‘কুরআনই যথেষ্ট, সুন্নাহর প্রয়োজন নেই’ সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা
- ওমর ফারুক বিন মুসলিমুদ্দীন*
আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন। ওয়াছ ছলাতু ওয়াস সালামু আলা রসূলিহিল কারীম। অতঃপর...
(১)
দ্বীনের শত্রুরা সর্বদা ইসলামের ক্ষতি করার জন্য বিভিন্ন উপায়ে ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছে। তারা তাদের বিভ্রান্তি ও সন্দেহ ছড়িয়ে দেয় সাধারণ মুসলিমদের মাঝে। ফলে কতক দুর্বল ঈমানদার ও অজ্ঞ মুসলিম এতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। অথচ, যদি এই সাধারণ মুসলিমরা একটু চিন্তা করত, তবে তারা বুঝতে পারত যে, এসব সন্দেহ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা।
কুরআনই যথেষ্ট, সুন্নাহর প্রয়োজন নেই-এই ভ্রান্তির খণ্ডন করা খুবই সহজ। সাধারণ একজন মুসলিম নিজেকে এই প্রশ্নটি করতে পারে: আমি যোহরের ছালাত কয় রাক‘আত পড়ব? যাকাতের নির্ধারিত পরিমাণ কত?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কুরআনে কোথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তবে, আল্লাহ আমাদের ছালাত ও যাকাতের আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু এই আদেশগুলো কীভাবে পালন করব— তা বোঝার জন্য সুন্নাহর দিকেই ফিরে যেতে হবে। এটি একটি সুস্পষ্ট বাস্তবতা যে, সুন্নাহ ছাড়া কুরআনের বিধানগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এই কারণেই ইমাম আওযায়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘কুরআন বোঝার জন্য সুন্নাহর প্রয়োজন সুন্নাহ বোঝার জন্য কুরআনের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি’।[১]
(২)
যারা মনে করে, ‘কুরআনই যথেষ্ট, সুন্নাহর প্রয়োজন নেই’, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আদেশ অমান্য করছে। কুরআনে বহু আয়াতে সুন্নাহ অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন,
وَ مَاۤ اٰتٰىکُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡہُ ٭ وَ مَا نَہٰىکُمۡ عَنۡہُ فَانۡتَہُوۡا
‘রাসূল যা তোমাদেরকে দেন, তা গ্রহণ করো; আর যা থেকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো’ (সূরা আল-হাশর: ৭)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
قُلۡ اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَ اَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ ۚ فَاِنۡ تَوَلَّوۡا فَاِنَّمَا عَلَیۡہِ مَا حُمِّلَ وَ عَلَیۡکُمۡ مَّا حُمِّلۡتُمۡ ؕ وَ اِنۡ تُطِیۡعُوۡہُ تَہۡتَدُوۡا ؕ وَ مَا عَلَی الرَّسُوۡلِ اِلَّا الۡبَلٰغُ الۡمُبِیۡنُ
‘(হে নবী!) আপনি বলুন, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে সে শুধু তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী। আর যদি তোমরা তার আনুগত্য কর তবে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া’ (সূরা আন-নূর: ৫৪)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
فَلَا وَ رَبِّکَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ حَتّٰی یُحَکِّمُوۡکَ فِیۡمَا شَجَرَ بَیۡنَہُمۡ ثُمَّ لَا یَجِدُوۡا فِیۡۤ اَنۡفُسِہِمۡ حَرَجًا مِّمَّا قَضَیۡتَ وَ یُسَلِّمُوۡا تَسۡلِیۡمًا.
‘অতএব আপনার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে আপনাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর আপনি যে ফয়সালা দেবেন সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়’ (সূরা আন-নিসা: ৬৫)।
যদি কেউ সত্যিই কুরআন মানতে চায়, তাহলে তাকে রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহও মানতে হবে। সুন্নাহ ছাড়া কুরআনের বিধান কীভাবে পালন করা সম্ভব? ছালাত: কয় রাক‘আত? কীভাবে পড়তে হবে? কোন্ সময় পড়তে হবে? যাকাত: কোন্ সম্পদের ওপর ফরয? কত পরিমাণ দিতে হবে? শরী‘আতের হদ (শাস্তি): চোরের হাত কোথা থেকে কাটা হবে? ব্যভিচারের শাস্তি কী? এই বিধানগুলোর ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন সুন্নাহ ছাড়া সম্ভব নয়। তাই, কেবল কুরআন মানার দাবি বাস্তবে অবান্তর।
(৩)
আল্লাহ যখন ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ ধর্ম হিসাবে ঘোষণা করেন, তখন তা কেবল কুরআন দিয়েই সম্পন্ন হয়নি, বরং কুরআন ও সুন্নাহ উভয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা পেয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَ رَضِیۡتُ لَکُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নে‘আমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসাবে পসন্দ করলাম ইসলামকে’ (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩)।
ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর জবানিতে চাই তা তাঁর নিজের কালাম হোক অথবা রাসূল (ﷺ)-এর কথার মাধ্যমে হোক, সবকিছু স্পষ্ট করে দিয়েছেন; যা তিনি আদেশ করেছেন, যা তিনি নিষেধ করেছেন, যা তিনি হালাল করেছেন, যা তিনি হারাম করেছেন এবং যা তিনি ক্ষমা করেছেন সবকিছু পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে। আর এভাবেই তাঁর দ্বীন পূর্ণ হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নে‘আমত সম্পূর্ণ করলাম’ (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩)। [২]
(৪)
রাসূল (ﷺ) সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, সুন্নাহ কুরআনের মতই শরী‘আতের উৎস। মিক্বদাম ইবনু মা‘দীকরিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, ‘শুনে রাখো! আমাকে কিতাব (কুরআন) এবং তার অনুরূপ আরেকটি জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে (অর্থাৎ সুন্নাহ)। সাবধান! কিছুদিনের মধ্যে এমন কিছু লোক আসবে, যারা তৃপ্তিভাবে তাদের সোফায় হেলান দিয়ে বসবে এবং বলবে: ‘তোমরা শুধু কুরআনকে আঁকড়ে ধরো। এতে যা হালাল পাওয়া যাবে, তা হালাল মনে করো; আর যা হারাম পাওয়া যাবে, তা হারাম মনে করো’। শোনো! আমি তোমাদের জন্য গৃহপালিত গাধার গোশত হারাম করেছি এবং কুকুরজাতীয় হিংস্র প্রাণীর গোশতও হারাম করেছি’।[৩]
ছাহাবীরাও সুন্নাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য দেখিয়েছেন। এক নারী ছাহাবী উম্মে ইয়াকূব (রাযিয়াল্লাহু আনহা) একবার আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর কাছে এসে বললেন, ‘আমি কুরআন পড়েছি, কিন্তু তাতে কোথাও দেখি না যে, আপনি যাকে হারাম বলেছেন, তা হারাম বলা হয়েছে। ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) জবাব দিলেন, তুমি কি কুরআনে এই আয়াত পড়োনি? রাসূল (ﷺ) যা তোমাদের দিয়েছেন, তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকো’ (সূরা আল-হাশর: ৭)।[৪]
তাবেঈগণ এবং ইসলামের ইমামগণ আল্লাহর ধর্ম থেকে যা বুঝেছিলেন এবং তারা জানতেন যে, কুরআন ও হাদীছের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, উভয়টি প্রমাণ এবং বাধ্যবাধকতায় সমান। হাদীছ কুরআনের ব্যাখ্যা এবং বিশ্লেষণ করে। আওযায়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, যে রাসূল (ﷺ)-কে মান্য করবে, সে আল্লাহকেও মান্য করেছে এবং তোমাদের কাছে রাসূল যা কিছু নিয়ে এসেছে, তা গ্রহণ করো। আওযায়ী (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন, কাসিম বিন মাখামিরা বলেছেন, যা কিছু নবী (ﷺ)-এর মৃত্যুর সময় হারাম ছিল, তা আজও হারাম এবং যা কিছু হালাল ছিল, তা আজও হালাল’।[৫] বদরুদ্দীন আয-যারকাশি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাফিয আদ-দারিমী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘নবী (ﷺ)-এর এই কথার অর্থ ‘আমাকে কুরআন দেয়া হয়েছে এবং কুরআনের অনুরূপ আরও কিছু দেয়া হয়েছে’, এটি সেই সুন্নতসমূহকে বোঝায়, যা কুরআনের সুস্পষ্ট বাক্যে উল্লেখ করা হয়নি। বরং এগুলো কুরআনের উদ্দেশ্যকে ব্যাখ্যা করার মাধ্যম হিসাবে এসেছে। যেমন গৃহপালিত গাধার গোশত হারাম হওয়া এবং সমস্ত ধারালো দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র জন্তু হারাম হওয়া। অথচ এগুলোর নিষিদ্ধকরণ কুরআনে সরাসরি উল্লেখ নেই’।[৬] ইবনু হিব্বান (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘ছহীহ’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘নবী (ﷺ) বলেছেন, আমার থেকে একটি আয়াতও পৌঁছে দিন- এখানে এটি নির্দেশ করে যে, হাদীছকেও কখনও কখনও আয়াত বলা যেতে পারে’।[৭]
(৫)
হাদীছ-সুন্নাহ যে কুরআনের ব্যখ্যা করে এক্ষেত্রে আলেমগণ বেশকিছু দিক তুলে ধরেছেন। যেমন:
১. সুন্নাহ কুরআনের বক্তব্যের সাথে মিল রেখে আসে।
২. এটি কুরআনের সাধারণ (মুতলাক) বিধানকে সীমাবদ্ধ (মুকাইয়্যাদ) করে।
৩. এটি কুরআনের সাধারণ (আম) বিধানকে নির্দিষ্ট (খাস) করে।
৪. এটি কুরআনের সংক্ষিপ্ত (মুজমাল) বিষয়কে ব্যাখ্যা (মুবাইয়ান) করে।
৫. এটি কোন কুরআনী বিধানকে নাসিখ-মানসুখ করে।
৬. এটি নতুন বিধান প্রবর্তন করে।
কতক আলেম এগুলোকে তিনটি স্তরে সংক্ষিপ্ত করেছেন। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের জন্য যা বিশ্বাস করা আবশ্যক, তা হলো: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছহীহ সুন্নাহর মধ্যে একটিও নেই, যা কুরআনের বিপরীত হয়। বরং সুন্নাহ কুরআনের সাথে তিন অবস্থানে থাকে। যথা:
- ১ম স্তর: সুন্নাহ কুরআনের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও তার সমর্থক হিসাবে আসে।
- ২য় স্তর: সুন্নাহ কুরআনকে ব্যাখ্যা করে, আল্লাহর উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে এবং কুরআনের সাধারণ বক্তব্যকে সীমাবদ্ধ করে।
- তৃতীয় স্তর: হাদীছ, কুরআনে যা বলা হয়নি, তা প্রকাশ করে এবং নতুন একটি বিধান তৈরি করে।
এই তিনটি স্তরের মধ্যে কোনটিও অগ্রাহ্য করা যাবে না। কুরআনের সাথে হাদীসের সম্পর্কের ৪র্থ স্তর নেই।
ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) সেই মতের বিরোধিতা করেছেন, যারা বলে, ‘সুন্নাহ কুরআনের বিপরীত’। তিনি বলেন, ‘বরং সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যা দেয় এবং তাকে স্পষ্ট করে’। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কোন ছহীহ সুন্নাহ কুরআনের বিপরীত নয়, কখনো তা বিরোধী হতে পারে না। কীভাবে তা সম্ভব? বরং তিনিই তো কুরআনের ব্যাখ্যাকারী। তাঁর ওপরই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে হিদায়াত দিয়েছেন। তিনি কুরআন অনুসরণ করতে আদিষ্ট এবং তিনি সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বেশি কুরআনের ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন! যদি কোন ব্যক্তি কুরআনের প্রকাশ্য ভাষার (যাহির) ভিত্তিতে রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ প্রত্যাখ্যান করার অনুমতি পেত, তাহলে অধিকাংশ সুন্নাহ প্রত্যাখ্যাত হত এবং পুরোপুরি বাতিল হয়ে যেত।
যে কারও সামনে যখন একটি ছহীহ সুন্নাহ উপস্থাপন করা হয়, যা তার মতের বিপরীত, তখন সে কোন সাধারণ (আম) বা অবাধ (মুতলাক) কুরআনি আয়াতের সাথে সুন্নাহর বিরোধিতা দেখিয়ে বলতে পারে: ‘এই সুন্নাহ কুরআনের সাধারণ ভাষার বিরোধী, তাই এটি গ্রহণযোগ্য নয়’। এমনকি রাফিযিরা (শী‘আ) একই পদ্ধতি অনুসরণ করে। তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এই ছহীহ ও বহুল প্রচলিত (মুতাওয়াতির) হাদীছ প্রত্যাখ্যান করেছে। যথা:
لا نورث ما تركنا صدقة
‘আমরা কোন সম্পদ উত্তরাধিকারসূত্রে রেখে যাই না, আমরা যা রেখে যাই, তা ছাদাক্বাহ’। তারা বলে, ‘এই হাদীছ কুরআনের বিরোধী’। কারণ আল্লাহ বলেছেন,
یُوۡصِیۡکُمُ اللّٰہُ فِیۡۤ اَوۡلَادِکُمۡ ٭ لِلذَّکَرِ مِثۡلُ حَظِّ الۡاُنۡثَیَیۡنِ
‘আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন: পুত্রের জন্য রয়েছে দুই কন্যার সমান অংশ’ (সূরা আন-নিসা: ১১)।
জাহমিয়ারা (আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অসংখ্য ছহীহ হাদীছ প্রত্যাখ্যান করেছে, যা আল্লাহর গুণাবলীর (ছিফাত) প্রমাণ দেয় এবং তারা আল্লাহর এই আয়াতের বাহ্যিক অর্থকে ভিত্তি বানিয়েছে: لَیۡسَ کَمِثۡلِہٖ شَیۡءٌ ‘তাঁর সদৃশ কিছুই নেই’ (সূরা আশ-শূরা: ১১)।
খাওয়ারিজরা শাফা‘আত সম্পর্কিত হাদীছগুলো এবং কাবীরা গুনাহকারী মুমিনদের জাহান্নাম থেকে বের হওয়ার বিষয়টি কুরআনের (যাহির) প্রকাশ্য অর্থ থেকে বুঝে অস্বীকার করেছে। জাহমিয়ারা দৃষ্টির সম্পর্কিত হাদীছগুলো, যেগুলোর সংখ্যা এবং স্বীকৃতি অনেক, কুরআনের আয়াত: لَا تُدۡرِکُہُ الۡاَبۡصَارُ ‘তাঁকে দৃষ্টি ধরতে পারে না’ (সূরা আল-আন‘আম: ১০৩); থেকে বুঝে অস্বীকার করেছে। ক্বাদারিয়ারা তাক্বদীর বিষয়ক হাদীছগুলো কুরআনের প্রকাশ্য অর্থ থেকে বুঝে অস্বীকার করেছে। প্রতিটি দল তার নিজস্বভাবে হাদীছগুলোকে কুরআনের প্রকাশ্য অর্থের ভিত্তিতে অস্বীকার করেছে। অতএব, দু’টি পথের একটিই গ্রহণ করতে হবে-
১. সব সুন্নাহ প্রত্যাখ্যান করতে হবে, যদি কুরআনের প্রকাশ্য (যাহির) অর্থকে মানদণ্ড বানিয়ে সুন্নাহ অস্বীকার করা হয়।
২. সব সুন্নাহ গ্রহণ করতে হবে, কারণ রাসূল (ﷺ) কুরআনের ব্যাখ্যাকারী।
কিন্তু কিছু সুন্নাহ গ্রহণ করা এবং কিছু প্রত্যাখ্যান করা এটি সুস্পষ্ট দ্বন্দ্ব (তানাকুদ)। কোন ব্যক্তি যখন কুরআনের প্রকাশ্য অর্থের বিরোধিতা দেখিয়ে কোন সুন্নাহ প্রত্যাখ্যান করে, তখন দেখা যায়, সে একই ভিত্তিতে আরও অনেক সুন্নাহ গ্রহণ করেছে। অথচ তার গ্রহণকৃত সুন্নাহগুলোও ঠিক একইভাবে কুরআনের প্রকাশ্য ভাষার সাথে সম্পর্কিত। এটি তার দৃষ্টিভঙ্গির অসংগতি প্রকাশ করে। যে ব্যক্তি কুরআনের প্রকাশ্য অর্থ অনুযায়ী কিছু বুঝে কোন হাদীছকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সে তার চেয়ে বেশি হাদীছ গ্রহণ করেছে, যদিও সেগুলোও একইভাবে কুরআনের প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত হতে পারে। শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) একটি ‘রিসালাহ’ লিখেছিলেন ‘ইসলামে হাদীছের মর্যাদা’ শিরোনামে, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আপনারা সবাই জানেন যে, আল্লাহ তা‘আলা নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে তাঁর নবুয়ত দ্বারা নির্বাচিত করেছেন এবং তাঁকে তাঁর রিসালাত দ্বারা বিশেষ করেছেন এবং তাঁর উপর কুরআন নাজিল করেছেন। এতে যা কিছু তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আল্লাহ তাঁকেতা মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, وَ اَنۡزَلۡنَاۤ اِلَیۡکَ الذِّکۡرَ لِتُبَیِّنَ لِلنَّاسِ ‘আমরা আপনার কাছে যেসব যিকির (কুরআন) নাযিল করেছি, তা মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করুন’ (সূরা আন-নহল: ৪৪)।
আমার মতে, এই আয়াতে উল্লিখিত ব্যাখ্যা দুই ধরনের হতে পারে। যথা:
প্রথমতঃ বাক্য এবং গঠনব্যবস্থা ব্যাখ্যা, যা হল কুরআনকে পৌঁছানো, তা গোপন না করা এবং জনগণের কাছে পৌঁছানো। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা নবী (ﷺ)-এর অন্তরে পাঠিয়েছেন। আল্লাহর বাণী:
یٰۤاَیُّہَا الرَّسُوۡلُ بَلِّغۡ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ
‘হে রাসূল! যা কিছু আপনার প্রতি আপনার রব থেকে অবতীর্ণ হয়েছে, আপনি তা পৌঁছান’ (সূরা আল-মায়েদা: ৬৭)-এর উদ্দেশ্য। আয়েশা ছিদ্দীকা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেছেন,
مَن زَعَمَ أنَّ رَسوْلَ اللهِ ﷺ كَتَمَ شيئًا مِنْ كِتَابِ اللهِ، فقَدْ أعْظَمَ علَى اللهِ الفِرْيَةِ
‘যে ব্যক্তি তোমাকে বলবে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) কিছু গোপন করেছেন যা তাঁর উপর পৌঁছানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সে আল্লাহর বিরুদ্ধে বড় মিথ্যা রটিয়েছে’। এরপর তিনি উল্লিখিত আয়াতটি পাঠ করেন।[৮]
দ্বিতীয়তঃ বাক্য, বাক্যাংশ বা আয়াতের অর্থ ব্যাখ্যা, যা জাতির জন্য ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। এটি সাধারণত সেই আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে হয় যা সাধারণভাবে (মুতলাক) এসেছে। হাদীছ এসে এসব আয়াতের ব্যাখ্যা দেয়, উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘চোর ও চোরিণী, তাদের হাত কেটে দাও’ (সূরা আল-মায়েদা: ৩৮)। এখানে ‘হাত’ শব্দটি সাধারণভাবে এসেছে। হাদীছ বলে যে, চোরের হাত কাটা হবে যখন সে এক চতুর্থাংশ দীনার চুরি করবে।[৯] হাদীছ আবার প্রমাণ করেছে যে, চোরের হাত কাটা হবে কবজির নিচে (যেমনটি হাদীছে রয়েছে)। তেমনি তায়াম্মুমের আয়াতের ব্যাখ্যা হিসাবে হাদীছ বলে যে, তা কেবল মুখ এবং হাতের তালুতে হবে (ছহীহ মুসলিম ও ছহীহ বুখারী)।
আরও কিছু আয়াত রয়েছে, যা কেবল হাদীছের মাধ্যমে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। যথা:
১. আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘যারা বিশ্বাস করে এবং তাদের বিশ্বাসে অন্যায় করে না, তারা নিরাপদ থাকবে এবং তারা পথপ্রদর্শিত হবে’ (সূরা আল-আন‘আম: ৮২)। ছাহাবীগণ এ আয়াতের অর্থকে সাধারণভাবে নিয়েছিল, তবে তারা বুঝতে পারল যে, এটা একমাত্র শিরক ছাড়া সব ধরনের অন্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করে। নবী (ﷺ) বলেন: এটি শিরক ছাড়া অন্য কোন অন্যায় নয় (ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিম)।
২. আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘যখন তোমরা পৃথিবীতে সফর কর, তখন যদি শত্রুদের ভয়ে তোমরা ছালাত ছোট করতে চাও, তাতে কোন দোষ নেই’ (সূরা আন-নিসা: ১০১)। ছাহাবীগণ বুঝেছিল যে, ছালাত কছর করা শুধু শত্রুদের ভয় থেকে নির্ভরশীল। তবে নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘এটি আল্লাহর দান, তা গ্রহণ করো’।[১০]
৩. আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘তোমাদের জন্য মৃত প্রাণী এবং রক্ত হারাম করা হয়েছে’ (সূরা আল-মায়েদা: ৩)। হাদীছ বলেছে যে, উভয় ধরনের মৃত প্রাণী এবং রক্ত (যেমন মাছ এবং গ্রাহিক) নিষিদ্ধ নয়। নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘আমাদের জন্য দু’টি মৃত প্রাণী এবং দু’টি রক্ত বৈধ, তা হল মাছ ও গ্রাহিক এবং যকৃৎ ও তলপেট’।[১১]
৪. আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, আল্লাহর সুসজ্জিত সৌন্দর্য এবং পবিত্র রিযিক তো তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য উপহার দেন’ (সূরা আল-আ‘রাফ: ৩২)। তবে হাদীছ বলে যে, কিছু সৌন্দর্য নিষিদ্ধ। যেমনটি নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘পুরুষদের জন্য রেশম ও সোনা নিষিদ্ধ, তবে নারীদের জন্য বৈধ’।[১২]
আরও অনেক উদাহরণ যা হাদীছের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে এবং এসব কথা প্রকৃত আলেমসমাজ ও ফিকহবিদদের কাছে সুপরিচিত।
এখান থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, ইসলামী আইনে হাদীছের গুরুত্ব অপরিসীম। আপনি যদি উপরের উদাহরণগুলোর দিকে তাকান, তবে আপনি বুঝতে পারবেন যে, কুরআন হাদীছের সাহায্য ছাড়া সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এছাড়া, আমরা শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর রিসালাটি পড়ার জন্য পরামর্শ দিব। যে কেউ কুরআন থেকে হাদীছকে আলাদা করে বিচার করার চেষ্টা করে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নির্দেশনার বিরুদ্ধে যাচ্ছে এবং তিনি সেই ব্যক্তি যিনি নবী (ﷺ)-এর পথ ও নির্দেশনা অগ্রাহ্য করছেন। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন।
* সাবেক মুদাররিস, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী; অধ্যয়নরত, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
তথ্যসূত্র:
[১]. আল-বাহরুল মুহীত্ব, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ১১।
[২]. ই‘লামুল মুওাক্কি‘ঈন, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫০।
[৩]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৪, সনদ ছহীহ।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৬০৪; ছহীহ মুসলিম, হা/২১২৫।
[৫]. আদাব শরী‘আহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩০৭।
[৬]. আল-বাহরুল মুহীত্ব।
[৭]. আল-বাহরুল মুহীত্ব, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৭, ৮।
[৮]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৭৭।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৭৮৯; নাসাঈ, হা/৪৯২০।
[১০]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮৬।
[১১]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৭২৩; মিশকাত, হা/৪২৩২; সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১১১৮।
[১২]. নাসাঈ, হা/৫১৪৮; মিশকাত, হা/৪৩৪১, সনদ ছহীহ।