সৎ স্ত্রীর গুণাবলী
- মূল: আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল মুহসিন আল-বদর
- অনুবাদ: সাইনুল ইসলাম বিন শাহজাহান আলী*
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর কাছেই সাহায্য চাই, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁরই কাছে তাওবা করি। আমরা আমাদের নিজেদের খারাপি এবং আমাদের মন্দ কাজসমূহের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। যাকে আল্লাহ হেদায়াত দেন, আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে কেউ হেদায়াত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। তাঁর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সকল ছাহাবীর উপর আল্লাহর দরূদ ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর এখানে আলোচনার বিষয় হলো ‘সৎ স্ত্রীর গুণাবলী’। তবে এই বক্তব্য কেবলমাত্র বিবাহের পথে অগ্রসর তরুণী, যে জানতে চায়, সৎ স্ত্রীর গুণাবলী কী এবং নিজেকে তা ধারণ করার জন্য প্রস্তুত করতে চায়, এদের সাথেই সীমাবদ্ধ নয়। একইভাবে, এটি শুধু সেই বিবাহিত নারীর সাথেও সীমাবদ্ধ নয়, যে সৎ স্ত্রীর গুণাবলী নিজের মধ্যে রাখতে ভালোবাসে এবং জীবনে তা ধরে রাখার চেষ্টা করে। তদ্রুপ, এটি শুধুমাত্র সেই গাফেল নারীর জন্যও নয়, যার মধ্যে কিছু ঘাটতি আছে, তাকে সংশোধন করা এবং তার অপূর্ণতাগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে যেন সে তার বিবাহিত জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারে, এ উদ্দেশ্যেও সীমাবদ্ধ নয়।
বরং এটি আরও বিস্তৃত একটি বক্তব্য ও স্মরণিকা। এটি হলো পিতার জন্য এক স্মরণিকা, যিনি চান তার কন্যারা ও তার অধীনে যারা আছে তারা সুন্দর চরিত্রে বেড়ে উঠুক, মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করুক এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর ইচ্ছার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করুক। এতে যেন কন্যাদেরকে শরী‘আতের নিয়ম-কানুন এবং যেসব গুণাবলী একজন মেয়ের মধ্যে গড়ে তোলা উচিত তা স্মরণ করিয়ে দিতে সহায়তা হয়।
এটি হলো মায়ের জন্যও এক স্মরণিকা। কারণ তিনি তার ঘরে একজন রক্ষক এবং তার কন্যাদের জন্য দায়িত্বশীল ও দিকনির্দেশক। বহু কন্যাই তাদের মায়ের কাছ থেকে বিভিন্ন চরিত্র ও গুণাবলী অর্জন করে বড় হয়।
এটি একইভাবে দাঈদের (দাওয়াত দাতাদের) জন্যও এক স্মরণিকা, যাতে তারা এ বিষয়ে যত্নবান হয়, মনোযোগ দেয় এবং প্রচেষ্টা চালায় এই মহৎ গুণাবলী, সুন্দর চরিত্র ও বরকতময় আচরণ সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। যেন ঈমানী সমাজে ও মুমিনদের ঘরে কন্যা ও নারীদের মাঝে এ গুণাবলী প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিশেষত আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন নারীকে এমনভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, যা ইতিহাসের অন্য কোনো যুগে হয়নি। বহুবিধ মাধ্যম, নানান চ্যানেল এবং বহু উপায়ে তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে, তার সতীত্ব, ইজ্জত, পূর্ণতা, অলংকার, সৌন্দর্য, ঈমান, চরিত্র ও নৈতিকতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে।
আর যখন আমরা সৎ স্ত্রীর গুণাবলী এবং সালাহ (সৎকর্মশীলতা) নিয়ে আলোচনা করি, তখন আমাদের সামনে থেকে কখনোই আড়াল হয়ে থাকা উচিত নয়, একটি মহান নীতি, যা এই বিষয়ের মূলভিত্তি এবং সালাহ সততা অর্জন, লাভ ও প্রাপ্তির মূল ভিত্তি।। আর সেটি হলো,
প্রথমতঃ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার তাওফীক্ব, তাঁর হেদায়াত, তাঁর সাহায্য, তাঁর সহজীকরণ এবং তাঁর সংশোধন। কারণ হেদায়াত দাতা হলেন আল্লাহ, তাওফীক্ব দাতা হলেন আল্লাহ এবং সকল বিষয় তাঁরই হাতে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, مَنۡ یَّہۡدِ اللّٰہُ فَہُوَ الۡمُہۡتَدِ ۚ وَ مَنۡ یُّضۡلِلۡ فَلَنۡ تَجِدَ لَہٗ وَلِیًّا مُّرۡشِدًا ‘আল্লাহ যাকে হেদায়াত দেন, সেই হেদায়াতপ্রাপ্ত। আর যাকে তিনি গুমরাহ করেন, আপনি তার জন্য কোনো হেদায়াতকারী অভিভাবক পাবেন না’ (সূরা আল-কাহফ : ১৭)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَ اللّٰہُ یَدۡعُوۡۤا اِلٰی دَارِ السَّلٰمِ ؕ وَ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ ‘আর আল্লাহ শান্তির আবাসের দিকে ডাকেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল সঠিক পথের দিকে হেদায়াত করেন’ (সূরা ইউনুস : ২৫)। সুতরাং, হেদায়াত তাঁর হাতে, সালাহ (সৎকর্মশীলতা) তাঁর হাতে এবং তাওফীক্বও তাঁর হাতে। আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই হয় এবং তিনি যা ইচ্ছা না করেন, তা হয় না। আর মহান ও সর্বোচ্চ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইখতিয়ার ও শক্তি নেই।
দ্বিতীয়তঃ মানুষের চেষ্টা-সাধনা, পরিশ্রম ও সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সালাহ (সৎকর্মশীলতা) অর্জন করা, তা কামনা করা এবং এর উপায় ও মাধ্যম অবলম্বন করা। নবী (ﷺ) এই দু’টি বিষয়কে একত্র করেছেন তাঁর ছহীহ হাদীছে। তিনি (ﷺ) বলেছেন, احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللهِ ‘যাতে তোমার উপকার রয়েছে তা অর্জনে তুমি আগ্রহী হও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা কর’।[১]
আর একটি মূলনীতি রয়েছে, যার প্রতি মনোযোগ দেয়া অপরিহার্য; তা হলো : সকল সৎকর্মের উৎস, তা জানার মূল উপায় এবং এর জ্ঞান ও হেদায়াত লাভের পথ হলো আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাহ। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنَ یَہۡدِیۡ لِلَّتِیۡ ہِیَ اَقۡوَمُ ‘নিশ্চয় এই কুরআন এমন পথের নির্দেশনা দেয়, যা সর্বাধিক সরল ও সুদৃঢ়’ (সূরা আল-ইসরা : ৯)। পবিত্র কুরআনে এই ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন (উপর্যুক্ত আয়াত)। আর সম্মানিত নবী (ﷺ)-এর সুন্নাহ ও হেদায়াতের ব্যাপারে তিনি বলেছেন, تركت فيكم شيئين لن تضلوا بعدهما : كتاب الله و سنتي ‘আমি তোমাদের মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে গেলাম, তোমরা এ দু’টি আঁকড়ে ধরলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না; আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ’।[২]
আর একটি তৃতীয় মূলনীতি রয়েছে : এটি এমন একটি ভিত্তি যার উপর সব ইবাদত প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর উপরই সব গুণাবলী ও পূর্ণতা দাঁড়িয়ে থাকে। আর সেটি হলো আল্লাহ তা‘আলার তাক্বওয়া অর্জন করা।
নিশ্চয়ই তাক্বওয়া হলো সব গুণাবলীর মূলভিত্তি, সব কল্যাণের উৎস এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতার আসল ভরসা। একজন মুসলিমা নারীর কর্তব্য হলো বুঝে রাখা যে, শরী‘আতের আদব-আখলাক মেনে চলা এবং উত্তম গুণাবলী দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করা, এগুলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম, যার দ্বারা সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে এবং তাঁর সওয়াব ও পুরস্কার অর্জন করবে। আর এগুলোতে অবহেলা করলে, যতটুকু অবহেলা করবে, ঠিক ততটুকুই তার কাছে থেকে সেই পুরস্কার ও গুণাবলী হারিয়ে যাবে।
আর এগুলো হলো সৎ স্ত্রীর গুণাবলী সম্পর্কে কিছু কথা। আমি আল্লাহ পরম দয়ালু, মহান আরশের মালিক আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি যে, তিনি এ লেখাকে কল্যাণ ও উপকারিতায় পরিপূর্ণ করুন, একে কল্যাণের চাবি এবং অকল্যাণের তালা বানান, এর মাধ্যমে যেন অন্তরসমূহ হেদায়াত পায়, নফসসমূহের সংস্কার হয়, আর সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়, তাঁর ভালোবাসা পাওয়া যায় এবং যা তাঁকে অসন্তুষ্ট করে ও ক্রুদ্ধ করে, তা থেকে দূরে রাখা যায়। সুতরাং আমি বলি, আর আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করি।
আমি শুরু করছি সূরা আন-নিসায় উল্লেখিত সৎ স্ত্রীর গুণাবলী থেকে। মহান আল্লাহ বলেন, فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ‘অতএব সৎ স্ত্রীগণ অনুগত হয়, আর স্বামী অনুপস্থিত থাকাকালে আল্লাহ যা রক্ষা করেছেন তারই কারণে তারা স্বীয় সতীত্ব রক্ষা করে’ (সূরা আন-নিসা : ৩৪)।
এই আয়াতের অংশটুকু এ বিষয়ের মৌলিক সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ব্যাখ্যা ও অর্থে সৎ স্ত্রীর প্রতিটি উত্তম গুণ ও মহৎ বৈশিষ্ট্যকে একত্র করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, যে স্ত্রী দুটি গুণের সমন্বয় ঘটায়।
প্রথম গুণ : এটি তার রবের সাথে সম্পর্কিত। আল্লাহর বাণী (قٰنِتٰتٌ) এর মধ্যে এ গুণের উল্লেখ আছে। আর কুনুত অর্থ হলো আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকা, আল্লাহর ইবাদতে যত্নবান থাকা, তাঁর আনুগত্যের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা, ইসলামের ফরযসমূহ ও দ্বীনের ওয়াজিবসমূহ রক্ষা করা এবং এগুলোতে গাফেলতি বা অপচয় না করা।
দ্বিতীয় গুণ : এটি স্বামীর সাথে স্ত্রীর সম্পর্কের সাথে সম্পৃক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ অর্থাৎ ‘আর স্বামী অনুপস্থিত থাকাকালে আল্লাহ যা রক্ষা করেছেন তারই কারণে তারা স্বীয় সতীত্ব রক্ষা করে’। তেমনি উপস্থিতিতেও স্বামীর সম্পদ রক্ষা করে, তার শয্যা রক্ষা করে, তার হক্বসমূহ রক্ষা করে এবং তার দায়িত্ব-অধিকারগুলো সংরক্ষণ করে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বাণী এসেছে,
إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا وَصَامَتْ شَهْرَهَا وَحَفِظَتْ فَرْجَهَا وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا قِيلَ لَهَا ادْخُلِى الْجَنَّةَ مِنْ أَىِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شِئْتِ
‘যখন কোনো নারী তার পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত পড়ে, তার (রামাযান) মাসের ছিয়াম পালন করে, তার লজ্জাস্থানের হেফাযত করে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করে, তখন সে জান্নাতের যে কোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে’।[৩]
(ইনশাআল্লাহ আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
* ফাযিল (সমমান স্নাতক), ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়, বি.এ অনার্স, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৪।
[২]. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৩১৯, সনদ ছহীহ।
[৩]. ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৪১৬৩, সনদ ছহীহ।