শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৮ অপরাহ্ন

শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী: মুসলিম বিশ্বে তার অবদান

ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী*



ভূমিকা

মহান আল্লাহ আল-কুরআনুল কারীমে মুসলিমদের ‘খাইরুল উম্মাহ’ বা উত্তম জাতি হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন- ‘নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি অতি উত্তম অবয়বে’।[১] আবার আল-কুরআনের অন্য আয়াতে বলা হয়েছে- ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দিবে ও অন্যায় কাজে বাধা দিবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে’।[২] যুগে যুগে পৃথিবীতে আগমনকারী মহান ব্যক্তিদের পরিচয় না জানলে বা তাদের সুহবত না পেলে বুঝা যেত না আমরা মুসলিমরাই সর্বোত্তম জাতি। কেননা আমাদের বর্তমান অবস্থা হচ্ছে নিকৃষ্ট জাতির ন্যায়, যা কুরআনে ‘আমি মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি’। বলা হয়েছে- ‘অতঃপর আমি তাকে নামিয়ে দিয়েছি নীচু থেকে নীচু স্তরে’।[৩]

নবীদের পর ছাহাবী, তাবিঈ, তাবি-তাবিঈ, মুজতাহিদ, সম্মানিত ইমামগণ এবং পরবর্তী সালাফ বা ওলামায়েকেরাম যারা এসেছিলেন, তারাই উক্ত আয়াতের বাস্তব রূপ দেখিয়েছেন এবং উম্মাহর সামনে আদর্শ হিসাবে নিজেদেরকে উপস্থাপন করে গেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় মুসলিম মহামনীষীরা ছড়িয়ে পড়েছেন পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। আরব, আফ্রিকা, এশিয়া-দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী মহান আল্লাহ মহাপুরুষদের প্রেরণ করেছেন। বলা যায় তাদের মাধ্যমেই আল্লাহ তার সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলামের প্রচার ও প্রসারের কাজ অব্যাহত রেখেছেন। উপমহাদেশের কিংবদন্তী মহাপুরুষদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ)। মুসলিম পুনর্জাগরণ, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও শিক্ষা বিস্তারের অগ্রদূত হিসাবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে তাঁর সৃষ্টি ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ নামক গ্রন্থটি মুসলিম জাতির জন্য দলীল এবং পথহারা মানুষের দিকনির্দেশক। লেখক উক্ত বইয়ে তাওহীদ, রিসালাত, ফিক্বহ, মানবিক জীবন, রাষ্ট্রনীতি, ছালাত, যাকাত সহ দ্বীনের প্রকৃত রহস্য নিয়ে আলোচনা করেছেন নিবীড়ভাবে। যা গবেষণার যোগ্য একটি গ্রন্থ।

তাছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার মুজাদ্দিদ[৪] খ্যাত, সমাজ সংস্কারক শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ) -এর জীবনীতেও রয়েছে মুসলিম জাতির শিক্ষণীয় বিষয়। তাই হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ও এর লেখক শাহ ওয়ালীউল্লাহর জীবনকে নিয়ে আমাদের গবেষণা। জ্ঞানপিপাসু পাঠকরা এ গবেষণা কর্ম থেকে উপকৃত হবেন, ইনশাআল্লাহ। পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কর্মের কারণে অনেকেই মুজাদ্দিদ বা মহাসংস্কারক হিসাবে আবির্ভূত হন। উপমহাদেশে শাহ ওয়ালীউল্লাহ একজন সার্থক মুজাদ্দিদ হিসাবেই সুপরিচিত। শাহ ওয়ালীউল্লাহ সম্পর্কে বিশ্ববিখ্যাত অন্ধ আরবী কবি আবুল ‘আলা আল-মা‘আররির কবিতার নিম্নোক্ত শ্লোকটি যথার্থই মিলে যায়-

و إني و ان كنت الأخيرة زمانةٌ   * لآت بما لم تستطعه الأوائل

‘সময়ের বিবেচনায় যদিও আমি শেষে এসেছি, তবে আমি এমন কিছু নিয়ে এসেছি, যা পূর্বসূরীগণও আনতে সক্ষম হননি’।[৫] নিম্নে শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভীর পূর্ণাঙ্গ জীবনী এবং তার সমকালীন প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা হল।

ক. শাহ ওয়ালীউল্লাহ ও সমকালীন প্রেক্ষাপট

আঠারো শতকের পূর্ব থেকেই ভারতের রাজধানী দিল্লীসহ উপমহাদেশের অন্যান্য এলাকার মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থা নাজুক পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। সে সময় কুরআনের তরজমাও নিষিদ্ধ ছিল। ইলমে হাদীছের চর্চা বলতে কিছুই ছিল না, পূর্বে যা ছিল তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দরবারী আলেমদের জারিকৃত ফাতাওয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল জনতা, যার বিরোধিতা করা রীতিমত দুঃসাহসের ব্যাপার ছিল।[৬] মাযার বা দরগার বিদ‘আতী পীরদের জয়-জয়কার ছিল। জ্যোতিষীর মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষার বদ অভ্যাস ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল। জ্যোতিষী বা গণকের কাছে যাওয়া ছাড়া জনসাধারণের যেন উপায়ই ছিল না। সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কোন কাজ করতে গেলে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগীসহ দুধ পর্যন্ত কাজের ভিত্তিপ্রস্তরের স্থানে ঢেলে দিত।[৭] তাছাউওফের[৮] নবাবিস্কৃত হাকীকত, তরীকত ও মা‘রিফাতের মিথ্যা ছায়ায় ইসলামের স্বচ্ছ আলো ঢেকে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। হিন্দু-মুসলিম যেন একাকার। শায়খ আহমাদ সারহিন্দী (৯৭১-১০৩৭ হিজরী মোতাবেক ১৫৬৪-১৬২৪ খৃ.) সংস্কারের যে বীজ বপন করেছিলেন, শতবর্ষের ব্যবধানে তা স্তিমিত হয়ে এসেছিল। সম্রাটের প্রাসাদ হতে গরীবের পর্ণকুটীর পর্যন্ত বিস্তৃত কুসংস্কারের শিকড় উৎপাটনের জন্য সমগ্র সমাজ একজন দূরদর্শী চিন্তানায়কের আগমনের জন্য পথ চেয়ে ছিল। এমনি অবস্থায় আল্লাহর অপার অনুগ্রহে ‘ফাতাওয়া আলমগীরী[৯]’র অন্যতম সংকলক ও দিল্লীর মাদরসা রহীমিয়ার প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা আব্দুর রহীমের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন ভারত উপমহাদেশের প্রেরণা সৃষ্টিকারী ও আধুনিক যুগের অগ্রনায়ক কুতুবুদ্দীন আহমাদ ইবন আব্দুর রহীম ফারূকী ওরফে শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী রহিমাহুল্লাহ (১১১৪-১১৭৬ হি./১৭০৩-১৭৬২ খৃ.)।[১০] পরবর্তীতে তাঁরই স্বনামধন্য পৌত্র শাহ ইসমাঈল ইবন আব্দুল গণী ইবন শাহ ইসমাঈল (১১৯৩-১২৪৬ হি./১৭৭৯-১৮৩১ খৃ.) জিহাদ আন্দোলনের[১১] মাধ্যমে ব্যাপক সামাজিক বিপ্লবের রূপ ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।

ভারতের মোগল সম্রাট মুহিউদ্দীন আলমগীরের (আওরঙ্গজেব) মৃত্যুর (১৭০৭ খ্রি.) পর তাঁর দুর্বল ও অযোগ্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উচ্চাভিলাষী আমীর-ওমরার মধ্যে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বিস্তারের দলগত কোন্দলের ফলে এক অসহনীয়, অরাজকতাপূর্ণ অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে।[১২] এমতাবস্থায় উপমহাদেশে মারাঠা শক্তির উত্থান হয় এবং তারা দেশের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং গ্রামের পর গ্রাম লুণ্ঠন করে ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করে।[১৩] এমনকি মারাঠারা একবার দিল্লীর লালকেল্লার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে সেখানে অবস্থিত দেওয়ান-ই-খাসের ছাদের রৌপ্য খুলে নিয়ে যায় এবং বহু মুসলিম ছূফী-সাধকের মাযারে রক্ষিত স্বর্ণ-রৌপ্য লুণ্ঠন করে।[১৪] আহমদ শাহ আবদালী ১৭৬১ সনে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে মারাঠাদেরকে পরাজিত করেন। উক্ত যুদ্ধে বহু সংখ্যক মারাঠা নিহত হওয়ার ফলে সাময়িকভাবে হলেও মারাঠাশক্তি স্তিমিত হয়ে যায়। সমসাময়িককালে উপমহাদেশের মুসলিমদের দ্বিতীয় শত্রু ছিল নবউত্থিত শিখ শক্তি। আহমদ শাহ আবদালীর উত্তরাধিকারী জামান শাহ শিখদের কার্যকলাপে খুশি হয়ে এক শিখ প্রধানের পুত্র রণজিৎ সিংহকে লাহোরের প্রশাসক নিয়োগ করেন।[১৫] উচ্চাভিলাষী রণজিৎ সিংহ দ্রুত পাঞ্জাবের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে অত্র এলাকায় একটি শিখ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।[১৬] নব প্রতিষ্ঠিত শিখ রাজ্যে মুসলিমদের জীবন ও সম্পদ সার্বক্ষণিক লুণ্ঠিত হতে থাকে। মুসলিমদের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন আচরণ শুরু করা হয়। এমনকি এ রাজ্যে উচ্চৈঃস্বরে আযান দেয়া নিষিদ্ধ ছিল। তারা ক্রমান্বয়ে মুসলিম জনপদ এবং মসজিদ ধ্বংস করতে থাকে। লুঠতরাজ ও খুন খারাবী ছিল তাদের প্রধান মূলনীতি।[১৭]

সে সময় ছিল জ্ঞানচর্চা, বহুসংখ্যক পণ্ডিত ব্যক্তির উপস্থিতি, হাদীছে নববীর সাথে সম্পৃক্ততা, শাসকদের ধার্মিকতা, আক্বীদা-বিশ্বাসে পোক্ততা এবং প্রতিষ্ঠিত ছিল যথেষ্ট পরিমাণ মসজিদ-মাদ্রাসা। সাধারণত মুসলিমবিশ্বের উত্থান-পতন লক্ষ্য করা যেত। মানুষের মাঝে চারিত্রিক বিপর্যয় ঘটেছিল এবং সমাজে নেমেছিল ধস। অনারব-অমুসলিমদের অনেক প্রথা-প্রচলন, অভ্যাস ও রীতিনীতি মুসলিমদের মধ্যে প্রবেশ করেছিল। শাসকদের মধ্যে নেতৃত্বের-মোহ ঢুকে পড়েছিল, আমীর ও ধনী ব্যক্তিদের মাঝে প্রাচুর্য্যরে প্রভাব পড়েছিল। আর কোন কোন স্থানে বিজাতিদের আদর্শ ও চিন্তাধারা মুসলিমদের মাঝে মিশে গিয়েছিল। সমাজের বিভিন্ন স্তরে অলসতা, উদাসীনতা, বেকারত্ব, সরকারি দরবারের সাথে ঘনিষ্ঠতা, ওঠা-বসা ও খোশামোদের অভ্যাস প্রকট হয়ে উঠেছিল। সঠিক তাওহীদের সীমা অতিক্রম, আউলিয়ায়ে কেরামের স্তুতি ও মাত্রাতিরিক্ত সম্মানপ্রদর্শন, কবরপূজা এবং কোথাও কোথাও মানুষকে সিজদার মত জঘন্য শিরক করার চিত্রও পরিলক্ষিত হত ।

আমেরিকান লেখক ড. লুফারাপে স্টাডার্ডে তার জগদ্বিখ্যাত ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অফ ইসলাম (ঘবি ড়িৎষফ ড়ভ রংষধস) বা ‘আধুনিক মুসলিমবিশ্ব’ গ্রন্থে আঠারো খ্রিষ্টশতকের মুসলিমবিশ্বের চিত্র তুলে ধরেছেন। যাতে কোন কোন পৃষ্ঠায় অতিরঞ্জন ও অমিল পাওয়া গেলেও তাতে সেসময়কার এমন বহু চিত্র উঠে এসেছে, যা যথেষ্ঠ আপত্তিকর ও লজ্জার। তিনি লিখেছেন, ‘আঠারো শতকে মুসলিমবিশ্ব দুর্বলতার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। সঠিক শক্তির প্রভাব কোথাও দেখা যেত না। সর্বত্রই ছিল অধঃপতন ও স্থবিরতা। সভ্যতা, ভদ্রতার নাম পর্যন্ত ছিল না, চরিত্র ছিল ঘৃণ্য, হতাশাজনক’।[১৮]

❖ রাজনৈতিক অবস্থা  

শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর জন্ম হয় সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর (মৃত্যু ১১১৮ হি.)-এর মৃত্যুর চার বছর পূর্বে হিজরী ১১১৪ সালে। সংরক্ষিত ইতিহাসের আলোকে জানা যায়, সম্রাট আলমগীর এই উপমহাদেশের সম্রাট অশোকে (মৃত্যু: খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৩)-এর পরে ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় শাসক। তার রাজত্ব ভারতবর্ষের সকল সম্রাটের রাজত্ব অপেক্ষা সর্বাধিক বিস্তৃত ছিল। ক্যমব্রিজ হিস্ট্রোরি রচয়িতা লেখেন, ‘তার শাসন গযনী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এবং কাশ্মির থেকে করনাটক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল’।[১৯] আরেক ঐতিহাসিক লিখেছেন ‘প্রাচীন যুগ থেকে ইংরেজ আমল পর্যন্ত ভারতবর্ষের এতো দীর্ঘ ও বিস্তৃত শাসন কখনোই প্রতিষ্ঠিত হয়নি’।[২০] পূর্বের সম্রাটদের তুলনায় সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। তিনি কুরআনুল কারীমের হাফিজ হওয়ার কারণে কুরআনের বেশ কিছু খেদমত করেছেন। ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য থাকায় সম্রাট হওয়া সত্ত্বেও তিনি সর্বদা খুবই স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন।[২১] বিশেষ করে তার সময়ে ‘ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী’ নামে একটি সুবিশাল মাসলা-মাসায়েলের সংকলন তৈরি হয়। যা মিশর-তুরষ্কেও ইসলামী আইনের একটি বিশাল ও নির্ভরযোগ্য উৎস মনে করা হয়। আওরঙ্গজেব কুর্নিশ ও অভিবাদনের অনৈসলামিক ও তাওহীদবিরোধী প্রথা বিলুপ্ত করেন। তদস্থলে অভিবাদনের ইসলামী রীতি ‘সালামে’র সুন্নাত চালু করেন। আওরঙ্গজেবের বেশকিছু ভাল গুণ ছিল, যা অন্য সম্রাটদের থেকে আলাদা। প্রাসাদের জনৈক আমীর একবার তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘জাঁহাপনা! রাজ্যের কাজে অতিরিক্ত কষ্ট স্বীকার করবেন না। এতে স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। শরীর খারাপ করতে পারে’। তার জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহ আমাকে অন্যের পরিশ্রম করার জন্যই প্রেরণ করেছেন’।[২২] মৌলভী যাকাউল্লাহ ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আলমগীরের মৃত্যুর পর রাজত্বের কর্মকাণ্ডে বিরাট ধরণের পরিবর্তন সৃষ্টি হয়েছে।[২৩] শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ যে যুগে দিল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন, সে যুগে রাজধানী দিল্লীসহ সারা উপমহাদেশে ইসলামের চরম দুর্দিন ছিল। রাজনৈতিক দিক দিয়ে দিল্লীর মুসলিম সিংহাসন যেমন হিন্দু, মারাঠা ও ইংরেজ শক্তির হুমকির সন্মুখীন ছিল, ধর্মীয় দিক দিয়েও তেমনি মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও জনগণের অধিকাংশ চরম দেউলিয়াত্বের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল। ব্যাপক নৈতিক ধ্বস নামার ফলে তাদের মধ্যে সর্বত্র হীনমন্যতার রোগে সংক্রমিত হয়ে পড়েছিল।[২৪]

শাহ ওয়ালীউল্লাহর জন্মের পূর্বে ভারত উপমহাদেশে রাজনৈতিক বিক্ষিপ্ততা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা-বিপর্যয় থাকলেও এ যুগে শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, সাহিত্য ও কাব্যচর্চা, আত্মশুদ্ধি চর্চার যুগ ছিল। শিক্ষার উন্নতির সাথে সাথে সে যুগে যারা শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন তারা লেখনি রেখে গেছেন যথেষ্ট। বিশেষ করে ‘সুল্লামুল উলুম’ ও ‘মুসাল্লামুস সুবুত’ রচয়িতা কারী মুহিববুল্লাহ বিহারী (মৃত্যু ১১১৯ হিজরী), কাজী মুবারক গোপামবী (মৃত্যু ১১৬২ হিজরী) এদের লিখা অসাধারণ প্রবন্ধ বা পুস্তক উল্লেখযোগ্য। তাছাড়াও মোল্লা নিযামুদ্দীন লাখনোবী (মৃত্যু ১১৬১ হিজরী) ছিলেন তাদের মাঝে সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য বিশেষ ব্যক্তি, যার নির্বাচিত শিক্ষাক্রম ও শিক্ষাব্যবস্থা ভারতবর্ষ থেকে বুখারা-সমরকন্দ পর্যন্ত চালু ছিল। তাদের মত বিচক্ষণ, দূরদর্শী, দেশের গৌরব ও যুগশ্রেষ্ঠ আলেম, অধ্যাপক, লেখক-গবেষকরা ছিলেন ছাত্র-যুবকদের চেতনা। তারাই ছিলেন দীক্ষাদানের এই ময়দানে ত্রাণকর্তা এবং সেই শতকের মনীষী ও মহাপুরুষ।[২৫]

❖ অর্থনৈতিক অবস্থা

ভারতের মোগল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট মুহিউদ্দীন আলমগীরের (আওরঙ্গজেব) (মৃ. ১৭০৭ খ্রি.) শেষ দিকে শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাম্মাদ দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ) জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে ভারত অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী ছিল। এই সময় স্থল ও নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। আগ্রা, লাহোর ও বাংলা বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে সুনাম লাভ করে। বণিকদের নিরাপত্তা ও সরাইখানার ব্যবস্থা করা হয়। এই সময় সুতিবস্ত্র ও চিনি, চাল, গম ইত্যাদি বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হত। লেনদেনের জন্য মুদ্রার প্রচলন ছিল। মুদ্রার নাম ছিল তাম্রমুদ্রা, দাম, ফুলুম ইত্যাদি। কৃষি ও শিল্পপণ্য তখন উৎপাদিত হত। কার্পাস, তামাক, নীল ও পশম উৎপন্ন হত। ঢাকার মসলিন ছিল এই সময়ে জগৎ বিখ্যাত।[২৬]

তবে মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে অষ্টাদশ শতকে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। সামগ্রিক উন্নয়নে ভারতবর্ষ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান রাজস্ব দাবী, অভিজাত-জমিদার ও ইজারাদারদের লোভ ও অর্থলিপ্সা, প্রতিদ্বন্দী সৈন্যদের অভিযান ও লুটতরাজ এদেশের মানুষের জীবনকে একেবারে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। চূড়ান্ত দারিদ্র্যের পাশাপাশি চূড়ান্ত ধনসম্পত্তি ও বিলাসিতাও ছিল ব্যাপকহারে। একদিকে ধনী ও ক্ষমতাশালী অভিজাতরা ভোগ-বিলাসের মধ্যে মগ্ন থাকেন, অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া, নিপীড়িত ও দরিদ্র কৃষকেরা একেবারে নিঃস্ব অবস্থায় পৌঁছে যায়। সবরকম অবিচার, অসাম্য তাদেরকে সহ্য করতে হয়। অষ্টাদশ শতকে ভারতীয়রা কৃষি কারিগরি দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। যা প্রকৃতপক্ষে অচল ও অনড় ছিল। উৎপাদনের কারিগরি কৌশলগুলো শতাধিক বছর ধরে স্থবির হয়ে পড়েছিল। কৃষক তার কঠোর পরিশ্রম দিয়ে কারিগরিগত অনুন্নয়নকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার নিজের প্রাপ্তি ছিল শোচনীয়ভাবে অপর্যাপ্ত। রাষ্ট্র, জমিদার, জায়গিরদার, ইজারাদার সকলেই কৃষকের নিকট থেকে অধিক পরিমাণ রাজস্ব আদায় করত।

অন্যদিকে হস্তশিল্প ও কৃষিজ উৎপাদনে ভারতবর্ষ স্বয়ংসম্পন্ন হলেও এ শতকে অনবরত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতির কারণে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষমতালোভী ও বিদেশী আক্রমণকারীরা অনেক বাণিজ্যকেন্দ্র লুঠপাঠ করে নেয়। অনেক বাণিজ্য পথ সুরক্ষিত ছিল না, সংঘটিত ডাকাত দল অধ্যুষিত ছিল। বণিকরা এবং তাদের পণ্যদ্রব্য ভর্তি গাড়িগুলো নিয়মিত লুঠ হয়ে যেত। রাজনৈতিক কারণেও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সমৃদ্ধশালী নগর ও উন্নয়নশীল শিক্ষাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত ও পরিত্যক্ত হয়। ফলে আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অবনতিতে দেশের কিছু কিছু অংশে সাংঘাতিক প্রভাব পড়ে।[২৭] শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সময়ে এরকম ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* প্রিন্সিপ্যাল, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১].   আল-কুরআন, সূরা অত-তীন : ৫ ।
[২].   আল-কুরআন, আলে-ইমরান : ১১০।
[৩].   আল-কুরআন, সূরা আত-তীন : ৬।
[৪].   আরবী শব্দ (المجدد) ‘মুজাদ্দিদ’ যার অর্থ সংষ্কারক। প্রতি হিজরী শতাব্দিতে মুসলিম সমাজ সংষ্কারক হিসাবে মুসলমানদের মধ্যে অনুপ্রবেশকৃত অনৈসলামিক রীতির মূলোৎপাটন এবং ইসলামের প্রকৃত আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য আবির্ভূত হন। হাদীছে এসেছে- রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘এ উম্মতের কল্যাণের জন্য প্রত্যেক শতাব্দীর শেষে ’এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাবেন যিনি তাদের দ্বীনকে সংষ্কার করবেন (সুলাইমান ইবন আশ‘আছ ইবন সাদ্দাদ ইবন ‘আমর আবুদাঊদ আস-সিজিস্তানী, সুনান আবুদাঊদ,  ১২তম খণ্ড, পৃ. ৪০৯, হাদীছ নং ৪২৯১; আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ খতীব আত-তিবরিযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩, হাদীছ নং ২৪৭)।
[৫].   https://www.aldiwan.net/poem101679.html
[৬].   মুহাম্মাদ ইনামুল হক, ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন, (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩ খৃ.), পৃ. ২।
[৭].   গোলাম রসুল মেহের, হযরত সৈয়দ আহমাদ শহীদ (র), আব্দুল জলিল ও মতিউর রহমান নূরী অনূদিত, (ঢাকা: ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, ১৯৮১ খৃ.), পৃ. ১১০।
[৮]   তাছাউওফ: এটি আরবী শব্দ। আভিধানিক অর্থ ছূফিবাদ, আধ্যাত্মিকতা, আধ্যাত্মবাদ। ইসলামে ছূফীবাদ ‘আত-তাছাউওফ’ নামে পরিচিত। এ ছূফীবাদ আল্লাহর প্রেমে ও ধ্যানের উপর প্রতিষ্ঠিত এক ধরনের চিন্তাধারা। এ চিন্তাধারার লক্ষ্য হল আল্লাহর গূঢ় অনুভূতির অন্বেষণ ও আত্মার পবিত্রতা বিধান। দ্র.: ইসলামে সূফীবাদের উদ্ভব ও বিকাশ, ড. মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ ও অন্যান্য, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন পত্রিকা, ৪৬তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০০৬।

    মুসলিম দর্শনে তাছাউওফ ছূফিবাদ নামে খ্যাত। বিশেষজ্ঞদের মতে ছূফী শব্দটি ছূফী শব্দ থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ পশম। পশমী বস্ত্র সরলতা ও আড়ম্বরতাহীনতার প্রতীক। রাসূল (ﷺ) ও তার ছাহাবীরা বিলাসিতার পরিবর্তে সাদাসিধা পোশাক পরিধান করতেন। তাই সাদাসিধা জীবন-যাপনকারী ব্যক্তিরা মুসলিম দর্শনে ছূফী নামে অভিহিত। সে সময় মুসলিমদের মাঝে ছূফিবাদ ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। আর মানুষরা বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে যে, তারা একে স্বীকার করবে নাকি প্রত্যাখ্যান করবে। কারণ তাদের সবকিছুই ইসলামের নামে; অথচ প্রকৃত ইসলাম থেকে তা অনেক দূরে। যাদের আক্বীদা ছিল বিভ্রান্ত যা শিরকের পর্যায়ে পড়ে। তার মধ্যে অন্যতম হল তারা আল্লাহর সাথে নবী বা অলীদেরও আহ্বান করাকে জায়েয মনে করত যা হারাম। দ্র.: সূরা ইউনুস ১০৬; সুনান আবূ দাঊদ, হাদীছ নং ১৪৭৯; সুনান তিরমিযী, হাদীছ নং ২৯৬৯, ৩২৪৭; সুনান ইবনু মাজাহ, হাদীছ নং ৩৮২৮; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীছ নং ২২৩০, সনদ সহীহ)।

    মহান আল্লাহ এধরণের দ্বন্দ্বের সমাধান দিয়েছেন পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতের মাধ্যমে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত কর আল্লাহ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাকো’ (সূরা নিসা : ৫৯)। রাসূল (ﷺ), ছাহাবী বা তাবে-তাঈেদের যুগে এই ছূফিবাদের কোন অস্তিত্ব ছিল না। ছূফীদের সবচেয়ে খারাপ আক্বীদা ছিল তারা সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে একাকার করে ফেলত। এদের পুরোধা হচ্ছে সিরিয়ার দামেস্ক-এ সমাহিত ‘মুহীউদ্দীন ইবনুল ‘আরাবী। সে বলতো-

العبد رب والرب عبد * ياليت شعري من المكلف؟
إن قلت عبد فذاك حق *  أو قلت رب فأنّى رب يكلف

    “বান্দাই রব, আর রবই বান্দা, আহা যদি জানতাম কে মুকাল্লাফ (নির্দেশ মানতে বাধ্য)?  যদি বলি বান্দা, তাহলে তা-ই সত্য। অথবা যদি বলি রব, তবে কোথায় সে রব, যে মুকাল্লাফ (আদেশদাতা) হবে?”। দ্র.: ইবনুল আরাবী, আল-ফুতুহাতুল মাক্কিয়্যাহ; ফিরকা সূফিয়া ফী যুইল কিতাব ওয়াস সুন্নাহ, আব্দুর রহমান ইবন আব্দুল খালেক আল-ইউসুফ, ১/১৪ পৃ.।
[৯]. ফাতাওয়া আলমগীরী: আরবীতে ‘আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া’ নামে পরিচিত একটি ইসলামী আইন সংকলন, যা ৫৪ বছর ধরে উপমহাদেশের রাষ্টীয় নীতিমালা, নৈতিকতা, রন কৌশল, অর্থনৈতিক নীতি, ন্যায়বিচার এবং শাস্তির উপর আইন সংকলন ছিল। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে এই সংকলন প্রণীত হয়। সংকলনটি ব্যাপকভাবে ফিকহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুসংগঠিত কাজগুলোর মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। হানাফী মাযহাবের ভিত্তিতে শরী‘আহ আইন এতে সংকলিত হয়েছে। এতে কুরআন, ছহীহ আল-বুখারী, ছহীহ মুসলিম, সুনান আবু দাউদ ও জামি' আত-তিরমিযী থেকে সব লেখা হয়েছিল। ফাতাওয়া আলমগীরী প্রণয়নের উদ্দেশ্যে আওরঙ্গজেব ৫০০ আলেমকে নিয়োগ দেন। তাদের মধ্যে ৩০০ জন দক্ষিণ এশিয়া, ১০০ জন ইরাক এবং ১০০ জন হেজাজ থেকে। দিল্লি ও লাহোরে সংকলন কর্মে শেখ নিজাম বুরহানপুরী দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের কয়েক বছরব্যপী পরিশ্রমের মাধ্যমে ফাতাওয়া আলমগীরী প্রণীত হয়। এই গ্রন্থে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, দাস, যুদ্ধ, সম্পদ, বিনিময়, কর, অর্থনীতি ও অন্যান্য আইন এবং আইনি নির্দেশনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এই কিতাবটি ‘ফাতাওয়া আলমগীরী’ বলে খ্যাত। কিন্তু আসল নাম হলো ‘ফতোয়া আল হিন্দিয়া’। ফাতাওয়া আলমগীরী লেখা হয় ১১০৩ হিজরীতে অর্থাৎ ইমাম আবু হানিফার মৃত্যুর (১১০৩-১৫০)= ৯৫৩ বছর পর। এই কিতাবে ইমাম আবু হানিফার কথাগুলো প্রাপ্তির কোন সুত্র নেই। কিতাবটির নামের নিচে বড়অক্ষরে লেখা আছে- কিতাব-খানি ইমাম আবু-হানিফার মাজহাব। এটা প্রণয়নের পর ফাতাওয়া আলমগীরী হানাফী মাযহাবের একটি রেফারেন্স গ্রন্থ হিসাবে গণ্য ও ব্যবহৃত হতে থাকে।
[১০]. আনিসুজ্জামান, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য (ঢাকা: ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, ১৯৬৪), পৃ. ১৬।
[১১]. জিহাদ আন্দোলন: সৈয়দ আহমদ শহিদ কর্তৃক পরিচালিত জিহাদ আন্দোলন উপমহাদেশের মুসলিম জনগণের সর্বাপেক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ এবং এক গণ-অভ্যুত্থানরূপে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এ আন্দোলন ছিল প্রধানত পারিপার্শ্বিক নানা অপপ্রভাবে কলুষিত মুসলিম জনগণের ঈমান আক্বীদাকে শিরক, বিদ‘আত, বিজাতীয় অনুকরণ নানা জঞ্জাল থেকে মুক্ত করে পূর্ণ ঈমানী জৌলুশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পরিচালিত একটি আন্দোলন। মোগল সালতানাতের পতন যুগ শুরুর পরে উপমহাদেশব্যাপী মুসলিমদের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনে নেমে আসে মারাত্মক অধঃপতন। ঈমান-আক্বীদার স্থান দখল করে বসে নানা কুসংস্কার ও বিজাতীয় ধ্যান-ধারণা। মুসলিম জনগণ পরিণত হয় নামসর্বস্ব মুসলিমে। সমাজের উচ্চবিত্তদের মধ্যে শী‘আ ধ্যান-ধারণা, পীরপূজা, কবরপূজাসহ অগণিত শিরক, বিদ‘আত স্থায়ীভাবে শিকড় গেড়ে বসে। ইমামুল হিন্দ শাহ ওয়ালীউল্লাহর সুযোগ্য সন্তান এবং সার্থক উত্তরাধিকারী শাহ আব্দুল আযীয তখন জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত হয়েছেন। চারিদিকে বিভিন্নভাবে তাবলীগী দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যার অন্যতম সদস্য ছিলেন মাওলানা ইমামুদ্দীন (রাহিমাহুল্লাহ)। ঠিক সে সময় সৈয়দ সাহেব হিজরী ১২৩৬ সনের ১ শাওয়াল (১৮২০ খ্রি.) রায়বেরেলী থেকে চারশ’ সঙ্গীসহ নৌকাযোগে কলকাতার পথে রওনা হন। সেখান থেকে জাহাজ যোগে হজ্জের উদ্দেশ্যে জেদ্দায় রওনা দেন। সৈয়দ সাহেবের সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল উপমহাদেশের প্রতিটি জনপদের মুসলিম জনগণের জন্য মুক্ত স্বাধীনভাবে আল্লাহর বন্দেগী করার মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা। হজ্জ থেকে ফিরে যখন তিনি শুনতে পেলেন যে, আগ্রাসী শিখ সামন্ত শাসকেরা পাঞ্জাব ও সীমান্ত প্রদেশের সর্বত্র মসজিদের আযান এবং জামা‘আত বন্ধ করে দিয়েছে, স্বাধীনভাবে ধর্মকর্ম করার সকল সুযোগ রুদ্ধ করা হয়েছে, অনেক এলাকার মুসলিম নারী-শিশুদের ধরে এনে বাঁদীতে পরিণত করা হচ্ছে, তখন আর কালবিলম্ব না করে তিনি শিখ শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার দৃঢ় সঙ্কল্প ঘোষণা করলেন। এটাই ছিল মূলত জিহাদ আন্দোলন। দিনটি ছিল ১৮২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর। মাওলানা ইসমাঈল শহীদ, মাওলানা আব্দুল হাই, মাওলানা ইমামুদ্দীন বাঙালি ও ছূফী নুর মুহাম্মাদ প্রমুখ প্রথম সারির খলীফাগণকে জিহাদের কাফেলায় লোকজন সমবেত করার উদ্দেশ্যে ফরমান প্রেরণ করা হয়। বিস্তারিত: ড. মোহাম্মদ মুহিবউল্যাহ ছিদ্দিকী, বালাকোটের মর্মান্তিক ঘটনার শিক্ষা : একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (ঢাকা: ইসলামিক ফাউণ্ডেশ পত্রিকা, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ৪৬তম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, এপ্রিল-জুন ২০০৭), পৃ. ২৯।
[১২].     আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এক দশকের মধ্যে পর পর দুটো উত্তরাধিকার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর ১৭৫৪ সনে নিহত হয় পরবর্তী সম্রাট শাহ আলম অযোধ্যায় আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে শাহ আলম সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলেও তিনি সিন্ধিয়ার বৃত্তিভোগী আশ্রিত সম্রাটে পরিণত হয়ে যান।
[১৩]. সৈয়দ গোলাম হোসেন খান তাবতাবায়ী (অনু: এম. আবদুল কাদের), সিয়ােের মুতাখ্খিরীন (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬) পৃ. ৩১৮-৩২৩।
[১৪]. গোলাম হোসেন সলিম (অনু: আকবর উদ্দিন), রিয়াজ-উস-সালাতীন (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৭৪) পৃ. ২৭৪-২৮০।
[১৫].  I. H. Qureshi A short History of Pakistan, vol. iv (Karachi: Pakistan Historical society, 1967) p. 105. 
[১৬]. Zafrul Islam “The End of the Sikh Rule” History of the freedom Movement, vol. 11, part -1 (Karachi: Pakistan Historical Society, 1960) p. 72. 
[১৭]. ড. মোহাম্মদ মুহিবউল্যাহ ছিদ্দিকী, বালাকোটের মর্মান্তিক ঘটনার শিক্ষা : একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (ঢাকা: ইসলামিক ফাউণ্ডেশ পত্রিকা, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ৪৬তম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা, এপ্রিল-জুন ২০০৭), পৃ. ২৯।
[১৮]. মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী হাসানী নদভী, সীরাতে সাইয়েদ আহমদ শহীদ, (লাখ্নৌ : মাজলিস তাহকীকাত ও নাশরিয়াত  ইসলাম, ১৪৩১ হি./২০১১ খৃ.), প্রথম খণ্ড, পৃ. ৬৯-৭০।
[১৯]. E. J. Rapson, Cambridge History of India, 4:316. D.P. Mahajan, Muslim Rule in India, Delhi. 1971.
[২০]. Merry E Wiesner-Hanks, Cambridge History of World, P. 175, Delhi. 1970.
[২১]. Richards, John F. (1996), The Mughal Empire। The New Cambridge History of India। 5 (Reprinted) p. 128.
[২২]. আবুল হাসান আলী হাসানী নদভী, রিজালুল ফিকরি ওয়াদ দা‘ওয়াতি ফিল ইসলাম, (বৈরূত : দারু ইবনি কাছীর, ২য় সংস্করণ, ১৪২৮ হি./২০০৭ খ্রি.), ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৩০।
[২৩]. ড. সৈয়দ মাহমূদুল হাসান, ভারতবর্ষের ইতিহাস (ঢাকা : জুন ১৯৮৪) পৃ. ৪১১-১২; মৌলভী যাকাউল্লাহ দেহলভী তারীখে হিন্দুস্তান, ৯/৩৩।
[২৪]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, আহলেহাদীছ আন্দোল উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষিত সহ (রাজশাহী: হাদীছ ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খৃ.), পৃ ২৫৬.
[২৫]. আব্দুল হাই লক্ষেèৗভী, নুযহাতুল খাওয়াতির  (বৈরুত: দারু ইবনি হাযম, ১৪২০হি./১৯৯৯খ্রি.), ৭ম খণ্ড, পৃ. ১০৩০।
[২৬]. http://www.ebookbou.edu.bd/Books/Text/OS/HSC/hsc _2856/Unit-03.pdf.
[২৭]. https://drklbcollege.ac.in/wp-content/uploads/2020/03.




প্রসঙ্গসমূহ »: মনীষীদের জীবনী
সুন্নাতের রূপরেখা (৪র্থ কিস্তি) - মাইনুল ইসলাম মঈন
জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ (৫ম কিস্তি) - অনুবাদ : মুহাম্মদ ইমরান বিন ইদরিস
তরুণদের বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে সতর্কীকরণ (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
মসজিদ: ইসলামী সমাজের প্রাণকেন্দ্র (২য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ছাহাবায়ে কেরামকে গালি দেয়া নিষিদ্ধ - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
হজ্জ ও ওমরাহ সম্পর্কে প্রচলিত বিদ‘আতসমূহ - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
সালাফী মানহাজ অনুসরণের মর্যাদা - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
আধুনিক যুগে দাওয়াতী কাজের পদ্ধতি (শেষ কিস্তি) - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
কাফেরদের হত্যা করাই কি আল্লাহর পথে জিহাদ - অনুবাদ : মুহা. মাহফুজুর রহমান বিন আব্দুস সাত্তার
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (১০ম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধান (৫ম কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ইসলামের দৃষ্টিতে রোগর চিকিৎসা - আল-ইখলাছ ডেস্ক

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ