বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ০২:০২ পূর্বাহ্ন

রামাযান মাস : এক মহামূল্যবান নে‘মত

- মূল : শায়খ ড. আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল মুহসিন আব্বাদ আল-বদর
- অনুবাদ : সাইনুল ইসলাম বিন শাহজাহান*


আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের উপর অগণিত অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَ اِنۡ تَعُدُّوۡا نِعۡمَتَ اللّٰہِ لَا تُحۡصُوۡہَا ؕ اِنَّ الۡاِنۡسَانَ  لَظَلُوۡمٌ  کَفَّارٌ ‘আর যদি তোমরা আল্লাহর নে‘মত গণনা কর, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় মানুষ বড়ই যালিম, অকৃতজ্ঞ’ (সূরা ইবরাহীম : ৩৪)। এ নে‘মতসমূহের কিছু নিরংকুশ ও কিছু শর্তযুক্ত; কিছু দ্বীনী এবং কিছু দুনিয়াবী। তিনি বান্দাদেরকে এসব নে‘মতের দিকে পথনির্দেশ করেছেন, তাদেরকে সে পথে হেদায়াত দিয়েছেন এবং তাদেরকে শান্তির আবাসের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রসেঙ্গ মহান আল্লাহ বলেন, وَ اللّٰہُ یَدۡعُوۡۤا اِلٰی دَارِ السَّلٰمِ ؕ وَ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ  اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ  ‘আল্লাহ মানুষকে শান্তির আবাসের দিকে আহ্বান করেন এবং যাকে ছিরাতে মুস্তাক্বীমে পরিচালিত করেন’ (সূরা ইউনুস : ২৫)।  তিনি তাদেরকে তাদের বিবেক-বুদ্ধিতে, তাদের দেহে ও তাদের জীবিকায় নিরাপদ রেখেছেন এবং তাদেরকে পবিত্র বস্তু দিয়ে রিযিক দান করেছেন। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে সবই তিনি তাদের জন্য নিয়োজিত করে দিয়েছেন। এই সমস্ত নে‘মত দান করেছেন, যাতে বান্দারা তাঁর শুকরিয়া আদায় করে এবং এককভাবে তাঁরই ‘ইবাদত করে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করে। যাতে তারা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে এবং তাঁর অনুগ্রহ ও রহমত লাভে ধন্য হতে পারে।

আর তাঁর মহান দানসমূহ ও বিপুল অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত হল- তিনি তাঁর মুমিন বান্দাদের জন্য বরকতময় রামাযান মাসের ছিয়াম ফরয করেছেন এবং একে দ্বীনের মহান স্তম্ভসমূহ ও ভিত্তিগুলোর অন্যতম করেছেন, যার ওপর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত। যেহেতু রামাযান মাসের ছিয়াম আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর দানকৃত এক মহা নে‘মত, তাই তিনি রামাযান মাসে ছিয়াম রাখার নির্দেশ সংবলিত আয়াতসমূহের শেষ করেছেন তাঁর এই বাণী দ্বারা- وَلَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ ‘যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৫)। কারণ কৃতজ্ঞতাই হল সৃষ্টিকে সৃষ্টি করা এবং নে‘মতকে বৈচিত্রময় করার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।

আর শুকরিয়ার প্রকৃত অর্থ হল- ‘নে‘আমতদাতার নে‘মতকে তার সামনে বিনয়-নম্রতা, আনুগত্য ও ভালবাসার সাথে স্বীকার করা। সুতরাং, যে ব্যক্তি নে‘মতকে চিনল না বরং তা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকল, সে শুকরিয়া আদায় করল না। আর যে নে‘মতকে চিনল কিন্তু নে‘মতদাতাকে চিনল না, সেও শুকরিয়া আদায় করল না। আর যে নে‘মতকেও চিনল এবং নে‘মতদাতাকেও চিনল কিন্তু তা অস্বীকার করল- যেমন: কোন অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি তার নে‘মতদাতার নে‘মত অস্বীকার করে, সে তো এর প্রতি কুফরী করল। আর যে নে‘মতকেও চিনল এবং নে‘মতদাতাকেও চিনল ও তা স্বীকার করল, অস্বীকার করল না; কিন্তু তার প্রতি বিনয়ী হল না এবং তাকে ভালোবাসল না, তার প্রতি সন্তুষ্ট হল না ও তার পক্ষ থেকে সন্তুষ্ট হল না, সেও শুকরিয়া আদায় করল না। আর যে ব্যক্তি একে চিনল, এর নে‘মতদাতাকেও চিনল, তার প্রতি বিনয়ী হল, তাকে ভালোবাসল, তার প্রতি সন্তুষ্ট হল ও তার পক্ষ থেকে সন্তুষ্ট হল এবং তা (নে‘মত) ব্যবহার করল তার প্রিয় কাজে ও আনুগত্যে, এই হল এর প্রকৃত শোকরগুজার’।[১]

এর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, শুকর পাঁচটি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। যথা: (১) কৃতজ্ঞ ব্যক্তির কৃতজ্ঞতা গ্রহণকারীর (আল্লাহর) প্রতি বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ করা (২) তাঁর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা (৩) তাঁর নে‘মতকে স্বীকৃতি দেয়া (৪) সেই নে‘মতের জন্য তাঁর প্রশংসা করা এবং (৫) সেই নে‘মতকে এমন কাজে ব্যবহার না করা যা তিনি অপসন্দ করেন। এই পাঁচটি মূলনীতিই শুকরের ভিত্তি ও কাঠামো। অতএব, এর কোন একটি অনুপস্থিত হলে শুকরের ভিত্তির একটি স্তম্ভ নষ্ট হয়ে যায়। শুকর ও তার সীমা সম্পর্কে যারা আলোচনা করেছেন, তাঁদের সকল বক্তব্য শেষ পর্যন্ত এই মূলনীতিগুলোর দিকেই ফিরে আসে এবং এগুলোর চারপাশেই আবর্তিত হয়।[২]

শুকর আদায়ের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। এর কারণ হলো- শুকরের আবশ্যক বিষয়সমূহ সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের ভিন্নতা; অর্থাৎ মহান স্রষ্টা, পরম প্রতিপালক ও দয়ালু নে‘মতদাতাকে চেনার ক্ষেত্রে তাদের জ্ঞানের তারতম্য। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহকে তাঁর নামসমূহ, গুণাবলী ও কর্মসমূহের বিস্তারিত জ্ঞানের মাধ্যমে, তাঁর সৃষ্টির বিস্ময়কর নিদর্শন, কার্যাবলি এবং তাঁর সুন্দর অনুগ্রহ ও দানসমূহের পরিচয়ের মাধ্যমে চিনেছে; ফলে তার অন্তর আল্লাহর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, তার জিহ্বা আল্লাহর প্রশংসায় সদা ব্যস্ত হয়েছে, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এমন কাজে নরম ও অনুগত হয়ে গেছে এবং সে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সকল নে‘মত স্বীকার করেছে ও সেগুলোকে আল্লাহ যা ভালোবাসেন ও পসন্দ করেন, সে সব কাজেই ব্যবহার করেছে। আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ সম্পর্কে গাফিলতি ও অজ্ঞতার মাধ্যমে নিজ আত্মাকে অবহেলায় নিমজ্জিত করেছে; ফলে তারা আল্লাহ থেকে আরও দূরে সরে গেছে, কখনো তাঁর অনুগ্রহ অস্বীকার ও অমান্য করার মাধ্যমে, আবার কখনো আল্লাহকে স্বীকার করেও তাঁর আদেশ মান্য না করে এবং তাঁর শরী‘আতের অনুসরণ না করার কারণে।

বরকতময় রামাযান মাস হল বান্দাদের জন্য এক ইলাহী অনুগ্রহ ও প্রতিপালক প্রদত্ত দান, যাতে যারা ঈমান এনেছে তাদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পায়, আর যারা অবহেলা ও শৈথিল্য করেছে তারা তাওবাহ করে ফিরে আসে। আল্লাহ তা‘আলা এই মাসকে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে স্বতন্ত্র করেছেন এবং এমন সব মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য দিয়ে সম্মানিত করেছেন, যা অন্য সব মাস থেকে একে পৃথক করে তোলে। আসুন, আমরা এর কিছু বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি দিই, যাতে আল্লাহ আমাদের যে মহান নে‘মত দান করেছেন তার মহিমা উপলব্ধি করতে পারি এবং যথাযথভাবে তাঁর শুকর আদায় করতে ও যথাযথভাবে তাঁর ইবাদত করতে পারি। যা নিম্নরূপ:

>> নিশ্চয় সম্মানিত রামাযান মাস, যা ছিয়ামের মাস। এ মাস কুরআনের সাথে একটি বিশেষ সম্পর্ক বহন করে। কারণ এ মাসেই আল-কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, شَہۡرُ رَمَضَانَ الَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ فِیۡہِ الۡقُرۡاٰنُ ہُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الۡہُدٰی وَ الۡفُرۡقَانِ ‘রামাযান মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য পথনির্দেশ, হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৫)। এই মহিমান্বিত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা অন্যান্য সকল মাসের তুলনায় ছিয়ামের মাসকে বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন। কারণ তিনি এ মাসকেই মহান কুরআন অবতীর্ণ করার জন্য নির্বাচন করেছেন। বরং হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, এ মাসই ছিল সেই মাস, যখন আল্লাহ তা‘আলা নবীদের ওপর আসমানী কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করতেন। আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘ছহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ’ গ্রন্থে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) এর বর্ণনায় একটি হাদীছ উল্লেখ করেছেন, যা ওয়াসিলাহ ইবনুল আসকা‘ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

أُنْزِلَتْ صُحُفُ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فِى أَوَّلِ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ وَأُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ لِسِتٍّ مَضَيْنَ مِنْ رَمَضَانَ وَالإِنْجِيلُ لِثَلاَثَ عَشْرَةَ خَلَتْ مِنْ رَمَضَانَ وَأُنْزِلَ الْقُرْآنُ لأَرْبَعٍ وَعِشْرِينَ خَلَتْ مِنْ رَمَضَانَ

‘ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর ছহীফাসমূহ রামাযানের প্রথম রজনীতে নাযিল করা হয়, তাওরাত নাযিল করা হয় রামাযানের ছয় তারিখ গত হলে, ইঞ্জীল নাযিল করা হয় রামাযানের তের তারিখ গত হলে এবং ফুরক্বান (কুরআন) নাযিল করা হয় রামাযানের চব্বিশ তারিখ গত হলে’।[৩] আর এই হাদীছটি প্রমাণ করে যে, রামাযান মাস হল সেই মাস, যাতে রাসূলগণের উপর ইলাহী কিতাবসমূহ নাযিল হত, তবে তা সংশ্লিষ্ট নবীর উপর পূর্ণাঙ্গরূপে একসাথে নাযিল হত। আর পবিত্র কুরআন তার মর্যাদার অতিরিক্ত গুরুত্ব ও মহান ফযীলতের কারণে পুরোপুরি একসাথে নাযিল করা হয়েছিল আসমানের সর্বনিম্নস্তরের বায়তুল ‘ইযযাতে, আর তা ছিল পবিত্র রামাযান মাসের লাইলাতুল ক্বদরে। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, اِنَّاۤ  اَنۡزَلۡنٰہُ  فِیۡ  لَیۡلَۃِ  الۡقَدۡرِ ‘নিশ্চয় আমরা একে (কুরআন) নাযিল করেছি ক্বদরের রাত্রিতে’ (সূরা আল-ক্বদর : ১) এবং তিনি বলেছেন, اِنَّاۤ  اَنۡزَلۡنٰہُ  فِیۡ  لَیۡلَۃٍ  مُّبٰرَکَۃٍ  اِنَّا کُنَّا مُنۡذِرِیۡنَ ‘নিশ্চয় আমরা এ (কুরআন) নাযিল করেছি এক মুবারক রজনীতে। নিশ্চয় আমি (মানুষকে) সতর্ককারী’ (সূরা আদ-দুখান : ৩)। এরপর তা নক্ষত্রসমূহের অবস্থান অনুযায়ী ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হয়েছে, এর এক অংশের পর আরেক অংশ। এর মধ্যেই ছিয়াম মাস, বরকতময় রামাযান মাসের মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে এবং এ কথাও প্রতীয়মান হয় যে, এ মাসের সঙ্গে পবিত্র কুরআনের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। কেননা এই মাসেই আল্লাহ তা‘আলা উম্মতের প্রতি এক মহা অনুগ্রহ দান করেছেন, তাঁর মহান ওহীর অবতরণ এবং তাঁর সম্মানিত বাণী, যা পরিপূর্ণ হিদায়াতকে অন্তর্ভুক্ত করে। মহান আল্লাহ বলেন, ہُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الۡہُدٰی وَ الۡفُرۡقَانِ ‘যা মানুষের জন্য পথনির্দেশ, হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৫)।  যাতে রয়েছে দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণের হিদায়াত, যাতে রয়েছে অতি স্পষ্টবর্ণনার মাধ্যমে সত্যের ব্যাখ্যা, এবং যাতে রয়েছে হিদায়াত ও গোমরাহীর মাঝে, সত্য ও মিথ্যার মাঝে, অন্ধকার ও আলোর মাঝেপার্থক্য নির্ণয়কারী সূচক।

>>  রামাযান মাসে রয়েছে লাইলাতুল ক্বদর, যার সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, وَ مَاۤ  اَدۡرٰىکَ مَا لَیۡلَۃُ  الۡقَدۡرِ - لَیۡلَۃُ  الۡقَدۡرِ ۬ۙ خَیۡرٌ  مِّنۡ  اَلۡفِ شَہۡرٍ ‘আপনি কি জানেন লাইলাতুল ক্বদর কী? লাইলাতুল ক্বদর এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ’ (সূরা আল-ক্বদর : ২-৩)। অর্থাৎ এ রাতে আমল অন্য এক হাজার মাসের আমল থেকে উত্তম, অনুরূপভাবে ছওয়াবও।

>>  এই মাসের ছাওম পাপসমূহের মাগফিরাতের কারণ। শায়খাইন (ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম) বর্ণনা করেছেন, আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছাওয়াবের আশায় রামাযানের ছাওম পালন করে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়’।[৪] অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি ঈমান রেখে, তাঁর পক্ষ থেকে ছিয়াম ফরয করা হয়েছে- এতে সন্তুষ্ট থেকে এবং এর ছাওয়াব ও প্রতিদানের আশা নিয়ে (যে ব্যক্তি ছিয়াম পালন করে), সে ছিয়াম ফরয হওয়াকে অপসন্দ করে না এবং এর ছাওয়াব ও প্রতিদান নিয়ে কোন সংশয় পোষণ করে না, তবে আল্লাহ তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। আর ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ছহীহ মুসলিমে বর্ণনা করেছেন, আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفِّرَاتٌ مَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ ‘পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত, এক জুম‘আহ থেকে অপর জুম‘আহ এবং এক রামাযান থেকে অপর রামাযান; এগুলো মধ্যবর্তী (সগীরা) গুনাহসমূহের কাফফারা হয়ে যায়, যদি কেউ কাবীরা গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকে’।[৫]

>>  উপরিউক্ত বিষয়গুলোর পাশাপাশি আরও রয়েছে যে, যে ব্যক্তি ঈমান ও ছাওয়াবের প্রত্যাশা নিয়ে রামাযান মাসে ক্বিয়াম (তারাবীহ/রাতের ছালাত) আদায় করে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। এ মাসে শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। আর এ মাসে প্রতি রাতেই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে বহু মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয়া হয়।

>>  এই বরকতময় মাসেই মহান বদর যুদ্ধে আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদেরকে তাদের মুশরিক শত্রুদের ওপর মহাবিজয় দান করেছিলেন। সে যুদ্ধে মুশরিকদের সংখ্যা মুসলিমদের তুলনায় তিন গুণ ছিল। আর এ মাসেই আল্লাহ তা‘আলা মক্কা মুকাররমা, নিরাপদ নগরী- রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে বিজয় দান করেন এবং তাকে মূর্তিসমূহ থেকে পবিত্র করেন। কা‘বা ঘর ও তার চারপাশে মোট তিন শত ষাটটি মূর্তি ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেই মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলতে থাকেন এবং বলতে থাকেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَ قُلۡ جَآءَ الۡحَقُّ وَ زَہَقَ الۡبَاطِلُ ؕ اِنَّ الۡبَاطِلَ  کَانَ  زَہُوۡقًا ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে; নিশ্চয় মিথ্যা তো বিলুপ্ত হবারই’ (সূরা আল-ইসরাঈল : ৮১)। অতএব রামাযান মাস হলো দৃঢ়তা, কর্মচাঞ্চল্য ও সক্রিয়তার মাস; এটি ইবাদতের মাস এবং আল্লাহর পথে জিহাদের মাস। সুতরাং যে মাসের এই মর্যাদা এবং যে মাসে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এত মহান অনুগ্রহ বর্ষণ করেছেন, সে মাসকে বান্দাদের দ্বারা সম্মানিত করা এবং এটিকে ইবাদতের মৌসুম ও পরকালের পাথেয় হিসাবে গ্রহণ করা অত্যন্ত যথার্থ।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে সে সমস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা এ মাসের মর্যাদা ও সম্মানকে চিনতে পারে এবং এতে যা আপনি পসন্দ করেন তা আদায় করার তাওফীক্ব আমাদেরকে দান করুন। নিশ্চয় আপনি দু‘আ শ্রবণকারী। হে আল্লাহ! হে বিশ্বজগতের রব! আমাদেরকে আপনার আনুগত্য করার তাওফীক দিনি, আপনার যিকির, শুকরিয়া ও উত্তম ইবাদত করার ব্যাপারে আমাদেরকে সাহায্য করুন, কল্যাণের পথে আমাদেরকে সহজগামী করুন এবং এ সম্মানিত আগন্তুকের (রামাযানের) হক আদায় করার মাধ্যমে আমাদের উপর নে‘মত পূর্ণ করুন এবং এর ছাওম, ক্বিয়াম ও উত্তম আচরণ পালনে আমাদেরকে সাহায্য করুন।


* ফাযিল (সমমান স্নাতক), ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়, বিবিএ অনার্স, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, তারীকুল হিজরাতাইন ওয়া বাবুস সা‘আদাতাইন (কায়রো: দারুস সালাফিয়্যাহ, ২য় সংস্করণ, ১৩৯৪ হি.), পৃ. ৯৫।
[২]. ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, মাদারিকুস সালিকীন, ২য় খণ্ড (বৈরূত: দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ২য় সংস্করণ, ১৪১৬ হি.১৯৯৬ খ্রি.), পৃ. ২৩৪।
[৩]. মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী, ছহীহ সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ (আম্মান: আল-মাকতাবাতুল ইসলামী, ১ম সংস্করণ, তাবি), পৃ. ৯০; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭০২৫।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৬০।
[৫]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৩।




প্রসঙ্গসমূহ »: ছিয়াম-রামাযান
আল-কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (২১তম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইসলামে ব্যবসায়িক মূলনীতি - ড. সাদীক মাহমূদ
রজব মাসের বিধানসমূহ - অনুবাদ : ইউনুস বিন আহসান
মীলাদুন্নবী ও আমাদের অবস্থান - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ছয়টি মূলনীতির ব্যাখ্যা (৩য় কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
ইসলামী জামা‘আতের মূল স্তম্ভ (৫ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজ (৩য় কিস্তি) - ড. মেসবাহুল ইসলাম
সূদ-ঘুষ ও অবৈধ ব্যবসা (৫ম কিস্তি) - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
প্রচলিত তাবলীগ জামা‘আত সম্পর্কে শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের অবস্থান (৭ম কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
ধর্মীয় সংস্কারের স্বরূপ ও প্রকৃতি (৫ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধান - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন

ফেসবুক পেজ