কাফেরদের হত্যা করাই কি আল্লাহর পথে জিহাদ
- মূল : শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল মুহসিন আল-বদর
- অনুবাদ : মাহফূজ সাত্তার*
দ্বীনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় হলো, মানব রক্তের মর্যাদা। আল্লাহ তা‘আলা মানুষের জীবনকে পবিত্র ও সম্মানিত করেছেন এবং অন্যায়ভাবে রক্তপাতের বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। এই ক্ষেত্রে সামান্য শিথিলতা কিংবা রক্তের হুরমত লঙ্ঘন করাকে তিনি মহাপাপ ও ব্যাপক বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এমন অপরাধের জন্য আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ও কঠোর ধমকের ঘোষণা করেছেন।
ইসলামের সুস্পষ্ট নীতি হলো, যে কোনো হত্যা যদি শরী‘আতসম্মত পদ্ধতিতে না হয়, হোক সে নিহত ব্যক্তি মুসলিম কিংবা কাফের, তাহলে তা হারাম। বরং ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি কাবীরা গুনাহ এবং ধ্বংসাত্মক অপরাধ। যে ব্যক্তি এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে ইসলামের জিহাদ কিংবা বৈধ কর্ম বলে মনে করে, সে প্রকৃতপক্ষে পথভ্রষ্ট। সে মুসলিমদের ইজমা থেকে বিচ্যুত, এমনকি আসমানি শরী‘আতের সর্বজনস্বীকৃত নীতিমালার সঙ্গেও তার কোনো সম্পর্ক নেই। এই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা লাভের জন্য মূসা (আলাইহিস সালাম) -এর ঘটনাটি গভীরভাবে চিন্তা করার দাবি রাখে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ دَخَلَ الۡمَدِیۡنَۃَ عَلٰی حِیۡنِ غَفۡلَۃٍ مِّنۡ اَہۡلِہَا فَوَجَدَ فِیۡہَا رَجُلَیۡنِ یَقۡتَتِلٰنِ ٭۫ ہٰذَا مِنۡ شِیۡعَتِہٖ وَ ہٰذَا مِنۡ عَدُوِّہٖ ۚ فَاسۡتَغَاثَہُ الَّذِیۡ مِنۡ شِیۡعَتِہٖ عَلَی الَّذِیۡ مِنۡ عَدُوِّہٖ ۙ فَوَکَزَہٗ مُوۡسٰی فَقَضٰی عَلَیۡہِ ٭۫ قَالَ ہٰذَا مِنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ عَدُوٌّ مُّضِلٌّ مُّبِیۡنٌ - قَالَ رَبِّ اِنِّیۡ ظَلَمۡتُ نَفۡسِیۡ فَاغۡفِرۡ لِیۡ فَغَفَرَ لَہٗ ؕ اِنَّہٗ ہُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ - قَالَ رَبِّ بِمَاۤ اَنۡعَمۡتَ عَلَیَّ فَلَنۡ اَکُوۡنَ ظَہِیۡرًا لِّلۡمُجۡرِمِیۡنَ - فَاَصۡبَحَ فِی الۡمَدِیۡنَۃِ خَآئِفًا یَّتَرَقَّبُ فَاِذَا الَّذِی اسۡتَنۡصَرَہٗ بِالۡاَمۡسِ یَسۡتَصۡرِخُہٗ ؕ قَالَ لَہٗ مُوۡسٰۤی اِنَّکَ لَغَوِیٌّ مُّبِیۡنٌ - فَلَمَّاۤ اَنۡ اَرَادَ اَنۡ یَّبۡطِشَ بِالَّذِیۡ ہُوَ عَدُوٌّ لَّہُمَا ۙ قَالَ یٰمُوۡسٰۤی اَتُرِیۡدُ اَنۡ تَقۡتُلَنِیۡ کَمَا قَتَلۡتَ نَفۡسًۢا بِالۡاَمۡسِ ٭ۖ اِنۡ تُرِیۡدُ اِلَّاۤ اَنۡ تَکُوۡنَ جَبَّارًا فِی الۡاَرۡضِ وَ مَا تُرِیۡدُ اَنۡ تَکُوۡنَ مِنَ الۡمُصۡلِحِیۡنَ
‘আর মূসা নগরীতে প্রবেশ করলেন, যখন এর অধিবাসীরা ছিল অসতর্ক। সেখানে তিনি দু’টি লোককে সংঘর্ষে লিপ্ত দেখলেন, একজন তার নিজ দলের এবং অন্যজন তার শক্রদলের। অতঃপর মূসার দলের লোকটি ওর শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করল, তখন মূসা তাকে ঘুষি মারলেন; এভাবে তিনি তাকে হত্যা করে বসলেন। মূসা বললেন, এটা শয়তানের কাণ্ড। সে তো প্রকাশ্য শত্রু ও বিভ্রান্তকারী। তারপর তিনি দু‘আ করে বললেন, হে আমার রব! আমি তো আমার নিজের প্রতি যুলুম করেছি; কাজেই আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর তিনি তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এরপর বললেন, হে আমার রব! আপনি যেহেতু আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আমি কখনো অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না। অতঃপর ভীত সতর্ক অবস্থায় সে নগরীতে তার ভোর হল। হঠাৎ তিনি শুনতে পেলেন, আগের দিন যে ব্যক্তি তার কাছে সাহায্য চেয়েছিল, সে সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে। মূসা তাকে বললেন, তুমি তো স্পষ্টই একজন বিভ্রান্ত ব্যক্তি। অতঃপর মূসা যখন উভয়ের শত্রুকে পাকড়াও করতে উদ্যত হল, তখন সে ব্যক্তি বলে উঠল, হে মূসা! গতকাল তুমি যেমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, তেমনি আমাকেও কি হত্যা করতে চাও? তুমি তো পৃথিবীতে কেবল স্বেচ্ছাচারী হতে চাও; শান্তি স্থাপনকারী হতে চাও না!’ (সূরা আল-ক্বাছাছ, ২৮ : ১৫-১৯)।
এই ঘটনার বিবরণ থেকে আমরা দেখতে পাই, যে ব্যক্তি মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট সাহায্য চেয়েছিল, সে ছিল তারই গোত্রভুক্ত একজন ইসরাঈলি মুসলিম। আর যার বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করা হয়েছিল, সে ছিল এক কিবতী কাফের।[১]
ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ঐ কিবতী ব্যক্তি ইসরাঈলি মুসলিমের ওপর যুলুম করছিল। যুলুম প্রতিহত করার উদ্দেশ্যেই মূসা (আলাইহিস সালাম) এগিয়ে যান। তার উদ্দেশ্য কখনোই কাউকে হত্যা করা ছিল না। কিন্তু মূসা (আলাইহিস সালাম) যেহেতু শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন, তাই তার একটি আঘাতই অনাকাক্সিক্ষতভাবে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়ায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘মূসা তাকে ঘুষি মারলেন এভাবে তিনি তাকে হত্যা করে বসলেন’ (সূরা আল-ক্বাছাছ, ২৮ : ১৫)।
অর্থাৎ তিনি তার দু’হাতের তালু দিয়ে তার বুকে আঘাত করলে সে মৃত্যুবরণ করে। অথচ বাস্তবে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর কোনো হত্যার ইচ্ছা ছিল না।[২]
হাফেয ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ঐ কিবতী ব্যক্তি কাফের মুশরিক ছিল। তবুও মূসা (আলাইহিস সালাম) তাকে হত্যা করতে চাননি। তিনি কেবল তাকে প্রতিহত করতে ও যুলুম থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিলেন। এরপরও মূসা (আলাইহিস সালাম) গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করে বলেন,
قَالَ ہٰذَا مِنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ عَدُوٌّ مُّضِلٌّ مُّبِیۡنٌ - قَالَ رَبِّ اِنِّیۡ ظَلَمۡتُ نَفۡسِیۡ فَاغۡفِرۡ لِیۡ فَغَفَرَ لَہٗ ؕ اِنَّہٗ ہُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ - قَالَ رَبِّ بِمَاۤ اَنۡعَمۡتَ عَلَیَّ فَلَنۡ اَکُوۡنَ ظَہِیۡرًا لِّلۡمُجۡرِمِیۡنَ
‘মূসা বললেন, এটা শয়তানের কাণ্ড। সে তো প্রকাশ্য শত্রু ও বিভ্রান্তকারী। তারপর তিনি দু‘আ করে বললেন, হে আমার রব! আমি তো আমার নিজের প্রতি যুলুম করেছি; কাজেই আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর তিনি তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এরপর বললেন, হে আমার রব! আপনি যেহেতু আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আমি কখনো অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না’ (সূরা আল-ক্বাছাছ, ২৮ : ১৫-১৭)।
এর দ্বারা বোঝা যায়, মূসা (আলাইহিস সালাম) তার এক অনিচ্ছাকৃত আঘাতে একটি কাফের কিবতীর প্রাণনাশ হওয়ায় লজ্জিত ও আফসোসে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন, যদিও ঐ কিবতী ছিল বনী ইসরাঈলের ওপর যুলুমকারী। তিনি এই ঘটনাকে শয়তানের প্ররোচনার ফল বলে আখ্যায়িত করেন এবং উপলব্ধি করেন যে, এর মাধ্যমে তিনি নিজের ওপরই যুলুম করেছেন। তাই তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং খালেছভাবে তাওবা করেন।
হাসান আল-বাছরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, যে সময় মূসা (আলাইহিস সালাম) ঐ কিবতীকে আঘাত করেছিলেন, সে সময় কাফেরকে হত্যা করা বৈধ ছিল না। কারণ সে সময়টি ছিল যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার সময়কাল।[৩]
এই ঘটনাতে আমাদের জন্য বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে, যা গভীরভাবে চিন্তা করা একান্ত প্রয়োজন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো,
১. মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর দ্বারা সংঘটিত হত্যাটি ছিল সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ও ভুলবশত; এটি কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃত হত্যা ছিল না।
২. নিহত ব্যক্তি কাফের ও মুশরিক হওয়ার পাশাপাশি একজন যালেমও ছিল, যে একজন ইসরাঈলি মুসলিমের ওপর সীমালঙ্ঘন করছিল। তবুও তার অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর জন্য মূসা (আলাইহিস সালাম) নিজেকে দায়ী মনে করেছেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।
৩. নিহত ব্যক্তিটি বনী ইসরাঈলের কঠোর শত্রু গোত্রের ছিল। তারা বানি ইসরাঈলের ছেলে সন্তানদের হত্যা করেছিল এবং নারীদের জীবিত রেখেছিল।
৪. মুসা (আলাইহিস সালাম) এ অবস্থায় কিবতীকে হত্যা করা শয়তানের কাজ বলে গণ্য করেছেন। কেননা শয়তান বনু আদমের প্রকাশ্য শত্রু। তাদের সঠিক পথ হতে বিচ্যুতকারী।
৫. মুসা (আলাইহিস সালাম) নিজের কর্মকে যুলুম হিসেবে গন্য করেছেন। এজন্য তিনি দুআ করে বলেন, رَبِّ اِنِّیۡ ظَلَمۡتُ نَفۡسِیۡ فَاغۡفِرۡ لِیۡ ‘হে আমার রব! আমি তো আমার নিজের প্রতি যুলুম করেছি; কাজেই আপনি আমাকে ক্ষমা করুন’ (সূরা আল-ক্বাছাছ, ২৮ : ১৬)।
৬. তিনি বুঝেছিলেন, এটি একটি গুরুতর ভুল, যার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা আবশ্যক। তাই তিনি বলেন, ‘অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন’।
৭. তিনি আল্লাহ তা‘আলার নিকট অঙ্গীকার করেন যে, ভবিষ্যতে তিনি কখনোই অপরাধ ও পাপের কাজে কাউকে সাহায্য করবেন না। এ অঙ্গীকারই প্রতিফলিত হয়েছে তার সেই প্রার্থনায়, ‘হে আমার রব! আপনি যেহেতু আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আমি কখনো অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না’।
এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে, ইসলাম কখনোই অবৈধ হত্যাকে জিহাদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। বরং ন্যায়, সংযম ও আল্লাহর নির্ধারিত সীমার ভেতরে থেকেই প্রতিটি কাজ সম্পাদন করাই ইসলামের মূল শিক্ষা।
(বিস্তারিত জানতে পড়ুন, শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল মুহসিন আল বদর রচিত “জিহাদ : ভ্রান্তির বেড়াজালে যুবসমাজ, উত্তরণের উপায়” বইটি প্রকাশিতব্য)
* অধ্যয়নরত, হায়ার ডিপ্লোমা (শরী‘আহ), মাদরাসা মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া, উত্তর যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
তথ্যসূত্র :
[১]. তাফসীর আত-ত্বাবারী, ১৮তম খণ্ড, পৃ. ১৮৬; তাফসীর আবুল মুযাফ্ফর সাম‘আনী, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১২৮।
[২]. তাফসীর আত-ত্বাবারী, ১৮তম খণ্ড, পৃ. ১৮৯-১৯০; তাফসীরুল কাসেমী, ১২তম খণ্ড, পৃ. ৪৬৯৯।
[৩]. তাফসীর কুরতুবী, ১৩তম খণ্ড, পৃ. ১৭৩; তাফসীরুল কাসেমী, ১২তম খণ্ড, পৃ. ৪৬৯৯।