শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৫:২৫ অপরাহ্ন

সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব

-হাসিবুর রহমান বুখারী*



ভূমিকা

ইসলামী জ্ঞানের মূল উৎস হল আল-কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ। কুরআনুল কারীমকে যেমন আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে শারঈ জ্ঞানের প্রথম উৎস হিসাবে গ্রহণ করেছি, অনুরূপভাবে সুন্নাহ বা হাদীছকেও শরী‘আতের দ্বিতীয় উৎস হিসাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ ঐকমত্য। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল প্রত্যেক যুগেই কিছু ইসলাম বিদ্বেষী হতভাগা সুন্নাহ সম্পর্কে মানুষের অন্তরে সংশয় সৃষ্টি করার জন্য গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

সুন্নাহ বিরোধীরা শয়তানী মূল মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ তাদের চক্রান্ত সম্পর্কে আঁচ করতে পারছেন না। মানুষকে বিভ্রান্ত করার শয়তানী মূলমন্ত্র হল- ‘কোন বিষয়ে শয়তান কখনো মানুষকে সরাসরি না-মানার নির্দেশ দেয় না। বরং কোন জিনিস সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পূর্বে সে মানুষকে প্রথমে সন্দেহের বেড়াজালে আবদ্ধ করে, মানুষের অন্তরে সেই জিনিস সম্পর্কে সংশয় সঞ্চার করে, যাতে করে মানুষ নিজেই একসময় একথা বলতে বাধ্য হয় যে, ‘এরকম সংশয় উদ্রেককারী জিনিস কখনো দীনের অংশ হতে পারে না’।

সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের উৎপত্তি ও বিকাশ

রাসূল (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর ছাহাবীদের যুগেই এই ফিতনাহ প্রকাশিত হয়েছিল। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর দলভুক্ত হিসাবে আত্মপ্রকাশকারী খারেজী সম্প্রদায় ছাহাবীদের বিরোধী হয়ে যায়। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও মু‘আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মধ্যে চলমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মীমাংসাকে তারা অস্বীকার করে সর্বপ্রথম নিজেদের ভ্রষ্টতার উপর প্রলেপ দেয়ার উদ্দেশ্যে বলেছিল, لَا حُكْمَ إلَّا لِلٰه ‘আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কোন হুকুমদাতা নেই’। অতঃপর উক্ত মীমাংসাকারী এবং এই মীমাংসাকে সমর্থনকারী সমস্ত ছাহাবীকে তারা কাফির বলেছিল! এবং তাঁদের বর্ণিত সকল হাদীছকে পরবর্তীতে তারা অস্বীকার করেছিল। অনুরূপভাবে শী‘আ সম্প্রদায়েরাও কয়েকজন ছাহাবী ব্যতীত সকল ছাহাবীকে কাফির বলে সম্বোধন করে এবং তাঁদের বর্ণিত হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। পরবর্তীতে আরো অনেক ভ্রান্ত দলের উৎপত্তি হয়, এদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল- ‘মু‘তযিলা’। এরা নিজেদের যুক্তিবাদী বা বুদ্ধিবাদী দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার পর তারা তাদের যুক্তির বাইরে বর্ণিত হাদীছগুলোকে অস্বীকার করে। কখনো কখনো তারা প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য তাদের যুক্তির বাইরের বর্ণিত কুরআনের আয়াতগুলোকেও অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। অতঃপর ইসলামের প্রথম শতাব্দী থেকেই  মাঝে মধ্যে বিভিন্ন চক্রান্তকারী দল ও বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষেরা হাদীছের নামে অপবাদ ছড়িয়েছে। মুসলিমদের অন্তরে ইসলামের দ্বিতীয় উৎস হাদীছ সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। তবে উলামা, মুহাক্কিক্ব, মুফাসসির, মুহাদ্দিছ ও বিদ্বানগণের নিরলস প্রচেষ্টা ও তীব্র প্রতিরোধের মুখে তা ব্যাপকতা লাভ করতে পারেনি। তবে আধুনিক যুগে পাশ্চাত্য সভ্যতায় অনুপ্রাণিত কিছু নামধারী যুক্তিবাদী মুসলিম ইসলামকে প্রাচীন ভেবে তাকে সংস্কার ও আধুনিক করার প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করে। তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসকে ইসলামী লেবাস পরিধান করাতে সচেষ্ট হয়। তাদের নানামুখী ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান দিক ছিল, ‘আমাদের জন্য কুরআনই যথেষ্ট হাদীছের কোন প্রয়োজন নেই। কেননা হাদীছ হল- ‘ধারণা নির্ভর’ নাউযুবিল্লাহ। এরাই হাদীছ শাস্ত্রের বিরুদ্ধে সন্দেহবাদ আরোপ করেছে। কেউ হাদীছ বাদ দিয়ে শুধু কুরআনের অনুসারী হওয়ার দাবি করেছে। কেউ নিজের স্বার্থের কিছু হাদীছকে স্বীকার করেছে, আর বাকিগুলোকে অস্বীকার বা অপব্যাখ্যা করেছে।

এক্ষেত্রে দু’টি দেশের কিছু নামধারী বুদ্ধিজীবী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই হাদীছ বিরোধী আন্দোলনের দু’টি প্রধান উৎস ভূমি হল- (১) মিশর (২) ভারত। মিশরীয় পণ্ডিতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হল- ‘মুফতী মুহাম্মাদ আবদুহু’। অপরদিকে ভারতীয় পণ্ডিতদের মধ্যে স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের নাম উল্লেখযোগ্য। এরা সংস্কারের নামে ইসলামী সংস্কৃতিতে মধ্যযুগীয় কুসংস্কার সংমিশ্রণের কুচক্রে উঠে-পড়ে লাগে। সাম্প্রতিককালে আবার ঐ ফিতনা ‘আহলুল কুরআন’ নামে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। তুরস্কের অধিকাংশ লোক ছূফিবাদে বিশ্বাসী। তারা সাধুদের (পুরুষ ও মহিলা উভয়ই) পূজা এবং তাদের মাজার এবং ক্ববরে তীর্থযাত্রা করে। দেশের বিভিন্ন অভয়ারণ্যে ফলক লাগিয়ে মোমবাতি জ্বালানো, ভক্তিমূলক বস্তু নিবেদন এবং এ সম্পর্কিত ভক্তিমূলক কার্যকলাপ করে। যারা হাদীছ অস্বীকার করে, যারা কুরআনবাদী, কুরআনিয়্যূন বা আহলে কুরআন নামে পরিচিত, তারাও তুরস্কে উপস্থিত রয়েছে। বর্তমান তুরস্কের অধিকাংশ তরুণ হয় ইসলাম ত্যাগকারী অথবা কুরআনবাদী। আশ্চর্যের বিষয় হল- তুরস্কে উল্লেখযোগ্য কুরানিস্ট স্কলারশিপ রয়েছে। এমনকি উল্লেখযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কুরআনবাদী ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপকও রয়েছে, যার মধ্যে ইয়াসার নুরি ও জতুর্ক এবং ক্যানের তাসলামানের মত পণ্ডিত রয়েছে।

ইসলামের নামে নব্য আবিষ্কৃত দলগুলোর মধ্যে সর্বাধিক পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্তিকর দলটির নাম হল- ‘আহলে কুরআন’। পবিত্র মক্কা নগরীতে অবস্থিত ‘উম্মুল কুরা’ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাইখ খাদিম হুসাইন ইলাহী বাখশ (হাফিযাহুল্লাহ) ‘উম্মুল কুরা’ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স (গ.অ) করার সময় ‘আহলে কুরআন’ সম্পর্কে গবেষণা করেছিলেন এবং এ সম্পর্কে তিনি (فرقة أهل القرآن بباكستان وموفق الإسلام منها) ‘ফির্ক্বাতু আহলিল কুরআন বি-বাকিস্তান ওয়া মাওক্বিফুল ইসলাম মিনহা’ নামে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর প্রবন্ধকেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি ‘আহলে কুরআনের উৎপত্তি’ নামক শিরোনামে বলেছেন, ‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কালে ১৭০০ শতকের শেষের দিক থেকেই হাদীছ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অন্তরে সন্দেহ, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সংশয় তৈরির কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ভারতবর্ষের পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে ইসলামের নামে অত্যধিক জঘন্য, বিপদগামী, আদর্শচ্যুত, দিশেহারা, ধ্বংসাত্মক ও মারাত্মক দু’টি দল উদ্ভাবিত ও অভ্যুদিত হয়েছে। যার একটির নাম ‘কাদিয়ানী’, আর অপরটির নাম ‘আহলে কুরআন’।

১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম অভিশপ্ত গোলাম আহমাদ ক্বাদিয়ানী নিজেকে নাবী বলে দাবী করার মাধ্যমে ‘কাদিয়ানী’ সম্প্রদায় শিরোনামে আসে। ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে একই প্রদেশ থেকে হাদীছ অস্বীকারকারী ‘আব্দুল্লাহ জাকরালাবীর’ প্ররোচনায় ‘আহলে কুরআন’ নামক অপর একটি ভ্রান্ত দলের উৎপত্তি হয়। যে সাধারণ মানুষদের সুন্নাতকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করে শুধু কুরআন মানার প্রতি আহ্বান করতে থাকে এবং সে ‘লাহোরের জিনিয়ান-ওয়ালী’ নামক একটি মসজিদে আশ্রয় গ্রহণ করে। শুরুর দিকে মূলত দু’জন ব্যক্তি-ই এই ভ্রান্ত মতবাদের নেতৃত্ব দিয়েছিল। একজন পূর্ব ভারতের বিহার রাজ্যের ‘মুহিব্বুল হাক্ব আযীমাবাদী’, অপরজন পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে পলায়নকারী লাহোরের ‘আব্দুল্লাহ জাকরালাবী’।[১] আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এরা দু’জনেই কিন্তু সাইয়্যিদ আহমাদ খাঁন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। ‘ছাওতু আলীকারাহ বা আলীগড়ের ডাক’ নামক আন্দোলনের সময়কালে তিনি বলেছিলেন, ‘দীন মানার জন্য শুধু কুরআনকেই যথেষ্ট মনে করতে হবে এবং হাদীছকে শারঈ দলীল হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না’। এই আহ্বান ‘মুহিব্বুল হাক্ব আযীমাবাদী’ ও ‘আব্দুল্লাহ জাকরালাবী’-কে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।[২] বর্তমানে ‘আহলে কুরআন’ নামক দলটি চারটি উপদলে বিভক্ত। যথা: (১) ‘উম্মাতু মুসলিম আহলুয যিকর ওয়াল কুরআন (২) ‘উম্মাতুন মুসলিমাতুন’ (৩) ‘তুলূঊ ইসলাম’, (৪) তাহরীকু তামীর ইসলাম’।[৩]

ইসলামের নামে যে সমস্ত মাযহাব, দল ও মতবাদের অভ্যুদয় ঘটেছে তাদের স্বধর্মভ্রষ্টতা, পদস্খলিতা ও অধঃপতনের বিষয়টি পরিস্ফুটিত করার সর্বাধিক সহজবোধ্য ও সহজলব্ধ উপায় হল তার উৎপত্তিকাল সম্পর্কে পরিজ্ঞাত বা তথ্যাভিজ্ঞ হওয়া। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

عَنْ عَبْدِ اللّهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أُمَّتِيْ مَا أَتَى عَلَى بَنِيْ إِسْرَائِيْلَ حَذْوَ النَّعْلِ بِالنَّعْلِ، حَتَّى إِنْ كَانَ مِنْهُمْ مَنْ أَتَى أُمَّهُ عَلَانِيَةً لَكَانَ فِيْ أُمَّتِيْ مَنْ يَصْنَعُ ذَلِكَ، وَإِنَّ بَنِيْ إِسْرَائِيْلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِيْنَ مِلَّةً، وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِيْ عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِيْنَ مِلَّةً، كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةً، قَالُوْا: وَمَنْ هِيَ يَا رَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِيْ‏.‏

আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আম্‌র (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, বানী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মত হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উম্মতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বানী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সব দলগুলোই জাহান্নামী হবে। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সে দল কোন্টি? তিনি বললেন, ‘আমি ও আমার ছাহাবীগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত’।[৪] উক্ত হাদীছের আলোকে একথা দিবালোকের ন্যায় প্রতীয়মান হয় যে, যারাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তাঁর ছাহাবীগণের আদর্শকে আঁকড়ে ধরবে, বিবিধ দলসমূহের মধ্য হতে শুধু তারাই প্রকৃত ইসলামের ও হক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, আর তারাই সফলতা, সার্থকতা এবং পরিত্রাণ পাবে।

পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে ‘আহলে কুরআনদের’ অবস্থান

প্রকৃতপক্ষে এদের ‘আহলে কুরআন’ না বলে ‘মুনকিরুল হাদীছ বা হাদীছ অস্বীকারকারী’ বলা সময়ে দাবী। কেননা কুরআন মান্যকারীদের উপর হাদীছ মানা অপরিহার্য। বস্তুতঃ পবিত্র কুরআনের মধ্যেই হাদীছের প্রামাণিকতা বিদ্যমান। হাদীছের সত্যতা ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কেউ ‘আহলে কুরআন’ হতে পারে না। যেমন,

(১) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

فَلَا وَ رَبِّکَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ حَتّٰی  یُحَکِّمُوۡکَ فِیۡمَا شَجَرَ  بَیۡنَہُمۡ ثُمَّ  لَا  یَجِدُوۡا فِیۡۤ  اَنۡفُسِہِمۡ حَرَجًا  مِّمَّا قَضَیۡتَ  وَ یُسَلِّمُوۡا  تَسۡلِیۡمًا

‘কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে, অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের অন্তরে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়’ (সূরা আন-নিসা: ৬৫)।

(২) অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

وَ مَا نَہٰىکُمۡ  عَنۡہُ فَانۡتَہُوۡا ۚ وَ  اتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ

‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর’ (সূরা আল-হাশর: ৭)।

(৩) মহান আল্লাহ আরো বলেন,

وَ مَا یَنۡطِقُ عَنِ  الۡہَوٰی -اِنۡ  ہُوَ   اِلَّا  وَحۡیٌ   یُّوۡحٰی

‘আর তিনি মনগড়া কথা বলেন না। তা তো অহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়’ (সূরা আন-নাজম: ৩-৪)।

(৪) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ مَنۡ یُّشَاقِقِ الرَّسُوۡلَ مِنۡۢ بَعۡدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُ الۡہُدٰی وَ یَتَّبِعۡ غَیۡرَ  سَبِیۡلِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ نُوَلِّہٖ مَا تَوَلّٰی وَ نُصۡلِہٖ جَہَنَّمَ ؕ وَ سَآءَتۡ مَصِیۡرًا

‘আর কারো নিকট সৎপথ প্রকাশিত হওয়ার পরও যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে তাকে আমরা সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কতই না মন্দ আবাস!’ (সূরা আন-নিসা: ১১৫)।

(৫) মহান আল্লাহ বলেন,

قُلۡ  اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَ یَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَ اللّٰہُ غَفُوۡرٌ  رَّحِیۡمٌ

‘(হে নবী!) আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর। ফলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করবেন। বস্তুত আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আলে ইমরান: ৩১)।

হাদীছের প্রামাণিকতায় এ রকম আরো সহস্র আয়াত বিদ্যমান। অতএব বুঝা যাচ্ছে যে, ‘আহলে কুরআন’ নামক দলটি কুরআন-সুন্নাহ ও শরী‘আতের দলীলাদি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। নাম আহলে কুরআন হলেও কিন্তু আসলে তারা কুরআনের কিছুই বুঝে না। আর বুঝবেই বা কী করে! হাদীছ ছাড়া কি কুরআন বুঝা সম্ভব? এদের ভ্রান্ত মতবাদ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অনেক পূর্বেই সতর্ক করে বলেছেন, ‘জেনে রাখ! আমাকে কুরআন এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু দেয়া হয়েছে। জেনে রাখ! এমন এক সময় আসবে যখন কোন প্রাচুর্যবান ব্যক্তি তার আসনে বসে বলবে, তোমরা শুধু এ কুরআনকেই আঁকড়ে ধর, তাতে যা হালাল পাবে তাকে হালাল হিসাবে এবং যা হারাম পাবে তাকে হারাম হিসাবে গ্রহণ কর। নবী (ﷺ) বলেন, ‘জেনে রাখ! গৃহপালিত গাধা তোমাদের জন্য হালাল নয় এবং ছেদন দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র পশুও নয়’।[৫]

আহলে কুরআন বা হাদীছ অস্বীকারকারীদের বিধান

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সর্বসম্মত মতানুযায়ী আহলে কুরআন বা হাদীছ অস্বীকারকারীরা কাফির। যেমন

(১) ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘হাদীছ অস্বীকারকারীদের ধ্বংস অনিবার্য’।[৬]

(২) ইমাম ইসহাক্ব ইবনু রাহওয়াইহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এমন প্রত্যেক ব্যক্তি যার কাছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কোন একটি ছহীহ হাদীছ পৌঁছেছে, অতঃপর সে কোন ভয়ের আশঙ্কা ছাড়াই তাকে অস্বীকার করেছে, তবে সে নিশ্চিতরূপে কাফির’।[৭]

(৩) শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যারা মনে করে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আনুগত্য করা অপরিহার্য নয়, তারা কাফির, তাদের হত্যা করা অপরিহার্য’।[৮]

(৪) ইমাম সুয়ূত্বী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যারা নবী (ﷺ)-র হাদীছকে অস্বীকার করে তারা কাফির এবং তারা ইসলামের গণ্ডি ও চৌহদ্দি থেকে নিষ্কাশিত হয়ে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান অথবা অন্য কোন বিধর্মী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে’।[৯]

(৫) ইমাম ইবনু দাক্বীক্ব আল-ঈদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদীছ প্রমাণিত হওয়ার পরেও যারা তা প্রত্যাখ্যান করে তারা স্পষ্ট কাফির’।[১০]

(৬) ইমাম ইবনু হায্ম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যদি কোন ব্যক্তি বলে, আমরা শুধু কুরআনের বিধানই মানব, হাদীছ মানব না, তবে সে সর্বসম্মতিক্রমে কাফির’।[১১]

(৭) শাইখ আবূ বাকর আল-আজুর্রী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আলেমগণ বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনের মধ্যে যে সমস্ত বিধানকে ফরয করেছেন, তার পদ্ধতি ও নিয়ম-কানুন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাত ছাড়া উপলব্ধি করা অসম্ভব। আর যারা এর বিপরীত বলবে, অর্থাৎ যারা বলবে যে, সুন্নাত ছাড়াও ইসলাম মানা সম্ভব তারা কাফির। তারা ইসলামী দল থেকে বহিষ্কৃ হয়ে নাস্তিকদের অন্তর্ভুক্ত হিসাবে বিবেচিত হবে’।[১২]

(৮) শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যারা সুন্নাতকে অস্বীকার করে তারা কাফির ও স্বধর্মত্যাগী। কেননা সুন্নাতকে অস্বীকার করা কুরআনকে অস্বীকার করার নামান্তর। যে কিতাব ও সুন্নাতকে অথবা এর কোন একটিকে অস্বীকার করে সে সর্বসম্মতিক্রমে কাফির। অবশ্যই তাকে এ সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করা দরকার’।[১৩]

(৯) সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি বলেন, ‘যারা সুন্নাত অনুযায়ী আমাল করাকে অস্বীকার করে তারা কাফির’।[১৪] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِيْ فَلَيْسَ مِنِّيْ ‘সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি ঔদাসীন্য ও বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়’।[১৫]

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* মুর্শিদাবাদ, ভারত।

তথ্যসূত্র:
[১]. আল-কুরআনিয়্যীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯-২১।
[২]. আল-কুরআনিয়্যীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ২২।
[৩]. আল-কুরআনিয়্যীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৭-৬৪।
[৪]. তিরমিযী, হা/২৬৪১; মিশকাত, হা/১৬৯, ১৭১; সনদ হাসান, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৩৪৮; ছহীহুল জামি‘, হা/৫৩৪৩।
[৫]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৪-৪৬০৫; তিরমিযী, হা/২৬৬৩-২৬৬৪; ইবনু মাজাহ, হা/১২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৭৪, ১৭১৯৪, সনদ হাসান।
[৬]. শারহু উছূলি ই‘তিক্বাদি আহলিস-সুন্নাতি ওয়াল-জামা‘আতি, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪৭৮।
[৭]. ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৯, ফৎওয়া নং ১১৫১২৫।
[৮]. আল-ওয়াসিয়্যাতুল কুবরা লি ইবনি তাইমিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩১৫।
[৯]. মিফতাহুল জান্নাহ ফিল ইহতিজাজি বিস সুন্নাহ, পৃ. ১৪।
[১০]. শারহুল ইসলাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৭৭-১৭৮।
[১১]. আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮০।
[১২]. আশ-শারী‘আহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪১২।
[১৩]. মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনি বায, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪০৩ ও ৯ম খণ্ড, পৃ. ১৭৬-১৭৮।
[১৪]. ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৯৪ ও ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৯-২০।
[১৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৬৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৩৫৩৪।




প্রসঙ্গসমূহ »: সুন্নাত
‘কুরআনই যথেষ্ট, সুন্নাহর প্রয়োজন নেই’ সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা - ওমর ফারুক বিন মুসলিমুদ্দীন
ইমাম মাহদী, দাজ্জাল ও ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর আগমন সংশয় নিরসন - হাসিবুর রহমান বুখারী
সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব - হাসিবুর রহমান বুখারী
ইখলাছই পরকালের জীবনতরী (৬ষ্ঠ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
তওবার গুরুত্ব ও ফযীলত - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ - অনুবাদ : মুহাম্মদ ইমরান বিন ইদরিস
তারুণ্যের উপর সন্ত্রাসবাদের হিংস্র ছোবল : প্রতিকারের উপায় - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
প্রচলিত তাবলীগ জামা‘আত সম্পর্কে শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের অবস্থান - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
যুলমের পরিচয় ও পরিণাম - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
মুসলিম বিভক্তির কারণ ও প্রতিকার - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
মসজিদ: ইসলামী সমাজের প্রাণকেন্দ্র (৮ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ইসলামী পুনর্জাগরণের মূলনীতি (৩য় কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন

ফেসবুক পেজ