় অর্থ হল ইবাদত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা ও তা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা। হাদীছে জিবরীলের মধ্যে এসেছে. أن تعبد الله كأنك تراه ‘আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে কর, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ’। আত্মীয়-স্বজনের অধিকার আদায় করা, অর্থাৎ, তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এটাকেই হাদীছে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা বলা হয়েছে এবং তার প্রচুর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সুবিচার, সদাচরণ অনুগ্রহের পর এর পৃথকভাবে উল্লেখ জ্ঞাতি-বন্ধন বজায় রাখার গুরুত্বকে আরো অধিকরূপে বাড়িয়ে তোলে।

আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা তিনটি বিষয়ের আদেশ দিয়েছেন- (১) সুবিচার, (২) অনুগ্রহ ও (৩) আত্মীয়দের প্রতি অনুগ্রহ। পক্ষান্তরে তিন প্রকার কাজ করতে নিষেধ করেছেন, (১) অশ্লীলতা, (২) যাবতীয় মন্দ কাজ এবং (৩) যুলুম ও উৎপীড়ন। এ আয়াত সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ‘এটি হচ্ছে কুরআনুল কারীমের ব্যাপকতর অর্থবোধক একটি আয়াত’। কোন কোন ছাহাবী এ আয়াত শ্রবণ করেই মুসলিম হয়েছিলেন। উছমান ইবনু মাযঊন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, শুরুতে আমি লোকমুখে শুনে ঝোঁকের মাথায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম, আমার অন্তরে ইসলাম বদ্ধমূল ছিল না। একদিন আমি রাসূল (ﷺ)-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম, হঠাৎ তার উপর অহী নাযিলের লক্ষণ প্রকাশ পেল। কতিপয় বিচিত্র অবস্থার পর তিনি বললেন, আল্লাহর দূত এসেছিল এবং এই আয়াত আমার প্রতি নাযিল হয়েছে। উছমান ইবনু মাযঊন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এই ঘটনা দেখে এবং আয়াত শুনে আমার অন্তরে ঈমান বদ্ধমূল ও অটল হয়ে গেল এবং রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি মুহব্বত আমার মনে আসন পেতে বসল।[২]

উপরের তিনটি সৎকাজের মোকাবিলায় আল্লাহ তিনটি অসৎ কাজ করতে নিষেধ করেন। তন্মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে, ‘ফাহশা’। যার অর্থ অশ্লীলতা-নির্লজ্জতা। কথায় হোক বা কাজে। প্রকাশ্য মন্দকর্ম অথবা কথাকে অশ্লীলতা বলা হয়, যাকে প্রত্যেকেই মন্দ মনে করে। সব রকমের অশালীন, কদর্য ও নির্লজ্জ কাজ এর অন্তর্ভুক্ত। এমন প্রত্যেকটি খারাপ কাজ যা স্বভাবতই কুৎসিত, নোংরা, ঘৃণ্য ও লজ্জাকর তাকেই বলা হয় অশ্লীল। যেমন কৃপণতা, ব্যভিচার, উলঙ্গতা, সমকামিতা, মুহাররাম আত্মীয়কে বিয়ে করা, চুরি, মদ্যপান, ভিক্ষাবৃত্তি, গালাগালি করা, কটু কথা বলা ইত্যাদি। এভাবে সর্বসমক্ষে বেহায়াপনা ও খারাপ কাজ করা এবং খারাপ কাজকে ছড়িয়ে দেয়াও অশ্লীলতা-নির্লজ্জতার অন্তর্ভুক্ত। যেমন মিথ্যা প্রচারণা, মিথ্যা দোষারোপ, গোপন অপরাধ জনসমক্ষে বলে বেড়ানো, অসৎকাজের প্ররোচক গল্প, নাটক ও চলচ্চিত্র, উলঙ্গ চিত্র, মেয়েদের সাজগোজ করে জনসমক্ষে আসা, নারীপুরুষ প্রকাশ্যে মেলামেশা এবং মঞ্চে মেয়েদের নাচগান করা ও তাদের শারীরিক অঙ্গভঙ্গির প্রদর্শনী করা ইত্যাদি। আজকাল অশ্লীলতা এত ব্যাপকতা লাভ করেছে যে, তার নামই সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রগতি ও শিল্পকলা হয়ে গেছে! অথবা চিত্ত-বিনোদন বা মনোরঞ্জনের নামে তাকে বৈধ করে নেয়া হয়েছে। তবে সুন্দর লেবেল লাগালে কোন জিনিসের আসলত্ব পাল্টে যায় না। অনুরূপ ইসলাম ব্যভিচার ও তার সকল ছিদ্রপথ: নাচ, পর্দাহীনতা, ফ্যাশন-প্রবণতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং অনুরূপ লজ্জাহীনতা প্রদর্শনকে অশ্লীলতা বলে অভিহিত করেছে। তার নাম যত সুন্দরই হোক না কেন, পাশ্চাত্য হতে আমদানীকৃত নোংরামি কোন মতেই বৈধ হতে পারে না।

নিষিদ্ধ দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে ‘মুনকার’ তথা দুস্কৃতি বা অসৎকর্ম। যা এমন কথা অথবা কাজকে বলা হয়, যা শরী‘আত হারাম করেছে। যাবতীয় গোনাহই এর অন্তর্ভুক্ত। কারও কারও মতে এর অর্থ শিরক। নিষিদ্ধ তৃতীয় জিনিসটি হচ্ছে ‘বাগ্‌ই’ তথা সীমালঙ্ঘন করা। কারো কারো মতে, যুলুম। কারো কারো মতে, হিংসা-বিদ্বেষ। মোটকথা: এর দ্বারা যুলুম ও উৎপীড়ন বোঝানো হয়েছে। নিজের সীমা অতিক্রম করা এবং অন্যের অধিকার লংঘন করা ও তার উপর হস্তক্ষেপ করা। তা আল্লাহর হক হোক বা বান্দার হক। মুনকার শব্দের যে অর্থ বর্ণিত হয়েছে, তাতে বাগ্ই ও ফাহ্শা ও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু চূড়ান্ত মন্দ হওয়ার কারণে ফাহ্শা -কে পৃথক ও আগে উল্লেখ করা হয়েছে। যেসব গুনাহের মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় শাস্তিই একত্রিত হয় এবং দুনিয়ার শাস্তি তা মোচন করে না, তার মধ্যে রয়েছে: অবিচার/সীমালঙ্ঘন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, খিয়ানত এবং মিথ্যা। অর্থাৎ এসব পাপের শাস্তি দুনিয়াতে এবং পরকালেও দেয়া হয়। আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও আবূ বাকরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ,

مَا مِنْ ذَنْبٍ أَجْدَرُ أَنْ يُعَجِّلَ اللهُ تَعَالَى لِصَاحِبِهِ الْعُقُوْبَةَ فِي الدُّنْيَا، مَعَ مَا يَدَّخِرُ لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِثْلُ الْبَغْيِ وَقَطِيْعَةِ الرَّحِمِ

‘অন্যায়-অবিচার, বিদ্রোহ ও রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার মত মারাত্মক আর কোন পাপ নেই, আল্লাহ তা‘আলা যার শাস্তি পৃথিবীতেও অতিদ্রুত প্রদান করেন এবং আখিরাতের জন্যও অবশিষ্ট রাখেন’।[৩]

ত্বাবারানী অপর একটি বর্ণনায় এ শব্দে বর্ণনা করেছেন, ‘এমন কোন গুনাহ নেই যার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তার কর্তার জন্য দুনিয়াতে অতিদ্রুত শাস্তি প্রদান করেন, সাথে আখিরাতের জন্য শাস্তি সঞ্চিত রাখেন। যেমন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, খিয়ানত ও মিথ্যা। আর যে আমলের প্রতিদান সবচেয়ে দ্রুত প্রদান করা হয় তা হল- আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। এমনকি কোন পরিবারের লোকেরা পাপাচারী হলেও, তারা যদি পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখে, তবে তাদের সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং তাদের সংখ্যা বেড়ে যায়’।[৪] ইমাম মুনাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এ হাদীছে প্রমাণ রয়েছে যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণে দুনিয়াতে যে বিপদ আসে, তা আখিরাতের শাস্তিকে প্রতিহত করে না’।[৫] শাইখ আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানেই শাস্তি হবে। তার জন্য দুনিয়ার শাস্তি এবং আখিরাতের শাস্তি দু’টিই একত্রিত হবে। ফলে তার জন্য দুনিয়ার আযাব ও আখিরাতের আযাব উভয়ই একত্রিত হবে, দুনিয়ার ক্ষতি ও আখিরাতের ক্ষতি দু’টোই সে ভোগ করবে। এটি প্রমাণ করে যে, অবিচার (বাগী) ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর ও ভয়াবহ। কারণ রাসূল (ﷺ) উল্লেখ করেছেন যে, এদের কর্তা এমন ব্যক্তি যে, তার জন্য এ দু’ধরনের শাস্তিই একত্র হওয়া খুবই উপযুক্ত। এটি এ গুনাহ দু’টির ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে’।[৬]

(২) নৈতিক অবক্ষয় আল্লাহর শাস্তি ডেকে আনে। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ اِذَاۤ  اَرَدۡنَاۤ  اَنۡ نُّہۡلِکَ قَرۡیَۃً  اَمَرۡنَا مُتۡرَفِیۡہَا فَفَسَقُوۡا فِیۡہَا فَحَقَّ عَلَیۡہَا الۡقَوۡلُ  فَدَمَّرۡنٰہَا  تَدۡمِیۡرًا

‘যখন আমরা কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন সেখানকার সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিদেরকে (সৎকর্ম করতে) আদেশ করি, উল্টো তারা সেথায় অসৎকর্ম করে ও পাপাচারে লিপ্ত হয়, ফলে তাদের উপর শাস্তি ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং ওটাকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ১৬)। ইতিহাসে বহু জাতি নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে ধ্বংস হয়েছে। যেমন ‘আদ, ছামূদ, লূত্বের ক্বাওম। এখানে সেই মূলনীতির কথা তুলে ধরা হয়েছে, যার ভিত্তিতে জাতির বিনাশ সাধনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর তা হল এই যে, তাদের সচ্ছল ও ঐশ্বর্যশালী ব্যক্তিরা আল্লাহর আদেশ লংঘন ও নির্দেশাবলী অমান্য করতে আরম্ভ করে এবং এদের দেখাদেখি অন্যরাও তা-ই করতে শুরু করে দেয়, আর এইভাবে এই জাতির মধ্যে আল্লাহর অবাধ্যতা ব্যাপক হয়ে যায়। ফলে তারা শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হয়।

জনসাধারণ স্বাভাবিকভাবেই বিত্তশালী ও শাসক-শ্রেণীর চরিত্র ও কর্মের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়। এরা কুকর্মপরায়ণ হলে সমগ্র জাতি কুকর্মপরায়ণ হয়ে যায়। তাই আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে ধন-দৌলত দান করেন, কর্ম ও চরিত্রের সংশোধনের প্রতি তাদের অধিকতর যত্নবান হওয়া উচিত। এমন হওয়া উচিত নয় যে, তারা বিলাসিতায় পড়ে কর্তব্য ভুলে যাবে এবং তাদের কারণে সমগ্র জাতি ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হবে। এমতাবস্থায় সমগ্র জাতির কুকর্মের শাস্তিও তাদেরকে ভোগ করতে হবে। তাছাড়া যখন কোন জাতির লোকেরা খারাপ কাজ করে এবং অন্যান্যরা সেটাতে বাধা না দেয়, তখন তারা হয় সেটায় রাজি আছে হিসাবে অথবা তার বিরোধিতা না করার কারণে শাস্তি লাভ করে। এক হাদীছে এসেছে, রাসূল (ﷺ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আমাদের মধ্যে সৎ লোকগণ থাকা অবস্থায় ও আমরা কি ধ্বংসপ্রাপ্ত হবো? তখন রাসূল (ﷺ) উত্তরে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, যখন খারাপের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়’।[৭]

(৩) নবী (ﷺ)-এর আগমনের মূল উদ্দেশ্য ছিল চরিত্র সংশোধন। মানবজাতির ইতিহাসে নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আগমন ছিল এক অনন্য ও যুগান্তকারী ঘটনা। তাঁর আগমনের মাধ্যমে শুধু একটি নতুন ধর্মীয় বিধানই প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈতিকতা, চরিত্রগঠন ও আদর্শ আচরণের এক পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা বিশ্ববাসী লাভ করেছে। তিনি নিজেই বলেছেন, إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ ‘আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্র পূর্ণতা দানের জন্য’।[৮] অর্থাৎ ইসলামের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হল নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা। এই হাদীছ থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর রিসালাতের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মানবচরিত্রকে পরিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ করা।

ইসলাম আগমনের পূর্বে আরব সমাজে নৈতিক অবক্ষয় চরমে পৌঁছেছিল। মদ্যপান, সূদ, ব্যভিচার, নারী নির্যাতন, গোত্রীয় হানাহানি, দুর্বলদের উপর অত্যাচার এসব ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। শক্তিমানরা দুর্বলদের অধিকার হরণ করত, কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হত, সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতা বিরল গুণে পরিণত হয়েছিল। এমন এক অন্ধকার যুগে নবী (ﷺ) নৈতিকতার আলো নিয়ে আবির্ভূত হন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন সত্যবাদিতা, আমানত রক্ষা, ন্যায়বিচার, দয়া, সহানুভূতি, ক্ষমাশীলতা ও আত্মসংযম। তিনি শুধু কথায় নয়, নিজের জীবনের মাধ্যমে এসব গুণের বাস্তব নমুনা পেশ করেছেন। মক্কার কাফিররাও তাঁকে ‘আল-আমীন’ (বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। তায়িফবাসীরা যখন তাঁকে রক্তাক্ত করেছিল, তখনও তিনি তাদের জন্য বদদু‘আ না করে হিদায়াতের দু‘আ করেছিলেন, এটাই ছিল তাঁর চরিত্রের মহত্ত্ব। নবী (ﷺ) দেখিয়েছেন যে, ইবাদত ও নৈতিকতা একে অপরের পরিপূরক। ছালাত, ছিয়াম, যাকাত এসব ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যই হল মানুষকে অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখা এবং নৈতিকতায় দৃঢ় করা। যে ইবাদত মানুষের চরিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে না, তা তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে না।

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই তিনি নৈতিকতার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, প্রতিবেশীর অধিকার, আত্মীয়তার সম্পর্ক, ব্যবসায়িক লেনদেনÑ প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি ন্যায় ও সদাচরণের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর জীবন ছিল কুরআনের জীবন্ত ব্যাখ্যা। বর্তমান যুগেও মানবসমাজ নানা সংকটে জর্জরিতÑ দুর্নীতি, প্রতারণা, হিংসা, অবিচার ও স্বার্থপরতা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় নবী (ﷺ)-এর চরিত্র ও শিক্ষা অনুসরণ করাই পারে মানবজাতিকে সত্যিকারের শান্তি ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করতে। সুতরাং বলা যায়, নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আগমনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, সমাজে ন্যায় ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করা এবং উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দান করা। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করলেই ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই সাফল্য ও মুক্তির পথে অগ্রসর হতে পারবে।

(৪) নৈতিক অবক্ষয়ের সামাজিক ক্ষতি। নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে রাষ্ট্রে দুর্নীতি ও ঘুষ বৃদ্ধি পায়, স্বজনপ্রীতি ও অন্যায়-অবিচার বিস্তৃত হয়, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়ে, আমানতের খিয়ানত ও নেতৃত্বে বিশ্বাসহীনতা গ্রাস করে। রাসূল (ﷺ) বলেছেন,

فَإِذَا ضُيِّعَتِ الْأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ.‏ قَالَ كَيْفَ إِضَاعَتُهَا قَالَ إِذَا وُسِّدَ الْأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ.‏

‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন ক্বিয়ামতের অপেক্ষা কর। প্রশ্নকারী বলল, কিভাবে আমানত নষ্ট করা হয়? তিনি বললেন, যখন কোন অনুপযুক্ত ব্যক্তির উপর কোন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন তুমি ক্বিয়ামতের অপেক্ষা করবে’।[৯] এখানে বোঝানো হয়েছে নৈতিকতার পতন সমাজ ধ্বংসের পূর্বলক্ষণ।

(৫) নৈতিক অবক্ষয় রাষ্ট্র ধ্বংসের মূল কারণ। ইসলামের ইতিহাস প্রমাণ করে শুধু বাহ্যিক শক্তি নয়, অভ্যন্তরীণ নৈতিক পতনই রাষ্ট্রের পতনের প্রধান কারণ। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা সেই রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত করেন, সাহায্য করেন এবং ক্ষমতাবান করেন, যেখানে মাযলূমকে সাহায্য করা হয় এবং তার অধিকার তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

إنَّ اللهَ يقيمُ الدَّولةَ العادلةَ وإن كانت كافِرةً، ولا يقيمُ الدَّولةَ الظَّالمةَ وإن كانت مُسلِمةً

‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখেন, যদিও তা কাফির রাষ্ট্র হয়, আর যুলমভিত্তিক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখেন না, যদিও তা মুসলিম রাষ্ট্র হয়’।[১০] উপরিউক্ত উক্তি প্রমাণ করে যে, নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারই নেতৃত্বে টিকে থাকার প্রধান শর্ত।

ইসলামের দৃষ্টিতে নৈতিক অবক্ষয় আল্লাহর অসন্তোষের কারণ। সমাজ ধ্বংসের সূচনা। রাষ্ট্র পতনের বীজ। আখিরাতে কঠিন শাস্তির কারণ। অতএব ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে ঈমান মজবুত করা, কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করা, সৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলা, সন্তানদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা, এগুলোই নৈতিক অবক্ষয় রোধের পথ।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* মুর্শিদাবাদ, ভারত।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৪, ৬৬৬৭; ইবনু মাজাহ, হা/৭৯,৪১৬৮।
[২]. মুসনাদে আহমাদ ,১/৩১৮ পৃ.।
[৩]. আবূ দাঊদ, হা/৪৯০২; তিরমিযী, হা/২৫১১; ইবনু মাজাহ, হা/৪২১১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯৮৬১, ১৯৮৮৫; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৯১৭।
[৪]. ছহীহুল জামি‘, হা/১০৬৪২ সনদ ছহীহ।
[৫]. আত-তাইসীর শারহুল জামি‘ আছ-ছাগীর, ২/৬৯৮ পৃ.।
[৬]. শারহ সুনান আবী দাঊদ, ২৮/১৬৭।
[৭]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৮০।
[৮]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৯৫২; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৪৬।
[৯]. ছহীহ বুখারী হা/৫৯, ৬৪৯৬।
[১০]. মাজমুঊল ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়্যাহ, ২৪/১৪৬ পৃ.।




প্রসঙ্গসমূহ »: সমাজ-সংস্কার
ইখলাছ বিহীন আমল ও তার পরিণতি - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধান - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
প্রচলিত তাবলীগ জামা‘আত সম্পর্কে শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের অবস্থান - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজ (শেষ কিস্তি) - ড. মেসবাহুল ইসলাম
ক্রোধের ভয়াবহতা ও তার শারঈ চিকিৎসা - হাসিবুর রহমান বুখারী
হজ্জ ও ওমরাহ সম্পর্কে প্রচলিত বিদ‘আতসমূহ - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
তরুণদের বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে সতর্কীকরণ (৭ম কিস্তি) - মাসঊদুর রহমান
ছালাতে একাগ্রতা অর্জনের ৩৩ উপায় (৫ম কিস্তি) - আব্দুল হাকীম বিন আব্দুল হাফীজ
মহামারী থেকে বেঁচে থাকার দশটি উপদেশ - অনুবাদ : আযহার বিন আব্দুল মান্নান
নফল ছালাত - আল-ইখলাছ ডেস্ক
যাদুটোনার শারঈ সমাধান (৪র্থ কিস্তি) - মাসঊদুর রহমান
ইসলামী পুনর্জাগরণের মূলনীতি (৩য় কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ