শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:০২ অপরাহ্ন

সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব 

হাসিবুর রহমান বুখারী* 


(৭ম কিস্তি) 

অষ্টম চক্রান্ত

সুন্নাহ বিরোধী কুরানিস্ট বা আহলে কুরআন নামক অন্ধবিশ্বাসীরা দাবী করে যে, ‘রাসূল (ﷺ) উপস্থিত ছাহাবীদের পরিস্থিতি অনুযায়ী, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের নানান সমস্যার যে সমাধান দিতেন, আর বিভিন্ন সময় তিনি যে দিকনির্দেশনা দিতেন, সেগুলো শুধু সেই যুগের জন্যই প্রযোজ্য ছিল! বর্তমান যুগে সেগুলোর আর মান্যতা নেই! যেমন খাজা ইবাদুল্লাহ আখতার (সুন্নাহ বিরোধীদের একজন কুখ্যাত ইবলীশ, পথভ্রষ্ট আহলে কুরআনের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যে কুরআনকে কেন্দ্র করে একটি নতুন মুসলিম সমাজের ধারণা দিয়েছিল) বলেছে, জেনে রাখো! রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্য নির্ধারিত ছিল তাঁর যুগের সঙ্গে! তাঁর আদেশ, নিষেধ ও অন্যান্য বিধি-বিধান তাঁর মৃত্যুর সঙ্গেই সমাপ্ত হয়েছে! তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে এগুলোর দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে!’ নাউযুবিল্লাহ্![১] এই চক্রান্ত ও অপব্যাখ্যার ব্যাখ্যা করে অপর একজন সুন্নাহ বিরোধী কুখ্যাত ইবলীশ ‘হাশমত আলী খালীফা আব্দুল্লাহ বলেছে, নিশ্চয় রাসূল (ﷺ)-এর দিকনির্দেশনা গুলো ছাহাবীদের সমস্যার সমাধান স্বরূপ আবির্ভূত হত! যদি আমরাও সেই যুগে উপস্থিত থাকতাম, তাহলে আমাদের উপরেও তাঁর কথাগুলো ও উপদেশগুলো মানা অপরিহার্য হত।... এবং যেমন কুরআনের বাণীগুলো সর্বযুগের ও সর্বসাধারণের জন্য, যদিও হাদীছের বাণীগুলো নির্দিষ্ট উম্মাতের জন্য, আর তারা হল- আরব জাতি।[২]

জবাব

সুন্নাহ হল- একটি স্থায়ী আইন ব্যবস্থা, যা একটি প্রয়োজনীয় উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে, যা কোন অস্থায়ী পরিস্থিতির দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। প্রথমেই আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরতে চাই, তা হল- প্রতিটি মুসলিম বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহ ক্বিয়ামত পর্যন্ত চিরন্তন ও সর্বকালীন প্রযোজ্য এবং একটি স্থায়ী আইন ব্যবস্থা এবং কোন মানুষেরই এটি পরিবর্তন করার ক্ষমতা নেই। উছূলে ফিক্বহের পণ্ডিতরা বলেন যে, শরী‘আত এসেছে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জন এবং ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য, আর সুন্নাহ সেই শরী‘আতের অন্তর্ভুক্ত। যার মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে এই শারঈ আইনের উদ্দেশ্য অর্জিত হয়।[৩]

‘উম্মুল কুরা’ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাইখ খাদিম হুসাইন ইলাহী বাখশ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘কুরআনুল কারীম বর্ণনা করেছে যে, তার দাওয়াত চিরন্তন, সর্বকালীন ও সর্বসাধারণের জন্য হিদায়াত স্বরূপ। অবতীর্ণের ধারাবাহিকতা সমাপ্তির কারণে কিংবা যার উপরে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে তাঁর মৃত্যুর কারণে কুরআনের বিধানের প্রযোজ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার সমাপ্তি ঘটেনি। বরং তার উপদেশ সর্বপ্রকার দায়িত্বশীলের প্রতি এবং সমগ্র মানবজাতির প্রতি ভারার্পণ করা হয়েছে। এতে আরব ও অনারব সবাই অন্তর্ভুক্ত। যদিও কুরআনের অসংখ্য আয়াত বিশেষভাবে আরবের মুশরিকদের উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ করা হয়েছে, যারা তার দাওয়াত ও তাবলীগের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত। সুতরাং তাদের নিজস্ব আচরণ অনুসারে তাদের সম্পর্কে বিধান বা রায় দেয়া হয়েছে, কিন্তু ঐ সমস্ত রায় বা বিধানগুলো শুধু ঐ সকল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা তাদের সীমানা অতিক্রম করে, তাদের মতই যাদের বক্র আচরণ তাদের প্রতিও প্রযোজ্য। এর পাশাপাশি কুরআন আরব সমাজের বহু অপরাধ, যেমন শিরক, মূর্তিপূজা, আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য মানত করা ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করেছে এবং সেগুলোকে নিন্দা করেছে। আর এটা বলা ঠিক নয় যে, সেই নিন্দা শুধু ওই মুশরিকদের সম্পর্কেই এসেছে, তাই তা কেবল তাদের জন্যই প্রযোজ্য! বরং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে যারাই এরূপ অপরাধে জড়িত হবে এবং যারাই তাদের মত কাজ করবে, তাদের জন্য প্রযোজ্য। আসল শিক্ষণীয় বিষয় হল- শব্দের সার্বজনীনতা, কোন নির্দিষ্ট কারণ নয়। তাই সেই আয়াতগুলোর বিধান ঐ মুশরিকদের সীমা অতিক্রম করে তাদের পরবর্তীদের প্রতিও প্রযোজ্য হয়, সময়ের কোন সীমা বা নির্দিষ্ট সম্বোধনের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, কুরআনের আয়াতের বিধান কোন নির্দিষ্ট যুগ বা সীমিত কয়েকজন ব্যক্তির সাথে সীমাবদ্ধ নয়।

সুতরাং সুন্নাহও একই রকম। কারণ কিতাবের বিধান ও সুন্নাহর বিধানের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, যেহেতু দু’টি-ই এক উৎস থেকে এসেছে। যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। (দ্বিতীয় চক্রান্তের জবাবে)। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলার উপর ঈমান আনয়নের সঙ্গে সঙ্গে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর ঈমান আনা হল- ঈমান ও কুফরের মধ্যে সীমারেখা। সুতরাং যদি তাঁর সুন্নাহ কেবল তাঁর যুগের ব্যক্তিদের জন্যই সীমাবদ্ধ হত, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ কী হত? তা কি শুধু মুখের কথায়, কর্ম ছাড়া? না-কি শুধুই দাবিতে, বাস্তব প্রয়োগ ছাড়া? অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ۠ يُحْبِبْكُمُ اللّٰهُ وَ يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ١ؕ وَ اللّٰهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ

‘(হে নবী!) আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আলে ইমরান : ৩১)।

যারা আল্লাহকে ভালোবাসার দাবীদার এবং আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার আকাক্সক্ষী, আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা স্বীয় ভালোবাসার মাপকাঠি তাদের বলে দিয়েছেন। অর্থাৎ জগতে যদি কেউ আল্লাহর ভালোবাসার দাবী করে, তাহলে মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে অনুসরণের কষ্টিপাথরে তা যাচাই করে দেখা অত্যাবশ্যকীয়। এতে আসল ও মেকী ধরা পড়ে যাবে। যার দাবী যতটুকু সত্য হবে, সে রাসূল (ﷺ)-এর অনুসরণে ততটুকু যত্নবান হবে এবং তাঁর শিক্ষার জ্যোতিকে পথের মশালরূপে গ্রহণ করবে। পক্ষান্তরে যার দাবী দুর্বল হবে, রাসূল (ﷺ)-এর  অনুসরণে তার দুর্বলতা সেই পরিমাণে পরিলক্ষিত হবে। ভালোবাসা অনুসারে মানুষের হাশরও হবে। হাদীছে এসেছে, আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল (ﷺ)-কে ক্বিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময়কাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন, ‘তুমি তার জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ? লোকটি বলল, আমি এর জন্য অনেক বেশি ছালাত, ছিয়াম এবং ছাদাক্বাহ আদায় করতে পারিনি। কিন্তু আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি। রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি যাকে ভালোবাস তার সাথেই তোমার ক্বিয়ামত হবে’।[৪]

প্রথমতঃ ইয়াহুদী এবং খ্রিষ্টানদের মত আহলে কুরআনরাও দাবী করে যে, আমরা শুধু আল্লাহ তা’আলাকে ভালোবাসি এবং মহান আল্লাহও আমাদেরকে ভালোবাসেন। মহান আল্লাহ বললেন, কেবল মৌখিক দাবী এবং মনগড়া পদ্ধতিতে আল্লাহর ভালোবাসা এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করা যায় না। এ সব লাভ করার পথ তো একটাই। আর তা হল- শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর ঈমান আনা এবং তাঁর অনুসরণ করা। এই আয়াতে সমস্ত ভালোবাসার দাবীদারদের জন্য একটি পথই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অতএব আল্লাহর ভালোবাসার অনুসন্ধানী যদি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর অনুসরণের মাধ্যমে তা অনুসন্ধান করে, তাহলে অবশ্যই সে সফল হবে এবং স্বীয় দাবীতে সত্য প্রমাণিত হবে। অন্যথা সে মিথ্যুক হবে এবং উদ্দেশ্য হাসিলেও ব্যর্থ হবে। নবী করীম (ﷺ)-এর উক্তি হল-

مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ. وفي روايةٍ‏ مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ.‏

‘কেউ আমাদের এই দ্বীনের অংশ নয় এমন কিছু উদ্ভাবন করলে বা অনুপ্রবেশ ঘটালে তা পরিত্যাজ্য-প্রত্যাখ্যাত। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ধর্মীয় কাজের মধ্যে এমন বিষয় উদ্ভাবন করে যা তাতে নেই (অর্থাৎ দলীলবিহীন) তা অগ্রহণযোগ্য’।[৫] তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা (দ্বীনের মধ্যে) নব প্রচলিত বিষয়সমূহ থেকে সতর্ক থাকো। কেননা প্রত্যেক নব আবিষ্কৃত বিষয় বিদ‘আত এবং প্রত্যেক বিদ‘আত ভ্রষ্টতা’।[৬] অন্যত্র রাসূল (ﷺ) বলেছেন,

فَمَنْ أَحْدَثَ فِيْهَا حَدَثًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ، لَا يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُ صَرْفًا وَلَا عَدْلًا وَإِذَا فِيْهِ

‘যে কেউ দ্বীনের ব্যাপারে বিদ‘আত উদ্ভাবণ করে কিংবা কোন বিদ‘আতীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ তা‘আলা, ফেরেশতাগণের ও সকল মানুষের লা’নত ও অভিসম্পাত। তার কোন ফরয কিংবা নফল ‘ইবাদত গৃহীত হবে না’।[৭]

দ্বিতীয়তঃ এখানে বলা হয়েছে যে, রাসূল (ﷺ)-এর অনুসরণ করার কারণে কেবল তোমাদের পাপই ক্ষমা করা হবে না, বরং তোমরা আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র হয়ে যাবে। আর কোন মানুষের আল্লাহর নিকট প্রিয়পাত্র হয়ে যাওয়া যে অতীব উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়া তাতে কোন সন্দেহ নেই। সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্যানুযায়ী, কুরআন ও সুন্নাহর বিধানসমূহ সর্বকালের ও সর্বস্তরের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। এগুলো কোন একটি যুগ বা জাতির জন্য সীমাবদ্ধ নয়। কারণ, স্বয়ং কুরআন নিজে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাত, দাওয়াত, আদেশ ও নিষেধও শুধু তাঁর যুগের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাঁর সুন্নাত আরব, অনারব তথা সমগ্র মানবজাতির জন্য এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত সকল যুগের জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ مَاۤ اَرْسَلْنٰكَ اِلَّا كَآفَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيْرًا وَّ نَذِيْرًا وَّ لٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ

‘আমরা তো আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না’ (সূরা ছাবা : ২৮)।

আলোচ্য আয়াতে সুস্পষ্টরূপে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (ﷺ)-কে কেবল তাঁর নিজের দেশ বা যুগের জন্য নয় বরং ক্বিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতির জন্য পাঠানো হয়েছে। একথা কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,

قُلْ اَيُّ شَيْءٍ اَكْبَرُ شَهَادَةً١ؕ قُلِ اللّٰهُ١ۙ۫ شَهِيْدٌۢ بَيْنِيْ وَ بَيْنَكُمْ١۫ وَ اُوْحِيَ اِلَيَّ هٰذَا الْقُرْاٰنُ لِاُنْذِرَكُمْ بِهٖ وَ مَنْۢ بَلَغَ

‘(হে নবী!) আপনি বলুন, সাক্ষী হিসাবে কোন্ জিনিস সর্বশ্রেষ্ঠ? আপনি বলুন, আল্লাহ। (তিনিই) আমার ও তোমাদের মধ্যে (শ্রেষ্ঠ) সাক্ষী। আর এই কুরআন আমার নিকট প্রেরিত হয়েছে, যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট এটি পৌঁছবে তাদেরকে এ দ্বারা আমি সতর্ক করি...’ (সূরা আল-আন‘আম : ১৯)। আল্লাহ তা‘আলা নবী (ﷺ)-এর সর্বজনীন রাসূল হওয়ার ব্যাপারে বলেছেন, قُلْ يٰۤاَيُّهَا النَّاسُ اِنِّيْ رَسُوْلُ اللّٰهِ اِلَيْكُمْ جَمِيْعَا ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে (প্রেরিত) রাসূল’ (সূরা আল-আ’রাফ : ১৫৮)। ‘আর হে নবী! আমি পাঠিয়েছি আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিকুলের জন্যই রহমত হিসাবে’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ১০৭)। অন্যত্র তিনি বলেন,

تَبٰرَكَ الَّذِيْ نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلٰى عَبْدِهٖ لِيَكُوْنَ لِلْعٰلَمِيْنَ نَذِيْرَاۙ

‘কত প্রাচুর্যময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরক্বান (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে’ (সূরা আল-ফুরক্বান : ১)। নবী (ﷺ) নিজেও এই একই বক্তব্য বিভিন্ন হাদীছে বিভিন্নভাবে পেশ করেছেন। যেমন জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন,

أُعْطِيْتُ خَمْسًا لَمْ يُعْطَهُنَّ أَحَدٌ قَبْلِيْ نُصِرْتُ بِالرُّعْبِ مَسِيْرَةَ شَهْرٍ، وَجُعِلَتْ لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُوْرًا، فَأَيُّمَا رَجُلٍ مِنْ أُمَّتِيْ أَدْرَكَتْهُ الصَّلَاةُ فَلْيُصَلِّ، وَأُحِلَّتْ لِيَ الْمَغَانِمُ وَلَمْ تَحِلَّ لأَحَدٍ قَبْلِي، وَأُعْطِيْتُ الشَّفَاعَةَ، وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً، وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةً.‏‏

‘আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দান করা হয়েছে, যা আমার পুর্বে কাউকেও দান করা হয়নি। (১) আমাকে এমন প্রভাব দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে যে, একমাস দূরত্বেও তা প্রতিফলিত হয়। (২) সমস্ত ভূপৃষ্ঠ আমার জন্য পবিত্র ও ছালাত আদায়ের উপযোগী করা হয়েছে। কাজেই আমার উম্মতের যে কোন লোক ওয়াক্ত হলেই ছালাত আদায় করতে পারবে। (৩) আমার জন্য গনীমাতের মাল হালাল করে দেয়া হয়েছে, যা আমার পূর্বে আর কারো জন্য হালাল করা হয়নি। (৪) আমাকে শাফা’আতের অধিকার দেয়া হয়েছে। (৫) সমস্ত নবী কেবল তাঁদের সম্প্রদায়ের জন্য প্রেরিত হতেন, আর আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য’।[৮] অন্য বর্ণনায় এসেছে, كَانَ كُلُّ نَبِيٍّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً وَبُعِثْتُ إِلَى كُلِّ أَحْمَرَ وَأَسْوَدَ ‘প্রত্যেক নবীকে শুধু তাঁর জাতির জন্য পাঠানো হত। কিন্তু আমাকে সাদা ও কালো সবার জন্য নবী করে পাঠানো হয়েছে’।[৯] লাল ও কালো থেকে অনেকে জ্বীন ও মানুষ উদ্দেশ্য নিয়েছেন, আবার অনেকে আরবী ও অনারবী উদ্দেশ্য নিয়েছেন। ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘উভয় অর্থই সঠিক’। সাহল ইবনু সা‘দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ بِإِصْبَعَيْهِ هَكَذَا بِالْوُسْطَى وَالَّتِيْ تَلِي الإِبْهَامَ بُعِثْتُ وَالسَّاعَةُ كَهَاتَيْنِ

‘আমি দেখেছি, রাসূল (ﷺ) তাঁর মধ্যমা ও বুড়ো আঙ্গুলের নিকটবর্তী অঙ্গুলিদ্বয় এভাবে একত্র করে বললেন, ক্বিয়ামত ও আমাকে এমনিভাবে পাশাপাশি পাঠানো হয়েছে’।[১০] অনুরূপভাবে মহান আল্লাহ অধিকাংশ মানুষের অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার কথাও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘তুমি যতই আগ্রহী হও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করবার নয়’ (সূরা ইউসুফ : ১০৩)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল, তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করে দেবে’ (সূরা আল-আন‘আম : ১১৬)। মোটকথা বিপথগামীদের সংখ্যাই বেশি।[১১]

উপরিউক্ত আলোচনার ভিত্তিতে প্রতীয়মান হয় যে, (ক) মানবতার শিক্ষক, স্রষ্টার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করা ও তাঁকে সত্যায়ন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। আর ঈমানের মূল হচ্ছে, তিনি যা নিয়ে এসেছেন, তা অকাট্যভাবে সত্যায়ন করা, তিনি যা সংবাদ দিয়েছেন তা বিশ্বাস করা, পূর্ববর্তী জাতি ও ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে এমন গায়িব সম্পর্কে তিনি যে সকল খবর দিয়েছেন সেগুলোর সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত বিশ্বাস পোষণ করা। কারণ তিনি যা বলেছেন সবই অহী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوٰى ؕ۰۰۳ اِنْ هُوَ اِلَّا وَحْيٌ يُّوْحٰى ‘আর তিনি মনগড়া কোন কথা বলেন না। তা তো অহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়’ (সূরা আন-নাজম : ৩-৪)। আনাস বিন মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) ওযূ করার সময় হাতে এক অঞ্জলি পানি নিতেন। অতঃপর ঐ পানি থুতনির নিচে প্রবেশ করাতেন এবং তার দ্বারা নিজের দাড়ি খিলাল করতেন এবং বলতেন, هَكَذَا أَمَرَنِي رَبِّي عَزَّ وَجَلّ ‘আমার মহান প্রতিপালক আমাকে এরূপ করারই নির্দেশ দিয়েছেন’।[১২]

সুতরাং সেগুলোর প্রতি আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে সাথে মৌখিক স্বীকৃতিও প্রদান করতে হবে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নবী করীম (ﷺ) আনীত বিষয়গুলোকে স্বীকৃতি প্রদান করবে। আর এটাই হচ্ছে শাহাদাতাইন (অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল)-এর প্রকৃত তাৎপর্য। সুতরাং যে ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, তিনি আল্লাহর রাসূল, তখন সে এ সত্যায়নও করবে যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সংবাদ দিয়েছেন তা সত্য। কেননা এটাই হল- রিসালাতের প্রতি সাক্ষ্যদানের তাৎপর্য। এই নিশ্চিত বিশ্বাসের প্রতি আহ্বান করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اٰمِنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِهٖ وَ اَنْفِقُوْا مِمَّا جَعَلَكُمْ مُّسْتَخْلَفِيْنَ فِيْهِ١ؕ فَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْ وَ اَنْفَقُوْا لَهُمْ اَجْرٌ كَبِيْرٌ۰۰۷ وَ مَا لَكُمْ لَا تُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ١ۚ وَ الرَّسُوْلُ يَدْعُوْكُمْ لِتُؤْمِنُوْا بِرَبِّكُمْ وَ قَدْ اَخَذَ مِيْثَاقَكُمْ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ

‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন তা হতে ব্যয় কর। তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে ও ব্যয় করে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। তোমাদের কী হল যে, তোমরা আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন কর না? অথচ রাসূল তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে আহ্বান করছে এবং তিনি (আল্লাহ) তোমাদের নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন; তোমরা যদি বিশ্বাসী হও’ (সূরা আল-হাদীদ  : ৭-৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, فَاٰمِنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِهٖ وَ النُّوْرِ الَّذِيْۤ اَنْزَلْنَا١ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِيْرٌ ‘অতএব তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এবং আমরা যে নূর (ক্বুরআন) অবতীর্ণ করেছি তার প্রতি ঈমান আনয়ন কর। আর তোমরা যে আমল করছ আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত’ (সূরা আত-তাগাবুন :  ৮)। অন্যত্র তিনি বলেন,

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اٰمِنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِهٖ وَ الْكِتٰبِ الَّذِيْ نَزَّلَ عَلٰى رَسُوْلِهٖ وَ الْكِتٰبِ الَّذِيْۤ اَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ١ؕ وَ مَنْ يَّكْفُرْ بِاللّٰهِ وَ مَلٰٓىِٕكَتِهٖ وَ كُتُبِهٖ وَ رُسُلِهٖ وَ الْيَوْمِ الْاٰخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بَعِيْدًا

‘হে মুমিনগণ! তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি এবং সেই কিতাবের প্রতি যা তিনি তাঁর রাসূলের উপর নাযিল করেছেন এবং সেই কিতাবের প্রতি যা তিনি ইতিপূর্বে নাযিল করেছেন। আর যে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং শেষ দিনকে অস্বীকার করবে, সে সুদূর বিভ্রান্তিতে পতিত হল’ (সূরা আন-নিসা : ১৩৬)। রাসূল (ﷺ)-এর উপরে ঈমান না আনার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। আবূ হুরাইরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। রাসূল (ﷺ) বলেন,

وَالَّذِىْ نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا يَسْمَعُ بِىْ أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُوْدِىٌّ وَلَا نَصْرَانِىٌّ ثُمَّ يَمُوْتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِى أُرْسِلْتُ بِهِ إِلَّا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ

‘সে সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ রয়েছে! ইয়াহুদী হোক কিংবা খ্রিস্টান হোক, যে ব্যক্তিই আমার এ রিসালাতের খবর শুনেছে অথচ আমার রিসালাতের উপর ঈমান না এনে মৃত্যুবরণ করবে, অবশ্যই সে জাহান্নামী হবে’।[১৩]

(খ) অনুরূপভাবে তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। যাবতীয় কথা-কর্মে রাসূল (ﷺ)-এর অনুসরণ করতে হবে এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশনা মোতাবেক চলতে হবে। তাঁরই অনুসরণে জীবন গড়তে হবে। রাসূল (ﷺ)-এর অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اَطِيْعُوا اللّٰهَ وَ اَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَ اُولِي الْاَمْرِ مِنْكُمْ١ۚ فَاِنْ تَنَازَعْتُمْ فِيْ شَيْءٍ فَرُدُّوْهُ اِلَى اللّٰهِ وَ الرَّسُوْلِ اِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَ الْيَوْمِ الْاٰخِرِ١ؕ ذٰلِكَ خَيْرٌ وَّ اَحْسَنُ تَاْوِيْلًاؒ.

‘হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে কোন মতবিরোধ হয়, তাহলে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তিত হও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে থাক। এটাই উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর’ (সূরা আন-নিসা : ৫৯)। অন্যত্র তিনি বলেন,

قُلْ اَطِيْعُوا اللّٰهَ وَ اَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ١ۚ فَاِنْ تَوَلَّوْا فَاِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَ عَلَيْكُمْ مَّا حُمِّلْتُمْ١ؕ وَ اِنْ تُطِيْعُوْهُ تَهْتَدُوْا١ؕ وَ مَا عَلَى الرَّسُوْلِ اِلَّا الْبَلٰغُ الْمُبِيْنُ

‘(হে নবী!) আপনি বলুন, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর’। তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে সে শুধু তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী। আর যদি তোমরা তার আনুগত্য কর তবে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর রাসূলের দায়িত্বতো শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া’ (সূরা আন-নূর : ৫৪)। আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। রাসূল (ﷺ) বলেন,

كُلُّ أُمَّتِىْ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ، إِلَّا مَنْ أَبَى. قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَنْ يَأْبَى قَالَ مَنْ أَطَاعَنِىْ دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِىْ فَقَدْ أَبَى

‘আমার সকল উম্মাত-ই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করবে। তারা বললেন, কে অস্বীকার করবে? তিনি বললেন, যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে’।[১৪]

(গ) স্বীয় ঈমান বাঁচাতে রাসূল (ﷺ) কর্তৃক সমস্ত আদেশ একবাক্যে স্বীকার করতে হবে এবং সমস্ত নিষিদ্ধ বিষয় পরিহার করতে হবে। রাসূল (ﷺ) যা আদেশ করেছেন তা মেনে চলা এবং যা নিষেধ করেছেন তা পরিহার করা আবশ্যক। কারণ তাঁর যাবতীয় আদেশ প্রতিপালন এবং তাঁর নিষেধ পরিত্যাগ করা সকল মানুষের উপরে ফরয করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ مَاۤ اٰتٰىكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ١ۗ وَ مَا نَهٰىكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا١ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ١ؕ اِنَّ اللّٰهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِۘ

‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে অত্যধিক কঠোর’ (সূরা আল-হাশর : ৭)। অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা বলেন,

وَ مَنْ يُّشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْۢ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدٰى وَ يَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِيْنَ نُوَلِّهٖ مَا تَوَلّٰى وَ نُصْلِهٖ جَهَنَّمَ١ؕ وَ سَآءَتْ مَصِيْرًاؒ

‘আর কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস’ (সূরা আন-নিসা : ১১৫)।

রাসূল (ﷺ)-এর আদেশ ও নিষেধ না মেনে তাঁর বিরোধিতা করলে পরকালে কঠিন শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন,

فَلْيَحْذَرِ الَّذِيْنَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ اَمْرِهٖۤ اَنْ تُصِيْبَهُمْ فِتْنَةٌ اَوْ يُصِيْبَهُمْ عَذَابٌ اَلِيْمٌ

‘সুতরাং যারা তার (রাসূলের) আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় অথবা কঠিন শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে’ (সূরা আন-নূর : ৬৩)।

এটি প্রমাণ করে যে, সুন্নাত ক্বিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর পথনির্দেশক। সুন্নাত চিরন্তন ও সর্বকালীন। ছাহাবায়ে কিরামগণ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাতকে শুধু তাঁদের জীবনের জন্য সীমাবদ্ধ মনে করেননি, বরং তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছেন এবং সর্বযুগে তা পালনের তাকীদ দিয়েছেন। 

(ইনশাআল্লাহ চলবে)

* মুর্শিদাবাদ, ভারত।

তথ্যসূত্র :
[১]. ১৯৫১ সালের আগস্ট মাসের ‘মাজাল্লাতুল বায়ান’, পৃ. ৩২; ১৯২৯ সালের আগস্ট মাসের ‘মাজাল্লাহ বালাগ’, বিষয়বস্তু ছিল- কুরআন ও হাদীছ।
[২]. তাবলীগুল কুরআন, পৃ. ৫।
[৩]. আস-সুন্নাতু তাশরীউন লাযিমুন ওয়া দায়িমুন, পৃ. ৯৩-৯৪।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৬৭-৬১৭১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪১।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮; আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৬; ইবনে মাজাহ, হা/১৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৯২৯, ২৪৬০৪, ২৪৯৪৪, ২৫৫০২, ২৫৬৫৯, ২৫৭৯৭।
[৬]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; তিরমিযী, হা/২৬৭৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৪৫;  ছহীহুল জামি‘, হা/২৫৪৯।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৭০, ৩১৭২, ৩১৭৯, ৬৭৫৫, ৭৩০০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৭০; আবূ দাঊদ, হা/২০৩৪।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৫, ৪৩৮, ৩১২২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪২৬৮।
[৯]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫২১।
[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৯৩৬, ৫৩০১, ৬৫০৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৫০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৮৬০।
[১১]. ফিরক্বাতু আহলিল কুরআন বি-বাকিস্তান ওয়া মাওক্বিফুল ইসলাম মিনহা, পৃ. ২৩১-২৩২।
[১২]. আবূ দাঊদ, হা/১৪৫; সুনানুল কুবরা লিল বাইহাক্বী, ১/৫৪; হাকিম, ১/১৪৯; ইরওয়াউল গালীল, ১/১৩০ পৃ.।
[১৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৩; ছহীহুল জামি‘, হা/৭০৬৩।
[১৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৭২৮০।





প্রসঙ্গসমূহ »: ভ্রান্ত মতবাদ
দু‘আ ও যিকর : আল্লাহর অনুগ্রহ ও প্রশান্তি লাভের মাধ্যম - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
মাযহাবী গোঁড়ামি ও তার কুপ্রভাব (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : রিদওয়ান ওবাইদ
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (১৪তম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইসলামী উত্তরাধিকার আইন: উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ ধারা - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
ইসলামে দারিদ্র্য বিমোচনের কৌশল (২য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ইসলামী সংগঠন ও তরুণ-যুবক-ছাত্র - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায় (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
তারুণ্যের উপর সন্ত্রাসবাদের হিংস্র ছোবল : প্রতিকারের উপায় (শেষ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
সালাফী মানহাজের মূলনীতিসমূহ (২য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
আল-উরওয়াতুল উছক্বা - অনুবাদ : ইউনুস বিন আহসান
মুসলিম উম্মাহর বিভ্রান্তির কারণ ও উত্তররেণর উপায় - হাসিবুর রহমান বুখারী
তওবার গুরুত্ব ও ফযীলত - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ