তরুণদের বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে সতর্ক করা
- মুহাম্মাদ ইবনু নাছির আল-উরাইনি (রাহিমাহুল্লাহ)
- অনুবাদ : মাসঊদুর রহমান*
(৮ম কিস্তি)
জিহাদ
জিহাদ সম্পর্কে শায়খ আল ফাওজান (হাফি.)-এর মন্তব্য; আল্লাহর পথে জিহাদ একটি মহান ফরজ এবং এটা দ্বীনের ভিত্তি, যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,رَأْسُ الأَمْرِ الإِسْلاَمُ وَعَمُودُهُ الصَّلاَةُ وَذِرْوَةُ سَنَامِهِ الْجِهَادُ ‘সকল কাজের মূল হলো ইসলাম, স্তম্ভ হলো ছালাত এবং সর্বোচ্চ শিখর হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা’।
মহান আল্লাহ অনেক আয়াতে জিহাদের আদেশ দিয়েছেন, উৎসাহিত করেছেন এবং এর তাকিদ দিয়েছেন। একইভাবে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) জিহাদের আদেশ দিয়েছেন, উৎসাহিত করেছেন, তাগিদ দিয়েছেন এবং এর ফযীলত ও উপকারিতা বর্ণনা করেছেন, এমনকি কিছু আলেম এর গুরুত্বের কারণে একে ইসলামের ষষ্ঠ স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করেছেন। শায়খ ছালেহ্ আল ফাওজান (হাফি.) আরো বলেন,
‘বর্তমান সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে অন্তর্দৃষ্টি বা জ্ঞানহীন লোকেরা জিহাদের বিষয়ে কথা বলছে। এমনকি কিছু অজ্ঞ লোক ও ইসলাম বিদ্বেষী শত্রু যারা ইসলামী জিহাদকে বর্বর এবং ধর্মের জবরদস্তি হিসেবে ব্যক্ত করছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَاۤ اِکۡرَاہَ فِی الدِّیۡنِ ‘দ্বীনের মধ্যে কোনো জবরদস্তি নেই’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৫৬)। একদিকে তারা দাবি করে যে, ইসলামে কোনো জিহাদ নেই। আবার অন্য দিকটি হলো তারা চরমপন্থার সাথে জ্ঞানহীনভাবে এবং ইসলামী আইনগত নীতিমালার প্রতি আনুগত্য ছাড়াই এ বিষয়ে কথা বলে। সুতরাং এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিষয়টি বর্ণনার প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত’। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ أَعَدَّهَا اللهُ لِلْمُجَاهِدِينَ فِي سَبِيلِهِ كُلُّ دَرَجَتَيْنِ مَا بَيْنَهُمَا كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ
‘জান্নাতে একশটি (মর্যাদার) স্তর রয়েছে। এগুলো আল্লাহ তাঁর রাস্তায় জিহাদকারীদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। প্রতি দু’টি স্তরের মাঝে আসমান ও যমীনের দূরত্ব বিদ্যমান’।[১]
তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে, নিশ্চয় জিহাদ একটি প্রাচীন ফরজ। তিনি মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর জিহাদের কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি বনী ইসরাঈলদেরকে বিজয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর পর বনী ইসরাঈলের মধ্যে জিহাদ ফরজ করা হয়েছিল এবং এভাবেই আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ থেকে প্রমাণ উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, জিহাদের বিভিন্ন প্রকার রয়েছে এবং একজন মুসলিম সর্বদা এই প্রকারগুলোর কোনো একটিতে লিপ্ত থাকেন, তা হলো পাঁচটি।
প্রথম : আত্মার বিরুদ্ধে জিহাদ, যা আল্লাহর আনুগত্যে নিজের কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের মাধ্যমে করা হয়। একজন মুসলিম প্রথমে নিজের আত্মার বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করে অন্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে পারে না।
দ্বিতীয় : শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ। নিজের আত্মার বিরুদ্ধে সংগ্রাম যখন শেষ করবে, তখন সে শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ করা শুরু করবে, তা এইভাবে যে, শয়তান যা আদেশ করবে, তা অমান্য করবে এবং শয়তান যা নিষেধ করবে, তা পালন করবে। এটাই হবে শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ।
তৃতীয় : অবাধ্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে জিহাদ, যা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের মাধ্যমে করা হয় এবং এটি নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ
‘তোমাদের কেউ মন্দ কাজ হতে দেখলে সে যেন স্বহস্তে (শক্তি প্রয়োগে) পরিবর্তন করে দেয়, যদি তার সে ক্ষমতা না থাকে, তবে মুখ (বাক্য) দ্বারা এর পরিবর্তন করবে। আর যদি সে সাধ্যও না থাকে, তখন অন্তর দ্বারা করবে, তবে এটা ঈমানের দুর্বলতম পরিচায়ক’।[২] ওপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, وَلَيْسَ وَرَاءَ ذَلِكَ مِنَ الإِيمَانِ حَبَّةُ خَرْدَلٍ ‘এরপর আর সরিষার দানা পরিমাণও ঈমানের স্তর নেই’।[৩]
চতুর্থ : মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা, তাদের সন্দেহ খণ্ডন করে এবং তাদের মনগড়া কথার জবাব দেয়ার মাধ্যমে। তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকা ফরজ। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ہُمُ الۡعَدُوُّ فَاحۡذَرۡہُمۡ ‘তারা শত্রু, সুতরাং তাদের থেকে সাবধান হও’ (সূরা আল-মুনাফিকুন : ৪)। তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জিহ্বার মাধ্যমে করা হয়, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে নবী! কাফির ও মুনাফিক্বের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হোন’ (সূরা আত-তাহরিম : ৯)।
পঞ্চম : কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ। এটি করা হয় অস্ত্র ধারণ করে এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রচার এবং মুশরিক ও তার অনুসারীদের পরাজিত করার জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে। মহান আল্লাহ তাঁর পথে জিহাদ করা এই উম্মতের উপর ফরজ করেছেন, কিন্তু তিনি এর বিধান পর্যায়ক্রমে করেছেন। যখন আল্লাহর নবী (ﷺ) মুসলমানদের সাথে মক্কায় ছিলেন, তখন তাদেরকে জিহাদ করতে নিষেধ করা হয়েছিল এবং সংযত থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। নবুয়তের পর আল্লাহর নবী (ﷺ) তাঁর সম্প্রদায়ের কাছ থেকে নানা কষ্ট ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও মক্কায় ১৩ বছর অবস্থান করে তিনি মানুষদেরকে শুধু আল্লাহর দিকে আহবান করেছেন।
এর কারণ হলো মুসলমানরা তখন দুর্বল অবস্থায় ছিল। এমতাবস্থায় যদি তাদেরকে যুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হতো, তবে শত্রুরা তাদেরকে পরাভূত করে, সমূলে ধ্বংস করে দিত এবং তাদের দাওয়াতকে নিশ্চিহ্ন করে দিত। অতঃপর, যখন আল্লাহর নবী (ﷺ) মদিনায় হিজরত করলেন এবং সমর্থক ও সাহায্যকারী পেলেন, তখন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাদেরকে জিহাদ করার অনুমতি দিলেন, কিন্তু আদেশ হিসেবে নয়।
জিহাদের বিধানের প্রথম পর্যায়
মহান আল্লাহ বলেন, اُذِنَ لِلَّذِیۡنَ یُقٰتَلُوۡنَ بِاَنَّہُمۡ ظُلِمُوۡا ؕ وَ اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی نَصۡرِہِمۡ لَقَدِیۡرُۨ ‘যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো তাদেরকে, যারা আক্রান্ত হয়েছে। কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৩৯)। সুতরাং তিনি তাদেরকে জিহাদে লিপ্ত হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন এবং তাদের জন্য তা হালাল করেছেন, যা পূর্বে তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।
দ্বিতীয় পর্যায়
অতঃপর, মুসলিমদেরকে কাফের মুশরিকদের মধ্য হতে শুধুমাত্র তাদের সাথে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয়, যারা তাদের সাথে যুদ্ধ করেছিল। আর যারা তাদের সাথে যুদ্ধ করেনি, তাদের সাথে যুদ্ধ করতে নিষেধ করা হয়েছিল বা যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ قَاتِلُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ الَّذِیۡنَ یُقَاتِلُوۡنَکُمۡ وَ لَا تَعۡتَدُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ الۡمُعۡتَدِیۡنَ ‘এবং যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে, তোমরাও তাদের সাথে আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর এবং সীমা অতিক্রম করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমা লংঘনকারীদেরকে ভালোবাসেন না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৯০)। সুতরাং, তাদেরকে কেবল তাদের সাথেই যুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, যারা তাদের সাথে যুদ্ধ করেছিল।
তৃতীয় পর্যায়
অতঃপর মহান আল্লাহর কালেমাকে সুউচ্চ করার জন্য সকল প্রকার কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে যুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। এর কারণ ছিল এই যে, তারা ক্ষমতা ও রাষ্ট্র লাভ করেছিল এবং তাদের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাই তিনি তাদেরকে জিহাদ করার আদেশ দিয়েছিলেন... [ উৎস : জিহাদ, এর প্রকারভেদ ও বিধান, শাইখ সালেহ আল-ফাওযান রচিত]
ইমাম ইবনে উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন : ‘এর (অর্থাৎ জিহাদের) জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকা উচিত। যেমন,
১ম শর্ত
মুসলিমদের যুদ্ধ করার সামর্থ্য ও শক্তি থাকতে হবে। যদি তাদের সেই সামর্থ্য না থাকে, তবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া মানে ধ্বংসের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়া। এ কারণেই আল্লাহ মক্কায় থাকাকালীন মুসলিমদের জন্য যুদ্ধ ফরজ করেননি, কারণ তারা দুর্বল ও অক্ষম ছিল। কিন্তু যখন তারা মদিনায় হিজরত করল এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে শক্তি অর্জন করল, তখন তাদেরকে যুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হলো।[৪]
২য় শর্ত
তিনি আরোও বলেছেন, ‘পরিস্থিতি যাই হোক না কেন ইমামের অনুমতি ছাড়া সেনাবাহিনীর জন্য যুদ্ধ করা জায়েজ নয়। কেননা যুদ্ধ ও জিহাদের আদেশ শাসকদের উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়, সাধারণ জনগণের জন্য নয়। জনগণ শাসকদের কর্তৃত্বের অধীন। আত্মরক্ষা ব্যতীত ইমামের অনুমতি ছাড়া যুদ্ধ করার অনুমতি কারো নেই। যদি শত্রু তাদের অতর্কিতভাবে আক্রমণ করে এবং তারা তার শক্তিকে ভয় পায়, তবে তাদের আত্মরক্ষার অনুমতি আছে, কারণ তখন যুদ্ধ করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়’।[৫]
সুতরাং শাসকের অনুমতি, সক্ষমতা ছাড়াও কতিপয় শর্ত রয়েছে যেমন, পতাকা, পিতা-মাতার সম্মতি; এই শর্তগুলো ছাড়া যা করা হয়, তাকে জিহাদ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
মূলত জিহাদের বিষয়ে ফাতাওয়া এমন ব্যক্তিদের দ্বারা দেয়া হয়েছিল, যারা এ বিষয়ে অযোগ্য। বিধায় তারা কোন ধরনের বিচার বিবেচনা ও চিন্তা ভাবনা ছাড়াই এ বিষয়ে ফাতাওয়া দিয়েছিল। যার ফলস্বরূপ অনেক নিরীহ মানুষ নিহত ও বিভিন্ন স্থানে হামলা ও আক্রমণের শিকার হয়েছে। যেখানে জিহাদের শর্তগুলো সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত ছিল।
অথচ এ ক্ষেত্রে যাদেরকে ভুল ফাতাওয়া দিয়ে ভুলভাল বুঝিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল, তাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে, এটাই বাস্তবতা। দায়িত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ ফাতাওয়াগুলোকে প্রবীণ উলামা পরিষদ এবং ফাতাওয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির মতো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বিজ্ঞ, দক্ষ, বিদগ্ধ পন্ডিত বিদ্বান আলেমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।
জিহাদ বিষয়ক ফাতাওয়া
প্রশ্ন : কোনটি শ্রেষ্ঠ : জ্ঞানের জিহাদ, নাকি তরবারির জিহাদ?
উত্তর : জ্ঞানই সর্বাগ্রে। একজন ব্যক্তিকে তার ঈমানের দৃঢ়তার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা অবশ্যই শিখতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَاعۡلَمۡ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا اللّٰہُ وَ اسۡتَغۡفِرۡ لِذَنۡۢبِکَ وَ لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتِ ‘সুতরাং জেনে রাখুন, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোন মা‘বূদ নেই; ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার এবং মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য’ (সূরা মুহাম্মাদ : ১৯)।
মহান আল্লাহ কথা ও কাজের আগে জ্ঞানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। জ্ঞানই সর্বাগ্রে, তারপর জিহাদসহ সকল কাজ, যাতে কারো জিহাদ অজ্ঞতা ও ভুলের উপর নয়, বরং জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির উপর ভিত্তি করে হয়।
প্রশ্ন : যারা জিহাদকে ফরয ঘোষণা করে ফৎওয়া জারি করে কিন্তু বলে যে, এর জন্য কোনো নেতা বা পতাকার প্রয়োজন নেই, তাদের সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
উত্তর : এটি খারিজিদের মত। একটি পতাকা এবং একজন নেতা অবশ্যই থাকতে হবে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সময় থেকেই মুসলমানদের এটাই পদ্ধতি। যে ব্যক্তি কোনো নেতা ও পতাকা ছাড়াই জিহাদের অনুমতি দিয়ে ফৎওয়া দেয়, সে খারিজি মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণকারী একজন খারিজি।
প্রশ্ন : এই সময়ে জিহাদের বিধান কী? আমরা তা কোথায় খুঁজে পেতে পারি? কোনো কাফির বা ধর্মদ্রোহী শাসকের পতাকার অধীনে যুদ্ধ করা কি আমাদের জন্য জায়েজ?
উত্তর : কোনো কাফিরের পতাকার অধীনে যুদ্ধ করা জিহাদ নয়। মুসলিমদের পতাকার নিচে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে থেকে যুদ্ধ করুন।
প্রশ্ন : বুখারীর হাদীছ الْإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ ‘ইমাম হলেন একটি ঢাল, যার আড়ালে যুদ্ধ করা হয়’।[৬] যারা বলেন যে, জিহাদের অবশ্যই একজন ইমাম থাকতে হবে যিনি এর পতাকা উত্তোলন করেন, তাদের জন্য এটি কি একটি প্রমাণ?
উত্তর : হ্যাঁ, এটি এই বিষয়ের উপর একটি দলীল। ইমাম হলেন মুসলিমদের জন্য একটি ঢাল এবং তারা এই ঢালের আড়ালে যুদ্ধ করে। নিঃসন্দেহে, মুসলিমদের নেতৃত্ব এবং তাদের ইমামত তাদের জন্য এক বিরাট নে‘মত। তারা তাঁর পতাকার নিচে যুদ্ধ করে এবং ইমাম নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়ন করেন, অধিকারগুলো পূরণ করেন এবং তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ সারা দেশে নিরাপত্তা বিস্তার করেন। তিনি সর্বশক্তিমান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নে‘মত।
প্রশ্ন : কিছু লোক ইমামের অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন স্থানে জিহাদে গিয়েছিল। এটা কি সঠিক?
উত্তর : ইমামের অনুমতি ছাড়া তাদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই, কারণ তারা প্রজা এবং প্রজাদের অবশ্যই ইমামের আনুগত্য করতে হবে। যদি তিনি তাদের অনুমতি দেন, তবে আক্রমণাত্মক জিহাদের জন্য পিতা-মাতার অনুমতি ও সম্মতিও প্রয়োজন। পিতা-মাতার সম্মতি ছাড়া যাওয়া উচিত নয়, কারণ এক ব্যক্তি জিহাদে যেতে চেয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে এলেন এবং নবী (ﷺ) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার পিতা-মাতা কি জীবিত?’ সে বলল : হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘তাহলে তাদের পথে জিহাদ করো’।[৭] অতঃপর তিনি তাকে তার পিতা-মাতার কাছে ফিরিয়ে দিলেন। অত্র হাদীছের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, খলীফা বা নেতার অনুমতির পরে পিতা-মাতার অনুমতি নেয়াটাও আবশ্যক।
প্রশ্ন : যদি আমার বাবার অন্য সন্তান থাকে এবং কোনো কিছুর জন্য আমার প্রয়োজন না থাকে এবং জিহাদে আমাকে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার পেছনে তার একমাত্র কারণ হয় আমার জীবনের ভয়, তাহলে বিধান কী?
উত্তর : বিধান হলো, তার একশ সন্তান থাকলেও তোমাকে তার আনুগত্য করতে হবে। তার আনুগত্য করা এবং তার সাথে সদ্ব্যবহার করা তোমার জন্য বাধ্যতামূলক এবং এটি তোমার জন্য পুরস্কার ও পুণ্য বয়ে আনবে।
প্রশ্ন : পিতা-মাতার সম্মতি থাকলে ইমামের অনুমতি ছাড়া জিহাদের জন্য বের হওয়া কি জায়েজ?
উত্তর : যদি পিতা-মাতা অনুমতি দেন, তাহলে ইমামের অনুমতিও আবশ্যক। উভয়ই প্রয়োজনীয়: ইমামের অনুমতি এবং পিতা-মাতার সম্মতি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য : জিহাদের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার অনুমতির বিষয়টি যখন জিহাদ নফল মুস্তাহাব বা ফরযে কেফায়া পর্যায়ের হবে, তখন এই শর্তটি প্রযোজ্য। (শাইখ সালেহ আল-ফাওযান রচিত ‘জিহাদ: এর প্রকারভেদ ও বিধান’ গ্রন্থ থেকে)।
* শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৪২৩।
[২]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯।
[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫০।
[৪]. শারহুল মুমতি’, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৯-১০।
[৫]. শারহুল মুমতি’, ৮ম খণ্ড, পৃ. ২৫-২৬।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯৫৭।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৩০০৪।