মু‘তাযিলা মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ
- আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম*
(৩য় কিস্তি)
মু‘তাযিলাদের উপদলসমূহ
মু‘তাযিলারা অনেক দলে বিভক্ত। তাদের উপদলসমূহের সংখ্যা অনেক। সালাফে ছালেহীন তাদের দলের সংখ্যা বর্ণনা করতে গিয়ে কেউ ২০টি[১], কেউ ১২টি, কেউ ১৫টি, কেউ ১৭টি[২] দলের কথা উল্লেখ করেছেন। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপদলের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হল-
১. আল-ওয়াছিলিয়্যাহ (اَلْوَاصِلِيَّةُ) : আল-ওয়াছিলিয়্যাহ হলো মু‘তাযিলা মতবাদের প্রথম এবং প্রাচীনতম উপশাখা। এটি ২য় হিজরী শতকে বসরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ওয়াছিল ইবনু ‘আত্বা। তিনি ৮০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ১৩১ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। আল-ওয়াছিলিয়্যাহ ছিল মু’তাযিলাদের মূল ভিত্তি। এ মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াছিল ইবনু ‘আত্বা বিশ্বাস করতেন যে, কেউ যদি পাপ করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে এবং তাওবা না করে, তবে আল্লাহর জন্য তাকে ক্ষমা করা জায়েয নয়। এই মত পুরো মুসলিম উম্মাহর মতের বিরোধিতা করে এবং এই মত দিয়েই সে ইসলামের মূলধারা থেকে আলাদা হয়ে যায়। তাদের তত্ত্ব থেকে পরবর্তী বহু উপ-ফের্ক্বা জন্ম নেয়। অধিকাংশ আহলুস সুন্নাহর ‘আলেমগণ তাদেরকে বিদ‘আতী গোষ্ঠী হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
মূলত ওয়াছিল ইবনু আত্বা মুসলিম আক্বীদার মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে এক নতুন ফের্ক্বা তৈরি করেন। তার ফের্ক্বা ফাসিক্ব মুসলিমদের ঈমান অস্বীকার করে। ছাহাবাদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল চরম ও অবমাননাকর এবং ঘৃণাভরা। তার প্রতিষ্ঠিত মতবাদ ‘মু‘তাযিলা’ নামে পরিচিত হয়। এই মতবাদ চারটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে গঠিত। যথা: ১. আল্লাহর গুণাবলী অস্বীকার করা। ২. বান্দা নিজেই তার কর্মের স্রষ্টা। ৩. পাপি ব্যক্তি না কাফির না মুমিন এবং ৪. ছাহাবায়ে কেরাম (বিশেষ করে জামাল ও সিফফীনের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছাহাবীগণের একটি অংশ) ফাসিক্ব, মিথ্যাবাদী এবং তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।[৩]
২. আল-‘আমরিয়্যাহ (اَلْعَمْرِيَّةُ) : আল-‘আমরিয়্যাহ হলো মু‘তাযিলাদের একটি উপদল, যেটি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আমর ইবন ‘উবায়দ (عمرو بن عبيد)। তিনি ছিলেন মু‘তাযিলার প্রথম দিকের নেতা, বনু তামিম গোত্রের এক মুক্তদাস এবং ওয়াছিল ইবনু আত্বার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। তিনি ওয়াছিল ইবনু আত্বার সাথে একমত ছিলেন, তবে তিনি আরও একধাপ বাড়িয়ে বলেছিলেন, উষ্ট্রের যুদ্ধের (সাহাবীদের) উভয় পক্ষই ফাসিক্ব বা পাপী এবং তারা জাহান্নামের চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। তারা উষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের কাউকেউ সাক্ষ্যগ্রহণে গ্রহণযোগ্য মনে করে না।[৪]
৩. আল-হুযায়লিয়্যাহ (اَلْهُذَيْلِيَّةُ) : আল-হুযায়লিয়্যাহ হলো মু‘তাযিলা ফের্ক্বার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা বা উপদল, যা তাদের একজন প্রখ্যাত ইমাম ও চিন্তাবিদ আবুল হুযায়েল আল-আল্লাফ (أبو الهذيل العلاف)-এর অনুসারীদের নিয়ে গঠিত। আবুল হুযায়েল ছিলেন আব্দুল কাইস গোত্রের একজন মুক্তদাস (মাওলা)। তিনি ছিলেন সাবায়িদের মতো পথ অনুসরণকারী, যাদের মধ্য থেকেই অধিকাংশ বিদ‘আত প্রকাশ পায় এবং তাদের কুকর্ম ও বিভ্রান্তির ঘটনা একের পর এক ঘটে। ফলে মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন দল, এমনকি তার নিজ গোষ্ঠী ‘মু‘তাযিলা’ থেকেও তাকে কাফের বলে ফাতাওয়া দিয়েছিল। আবু হুযায়েলের অন্যতম বিপর্যয়কর মতবাদ ছিল, তিনি বলতেন, ‘আল্লাহর কুদরতের আওতাভুক্ত সব কিছু একসময় ফুরিয়ে যাবে। এরপর আল্লাহ আর কিছু করার ক্ষমতা রাখবেন না। অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নামের নে‘মত একসময় ফুরিয়ে যাবে। তারপর জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীরা এক অবস্থায় থাকবে, নিষ্ক্রিয় ও অচল, এমনকি তারা কিছুই করতে পারবে না। আর আল্লাহও তখন না কোনো মৃতকে জীবিত করতে পারবেন, না কোনো জীবিতকে মারতে পারবেন, না কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারবেন, না কোনো কিছু বিলীন করতে পারবেন। এই অবস্থায় জীবিতদের বোধ-বুদ্ধি থাকবে, কিন্তু সক্রিয়তা থাকবে না। তিনি যা বলেছেন, তা জাহাম ইবনু সাফওয়ান-এর ‘জান্নাত-জাহান্নাম ফুরিয়ে যাবে’ বক্তব্য থেকেও বিপজ্জনক কারণ। জাহাম বলেছিলেন, জান্নাত-জাহান্নাম ফুরিয়ে গেলেও আল্লাহ পরে তা আবার সৃষ্টি করতে সক্ষম। কিন্তু আবু হুযায়েল বলেন, একবার সব ফুরিয়ে গেলে আল্লাহর কোনো কিছু করার ক্ষমতা থাকবে না।
আবু হুযায়েল আরও বলেছিলেন, আখিরাতের মানুষরা বাধ্য। তাদের পক্ষ থেকে যা কিছু ঘটবে, তা তারা নিজেদের ইচ্ছায় করবে না। এমনকি জান্নাতবাসীরাও তাদের সকল কাজ ও আমল করতে বাধ্য থাকবে। অর্থাৎ তারা পছন্দ বা ইচ্ছা থেকে কিছু করতে পারবে না, সবকিছু নির্ধারিতভাবে ও জবরদস্তি ঘটবে।[৫] এছাড়াও আবূ হুযায়েলের আরও দশটি কুফরী ও বিদ‘আতি বিশ্বাস হল নিম্নরূপ:
- ১. আল্লাহ জ্ঞান রাখেন, কিন্তু সেই জ্ঞান হলো তাঁরই সত্তা। আল্লাহ ক্ষমতাবান, জীবিত, কিন্তু ক্ষমতা, জীবন সব তাঁর সত্তার অংশ, আলাদা কোনো গুণ (صفة) নয়।
- ২. আল্লাহর কিছু ইচ্ছা (ইরাদা) রয়েছে যা কোনো অবস্থান বা জায়গার মধ্যে অবস্থিত নয়।
- ৩. আল্লাহর كن (হও) বাক্যটি কোনো স্থানে নেই (لا في محل)। কিন্তু আদেশ, নিষেধ, সংবাদ ইত্যাদি একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঘটে। তাঁর মতে, তাকবিনের আদেশ (সৃষ্টির নির্দেশ) এবং তাশরিয়ের আদেশ (শারী‘আতের বিধান) এক নয়।
- ৪. তিনি প্রথমে ছিলেন ক্বাদারিয়্যাহ (স্বাধীন ইচ্ছার পক্ষপাতী)। পরে বলেন, আখিরাতে জান্নাতি-জাহান্নামিরা বাধ্য (মুজবুর) হয়ে কাজ করবে। কারণ, যদি তারা স্বাধীনভাবে কাজ করত, তাহলে তাদের উপরও তাকলিফ (দ্বীনী দায়িত্ব) হতো, অথচ আখিরাত হলো প্রতিদানের স্থান।
- ৫. জান্নাতি ও জাহান্নামিরা এক সময় স্থায়ীভাবে নিস্তেজ হয়ে যাবে (خمود)। জান্নাতিরা সেই নিস্তব্ধতায় সব আনন্দ একত্রে পাবে, জাহান্নামিরা সব শাস্তি একত্রে পাবে।
- ৬. হৃদয়ের কাজ (ইখলাছ, নিয়্যত ইত্যাদি) ক্ষমতা ছাড়া হয় না। শরীরের কাজ ক্ষমতা আগে আসতে পারে, কাজ পরে ঘটতে পারে। ‘فعل’ ও ‘يفعل’-এর মধ্যে পার্থক্য করেন। রঙ, স্বাদ, গন্ধ ইত্যাদি মানবীয় কাজ নয়, বরং আল্লাহর সৃষ্ট।
- ৭. মানুষের উপর আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ ছাড়া জানাও ফরজ। যদি না জানে, তাহলে চিরকাল শাস্তির যোগ্য। সততা, ন্যায় ইত্যাদি যুক্তি দিয়েই ভালো প্রমাণিত; মিথ্যা, অন্যায় খারাপ প্রমাণিত। ইবাদত করতে পারে এমনকি আল্লাহকে না চিনেই, যেমন প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ (নযর)। বিপদে মিথ্যা বলা জায়েজ, যদি বিকল্প (তাওরিয়া) না থাকে।
- ৮. যে সময় মারা যাওয়ার, সে সময়ই মারা যাবে; বাড়তি বা কমানো সম্ভব নয়। রিজিক দুই রকম ১. আল্লাহর সৃষ্টি যা মানুষ ভোগ করে, এটা প্রকৃত রিজিক। ২. হালাল হওয়া, যা খাওয়া বৈধ, সেটাই রিজিক। হারাম জিনিসকে রিজিক বলা যায় না।
- ৯. আল্লাহর ইচ্ছা আলাদা কিছু নয়, বরং সৃষ্টির সাথেই যুক্ত। যেমন, আল্লাহর ইচ্ছা হচ্ছে, তিনি যখন কিছু সৃষ্টি করেন, তখনই তা তাঁর ইচ্ছা। সৃষ্টিকর্ম তাঁর কাছে মৌখিক আদেশ মাত্র, যা কোনো স্থানে অবস্থিত নয়। তিনি বলেন, আল্লাহ সর্বদা ‘হবেন এমন’ গুণে গুণান্বিত, যেমন : ‘তিনি পরবর্তীতে দয়ালু হবেন, সৃষ্টিকর্তা হবেন...’ ইত্যাদি।
- ১০. অদৃশ্য বিষয়ে প্রমাণ তখনই দাঁড়াবে, যখন বিশজন ব্যক্তি সংবাদ দেবে, যাদের মধ্যে অন্তত একজন জান্নাতি বা অভ্রান্ত হবেন। পৃথিবী কখনো অভ্রান্ত (معصوم) আল্লাহর বন্ধুদের দল থেকে শূন্য থাকে না। এরা তাওয়াতুরের চেয়ে শ্রেয়তর প্রমাণ। কারণ, বিপুল সংখ্যক মানুষ মিথ্যা বলতে পারে যদি তারা অভ্রান্ত না হয়।[৬]
পরিশেষে বলা যায় যে, এগুলো বিশ্বাস আহলে সুন্নাহ ওয়ালা জামা‘আতের আক্বীদা ও তাওহীদের মৌলভিত্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ফলে আবু হুযায়েলকে বহু মুসলিম চিন্তাবিদ কাফের, মুবতাদ, বিদ‘আতি এবং গোমরাহ আখ্যা দিয়েছেন।
৪. আন-নাযামিয়্যাহ (اَلنَّظَامِيَّةُ) : আন-নাযামিয়্যাহ হলো মু‘তাযিলা ফের্ক্বার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা বা উপদল, যা তাদের বিখ্যাত স্কলার ইবরাহীম ইবনু ইয়াসার ইবনু হানী আন-নাযযাম (إبراهيم بن يسار بن هانئ النظَّام)-এর চিন্তাধারা অনুসরণ করে গঠিত হয়। আন-নায্যাম তাঁর সাথীদের থেকে ভিন্ন কিছু মতবাদের কারণে পরিচিত। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো :
- ১. তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা শয়তানি কাজ ও গুনাহের ওপর কোনোভাবেই ক্ষমতাবান নন। এগুলো আল্লাহর কুদরতের অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি তাঁর অন্যান্য মু‘তাযিলা সাথীদের মতের বিরোধী, কারণ তারা বলেন, আল্লাহ এগুলো করতে সক্ষম, কিন্তু করেন না কারণ এগুলো অসুন্দর। তিনি আরও বলেন, আল্লাহ জাহান্নামিদের শাস্তি বাড়াতে বা জান্নাতিদের নে‘মত কমাতে পারেন না।
- ২. তিনি বলেন, ইজমা‘ (সর্বসম্মত মত) শারী‘আতের দলীল নয়। প্রকৃত দলীল হলো ইমাম মাসুমের (অপরাধমুক্ত ইমাম) কথা।
- ৩. তিনি রাফেযি শী‘আ আক্বীদার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি বলেন, ইমাম শুধুমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত হতে পারে, নিজে বা লোকের মতের ভিত্তিতে নয়। ‘আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-ই প্রকৃত ইমাম ছিলেন। ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এই নিযুক্তি গোপন করেছিলেন এবং সাক্বীফায় আবূ বকরের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হাতে বাই‘আতের আয়োজন করেন। এরপর তিনি ‘উসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু), ‘আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু), ও ইবনু মাস‘ঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) সম্পর্কেও অবমাননাকর মন্তব্য করেন।[৭]
৫. আল-আসওয়ারিয়্যাহ (اَلْأَسْوَارِيَّةُ) : আল-আসওয়ারিয়্যাহ হলো মু‘তাযিলা ফের্ক্বার একটি উপশাখা, যার নামকরণ হয়েছে এর প্রতিষ্ঠাতা আসওয়ার (أسوار)-এর নাম অনুসরণ করে। তিনি ছিলেন আল-নায্যামের অনুসারী এবং উপরে যে সমস্ত বিভ্রান্তি ও গোমরাহির কথা বলা হয়েছে, সে সেগুলোর সবকটিতেই তার সাথে একমত ছিল। তবে সে আরো একধাপ এগিয়ে বলেছিল, আল্লাহ তা‘আলা যা কিছু সম্পর্কে জানেন যে তা কখনো ঘটবে না, তা আল্লাহর পক্ষে করানো সম্ভব নয়। এই বক্তব্যের ফলে এমনটি প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর কুদরত (ক্ষমতা) সীমাবদ্ধ। আর যার কুদরত সীমাবদ্ধ, তার সত্তাও সীমাবদ্ধ হয় এবং এই ধরনের বক্তব্য কুফর হিসেবে গণ্য হবে, যে এই মতবাদ গ্রহণ করে, সে কাফের।[৮]
৬. আল-ইসকাফিয়্যাহ (اَلْإِسْكَافِيَّةُ) : তারা হচ্ছে মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ আল-ইস্কাফির অনুসারী। তিনি ‘জাফর ইবনু হারব’-এর কাছ থেকে ক্বাদর (অর্থাৎ তাকদির সংক্রান্ত মতবাদ) গ্রহণ করেছিলেন। এরপর তিনি আরও কিছু নতুন বিদ‘আত (বিভ্রান্ত মতবাদ) চালু করেন। এর মধ্যে একটি হলো, তিনি দাবি করেন যে, আল্লাহ তা’আলাকে বর্ণনা করা যায় যে, তিনি শিশু ও পাগলদের উপর জুলুম করতে সক্ষম, কিন্তু বুদ্ধিমানদের উপর জুলুম করতে সক্ষম নন। এই কথার জন্য তার পূর্বসূরিরা তাকে কাফের আখ্যা দেন, আর তিনিও তাদেরকে কাফের বলেন, কারণ তারা এই বিষয়ে তার সঙ্গে একমত ছিল না।[৯]
৭. আল-জা‘ফারিয়্যাহ (اَلْجَعْفَرِيَّةُ) : তাদের মধ্যে আছে ‘জা‘ফারিয়্যাহ’ নামক একটি দল, যারা জা‘ফর ইবনু মুবাশ্শির ও জা‘ফর ইবনু হারব-এর অনুসারী। এ দুজনই অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির মূল ভিত্তি ছিল। জা‘ফর ইবনু মুবাশ্শির বলতেন, ‘এই উম্মতের পাপীরা (ফাসিকরা) ইয়াহুদি, খ্রিস্টান, অগ্নিপূজক (মাজূস) ও নাস্তিকদের চেয়েও নিকৃষ্ট,’ যদিও তিনি স্বীকার করতেন যে তারা তাওহীদে বিশ্বাসী এবং দুই অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ তারা না মুমিন, না কাফির।
কিন্তু কীভাবে এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে যে কেউ বলবে, একজন তাওহীদে বিশ্বাসী ব্যক্তি একজন মুশরিকের চেয়েও খারাপ’? যে ব্যক্তি এমন কথা বলে, তাকে তো বলা উচিত যে, সে নিজেই সব কাফেরদের চেয়েও অধম।
তিনি (জা‘ফর ইবন মুবাশ্শির) ফিক্বহের একটি বিষয়ে বলতেন, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারীকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দেয় এবং তাদের মধ্যে ‘আক্বদ (বিয়ে) হওয়ার জন্য সাক্ষাৎ হয়, আর সে পুরুষ হঠাৎ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নারী তাকে বাধা না দিয়ে রাজি হয় এবং সে তার সঙ্গে সহবাস করে, তাহলে নারীর উপর কোনো হদ্দ নেই, কিন্তু পুরুষের উপর হদ্দ বর্তাবে। এই নারীর ব্যাপারে তার বক্তব্য মুসলমানদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের (ইজমা‘) বিরুদ্ধে।[১০]
৮. আল-বিশরিয়্যাহ (اَلْبِشْرِيَّةُ) :
আল-বিশরিয়্যাহ হলো মু‘তাযিলা ফের্ক্বার একটি উপশাখা, যার নামকরণ হয়েছে এর প্রতিষ্ঠাতা ‘বাশর ইবনু আল-মু‘তামির’-এর নাম অনুসারে। তার বিভ্রান্তিকর বিশ্বাসগুলোর মধ্যে একটি হলো, সে ‘তাওালুদ’ (তৈরি হওয়া বা উৎপত্তি হওয়া)-এর ক্ষেত্রে বলেছে, যে মানুষই রং, স্বাদ, গন্ধ, শ্রবণ, দৃষ্টি এবং সবধরনের অনুভূতির সৃষ্টিকর্তা; এবং এভাবেই সে তাপ, শীতলতা, আর্দ্রতা ও শুষ্কতাও সৃষ্টি করে। এই মতবাদে সে মুসলমানদের সর্বসম্মত মতের বিরোধিতা করেছে।
কারণ, আহলুস সুন্নাহরা তাওালুদ (উৎপত্তি)-এর কোনো ধারণা মানে না, আর মু‘তাযিলাদের মধ্যে যারা তাওালুদ মানে, তারাও এতে বাড়াবাড়ি করে না। তারা শুধু নড়াচড়া ও নির্ভরতার ক্ষেত্রেই তাওালুদ মানে। কাজেই বাশরের এই মতবাদ মু‘তাযিলাদের বিদ‘আতের উপর আরেকটি অতিরিক্ত বিদ‘আত হিসেবে ধরা হয়।
তার আরও একটি বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস হলো, সে বলেছে, ‘যে কোনো বস্তুর স্থানান্তর ঘটে প্রথম স্থান থেকে দ্বিতীয় স্থানে সরাসরি, এদের মাঝে কোনো মধ্যবর্তী স্থান নেই’। অথচ যদি প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানের মাঝে কোনো মধ্যবর্তী স্থান না থাকে, তবে তার এই কথা যুক্তিসংগত হয় না এবং এর কোনো বাস্তবতা নেই।
তার আরেকটি ভুল মত হলো, সে বলে, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দার গুনাহ মাফ করেন, তারপর সে বান্দা আবার গুনাহ করে, তাহলে তাকে শুধু নতুন গুনাহর জন্যই নয়, পূর্বে যেসব গুনাহ মাফ করা হয়েছিলো, সেগুলোর জন্যও শাস্তি দেওয়া হবে’। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘একজন কাফির যদি কুফর থেকে তাওবা করে, তারপর মদ্যপান করে এবং মৃত্যুর আগে মদ্যপান থেকে তাওবা না করে, তাহলে কি সে মদ্যপানের জন্য এবং আগের কুফরের জন্যও শাস্তি পাবে?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ, সে মদ্যপানের জন্যও এবং পূর্বের কুফরের জন্যও শাস্তি পাবে’।
তাকে আবার বলা হলো, ‘তাহলে কি আপনি বলেন যে, কোনো মুসলমান যদি মদ্যপান করে, তাহলে পরিণামে সে কাফেরদের মতোই শাস্তি পাবে?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ, এমনটাই বলা হয়’।
এই কথাও মুসলমানদের সর্বসম্মত বিশ্বাসের পরিপন্থী। কারণ, যদিও মু‘তাযিলা বলে থাকে যে, পাপী ব্যক্তি এমন একটি অবস্থায় থাকে যা মুমিন ও কাফেরের মধ্যবর্তী এবং সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, তবুও তারা কখনো বলেনি যে, যে গুনাহ থেকে তাওবা করা হয়েছে, তার জন্যও তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।[১১]
৯. আল-মুরদারিয়্যাহ (الْمُرْدَارِيَّةُ) : আল-মুরদারিয়্যাহ হলো মু‘তাযিলা ফের্ক্বার একটি উপশাখা, যার নামকরণ হয়েছে এর প্রতিষ্ঠাতা ‘ঈসা ইবনু সাবীহ আল-মারদার’-এর নাম অনুসারে। তিনি ছিলেন বিশর ইবনু আল-মু‘তামিরের ছাত্র। তিনি এতটাই সাধনায় মগ্ন ছিলেন যে, তাকে ‘মু‘তাযিলা সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী’ বলা হতো। তিনি কিছু বিদ‘আত প্রবর্তন করেন, তার মধ্যে একটি হলো, কুরআন সম্পর্কে তার এই মত, যে মানুষও কুরআনের মতোই ফাসাহা, নযম (ছন্দ) ও বালাগাতে (বক্তব্যর সৌন্দর্যে) অনুরূপ কিছু রচনা করতে সক্ষম। তিনি কুরআনের সৃষ্ট হওয়ার বিষয়ে অতিরঞ্জিতভাবে বলতেন এবং যিনি কুরআনকে ‘অজন্ম/অসৃষ্ট’ বলেন তাকে কুফরি রায় দিতেন। তিনি এমনকী শাসকদের ঘনিষ্ঠদেরও কাফের বলতেন। তিনি এতটাই বাড়াবাড়ি করতেন যে, একবার ইবরাহীম ইবনু সিনদী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সমগ্র পৃথিবীর মানুষদের ব্যাপারে তুমি কী বলো?’ তিনি সবাইকে কাফের ঘোষণা করেন। তখন ইবরাহীম বললেন, ‘যার জান্নাতের ব্যাপ্তি আসমান ও জমিন পর্যন্ত, সেখানে কি কেবল তুমি এবং তোমার সঙ্গে তিনজন লোকই যাবে?’ এই প্রশ্নে মারদার লজ্জিত হয়ে পড়েন এবং কোনো উত্তর দিতে পারেননি।[১২]
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
*পি-এইচ. ডি গবেষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
তথ্যসূত্র :
[১]. الْوَاصِلِيَّةُ،وَالْعَمْرِيَّةُ، وَالْهُذَيْلِيَّةُ، وَالنَّظَامِيَّةُ، وَالْأَسْوَارِيَّةُ، وَالْإِسْكَافِيَّةُ، وَالْجَعْفَرِيَّةُ، وَالْبِشْرِيَّةُ، وَالْمُزْدَارِيَّةُ، وَالْهِشَامِيَّةُ، وَالصَّالِحِيَّةُ، وَالْخَطَّابِيَّةُ، وَالْحَدَبِيَّةُ، وَالْمَعْمَرِيَّةُ، وَالثُّمَامِيَّةُ، وَالْخَيَّاطِيَّةُ، وَالْجَاحِظِيَّةُ، وَالْكَعْبِيَّةُ، وَالْجُبَّائِيَّةُ، وَالْبَهْشَمِيَّةُ.-দ্র. ইবরাহীম ইবনু মূসা আশ-শাত্বেবী, আল-ই‘তিছাম, তাহক্বীক্ব : সালীম ইবনু ‘ঈদুল হিলালী, ২য় খণ্ড (সঊদীআরব : দারু ইবনি ‘আফফান, ১৪১২ হি.), পৃ. ৭১৮; আব্দুল ক্বাহির ইবনু ত্বাহির ইবনু মুহাম্মাদ আল-বাগদাদী, আল-ফারকু বায়নাল ফিরাক্ব ও বায়ানিল ফিরকাতিল নাজিয়া (বৈরূত : দারুল আফাকিল জাদীদাহ, ২য় সংস্করণ, ১৯৭৭ খৃ.), পৃ. ৯৩।
[২]. في فرق المعتزلة إعلم أنهم سبع عشرة ! فرقة ; মুহাম্মাদ ইবনু আমর ইবনুল হুসাইন আর-রাযী আবূ আব্দুল্লাহ, ই‘তিক্বাদাতু ফিরাকিল মুসলিমীন ওয়াল মুশরিকীন; তাহক্বীক : আলী সামী (বৈরূত : দারুল কুতুবিল আলামিয়্যা, ১৪০২ হি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ৪০।
[৩]. ত্বাহির ইবনু মুহাম্মাদ আল-আসফারায়ীনী, আত-তাবছীরু ফিদ দ্বীন ওয়া তাময়ীযুল ফের্ক্বাতিন নাজিয়াতি আনিল ফেরাকিল হালিকীন (লেবানন : ‘আলিমুল কুতুব, ১৪০৩ হি.), পৃ. ৬৭; আবুল ফাতহ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল কারীম আশ-শাহরাসতানী, আল-মিলাল ওয়ান নাহাল, ১ম খণ্ড (মুওয়াসসাসাতুল হালাবী, তা.বি.), পৃ. ৪৬-৪৯; আবূ আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ‘আমর ফখর উদ্দীন আর-রাযী, ই‘তিক্বাদাতু ফেরাক্বিল মুসলিমীন ওয়াল মুশরিকীন (বৈরূত : দারুল কুতুব আল-‘ইলমিয়্যাহ, তা.বি), পৃ. ৪০; আল-ই‘তিছাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৪৪।
[৪]. আত-তাবছীরু ফিদ দ্বীন ওয়া তাময়ীযুল ফের্ক্বাতিন নাজিয়াতি আনিল ফেরাকিল হালিকীন, পৃ. ৬৯।
[৫]. আল-ফারকু বায়নাল ফিরাক্ব ও বায়ানিল ফিরকাতিল নাজিয়া, পৃ. ১০২, ১০৪।
[৬]. আল-মিলাল ওয়ান নাহাল, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৯-৫৩; আল-ই‘তিছাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৪৪।
[৭]. أولاً: أنه قال: إن الله تعالى لا يوصف بالقدرة على الشرور والمعاصي، وليست هي مقدورة للباري، ثانياً: : قال إن الإجماع والقياس ليسا بحجة في الشرع، وإنما الحجة في قول الإمام المعصوم. -দ্র. আল-ই‘তিছাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৫৪।
[৮]. قَالَ إِن مَا علم الله تَعَالَى أَن لَا يكون لم يكن مَقْدُورًا لله تَعَالَى -দ্র. আত-তাবছীরু ফিদ দ্বীন ওয়া তাময়ীযুল ফের্ক্বাতিন নাজিয়াতি আনিল ফেরাকিল হালিকীন, পৃ. ৭৩; আল-ই‘তিছাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৪৬।
[৯]. زعم أن الله تعال يوصف بالقدرة على ظلم الأطفال والمجانين، ولا يوصف بالقدرة على ظلم العقلاء -দ্র. আত-তাবছীরু ফিদ দ্বীন ওয়া তাময়ীযুল ফের্ক্বাতিন নাজিয়াতি আনিল ফেরাকিল হালিকীন, পৃ. ৭৯; আল-ই‘তিছাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৪৬।
[১০]. فساق هَذِه الْأمة شَرّ من الْيَهُود وَالنَّصَارَى وَالْمَجُوس والزنادقة مَعَ قَوْله بِأَنَّهُم موحدون فِي منزلَة بَين المنزلتين لَا مُؤمن وَلَا كَافِر وَكَيف يعقل قَول الْقَائِل أَن الموحد شَرّ من الْمُشرك وَمن كَانَ هَذَا قَوْله كَانَ حَقِيقا بَان يُقَال بِأَنَّهُ شَرّ من جَمِيع الْكَفَرَة وَكَانَ يَقُول فِي الْفُرُوع ان رجلا لَو كَانَ يخْطب امْرَأَة واجتمعا للْعقد بَينهمَا فَوَثَبَ عَلَيْهَا واطاعته فألم بهَا ان الْمَرْأَة لَا حد عَلَيْهَا وَالرجل يجب عَلَيْهِ الْحَد -দ্র. আত-তাবছীরু ফিদ দ্বীন ওয়া তাময়ীযুল ফের্ক্বাতিন নাজিয়াতি আনিল ফেরাকিল হালিকীন, পৃ. ৭৭।
[১১]. قَوْله فِي بَاب التولد ان الْإِنْسَان يخلق اللَّوْن والطعم والرائحة والسمع وَالْبَصَر وَجَمِيع الإدراكات على سَبِيل التولد وَكَذَلِكَ يخلق الْحَرَارَة والبرودة والرطوبة واليبوسة
وَمن ضَلَالَة قَوْله أَن حَرَكَة الْجِسْم فِي الْمَكَان الأول فِي مَكَان ثَان وَلَا وَاسِطَة بَينهمَا وَإِذا لم يكن بَين المكانين وَاسِطَة لم يكن هَذَا الْكَلَام الَّذِي يَقُول معقولا وَلم يكن لَهُ حَقِيقَة بِحَال وَمن ضلالته قَوْله إِن الله إِذا غفر ذنُوب عبد من عباده ثمَّ رَجَعَ العَبْد إِلَى ذَنْب عذبه على هَذَا الذَّنب الثَّانِي وعَلى مَا تقدم من ذنُوبه الَّتِي غفرها لَهُ -দ্র. আত-তাবছীরু ফিদ দ্বীন ওয়া তাময়ীযুল ফের্ক্বাতিন নাজিয়াতি আনিল ফেরাকিল হালিকীন, পৃ. ৭৪-৭৫।
[১২]. قوله في القرآن أن الناس قادرون على أن يأتوا بمثل القرآن فصاحة، ونظماً، وبلاغة، وهو الذي بالغ في القول بخلق القرآن، وكفَّر من قال بقدمه، وكفَّر من لابس السلطان -দ্র. আল-ই‘তিছাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৪৭।
প্রসঙ্গসমূহ »:
ভ্রান্ত মতবাদ