শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:০০ অপরাহ্ন

যাদুটোনার শারঈ সমাধান 

- মূল: ড. আব্দুল মুহসিন ইবনে মুহাম্মাদ আল-কাসিম 
-অনুবাদ: মাসঊদুর রহমান* 


(৩য় কিস্তি) 
 
যাদুকর তার যাদু হতে কী উপকার পায়?

যাদুকর একটি মিথ্যা উচ্চ মর্যাদার আশায় যাদু করে, যাতে করে তার নিজের ত্রুটিগুলো ঢেকে রাখতে পারে। কেননা তার প্রতি শয়তানের অবমাননা রয়েছে। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যারা যাদুতে লিপ্ত আপনি তাদের দেখতে পাবেন, তারা গ্রহগুলোকে আহ্বান করে এবং তার প্রশংসা করে, অতঃপর তারা তাকে সম্বোধন করে তাকে সেজদা করে। তাদের প্রত্যেকের চাওয়া একই, তাহল- অর্থ ও নেতৃত্ব। তাই সে কুফরী করে এবং আল্লাহর সাথে শরীক করে। কারণ সে নেতৃত্ব এবং অর্থ লাভের কল্পনা করে, কিন্তু সে ক্ষতি ও ধংস ছাড়া কিছুই পায় না। যেমন সারা বিশ্বের অবস্থা অনুসন্ধান করলে তার প্রমাণ পাওয়া যায়’।[১]

যাদুকর যাদু করে শিরকে নিমজ্জিত হয়, যা অর্থ-সম্পদের  লোভেই করে থাকে। যেমনিভাবে ফেরাঊন যাদুকরদেরকে মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে যাদু করার জন্য বললে, তারা অর্থ-সম্পদ চেয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা সেই সকল যাদুকরদের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। তারা বলেছিল:

اَئِنَّ لَنَا لَاَجۡرًا  اِنۡ  کُنَّا نَحۡنُ  الۡغٰلِبِیۡنَ

‘আমরা যদি বিজয়ী হই, তাহলে আমাদের জন্য পুরস্কার থাকবে তো?’ (সূরা আশ- শু‘আরা: ৪১)। ফেরাঊন তাদের অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং সে তাদের কাছে নৈকট্য অর্জনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। কারণ যাদুকররা অর্থ এবং খ্যাতি পসন্দ করে।

যাদুকর জানে  যে, যাদুল করার কারণে সে শয়তানের গোলাম বা দাস হয়ে গেছে। সে এটাও জানে যে, শয়তান তার অনেক ক্ষতি করেছে এবং তার  অনেক কল্যাণ  নষ্ট করেছে;  তাই সে অন্যদের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘শয়তান নিজেই একজন খারাপ অনিষ্টকারী। তাই যখন কোন ব্যক্তি মন্ত্র, শপথ, আধ্যাত্মিক যাদুর বই ইত্যাদি ব্যবহার করে তাদের কাছে আসে, যে শিরক ও কুফর তাদের কাছে পসন্দনীয়। এটি তাদের জন্য ঘুষ এবং ঘুষের মত হয়ে উঠেছে, তাই তারা তার কিছু লক্ষ্য অর্জন করে। যেমন কেউ কাউকে হত্যা করার জন্য অর্থ দেয়, যাকে সে হত্যা করতে চায় অথবা তাকে অনৈতিক কাজ করতে সাহায্য করে অথবা তার সাথে অনৈতিক কাজ করে’।[২]

যাদুকরের শাস্তি

যাদুর ক্ষতি সামাজিকভাবে এবং ব্যক্তিগতভাবে খুবই মারাত্মক। যাদুকরের ব্যাপারে শারঈ বিধান হল- তাদের গর্দান কর্তন করা। যেন সমাজের মানুষ তাদের অনিষ্ট হতে নিরাপদে থাকে। হাদীছে এসেছে, বাজালা ইবনু আবাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তিনি  তার এক গভর্নরের নিকট চিঠি লিখেছেন এই মর্মে যে, أَنِ اقْتُلُوْا كُلَّ سَاحِرٍ وَسَاحِرَةٍ ‘তোমরা সকল যাদুকর ও যাদুকারিনীকে হত্যা কর’।[৩] হাফছা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত,

أَنَّهَا أَمَرَتْ بِقَتْلِ جَارِيَةٍ لَهَا سَحَرَتْهَا، فَقُتْلَتْ

‘তিনি তার এক দাসীকে হত্যা করতে আদেশ দিয়েছিলেন, যে তাকে যাদু করেছিল। অতঃপর তাকে হত্যা করা হয়’।[৪]

এটা তার দুনিয়াবী শাস্তি। কেননা সে আল্লাহর সাথে কুফরী করেছে এবং মানুষদেরকে কষ্ট দিয়েছে। অতঃপর পরকালের শাস্তির ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, وَ لَقَدۡ عَلِمُوۡا لَمَنِ اشۡتَرٰىہُ مَا لَہٗ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنۡ خَلَاقٍ ‘যে কেউ ওটা (যাদু) ক্রয় করেছে তার জন্য আখিরাতে সুখ লাভ নেই’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১০২)। অর্থাৎ পরকালে তার জন্য নেকির কোন অংশ বিশেষও নেই। বরং তার আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম।

যাদুকরের নিকট আগন্তুক ব্যক্তির বিধান

যাদুবিদ্যার শিষ্য পাপের ক্ষেত্রে যাদুকরের অংশীদার

যে ব্যক্তি যাদুকরের নিকট গমন করে এই উদ্দেশ্যে যেন তার জন্য যাদু করা হয়; তাহলে সে যেন তার পার্থিব জীবনের জন্য তার দ্বীন বিক্রি করল এবং ইসলাম বা ঈমান বিধ্বংসী একটি কাজ করার মাধ্যমে সে নিজেকে আল্লাহর ক্রোধের মুখোমুখি করল। আর তা হলো যাদুর প্রতি সন্তুষ্টি লাভ করা। শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সুতরাং যে এটি করে অর্থাৎ যাদু করে বা এটিতে সন্তুষ্টি থাকে, তাহলে সে কুফরী করল’ (রিসালাতু ফী নাওয়ক্বিযিল ইসলাম)। সুতরাং যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করার জন্য যাদুকরদের কাছে গেল  সে তার ঈর্ষার লক্ষ্য অর্জন করল। কেননা সে অন্যের প্রতি ঈর্ষা করল এমন বিষয়ে, যা মহান আল্লাহ তাকে নে‘মত হিসাবে দিয়েছেন। আর আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন এবং যা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তার প্রতি  অসন্তুষ্টির কারণে এবং নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করার কারণে সে তার পরকাল নষ্ট করল। যে যাদুকরদের কাছে যায় সে একটি পাপ করে, যাতে রয়েছে সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতা এবং সৃষ্টির উপর অত্যাচার জড়িত। যে কোন ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করতে চাইলেই সে তার ক্ষতি করতে পারবে না। কেননা আল্লাহ তা‘আলা যালিমের বিরুদ্ধে মাযলূমকে সাহায্য সহযোগিতা করেন এবং যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কোন ব্যক্তির ওপর আল্লাহ তা‘আলার নে‘মত অর্পিত হওয়ার কারণে হিংসুক ব্যক্তি হিংসায় ফেটে মরে। অথচ তার হিংসার কারণে হিংসিত ব্যক্তির ওপর নে‘মত আরো বৃদ্ধি পায়। কখনো কখনো হিংসা করার কারণে হিংসিত ব্যক্তির ওপর যে পরিমাণ নে‘মত বর্ষিত হয়েছিল তার সমপরিমাণ নে‘মত বর্ষিত হয়’।[৫]

হে যালেম যাদুকর! সাবধান, তোমার যাদুর খারাপ পরিণতি তোমার ওপরই পতিত হবে। হয়তোবা তুমি যাদুর মাধ্যমে যাকে কষ্ট দিচ্ছ তাকে অথবা অন্য কাউকে  আল্লাহ তা‘আলা তোমার ওপর কর্তৃত্ব দান করবেন। আল্লাহর হাতের ওপর কারো হাত নেই এবং প্রত্যেক যালেমকে তার যুল্মের কারণে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا یَحِیۡقُ الۡمَکۡرُ السَّیِّیُٔ  اِلَّا بِاَہۡلِہٖ ‘কূট ষড়যন্ত্র ওর উদ্যোক্তাদেরকেই পরিবেষ্টন করে’ (সূরা আল-ফাতির: ৪৩)। অর্থাৎ তার  খারাপ পরিনতি তাদের নিজেদের ওপরই বর্তাবে অন্যদের ওপরে নয়। মুহাম্মাদ ইবনু  কা‘ব আল-কুরাযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তিনটি কাজ যে ব্যক্তি করবে সে তার ফল ভোগ করবেই। তা হলো: চক্রান্ত, বিদ্রোহ, চুক্তি/শপথ ভঙ্গ করা। যার সত্যতা কুরআন মাজীদে রয়েছে’।[৬]

দিনে রাতে যে কোন সময় যাদুগ্রস্ত মাযলূম ব্যক্তি আল্লাহর নিকট দু‘আ করলে আল্লাহ তার দু‘আ কবুল করবেন মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন। রাসূল (ﷺ) বলেন,

‏ثَلَاثُ دَعَوَاتٍ مُسْتَجَابَاتٌ لَا شَكَّ فِيْهِنَّ دَعْوَةُ الْمَظْلُوْمِ وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ وَدَعْوَةُ الْوَالِدِ عَلَى وَلَدِهِ

‘তিন প্রকারের দু‘আ অবশ্যই মঞ্জুর করা হয়, তাতে কোনরকম সন্দেহ নেই। নির্যাতিত ব্যক্তির দু‘আ, মুসাফিরের দু‘আ এবং সন্তানের প্রতি বাবার বদ-দু‘আ’।[৭] যে ব্যক্তি সৃষ্টির কারো প্রতি চক্রান্ত করতে সক্ষম সে আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে চক্রান্ত করতে অক্ষম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قُلِ اللّٰہُ  اَسۡرَعُ مَکۡرًا ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, আল্লাহ অতি দ্রুত কলাকৌশল তৈরি করতে পারেন’ (সূরা ইউনুস: ২১)।

নিরপরাধ মাযলূম ব্যক্তিদেরকে রক্ষা করার জন্য একজন আছেন তিনি হলেন আল্লাহ তা‘আলা। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ اللّٰہَ یُدٰفِعُ عَنِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ کُلَّ  خَوَّانٍ  کَفُوۡرٍ ‘আল্লাহ রক্ষা করেন মুমিনদেরকে। নিশ্চয় আল্লাহ কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পসন্দ করেন না’ (সূরা আল-হজ্জ: ৩৮)। যুল্মের শেষ পরিণতি খুবই খারাপ এবং যালিম ব্যক্তির জন্য কঠিন শাস্তির ওয়াদা দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, وَ مَنۡ یَّظۡلِمۡ  مِّنۡکُمۡ  نُذِقۡہُ عَذَابًا کَبِیۡرًا ‘তোমাদের মধ্যে যে সীমালংঘন করবে আমি তাকে মহাশাস্তি আস্বাদ করাব’ (সূরা আল-ফুরক্বান: ১৯)।

যাদুকরের নিকট আগন্তক ব্যক্তি শয়তানের চক্রান্তে সে তার দ্বীন থেকে বের হয়ে যায়। সে ভুলে যায় যে, দুনিয়ার সময়টা খুবই সংক্ষিপ্ত, অন্ধকার কবরে সে একাকী লম্বা সময় অতিক্রম করবে এবং অচিরেই সে ন্যায়পরায়ণ বাদশা মহান আল্লাহর নিকট দণ্ডায়মান  হবে। যিনি যাদুকরের নিকট থেকে মাযলূম যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য প্রতিদান গ্রহণ করবেন এই কারণে যে, সে দুনিয়াতে তাকে যাদু করেছিল। সুতরাং তোমরা অনুতাপ প্রকাশ কর। হে যাদুকরের নিকট আগন্তুক ব্যক্তি! তুমি যার ওপর যাদু করেছিলে সেই যাদুর প্রতিক্রিয়া তোমার ওপর পতিত হওয়ার আগেই তুমি তার সেই যাদুর গিট খুলে দাও।

যাদু হতে নিরাপদ থাকার উপায়

প্রথমতঃ যাদুগ্রস্ত হওয়ার আগেই তার প্রতিষেধক গ্রহণ করা।

আল্লাহ তা‘আলা মানুষ সৃষ্টি করার পর তার জন্য শত্রুও সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর উক্ত শয়তানের অনিষ্ট হতে নিরাপদ থাকার জন্য বিভিন্ন উপায় উপকরণও দিয়েছেন। নিম্নে তার কিছু আলোকপাত করা হলো-

১- আল্লাহর ওপর ভরসা করা

মুমিন ব্যক্তি তার অন্তরকে সর্বদা আল্লাহ তা‘আলার সাথে ঝুলন্ত রাখে। তার প্রতিটি কাজ আল্লাহর জন্য সমর্পণ করে দেয়। সে জানে যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন অনিষ্ট কখনোই তার ক্ষতি করতে পারবে না। যেমন রাসূল (ﷺ)বলেন,

وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوْكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوْكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ لَكَ وَلَوِ اجْتَمَعُوْا عَلَى أَنْ يَضُرُّوْكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوْكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ رُفِعَتِ الْأَقْلَامُ وَجَفَّتِ الصُّحُفُ

‘জেনে রাখো, যদি সকল উম্মাতও তোমার কোন উপকারের উদ্দেশে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তা‘আলা তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। পক্ষান্তরে যদি সমস্ত সৃষ্টিজীব সমবেতভাবে তোমার কোন ক্ষতি করতে চায়, তবে তারা আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাণ ব্যতীত তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কলম তুলে নেয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহও শুকিয়ে গেছে’।[৮]

কোন যাদুই যাদু কৃত ব্যক্তির ওপর প্রভাব ফেলতে  পারে না। এরকম অনেক  যাদুকর রয়েছে, যে তার যাদু যাদুকৃত ব্যক্তির ওপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। আল্লাহ  তা‘আলা বলেন, وَ مَا ہُمۡ  بِضَآرِّیۡنَ بِہٖ مِنۡ اَحَدٍ  اِلَّا بِاِذۡنِ اللّٰہِ ‘কিন্তু তারা আল্লাহর আদেশ ব্যতীত তদ্বারা কারও অনিষ্ট করতে পারত না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১০২)। পৃথিবীবাসীর অনিষ্ট সম্পাদনে শয়তানের জন্য কী কখনও পথ খোলা ছিল?!!

২- বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করা

যাদু থেকে বিরত থাকার জন্য বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করতে হবে হবে। হতে পারে তা কুরআন তিলাওয়াত করা, তাওবা-ইস্তিগফার করা, তাসবীহ পাঠ করা সহ সব ধরনের যিকির-আযকার। এগুলো হল আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিতে অনিষ্টসমূহ হতে সুদৃঢ় নিরাপত্তা। যখনই কোন মানুষ আল্লাহ তা‘আলা থেকে দূরে থাকে তখন তার জন্য আল্লাহ অভিমুখী হওয়া এবং তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। কেননা  তার বিপর্যয় ছিল অনেক বড়, তার দুর্দশা ছিল অনেক এবং মানবজাতির মধ্য হতে শয়তান এবং জিনদের মধ্য হতে শয়তান তার বিরুদ্ধে একটি প্রবেশদ্বার খুঁজে পেয়েছিল। ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যদি হৃদয় আল্লাহর  সাথে পূর্ণ হয়, তবে এটি তাঁর স্মরণে নিমজ্জিত হয়। তার কাছে  অনুরোধ, মিনতি, স্মরণ এবং আশ্রয় প্রার্থনা সবগুলোর ক্ষেত্রে অন্তত তার জিহবাকে অনুকূলে পায়। এটি ছিল সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি। যা যাদুকে তার উপর প্রভাব ফেলতে বাধা দেয় এবং তাকে যা পেয়ে বসেছিল তা দূর করার ক্ষেত্রে এটি তার জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক’।[৯]

৩- পাপকর্ম ও গান শ্রবণ থেকে দূরে থাকা। কেননা অন্তরে এবং বাড়িতে শয়তানকে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো গান শ্রবণ করা। (পক্ষান্তরে) শয়তানকে বিতাড়নের ক্ষেত্রে করণীয় হল- নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত এবং আল্লাহর যিকির করা 

৪- মসজিদে গিয়ে মুসলিমদের জামা‘আতের সাথে আদায় করার মাধ্যমে ফাজরের ছালাতকে হেফাযত করা। রাসূল (ﷺ) বলেন, مَنْ صَلَّى الصُّبْحَ فَهُوَ فِىْ ذِمَّةِ اللهِ ‘যে ব্যক্তি ফজরের ছালাত আদায় করে সে আল্লাহর জিম্মায় চলে যায়’।[১০] আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জিম্মায় চলে যায় তার ব্যাপারে শয়তানের জন্য কোন পথ খোলা থাকে না।

৫- বাড়িতে নিয়মিত সূরা বাক্বারাহ পাঠ করা। রাসূল (ﷺ) বলেন,

اقْرَءُوْا سُوْرَةَ الْبَقَرَةِ فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةٌ وَتَرْكَهَا حَسْرَةٌ وَلَا تَسْتَطِيْعُهَا الْبَطَلَةُ‏.‏ قَالَ مُعَاوِيَةُ بَلَغَنِي أَنَّ الْبَطَلَةَ السَّحَرَةُ

‘তোমরা সূরা আল-বাক্বারাহ পাঠ কর। এ সূরাটিকে গ্রহণ করা বরকতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না’। হাদীছটির বর্ণনাকারী আবূ মু‘আবিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, আমি জানতে পেরেছি যে, ‘বাতিলের অনুসারী বলে যাদুকরদের কথা বলা হয়েছে’।[১১] অন্যত্র রাসূল (ﷺ) বলেন, إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيْهِ سُوْرَةُ الْبَقَرَةِ ‏ ‘যে ঘরে সূরাহ আল-বাক্বারাহ পাঠ করা হয় শয়তান সে ঘর থেকে পালিয়ে যায়’।[১২]

৬- সকাল-সন্ধ্যা সূরা আন-নাস ও সূরা আল-ফালাক্ব পাঠ করা। রাসূল (ﷺ) ঊক্ববা ইবনু আমির (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে এই সূরাদ্বয় পাঠ করার ব্যাপারে নাছিহা করেছেন এবং তাকে বলেছেন, تَعَوَّذْ بِهِمَا فَمَا تَعَوَّذَ مُتَعَوِّذٌ بِمِثْلِهِمَا ‘এ সূরা দু’টি দ্বারা পানাহ চাও। কেননা পানাহ চাওয়ার জন্য এরূপ সূরা নেই’।[১৩] ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মানুষের  খাদ্য-পানীয় ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গুরুত্ব যতটুকু তার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এই সূরা নাস ও ফালাক্ব দ্বারা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা’।[১৪]

৭- আল্লাহর সৃষ্টির অনিষ্ট হতে দিনে ও রাতে পূর্ণ বাক্য দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার নিকট বেশি বেশি আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং যেকোন জায়গা অবতরণ করার সময়, তা বাড়ি বা মানবহীন স্থান, আকাশ বা সাগর যেকোন স্থানে হোক না কেন। রাসূল (ﷺ) বলেন,

مَنْ نَزَلَ مَنْزِلًا فَقَالَ: أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ لَمْ يَضُرَّهُ شَيْءٌ حَتَّى يَرْتَحِلَ مِنْ مَنْزِلِهِ ذَلِكَ

‘যে ব্যক্তি কোন জায়গায় অবতরণ করে বলে, ‘আ‘ঊযুবি কালিমাতিল্লা-হিত তা-ম্মা-তি মিং র্শারি মা- খলাক্ব’ (অর্থাৎ- আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমসমূহের মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্ট সকল কিছুর অনিষ্টতা হতে আশ্রয় চাই); তাহলে তাকে কোন জিনিস অনিষ্ট করতে পারবে না তার ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত’।[১৫]

৮- রাতের শুরুর দিকে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اٰمَنَ الرَّسُوۡلُ بِمَاۤ  اُنۡزِلَ اِلَیۡہِ مِنۡ رَّبِّہٖ وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ ؕ کُلٌّ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَ مَلٰٓئِکَتِہٖ وَ کُتُبِہٖ وَ رُسُلِہٖ ۟ لَا نُفَرِّقُ بَیۡنَ  اَحَدٍ مِّنۡ رُّسُلِہٖ ۟ وَ قَالُوۡا سَمِعۡنَا وَ اَطَعۡنَا ٭۫ غُفۡرَانَکَ رَبَّنَا وَ اِلَیۡکَ الۡمَصِیۡرُ -لَا یُکَلِّفُ اللّٰہُ نَفۡسًا اِلَّا وُسۡعَہَا ؕ لَہَا مَا کَسَبَتۡ وَ عَلَیۡہَا مَا اکۡتَسَبَتۡ ؕ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذۡنَاۤ  اِنۡ نَّسِیۡنَاۤ  اَوۡ اَخۡطَاۡنَا ۚ رَبَّنَا وَ لَا  تَحۡمِلۡ عَلَیۡنَاۤ  اِصۡرًا کَمَا حَمَلۡتَہٗ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِنَا ۚ رَبَّنَا وَ لَا  تُحَمِّلۡنَا مَا   لَا طَاقَۃَ لَنَا بِہٖ ۚ وَ اعۡفُ عَنَّا ٝ وَ اغۡفِرۡ لَنَا ٝ وَ ارۡحَمۡنَا ٝ اَنۡتَ مَوۡلٰىنَا فَانۡصُرۡنَا عَلَی الۡقَوۡمِ الۡکٰفِرِیۡنَ

‘রাসূল তার রব হতে তার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা ঈমান আনয়ন করেছেরন এবং মুমিনগণও (ঈমান আনয়ন করেছেন); তারা সবাই আল্লাহ, তাঁর মালাইকা, তাঁর গ্রন্থসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করে; (তারা বলে) আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কাউকেও পার্থক্য করি না এবং তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং স্বীকার করলাম; হে আমাদের রব! আমরা আপনারই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনারই দিকে শেষ প্রত্যাবর্তন। কোন ব্যক্তিকেই আল্লাহ তার সাধ্যের অতিরিক্ত কর্তব্য পালনে বাধ্য করেন না; সে যা উপার্জন করেছে তা তারই জন্য এবং যা সে অর্জন করেছে তা তারই উপর বর্তাবে। হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই অথবা ভুল করি সেজন্য আমাদেরকে অপরাধী করবেন না। হে আমাদের রব! আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেরূপ গুরুভার অর্পণ করেছিলেন আমাদের উপর তদ্রুপ ভার অর্পণ করবেন না। হে আমাদের রব! যা আমাদের শক্তির বাইরে ঐরূপ ভার বহনে আমাদেরকে বাধ্য করবেন না এবং আমাদের পাপ মোচন করুন ও আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আমাদেরকে দয়া করুন, আপনিই আমাদের আশ্রয়দাতা! অতএব কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে জয়যুক্ত করুন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৮৫-২৮৬)।

রাসূল (ﷺ) বলেন, مَنْ قَرَأَ بِالآيَتَيْنِ مِنْ آخِرِ سُوْرَةِ الْبَقَرَةِ فِيْ لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ‏ ‘কেউ যদি রাতে সূরাহ বাক্বারার শেষ দু’টি আয়াত পাঠ করে, সেটাই তার জন্য যথেষ্ট’।[১৬]

৯- ঘুমের সময় আয়াতুল কুরসি পাঠ করা। হাদীসে এসেছে,

إِذَا أَوَيْتَ إِلَى فِرَاشِكَ فَاقْرَأْ آيَةَ الْكُرْسِيِّ (اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَۚ اَلۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ) حَتَّى تَخْتِمَ الْآيَةَ فَإِنَّكَ لَنْ يَزَالَ عَلَيْكَ مِنَ اللهِ حَافَظَ وَلَا يَقْرِبَنَّكَ شَيْطَانٌ حَتَّى تُصْبِحَ

‘তুমি শোবার জন্য বিছানায় গেলে আয়াতুল কুরসী পড়বে, ‘আল্ল-হু লা- ইলা-হা ইল্লা- হুওয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যূম’ আয়াতের শেষ পর্যন্ত; তাহলে আল্লাহর তরফ থেকে সব সময় তোমার জন্য একজন রক্ষী থাকবে, ভোর হওয়া পর্যন্ত’।[১৭]

(ইনশাআল্লাহ চলবে)

* শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাউসা, হেদাতীপাড়া, বাঘা, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. মাজমূঊল ফাতাওয়া, ২৯শ খণ্ড, পৃ. ৩৮৪।
[২]. মাজমূঊল ফাতাওয়া, ১৯শ খণ্ড, পৃ. ৩৪।
[৩]. বাইহাক্বী, সুনানুছ ছুগরা, হা/৩১৯৫।
[৪]. বাইহাক্বী, সুনানুছ ছুগরা, হা/৩১৯৫।
[৫]. মাজমূঊল ফাতাওয়া, ১০ম খণ্ড, পৃ. ১১২।
[৬]. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৫৫৯।
[৭]. তিরমিযী, হা/১৯০৫।
[৮]. তিরমিযী, হা/২৫১৬।
[৯]. যাদুল মা‘আদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১২৭।
[১০]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৭; মিশকাত, হা/৬২৭।
[১১]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৭৫৯।
[১২]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৭০।
[১৩]. আবূ দাঊদ, হা/১৪৬৩।
[১৪]. বাদাইঊল ফাওয়াইদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৯৯।
[১৫]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭০৮।
[১৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০০৯।
[১৭]. ছহীহ বুখারী, হা/২৩১১।




তওবার গুরুত্ব ও ফযীলত (২য় কিস্তি) - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ধর্মীয় সংস্কারের স্বরূপ ও প্রকৃতি (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
জঙ্গিবাদ বনাম ইসলাম (৫ম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কারে আলিমগণের গৃহীত মূলনীতিসমূহ: একটি পর্যালোচনা (৩য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ছয়টি মূলনীতির ব্যাখ্যা (শেষ কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
প্রতিবেশীর হক্ব আদায়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
বাংলাদেশে সমকামিতার গতি-প্রকৃতি : ভয়াবহতা, শাস্তি ও পরিত্রাণের উপায় অনুসন্ধান - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
আল-কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত (১০ম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
জঙ্গিবাদ বনাম ইসলাম (২য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : মুহাম্মদ ইমরান বিন ইদরিস
ইসলামী তাবলীগ বনাম ইলিয়াসী তাবলীগ (৩য় কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ইসলামী সংগঠন ও তরুণ-যুবক-ছাত্র - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ