ইসলামী রাষ্ট্রে শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা: একটি পর্যালোচনা
- মূসা ইবরাহীম বিন রঈসুদ্দীন*
(২য় কিস্তি)
১.২.৪ মানবতার কল্যাণ
ইসলাম মানুষের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়েছে, মানবতার কল্যাণের অন্যতম দিক হল শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা। এ দায়িত্ব মুসলিম জাতির ওপর ন্যাস্ত। যারা এ দায়িত্ব পালন করবে আল্লাহ তাদেরকে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসাবে ঘোষণা করেছেন (সূরা আলে ‘ইমরান : ১১০)। ইসলামের এ মহৎ উদ্দেশ্যের প্রেক্ষাপটেই ‘দ্বীন’কেই সর্বৈব কল্যাণকামিতা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
عَنْ تَمِيْمٍ الدَّارِىِّ أَنَّ
النَّبِىَّ ﷺ
قَالَ «الدِّيْنُ النَّصِيْحَةُ» قُلْنَا لِمَنْ قَالَ «لِلهِ وَلِكِتَابِهِ
وَلِرَسُوْلِهِ وَلأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِيْنَ وَعَامَّتِهِمْ».
তামীম আদ-দারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি নবী করীম (ﷺ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, ‘দ্বীন হল নাসীহাহ বা কল্যাণকামিতা’। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! কার জন্য? তিনি বলেন, ‘আল্লাহর জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিম নেতৃবৃন্দের জন্য এবং তাদের সর্ব-সাধারণের জন্য’।[১] আর মানবতার কল্যাণকামিতার সর্বোচ্চ দিক হলো মানুষের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মানুষের জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই ইসলামী ব্যবস্থা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপনকে অপরিহার্য করে দিয়েছে। পক্ষান্তরে যেসব বিষয় মানুষের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য, হিংসা-বিদ্বেষ, জিগাংসা, হানাহানি, খুন খারাপী, হতাশা, বঞ্চনা, শোষণ, নিপীড়ন এবং সাধারণ ও স্বাভাবিক সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরায়, ইসলাম এ সকল বিষয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এবং হারাম ঘোষণা করেছে।
১.২.৫ শান্তিময় জীবনের অন্যতম প্রধান শর্ত নিরাপত্তা
নিরাপত্তা মানবজীবনের অন্যতম প্রধান কাম্যবস্তু। নিরাপত্তা ছাড়া সুখ ও শান্তি কল্পনাও করা যায় না। প্রাণহানি, সম্পদ ও সম্মানহানির ভয় যখন উপস্থিত হয়, তখন সুখের সকল উপকরণ বিস্বাদ হয়ে যায়। তাই শান্তিময় জীবনের অন্যতম প্রধান শর্ত নিরাপত্তা। পৃথিবীর সকল শ্রেণীর মানুষ নিরাপত্তা চায়। সৎ লোকও চায়, অসৎ লোকও চায়। বিশ্বাসীও চায়, অবিশ্বাসীও চায়। অথচ পৃথিবীর সকল নে‘তের মত নিরাপত্তাও আল্লাহ তা‘আলার নে‘মত। তিনিই মানুষকে নিরাপত্তা দান করেন এবং ভীতি ও শঙ্কা থেকে মুক্ত করেন। মুসলিমজাতির পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) মক্কা নগরীর জন্য তাই প্রথমেই শান্তি ও নিরাপত্তার দু‘আ করেছিলেন। মক্কাবাসীর জন্য আল্লাহর কাছে খাদ্য চাওয়ার আগেই তিনি চেয়েছিলেন শান্তি ও নিরাপত্তা। কুরআন মজীদে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সেই দু‘আ আল্লাহ তা‘আলা এভাবে উল্লেখ করেছেন যে,
وَ اِذۡ قَالَ اِبۡرٰہٖمُ رَبِّ اجۡعَلۡ ہٰذَا بَلَدًا اٰمِنًا وَّ ارۡزُقۡ اَہۡلَہٗ مِنَ الثَّمَرٰتِ مَنۡ اٰمَنَ مِنۡہُمۡ بِاللّٰہِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ قَالَ وَ مَنۡ کَفَرَ فَاُمَتِّعُہٗ قَلِیۡلًا ثُمَّ اَضۡطَرُّہٗۤ اِلٰی عَذَابِ النَّارِ ؕ وَ بِئۡسَ الۡمَصِیۡرُ
‘স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! একে নিরাপদ শহর করুন, আর এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান আনে তাদেরকে ফলমূল থেকে জীবিকা প্রদান করুন। আর যে কেউ কুফরী করবে তাকে কিছুকালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দিন, অতঃপর তাকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করুন এবং কত নিকৃষ্ট তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল’ (সূরা আল-বাকারাহ : ১২৬)। উল্লেখ্য, এ নিরাপত্তা যেমন মানুষের ব্যক্তিজীবনে যরূরী, তেমনি পারিবারিক জীবনেও তা আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। আর ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের শান্তির জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা।
১.২.৬ জান-মাল ও সম্মানের সাথে জীবনযাপনের নিশ্চয়তা
একটি সমাজকে শান্তির সমাজ তখনই বলা যায়, যখন তাতে জান-মালের নিরাপত্তা থাকে এবং সম্মানের সাথে জীবনযাপনের নিশ্চয়তা থাকে। শান্তির উপকরণ যেমন শান্তি নয়, তেমনি নিরাপত্তার উপকরণও নিরাপত্তা নয়। নিরাপত্তা আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ নে‘মত। এই নে‘মত তিনি ব্যক্তি ও সমাজকে তখনই দান করেন, যখন আল্লাহর দাসত্ব করা হয়। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানের আনুগত্যের দ্বারাই আল্লাহর পক্ষ হতে নিরাপত্তা লাভ করা যায়। পক্ষান্তরে আল্লাহর বিধানের অবাধ্যতা ও নাফরমানী ব্যক্তি ও সমাজকে নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করে। ঐ সমাজে প্রীতি ও একতার পরিবর্তে বিভেদ ও শত্রুতা ছড়িয়ে পড়ে। যারা একে অপরের জান মালের ‘রক্ষক’ হওয়ার কথা তারাই পরস্পরের জানমাল লুণ্ঠন করতে থাকে। ফলে সমাজে ভীতি ও দারিদ্র বিস্তার লাভ করে। শান্তির শত প্রচেষ্টা এবং দারিদ্র বিমোচনের অসংখ্য কর্মসূচী শুধু ব্যর্থই হতে থাকে। আর এই সব কিছু ঘটে আল্লাহ বিস্মৃতি ও আল্লাহর নে‘মতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করার কারণে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ ضَرَبَ اللّٰہُ مَثَلًا قَرۡیَۃً کَانَتۡ اٰمِنَۃً مُّطۡمَئِنَّۃً یَّاۡتِیۡہَا رِزۡقُہَا رَغَدًا مِّنۡ کُلِّ مَکَانٍ فَکَفَرَتۡ بِاَنۡعُمِ اللّٰہِ فَاَذَاقَہَا اللّٰہُ لِبَاسَ الۡجُوۡعِ وَ الۡخَوۡفِ بِمَا کَانُوۡا یَصۡنَعُوۡنَ
‘আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে আসত সবদিক থেকে প্রচুর জীবনোপকরণ। অতৎপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহসমূহ অস্বীকার করল। ফলে তারা যা করত তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের’ (সূরা আল-নাহল : ১১২)। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَیَسۡتَخۡلِفَنَّہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ کَمَا اسۡتَخۡلَفَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ ۪ وَ لَیُمَکِّنَنَّ لَہُمۡ دِیۡنَہُمُ الَّذِی ارۡتَضٰی لَہُمۡ وَ لَیُبَدِّلَنَّہُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ خَوۡفِہِمۡ اَمۡنًا ؕ یَعۡبُدُوۡنَنِیۡ لَا یُشۡرِکُوۡنَ بِیۡ شَیۡئًا ؕ وَ مَنۡ کَفَرَ بَعۡدَ ذٰلِکَ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ
‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পসন্দ করেছেন এবং ভয়ভীতির পরিবর্তে তাদেরকে অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, আমার কোন শরীক করবে না। অতঃপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারা তো সত্যত্যাগী’ (সূরা আন-নূর, : ৫৫)। সুতরাং সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় থাকলে জান-মাল ও সম্মানের সাথে জীবন-যাপনের নিশ্চয়তা অক্ষুণ্ন থাকবে।
১.২.৭. নিরাপত্তার পরিপন্থী হল কুফর ও শিরক
ঈমানের বিপরীত বিষয় হচ্ছে কুফর ও শিরক। কুফর ও শিরকে লিপ্ত হওয়া দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা এ মর্মে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে,
وَ حَآجَّہٗ قَوۡمُہٗ ؕ قَالَ اَتُحَآجُّوۡٓنِّیۡ فِی اللّٰہِ وَ قَدۡ ہَدٰىنِ ؕ وَ لَاۤ اَخَافُ مَا تُشۡرِکُوۡنَ بِہٖۤ اِلَّاۤ اَنۡ یَّشَآءَ رَبِّیۡ شَیۡئًا ؕ وَسِعَ رَبِّیۡ کُلَّ شَیۡءٍ عِلۡمًا ؕ اَفَلَا تَتَذَکَّرُوۡنَ- وَ کَیۡفَ اَخَافُ مَاۤ اَشۡرَکۡتُمۡ وَ لَا تَخَافُوۡنَ اَنَّکُمۡ اَشۡرَکۡتُمۡ بِاللّٰہِ مَا لَمۡ یُنَزِّلۡ بِہٖ عَلَیۡکُمۡ سُلۡطٰنًا ؕ فَاَیُّ الۡفَرِیۡقَیۡنِ اَحَقُّ بِالۡاَمۡنِ ۚ اِنۡ کُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ- اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ لَمۡ یَلۡبِسُوۡۤا اِیۡمَانَہُمۡ بِظُلۡمٍ اُولٰٓئِکَ لَہُمُ الۡاَمۡنُ وَ ہُمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ
‘আর তার জাতির লোকেরা তার সাথে ঝগড়া করতে থাকলে সে তাদেরকে বলল, তোমরা কি আল্লাহর ব্যাপারে আমার সাথে ঝগড়া করছ? অথচ তিনি আমাকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন! তোমরা আল্লাহর সাথে যা কিছু শরীক করছ আমি উহাকে ভয় করি না তবে যদি আমার প্রতিপালক কিছু চান, প্রতিটি বস্তু সম্পর্কে আমার প্রতিপালকের জ্ঞান খুবই ব্যাপক, এর পরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? তোমাদের মনগড়া ও বানানো শরীকদেরকে আমি কী রূপে ভয় করতে পারি? অথচ তোমরা এই ভয় করছ না যে, আল্লাহর সাথে যাদেরকে তোমরা শরীক করছ তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তোমাদের কাছে কোন দলীল প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, আমাদের দুই দলের মধ্যে কারা অধিকতর শান্তি ও নিরাপত্তা লাভের অধিকারী যদি তোমাদের জানা থাকে, তবে বল তো? প্রকৃতপক্ষে তারাই শান্তি ও নিরাপত্তার অধিকারী। যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানকে যুল্মের সাথে (শিরকের সাথে) সংমিশ্রত করেনি, তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত। (সূরা আল-আন‘আম : ৮০-৮২)।
১.২.৮ আত্মসমালোচনাই নিরাপত্তা
আল্লাহ তা‘আলার সকল নে‘মতের মত শান্তি ও নিরাপত্তার মূল্যও তখনই উপলব্ধি করা যায় যখন কিছু সময়ের জন্য জীবনের কিছু ক্ষেত্রে এই নে‘মতের সংকট দেখা দেয়। বিবাদ, বিসংবাদ ও হানাহানিতে যখন জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে, তখন শান্তি ও নিরাপত্তার মূল্য বুঝে আসে। এই ভীতি ও অশান্তির সময়গুলো যে বিষয়টির দিকে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে সেটা হলো- মুহাসাবা ও আত্মপর্যালোচনা। ভালো-মন্দ সকল অবস্থার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে মানুষের নিজের কর্ম। এ কারণে সর্বাবস্থায় আত্মপর্যালোচনা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
ظَہَرَ الۡفَسَادُ فِی الۡبَرِّ وَ الۡبَحۡرِ بِمَا کَسَبَتۡ اَیۡدِی النَّاسِ لِیُذِیۡقَہُمۡ بَعۡضَ الَّذِیۡ عَمِلُوۡا لَعَلَّہُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ
‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে; যার ফলে তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তিনি আস্বাদন করান; যেন তারা ফিরে আসে’ (সূরা আর-রূম : ৪১)। এ অশান্তির শাস্তি যেমনিভাবে ফাসাদ সৃষ্টিকারী ব্যক্তি ও সমাজ তাদের অপকর্মের জন্য ভোগ করে থাকে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে তার আগ্রাসনে পড়ে যায় জালিমদের আশ্রয় দেয়া, তাদের প্রতিবাদ ও সাধ্যানুযায়ী প্রতিরোধ না করা সমাজ ও গোষ্ঠীর লোকজনও। তাই নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ করার পাশাপাশি অসত্য, অন্যায়, প্রকাশ্য গুনাহ ও আল্লাহদ্রোহীতার বিরুদ্ধে যার যার সাধ্যানুযায়ী শান্তিপূর্ণ পন্থায় উদ্যোগ গ্রহণ করাও অপরিহার্য।
১.২.৯ মহান আল্লাহ ও আখেরাতের ভয়-ভীতির চিন্তা নিরাপত্তার কারণ
দুনিয়ার ছোট ছোট ভীতি ও শঙ্কা আখিরাতের চরম ভীতি ও শঙ্কার নিদর্শন। এগুলো আখিরাতের কঠিন মুহূর্তে শান্তি ও নিরাপত্তার মূল্য মুমিনের চিন্তায় উপস্থিত করে। কুরআন মাজীদে বারবার ক্বিয়ামত ও আখিরাতের সেই চরম ভীতির পরিস্থিতি সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছে। জাহান্নামীদের অবর্ণনীয় ভীতির যে চিত্র আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে তুলে ধরেছেন তা মুমিনের অন্তরাত্মাকে প্রকম্পিত করে তোলে। নিম্নের আয়াতগুলোতে তার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তুমি কখনো মনে করো না যে, যালিমরা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ বে-খবর, তবে তিনি তাদেরকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দেন যেদিন তাদের চক্ষু স্থির হবে। ভীতবিহবল চিত্তে আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা ছুটাছুটি করবে। নিজের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে না এবং তাদের অন্তর হবে উদাস। যেদিন তাদের শাস্তি আসবে সেদিন সম্পর্কে তুমি মানুষকে সতর্ক কর, যখন যালিমরা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে কিছুকালের জন্য অবকাশ দাও আমরা তোমার ডাকে সাড়া দিব এবং রাসূলগণের অনুসরণ করব। তোমরা কি পূর্বে শপথ করে বলতে না যে, তোমাদের পতন নাই? অথচ তোমরা বাস করতে তাদের বাসভূমিতে, যারা নিজেদের প্রতি যুল্ম করেছিল এবং তাদের প্রতি আমি কী করেছিলাম তাও তোমাদের জানা ছিল এবং তোমাদের কাছে আমি তাদের দৃষ্টান্তও উপস্থিত করেছিলাম। তারা ভীষণ চক্রান্ত করেছিল, কিন্তু তাদের চক্রান্ত আল্লাহ রহিত করেছেন, যদিও তাদের চক্রান্ত এমন ছিল, যাতে পর্বত টলে যেত। তুমি কখনো মনে করো না যে, আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের প্রতি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, দণ্ড-বিধায়ক। যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমণ্ডলীও; এবং মানুষ উপস্থিত হবে আল্লাহর সামনে যিনি এক, পরাক্রমশালী। সেইদিন তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে শৃঙ্খলিত অবস্থায়, তাদের জামা হবে আলকাতরার এবং আগুন আচ্ছন্ন করবে তাদের মুখমণ্ডল। এটা এজন্য যে, আল্লাহ প্রত্যেকের কৃতকর্মের প্রতিফল দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব করেন। এটা মানুষের জন্য এক বার্তা, যাতে এর দ্বারা সতর্ক হয় এবং জানতে পারে যে, তিনি একমাত্র ইলাহ এবং যাতে বোধশক্তি সম্পন্নরা উপদেশ গ্রহণ করে’ (সূরা ইবরাহীম : ৪২-৫২)।
ঐ চরম ভীতির মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে অভয় ও নিরাপত্তাই হবে সবচেয়ে বড় নে‘মত, যার মোকাবেলায় দুনিয়ার সকল ভোগ-উপভোগ অতি তুচ্ছ মনে হবে। এই পরম নে‘মত আল্লাহ শুধু দান করবেন তাঁর মুত্তাকী বান্দাদেরকে, যারা দুনিয়াতে আল্লাহকে ভয় করেছেন, ক্বিয়ামত ও আখিরাতের কঠিন অবস্থাকে ভয় করেছেন। আল্লাহ তাদেরকে ঐ জীবনের ভীতি থেকে নিরাপদ রাখবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ یَوۡمَ یُنۡفَخُ فِی الصُّوۡرِ فَفَزِعَ مَنۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَنۡ فِی الۡاَرۡضِ اِلَّا مَنۡ شَآءَ اللّٰہُ ؕ وَ کُلٌّ اَتَوۡہُ دٰخِرِیۡنَ- وَ تَرَی الۡجِبَالَ تَحۡسَبُہَا جَامِدَۃً وَّ ہِیَ تَمُرُّ مَرَّ السَّحَابِ ؕ صُنۡعَ اللّٰہِ الَّذِیۡۤ اَتۡقَنَ کُلَّ شَیۡءٍ ؕ اِنَّہٗ خَبِیۡرٌۢ بِمَا تَفۡعَلُوۡنَ- مَنۡ جَآءَ بِالۡحَسَنَۃِ فَلَہٗ خَیۡرٌ مِّنۡہَا ۚ وَ ہُمۡ مِّنۡ فَزَعٍ یَّوۡمَئِذٍ اٰمِنُوۡنَ-وَ مَنۡ جَآءَ بِالسَّیِّئَۃِ فَکُبَّتۡ وُجُوۡہُہُمۡ فِی النَّارِ ؕ ہَلۡ تُجۡزَوۡنَ اِلَّا مَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ
‘যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, সেদিন আকাশমণ্ডলীর ও পৃথিবীর সকলেই ভীতবিহ্বল হয়ে পড়বে, তবে আল্লাহ যাদেরকে চান তারা ব্যতিক্রম এবং সকলেই তার নিকট আসবে বিনীত অবস্থায়। তুমি পর্বতমালা দেখছ, মনে করছ, তা অচল, অথচ সেগুলো মেঘকুঞ্জের মত সঞ্চরমাণ। এটা আল্লাহরই সৃষ্টি নৈপূণ্য, যিনি সবকিছুকে করেছেন সুষম। তোমরা যা কর সে সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত। যে কেউ সৎকর্ম নিয়ে আসবে, সে তারচেয়ে উৎকৃষ্ট প্রতিফল পাবে এবং সে দিন তারা শঙ্কা হতে নিরাপদ থাকবে। যে কেউ অসৎকর্ম নিয়ে আসবে, তাকে অধোমুখে নিক্ষেপ করা হবে আগুনে এবং তাদেরকে বলা হবে ‘তোমরা যা করতে তারই প্রতিফল তোমাদেরকে দেয়া হচ্ছে’ (সূরা আন-নামল : ৮৭-৯০)।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট, গাজীপুর।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ মুসলিম, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৭৪, হাদীছ নং-৫৫; আবূ দাঊদ সুলাইমান ইবনুল আশ‘আস আস-সিজিস্তাসী, সুনানু আবী দাঊদ, ২য় খণ্ড (বৈরূত : দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, তা.বি.), পৃ. ৭০৪, হাদীছ নং-৪৯৪৪; মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ আল-খতীব আত-তিবরীজী, মিশকাতুল মাছাবীহ, ৩য় খণ্ড (বৈরূত : আল-মাকতাবুল ইসলামী, ৩য় সংস্করণ, ১৪০৫ হি.), পৃ. ৭৬, হাদীছ নং-৪৯৬৬।