বৃহস্পতিবার, ১১ Jun ২০২৬, ১২:২৬ পূর্বাহ্ন

নববী গৃহ : প্রতিটি মুসলিম পরিবারের জন্য এক উত্তম আদর্শ 

- মূল : শায়খ ড. মুরাদ বিন কারামত বিন সাঈদ বাখেরীসাহ 
- অনুবাদ : মাহফুজুর রহমান বিন আব্দুস সাত্তার* 



প্রশংসা মাত্রই আল্লাহ তা‘আলার, যিনি বিবাহকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি বানিয়েছেন, আর দম্পতির মাঝে দিয়েছেন ভালোবাসা ও দয়া। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য কোন ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তাঁর প্রতি, তাঁর পরিবার পরিজন ও পবিত্রতম স্ত্রীগণের প্রতি অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন।*

পরকথা, হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমি আমার নিজেকে ও আপনাদেরকে তাক্বওয়ার উপদেশ দিচ্ছি। কারণ তাক্বওয়াই হলো, প্রথম ও শেষ যুগের মানুষের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার উপদেশ। মহান আল্লাহ বলেন, وَ لَقَدۡ وَصَّیۡنَا الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ وَ اِیَّاکُمۡ اَنِ اتَّقُوا اللّٰہَ ‘আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর’ (সূরা আন-নিসা : ১৩১)।

আজকের আলোচনার বিষয় হল, নববী গৃহ : মুসলিম পরিবারের জন্য এক উত্তম আদর্শ। এ আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, আমরা যেন ঘরোয়া জীবনে নবী (ﷺ)-এর বাস্তব শিক্ষালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি। কারণ আদর্শ কেবল জিহাদের ময়দানে বা মসজিদের মেহরাব কিংবা জ্ঞানচক্রের আসরেই সীমাবদ্ধ নয়; আদর্শ গড়ে ওঠে ঘরেও, যেখানে মানুষ প্রকৃত অর্থে নিজের রূপ প্রকাশ করে।

উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) নবী (ﷺ)-এর চরিত্র এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, كان خلقه القرآن ‘তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন’। অর্থাৎ তিনি ছিলেন পরিবারের প্রতি সর্বাধিক কোমল, সর্বাধিক উত্তম সঙ্গী, সর্বাধিক বিশ্বস্ত স্বামী।

নবী (ﷺ)-এর আচার-আচরণে ছিল কোমলতা ও দয়া, ছিল ভালোবাসা। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম, আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে উত্তম’। তিনি ছিলেন না রূঢ় বা কঠোর। তিনি স্ত্রীদের সঙ্গে হাস্য-পরিহাস করতেন, তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করতেন, আয়িশার সাথে পথে দৌড় প্রতিযোগিতাও করতেন। আজকের জীবনে নানা চাপ-ঝড়ের মাঝেও স্বামীদের উচিত, এই সুন্নাহ স্মরণ রাখা, ঘরকে সংঘাতের ময়দান না বানিয়ে পবিত্র সুন্নাহয় জীবিত করে রাখা। দয়া ও মমতার এক মরূদ্যানে রুপান্তর করা।

তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। রাতযাপন, খোরপোষের ক্ষেত্রে তিনি সব স্ত্রীদের মাঝে আদল বজায় রাখতেন। অর্থাৎ তিনি বাহ্যিক বিষয়গুলোতে তাদের মাঝে ইনসাফ করতেন, আর অন্তরের কোন দিকে ধাবিত হয়ে যাওয়ার জন্য ক্ষমা চাইতেন। অথচ আমাদের যুগে কত ঘর ভেঙে যায় অন্যায় আচরণ, স্ত্রীর অধিকার খর্ব, কিংবা সন্তানদের মধ্যে বৈষম্যের কারণে।

তাছাড়া নবী (ﷺ) স্ত্রীদের সাথে পরামর্শ করতেন। হুদায়বিয়ার সন্ধিতে তিনি উম্মু সালামার পরামর্শ গ্রহণ করেন, আর তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শেই কঠিন অবস্থা কাটিয়ে ওঠেন। এটি শিক্ষা দেয় যে, নারী অবহেলা করার কেউ নয়, বরং জীবন-ব্যবস্থাপনায় তিনি এক অংশীদার।

নবী (ﷺ) কখনো পারিবারিক দ্বন্দ্বকে কঠোরতা দিয়ে সমাধান করতেন না, বরং প্রজ্ঞা ও মমতা দিয়ে সমাধান করতেন। যখন তাঁর স্ত্রীগণ অধিক ভরণ-পোষণ দাবি করেন, তখন তিনি রাগান্বিত শাসকের মতো ক্ষুব্ধ হননি, বরং এক মাস তাদের থেকে দূরে থাকেন, শিক্ষা দেন কোমল শাসনের। পরে তিনি তাঁদেরকে বেছে নেয়ার সুযোগ দেন,

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ  قُلۡ  لِّاَزۡوَاجِکَ اِنۡ  کُنۡـتُنَّ تُرِدۡنَ  الۡحَیٰوۃَ  الدُّنۡیَا وَ زِیۡنَتَہَا فَتَعَالَیۡنَ اُمَتِّعۡکُنَّ وَ اُسَرِّحۡکُنَّ سَرَاحًا جَمِیۡلًا  . وَ اِنۡ کُنۡـتُنَّ تُرِدۡنَ اللّٰہَ  وَ رَسُوۡلَہٗ وَ الدَّارَ الۡاٰخِرَۃَ  فَاِنَّ اللّٰہَ  اَعَدَّ لِلۡمُحۡسِنٰتِ مِنۡکُنَّ  اَجۡرًا عَظِیۡمًا

‘হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের বল, ‘তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ ও তার বিলাসিতা কামনা কর, তাহলে এস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দিই এবং সৌজন্যের সাথে তোমাদেরকে বিদায় দিই। পক্ষান্তরে তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং পরকাল কামনা করলে, তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীলা আল্লাহ তাদের জন্য মহা প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন’ (সূরা আল-আহযাব : ২৮-২৯)।

তিনি ছিলেন অতুলনীয় বিশ্বস্ত স্বামী। স্ত্রীদের জীবিত অবস্থায়ও, মৃত্যুর পরও তিনি তাদের ইচ্ছে পূর্ণ করেছেন।  খাদীজাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) সম্পর্কে তিনি সর্বদা ভালো কথা বলতেন, তাঁর বান্ধবীদেরকে সম্মান করতেন, বলতেন, ‘আমি তাঁর ভালোবাসায় ধন্য হয়েছি’।

একবার আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, এক বৃদ্ধা নবীর কাছে এলেন। নবী (ﷺ) বললেন, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জুছামাহ মুযানিয়্যাহ। নবী (ﷺ) বললেন, না, বরং আপনি তো হাসানাহ মুযানিয়্যাহ। কেমন আছেন আপনারা? আমাদের পর আপনাদের অবস্থা কেমন? তিনি বললেন, ভালো আছি, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক। তিনি বেরিয়ে গেলে আয়িশা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি এ বৃদ্ধাকে এত সম্মান দিলেন কেন? নবী (ﷺ) বললেন, ‘তিনি খাদীজাহর সময়ে আমাদের কাছে আসতেন। আর অঙ্গীকার রক্ষা ঈমানের অংশ।

আহ! কী অনন্য বিশ্বস্ততা! অথচ আমাদের যুগে দেখা যায়, সামান্য মনোমালিন্যের কারণে কিছু স্বামী তাদের স্ত্রীদের প্রতি সৌজন্যতাই ভুলে যায়।

বর্তমান যুগে এ নববী মডেল আমাদের খুবই প্রয়োজন, যাতে পরিবার গঠনে আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আদর্শ হিসেবে মেনে চলতে পারি। মহান আল্লাহ বলেন, لَقَدۡ کَانَ لَکُمۡ  فِیۡ رَسُوۡلِ اللّٰہِ  اُسۡوَۃٌ حَسَنَۃٌ ‘তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে’ (সূরা আল-আহযাব : ২১)।

আজ আমাদের ঘরগুলো ভুগছে বিবাহ-বিচ্ছেদ ও দাম্পত্য বিরোধের মহামারীতে। আর এর নির্মম মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের সন্তানদের, তাদের শৈশব, তাদের মানসিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ যদি আমরা নববী গৃহের দিকে ফিরে তাকাই, পেয়ে যাব ওষুধ, ভালোবাসা ও দয়া, পারস্পরিক সম্মান, ন্যায় ও সুবিচার, ধৈর্য, দু‘আ ও ইস্তিগফার। নবী (ﷺ) ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি এড়িয়ে যেতেন। তিনি বলেছেন, কোনো মুমিন পুরুষ যেন তার স্ত্রীকে ঘৃণা না করে। যদি কোনো গুণ তার পছন্দ না হয়, তবে অন্য গুণে নিশ্চয়ই সে সন্তুষ্ট হবে’।

অতএব দাম্পত্য জীবন নিখুঁত পরিপূর্ণতার উপর দাঁড়ায় না, বরং কিছু উপেক্ষা আর ইতিবাচক দিক খুঁজে পাওয়ার উপর দাঁড়ায়। কিন্তু আমাদের সময়ে দেখা যায়, অনেক স্বামী কিংবা স্ত্রী ভুলত্রুটি খুঁজতে খুঁজতে সেগুলোকে বড় করে তোলে, ফলে ঘর পরিণত হয় কলহ ও অশান্তির ময়দানে।

নবী (ﷺ)-এর জীবন ছিল অতুলনীয় সরল। তিনি নিজেকে কিংবা পরিবারকে বিলাসিতার ভারে ক্লান্ত করতেন না। কখনো কখনো টানা এক মাস তাঁর ঘরে চুলা জ্বলত না। তখন তাঁদের আহার ছিল খেজুর ও পানি। বাহ্যিক চাকচিক্য, ভোগ-বিলাস আর ঋণের বোঝার যুগে নববী চরিত থেকে আমাদের জন্য এক বিরাট শিক্ষা হল, সুখ অনেক টাকার ভেতরে নয়, বরং সন্তুষ্টি আর উত্তম আচরণের ভেতরে।

নবী (ﷺ) পরিবারের কাজে সহায়তা করতেন। আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে জিজ্ঞেস করা হয়, নবী (ﷺ) ঘরে কী করতেন? তিনি বলেন, তিনি পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। আর যখন ছালাতের সময় হতো, তখন ছালাতের জন্য বেরিয়ে যেতেন।

এখানে আমাদের প্রত্যেকের জন্য শিক্ষা হল, শুধু কথায় নয়, নিজের ব্যবহারেই পরিবারকে শিক্ষা দিতে হবে; হতে হবে দয়া ও বিনয়ের এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।

অতএব আসুন, আমরা নবী (ﷺ)-এর অনুসরণে নিজেদের ঘরকে ভালোবাসা ও দয়ার আশ্রয়ে পরিণত করি। সন্তানদের লালন করি এই মহৎ মূল্যবোধে। মহান আল্লাহ বলেন, لَقَدۡ کَانَ لَکُمۡ  فِیۡ رَسُوۡلِ اللّٰہِ  اُسۡوَۃٌ حَسَنَۃٌ ‘তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে’ (সূরা আল-আহযাব : ২১)।

হে আল্লাহ! আমাদের ঘরগুলোকে সঠিক করে দাও, আমাদের হৃদয়ের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দাও, আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উত্তম আদর্শে জীবন সাজানোর তাওফীক্ব দান করো। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর এর প্রতি।

 

* অধ্যয়নরত, কুল্লিয়া দ্বিতীয় বর্ষ, মাদরাসা মুহাম্মাদীয়া আরাবীয়া, উত্তর যাত্রাবাড়ী, ঢাকা; অনার্স, আল-হাদীস এ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।




ছালাতে একাগ্রতা অর্জনের ৩৩ উপায় (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল হাকীম বিন আব্দুল হাফীজ
রামাযান : কুরআন নাযিলের মাস - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
আধুনিক যুগে দাওয়াতী কাজের পদ্ধতি (২য় কিস্তি) - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
পরনিন্দা চর্চা ও তার পরিণাম - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব (১০ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
বিদ‘আত পরিচিতি (১৬তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ফাযায়েলে কুরআন (৩য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
রামাযান মাসে প্রচলিত বিদ‘আত সমূহ - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধান (৪র্থ কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
আল্লাহর পথে দাওয়াত : গুরুত্ব ও ফযীলত - আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ
মসজিদ: ইসলামী সমাজের প্রাণকেন্দ্র (৯ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ফাযায়েলে কুরআন (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম

ফেসবুক পেজ