সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৪৪ অপরাহ্ন

মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ

 - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম* 


 (১৬তম কিস্তি) 

অসীলার শারঈ পদ্ধতি

সালাফগণ নবী ও সৎলোকদের শুধুমাত্র সুপারিশকারী ও মধ্যস্থতাকারী বানায়। আর এভাবে অসীলা গ্রহণ করাটা শরী‘আতের নির্দেশিত বিষয়। অতএব, আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বলতে পারি, ইসলামী শরী‘আতে অসীলার পদ্ধতি তিনটি। যথা,

১. আল্লাহর সুন্দর নাম এবং গুণাবলীর অসীলা  

আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণাবলীকে অসীলা করা। অর্থাৎ তাঁর সুন্দর নামসমূহ ও গুণাবলীর মাধমে তাঁকে ডাকা, তাঁর কাছে চাওয়া ইত্যাদি। কেননা কেউ যদি মহান আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ ও গুণাবলীর অসীলায় তাঁকে ডাকে, তাঁর নিকট কিছু চায়, তাহলে তিনি সে ডাক শুনেন এবং চাওয়া পূর্ণ করেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَ لِلّٰہِ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی فَادۡعُوۡہُ بِہَا ‘আর আল্লাহর অসংখ্য সুন্দর সুন্দর নামসমূহ[১] রয়েছে। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকবে’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ১৮০)। মহান আল্লাহ বলেন,

وَ اِذَا سَاَلَکَ عِبَادِیۡ عَنِّیۡ فَاِنِّیۡ قَرِیۡبٌ ؕ اُجِیۡبُ دَعۡوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ ۙ فَلۡیَسۡتَجِیۡبُوۡا  لِیۡ  وَ لۡیُؤۡمِنُوۡا بِیۡ  لَعَلَّہُمۡ  یَرۡشُدُوۡنَ

‘আর আমার বান্দারা যখন আপনাকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে, বস্তুত আমি তো সন্নিকটেই রয়েছি। আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে আহ্বান করে। কাজেই তারা আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যেন তারা সৎপথে চলতে পারে’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৬)। মহান আল্লাহ বলেন,

وَقَالَ رَبُّکُمُ ادۡعُوۡنِیۡۤ اَسۡتَجِبۡ لَکُمۡ ؕ اِنَّ الَّذِیۡنَ یَسۡتَکۡبِرُوۡنَ عَنۡ عِبَادَتِیۡ سَیَدۡخُلُوۡنَ جَہَنَّمَ دٰخِرِیۡنَ

‘তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। যারা অহংকার করে আমার ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সত্বরই তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (সূরা আল-গাফির : ৬০)। হাদীছে এসেছে,

عَنْ بُرَيْدَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ سَمِعَ رَجُلًا يَقُوْلُ اللهم إِنِّيْ أَسْأَلُكَ بِأَنَّكَ أَنْتَ اللهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِيْ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُوْلَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ فَقَالَ دَعَا اللهَ بِاسْمِهِ الْأَعْظَمِ الَّذِيْ إِذَا سُئِلَ بِهِ أَعْطَى وَإِذَا دُعِيَ بِهِ أَجَابَ

বুরায়দা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)  এক ব্যক্তিকে (আবূ মূসাকে) এরূপ বলতে শুনলেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করি এবং জানি যে, আপনিই আল্লাহ, আপনি ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই, আপনি এক, অনন্য, নিরপেক্ষ ও অন্যদের নির্ভরস্থল-যিনি জনকও নয়, তিনি জন্মিতও নন এবং যাঁর কোন সমকক্ষ নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)  বললেন, সে আল্লাহকে তাঁর ইসমে ‘আযম বা সর্বাধিক বড় ও সম্মানিত নামের সাথে ডাকল, যা দ্বারা যখন কেউ তাঁর নিকট কিছু চায়, তিনি তাকে তা দান করেন এবং যা দ্বারা যখন কেউ তাঁকে ডাকে, তিনি তার ডাকে সাড়া দেন।[২]

عَنْ أَنَسٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كُنْتُ جَالِسًا مَعَ النَّبِيِّ ﷺ فِي الْمَسْجِدِ وَرَجُلٌ يُصَلِّيْ فَقَالَ اللهم إِنِّيْ أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ الْحَنَّانُ الْمَنَّانُ بَدِيْعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ يَا حَيُّ يَا قَيُّوْمُ أَسْأَلُكَ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ دَعَا اللهَ بِاسْمِهِ الْأَعْظَمِ الَّذِيْ إِذَا دُعِيَ بِهِ  أَجَابَ وَإِذَا سُئِلَ بِهِ أَعْطَى

আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি নবী করীম (ﷺ) -এর সাথে মসজিদে বসে ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি ছালাত আদায় করছিল এবং (ছালাতের পর) বলছিল, হে  আল্লাহ! আমি আপনার নিকট প্রর্থনা করি এবং জানি যে, আপনারই জন্য প্রশংসা, আপনি ব্যতীত কোন মা‘বূদ নেই; আপনি বড় দয়ালু, বড় দাতা, আসমান ও যমীনের বিনা নমুনায় স্রষ্টা, হে মহত্ত্ব ও সম্মানের অধিকারী, হে চিরঞ্জীব, হে প্রতিষ্ঠাতা! আমি আপনার নিকট প্রর্থনা করি। তখন নবী করীম (ﷺ)  বললেন, সে আল্লাহকে তাঁর ইসমে ‘আযমে ডাকল। এটা দ্বারা যখন তাঁকে ডাকা হয় তাতে তিনি সাড়া দেন এবং যখন কেউ তাঁর নিকট কিছু চায়, তিনি তাকে তা দান করেন।[৩]

নবী-রাসূলগণ স্বাভাবিক অবস্থায়, বিপদ-আপদে এবং দুঃখকষ্টে কোন মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণাবলীকে অসীলা করে দু‘আ করতেন বা তাঁকে ডাকতেন। তিনি তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন, তাঁদের প্রয়োজন পূর্ণ করেছেন এবং তাঁদেরকে বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে হেফাযত করেছেন। যেমন,

আদম (আলাইহিস সালাম) যখন ভুলের মধ্যে নিপতিত হয়েছিলেন, তখন বলেছিলেন, قَالَا رَبَّنَا ظَلَمۡنَاۤ  اَنۡفُسَنَا ٜ وَ  اِنۡ  لَّمۡ تَغۡفِرۡ لَنَا وَ تَرۡحَمۡنَا لَنَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ ‘তাঁরা উভয়ে বলল, হে আমাদের পালনকর্তা আমরা নিজেদের প্রতি যুলম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ২৩)।

নূহ (আলাইহিস সালাম) বলেছিলেন,رَبِّ اغۡفِرۡ لِیۡ  وَ لِوَالِدَیَّ  وَ لِمَنۡ دَخَلَ بَیۡتِیَ  مُؤۡمِنًا وَّ لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِؕوَلَا تَزِدِ الظّٰلِمِیۡنَ اِلَّا تَبَارًا ‘হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করেছে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে ক্ষমা করুন। আর যালেমদের শুধু ধ্বংসই বৃৃদ্ধি করুন’ (সূরা আন-নূহ : ২৮)।

ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বলেছিলেন, رَبَّنَا اغۡفِرۡ لِیۡ  وَ لِوَالِدَیَّ وَ لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ  یَوۡمَ یَقُوۡمُ الۡحِسَابُ ‘হে আমাদের প্রতিপালক! যেদিন হিসাব অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতা এবং সকল মুমিনদের ক্ষমা করুন’ (সূরা ইবরাহীম : ৪১)। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) যখন বিপদে নিপতিত হয়েছিলেন, তখন বলেছিলেন,حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ ‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কার্যনির্বাহক’।[৪] এ কথাটি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তখনই বলেছিলেন, যখন আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। ফলে মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে আগুন থেকে রক্ষা করেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, قُلۡنَا یٰنَارُ کُوۡنِیۡ بَرۡدًا وَّ سَلٰمًا عَلٰۤی اِبۡرٰہِیۡمَ ‘আমরা বললাম, হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ৬৯)। কোন মাধ্যম ছাড়াই ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) মহান আল্লাহর নিকট সাহায্য চেয়েছিলেন, ফলে তিনি তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন (সূরা আল-আম্বিয়া : ৭১)।   

ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,

رَبِّ قَدۡ اٰتَیۡتَنِیۡ مِنَ الۡمُلۡکِ وَ عَلَّمۡتَنِیۡ مِنۡ تَاۡوِیۡلِ الۡاَحَادِیۡثِ ۚ فَاطِرَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ۟ اَنۡتَ وَلِیّٖ فِی الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃِ ۚ تَوَفَّنِیۡ مُسۡلِمًا وَّ اَلۡحِقۡنِیۡ  بِالصّٰلِحِیۡنَ

‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে রাজ্য দান করেছেন এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন; হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা! আপনিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক, আপনি আমাকে মুসলিম হিসাবে মৃত্যু দান করুন এবং আমাকে সৎকর্ম পরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করুন’ (সূরা ইউসুফ : ১০১)। 

আইয়্যুব (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,

وَ اَیُّوۡبَ اِذۡ نَادٰی رَبَّہٗۤ  اَنِّیۡ مَسَّنِیَ الضُّرُّ وَ اَنۡتَ  اَرۡحَمُ  الرّٰحِمِیۡنَ  . فَاسۡتَجَبۡنَا لَہٗ فَکَشَفۡنَا مَا بِہٖ مِنۡ ضُرٍّ وَّ اٰتَیۡنٰہُ  اَہۡلَہٗ  وَ مِثۡلَہُمۡ مَّعَہُمۡ  رَحۡمَۃً مِّنۡ عِنۡدِنَا وَ ذِکۡرٰی  لِلۡعٰبِدِیۡنَ

‘এবং স্মরণ করুন আইয়্যুবের কথা, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করে বলেছিলেন, আমি দুঃখকষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান। তখন আমরা তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম, তাঁর দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত করে দিলাম, আর তাঁর পরিবার পরিজনকে তাঁর নিকট ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তাদের সাথে তাদের মত আরো দিয়েছিলাম আমার বিশেষ রহমত এবং ইবাদতকারীদের জন্যও উপদেশ’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ৮৩-৮৪)।

মূসা (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর অনুসারীরা অথৈ সাগরের সামনে যখন ফেরাউনের হিংস্র বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিলেন, তখন তিনি ও তাঁর সাথীরা দৃঢ় হিমাদ্রির ন্যায় আল্লাহর উপর বিশ্বাসে অটল থাকেন এবং সাথীদের সান্ত¦না দিয়ে আল্লাহর রহমত কামনা করেন। মহান আল্লাহ তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁদেরকে ফেরাউনের কবল থেকে হেফাযত করেন। মহান আল্লাহ বলেন, 

فَاَتۡبَعُوۡہُمۡ مُّشۡرِقِیۡنَ . فَلَمَّا تَرَآءَ   الۡجَمۡعٰنِ قَالَ اَصۡحٰبُ مُوۡسٰۤی  اِنَّا  لَمُدۡرَکُوۡنَ . قَالَ  کَلَّا ۚ اِنَّ  مَعِیَ  رَبِّیۡ  سَیَہۡدِیۡنِ . فَاَوۡحَیۡنَاۤ  اِلٰی مُوۡسٰۤی اَنِ اضۡرِبۡ بِّعَصَاکَ  الۡبَحۡرَ ؕ فَانۡفَلَقَ فَکَانَ کُلُّ فِرۡقٍ  کَالطَّوۡدِ  الۡعَظِیۡمِ . وَ  اَزۡلَفۡنَا ثَمَّ   الۡاٰخَرِیۡنَ . وَ اَنۡجَیۡنَا مُوۡسٰی وَ مَنۡ  مَّعَہٗۤ   اَجۡمَعِیۡنَ . ثُمَّ   اَغۡرَقۡنَا  الۡاٰخَرِیۡنَ

‘সূর্যোদয়ের সময় তারা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। অতঃপর যখন উভয় দল পরস্পরকে দেখল, তখন মূসার সঙ্গীরা (ভীত হয়ে) বলল, আমরা তো এবার নিশ্চিত ধরা পড়ে গেলাম। তখন মূসা বললেন, কখনই নয়, আমার সাথে আছেন আমার পালনকর্তা। তিনি আমাকে সত্বর পথ প্রদর্শন করবেন। অতঃপর আমরা মূসাকে আদেশ করলাম, তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রকে আঘাত কর। ফলে তা বিদীর্ণ হয়ে গেল এবং প্রত্যেক ভাগ বিশাল পাহাড় সদৃশ হয়ে গেল। ইতিমধ্যে আমরা সেখানে অপরদলকে (অর্থাৎ ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনীকে) পৌঁছে দিলাম। এবং মূসা ও তাঁর সঙ্গীদের সবাইকে বাঁচিয়ে দিলাম। অতঃপর অপর দলটিকে ডুবিয়ে দিলাম’ (সূরা আশ-শু‘আরা : ৬০-৬৬)। 

ইউনুস (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, 

وَ ذَاالنُّوۡنِ  اِذۡ ذَّہَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ اَنۡ لَّنۡ نَّقۡدِرَ عَلَیۡہِ فَنَادٰی فِی الظُّلُمٰتِ  اَنۡ  لَّاۤ  اِلٰہَ   اِلَّاۤ  اَنۡتَ  سُبۡحٰنَکَ ٭ۖ اِنِّیۡ  کُنۡتُ  مِنَ الظّٰلِمِیۡنَ . فَاسۡتَجَبۡنَا لَہٗ ۙ وَ نَجَّیۡنٰہُ مِنَ الۡغَمِّ ؕ وَ کَذٰلِکَ  نُــۨۡجِی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ

‘আর (স্মরণ করুন) যুন-নূন (ইউনুস)-এর কথা, যখন তিনি ক্রোধভরে বের হয়ে গিয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন আমি তাঁর উপর কোন ক্ষমতা রাখি না; অতঃপর তিনি অন্ধকার হতে আহ্বান করেছিলেন, আপনি ছাড়া সত্য কোন মা‘বূদ নেই; আপনি পবিত্র, মহান; আমিতো অত্যাচারীদের একজন। তখন আমরা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাঁকে উদ্ধার করেছিলাম দুশ্চিন্তা হতে এবং এভাবেই আমরা মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ৮৭-৮৮)।

যাকারিয়া (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, 

وَ زَکَرِیَّاۤ  اِذۡ نَادٰی رَبَّہٗ رَبِّ لَا تَذَرۡنِیۡ فَرۡدًا  وَّ  اَنۡتَ  خَیۡرُ  الۡوٰرِثِیۡنَ . فَاسۡتَجَبۡنَا لَہٗ ۫ وَ وَہَبۡنَا لَہٗ یَحۡیٰی وَ اَصۡلَحۡنَا لَہٗ  زَوۡجَہٗ ؕاِنَّہُمۡ کَانُوۡا یُسٰرِعُوۡنَ فِی الۡخَیۡرٰتِ وَ یَدۡعُوۡنَنَا رَغَبًا وَّ رَہَبًا ؕوَ کَانُوۡا لَنَا خٰشِعِیۡنَ

‘আর (স্মরণ করুন) যাকারিয়ার কথা, যখন তিনি তাঁর প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একা (সন্তানহীন) ছেড়ে দিবেন না এবং আপনিই সর্বোত্তম ওয়ারিস। অতঃপর আমরা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাঁকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়াকে, আর তাঁর জন্য স্ত্রীকে যোগ্যতা সম্পন্ন করেছিলাম; তাঁরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করতেন, তাঁরা আমাকে ডাকতেন আশা ও ভীতির সাথে এবং তাঁরা ছিলেন আমার নিকট বিনীত’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ৮৯-৯০)।

অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও স্বাভাবিক, বিপদ-আপদে এবং দুঃখকষ্টে থাকাবস্থায় আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণাবলীকে অসীলা করে দু‘আ করেছেন। যেমন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সময় রক্তপিপাসু কুরাইশ শত্রুরা যখন গুহার মুখে গিয়ে পৌঁছে, সে সময় আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ভয় অনুভব করেন। সেই সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)  আল্লাহর উপর আস্থা রেখে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলেছিলেন, مَا ظَنُّكَ يَا أَبَا بَكْرٍ بِاثْنَيْنِ اللهُ ثَالِثُهُمَا ‘হে আবূ বকর! দু’জন ধারণা করছ কেন? আল্লাহ আছেন তৃতীয় হিসাবে’।[৫] মহান আল্লাহ তাঁদেরকে সাহায্য করেছিলেন। মহান আল্লাহ বিষয়টির বর্ণনা দিয়ে বলেন, 

اِلَّا تَنۡصُرُوۡہُ فَقَدۡ  نَصَرَہُ  اللّٰہُ  اِذۡ اَخۡرَجَہُ الَّذِیۡنَ  کَفَرُوۡا ثَانِیَ اثۡنَیۡنِ اِذۡ ہُمَا فِی الۡغَارِ اِذۡ یَقُوۡلُ لِصَاحِبِہٖ لَا تَحۡزَنۡ اِنَّ اللّٰہَ مَعَنَا ۚ فَاَنۡزَلَ اللّٰہُ سَکِیۡنَتَہٗ عَلَیۡہِ وَ اَیَّدَہٗ  بِجُنُوۡدٍ لَّمۡ تَرَوۡہَا وَ جَعَلَ کَلِمَۃَ  الَّذِیۡنَ کَفَرُوا السُّفۡلٰی ؕ وَ کَلِمَۃُ  اللّٰہِ ہِیَ الۡعُلۡیَا ؕ وَ اللّٰہُ  عَزِیۡزٌ  حَکِیۡمٌ 

‘যদি তোমরা তাঁকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখো আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফিরেরা তাঁকে বহিষ্কার করেছিল। তিনি ছিলেন দু’জনের একজন। যখন তাঁরা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন, চিন্তিত হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি স্বীয় প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখোনি। আর আল্লাহ কাফিরদের শিরকী কালেমা নীচু করে দিলেন। বস্তুতঃ আল্লাহর তাওহীদের কালেমা সদা উন্নত। আল্লাহ হলেন পরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’ (সূরা আত-তওবা : ৪০)।

বদরের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)  আল্লাহর নিকট আকুলভাবে দু‘আ করে বলেন, اَللّٰهُمَّ إِنِّىْ أَنْشُدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ ، اَللّٰهُمَّ إِنْ شِئْتَ لَمْ تُعْبَدْ بَعْدَ الْيَوْمِ ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যে ওয়াদা করেছেন তা পূর্ণ করুন। হে আল্লাহ! যদি এই ক্ষুদ্র দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে আজকের দিনের পর আপনার ইবাদত করার মত কেউ যমীনে আর থাকবে না’।[৬] মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন এবং আয়াত অবতীর্ণ হল,اِذۡ تَسۡتَغِیۡثُوۡنَ رَبَّکُمۡ فَاسۡتَجَابَ لَکُمۡ اَنِّیۡ مُمِدُّکُمۡ بِاَلۡفٍ مِّنَ الۡمَلٰٓئِکَۃِ  مُرۡدِفِیۡنَ ‘যখন তোমরা তোমাদের পালনকর্তার নিকটে কাতর প্রার্থনা করছিলে, তখন তিনি তোমাদের দু‘আ কবুল করলেন এই মর্মে যে, আমি তোমাদেরকে সাহায্য করব এক হাযার ফেরেশতা দিয়ে, যারা ধারাবাহিকভাবে অবতরণ করবে’ (সূরা আল-আনফাল : ৯)। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের অবতরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাঁরা অবতরণ হয়েছিলেন (সূরা আল-আনফাল : ১২-১৩)। জিবরীল (আলাইহিস সালাম)  সেদিন ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)  তাঁবূর বাহিরে এসে বললেন,  سَیُہۡزَمُ الۡجَمۡعُ وَ یُوَلُّوۡنَ الدُّبُرَ ‘এ দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে’ (সূরা আল-ক্বমার : ৫১)।[৭]     

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)  দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্তির দু‘আয় বলতেন,

أَسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِيْ كِتَابِكَ أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِيْ عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ رَبِيْعَ قَلْبِيْ

‘হে আল্লাহ! আপনার সেই সমস্ত নামের প্রত্যেকটির অসীলায় আমি প্রার্থনা জানাচ্ছি যেগুলো আপনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন অথবা তা আপনার কোন সৃষ্টিকে অবগত করেছেন অথবা কুরআনে তা নাযিল করেছেন অথবা আপনার অদৃশ্য জ্ঞানে তা সংরক্ষিত করে রেখেছেন। আপনি আমার জন্য কুরআনকে হৃদয়ের উর্বরতা স্বরূপ করুন’।[৮]

আল্লাহর নির্দিষ্ট গুণ উল্লেখ করে নির্দিষ্ট বিষয় চাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)  ছালাতের মধ্যে বিভিন্ন দু‘আ করেছেন। আর প্রত্যেক দু‘আতেই আল্লাহর কোন না কোন গুণ উল্লেখ করে দু‘আ করেছেন। যেমন ছালাতের শুরুতে তাকবীরে তাহরীমা বাঁধার পর তিনি বলতেন,

اَللّٰهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِىْ وَبَيْنَ خَطَايَاىَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ اَللّٰهُمَّ نَقِّنِىْ مِنَ الْخَطَايَا    كَمَا   يُنَقَّى الثَّوْبُ  الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ اَللّٰهُمَّ اغْسِلْ خَطَايَاىَ   بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ   وَالْبَرَدِ

‘হে আল্লাহ! আমার ও আমার পাপ সমূহের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে দিন, যেরূপ আপনি দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার পাপসমূহ হতে পরিচ্ছন্ন করুন, যেরূপ সাদা কাপড়কে ময়লা থেকে পরিচ্ছন্ন করা হয়। হে আল্লাহ! আপনি আমার পাপসমূহ ধৌত করে দিন পানি, বরফ ও শিশির দ্বারা’।[৯]

আবার ছালাতের শেষেও যে দু‘আগুলো পড়তেন, সেখানেও মহান আল্লাহর গুণ উল্লেখ করে দু‘আ করতেন এবং উম্মাতকে দু‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)  ছালাতের মধ্যে এ বলে দু‘আ করতেন,

اَللّٰهُمَّ  إِنِّىْ أَعُوْذُبِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيْحِ الدَّجَّالِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَفِتْنَةِ الْمَمَاتِ اَللّٰهُمَّ   إِنِّىْ أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْمَأْثَمِ  وَ الْمَغْرَمِ

‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পরিত্রাণ চাচ্ছি কবরের আযাব হতে, কানা দাজ্জালের ফেৎনা হতে। আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি জীবন ও মৃত্যুর পরীক্ষা হতে এবং পাপ ও ঋণের বোঝা হতে’।[১০]

ছহীহ বুখারীর ভাষ্যকার ইবনু বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া বা প্রয়োজন হচ্ছে ক্ষমা। আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মেটানোর জন্য আল্লাহর বড় গুণই উল্লেখ করতে হবে’।[১১] তাই আল্লাহর কাছে চাওয়ার জন্য বড় অসীলা হল আল্লাহর সুন্দর সুন্দর গুণবাচক নামসমূহ। যা আল্লাহর নবী নিজেই প্রশংসামূলক এই নামসমূহ উচ্চারণ করেই দু‘আ চেয়েছেন। যেমন

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)  তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরীমার পর বলতেন,

اَللّٰهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ قَيِّمُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيْهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ نُوْرُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيْهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ مَلِكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيْهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ الْحَقُّ وَوَعْدُكَ الْحَقُّ وَلِقَاؤُكَ حَقٌّ وَقَوْلُكَ حَقٌّ وَالْجَنَّةُ حَقٌّ وَالنَّارُ حَقٌّ وَالنَّبِىُّوْنَ حَقٌّ وَمُحَمَّدٌ حَقٌّ وَالسَّاعَةُ حَقٌّ اَللّٰهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ وَبِكَ خَاصَمْتُ وَإِلَيْكَ حَاكَمْتُ فَاغْفِرْ لِيْ مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّيْ أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ وَلَا إِلٰهَ غَيْرُكَ

‘হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আপনার জন্যই। আসমান, যমীন এবং এর মধ্যস্থিত যা কিছু আছে সবকিছুরই অধিকর্তা আপনি। প্রশংসা মাত্রই আপনার। আসমান, যমীন এবং এর মধ্যস্থিত যা কিছু আছে, আপনি সবকিছুর জ্যোতি। (হে আল্লাহ!) প্রশংসা মাত্রই আপনার জন্য। আসমান, যমীন এবং উভয়ের মধ্যস্থিত যা কিছু আছে আপনি ঐ সবের প্রতিপালক। (হে আল্লাহ!) প্রশংসা মাত্রই আপনার। আসমান ও যমীনের রাজত্ব আপনার। সকল গুণাগুণ আপনার। আপনি সত্য, আপনার অঙ্গীকার সত্য, আপনার বাণী সত্য, আপনার সাক্ষাৎ লাভ সত্য, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, নবীগণ সত্য, মুহাম্মাদ (ﷺ)  সত্য এবং ক্বিয়ামত সত্য। হে আল্লাহ! আপনার নিকটে আত্মসমর্পণ করলাম, আপনারই উপর নির্ভরশীল হলাম, আপনার উপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করলাম, আপনার দিকে প্রত্যাবর্তন করলাম, আপনারই সাহায্যের প্রত্যাশায় শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলাম এবং আপনাকেই বিচারক নির্ধারণ করলাম। অতএব আমার পূর্বের ও পরের, গোপন এবং প্রকাশ্য পাপ সমূহ মাফ করে দিন। আপনি ব্যতীত কোন মা‘বূদ নেই’।[১২]

অনুরূপভাবে ছাহাবীগণ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) আল্লাহর গুনবাচক নাম ধরে দু‘আ করতেন। যেমন আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)  হতে দু‘আ শুনে ছালাতে বলতেন,  

اَللّٰهُمَّ بِعِلْمِكَ الْغَيْبَ وَقُدْرَتِكَ عَلَى الْخَلْقِ أَحْيِنِىْ مَا عَلِمْتُ الْحَيَاةَ خَيْرًا لِىْ وَتَوَفَّنِىْ إَذَا عَلِمْتُ الْوَفَاةَ خيْرًا لِىْ اَللّٰهُمَّ وَأَسْأَلُكَ خَشْيَتَكَ وَالْغَيْبَ وَالشَّهَادَةَ وَالْفَقْرَ وَالْغِنىَ وَأَسْأَلُكَ نَعِيْمًا لَا يَنْفَدُ وَأَسْأَلُكَ قُرَّةَ عَيْنٍ لَا تَنْقَطِعُ وَأَسْأَلُكَ الرِّضَاءَ بَعْدَ الْقَضَاءِ وَأَسْأَلُكَ بَرْدَ الْعَيْشِ بَعْدَ الْمَوْتِ وَأَسْأَلُكَ لَذَّةَ النَّظْرِ إلى وَجْهِكَ وَالشَّوْقَ إِلى لِقَائِكَ فِىْ غَيْرِ ضَرَّاءِ مُضِرَّةٍ وَلَا فِتْنَةٍ مُضِلَّةٍ اَللّٰهُمَّ زَيَّنَّا بِزِيْنَةِ الْإِيْمَانِ وَاجْعَلْنَا هُدَاةً مُهْتَدِيْنَ

‘হে আল্লাহ আপনি অদৃশ্য জ্ঞানের মালিক এবং সৃষ্টির উপর ক্ষমতাশালী। আমাকে  জীবিত  রাখুন  যতদিন  আমার  আয়ু আমার  জন্য  কল্যাণকর  জানব এবং  আমাকে  মৃত্যু  দান  করুন  যখন  আমি  তাকে আমার জন্য মঙ্গলময় জানব। হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত-অনুপস্থিত এবং সচ্ছল-অসচ্ছল সর্বাবস্থায় আপনার ভীতি প্রার্থনা করছি। আপনার কাছে এমন নে‘মত চাই যা শেষ হবে না। আপনার কাছে চক্ষুর প্রশান্তি চাই, যা বিচ্ছিন্ন হবে না। মৃত্যুর পর আপনার সন্তুষ্টি চাই এবং আরামদায়ক জীবন চাই। আপনার সন্মুখপানে দৃষ্টির প্রশান্তি এবং আপনার সাক্ষাতের আকাংখা চাই কোন প্রকার ক্ষতি ছাড়াই এবং পথভ্রষ্টকারী ফেৎনা ছাড়াই। হে আল্লাহ! আমাদেরকে ঈমানের সৌন্দর্য দ্বারা সজ্জিত করুন এবং হেদায়াত প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন’।[১৩]

আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে বসে ছিলাম। এক ব্যক্তি ছালাত আদায় করলেন। তিনি তাশাহুদদের পর দু‘আ করে বললেন,  

اَللّٰهُمَّ إِنِّىْ أسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدُ لَاۤ اِلٰہَ أَنْتَ الْمَنَّانُ بَدِيْعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ يَا حَىُّ يَا قَيُّوْمُ  إِنّىْ أَسْأَلُكَ

‘হে আল্লাহ! আপনার নিকটে (ক্ষমা ও রহমত) চাচ্ছি। কেননা সকল প্রশংসা আপনার জন্যই। আপনি ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই। আপনি পরম দয়ালু, আসমান ও যমীনের স্রষ্টা। হে মহত্ত্ব ও সম্মানের অধিকারী, হে চিরঞ্জীব, হে সবকিছুর ধারক! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি’।[১৪]

এসব আয়াত ও হাদীছে আমরা কী দেখতে পেলাম? নবী-রাসূলগণ কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য চেয়েছেন? অন্য কাউকে অসীলা গ্রহণ করেছেন? না গ্রহণ করেননি। অনুরূপভাবে ছাহাবীগণও। বরং তাঁরা তাদের বিশেষ অবস্থার কথা বর্ণনা করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। তাহলে এসব বিপথগামী লোকেরা কীসের ভিত্তিতে অসীলা গ্রহণ করে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বা অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া দূরে থাক, রাসূল, নবী বা সৎলোকদের অসীলা হিসাবে গ্রহণ করার বৈধতার ব্যাপারে এইসব ভণ্ডরা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ থেকে প্রমাণস্বরূপ একটি অক্ষর দেখাতে পারবে কি? উল্লেখ্য যে, গায়রুল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া স্পষ্ট শিরক। এ ব্যাপারে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহের অবকাশ নেই। অতএব বৈধ অসীলা হল আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণাবলীকে অসীলা করা।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আল-ইসলামিয়্যাহ, খড়খড়ি, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলার নিরানব্বইটি এককম একশ’টি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি তা মুখস্থ করবে সে জান্নাতে যাবে। দ্র. ছহীহ বুখারী, হা/২৭৩৬,৭৩৯২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৭৭; মিশকাত, হা/২২৮৭।
[২]. আবূ দাঊদ, হা/১৪৯৩; তিরমিযী, হা/৩৪৭৫, সনদ ছহীহ; মিশকাত, হা/২২৮৯।
[৩]. তিরমিযী, হা/৩৪৭৫; আবূ দাঊদ, হা/১৪৯৫; নাসাঈ, হা/১৩০০; ইবনু মাজাহ, হা/৩৮৫৮, সনদ ছহীহ; মিশকাত, হা/২২৯০।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৫৬৩।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬৫৩, ৩৯৫২, ৪৬৬৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৮১; তিরমিযী, হা/৩০৯৬; মিশকাত, হা/৫৮৬৮।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯১৫, ৩৯৫৩, ৪৮৭৫, ৪৮৭৭।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৮৭৫, ৩৯৯৫; মিশকাত, হা/৫৮৭২, ৫৮৭৩।
[৮]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৪৩১৮; মুসতাদরাক হাকেম, হা/১৮৭৭; সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৯৯।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৪৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৯৮; মিশকাত, হা/৮১২।
[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৩২, ‘আযান’ অধ্যায়, ‘সালামের আগে দু‘আ’ অনুচ্ছেদ; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৮৯; মিশকাত, হা/৯৩৯।
[১১]. আবুল হাসান আলী ইবনু খালাফ ইবনু মালেক ইবনু বাত্তাল, শারহু ছহীহিল বুখারী (রিয়ায : মাকতাবাতুর রুশদ, ২য় সংস্করণ ১৪২৩ হি.), ১০ম খণ্ড, পৃ. ৯২।
[১২]. ছহীহ বুখারী, হা/১১২০; মিশকাত, হা/১২১১।
[১৩]. ‘আত্বা ইবনু সায়েব (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতা সায়েব হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, একবার ছাহাবী আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আমাদের এক ওয়াক্ত ছালাত পড়ালেন এবং তাতে কিরাআত সংক্ষেপ করলেন। তখন লোকদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বলে উঠল, আপনি যে ছালাত তাড়াতাড়ি পড়ালেন এবং সংক্ষেপ করলেন! তিনি বললেন, এতে আমার ক্ষতি হবে না। কেননা তাতে আমি সে সকল দু‘আ পড়েছি, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)  হতে শুনেছি। অতঃপর যখন তিনি চললেন, এক ব্যক্তি তার অনুসরণ করল। ‘আত্বা বলেন, তিনি হলেন, আমার পিতা সায়েবই, তবে তিনি নিজের নাম প্রকাশ না করে ইঙ্গিতে বললেন। তিনি আম্মারকে দু‘আটি কী তা জিজ্ঞেস করলেন এবং পরে এসে লোকদের জানালেন। দু‘আটি এই যে, ‘হে আল্লাহ আপনি অদৃশ্য জ্ঞানের মালিক..... আমাদেরকে ঈমানের সৌন্দর্য দ্বারা সজ্জিত করুন এবং হেদায়াত প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন’। দ্র. নাসাঈ, হা/১৩০৫, সনদ ছহীহ; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৩৫১; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/১৯৭১; মিশকাত, হা/২৪৯৭।
[১৪]. নাসাঈ, হা/১৩০০, সনদ ছহীহ।




প্রসঙ্গসমূহ »: ভ্রান্ত মতবাদ
মুসলিম বিভক্তির কারণ ও প্রতিকার (শেষ কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ফাযায়েলে কুরআন (২য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইমাম মাহদী, দাজ্জাল ও ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর আগমন সংশয় নিরসন (৯ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
মাযহাবী গোঁড়ামি ও তার কুপ্রভাব (শেষ কিস্তি) - অনুবাদ : রিদওয়ান ওবাইদ
সালাম প্রদানের গুরুত্ব ও মর্যাদা - মুহাম্মাদ আরিফ হুসাইন
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায় (২য় কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
ফিলিস্তীন, হে মুসলিম! - শায়খ মতিউর রহমান মাদানী
ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজ (৩য় কিস্তি) - ড. মেসবাহুল ইসলাম
বিদ‘আত পরিচিতি (১০ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
বিদ‘আত পরিচিতি - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ক্রোধের ভয়াবহতা ও তার শারঈ চিকিৎসা - হাসিবুর রহমান বুখারী

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ