বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ০১:৫৮ পূর্বাহ্ন

বিপদাপদ, অসুস্থতা ও তার চিকিৎসা

-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম*


(২য় কিস্তি)

পেট খারাপ ও পাতলা পায়খানা এবং তার চিকিৎসা

আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এক ব্যক্তি নবী করীম (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, আমার ভাইয়ের পেট খারাপ হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তাকে মধু পান করাও। সে মুধ পান করাল। সে আবার এসে বলল, আমি তাকে মুধ পান করিয়েছি, যাতে তার পায়খানা আরও বেড়ে গেছে। এভাবে তিনি তাকে তিনবার বললেন এবং লোকটি এসে তার ভাইয়ের পায়খানা ক্রমশঃ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ জানাত। অতঃপর চতুর্থবার আসলে নবী করীম (ﷺ) বললেন, তাকে মুধ পান করাও। সে বলল, আমি অবশ্যই তাকে মধু পান করিয়েছি, কিন্তু তার পায়খানা আরো বেড়ে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, صَدَقَ اللهُ وَكَذَبَ بَطْنُ أَخِيْكَ ‘আল্লাহ সত্য বলেছেন আর তোমার ভাইয়ের পেট মিথ্যা’। অতঃপর চতুর্থবার তাকে মধু পান করাল এবং সে আরোগ্য লাভ করল।[১]

রোগীর সেবা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার কাছে গমন করার ফযীলত

রোগীর সেবা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তার নিকট গমন করার মধ্যে রয়েছে অত্যধিক ফযীলত। যেমন, ১. কোন ব্যক্তি যখন তার কোন রুগ্ন মুসলিম ভাইকে দেখতে যায়, তখন সে না বসা পর্যন্ত জান্নাতের খেজুর আহরণ করতে থাকে। অতঃপর সে যখন বসে, তখন রহমত তাকে ঢেকে ফেলে। আর যদি ভোরবেলা তাকে দেখতে যায়, তাহলে সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত দু‘আ করতে থাকে। যদি সে সন্ধ্যাবেলা তাকে দেখতে যায়, তাহলে সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দু‘আ করতে থাকে।[২] ২. যে ব্যক্তি কোন অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যায় বা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার কোন দ্বীনী ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন একজন আহ্বানকারী (ফেরেশতা) তাকে ডেকে বলতে থাকেন, মঙ্গলময় তোমার জীবন, মঙ্গলময় তোমার এই পথ চলা। তুমি তো জান্নাতে তোমার আবাস নির্ধারণ করে নিলে।[৩] ৩. যে কোন মুসলিম বান্দা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার মুসলিম ভাইকে দেখতে যায়, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আরশের রাজত্বে ঘোষণা করেন, আমার বান্দা আমার সন্তুষ্টির জন্যই (তার ভাইয়ের সাথে) সাক্ষাৎ করেছে, ফলে আমার দায়িত্ব হল জান্নাতে তার মেহমানদারী করা। আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতেই মেহমানদারী করবেন।[৪] ৪. যে ব্যক্তি রোগীকে দেখতে যাবে, সে ব্যক্তি আল্লাহর নিরাপত্তায় থাকবে।[৫]

রোগীকে দেখা ও ঝাড়ফুঁক করার দু‘আ

দু‘আ-১ : আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি এমন কোন রোগীকে দেখতে যায়, যার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়নি, সে যেন তার নিকট বসে এ দু‘আটি সাতবার পাঠ করে-

أَسْأَلُ اللّٰهَ الْعَظِيْمَ رَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيْمِ أَنْ يَشْفِيَكَ

উচ্চারণ : আসআলুল্ল-হাল ‘আযীম রাব্বাল ‘আরশিল ‘আযীম আই ইয়াশফিয়াকা।

অর্থ : ‘আমি মহান আল্লাহর নিকটে দু‘আ করছি, যিনি মহান আরশের অধিপতি, তিনি যেন তোমাকে রোগমুক্ত করেন’।

ফযীলত : রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, এ দু‘আর ফলে অবশ্যই আল্লাহ তাকে রোগমুক্ত করবেন।[৬]

দু‘আ-২ : আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে কোন মানুষ যখন অসুস্থ হত, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর ডান হাত তার গায়ে বুলিয়ে দিতেন এবং বলতেন,

أَذْهِبِ الْبَاْسَ رَبَّ النَّاسِ وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِىْ لاَ شِفَاءَ إِلَّا شِفَائُكَ شِفَاءً لَّا يُغَادِرُ سَقَمًا

উচ্চারণ : আয্হিবিল বা‘স, রব্বান না-স, ওয়াশ্ফি আংতাশ শা-ফী, লা শিফা-আ ইল্লা শিফাউকা শিফা-আন লা ইউগা-দিরু সাক্বামা।

অর্থ : ‘হে মানুষের প্রতিপালক! আপনি এ রোগ দূর করুন এবং আরোগ্য দান করুন, আপনি আরোগ্য দানকারী। আপনার আরোগ্য ব্যতীত কোন আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য, যা বাকী রাখে না কোন রোগ’।[৭]

দু‘আ-৩ : আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিম্নের দু‘আ দিয়ে ঝাড়ফুঁক করতেন,

أَذْهِبِ الْبَاْسَ رَبَّ النَّاسِ   بِيَدِكَ الشِّفَاءُ لَا  كَاشِفَ لَهُ  إِلَّا    أَنْتَ
উচ্চারণ : আয্হিবিল বা‘স, রব্বান না-স, বিয়াদিকাশ শিফা-উ লা কা-শিফা লাহু ইল্ল আংতা।
অর্থ : ‘হে মানুষের প্রতিপালক! আপনি এ রোগ দূর করুন এবং আপনার নিকটেই রয়েছে আরোগ্য। আপনি ব্যতিত কোন আরোগ্যকারী নেই’।[৮]

দু‘আ-৪ : ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (ﷺ) যখন কোন অসুস্থকে দেখতে যেতেন, তখন বলতেন,

لاَ بَأْسَ طَهُوْرٌ  إِنْ شَاءَ اللّٰهُ
উচ্চারণ : লা বা‘সা ত্বাহূরুন ইংশা-আল্ল-হ। 
অর্থ : ‘ভয় নেই, আল্লাহ চাইলে আরোগ্য লাভ করবে’।[৯]

দু‘আ-৫ : আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ﷺ) যখন অসুস্থ হতেন, জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে ঝাড়ফুঁক করতেন এবং বলতেন,

بِاسْمِ اللّٰهِ يُبْرِيْكَ وَمِنْ كُلِّ دَاءٍ يَشْفِيْكَ وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ وَشَرِّ كُلِّ ذِىْ عَيْنٍ

উচ্চারণ : বিসমিল্লা-হি উবরীকা ওয়া মিং কুল্লি দা-ইন ইয়াশফীকা ওয়া মিং শাররি হা-সিদিন ইযা হাসাদ ওয়া শাররি কুল্লি যী ‘আইনিন। 
অর্থ : ‘আল্লাহর নামে-তিনি আপনাকে (ব্যাধি হতে) সুস্থতা দান করুন, সব ব্যাধি থেকে আপনাকে মুক্ত করুন, আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে এবং যখন সে হিংসা করে এবং সকল প্রকার কুদৃষ্টি ব্যক্তির ক্ষতি হতে’।[১০] 

দু‘আ-৬ : সাঈদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী করীম (ﷺ) যখন অসুস্থ হতেন, জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে ঝাড়ফুঁক করতেন এবং বলতেন,

بِاسْمِ اللّٰهِ أَرْقِيْكَ مِنْ كُلِّ شَىْءٍ يُؤْذِيْكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللّٰهُ   يَشْفِيْكَ بِاسْمِ اللّٰهِ أَرْقِيْكَ

উচ্চারণ : বিসমিল্লা-হি আরক্বীকা মিং কুল্লি শাইইং উযীকা মিং শাররি কুল্লি নাফসিন আও ‘আইনি হা-সিদিল্লা-হু ইয়াশফীক্ব বিসমিল্লা-হি আরক্বীকা। 
অর্থ : ‘আল্লাহর নামে আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি-সে সব জিনিস হতে, যা আপনাকে কষ্ট দেয়, সব আত্মার খারাবী অথবা হিংসুকের কুদৃষ্টি হতে আল্লাহ আপনাকে মুক্তি দিন; আল্লাহর নামে আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি’।[১১] 

অসুস্থ হলে মু‘আব্বিযাত দিয়ে ঝাড়ফুঁক করা

আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ﷺ) যখন অসুস্থ হতেন, তখন ‘মু‘আব্বিযাত’[১২] দ্বারা নিজের শরীরের উপর ফুঁ দিতেন এবং নিজের হাত দ্বারা শরীরে মুছে ফেলতেন। অথবা যখন তাঁর পরিবারের কেউ রোগে আক্রান্ত হত, তখন তিনি ‘মু‘আব্বিযাত’ পড়ে তার উপর ফুঁ দিতেন।[১৩] আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) যে রোগে ওফাত (মৃত্যু) পান, সেই রোগের সময়ে তিনি নিজ দেহে ‘মু‘আব্বিযাত’ পড়ে ফুঁক দিতেন। অতঃপর যখন রোগের তীব্রতা বেড়ে গেল, তখন আমি সেগুলো পড়ে ফুঁক দিতাম। আর আমি তাঁর নিজের হাত তাঁর দেহের উপর ঝুলিয়ে দিতাম। কেননা, তাঁর হাতে বারাকাত ছিল।[১৪]

কোন ব্যথা অনুভব হলে মু‘আব্বিযাত দিয়ে ঝাড়ফুঁক করা

আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন ব্যথা অনুভব করলে তিনি নিজেই ‘মু‘আব্বিযাত’ পড়ে ফুঁক দিতেন। ব্যথা বৃদ্ধি পেলে আমি তা পড়ে হাতে ফুঁক দিয়ে তা তাঁর ব্যথার স্থানে বুলিয়ে দিতাম বারাকাত লাভের আশায়।[১৫]

মু‘আব্বিযাত দিয়ে বদনযর হতে আশ্রয় চাওয়া

আবূ সাঈদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সূরা আল-ফালাক্ব ও সূরা আন-নাস দ্বারা জিন এবং মানুষের চক্ষু বদনযর হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন।[১৬] ‘মু‘আব্বিযাত’ হল-

قُلۡ اَعُوۡذُ  بِرَبِّ الۡفَلَقِ  - مِنۡ  شَرِّ مَا خَلَقَ  - وَ مِنۡ  شَرِّ غَاسِقٍ  اِذَا وَقَبَ  -  وَمِنۡ  شَرِّ النَّفّٰثٰتِ فِی الۡعُقَدِ  - وَ مِنۡ  شَرِّ حَاسِدٍ  اِذَا حَسَدَ

অর্থ : ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, আমি আশ্রয় চাচ্ছি ঊষার স্রষ্টার, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট হতে, অনিষ্ট হতে অন্ধকার রাত্রির যখন তা আচ্ছন্ন হয়; এবং গিরায় ফুঁকদানকারীণির এবং হিংসুকের অনিষ্ট হতেও, যখন সে হিংসা করে’ (সূরা আল-ফালাক্ব : ১-৫)।

قُلۡ  اَعُوۡذُ  بِرَبِّ النَّاسِ - مَلِکِ النَّاسِ  - اِلٰہِ  النَّاسِ   - مِنۡ  شَرِّ الۡوَسۡوَاسِ   الۡخَنَّاسِ  - الَّذِیۡ یُوَسۡوِسُ فِیۡ  صُدُوۡرِ النَّاسِ  - مِنَ الۡجِنَّۃِ وَ النَّاسِ 

অর্থ : ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, আমি আশ্রয় চাচ্ছি মানুষের প্রতিপালকের, যিনি মানবমণ্ডলীর বাদশাহ। যিনি মানবমণ্ডলীর প্রকৃত মা‘বূদ। আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে, যে লোকদের অন্তরে কুমন্ত্রণার উদ্রেক করে। জিনের মধ্য হতে এবং মানুষের মধ্য হতে’ (সূরা আন-নাস : ১-৬)।[১৭]

শয়তান ও জিনদের প্ররোচনা ও চক্রান্ত থেকে আত্মরক্ষার জন্য দু‘আ

দু‘আ-১ : আল্লাহ তা‘আলা নবী (ﷺ)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন, আপনি বলুন,

رَّبِّ اَعُوۡذُ بِکَ مِنۡ ہَمَزٰتِ الشَّیٰطِیۡنِ   -  وَ  اَعُوۡذُ  بِکَ رَبِّ اَنۡ یَّحۡضُرُوۡنِ

অর্থ : ‘হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি শয়তানের প্ররোচনা থেকে। আর হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি, আমার কাছে তাদের উপস্থিতি থেকে’ (সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত : ৯৭-৯৮)।

দু‘আ-২ : নবী (ﷺ) ছাহাবীদেরকে ভীতিকর পরিস্থিতিতে এ বাক্যগুলোর মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করার শিক্ষা দিতেন,

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ وَشَرِّ عِبَادِهِ وَمِنْ هَمْزَاتِ الشَّيَاطِيْنِ وَ اِنْ يَّحْضُرُوْنَ-

উচ্চারণ : আঊযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত তাম্মা-তি মিন গযাবিহী ওয়া ‘ইক্বা-বিহি ওয়া র্শারি ‘ইবা-দিহি ওয়া মিন হামযা-তিশ শায়া-ত্বীনি ওয়া ইয়ঁ ইয়াহ্যুরূন’।
অর্থ : ‘আমি আল্লাহর পূর্ণ বাক্যসমূহের মাধ্যমে আশ্রয় চাচ্ছি, আল্লাহর ক্রোধ ও তার শাস্তি হতে, তাঁর বান্দাদের অপকারিতা হতে এবং শয়তানের দ্বিাধা-দ্বন্দ্ব হতে। আর তারা যেন আমার কাছে উপস্থিত হতে না পারে’।[১৮]

দু‘আ-৩ : নবী (ﷺ) বলেছেন, আমার নিকট জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আসলেন। তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ (ﷺ)! আপনি বলুন,

أَعُوْذُ بِوَجْهِ اللّٰهِ الْكَرِيْمِ وَبِكَلِمَاتِ اللّٰهِ التَّامَّاتِ اللَّاتِيْ لَا يُجَاوِزُهُنَّ بَرٌّ وَلَا فَاجِرٌ مِنْ شَرِّ مَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَشَرِّ مَا يَعْرُجُ فِيْهَا وَشَرِّ مَا ذَرَأَ فِي الْأَرْضِ وَشَرِّ مَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمِنْ فِتَنِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمِنْ طَوَارِقِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِلَّا طَارِقًا يَطْرُقُ بِخَيْرٍ يَا رَحْمٰنُ

উচ্চারণ : আ‘ঊযু বিওয়াজহিল্লা-হিল কারীম ওয়া বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা-ম্মা-তিল লাতী লা ইউজা-ইউযুহুন্না র্বারুন ওয়া লা ফাজিরুন মিং শাররি মা ইয়ানযিলু মিনাস সামায়ি ওয়া র্শারি মা ইয়া‘রুজু ফীহা ওয়া র্শারি মা যারাআ ফীল আরযি ওয়া র্শারি মা ইয়াখরুজু মিনহা ওয়ামিং ফিতানিল লাইলি ওয়ান নাহা-রি ওয়ামিং ত্বওয়া-রিকিল লাইলি ওয়ান নাহা-রি ইল্লা ত্ব-রিকান ইয়াত্বরুকু বিখইরিন ইয়া রহমান।

অর্থ : ‘সম্মানিত মহান আল্লাহর নিকট এবং আল্লাহর ঐ সকল পূর্ণ বাক্যের সাহায্যে আশ্রয় চাচ্ছি, যা কোন নেককার বা বদকার অতিক্রম করতে পারে না। ঐ সকল বস্তুর অনিষ্ট হতে, যা আসমান থেকে নেমে আসে ও আসমানে চড়ে, যা যমীনে সৃষ্টি করেছেন, যমীন থেকে বেরিয়ে আসে এবং প্রত্যেক রাত ও দিনের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাচ্ছি এবং রাত ও দিনের প্রত্যেক খারাপ পথিক থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। তবে ভাল পথিক থেকে নয়, হে দয়াময়!’।[১৯]

ফযীলত : জিন শয়তানরা যখন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকট আগুন নিয়ে আগমন করেছিল এবং তাঁকে জ্বালিয়ে দেয়ার ইচ্ছা করছিল। তখন মুহাম্মাদ (ﷺ) এ দু‘আ পাঠ করেন। ফলে মহান আল্লাহ তাদের আগুন নিভিয়ে দেন এবং তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেন।[২০]

সূরা আল-ফাতিহা দিয়ে ঝাড়ফুঁক করা

আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা সফরে ছিলাম। অতঃপর আমরা অবতরণ করলাম। একটি বালিকা এসে বলল, এখানকার গোত্রপ্রধানকে সাপে কেটেছে। আমাদের পুরুষগণ অনুপস্থিত। আপনাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যিনি ঝাড়ফুঁক করতে পারেন? আমাদের মধ্য থেকে একজন ঐ বালকটির সঙ্গে গেলে। যদিও আমরা ভাবিনি যে, সে ঝাড়ফুঁক জানে। তারপর সে ঝাড়ফুঁক করল এবং গোত্রপ্রধান সুস্থ হয়ে উঠল। এতে সর্দার খুশী হয়ে তাকে ত্রিশটি ছাগল দান করল এবং আমাদের সকলকে দুধ পান করাল। অতঃপর যখন সে ফিরে আসল, তখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তুমি ভালভাবে ঝাড়ফুঁক করতে জান (হাদীছের বর্ণনাকারী বলেন) অথবা তুমি কি ঝাড়ফুঁক করতে পার? সে বলল, না। আমি উম্মুল কিতাব অর্থাৎ সূরা আল-ফাতিহা দিয়েই ঝাড়ফুঁক করেছি। আমরা বললাম, ততক্ষণ কেউ কিছু বলবে না, যতক্ষণ না আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে পৌঁছি অথবা তাঁকে জিজ্ঞেস করি। যখন আমরা মদীনায় পৌঁছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে ঘটনাটি উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, সে কেমন করে জানল যে, তা অর্থাৎ সূরা আল-ফাতিহা ঝাড়ফুঁক? তোমরা নিজেদের মধ্যে এগুলো বণ্টন করে নাও এবং আমার জন্যও একাংশ রাখ’।[২১] জ্ঞাতব্য : ছাহাবী উম্মুল কুরআন তথা সূরা আল-ফাতিহা পাঠ করছিলেন এবং তাঁর থু-থু একত্র করে আক্রান্ত ব্যক্তির গায়ে থুক দিচ্ছিলেন। ফলে ব্যক্তিটি সুস্থ হয়ে গিয়েছিল।[২২]

ফোঁড়া, যখম ও শরীরের ব্যাথা দূর করার জন্য দু‘আ ও ঝাড়ফুঁক

দু‘আ-১ : আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন কোন মানুষ তার কোন অঙ্গে ব্যথা অনুভব করত অথবা কোথাও ফোঁড়া অথবা যখম দেখা দিত, তখন নবী করীম (ﷺ) তার উপর নিজের আঙ্গুল বুলাতে বুলাতে বলতেন,

بِسْمِ اللّٰهِ تُرْبَةُ  أَرْضِنَا  بِرِيْقَةِ  بَعْضِنَا  لِيُشْفَى سَقِيْمُنَا بِإِذْنِ رَبِّنَا

উচ্চারণ : বিসমিল্লা-হি তুরবাতু আরযিনা বিরীকাতি বা‘যিনা লিউশফা সাক্বীমুনা বিইযনি রব্বিনা। 
অর্থ : ‘আল্লাহর নামে, আমাদের যমীনের মাটি আমাদের কারো থুথুর সাথে মিশিয়ে আমাদের প্রভুর নির্দেশে আমাদের রোগীকে ভাল করবে’।[২৩] জ্ঞাতব্য : রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর বুড়ো আঙ্গুলটি যমীনে রাখতেন। অতঃপর তা তুলে নিয়ে এ দু‘আ পড়তেন।

দু‘আ-২ : উছমান ইবনু আবুল ‘আছ ছাক্বাফী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে একটি ব্যাথার অভিযোগ করলেন, যা তিনি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে তাঁর দেহে অনুভব করছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বললেন, তোমার শরীরের যে অংশ ব্যথাযুক্ত হয়, তার উপরে তোমার (ডান) হাত রেখে বলবে,

بِسْمِ اللّٰهِ

উচ্চারণ : বিসমিল্লা-হি (৩ বার)। অর্থ : ‘আল্লাহর নামে’। অতঃপর,

أَعُوْذُ بِاللّٰهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ

উচ্চারণ : আ‘ঊযুবিল্লা-হি ওয়া কুদরাতিহী মিং শাররি মা আজিদু ওয়া উহা-যিরু (৭ বার)।
অর্থ : আল্লাহ এবং তাঁর ক্ষমতার আশ্রয় প্রার্থনা করছি- যা আমি অনুভব করি এবং যা ধারণা করি তার অনিষ্ট হতে’।[২৪]

ফযীলত : এ দু‘আ পড়লে আল্লাহ তা‘আলা শরীরের ব্যাথা দূর করে দেন।[২৫]

কুষ্ঠ, শ্বেত ও দুরোরোগ্য ব্যাধী, পাগলামি, মহামারী ও বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি থেকে আশ্রয় চাওয়ার দু‘আ

দু‘আ-১ : আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (ﷺ) বলতেন,

اَللّٰهُمَّ  إِنِّىْ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُوْنِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّئِ الْأَسْقَامِ

উচ্চারণ : আল্ল-হুমা ইন্নী আঊয়ুযুবিকা মিনাল বারাছি ওয়াল জুনূনি ওয়াল জুযামি ওয়া মিং সায়্যিইল আসক্বাম।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট কুষ্ঠ রোগ, পাগলামী, শ্বেত রোগ এবং দুরোরোগ্য ব্যাধী থেকে আশ্রয় চাই’।[২৬]

জ্ঞাতব্য : দুরোরোগ্য ব্যাধী (سَيِّئ الْأَسْقَامِ) হল- এমন রোগ, যা মানুষের চেহারার বিকৃতি এবং শরীরের ক্ষতি সাধন করে।[২৭]

দু‘আ-১ : আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী করীম (ﷺ) বলতেন,

اَللّٰهُمَّ  إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْبُخْلِ وَالْهَرَمِ وَالْقَسْوَةِ وَالْغَفْلَةِ وَالذِّلَّةِ وَالْمَسْكَنَةِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ وَالْكُفْرِ وَالشِّرْكِ وَالنِّفَاقِ وَالسُّمْعَةِ وَالرِّيَاءِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنَ الصَّمَمِ وَالْبَكَمِ وَالْجُنُوْنِ وَالْبَرَصِ وَالْجُذَامِ وَسَيِّيْءِ الْأَسْقَامِ

উচ্চারণ : আল্ল-হুমা ইন্নী আ‘ঊযুবিকা মিনাল ‘আজযি ওয়াল কাসালি ওয়াল বুখলি ওয়াল হারামি ওয়াল ক্বসওয়াতি ওয়াল গাফলাতি ওয়াযযিল্লাতি ওয়াল মাসকানাতি, ওয়া আ‘ঊযুবিকা মিনাল ফাক্বরি ওয়াল কুফরি ওয়াশ শিরকি ওয়ান নিফাক্বি ওয়াস সুম‘আতি ওয়ার রিয়া-য়ি, ওয়া আ‘ঊযুবিকা মিনাছ ছামামি ওয়াল বাকামি ওয়াল জুনূনি ওয়াল বারাছি ওয়াল জুযামি ওয়া সায়্যিইল আসক্বাম।

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট অক্ষমতা, অলসতা, কার্পণ্য, স্থবিরতা, কঠোরতা, ঔদাস্য, দারিদ্র, লাঞ্ছনা এবং দীনতা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। আপনার নিকট অভাব-অনটন, কুফরী, ফাসিক্বী, বিরোধীতা, কপটতা এবং সুখ্যাতি ও লোক প্রদর্শনের উদ্দেশ্য থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। আর আমি আপনার নিকট বধিরতা, মুকতা, উন্মাদনা, কুষ্ঠরোগ, ধবল এবং সকল প্রকার কঠিন ব্যাধি থেকে আশ্রয় চাচ্ছি’।[২৮]  

অসুস্থ ব্যক্তির দু‘আ

দু‘আ-১ : আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখে নিম্নের দু‘আ বলার উপদেশ দিয়েছেন

اَللّٰهُمَّ آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً  وَّفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً  وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ : আল্ল-হুমা আ-তিনা ফিদ দুন্য়া হাসানাতান ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতান ওয়া ক্বিনা ‘আযাবান নারি।

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন ও আখেরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব হতে বাঁচান’।[২৯]

ফযীলত : অসুস্থ অবস্থায় এ দু‘আ পড়লে আরোগ্য লাভ করা যায়।[৩০]

দু‘আ-২ : অসুস্থ ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় বলবে,

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَاللّٰهُ أَكْبَرُ   لَا  إِلٰهَ   إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ  لَا إِلٰهَ   إِلَّا اللّٰهُ  لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ لَا  إِلٰهَ   إِلَّا  اللّٰهُ  وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ   إِلَّا بِاللّٰهِ

উচ্চারণ : লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াল্ল-হু আক্বার। লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহু লা শারীকা লাহু। লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু । লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লা-হ।

অর্থ : ‘আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং আল্লাহ অতি মহান। আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই, রাজ্য তাঁর ও প্রশংসা তাঁরই। আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারো কোন উপায় ও শক্তি নেই’।

ফযীলত : যে ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় এ দু‘আ বলবে, অতঃপর মারা যাবে, তাকে জাহান্নামের আগুন খাবে না (আগুন তাকে স্পর্শ করবে না অথবা দগ্ধ করবে না)।[৩১]

রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্ত লোককে দেখে দু‘আ

দু‘আ-১ : আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে লোক কোন রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্ত লোককে দেখে বলে,

اَلْحَمْدُ  لِلّٰهِ الَّذِيْ عَافَانِيْ  مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ وَفَضَّلَنِيْ  عَلَيْكَ وَعَلَى كَثِيْرٍ مِنْ عِبَادِهِ تَفْضِيْلًا

উচ্চারণ : আল-হামদুলিল্লাহিল লাযী ‘আফা-নী মিম্মাব্তালা-কা বিহি ওয়া ফাযযালানী ‘আলাইকা ওয়া ‘আলা কাছীরিং মিন ‘ইবাদিহি তাফযীলান।

অর্থ : ‘সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য, যিনি তোমাকে যে ব্যাধিতে আক্রান্ত করেছেন, তা হতে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং তোমার ও তার অসংখ্য সৃষ্টির উপর আমাকে সম্মান দান করেছেন’।[৩২]

ফযীলত : যে ব্যক্তি কোন রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্ত লোককে দেখে এ দু‘আ বলে, সে যেন ঐ সকল নে‘মতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল।[৩৩]

দু‘আ-২ : আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে লোক কোন রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্ত লোককে প্রত্যক্ষ করে বলে,

اَلْحَمْدُ  لِلّٰهِ الَّذِيْ عَافَانِيْ  مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ وَفَضَّلَنِيْ  عَلَى كَثِيْرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيْلًا

উচ্চারণ : আল-হামদুলিল্লাহিল লাযী ‘আফা-নী মিম্মাব্তালা-কা বিহি ওয়া ফাযযালানী ‘আলা কাছীরিং মিম্মান খলাক্বা তাফযীলান।

অর্থ : ‘সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য, যিনি তোমাকে যে ব্যাধিতে আক্রান্ত করেছেন, তা হতে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং তার অসংখ্য বান্দার উপর আমাকে সম্মান দান করেছেন’।[৩৪]

ফযীলত : যে ব্যক্তি কোন রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্ত লোককে প্রত্যক্ষ করে এ দু‘আ বলে, সে উক্ত ব্যাধিতে কখনো আক্রান্ত হবে না।[৩৫]

হিজামার গুরুত্ব এবং ফযীলত

‘হিজামা’ একটি ইসলামিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। হিজামা অর্থ চোষা বা টেনে নেয়া। এটা এমন এক চিকিৎসা, যার মাধ্যমে দূষিত ও ব্যবহৃত রক্ত বের করা হয়।[৩৬] যার ফলে শরীরের মাংসপেশী সমূহের রক্ত প্রবাহ দ্রুততর হয়। এর মাধ্যমে পেশী, চামড়া, ত্বক ও শরীরের ভিতরের অরগান সমূহের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। ফলে শরীর সতেজ ও বলবান হয়। এটি অতি প্রাচীন মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট হিসেবে আরব বিশ্বে জনপ্রিয়। ইসলামী শরী‘আতে হিজামার গুরুত্ব অত্যধিক। এর কয়েকটি কারণ আছে। যেমন- ১. হিজামার মধ্যে রয়েছে রোগের নিরাময়।[৩৭] ২. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মি‘রাজে যাওয়ার সময় ফেরেশতাদের সকল দল তাঁকে এবং তাঁর উম্মতকে হিজামা করার কথা বলেন।[৩৮] ৩. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, হিজামা সর্বোত্তম চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং ঔষধের মধ্যে অধিক ফলদায়ক।[৩৯] ৪. নবী (ﷺ) অসুস্থতার (যেমন মাথা ব্যথা) কারণে হিজামা করতে বলতেন।[৪০] ৫. হিজামা শরীর হতে দূষিত রক্তগুলো বের করে দেয়, সে কারণে রোগের অন্য কোন ঔষধ ব্যবহার না করলেও কোন ক্ষতি হবে না।[৪১] ৬. হিজামা করা নবী (ﷺ)-এর সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের মাথায় এবং উভয় বাহুর মধ্যখানে[৪২], নিতম্বে[৪৩], ঘাড়ের দুই পার্শ্বের উভয় রগে[৪৪] হিজামা করেছেন। ৭. ছাহাবীগণও হিজামা করেছেন এবং এর মাধ্যমে আরোগ্য লাভ করেছেন।[৪৫] অতএব উম্মতে মুহাম্মাদীর উচিত চাঁদের সতের, ঊনিশ এবং একুশ তারিখে হিজামা করা।[৪৬] কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সতের, ঊনিশ ও একুশ তারিখে হিজামা করবে, সে সকল রোগ হতে নিরাপদ থাকবে’।[৪৭]


* পি-এইচ. ডি গবেষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭১৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২২১৭; মিশকাত, হা/৪৫২১। 
[২]. আবূ দাঊদ, হা/৩০৯৮; তিরমিযী, হা/৯৬৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৪৪২; ইবনু হিব্বান, হা/২৯৪৭, সনদ ছহীহ।
[৩]. তিরমিযী, হা/২০০৮, সনদ হাসান।
[৪]. আল-আহাদীছুল মুখতারাহ, হা/২৬৭৯; সনদ হাসান, ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/২৫৭৯; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৬৩২।
[৫]. ইবনু হিব্বান, হা/৩৭৩, সনদ ছহীহ।
[৬]. আবূ দাঊদ, হা/৩১০৬, সনদ ছহীহ।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৭৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৯১।
[৮]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১৯১, ‘সালাম’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৯।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬১৬, ৫৬৫৬; মিশকাত, হা/১৫২৯।
[১০]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১৮৫, ‘সালাম’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৬।  
[১১]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১৮৬, ‘সালাম’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৬।  
[১২]. সূরা আল-ফালাক্ব ও সূরা আন-নাসকে মু‘আব্বিযাত বলা হয়।  
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৩৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৯২।  
[১৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৩৫, ‘চিকিৎসা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩২।  
[১৫]. আবূ দাঊদ, হা/৩৯০২, সনদ ছহীহ।  
[১৬]. তিরমিযী, হা/২০৫৮; ইবনু মাজাহ, হা/৩৫১১; মিশকাত, হা/৪৫৬৩, সনদ ছহীহ।
[১৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৩৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৯২।  
[১৮]. আবূ দাঊদ, হা/৩৮৯৩, হাদীছের শেষ অংশ আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমরের কথা বাদে সনদ হাসান।  
[১৯]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৩৫০০; মুছান্নাফে ইবনু আবী শায়বাহ, হা/২৪০৬৮; মুসনাদ আবী ই‘য়ালা, হা/৬৮৪৪, সনদ ছহীহ; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৮৪০, ২৭৩৮, ২৯৯৫।  
[২০]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৩৫০০; মুছান্নাফে ইবনু আবী শায়বাহ, হা/২৪০৬৮; মুসনাদ আবী ই‘য়ালা, হা/৬৮৪৪, সনদ ছহীহ; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৮৪০, ২৭৩৮, ২৯৯৫।  
[২১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০০৭, ৫৭৩৬ ; ছহীহ মুসলিম, হা/২২০১।
[২২]. ছহীহ মুসলিম, হা/২২০১।
[২৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৪৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৯৪; মিশকাত, হা/১৫৩১।
[২৪]. ছহীহ মুসলিম, হা/২২০২।
[২৫]. ছহীহ মুসলিম, হা/২২০২; আবূ দাঊদ, হা/৩৮৯১; তিরমিযী, হা/২০৮০; ইবনু মাজাহ, হা/৩৫২২; মিশকাত, হা/১৫৩৩।
[২৬]. আবূ দাঊদ, হা/১৫৫৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৩০২৭; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/১০১৭, সনদ ছহীহ।   
[২৭]. আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ, শারহু সুনানি আবী দাঊদ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৩৩০।  
[২৮]. ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/১০২৩, সনদ ছহীহ।   
[২৯]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৮৮; মিশকাত, হা/২৫০২।
[৩০]. আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখতে গেলেন, যে পাখির বাচ্চার মত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আল্লাহ্র নিকট কোন বিষয়ে দু‘আ করেছিলে অথবা তা তাঁর নিকট চেয়েছিলে? সে বলল হ্যাঁ, আমি বলতাম, ‘হে আল্লাহ! আমাকে আপনি আখেরাতে যে শাস্তি দিবেন তা আগেভাগে দুনিয়াতেই দান করুন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, সুবহানাল্লাহ্! তা তুমি দুনিয়াতেও সহ্য করতে পারবে না এবং আখেরাতেও সহ্য করতে পারবে না। তুমি এরূপ বলনি কেন, اَللّٰهُمَّ آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً  وَّفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً  وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন ও আখেরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব হতে বাঁচান’। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, পরে সে এরূপ দু‘আ করল এবং আল্লাহ তা‘আলা তাকে আরোগ্য দান করলেন। দ্র. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৮৮; মিশকাত, হা/২৫০২।
[৩১]. আবুু সাঈদ খুদরী ও আবুু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে বলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আক্বার’ অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং আল্লাহ অতি মহান। আল্লাহ তার সমর্থন করে বলেন, হ্যাঁ, আমি ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং আমি অতি মহান। আর যখন সে বলে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকা লাহু’ অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। তখন আল্লাহ বলেন, হ্যাঁ, আমি ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই, আমি একা, আমার কোন শরীক নেই। আর যখন সে বলে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু লাহুল মূলকু ওয়ালাহুল হামদু অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তাঁর রাজ্য ও তাঁরই প্রশংসা। তখন আল্লাহ বলেন, হ্যাঁ, আমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, আমারই রাজ্য এবং আমারই প্রশংসা। আর যখন সে বলে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইলাহা বিল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং আল্লাহ্র সাহায্য ছাড়া কারো কোন উপায় ও শক্তি নেই। তখন আল্লাহ বলেন, হ্যাঁ, আমি ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং আমার সাহায্য ছাড়া কারো কোন উপায় ও শক্তি নেই। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এটাও বলতেন, এটা যে ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় বলবে, অতঃপর মারা যাবে, তাকে জাহান্নামের আগুন খাবে না। দ্র. তিরমিযী, হা/৩৪৩০; ইবনু মাজাহ, হা/৩৭৯৪, সনদ ছহীহ; মিশকাত, হা/২৩১০।  
[৩১]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, হা/৪৪৪৩; সনদ হাসান; ছহীহুল জামে‘, হা/৫৫৫।
[৩২]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, হা/৪৪৪৩; সনদ হাসান; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৫৫।
[৩৪]. তিরমিযী, হা/৩৪৩২; সনদ ছহীহ।
[৩৫]. তিরমিযী, হা/৩৪৩২; সনদ ছহীহ।
[৩৬]. আবূ দাঊদ, হা/৩৮৫৯; ইবনু মাজাহ, হা/৩৪৮৪।
[৩৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৮০, ৫৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২২০৫।
[৩৮]. তিরমিযী, হা/২০৫২, ২০৫৩; ইবনু মাজাহ, হা/৩৪৭৭।
[৩৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৯৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৭৭।
[৪০]. আবূ দাঊদ, হা/৩৮৫৮।
[৪১]. আবূ দাঊদ, হা/৩৮৫৯; ইবনু মাজহ, হা/৩৪৮৪।
[৪২]. আবূ দাঊদ, হা/৩৮৫৯; ইবনু মাজাহ, হা/৩৪৮৪।
[৪৩]. আবূ দাঊদ, হা/৩৮৬৩।
[৪৪]. আবূ দাঊদ, হা/৩৮৬০; তিরমিযী, হা/২০৫১।
[৪৫]. ছহীহ মুসলিম, হা/২২০৫।
[৪৬]. শারহুস সুন্নাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ১২৪।
[৪৭]. আবূ দাঊদ, হা/৩৪৬১।




প্রসঙ্গসমূহ »: আমল দু‘আ
ইসলামী জামা‘আতের মূল স্তম্ভ (৩য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
আল-কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
আধুনিক যুগে দাওয়াতী কাজের পদ্ধতি (২য় কিস্তি) - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
দু‘আ ও যিকর : আল্লাহর অনুগ্রহ ও প্রশান্তি লাভের মাধ্যম - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
যিলহজ্জ মাসের আমল ও তার ফযীলত - মুহাম্মাদ জাহিদুল ইসলাম
কর্যে হাসানাহ প্রদানের গুরুত্ব ও ফযীলত - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : মুহাম্মদ ইমরান বিন ইদরিস
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৩য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইসলামে পর্দার বিধান - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ইমাম মাহদী, দাজ্জাল ও ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর আগমন সংশয় নিরসন (৫ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
ইসলামী সংগঠন ও তরুণ-যুবক-ছাত্র - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
ইখলাছই পরকালের জীবনতরী (শেষ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী

ফেসবুক পেজ