সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৪২ অপরাহ্ন

মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূ

 -আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম* 


 (১৭তম কিস্তি)  

২. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত নেক আমল পেশ করে দু‘আ করা[১]

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত নেক আমল পেশ করে দু‘আর মাধ্যমে অসীলা করা বৈধ। মহান আল্লাহ বলেন,یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَ ابۡتَغُوۡۤا اِلَیۡہِ الۡوَسِیۡلَۃَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নৈকট্য অন্বেষণ কর’ (সূরা আল-মায়েদাহ : ৩৫)। মহান আল্লাহ বলেন,اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ یَدۡعُوۡنَ یَبۡتَغُوۡنَ اِلٰی رَبِّہِمُ الۡوَسِیۡلَۃَ  ‘তারা যাদেরকে আহ্বান করে তারাইতো তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৫৭)।

উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় (১) ক্বাতাদাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, أي تقربوا إليه بطاعته والعمل بما يرضيه ‘তোমরা সৎ আমল ও তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য কর’।[২]

(২) হাফেয ইবনু জারীর আত-ত্বাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, واطلبوا القربة إليه بالعمل بما يرضيه ‘সৎ আমলের মাধ্যমে তাঁর নিকট তোমরা নৈকট্য অন্বেষণ কর’।[৩]  

(৩) শায়খ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘অসীলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, তাহল যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়। এ কারণে তিনি বলেন, يبتغون অর্থ সৎ আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণ করা’।[৪]

ঈমান ও সৎ আমলের মাধ্যমে দু‘আ করে অছীলা করা। যেমন কোন মুসলিম বলে, হে আল্লাহ! আপনার ও আপনার রাসূলের প্রতি আমার ঈমান, আপনার ও আপনার রাসূলের জন্য আমার ভালোবাসা ও আনুগত্যের অসীলায় আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। অথবা বলবে হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি আমার ভালোবাসা ও তাঁর প্রতি আমার ঈমানের অসীলায় আপনার নিকট প্রার্থনা করছি আপনি আমার থেকে বিপদ দূর করে দিন। এ ক্ষেত্রে দু‘আকারী সৎ আমলের বিভিন্ন অবস্থার কথা উল্লেখ করে। যার মধ্যে  আল্লাহর ভয় ও একমাত্র তাঁর প্রতি তাক্বওয়ার কথা, সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা ও মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের কথা উল্লেখ করে থাকে। অতঃপর তার প্রভুর নিকটে এগুলো অসীলা হিসাবে দু‘আয় পেশ করে যাতে তা কবুলের আশা করতে পারে। এটা হচ্ছে, উত্তম ও সুন্দর অসীলা যা আল্লাহ তা‘আলা প্রণয়ন করেছেন এবং তাতে তিনি সন্তুষ্ট হন। তা শরী‘আত সম্মত হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার নিম্নের বাণী প্রমাণ বহন করে। মহান আল্লাহ বলেন,اَلَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَاۤ اِنَّنَاۤ اٰمَنَّا فَاغۡفِرۡ لَنَا ذُنُوۡبَنَا وَ قِنَا عَذَابَ النَّارِ ‘যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয় আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে আমাদেরকে বাঁচান’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ১৬)। মহান আল্লাহ আরো বলেন,رَبَّنَاۤ  اٰمَنَّا بِمَاۤ اَنۡزَلۡتَ وَ اتَّبَعۡنَا الرَّسُوۡلَ فَاکۡتُبۡنَا مَعَ الشّٰہِدِیۡنَ ‘হে আমাদের প্রভু! আপনি যা নাযিল করেছেন তার প্রতি আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা রাসূলের অনুসরণ করেছি। অতএব, আমাদেরকে সাক্ষ্যদাতাদের তালিকাভুক্ত করুন’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ৫৩)।

তিনি আরো বলেন,

رَبَّنَاۤ اِنَّنَا سَمِعۡنَا مُنَادِیًا یُّنَادِیۡ لِلۡاِیۡمَانِ اَنۡ اٰمِنُوۡا بِرَبِّکُمۡ  فَاٰمَنَّا ٭ۖ رَبَّنَا فَاغۡفِرۡ لَنَا ذُنُوۡبَنَا وَ کَفِّرۡ عَنَّا سَیِّاٰتِنَا وَ تَوَفَّنَا مَعَ  الۡاَبۡرَارِ

‘হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয় আমরা এক আহ্বানকারীকে আহ্বান করতে শুনেছিলাম যে, তোমরা স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তাতেই আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি; হে আমাদের প্রভু! অতএব আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি বিদূরিত করুন, আর নেককারদের সাথে আমাদেরকে মৃত্যু দান করুন’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ১৯৩-১৯৪)। তিনি আরো বলেন,

وَ  اِذَا سَمِعُوۡا مَاۤ  اُنۡزِلَ  اِلَی الرَّسُوۡلِ تَرٰۤی اَعۡیُنَہُمۡ تَفِیۡضُ مِنَ  الدَّمۡعِ مِمَّا عَرَفُوۡا مِنَ الۡحَقِّ ۚ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَاۤ  اٰمَنَّا فَاکۡتُبۡنَا مَعَ الشّٰہِدِیۡنَ

‘আর যখন তারা তা শ্রবণ করে, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি নাযিল হয়েছে, তখন তুমি দেখতে পাও যে, তাদের চোখে অশ্রু বইতে শুরু করে, এ কারণে যে, তারা সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছে, তারা এরূপ বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা মুমিন হয়ে গেলাম সুতরাং আমাদেরকেও ঐসব লোকের সাথে লিপিবদ্ধ করে নিন, যারা (মুহাম্মাদ ও কুরআনকে সত্য বলে) স্বীকার করে’ (সূরা আল-মায়িদা : ৮৩)।

তিনি আরো বলেন,اِنَّہٗ کَانَ فَرِیۡقٌ مِّنۡ عِبَادِیۡ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَاۤ  اٰمَنَّا فَاغۡفِرۡ لَنَا وَ ارۡحَمۡنَا وَ اَنۡتَ  خَیۡرُ  الرّٰحِمِیۡنَ ‘আমার বান্দাদের একদল ছিল যারা বলত, হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আমাদের ক্ষমা ও দয়া করুন, আর আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু’ (সূরা আল-মুমিনুন : ১০৯)। মহান আল্লাহ বলেন,

فَاِذَا  فَرَغۡتَ فَانۡصَبۡ  - وَ اِلٰی  رَبِّکَ فَارۡغَبۡ

‘অতএব যখনই (ছালাত হতে) অবসর পাও (দু‘আ) সাধনা কর, এবং তোমার প্রতিপালকের প্রতি মনযোগ দাও’ (সূরা আলাম নাশরাহ : ৭-৮)।

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) সারা (আলাইহিস সালাম)-কে সঙ্গে নিয়ে হিজরত করলেন এবং এমন এক জনপদে প্রবেশ করলেন, যেখানে এক বাদশাহ ছিল অথবা বললেন, এক অত্যাচারী শাসক ছিল। তাকে বলা হল যে, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) (নামক এক ব্যক্তি) এক পরমা সুন্দরী নারীকে নিয়ে (আমাদের এখানে) প্রবেশ করেছে। সে তখন তাঁর নিকট লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করল, হে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)! তোমার সঙ্গে এ নারী কে? তিনি বললেন, আমার বোন। অতঃপর তিনি সারার নিকট ফিরে এসে বললেন, তুমি আমার কথা মিথ্যা মনে করো না। আমি তাদেরকে বলেছি যে, তুমি আমার বোন। আল্লাহর শপথ! দুনিয়াতে (এখন) তুমি আর আমি ব্যতীত আর কেউ মুমিন নেই। সুতরাং আমি ও তুমি দ্বীনী ভাই বোন। এরপর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) (বাদশার নির্দেশে) সারাকে বাদশাহর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। বাদশাহ তাঁর দিকে অগ্রসর হল। সারা ওযূ করে ছালাত আদায়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এ দু‘আ করলেন,

اَللّٰهُمَّ إِنْ كُنْتُ آمَنْتُ بِكَ وَبِرَسُوْلِكَ وَأَحْصَنْتُ فَرْجِىْ إِلَّا عَلَى زَوْجِىْ فَلَا تُسَلِّطْ عَلَىَّ الْكَافِرَ

‘হে আল্লাহ! আমিও আপনার উপর এবং আপনার রাসূলের উপর ঈমান এনেছি এবং আমার স্বামী ব্যতীত সকল হতে আমার লজ্জাস্থানের সংরক্ষণ করেছি। তুমি এই কাফিরকে আমার উপর ক্ষমতা দিও না’।

তখন বাদশাহ বেহুঁশ হয়ে পড়ে মাটিতে পায়ের আঘাত করতে লাগল। তখন সারা বললেন, আয় আল্লাহ! এ যদি মারা যায় তবে লোকে বলবে, স্ত্রীলোকটি একে হত্যা করেছে। তখন সে সংজ্ঞা ফিরে পেল। এভাবে দু‘বার  বা তিনবারের পর বাদশাহ বলল, واللهِ مَا أَرْسَلْتُمْ إِلَىَّ إِلَّا شَيْطَانًا اِرْجِعُوْهَا إِلَى إِبْرَاهِيْمَ وَأَعْطُوْهَا آجَرَ ‘আল্লাহর শপথ! তোমরা তো আমার নিকট এক শয়তানকে পাঠিয়েছ। একে ইবরাহীমের নিকট ফিরিয়ে দাও এবং তাঁর জন্য হাজেরাকে হাদিয়া স্বরূপ দান কর’। সারাহ ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ফিরে এসে বললেন, আপনি জানেন কি, আল্লাহ তা‘আলা কাফিরকে লজ্জিত ও নিরাশ করেছেন এবং সে এক বাঁদী হাদিয়া হিসাবে দিয়েছে’।[৫]

ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, একদা তিন ব্যক্তি পথ চলছিল, এমন সময় তারা বৃষ্টির কবলে পড়ল এবং একটি পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিল। তৎক্ষণাৎ পর্বত হতে একখানা প্রকাণ্ড পাথর এসে গুহার মুখে পতিত হওয়ায় তাদের গুহার পথ বন্ধ হয়ে গেল। তখন তাদের একজন আরেকজনকে বলল, তোমরা নিজেদের এমন কোন নেক কাজকে স্মরণ কর, যা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্যেই করেছ। অতঃপর এর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার কাছে প্রার্থনা কর, আশা করা যায় তিনি এই বিপদ দূর করে দিবেন। অতঃপর তাদের একজন বলল, ‘হে আল্লাহ! আমার অতি বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিল এবং আমার ছোট-ছোট কয়েকটি সন্তানও ছিল। আমি তাদের জন্য মেষ চরাতাম, আর যখন সন্ধ্যায় তাদের কাছে ফিরে আসতাম, তখন তাদের জন্য দুধ দোহন করে আনতাম। কিন্তু আমি আমার সন্তানদেরকে পান করানোর আগেই প্রথমে আমার পিতা-মাতাকে পান করাতাম। একদিন চারণ বৃক্ষ আমাকে দূরে নিয়ে গেল। ফলে ঘরে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল, তখন আমি তাদেরকে ঘুমন্ত অবস্থায় পেলাম। অতঃপর আমি প্রতিদিনের মত আজও দুধ দোহন করলাম এবং দুধের পাত্র নিয়ে তাদের কাছে আসলাম এবং পাত্র হাতে তাদের শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম। তাদেরকে ঘুম হতে জাগানো ভাল মনে করলাম না। আর তাদের আগে বাচ্চাদেরকে দুধ পান করানোও ভাল মনে করলাম না। অথচ বাচ্চাগুলো আমার পায়ের কাছে ক্ষুধার তাড়ণায় কাঁদছিল। অবশেষে ভোর পর্যন্ত আমার ও তাদের অবস্থা এভাবেই বিদ্যমান ছিল। (প্রথম ব্যক্তি বললেন)

اَللّٰهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّىْ فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ فَافْرُجْ عَنَّا فُرْجَةً نَرَى مِنْهَا السَّمَاءَ

‘হে আল্লাহ! যদি আপনি জানেন যে, এই কাজটি আমি একমাত্র আপনার সন্তুষ্টির জন্য করেছিলাম, তাহলে এর আমাদের জন্য এতটুকু পথ করে দাও যেন আকাশ দেখতে পাই’। তখন আল্লাহ তা‘আলা পাথরটিকে এই পরিমাণ সরিয়ে দিলেন যে, তারা আকাশ দেখতে পেল। দ্বিতীয় জন বলল, ‘আমার এক চাচাতো বোন ছিল, তাকে আমি অত্যধিক ভালোবাসতাম যতটা পুরুষেরা মহিলাদেরকে ভালোবাসতে পারে। আমি তাকে উপভোগ করতে চেয়েছিলাম। সে তা অস্বীকার করল, যে পর্যন্ত আমি তাকে একশ’ দীনার প্রদান না করি। অতঃপর আমি চেষ্টা করতে লাগলাম, অবশেষে একশ’ দীনার সংগ্রহ করে তার সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তারপর যখন আমি তার দু’পায়ের মধ্যখানে বসলাম, তখন সে বলল, ‘হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় কর, মোহর খুলো না। তখন সাথে সাথে আমি তাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম (দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল) فَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّىْ فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ فَافْرُجْ عَنَّا فُرْجَةً ‘হে আল্লাহ! আপনি জানেন, এই কাজ আমি একমাত্র আপনার সন্তুটির জন্যই করেছি, তাহলে আমাদের জন্য পথ মুক্ত করে দিন’। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য পাথরটি আরো কিছু সরিয়ে দিলেন। তৃতীয় জন বলল, হে আল্লাহ! আমি এক ব্যক্তিকে এক ‘র্ফাক’ তথা ষোল (১৬) রতলের সমপরিমাণ চাউলের বিনিময়ে মজুর নিয়োগ করেছিলাম। যখন সে কাজ সম্পাদন করল, তখন বলল, আমাকে আমার প্রাপ্র্য দিয়ে দাও। আমি তার পাওনা তাকে পেশ করলাম। সে তাকে অবহেলা করে ফেলে চলে গেল। অবশেষে আমি তাকে চাষাবাদে লাগালাম এবং তা দ্বারা অনেকগুলো গরু ও রাখাল যোগাড় করলাম। এরপর একদা সে আমার কাছে আসল এবং বলল, আল্লাহ তা‘আয়ালাকে ভয় কর, আমার উপর অবিচার করো না। আমাকে আমার পাওনা দিয়ে দাও। আমি বললাম, এই গরুগুলো এবং তার রাখালসমূহ নিয়ে যাও। সে বলল, আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর, আমার সাথে উপহাস করো না। তখন আমি বললাম, আমি তোমার সাথে উপহাস করছি না। ঐ গরুগুলো ও তার রাখালসমূহ নিয়ে যাও। অতঃপর সে ঐগুলো নিয়ে চলে গেল। (তৃতীয় ব্যক্তি বলল) اَللّٰهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّىْ فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ فَافْرُجْ عَنَّا ‘হে আল্লাহ! আপনি যদি জানেন যে, এই কাজটি আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্যই করেছিলাম, তবে এখনও যতখানি বাকী আছে তা খুলে দিন’। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা পাথরটি সরিয়ে অবশিষ্ট অংশ উম্মুক্ত করে দিলেন।[৬]

সুধী পাঠক! উপরিউক্ত কুরআনের বাণী ও হাদীছগুলো থেকে বুঝা যায় যে, ঈমান ও সৎ আমলের মাধ্যমে অসীলা ধরা যায়। আমরা যে কোন বিপদ-আপদ, সমস্যা, দুশ্চিন্তা, অসুস্থতার ক্ষেত্রে আল্লাহ ও নবীর প্রতি ঈমান এবং সৎ কর্ম বা সৎ আমল উপস্থাপনের মাধ্যমে অসীলা করতে পারব ইনশাআল্লাহ। হাদীছগুলো থেকে সুস্পষ্ট হয় যে, ঐ তিনজন মুমিন ব্যক্তির বিপদ যখন কঠিন আকার ধারণ করে, তাদের সর্ব বিষয় সংকীর্ণ হয়, বের হওয়ার ব্যাপারে তারা হতাশ হয়ে পড়েছিল এবং একমাত্র আল্লাহর পথ ছাড়া বের হওয়ার আর কোন পথ ছিল না, তখন তারা আল্লাহর নিকট আশ্রয় নিয়েছিল এবং  একনিষ্ঠভাবে তারা তাঁকে ডেকেছিল এবং  তারা তাদের ঈমান ও সৎ আমলের কথা স্মরণ করেছিল। তারা আরামের সময়ে আল্লাহকে চিনেছিল এ আশায় যে, প্রতিদানসরূপ বিপদের সময় তাদের প্রতিপালকও তাদেরকে চিনবেন। যেমন নবী (ﷺ) থেকে এ ব্যাপারে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, সচ্ছল অবস্থায় তুমি আল্লাহকে চিনলে, বিপদে তিনি তোমাদের চিনবেন।[৭]

প্রথম অসীলা, ঐ ব্যক্তির পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ, তাদের প্রতি কোমল ব্যবহার, তাদের প্রতি প্রচণ্ড দয়া, (এমন পর্যায়ের ছিল) যেন এটি এক অনন্য ও বিশ্ময়কর। আর নবীগণ ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি তার পিতা-মাতার সাথে করা সদাচরণ এ পর্যন্ত পৌঁছবে বলে আমি মনে করি না।[৮]

দ্বিতীয় অসীলা, যেনা করার জন্য চাচাত বোনের সাথে ভালোবাসা, যাকে সে প্রচণ্ড ভালোবাসত যেমন একজন মানুষ কোন মহিলার মালিক হওয়ার পর ভালোবাসে। আর প্রয়োজন ও ক্ষুধার কারণে মেয়েটি তার কাছে নতি স্বীকার করে; কিন্তু সে (চাচাত বোন) তাকে মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, ফলে তার অন্তর আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবনত হল এবং সে তাকে (চাচাত বোন) ও তাকে দেয়া অর্থ ছেড়ে দেয়।[৯]  

তৃতীয় অসীলা, চাকরের প্রাপ্য ঐ এক ফারাক্ক পরিমাণ চাল (এক ফারাক্ক = তিন ছা‘) মজুরী মালিকের হেফাজত করা প্রসঙ্গে, যা সে পরিত্যগ করল। যেমন ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, সে তা না নিয়ে চলে গেল। ফলে মালিক শ্রমিকের মাল বৃদ্ধি করতে লাগল এবং তা থেকে দাস, ছাগল, গরু ও উটের পাল হয়ে গেল। একদিন শ্রমিকের মালের প্রয়োজন হল এবং তার মালিকের নিকট রেখে যাওয়া মালের কথা স্মরণ হল। তখন সে তার নিকট গেল এবং তার মাল চাইল। তিনি তাকে ঐ সমস্ত মাল দিয়ে দিলেন, এতে সে কিংকতর্ব্যবিমূঢ় হয়ে গেল এবং ধারণা করল, তার সাথে ঠাট্টা করা হচ্ছে; কিন্তু যখন সে নিশ্চিত হল ও বুঝতে পরল যে, এগুলো তার মজুরীর ফল এবং তা থেকে এতো সম্পদ হয়েছে। তখন সে ঐ সমস্ত সম্পদ আনন্দচিত্বে গ্রহণ করল এবং একটি মালও ছেড়ে গেল না। আল্লাহর কসম শ্রমিকের প্রতি মালিকের এই ইহসান আল্লাহ ভীতির পর্যায়ে পড়ে এবং (এই মালিক) শ্রমিককে সম্মান ও রক্ষণাবেক্ষণের উচ্চ আদর্শ (স্থাপন করেছে)। যার দশ ভাগের এক ভাগ উচ্চতায় পৌঁছা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় যারা শ্রমিক ও মজুরদের সহযোগীতার কথা দাবী করে, দরিদ্র ও অভাবীদের রক্ষার দাবী করে তাদের প্রতি ইনছাফ প্রতিষ্ঠার ও তাদের অধিকার প্রদানের দাবী করে। এ তিনজন তাদের প্রতিপালকের নিকট এ সকল সৎ আমল ও উত্তম অবস্থানকে অসীলা হিসেবে পেশ করে দু‘আ করে ঘোষণা করে যে, তারা এ সমস্ত কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই করেছিল। তারা এর দ্বারা দুনিয়ার নৈকট্য, তড়িৎ ফল, অথবা ধন সম্পদ কামনা করেননি। তারা আল্লাহর কাছে কামনা করেছিল তিনি যেন তাদের গুহার মুখের পাথর একটু সরিয়ে দেন। তারা তাদের কাজ একনিষ্ঠভাবে করেছিল, ফলে আল্লাহ তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। তাদের কষ্ট দূর করেছিলেন, আল্লাহর ব্যপারে  তাদের ধারণা ভাল থাকায় তিনি তাদের জন্য স্বাভাবিকতাকে ছিন্ন করেছিলেন এবং ঐ প্রকাশ্য কারামতের মাধ্যমে তাদের সম্মানিত করেন। তিন স্তরে পর্যায়ক্রমে পাথর সরিয়ে ফেলেন। যখন তাদের একজন দু‘আ করে, তখন গুহার মুখ থেকে পাথর একটু সরে যায়। শেষ পর্যন্ত তারা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়ার পর তিন জনের দু‘আ শেষে পাথর গুহার মুখ থেকে সম্পূর্ণরূপে সরে যায়।[১০]

৩. সৎ ব্যক্তির দু‘আর মাধ্যমে আল্লাহর নিকট অসীলা করা[১১]

যদি কোন মুসলিম কঠিন সংকটে পড়ে অথবা তার ওপর বিরাট বিপদ-আপদ আপতিত হয় এবং সে নিজেকে মহান আল্লাহর নিকট দূর্বল মনে করে ও  আল্লাহর কাছে শক্তিশালী মাধ্যম ধরা পসন্দ করে, তাহলে এমন উপস্থিত জীবিত ব্যক্তির নিকট যাবে, যাকে সে যোগ্য, তাক্বওয়াশীল ও মর্যাদাবান ও কুরআন-হাদীছের আলেম হিসাবে বিশ্বাস করে এবং সে তাঁর কাছে কামনা করবে, তিনি যেন আল্লাহর নিকট তার জন্য দু‘আ করেন, যেন তার থেকে বিপদ সরে যায় ও চিন্তা দূর হয়। এটাও শারঈ অসীলার মধ্যে একটি। শরী‘আত এ ব্যাপারে প্রমাণ সাব্যস্ত করে এর দিকে পথ নির্দেশ করেছে। হাদীছে এ ধরনের অনেক দৃষ্টান্ত বর্ণিত আছে। অনুরূপভাবে ছাহাবায়ে কেরামদের (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) কর্ম থেকেও অনেক নমুনা বর্ণিত আছে।[১২]  

হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, প্রখ্যাত ছাহাবী আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এক ব্যক্তি জুমু‘আর দিন মিম্বরের সোজাসুজি দরজা দিয়ে (মসজিদে) প্রবেশ করল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন দাঁড়িয়ে খুত্ববা দিচ্ছিলেন। সে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলল,يَا رَسُوْلَ اللهِ هَلَكَتِ الْمَوَاشِىْ وَانْقَطَعَتِ السُّبُلُ فَادْعُ اللهَ يُغِيْثُنَا ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! গবাদি পশু ধ্বংস হয়ে গেল এবং রাস্তাগুলোর চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। সুতরাং আপনি আল্লাহর কাছে দু‘আ করুন, যেন তিনি আমাদের বৃষ্টি দেন’। বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন তাঁর উভয় হাত তুলে দু‘আ করলেন, اَللّٰهُمَّ أَغِثْنَا اَللّٰهُمَّ أَغِثْنَا اَللّٰهُمَّ أَغِثْنَا ‘হে আল্লাহ! বৃষ্টি দিন, হে আল্লাহ! বৃষ্টি দিন, হে আল্লাহ! বৃষ্টি দিন’।[১৩]

অন্য বর্ণনায় আছে, ‘একদা রাসূল (ﷺ) জুম‘আর খুৎবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় একজন গ্রাম্য লোক এসে বলল, يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ هَلَكَتِ الأَمْوَالُ وَانْقَطَعَتِ السُّبُلُ فَادْعُ اللهِ يُغِيثُنَا ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! গাছ-পালা শুকিয়ে যাচ্ছে, পানির পিপাসায় পশু-পাখি মারা যাচ্ছে। আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য দু‘আ করুন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর দুই হাত উঠিয়ে দু‘আ করলেন। বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করুন! হে আল্লাহ! আমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করুন! হে আল্লাহ! আমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করুন! আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আল্লাহ্র শপথ! আকাশে তখন কোন মেঘের লক্ষণ ছিল না। পাহাড়ের পিছন থেকে ঢালের মত এক খণ্ড মেঘ এসে আকাশের উপরে উঠে ছড়িয়ে পড়ল এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত হল। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মিম্বার থেকে নামার পূর্বেই দেখলাম যে, তাঁর দাড়ি বেয়ে বৃষ্টির পানি ঝরে পড়ছে। অতঃপর আমরা ছালাত আদায় করে বৃষ্টির পানির উপর দিয়ে বাড়ীতে গেলাম। পরবর্তী জুম‘আর দিন পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকল। পরবর্তী জুম‘আয় সেই একই ব্যক্তি অথবা অন্য এক লোক এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! কাঁচা ঘর-বাড়ী ভেঙ্গে যাচ্ছে, বৃষ্টির পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে যাচ্ছে, আল্লাহর কাছে বৃষ্টি বন্ধ করার জন্য দু‘আ করুন। কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাসলেন এবং দুই হাত উঠিয়ে আল্লাহর কাছে দু‘আয় বললেন,

اَللّٰهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا اَللّٰهُمَّ عَلَى الآكَامِ وَالظِّرَابِ وَبُطُونِ الأَوْدِيَةِ وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ

‘হে আল্লাহ! আমাদের উপর নয়; বরং চারপশের উঁচু বনভূমি এবং বৃক্ষরাজি উৎপন্ন হওয়ার স্থানে বৃষ্টি বর্ষণ করুন। সাথে সাথে মদীনার আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল এবং মদীনার চারপাশে বৃষ্টি বর্ষণ হতে থাকল’।[১৪] আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘আমি তখন দেখতে পেলাম, মেঘ ডানে ও বামে পৃথক হয়ে বৃষ্টি হতে লাগল, মদীনাবাসীর উপর বর্ষণ হচ্ছিল না’।[১৫]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মৃত্যুবরণ করার সাথে সাথে এ প্রকার অসীলা নিষিদ্ধ। তবে তাঁর পরে উপস্থিত জীবিত সৎ ও পরহেযগার মানুষের দু‘আকে অসীলা করা বৈধ। যেমন ছাহাবীগণ করেছেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর জীবিত চাচার দু‘আকে অসীলা করেছেন। হাদীছে এসেছে, আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, অনাবৃষ্টি দেখা দিলে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করতেন। তিনি বলতেন,

اَللّٰهُمَّ إِنَّا كُنَّا نَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِنَبِيِّنَا فَتَسْقِينَا وَإِنَّا نَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِعَمِّ نَبِيِّنَا فَاسْقِنَا قَالَ فَيُسْقَوْنَ

‘হে আল্লাহ! আমরা আপনার নবীর (জীবিত থাকতে তাঁর) মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করলে আপনি আমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করতেন। এখন আপনার নবীর চাচার মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করছি। আপনি আমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করুন’। রাবী বলেন, এরপর বৃষ্টি হত।[১৬]

‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কথা ‘হে আল্লাহ! আমরা আপনার নবীর (জীবিত থাকতে তাঁর) মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করলে আপনি আমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করতেন। এখন আপনার নবীর চাচার মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করছি’-এ কথার অর্থ হল, আমরা আমাদের নবী (ﷺ)-এর নিকটে কামনা করতাম ও চাইতাম যে, তিনি যেন আমাদের জন্য দু‘আ করেন এবং আমরা তাঁর দু‘আর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চাই। আর এখন নবী (ﷺ) তো ইন্তেকাল করেছেন ফলে আর এটা সম্ভব না যে, তিনি আবার এসে আমাদের জন্য দু‘আ করবেন। সুতরাং এখন আমরা আমাদের নবী (ﷺ)-এর চাচা আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মুখাপেক্ষী হয়েছি এবং তাঁর কাছ থেকে চাই তিনি যেন আমাদের জন্য দু‘আ করেন। আর এর উদ্দেশ্য এটা নয় যে, তারা তাদের দু‘আয় বলতেন, হে আল্লাহ! আপনার নবী (ﷺ)-এর সম্মানের অসীলায় আমাদের পানি দান করুন। এমনও নয় যে, অতঃপর নবী (ﷺ)-এর ওফাতের পর তারা বলতে লাগল, হে আল্লাহ! আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মর্যাদার অসীলায় আমাদেরকে পানি দান করুন। কেননা এরূপ দু‘আ বিদ‘আতীদের; কুরআন ও হাদীছে যার কোন ভিত্তি নেই। সালাফে-ছালেহীন তথা ছাহাবীদের কেউ এরূপ করেননি।[১৭]  

সুধী পাঠক! রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবিত থাকাবস্থায় ছাহাবীগণ তাঁর দু‘আকে অসীলা করতেন। যেমন উক্কাশ ইবনু মিহছান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাধ্যমে দু‘আ চাইলেন।[১৮] আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে দু‘আ চেয়েছিলেন। তাঁর মায়ের ইসলাম গ্রহণের জন্য ঘটনা বর্ণনা করে দু‘আ চাইলেন এবং সে দু‘আ কবুলও হয়েছিল। অনেক ছাহাবীরা তাদের সন্তানদের নিয়ে আসতেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দু‘আ নেয়ার জন্য। আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) জন্মগ্রহণ করলে তাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে নিয়ে আসা হয়। আনাসের মা উম্মু সুলাইম আনাসকে নিয়ে এসেছিলেন, আনাসের ভাই হলেও মা উম্মু সুলাইম আনাসকে সহ সকালেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে পাঠান- এরূপ আরো অনেক ঘটনাই পাওয়া যাবে। কিন্তু যখন তিনি মৃত্যুবরণ করলেন, কোন ছহীহ হাদীছেই আপনি খুঁজে পাবেন না যে, কোন ছাহাবী ভুলেও কোনদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কবরের কাছে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে লক্ষ্য করে কিছু চেয়েছেন বা কিছু বলেছেন বা তাঁর কবরকে অসীলা করে দু‘আ করেছেন?

বরং ছাহাবীগণ জীবিত ছাহাবীদের দু‘আকে অসীলা করেছেন। যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। আবার তারা জীবিত তাবেঈদের দু‘আকেও অসীলা করেছেন। যেমন, হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। উসায়র ইবনু জাবির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

كَانَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ إِذَا أَتَى عَلَيْهِ أَمْدَادُ أَهْلِ الْيَمَنِ سَأَلَهُمْ أَفِيْكُمْ أُوَيْسُ بْنُ عَامِرٍ حَتَّى أَتَى عَلَى أُوَيْسٍ فَقَالَ أَنْتَ أُوَيْسُ بْنُ عَامِرٍ قَالَ نَعَمْ قَالَ مِنْ مُرَادٍ ثُمَّ مِنْ قَرَنٍ قَالَ نَعَمْ قَالَ فَكَانَ بِكَ بَرَصٌ فَبَرَأْتَ مِنْهُ إِلَّا مَوْضِعَ دِرْهَمٍ قَالَ نَعَمْ قَالَ لَكَ وَالِدَةٌ قَالَ نَعَمْ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ  يَقُوْلُ فَاسْتَغْفِرْ لِى فَاسْتَغْفَرَ لَهُ فَقَالَ لَهُ عُمَرُ أَيْنَ تُرِيدُ قَالَ الْكُوفَةَ قَالَ أَلَا أَكْتُبُ لَكَ إِلَى عَامِلِهَا قَالَ أَكُونُ فِى غَبْرَاءِ النَّاسِ أَحَبُّ إِلَىَّ

‘ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর অভ্যাস ছিল, যখন ইয়ামানের কোন সাহায্যকারী দল তার কাছে আসত, তখন তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের মধ্যে কি উওয়াস ইবনু আমির আছে? অবশেষে তিনি উওয়াসকে পেয়ে জান। তখন তিনি বললেন, তুমি কি উওয়াস ইবনু আমির? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মুরাদ গোত্রের কারান বংশের? বললেন, হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি শ্বেত রোগ ছিল এবং তা নিরাময় হয়েছে, কেবল এক দিরহাম স্থান ব্যতীত? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা কি আছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কাছে মুরাদ গোত্রের কারান বংশের উওয়াস ইবনু আমির ইয়ামানের সাহায্যকারী দলের সঙ্গে আসবে। তাঁর ছিল শ্বেত রোগ। পরে তা নিরাময় হয়ে গিয়েছে কেবল এক দিরহাম পরিমাণ ব্যতিরেকে। তার মা রয়েছেন। সে তাঁর প্রতি অতি সেবাপরায়ন। এমন ব্যক্তি আল্লাহর উপর কসম করে নিলে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। কাজেই যদি তুমি তোমার জন্য তার কাছে মাগফিরাতের দু‘আ কামনার সুযোগ পাও, তাহলে তা করবে। সুতরাং আপনি আমার জন্য মাগফিরাতের দু‘আ করুন। তখন উওয়াস (রাহিমাহুল্লাহ) তার মাগফিরাতের জন্য দু‘আ করলেন।[১৯]

তাবেঈ সুলাইম বিন আমির আল খাবায়েরী হতে ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, অনাবৃষ্টি হলে মু‘আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও দামেস্কবাসী বৃষ্টি প্রার্থনা করতে বের হলেন। মু‘আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মিম্বরে বসে বললেন, ইয়াযীদ বিন আল আসওয়াদ আল জুরাশী কোথায়? লোকেরা তাকে ডেকে আনলে মু‘আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাকে তার পায়ের নিকট বসতে আদেশ করে তিনি মেম্বরে বসে বললেন,اَللّٰهُمَّ إِنَّا نَسْتَشْفِعُ إِلَيْكَ الْيَوْمَ بِخَيْرِنَا وَأَفْضَلِنَا اَللّٰهُمَّ أَنَّا نَسْتَشْفِعُ إِلَيْكَ الْيَوْمَ بِيَزِيْدَ بْنِ الأَسْوَدِ الْجُرَشِيِّ ‘আমরা আমাদের মাঝে উত্তম ও মর্যাদাবান ইয়াযীদ বিন আসওয়াদ আল-জুরাশীর মাধ্যমে সুপারিশ কামনা করছি। আমরা আমাদের মাঝে ইয়াযীদ বিন আসওয়াদ আল-জুরাশীর মাধ্যমে সুপারিশ কামনা করছি’।

(এরপর মু‘আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন) হে ইয়াযীদ! তোমার হাত আল্লাহর দিকে উত্তোলন কর। ফলে তিনি হাত উঠালেন মানুষও তাদের হাত উঠালেন। দু‘আ চলাকালিন সময়ে শীঘ্রই পশ্চীমাকাশে ঢালের ন্যায় মেঘ ছড়িয়ে পড়ল এবং ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হতে লাগল। জনগণ তাদের বাড়ীতে পৌঁছতে না পৌঁছতেই বৃষ্টিপাত শুরু হল।[২০]

ইবনুু ‘আসাকির ছহীহ সনদে আরও বর্ণনা করেন যে, যাহহাক বিন কায়েস জনগণকে নিয়ে বৃষ্টি প্রার্থনা করতে বের হলেন এবং তিনি ইয়াযীদ বিন আসওয়াদকেও বলেন,قُمْ يَا بَكَّاءُ ‘হে ক্রন্দনকারী দাড়াও’। অন্য সূত্রে অতিরিক্ত আছে যে, তিনি মাত্র তিনবার দু‘আ করতেই এমন বৃষ্টিপাত হল, যেন তারা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হল।[২১]

সুধী পাঠক! মু‘আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নবী (ﷺ)-কে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করেননি; বরং তিনি উপস্থিত জীবিত সৎ ব্যক্তি ইয়াযীদ ইবনুল আসওয়াদ কে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করেছেন, তিনি তার কাছে আল্লাহর নিকট দু‘আ কামনা করেছেন তিনি যেন তাদের বৃষ্টি দেন এবং সাহায্য করেন। আর আল্লাহ তা‘আলা তার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। অনুরূপ যাহহাক (রাহিমাহুল্লাহ) ইবনু কায়েসকে দু‘আ করার দায়িত্ব প্রদানের ঘটনাও বর্ণনা করেছেন।

উল্লেখ্য যে, এরূপ অসীলার ক্ষেত্রে মানুষ একটি মারাত্মক ভুল করে থাকে। মৃত ব্যক্তি বা কবরবাসী তো নয়ই; এমনকি জীবিত হলেও বলা যাবে না যে, হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তির মাধ্যমে আমাকে ক্ষমা কর, যা ছাহাবী-তাবেঈ-সালাফে ছালেহীন এমনটি কেউই করেননি। এখানে ‘মাধ্যম’ বলতে অর্থ হল উপস্থিত সেই ব্যক্তির কাছে বলা যে, আমি এ বিপদে আছি, আমার জন্য দু‘আ করবেন।

উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা অসীলা ও তার প্রকারভেদ সম্পর্কে জানতে পারলাম। সুতরাং উক্ত প্রকারগুলো ব্যতীত কারও অধিকার বা সম্মানের অসীলা বা অনুপস্থিত ব্যক্তির অসীলা বা মানুষের সক্ষমতার বাহিরে কিংবা পীরের অসীলা দেয়া সহ যত ধরনের অসীলা রয়েছে, সবই বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এগুলোর পক্ষে আল্লাহর কিতাব, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাত এবং ছাহাবী ও তাবেঈদের কারো নিকট হতে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। অতএব, দেওবন্দীরা নবী-রাসূল সহ অন্যান্যদের জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় যে অসীলা বৈধ মনে করে, তাদের এ আক্বীদা প্রমাণিত নয়; বরং তা বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ এমন বিদ‘আতী আক্বীদা থেকে আমাদেরকে হেফাযত করুন-আমীন!!  

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আল-ইসলামিয়্যাহ, খড়খড়ি, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. আত-তাওয়াসসুল আনওয়াঊহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ৩২; মুহাম্মাদ ইবনু আলী ইবনু মুহাম্মাদ আল-বা‘আলী, আল-মিনহাজুল ক্বাবীম ফী ইখতিছারি ইক্বতিযায়িছ ছিরাতিল মুসতাক্বীম লি শায়খিল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ, তাহক্বীক্ব : আলী ইবনু মুহাম্মাদ আল-ইমরান (মক্কা মুকাররমা : দারু ‘আলিমিল ফাওয়াইদ, ১৪২২ হি.), পৃ. ১৯০; সঊদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-ঊকাইলী, আল-ই‘তিদায়ু ফিদ দু‘আয়ি (রিয়াদ : দারু কুনূয, ১৪৩১ হি.), পৃ. ২৬।
[২]. তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১০৩।
[৩]. জামে‘ঊল বায়ান ফী তা’বীলিল কুরআন, ১০ম খণ্ড, পৃ. ২৯০।
[৪]. আত-তাওয়াসসুলু আনওয়াঊহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ১৪-১৫।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/২২১৭।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/২২১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৪৩; মিশকাত, হা/৪৯৩৮।
[৭]. মুসনাদে আহমাদ; হাকিম হা/৬৩০৩ সনদ ছহীহ।
[৮]. আত-তাওয়াসসুলু আনওয়াঊহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ৩৫।
[৯]. আত-তাওয়াসসুলু আনওয়াঊহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ৩৬।
[১০]. আত-তাওয়াসসুলু আনওয়াঊহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ৩৭।
[১১]. আত-তাওয়াসসুলু আনওয়াঊহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ৩৮।
[১২]. আত-তাওয়াসসুলু আনওয়াঊহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ৩৮।
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/১০১৪; নাসাঈ, হা/১৫০৪; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৯৯২।
[১৪]. ছহীহ বুখারী, হা/১০১৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯৭; নাসাঈ, হা/১৫১৮।
[১৫]. ছহীহ বুখারী, হা/১০১৫।
[১৬]. ছহীহ বুখারী, হা/১০১০।
[১৭]. আত-তাওয়াসসুলু আনওয়াঊহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ৪১।
[১৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭০৫।
[১৯]. ছহীহ মুসলিম হা/২৫৪২।
[২০]. লালকাঈ, কারামাতুল আওলিয়া, তাহক্বীক্ব : আহমাদ ইবনু সা‘দ ইবনু হামদান, হা/১৫১, ৯ম খণ্ড (সঊদী আরব : দারুত তায়্যিবা, ১৪২৩ হি.), পৃ. ২১৫; আত-তাওয়াসসুলু আনওয়াঊহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ৪১; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাস্ক, ৬৫তম খণ্ড (দারুল ফিকর, ১৪১৫ হি.), পৃ. ১১৩।
[২১]. মুহাম্মাদ হাসান আব্দুল গাফফার, উছূলু ই‘তিক্বাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত লিল লালকাঈ, ৭৩তম খণ্ড, পৃ. ৭; নাছিরুদ্দীন আলবানী, ইরওয়াউল গালীল, ৩য় খণ্ড (বৈরূত : আল-মাকতাবুল ইসলামী, ১৪০৫ হি.), পৃ. ১৪০; আত-তাওয়াসসুলু আনওয়াঊহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ৪২; তারীখু দিমাস্ক, ৬৫তম খণ্ড, পৃ. ১১২।




প্রসঙ্গসমূহ »: ভ্রান্ত মতবাদ
ছয়টি মূলনীতির ব্যাখ্যা (শেষ কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কারে আলিমগণের গৃহীত মূলনীতিসমূহ: একটি পর্যালোচনা (২য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
আশূরায়ে মুহাররম - ড. সাদীক মাহমূদ
ইসলামী পুনর্জাগরণের মূলনীতি (৪র্থ কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
প্রতিবেশীর হক্ব আদায়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
সালাফী জামা‘আত বনাম ভ্রান্তদল সমূহ - আল-ইখলাছ ডেস্ক
ইমাম মাহদী, দাজ্জাল ও ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর আগমন সংশয় নিরসন (৫ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
জঙ্গিবাদ বনাম ইসলাম (শেষ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
যাদুটোনার শারঈ সমাধান (৩য় কিস্তি) - মাসঊদুর রহমান
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কারে আলিমগণের গৃহীত মূলনীতিসমূহ: একটি পর্যালোচনা (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
মুসলিম উম্মাহর বিভ্রান্তির কারণ ও উত্তররেণর উপায় - হাসিবুর রহমান বুখারী
ফিলিস্তীন, হে মুসলিম! - শায়খ মতিউর রহমান মাদানী

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ