শনিবার, ১৩ Jun ২০২৬, ০৫:৩২ অপরাহ্ন

বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে তরুণদের সতর্কীকরণ 

- মুহাম্মাদ ইবনু নাছির আল-উরাইনি (রহ.) 
- অনুবাদ : মাসঊদুর রহমান* 


(২য় কিস্তি)  

উত্তম চরিত্র 

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের জন্য পূর্ববর্তী যে সকল বিধান দিয়েছিলেন, তার প্রত্যেকটি বিধানে স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির  উত্তম আচরণের ব্যাপারে উৎসাহিত করে। আর আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) যে বিধান নিয়ে এসেছেন, তা উত্তম চরিত্র বা আচরণকে পরিপূর্ণতা দান করেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ الأَخْلَاقِ ‘আমি তো উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতা সাধনের জন্যই প্রেরিত হয়েছি’।[১]

স্রষ্টার প্রতি উত্তম নৈতিকতা হল তাঁর কুরআনুল কারীমে এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছগুলোর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস, সন্তুষ্টি ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সেগুলো গ্রহণ করা এবং আন্তরিকতা ও আনুগত্যের সাথে হাদীছগুলোর হুকুম বাস্তবায়ন করা। সততা, কোমলতা, কাউকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা, হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় কথা বলা এবং আল্লাহর জন্যই সকল সৃষ্টিকে ভালোবাসার মাধ্যমেই সৃষ্টির প্রতি উত্তম আচরণ ও চরিত্র পরিপূর্ণতা লাভ করে। আলেমগণ বলেছেন, আল্লাহর জন্য ভালোবাসা হলো সর্বোত্তম নিষ্ঠার কাজ। নবী (ﷺ) বলেছেন,وَجَبَتْ مَحَبَّتِى لِلْمُتَحَابِّينَ فِىَّ وَالْمُتَجَالِسِينَ فِىَّ وَالْمُتَزَاوِرِينَ فِىَّ وَالْمُتَبَاذِلِينَ فِىَّ ‘আমার ভালোবাসা তাদের প্রতি আবশ্যক হয়ে যায়, যারা আমার জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, আমার জন্য একে অপরকে উদারভাবে দান করে,  আমার জন্য একসাথে বসে এবং যারা আমার জন্য একে অপরকে দেখতে যায়’।[২] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেন,

سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ فِى ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِى اللهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ

‘যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন আল্লাহ যাদেরকে তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, তাদের মধ্যে দু’জন ব্যক্তি আছেন, যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসেন, সেই কারণেই মিলিত হন এবং সেই কারণেই বিচ্ছিন্ন হন’।[৩]

আবূ জা‘ফর আত ত্বাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমাদের আক্বীদা হলো, আমরা ন্যায়বিচার সম্পাদনকারী এবং আমানত রক্ষাকারী  মানুষদেরকে ভালোবাসি এবং অত্যাচারী-যালেম, খেয়ানতকারী ব্যক্তিদেরকে ঘৃণা করি’।[৪] পক্ষান্তরে আমরা যাদেরকে চিনি না ,তাদেরকে ভালোবাসিও না, ঘৃণাও করি না এবং আমরা সকলের জন্য কল্যাণ কামনা করি।

যারা আমাদের দ্বীন ধর্ম অনুসরণ করে না, তাদের সাথেও ভালো আচরণ করা আবশ্যক, যাতে তারা বুঝতে পারে যে, এটি এমন একটি দ্বীন, যার মাধ্যমে মুসলমানগন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে এবং এই আচরণ যেন  তাদের ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়, যেমনটি উত্তম শতাব্দীতে মুসলিমদের প্রথম প্রজন্মের ক্ষেত্রে হয়েছিল। তারা এটিকে নীরব আহ্বান বা দাওয়াত বলে আখ্যায়িত করেছিল।

আমাদের শিক্ষক ও আদর্শ, আমাদের নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর একজন ইয়াহুদি খাদেম ছিল। সে একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী (ﷺ) তাকে দেখার জন্য আসলেন। তিনি তার মাথার নিকট বসে তাকে বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ কর, সে তখন তার পিতার দিকে তাকাল, সে তার নিকটেই ছিল, পিতা তাকে বলল, আবুল কাসিম (নবী (ﷺ)-এর কুনিয়াত)-এর কথা মেনে নাও, তখন সে ইসলাম গ্রহণ করল। নবী (ﷺ) সেখান হতে বের হয়ে যাওয়ার সময় বললেন, যাবতীয় প্রশংসা সে আল্লাহ্‌র, যিনি তাকে জাহান্নাম হতে মুক্তি দিলেন।[৫] এটি উত্তম চরিত্র, নম্রতা এবং মানুষের প্রতি কল্যাণকর ভালোবাসার শীর্ষে অবস্থান করে।

আমাদের ধর্ম ন্যায়বিচার, সততা, উত্তম নৈতিকতা  মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের সাথেই ভালো আচরণের কথা বলে। মহান আল্লাহ বলেন,

لَا یَنۡہٰىکُمُ اللّٰہُ  عَنِ الَّذِیۡنَ لَمۡ یُقَاتِلُوۡکُمۡ فِی الدِّیۡنِ وَ لَمۡ  یُخۡرِجُوۡکُمۡ  مِّنۡ  دِیَارِکُمۡ  اَنۡ  تَبَرُّوۡہُمۡ وَ تُقۡسِطُوۡۤا اِلَیۡہِمۡ ؕ اِنَّ  اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُقۡسِطِیۡنَ

‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ হতে বহিস্কার করেনি, তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন’ (সূরা আল-মুমতাহিনা : ৮)।

উক্ত আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে শায়খ আস-সা’দী বলেন, অর্থাৎ তিনি তোমাদেরকে সদয় হতে, সুসম্পর্ক বজায় রাখতে এবং মুশরিকদের হতে ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে নিষেধ করেন না, সে তোমাদের আত্মীয়স্বজন হোক বা অন্য কেউ, তারা যেখানেই থাকুক না কেন। এমনকি যদি তারা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে বা তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে বহিষ্কার না করে তবুও। তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখলে তোমাদের কোন দোষ নেই, কারণ এই পরিস্থিতিতে তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা আপত্তিকর বা ক্ষতিকর নয়।[৬]

মানুষের জীবন, সম্পত্তি বা সম্মানের উপর আক্রমণ করা অনেক বড় অপরাধ, পাশাপাশি তা খারাপ চরিত্র এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হিসেবে সাব্যস্ত হয়। নবী (ﷺ) বলেছেন,

إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فَلْيُبْلِغْ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ

‘তোমাদের রক্ত, সম্পদ, ইয্যত-সম্মান তোমাদের জন্য তেমনি সম্মানিত, যেমনি সম্মানিত তোমাদের এ দিনটি, তোমাদের এ শহর ও তোমাদের এ মাস। উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট পৌঁছিয়ে দেয়’।[৭]

আমাদের যেসব সৎ নীতি-নৈতিকতা মেনে চলতে আদেশ দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে মুসলিমদেরকে আন্তরিক ভাবে উপদেশ দেওয়া, তাদের সাথে খোলামেলা কথা বলা,  ভালো ব্যবহার করা, যথাসম্ভব তাদের প্রয়োজন পূরণ করা, আনন্দ দেওয়া, যথাসাধ্য তাদের জন্য সুপারিশ করা। অতঃপর যখন তারা অন্যদের প্রতি অন্যায় করে তখন তাদেরকে ক্ষমা করা এবং তাদের সাথে শান্তি স্থাপন করা। মহান আল্লাহ বলেন, فَمَنۡ عَفَا وَ اَصۡلَحَ  فَاَجۡرُہٗ  عَلَی اللّٰہِ ‘এবং যে ক্ষমা করে ও আপোষ-নিস্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে’ (সূরা আশ-শুরা : ৪০)।

ক্ষমা করা যেন সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যাতে অপরাধী তার অন্যায় ও ভ্রষ্টটাতে আরও দুঃসাহসী না হয়ে ওঠে। ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 

الإصلاح واجب، والعفو مندوب، فإذا كان في العفو فوات الإصلاح فمعنى ذلك أننا قدمنا مندوبًا على واجب

‘সংশোধন করা ফরয আর ক্ষমা করা বৈধ। এখন যদি ক্ষমা করতে গিয়ে সংশোধনের কাজ ব্যাহত হয়, তাহলে এর অর্থ হল, আমরা ফরজ কাজের চেয়ে বৈধ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছি’।[৮]

উদাহরণ : একজন ব্যক্তি এমন একজন ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন, যে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে তার ছেলেকে  গাড়ি চাপা দিয়েছিল। অথচ সে রাষ্ট্রের আইন ও বিধিমালা উপেক্ষা করে গাড়ি চালিয়েছিল, যে আইন ও বিধিমালা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করে। এই ক্ষমা তার বেপরোয়াতা এবং দুর্নীতি বৃদ্ধি করতে পারে, তাই তাকে ক্ষমা করা প্রশংসনীয় নয়।

কিছু গুণ বা নৈতিকতা একজন ব্যক্তির মধ্যে সৃষ্টিজগতভাবেই তৈরি হয়, আর বাঁকিগুলো ভালো- ধার্মিক মানুষের সাহচর্য থেকে অভ্যাস এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত হয়। প্রথমটি দ্বিতীয়টির চেয়ে ভালো, কারণ স্বভাবগুণ (প্রাকৃতিক চরিত্র) অভ্যাসে অর্জিত গুণের চেয়ে উত্তম। তাইতো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আব্দুল কয়েস গোত্রের আশাজ্জকে বলেছিলেন,

 إِنَّ فِيكَ خَلَّتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللهُ، الْحِلْمُ وَالْأَنَاةُ قَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ أَنَا أَتَخَلَّقُ بِهِمَا أَمُ اللهُ جَبَلَنِي عَلَيْهِمَا؟ قَالَ: بَلِ اللهُ جَبَلَكَ عَلَيْهِمَا قَالَ: الْحَمْدُ لِلهِ الَّذِي جَبَلَنِي عَلَى خَلَّتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللهُ وَرَسُولُهُ

‘তোমার মধ্যে দু’টি উত্তম স্বভাব রয়েছে, যা আল্লাহ পছন্দ করেন; ধৈর্য্য ও ধীরস্থিরতা। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি কি এ অভ্যাস গড়ে তুলেছি, না আল্লাহ আমাকে এ দু’টি অভ্যাসের উপর সৃষ্টি করেছেন? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আল্লাহই তোমাকে এ দু’টি স্বভাবের উপর সৃষ্টি করেছেন। তখন তিনি বললেন, কৃতজ্ঞতা আদায় করছি সেই আল্লাহর, যিনি আমাকে এমন দু’টি স্বভাবের উপর সৃষ্টি করেছেন, যাকে স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল পছন্দ করেন’।[৯]

আমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। আর তিনি অবশ্যই চরিত্রের দিক থেকে সর্বোত্তম। ছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَ اِنَّکَ لَعَلٰی خُلُقٍ عَظِیۡمٍ ‘এবং অবশ্যই, আপনি মহান নৈতিক চরিত্রের অধিকারী’ (সূরা আল-কালাম : ৪)। ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে এবং তার ছাহাবীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে, এমনকি তার পরিবার, শিশু সবার সাথেই আচরণের ক্ষেত্রে তার উত্তম চরিত্র বা স্বভাব প্রকাশ পায় এবং তাঁর নিখুঁত ন্যায়বিচারের প্রতিফলন ঘটে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لأَهْلِي ‘তোমাদের মাঝে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার পরিবারের নিকট ভাল। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম’।[১০] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেন, أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا ‘ঈমানের দিক থেকে সবচেয়ে পরিপূর্ণ মুমিন সেই ব্যক্তি, যে চরিত্রের দিক থেকে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম’।[১১]

মানুষের সাথে হাসজ্জল চেহারায় হাসিমুখে কথা এবং চেনা অচেনা সবাইকে সালাম দেওয়ার মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা এবং কল্যাণের অনুভূতি তৈরি হয়। আপনি চাইলে কারো সাথে এটা চেষ্টা করে দেখতে পারেন। নবী (ﷺ) বলেছেন,أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ‏ ‘আমি কি তোমাদের তা বলে দিব না, কি করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে’।[১২] নবী (ﷺ) আরো বলেছেন, وَتَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ صَدَقَةٌ ‘তোমার ভাইয়ের সাথে তোমার হাস্যোজ্জ্বল মুখে সাক্ষাত করা একটি ছাদাক্বাহ’।[১৩] কিছু আলিমগণ অন্যদের প্রতি সদাচারকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যে, কারো ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা, উদার হওয়া এবং প্রফুল্লতার সাথে কথা বলা।

নিশ্চয়ই ভালো চরিত্র হৃদয়ে আনন্দ, মনের শান্তি এবং আত্মায় প্রশান্তি নিয়ে আসে এবং এটি ঈমানের পরিপূর্ণতার অংশ। ইবনুল কাইয়ুম  (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘হৃদয়ের আনন্দ এবং চোখের প্রশান্তি যেকোনো পার্থিব আনন্দের সাথে অতুলনীয়, এবং এর তুলনা আর কিছুই হতে পারে না। এটি জান্নাতের লোকদের একটি অবস্থা। এমনকি কিছু বিজ্ঞবর্গ ব্যক্তি বলেন, ‘আমার জীবনে কিছু মুহুর্ত এত আনন্দের মধ্যে অতিক্রম হয়, যখন আমি বলি- যদি জান্নাতের লোকেরা এমন অবস্থায় থাকে, তাহলে তারা সত্যিই একটি ভালো জীবনযাপন করছে’। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এই আনন্দ একজনকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর  দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যেতে, তাঁর সন্ধানে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনে প্রচেষ্টা চালাতে অনুপ্রাণিত করে। যারা এই সকল আনন্দের কোনটিই অনুভব করে না, তাদের উচিত তাদের ঈমান ও আমল নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা, কারণ ঈমানের একটি মিষ্টতা আছে, যারা এই স্বাদ পায়নি, তাদের উচিত অতিত নিয়ে একটু ভাবা এবং এমন একটি আলো বৈশিষ্ট্য অর্জন করা, যার মাধ্যমে তারা ঈমানের মিষ্টতা খুঁজে পাবে। নবী (ﷺ) ঈমানের স্বাদ উল্লেখ করেছেন এবং তিনি এর মিষ্টতা খুঁজে পেয়েছেন। অতঃপর তিনি স্বাদ এবং পরমানন্দের কথা উল্লেখ করে সেটাকে ঈমানের সাথে সংযুক্ত করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ذَاقَ طَعْمَ الإِيمَانِ مَنْ رَضِىَ بِاللهِ رَبًّا وَبِالإِسْلاَمِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا ‘সে ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেয়েছে, যে রব হিসেবে আল্লাহকে, দীন হিসেবে ইসলামকে এবং রাসূল হিসেবে মুহাম্মাদ (ﷺ) কে সন্তুষ্ট চিত্তে স্বীকার করেছে’।[১৪]

হে আল্লাহ! আপনি যেমন আমাদের সৃষ্টিকে সুন্দর করেছেন, তেমনিভাবে আমাদের চরিত্রকেও সুন্দর করে দিন-আমীন!!

কল্যাণকর বিষয়ে আনুগত্য করা

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَ اَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ وَ اُولِی الۡاَمۡرِ مِنۡکُمۡ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, আরও আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যকার নেতৃবর্গ (উলামাদের ) আনুগত্য কর’ (সূরা আন-নিসা : ৫৯)। নবী (ﷺ) বলেন,

السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ فِيمَا أَحَبَّ وَكَرِهَ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلاَ سَمْعَ وَلاَ طَاعَةَ

‘যতক্ষণ আল্লাহর নাফরমানীর নির্দেশ দেয়া না হয়, ততক্ষণ পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় সকল বিষয়ে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য তার মান্যতা ও আনুগত্য করা কর্তব্য। যখন নাফরমানীর নির্দেশ দেয়া হয়, তখন আর কোন মান্যতা ও আনুগত্য নেই’।[১৫]

ভালো কাজে আনুগত্য করা আবশ্যক এবং একজন মুসলিম শাসকের জন্য তার নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খলের ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হারাম করা হয়েছে। নবী (ﷺ) বলেন,

مَنْ أَتَاكُمْ وَأَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيدُ أَنْ يَشُقَّ عَصَاكُمْ أَوْ يُفَرِّقَ جَمَاعَتَكُمْ فَاقْتُلُوهُ. ‏

‘তোমাদের এক নেতার অধীনে একতাবদ্ধ থাকা অবস্থায় যে ব্যক্তি এসে তোমাদের শক্তি খর্ব করতে উদ্যত হয় অথবা তোমাদের ঐক্য বিনষ্ট করতে চায়, তাকে তোমরা হত্যা করবে’।[১৬] নবী (ﷺ) আরো বলেন,

مَنْ نَزَعَ يَدَهُ مِنَ الطَّاعَةِ فَلاَ حُجَّةَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ مَاتَ مُفَارِقاً لِلْجَمَاعَةِ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً

‘যে ব্যক্তি আনুগত্য থেকে হাত সরিয়ে নেয়, ক্বিয়ামতের দিন তার কোন অজুহাত থাকবে না, আর যে ব্যক্তি সমাজ বা জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মারা যায়, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যুতে মারা গেল’।[১৭] নবী (ﷺ) আরো বলেন,

مَنْ أَطَاعَنِيْ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ عَصَانِيْ فَقَدْ عَصَى اللهَ وَمَنْ يُطِعْ الأَمِيْرَ فَقَدْ أَطَاعَنِيْ وَمَنْ يَعْصِ الأَمِيْرَ فَقَدْ عَصَانِيْ

‘যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলারই আনুগত্য করল। আর যে ব্যক্তি আমার নাফরমানী করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলারই নাফরমানী করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আমারই আনুগত্য করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের নাফরমানী করল, সে ব্যক্তি আমারই নাফরমানী করল।[১৮] নবী (ﷺ) আরো বলেন,السلطان ظل الله في الأرض فمن أهانه أهانه الله ومن أكرمه أكرمه الله ‘শাসক পৃথিবীতে আল্লাহর ছায়া। যে ব্যক্তি তাকে অপমান করবে, আল্লাহ তাকে অপমান করবেন, আর যে ব্যক্তি তাকে সম্মান করবে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করবেন’। হাদীছটি ইমাম আহমাদ এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন। ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) কিতাবুস সুন্নাহ (১০২৪) গ্রন্থে হাদীছটিকে হাসান বলেছেন।

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিদ্যমান, পরিচিত ইমামদের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাদের কর্তৃত্ব রয়েছে এবং যারা জনগণকে শাসন করতে পারেন। অজ্ঞ -মূর্খ এবং যাদের কোনও কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা নেই, তাদের আনুগত্য করার আদেশ দেন নাই’।[১৯]

ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘অত্যাচারী শাসকের আনুগত্য করা এবং তার সাথে থেকে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার বিষয়ে ফক্বীহগণ সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার চেয়ে তার আনুগত্য করা উত্তম, কারণ এটি রক্তপাত রোধ করে এবং জনগনকে শান্ত করে’।[২০]

ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘অবাধ্যতা ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ে শাসকদের আনুগত্য করা আবশ্যক এ মর্মে সকল আলেমগণ সর্বসম্মতভাবে একমত’।[২১]

শায়খুল ইসলাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমাদের যিনি নেতা তিনি আমাদের যে আদেশ করবেন, সে আদেশ মেনে চলা ও তার আনুগত্য করাটাই হলো ঐক্যের পরিপূরক  যদিও সে একজন হাবশি গোলাম হয়’। নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন এবং এটাই ইসলামী আইন, যা তিনি ব্যাপকভাবে প্রচার করেছেন। তবে দুঃখের বিষয় হলো যে, এই নীতিটি যারা জানার দাবি করে, তাদের বেশিরভাগের কাছে আজ অজানা হয়ে পড়েছে। তাহলে আমরা কীভাবে এটি অনুসরণ করতে পারি?[২২]

ইমাম আবূ জাফর আল-তাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আমরা আমাদের ইমাম এবং শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ মনে করি না,  যদিও তারা অন্যায়-অত্যাচার করে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে বদ দু‘আ করি না এবং আমরা তাদের আনুগত্য করা হতে বিরত থাকি না। তাদের আনুগত্য করাকে আমরা আল্লাহর আনুগত্য করার অন্তর্ভুক্ত মনে করি, যতক্ষণ না তারা শারী‘আত বিরোধী  আদেশ না করে। বরং আমরা তাদের মঙ্গল এবং কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করি’।[২৩]

ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তার নিন্দা করা উচিত নয়। বরং যেমন হাদীছে উল্লেখ করা হয়েছে, তার উচিত তার হাত ধরে, তার সাথে একাকী অবস্থান করে তাকে উপদেশ দেওয়া। আল্লাহর কর্তৃত্বকে অবমাননা করা তার উচিত নয়। আমরা অতীতে নৈতিক শিক্ষার কিতাবে উল্লেখ করেছি যে, ইমামগণ যতক্ষণ ছালাত আদায় করবে এবং তাদের মধ্যে স্পষ্ট কুফরি প্রমাণিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের  বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ নয়, যদিও তারা অন্যায়-অত্যাচার এবং যুলম নিপীড়ন করে থাকে। এই মর্মে বর্ণিত হাদীছগুলো মুতাওয়াতির পর্যায়ের। তবে, জনগণ বা অনুসারী ব্যক্তিগণের উচিত, আল্লাহর আনুগত্য মূলক কাজে ইমামের আনুগত্য করা এবং আল্লাহর অবাধ্যমূলক বিষয়ে ইমামের আদেশ লঙ্ঘন করা। কারণ স্রষ্টার অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য নেই’।[২৪]

ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘উলিল আমর-এর আনুগত্য করা ওয়াজিব। আর তারা হলেন ইমামগণ এবং নেতাগণ। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে ছহীহ সূত্রে স্পষ্ট ভাবে বর্ণনা আছে যে, ভালো কাজের ক্ষেত্রে আনুগত্য করা আবশ্যক।[২৫]

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৯৩৯, সনদ ছহীহ।
[২]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২২০৮৩, সনদ ছহীহ।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৬০।
[৪]. আল-আক্বীদাতুত ত্বাহাবিয়্যাহ।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৫৬।
[৬]. তাফসীর আস-সা‘দী, পৃ. ৮৫৭।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/১৭৩৯।
[৮]. মুহাম্মাদ ছালেহ আল-উছায়মীন, মাকারিমুল আখলাক্ব, দারুল ওত্বান, তা.বি.), পৃ. ২৭।
[৯]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮; আবূ দাঊদ, হা/৫২২৫।
[১০]. তিরমিযী, হা/৩৮৯৫, সনদ ছহীহ।
[১১]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬৮২; তিরমিযী, হা/১১৬২, সনদ হাসান ছহীহ।
[১২]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮।
[১৩]. তিরমিযী, হা/১৯৫৬, সনদ ছহীহ।
[১৪]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৪।
[১৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৪৪।
[১৬]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৫২।
[১৭]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৬৭৬।
[১৮]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯৫৭।
[১৯]. ইবনু তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ, ১ম খণ্ড (জামিঊল ঊলূম মুহাম্মাদ ইবনু সঊদ, ১৪০৬ হি.), পৃ. ১১৫।
[২০]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাৎহুল বারী, ১৩ম খণ্ড, পৃ. ৭।
[২১]. শারহু ছহীহ মুসলিম।
[২২]. আল-জামিঊল ফারীদ মিন কুতুবিন ওয়া রাসাইল লি আইয়্যিমাতিত দা‘ওয়াতি, পৃ. ২৮১।
[২৩]. শারহুল ‘আক্বীদাহ আত-ত্বাহাবী, পৃ. ৩৬৮।
[২৪]. আস-সাইলুল জারার, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৫৫৬।
[২৫]. আল-মা‘লূম মিন ওয়াজিবিল ‘আলাক্বাতি বাইনাল হাকিম ওয়াল মাহকূম




বিদ‘আত পরিচিতি (১৭তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ছয়টি মূলনীতির ব্যাখ্যা - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব - হাসিবুর রহমান বুখারী
বিদ‘আত পরিচিতি (১২তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
আল-কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত (২য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইসলামী শিষ্টাচার - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
প্রবৃত্তিপূজারী বিদ‘আতীদের সাথে উঠাবসা : সালাফী উলামার সতর্কবাণী - আল-ইখলাছ ডেস্ক
সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব (৬ষ্ঠ কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা (৪র্থ কিস্তি) - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধান (৫ম কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
তাক্বওয়াই মুক্তির সোপান (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - আব্দুর রশীদ
ইখলাছ বিহীন আমল ও তার পরিণতি - আব্দুল গাফফার মাদানী

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ