শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৭ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কারে আলিমগণের গৃহীত মূলনীতিসমূহ: একটি পর্যালোচনা

- ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান 


(৯ম কিস্তি)

৯. ইসলামী আদর্শ ভিত্তিক সংস্থা ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা (Establishment of Organizations and Agency based on Islamic ideology)

কোন আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘবদ্ধ শক্তি শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। তাই ইসলামী আদর্শ ভিত্তিক সংস্থা ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা যেমন যরূরী, তেমনি সেখানে সমবেত হওয়ার গুরুত্বও অপরিসীম। কেননা ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রভাব অনেক সুদূরপ্রসারী। তাই বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কার সফলভাবে পরিচালনা করতে একটি আদর্শিক প্লাটফরম প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত যরূরী। কেননা এর মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন জনসমাজকে যেমন ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসাবে গঠন করা যায়, তেমনি ধর্মীয় সংস্কারের পথ সুগম হয়।

ইসলামে ঐক্যবদ্ধ জীবন-যাপনের ব্যাপারে বারবার তাকীদ প্রদান করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জাহিলী যুগে বিচ্ছিন্ন সমাজ ব্যবস্থাকে ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করেছিলেন। মদীনায় হিজরত করে তিনি আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ ও বিভক্তিকে মাটির নিচে দাবিয়ে দেন এবং তাদের মধ্যে সার্বিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে তাওহীদভিত্তিক একটি আদর্শিক প্লাটফরম প্রতিষ্ঠা করেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা নিম্নের আয়াতটি নাযিল করেন।[১] আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ اعۡتَصِمُوۡا بِحَبۡلِ اللّٰہِ جَمِیۡعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوۡا ۪ وَ اذۡکُرُوۡا نِعۡمَتَ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ  اِذۡ  کُنۡتُمۡ اَعۡدَآءً فَاَلَّفَ بَیۡنَ قُلُوۡبِکُمۡ فَاَصۡبَحۡتُمۡ بِنِعۡمَتِہٖۤ اِخۡوَانًا ۚ وَ کُنۡتُمۡ عَلٰی شَفَا حُفۡرَۃٍ مِّنَ النَّارِ فَاَنۡقَذَکُمۡ مِّنۡہَا ؕ کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمۡ اٰیٰتِہٖ  لَعَلَّکُمۡ  تَہۡتَدُوۡنَ.

‘তোমরা একযোগে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং দলে দলে বিভক্ত হয়ো না। আর তোমাদের প্রতি আল্লাহর যে অনুগ্রহ রয়েছে, তা তোমরা স্মরণ কর। যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, তখন তিনিই তোমাদের অন্তকরণে প্রীতি স্থাপন করেছিলেন। তারপর তোমরা তাঁর অনুগ্রহে ভ্রাতৃত্বে আবদ্ধ হলে। তোমরা যখন অগ্নিকুণ্ডের নিকটে ছিলে, তখন অনন্তর তিনিই তোমাদেরকে তা হতে উদ্ধার করেছেন। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নিদর্শনাবলী ব্যক্ত করেন, যাতে তোমরা সুস্পষ্ট পথ পাও’ (সূরা আলি ‘ইমরান : ১০৩)।

উক্ত আয়াতে বর্ণিত وَّ لَا تَفَرَّقُوۡا ‘তোমরা পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না’-এর ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৬ হি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না’ অর্থাৎ এটা দ্বারা মুসলিমদের জামা‘আতকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা ও পরস্পর মিলেমিশে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং এটি ইসলামী আইনসমূহের মধ্যে একটি আইন’।[২] ইবনু কাছীর (৭০১-৭৭৪ হি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তাদেরকে জামা‘আতবদ্ধ জীবন-যাপনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং বিভক্তি হতে নিষেধ করা হয়েছে’।[৩] ‘আব্দুর রহমান ইবনু নাসির আস-সা‘দী (১৩০৭-১৩৭৬ হি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এমন বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছেন, যা তাদেরকে তাক্বওয়া অবলম্বনের ব্যাপারে সাহায্য করবে। তা হলো, আল্লাহর দ্বীনকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা ও একটি বিষয়ে মুমিনদের দাবি বিচ্ছিন্নভাবে না হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে হওয়া। কেননা মুসলিমদের দ্বীনি ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ ও অন্তরের মিল হওয়া তাদের দ্বীন ও দুনিয়া উভয় বিষয়ে কল্যাণ বয়ে আনবে। আর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দ্বারা তারা সকল কর্ম সম্পাদনে সক্ষম হবে। এছাড়া তাদের ঐসকল সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে, যা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। নেকি ও পরহেযগারিতার বিষয়ে সাহায্য করা একা একা বিচ্ছিন্ন থেকে সম্ভব নয়। যেমনভাবে বিচ্ছিন্নতা ও শত্রুতার মধ্যে কোন শৃংখলা থাকে না, তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং প্রত্যেকেই নিজের খেয়াল খুশিমত প্রচেষ্টা ও ‘আমল করতে থাকে। যদিও এটা তাকে ব্যাপক ক্ষতির দিকে ধাবিত করে’।[৪]

ধর্মীয় সংস্কারের সামগ্রিক সফলতার মানদণ্ড হলো- সার্বিক ঐক্য। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জাতিতে জাতিতে প্রতিষ্ঠিত বিভেদের শিকড় উপড়ে ফেলেছিলেন এবং ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইসলামের জামা‘আতবদ্ধ জীবন-যাপনের গুরুত্ব সীমাহীন। বিখ্যাত ছাহাবী হারিস আল-আশ‘আরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

آمُرُكُمْ بِخَمْسٍ بِالْجَمَاعَةِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَالْهِجْرَةِ وَالْجِهَادِ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ وَإِنَّهُ مَنْ خَرَجَ مِنَ الْجَمَاعَةِ قِيْدَ شِبْر ِفَقَدْ خَلَعَ رِبْقَةَ الْإِسْلَامِ مِنْ عُنُقِهِ إِلَّا أَنْ يُرَاجِعَ وَمَنْ دَعَا بِدَعْوَىِ الْجَاهِلِيَّةِ فَهُوَ مِنْ جُثَى جَهَنَّمَ وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ

‘আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছি। যথা: (১) জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপন করা (২) আমীরের নির্দেশ শ্রবণ করা (৩) তাঁর আনুগত্য করা (৪) প্রয়োজনে হিজরত করা ও (৫) আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। যে ব্যক্তি জামা‘আত হতে এক বিঘত পরিমাণ বের হয়ে গেল তার গর্দান হতে ইসলামের গণ্ডি ছিন্ন হলো-যতক্ষণ না সে ফিরে আসে। যে ব্যক্তি মানুষকে জাহিলিয়াতের দাওয়াত দ্বারা আহ্বান জানাল, সে ব্যক্তি জাহান্নামীদের দলভুক্ত হলো। যদিও সে ছিয়াম পালন করে, ছালাত আদায় করে এবং ধারণা করে যে, সে একজন মুসলিম’।[৫]

‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘আমার ছাহাবীগণকে সম্মান কর। কেননা তারা তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম লোক। অতঃপর তৎপরবর্তীদেরকে (তাবি‘ঈ), অতঃপর তার পরবর্তী লোকদেরকে (তাবি‘ তাবি‘ঈ)। এরপর মিথ্যার আবির্ভাব ঘটবে। এমনকি কোন ব্যক্তি (স্বেচ্ছায়) কসম করবে, অথচ তার নিকট কসম চাওয়া হবে না। সে সাক্ষ্য দিবে, অথচ তার নিকট হতে সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। সাবধান! যে ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যস্থলের আকাক্সক্ষী, সে যেন জামা‘আতকে ধরে রাখে। কেননা শয়তান সে ব্যক্তির সাথে থাকে, যে জামা‘আত হতে পৃথক থাকে। সাবধান! তোমাদের কেউ যেন কোন বেগানা নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান না করে। কেননা শয়তান তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে তাদের মাঝে উপস্থিত থাকে। আর যার নেক কাজে মনের মধ্যে আনন্দ জাগে এবং খারাপ কাজ তাকে চিন্তিত করে ফেলে, সেই প্রকৃত ঈমানদার’।[৬]

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়্যাহ (৬৬১-৭২৮ হি./১২৬৩-১৩২৮ খ্রি. (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধতা এবং সম্প্রীতি ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) বাধ্যতামূলক করেছেন।... সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করা এবং পরস্পর বিভক্ত না হওয়া ইসলামের একটি সুমহান মূলনীতি’।[৭]

অতএব সমাজ সংস্কারে একটি আদর্শিক সংস্থা ও সংগঠন প্রতিষ্ঠার উপরিউক্ত গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই বাংলাদেশের ‘আলিম সমাজ বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। যার মাধ্যমে তারা যেমন ইসলামের ঈমান ও ‘আক্বীদা-বিশ্বাস, আবশ্যকীয় ফরয ‘ইবাদতসমূহ, নৈতিকতা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিষয়াবলী জনসাধারণের মাঝে সহজেই উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তেমনি এদেশের বিচ্ছিন্ন মুসলিম সমাজকে একক প্লাটফরমে ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। যেমন,

১. ফারায়েজী আন্দোলন (ঋধৎধলর সড়াবসবহঃ) : এটি ঊনিশ শতকে বাংলায় গড়ে ওঠা একটি ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন। যা পরবর্তীতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে। মাওলানা হাজী শরীয়াতুল্লাহ (১১৯৬-১২৫৬ হি./১৭৮১-১৮৪০ খ্রি.) হলেন এ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলায় ব্রিটিশ কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই মুসলমানদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় ঘটে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, চাকরি, জমিদারি প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্যের শিকার মুসলমানদের আত্মসচেতনতা সৃষ্টি ও ধর্মীয় বিষয়গুলো ঠিকমতো পালন করানোর লক্ষ্যে হাজী শরীয়াতুল্লাহ ‘ফারায়েজি আন্দোলন’-এর সূচনা করেন।[৮] ‘ফরায়েজী’ শব্দটি ‘ফরজ’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। তবে হাজী শরীয়াতুল্লাহ শব্দটিকে ব্যাপক অর্থে ব্যাখ্যা করে বলেন, অবশ্য পালনীয়ই হোক বা ঐচ্ছিকই হোক, আল-কুরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত সকল ধর্মীয় কর্তব্যই এর অন্তর্ভুক্ত। তিনি এ আন্দোলনের মাধ্যমে তাওহীদের পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও পূর্ণ অনুশীলনের উপর জোর দেন এবং মূল বিশ্বাস বা মতবাদ থেকে যে কোন বিচ্যুতিকে তিনি ‘শির্ক’ ও ‘বিদ‘আত’ বলে ঘোষণা করেন।[৯]

২. আঞ্জুমান-ই উলামা-ই বাংগালা (অহলঁসধহ-র টষধসধ-র ইধহমধষধ) : এ সংগঠনটি ১৯১৩ সালে বগুড়ার ‘ধানিয়া’ গ্রামে মাওলানা আব্দুল্লাহেল বাকী (১৮৮৬-১৯৫৬ খ্রি.)-এর উদ্যোগে গঠিত হয়। তিনি ছিলেন এর প্রথম সভাপতি। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ১৯১৪ সালে এ আঞ্জুমানের মুখপত্র হিসাবে মাসিক ‘আল-ইসলাম’ প্রকাশিত হয়। মাওলানা মনীরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন এর সম্পাদক। আকরম খাঁ ছিলেন প্রকাশক ও যুগ্ম সম্পাদক।[১০] উদ্দেশ্য ছিল হানাফী ও আহলে হাদীস ‘আলিমগণকে এক মঞ্চে এনে তাঁদের মধ্যকার ধর্মীয় বিভেদ দূর করা এবং মুসলমানগণকে তাদের ধর্মীয় সামাজিক অবস্থান ও সমাজের প্রতি দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা।[১১]

৩. নিখিলবঙ্গ ও আসাম জমঈয়তে আহলে হাদীছ (ঘরশযরষনড়হমড় ড় ধংংধস লড়সবড়ঃব ধযষব যধফরঃয) : মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফী আল-কুরাইশী (১৩১৮-১৩৮০ হি./১৯০০-১৯৬০ খ্রি.) হলেন এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪৪ ও ১৯৪৫ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত ‘অল ইন্ডিয়া আহলে হাদীস কনফারেন্সে’ মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফী (রহ.) পরপর দু’বার বিশেষ আমন্ত্রণে যোগদান করেন এবং অগ্নিঝরা বক্তব্য প্রদান করেন, যা সুধী সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ সম্মেলন থেকে ফিরে আসার পর তাঁর দীর্ঘদিনের সাধনা ও প্রেরণায় ১৮, ১৯ ও ২০ এপ্রিল  ১৯৪৬ সালে রংপুরের হারাগাছ এলাকায় তিনদিন ব্যাপী ঐতিহাসিক কনফারেন্সের আয়োজন করেন। উক্ত কফারেন্সে মাওলানা আব্দুল্লাহিল বাকী (রহ.) সভাপতিত্ব করেন। এ কনফারেেেন্স তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ১৯টি ও আসমারে ৫টি জেলা এবং বিহার হতে আহলে হাদীছ প্রতিনিধি এবং উপমহাদেশের বহু প্রখ্যাত ‘উলামায়ে কিরাম অংশগ্রহণ করেন।[১২] এ কনফারেন্সেই মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফী আল-কুরায়শী (রহ.)-কে সভাপতি করে ‘নিখিল বঙ্গ ও আসাম জমঈয়তে আহলে হাদীছ’ গঠিত হয়। কলকাতার মারকুইস লেনস্থ মিসরীগঞ্জ আহলে হাদীছ মসজিদে জমঈয়তের কেন্দ্রীয় দফতর স্থাপিত হয়।[১৩]

৪. বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীছ (ইধহমধষধফবংয লড়সবড়ঃব ধযষব যধফরঃয ) : ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ভারত বিভাগের পর ১৯৪৮ সালের ৭ই মার্চ তারিখে ‘নিখিল বঙ্গ ও আসাম জমঈয়তে আহলে হাদীছ’-এর সদর দফতর কলিকাতা হতে পূর্ব পাকিস্তানের পাবনা জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র বাঁশবাজার আহলেহাদীছ জামে মসজিদ সংলগ্ন দফতরে স্থানান্তরিত হয়। অতঃপর ১৯৫৩ সালের ১০ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জেনারেল কমিটির এক সভায় নাম পরিবর্তন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পূর্ব-পাক জমঈয়তে আহলেহাদীছ’ গঠিত হয়। ১৯৫৬ সালের অক্টোবর মাসে কেন্দ্রীয় দফতর পাবনা হতে ঢাকায় ৮৬, কাযী আলাউদ্দীন রোডে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬০ সালের ৪ঠা জুন তারিখে জমঈয়ত সভাপতি মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফী আল-কুরায়শী (রহ.)-এর ইন্তিকালের পর ১৫ই জুন তারিখে তদীয় ভ্রাতৃষ্পুত্র প্রখ্যাত বাগ্মী ও ইসলামী চিন্তাবিদ প্রফেসর ড. আবদুর বারী (রহ.) পরবর্তী সভাপতি নিযুক্ত হন। অতঃপর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর নাম পরিবর্তন হয়ে ‘বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীছ’ নামে পরিচিত।[১৪]

৫. আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ (অযষব ঐধফরঃয অহফড়ষড়হ ইধহমষধফবংয) : বাংলাদেশের একটি সংস্কারধর্মী ও দাওয়াহভিত্তিক ইসলামী সংগঠন, যা কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে। সংগঠনটি ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ও আমীর প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব। সংগঠনটির মূল আদর্শ হলো তাওহীদের বিশুদ্ধ ধারণা প্রতিষ্ঠা, ছহীহ সুন্নাহর অনুসরণ, আক্বীদা ও আমলের সংশোধন, শিরক, বিদ‘আত ও কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠন এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রসার। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সংগঠনটি দাওয়াহ, ইসলামী শিক্ষা, গবেষণা, প্রকাশনা, প্রশিক্ষণ, ইসলামী সাহিত্য বিতরণ এবং সামাজিক ও নৈতিক সংস্কারমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এর অন্যতম প্রকাশনা হলো গবেষণাধর্মী মাসিক আত-তাহরীক, তাওহীদের ডাক, যা ইসলামী চিন্তা, গবেষণা ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত প্রবন্ধ প্রকাশ করে। এছাড়া দেশব্যাপী বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক দাওয়াহ কার্যক্রম, ইসলামী সম্মেলন, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে।

সংগঠনটির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, আহলেহাদীছ মহিলা সংস্থা, সোনামণি (শিশু জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন), হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, হাদীছ ফাউন্ডেশন শিক্ষা বোর্ড এবং আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা, দাওয়াহ, গবেষণা, প্রকাশনা, সমাজকল্যাণ এবং ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক মানবসম্পদ গঠনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশে আহলেহাদীছ ধারার সাংগঠনিক বিকাশে ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষত ১৯৯৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সংগঠনটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শাখা সম্প্রসারণ, ইসলামী সাহিত্য প্রকাশ, দাওয়াহ কার্যক্রম পরিচালনা এবং ধর্মীয় সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজস্ব একটি সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলে। ফলে বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংস্কারধর্মী ইসলামী সংগঠনসমূহের আলোচনায় ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ একটি উল্লেখযোগ্য সংগঠন হিসাবে বিবেচিত হয়।

এতদ্ব্যতীত ‘ইসলাম মিশন’, ‘খাদিমুল ইসলাম’, ‘খিলাফত আন্দোলন’, ‘জমঈয়তে উলামায়ে হিন্দ’, ‘জমঈয়তে উলামায়ে বাাঙ্গালা’, ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টি’, ‘মুসলিম ন্যাশনালিষ্ট পার্টি’, ‘কৃষক-প্রজা পার্টি’ ইত্যাদি নামে অসংখ্য প্লাটফরম তথা সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। যা সংস্কার কাজকে আরো বেগবান ও শক্তিশালী করে তোলে।

১০. ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুনের চর্চা বৃদ্ধি করা (ওহপৎবধংরহম ঃযব ঢ়ৎধপঃরপব ড়ভ ওংষধসরপ ঈরারষরুধঃরড়হ ্ ঈঁষঃঁৎব)

তাহযীব-তামাদ্দুন তথা সভ্যতা-সংস্কৃতি হলো ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য। মানুষের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস মূলত তার সভ্যতা ও সংস্কৃতিরই ইতিহাস। মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নেতৃত্বে ইসলামের যাত্রা শুরু হওয়ার সাথে সাথে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি অতি দ্রুত চতুর্দিকে বিস্তার লাভ করে।[১৫] তাঁর মৃত্যুর পর মাত্র ২০ বছরে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে সিরিয়া, প্যালেষ্টাইন, মিসর ও পারস্য পর্যন্ত। এভাবেই ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি ৭ম শতাব্দী থেকে ১৩শ শতাব্দী পর্যন্ত গোটা বিশ্বকে পরিচালিত করেছে। মূলত সংস্কৃতি হলো সভ্যতার বাহন। সংস্কৃতির পিঠে চড়েই সভ্যতা কোন জাতি-গোষ্ঠীর ডানা মেলে বসে। এ জন্যই প্রতিটি সভ্যতা সংস্কৃতিকে লালন করে থাকে। পৃথিবীতে যত ধর্ম এসেছে তা তার বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিত সংস্কৃতিকে ধারণ করেই বেঁচে আছে। শুধু মুসলিম জাহানের সাহিত্য, স্থাপত্য শিল্পে নয়, বরং জ্ঞান-গরিমা, পরিবেশ রক্ষা ও মানবাধিকারসহ আজকে পৃথিবীজুড়ে যে সভ্যতা ও সংস্কৃতি লালিত হচ্ছে তার সবচেয়ে বড় অবদান ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির। কেবল ধর্মই নয়, বরং গোটা ইউরোপের সমগ্র জীবন ও এর সভ্যতা-সংস্কৃতি ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। রবার্ট ব্রিফল্ট (জড়নবৎঃ ইৎরভভধঁষঃ) স্বীকার করে বলেছেন,

"ঋড়ৎ ধষঃযড়ঁময, ঃযবৎব রং হড়ঃ ধ ংরহমষব ধংঢ়বপঃ ড়ভ ঊঁৎড়ঢ়বধহ মৎড়ঃিয রহ যিরপয ঃযব ফবপরংরাব রহভষঁবহপব রভ রংষধসরপ পরারষরুধঃরড়হ রং হড়ঃ ঃৎধপবধনষব হড়যিবৎব রং রঃ ংড় পষবধৎ ধহফ সড়সবহঃড়ঁং ধং রহ ঃযব মবহবংরং ড়ভ ঃযধঃ ঢ়ড়বিৎ যিরপয পড়হংঃরঃঁঃবং ঃযব ঢ়বৎসধহবহঃ ফরংঃরহপঃরাব ভড়ৎপব ড়ভ ঃযব সড়ফবৎহ ড়িৎষফ ধহফ ঃযব ংঁঢ়ৎবসব ংড়ঁৎপব ড়ভ রঃং ারপঃড়ৎুথহধঃঁৎধষ ংপরবহপব ধহফ ংপরবহঃরভরপ ংঢ়রৎরঃ.

‘ইউরোপের বিকাশের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে ইসলামী সভ্যতার নির্ণায়ক প্রভাবের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে এই প্রভাব সবচেয়ে সুস্পষ্ট, গভীর ও যুগান্তকারীভাবে প্রতিভাত হয়েছে সেই শক্তির উন্মেষে, যা আধুনিক বিশ্বের স্থায়ী ও স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য এবং তার সাফল্য ও প্রাধান্যের প্রধান উৎস- অর্থাৎ প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক মনন’।[১৬]

মুসলিমের ইহকালে কল্যাণ ও পরকালে মুক্তির জন্য ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা ইসলামী সংস্কৃতি সচেতন বিবেক গঠন করে থাকে। যা দ্বীনের মধ্য থেকে সকল প্রকার মিথ্যাকে প্রকাশ করে এবং কুসংস্কার ও কিসসা-কাহিনী থেকে মুক্ত করে।[১৭] এছাড়া বিশুদ্ধ ‘আক্বীদা গঠনও সংস্কৃতির অন্যতম অংশ। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ‘ইবাদতের জন্য সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন। ক্বিয়ামতের দিন মানুষকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে।[১৮] ইসলামী সংস্কৃতি মুসলিম উম্মাহর জন্য অন্যান্যদের সংস্কৃতি বিশেষ করে ইহুদী ও খ্রিস্টানদের অনুসরণের ব্যাপারে সতর্ক করে। আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ حَتَّى لَوْ سَلَكُوا جُحْرَ ضَبٍّ لَسَلَكْتُمُوْهُ قُلْنَا يَا رَسُوْلَ اللهِ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى قَالَ فَمَنْ

‘তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের পন্থা অনুসরণ করবে, প্রতি বিঘতে বিঘতে এবং প্রতি গজে গজে। এমনকি তারা যদি গো সাপের গর্তেও ঢুকে, তবে তোমরাও তাতে ঢুকবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি কি ইহুদী, নাছারাদের কথা বলছেন? তিনি বললেন, তবে আর কার কথা!’[১৯] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত’।[২০] এজন্য ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির মৌলিকত্ব বর্ণনায় ড. ছালিহ যিয়াব হিন্দী বলেন,

هي طريقة الحياة التي يعيشها المسلمون في جميع مجالات الحياة وفقاً لوجهة نظر الإسلام وتصوراته سواء في المجال المادي الذي سميناه بالمدنية أو في المجال الروحي والفكري الذي سميناه بالحضارة

‘এটা এমন এক জীবন পদ্ধতি, যা মুসলমানগণ প্রতিনিয়ত প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনাদর্শের আলোকে অবলম্বন করছে। চাই তা সামাজিক জীবনের বৈষয়িক ক্ষেত্রেই হোক কিংবা সভ্যতা নামে পরিচিত আত্মিক চিন্তার ক্ষেত্রে হোক’।[২১] এমনকি সমকালীন চ্যালেঞ্জসমূহের মোকাবিলা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য ইসলামী ভাবনার মৌলিক কেন্দ্র সম্পর্কে গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত’।[২২]

মুসলিম সভ্যতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- কুসংস্কার ও গোঁড়ামি থেকে দূরে থাকা। আরব বিশ্বে ইসলামের দা‘ওয়াতী কাজ যখন শুরু হয়, তখন সেখানকার মানুষ অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাদেরকে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চারিত্রিক সৌন্দর্যের শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে সকল অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের শিকল ভেঙ্গে ফেলেছিলেন। ইসলামী শিক্ষা, মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতার মনোভাব জাগ্রত করার পাশাপাশি প্রাথমিক যুগেই সমুজ্জ্বল মুসলিম সভ্যতা গড়ে উঠার ও তা বিকশিত হবার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। সাইয়িদ আবুল হাসান ‘আলী নদবী (মৃ. ১৯৯৯ খ্রি.) বলেন, ‘হিজরী প্রথম শতকে ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি তার পরিপূর্ণ রূহ ও দৃশ্যপটসমূহ সহ আবির্ভাব এবং ইসলামী হুকুমতের নিজস্ব রূপ ও রীতিনীতি সহকারে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল ধর্ম ও নৈতিকতার ইতিহাসে একটি নতুন ঘটনা। এ বিপ্লবের ফলে পৃথিবীর সভ্যতার গতিধারাই পাল্টে যায়। ইসলামের এ বিরাট আজিমুশ শানের বিজয়ে জাহিলিয়াত এক অভূতপূর্ব পরীক্ষা ও বিপদের মুখোমুখি হয়। এতদিন পর্যন্ত তার প্রতিপক্ষের (ইসলামের) অবস্থানগত মর্যাদা একটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আহ্বানের বেশি ছিল না। এখন হঠাৎ করেই হয়ে গেল সৌভাগ্য ও মুক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ বিধান, আধ্যাত্মিক ও বস্তুবাদের পরিপূর্ণ সমন্বয়, জীবন ও শক্তির পূর্ণ অভিব্যক্তি, একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা-সংস্কৃতি, একটি সমাজ, একটি শক্তিশালী হুকুমত ও একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সংবিধান’।[২৩]

তাই বাংলাদেশেও ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ খুবই যরূরী। এদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট হওয়ায় ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুন তথা সভ্যতা-সংস্কৃতির বেশি বেশি চর্চা হওয়া যেমন যরূরী, তেমনি সর্বত্র এর প্রচার-প্রসারের সার্বিক ব্যবস্থা করাও প্রয়োজন। এক্ষেত্রে এদেশের ‘আলিম সমাজের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। তারা হারিয়ে যাওয়া ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছেন এবং তা পুনরায় বাস্তবায়নের সর্বাত্মক সংগ্রাম করেছেন। যেমন,

উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার মুসলিম সমাজ নাচ-গান, মদ্যপান, হাউজি, জুয়া খেলা, অবাধ যৌনাচার ইত্যাদি ব্যাপকহারে প্রসার লাভ করেছিল। জন্ম-মৃত্যু ও বিবাহ-শাদি সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে নানারকম কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। হিন্দু জমিদাররা মুসলিমদেরকে ধুতি পরতে বাধ্য করত।[২৪] হাজী শরীয়াতুল্লাহ (১১৯৬-১২৫৬ হি./১৭৮১-১৮৪০ খ্রি.) উক্ত ইসলাম বিরোধী রীতি-নীতি ও পদ্ধতিগুলো কঠোর হস্তে দমন করেন এবং ধুতির পরিবর্তে লুঙ্গি, পায়জামা-পাঞ্জাবী পরতে বলতেন।[২৫]

তিতুমীরের সমসাময়িক যুগে হিন্দুরা মুসলমানদের নামকরণের ব্যাপারেও হস্তক্ষেপ করে। হিন্দু জমিদারদের পরামর্শে মুসলমানরা আব্দুর রহমান, আবুল কাশেম, রহীমা খাতুন,


আয়েশা, ফাতেমার পরিবর্তে বাংলা নাম রাখতে শুরু করল গোপাল, নেপাল, গোবর্ধন নবাই, কুশাই, পদ্মা, চিনি, চাঁপা, বাদল, পটল, মুক্তা প্রভৃতি’। মুসলিমরা তহবন্দ ছেড়ে ধূতি পরিধান করা শুরু করে, দাড়ি কামিয়ে গোঁফ রাখা শুরু করে।[২৬] তিতুমীর (১১৯৭-১২৪৬ হি./১৭৮২-১৮৩১ খ্রি.) এসব অবলোকন করে মুসলিমদের জাগরণের জন্য সংস্কার কাজ শুরু করেন। তিনি মসজিদ সংস্কার করেন, ধূতি ছেড়ে তহবন্দ পরিধান করার কথা বলেন, গোঁফ ছোট করে দাড়ি লম্বা করার কথা বলেন, ইসলামী নাম রাখতে বলেন। এভাবেই তিনি ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুন তথা সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নয়ন সাধনে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর যুগে মুসলমানদের মাঝে ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুনের চর্চা প্রায় শুন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছিল। এজন্য তিনি ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুনের প্রসার কামনা করতেন। তিনি বিদেশী সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণকে ঘৃণার চোখে দেখতেন।[২৭] এমনকি মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম ‘শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি’ শীর্ষক একটি গ্রন্থ রচনা করে ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুন তথা ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির স্বরূপ উন্মোচন করেছেন এব তা পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে আত্মনিয়োগ করেন।[২৮]

(ইনশাআল্লাহ চলবে)

 

তথ্যসূত্র :
[১]. জামি‘উল বায়ান ফী তা’বীলিল কুরআন, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৮২-৮৩, হাদীছ নং-৭৫৮৯; আস-সীরাহ আন-নাবুবিয়াহ লি ইবনি হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৯৪-৯৫।    
[২]. ইমাম নববী, আল-মিনহাজু শারহু সহীহ মুসলিম, ১২ তম খণ্ড (বৈরূত : দারু ইউইয়াউত তুরাছিল ‘আরাবী, ২য় সংস্করণ, ১৩৯২ হি.), পৃ. ১১।
[৩]. তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৯।
[৪]. তাইসীরুল কারীমির রহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান, পৃ. ১৪১।
[৫]. ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল, আল-মুসনাদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৩০, হাদীছ নং-১৭২০৯; ইমাম তিরমিযী, আস-সুনান, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৩৬৩, হাদীছ নং-২৮৬৩; ইমাম ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, ১৪তম খণ্ড, পৃ. ১২৪, হাদীছ নং-৬২৩৩; সনদ ছহীহ, মিশকাতুল মাসাবীহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৪১, হাদীছ নং-৩৬৯৪, ‘ইমারত’ অধ্যায়।
[৬] ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল, আল-মুসনাদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৮, হাদীছ নং-১১৪; ইমাম ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, ১৫তম খণ্ড, পৃ. ১২২, হাদীছ নং-৬৭২৮; মিশকাতুল মাসাবীহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩০৮, হাদীছ নং-৬০১২। 
[৭] মাজমূ‘উল ফাতাওয়া, ২২তম খণ্ড, পৃ. ৩৫৮-৩৫৯।
[৮] ঘধৎধহফৎধ কৎরংযহধ ঝরহযধ (বফরঃবফ), ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ইবহমধষ (১৭৫৭-১৯০৫) (ঈধষপঁঃঃধ : ঈধষপঁঃঃধ টহরাবৎংরঃু, ১৯৬৭), ঢ়. ১৮৮-২০০.
[৯] হাজী শরীয়ত উল্লাহ’র ফারায়েজী আন্দোলন, পৃ. ৮৩-১১৩।
[১০] সম্পাদনা পরিষদ, ইসলামী বিশ্বকোষ , ১ম খণ্ড (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় সংস্করণ, জুন ২০০৪), পৃ. ১৪০ ।
[১১] সম্পাদনা পরিষদ, ইসলামী বিশ্বকোষ, ২য় খণ্ড (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় সংস্করণ, জুন ২০০৫ খ্রি.), পৃ. ৬৩; রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা, পৃ. ১৪৩-১৪৪।
[১২] অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাস‘ঊদ, “আল্লামা মোহাম্মাদ ‘আবদুল্লাহেল কাফী আল-কুরায়শী (রহ.) : সংগঠক ও সংস্কারক”, বিশিষ্ট গবেষকদের কলমে আল্লামা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহেল কাফী আল-কুরাইশী (রহ.), পৃ. ১০৫-১০৬।
[১৩] মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, আহলেহাদীছ আন্দোলন : উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষিতসহ (রাজশাহী : হাদীছ ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ১ম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারী ১৯৯৬ খ্রি.), পৃ. ৩৮৬।
[১৪] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯০।
[১৫]  ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশে রাসূলুল্লাহ্ সা. এর অবদান (প্রবন্ধ) (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪২০ হি.), পৃ. ৫৫।
[১৬] জড়নবৎঃ ইৎরভভধঁষঃ, ঞযব গধশরহ ড়ভ ঐঁসধহরঃু (খড়হফড়হ : এবড়ৎমব অষষবহ ্ টহরিহ খঃফ. ১ংঃ চঁনষরংযবফ, ১৯১৯), ঢ়. ১৯০.
[১৭] ড. ‘আযমী ত্বহা আস-সাইয়েদ, আস-সাক্বাফাতুল ইসলামিয়্যাহ মাফহূমুহা মাসাদিরুহা খাসাইসুহা মাজালাতুহা (জর্ডান : দারুল মানাহিজ, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪২৩ হি./২০০২ খ্রি.), পৃ. ৭০।
[১৮] ড. মুহাম্মাদ খলীল হিরাস, দা‘ওয়াতুত তাওহীদ (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়াহ, ১ম সংস্করণ, ১৯৮৬ খ্রি.), পৃ. ৭৪।
[১৯] ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, পৃ. ৫৬৬, হাদীছ নং-৩৪৫৬ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়-৬০, অনুচ্ছেদ-৪৯; মিশকাতুল মাসাবীহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৬৩, হাদীছ নং-৫৩৬১।
[২০] ইমাম আবূ দাঊদ, আস-সুনান, পৃ. ৭৬১, হাদীছ নং-৪০৩১।
[২১] ড. সালিহ যিয়াব হিন্দী, দিরাসাতু ফিস সাক্বাফাতিল ইসলামিয়্যাহ (জর্ডান : জাম‘ঈয়াতু ‘উম্মালিল মাতাবি‘ইত তা‘আবুনিয়াহ, ৫ম সংস্করণ, ১৪০৪ হি./১৯৮৪ খ্রি.), পৃ. ১৫।
[২২] ড. আহমাদ আল-ইয়াদী, আল-মুরতাকিযাতুল আসাসিয়াহ ফিস সাক্বাফাতিল ইসলামিয়্যাহ (কুয়েত : দারুল কুতুবিল জামি‘, ২য় সংস্করণ, ১৪২৪ হি./২০০৪ খ্রি.), পৃ. ২০।
[২৩] মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?, পৃ. ১৪৬।
[২৪] আবুল মুনসুর আহমাদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর (ঢাকা : আহমদ পাবলিশিং হাউস, ১৯৮৮ খ্রি.), পৃ. ২৪; মুনতাসির মামুন, উনিশ শতকে বাংলাদেশ সংবাদপত্র ও সাময়িকী (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, তা.বি.), পৃ. ৩৭৪-৩৭৭।
[২৫] অ ঝশবঃপয ড়ভ ঃযব ঞড়ঢ়ড়মৎধঢ়যু ধহফ ঝঃধঃরংঃরপং ড়ভ উযধশধ (ঈধষপঁঃঃধ, ১৮৪০), চ. ২৪৯.
[২৬] বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, পৃ. ২১৬-২১৭।
[২৭] মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস,, পৃৃ. ১৩২-১৩৩।
[২৮] মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি (ঢাকা : খায়রুন প্রকাশনী, ৪র্থ প্রকাশ, ফেব্রুয়ারী ২০০৬ খ্রি.), পৃ. ১৮৩-৩১২।




প্রসঙ্গসমূহ »: সমাজ-সংস্কার
সূদ-ঘুষ ও অবৈধ ব্যবসা (৮ম কিস্তি) - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
গাযওয়াতুল হিন্দ : একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ - হাসিবুর রহমান বুখারী
ইখলাছই পরকালের জীবনতরী (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামী জামা‘আতের মূল স্তম্ভ (৩য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধান (৪র্থ কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
মু‘তাযিলা মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৩য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
যাদুটোনার শারঈ সমাধান (২য় কিস্তি) - মাসঊদুর রহমান
সূদের ইহকালীন ও পরকালীন ক্ষতিসমূহ - মাসঊদুর রহমান
রামাযানের খুঁটিনাটি - আল-ইখলাছ ডেস্ক
মু‘তাযিলা মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
সন্ত্রাসবাদ : ইসলামের দিকে শ্যেনদৃষ্টি - অধ্যাপক মো. আকবার হোসেন
দ্বীনি শিক্ষার গুরুত্ব - আব্দুল গাফফার মাদানী

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ