শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬, ০৩:৫৪ পূর্বাহ্ন

ইসলামে রাজনৈতিক ব্যবস্থা: একটি পর্যালোচনা 

- ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান* 


 
ভূমিকা 

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানবজীবনের সকল দিকের মত রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থাকেও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে পরিচালিত করে। ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থা ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত (শূরা) এবং আল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর মূল লক্ষ্য হলো মানবকল্যাণ নিশ্চিত করা এবং সমাজে ন্যায় ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। এই গবেষণায় ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতি ও বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা হবে, যাতে এর তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

রাজনীতির পরিচয়

‘সিয়াসাহ’ শব্দটি (سوس) ধাতু থেকে এসেছে। বলা হয়, ساس الأمر سياسة ‘সে কোন বিষয় পরিচালনা করেছে বা তা ব্যবস্থাপনা করেছে’। আবার বলা হয়, سُوس فلانٌ أمر بني فلان أي كلف سياستهم ‘অমুক ব্যক্তি অমুক গোত্রের বিষয় পরিচালনা করেছে, অর্থাৎ তাকে তাদের পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে’। আর سائس الدواب বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায়, যে পশুদের দেখাশোনা ও পরিচালনা করে। সুতরাং السياسة অর্থ হল- السياسة هي القيام على الشيء بما يصلحه ‘কোন বিষয়কে এমনভাবে পরিচালনা ও তত্ত্বাবধান করা, যা তার সংশোধন ও কল্যাণ নিশ্চিত করে’।[১]

রাজনীতির সংজ্ঞায় বুজাইরমী বলেন, ‘সিয়াসাহ হলো প্রজাদের বিষয়সমূহ সংশোধন করা এবং তাদের কার্যাবলি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা’।[২] ইবনু আবিদীন বলেন, ‘সিয়াসাহ হলো মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তিদায়ক পথের দিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে তাদের সংশোধন করা’।[৩] আব্দুল ওয়াহহাব আল-খাল্লাফ বলেন, ‘সিয়াসাহ শরইয়্যাহ তথা শরী‘আহসম্মত রাষ্ট্রনীতি হল- ইসলামী রাষ্ট্রের সাধারণ বিষয়সমূহ এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হয় এবং ক্ষতি দূর করা যায়- এমন সীমার মধ্যে থেকে, যা শরী‘আতের মৌলিক নীতিমালা ও সামগ্রিক ভিত্তিকে অতিক্রম করে না; যদিও তা মুজতাহিদ ইমামগণের মতামতের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে’।[৪] ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) ইবনু আকীলের সংজ্ঞা উদ্ধৃত করে বলেন,

السياسة ما كان فعلاً يكون معه الناس أقرب إلى الصلاح وأبعد عن الفساد ، وإن لم يضعه الرسول ولا نزل به وحي

‘সিয়াসাহ বা নীতি বা রাজনীতি হল- এমন কার্যপদ্ধতি, যার মাধ্যমে মানুষ কল্যাণের আরও নিকটবর্তী হয় এবং অকল্যাণ থেকে আরও দূরে থাকে, যদিও তা রাসূল (ﷺ) সরাসরি নির্ধারণ করেননি এবং এ বিষয়ে কোন ওহিও নাযিল হয়নি’।[৫]

ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ

ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বহু বৈশিষ্ট্যে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

১.  ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি রব্বানী তথা আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত ব্যবস্থা: আর এই রব্বানিয়াতের অর্থ হলো দু’টি। যথা:  এর উৎসও আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত এবং এর লক্ষ্যও আল্লাহর জন্য। (ক) উৎসের দিক থেকে রব্বানিয়াত (ربانية المصدر): উৎসের দিক থেকে রব্বানিয়াত বলতে বোঝানো হয়, এই ব্যবস্থার মূল উৎস মহান রব আল্লাহ তা‘আলা; তিনি এটি তাঁর কিতাবে নাযিল করেছেন। এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় তাদের জন্য আল্লাহর কঠোর সতর্কবাণী ও শাস্তির ঘোষণার মাধ্যমে, যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না (সূরা আল-মায়েদাহ: ৪৪-৪৫, ৪৭)। (খ) উদ্দেশ্যের দিক থেকে রব্বানিয়াত (ربانية الوجهة): এর অর্থ হল- মানুষ তার সকল কাজের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি কামনা করবে। অর্থাৎ একজন মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার সব কাজই হবে আল্লাহর জন্য নিবেদিত (সূরা আল-আন‘আম: ১৬২-১৬৩)।

২. বিশ্বজনীনতা (العالمية): ইসলাম ধর্ম এবং এর প্রবর্তিত বিধানসমূহের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল- এটি বিশ্বজনীনতা। এগুলো এমন বিধান, যা সময় ও স্থান- উভয় দিক থেকেই সর্বজনীন। সময়ের বিশ্বজনীনতা অর্থ হল- এসব বিধান ক্বিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর ও প্রযোজ্য থাকবে। স্থানের বিশ্বজনীনতা অর্থ হলো- পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলে এগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য। অতএব, ইসলাম সব মানুষের জন্য উপযোগী- তাদের বর্ণ, জাতি বা ভাষা যাই হোক না কেন। কুরআন ও হাদীছের বহু আয়াত ও বর্ণনায় এই বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে (সূরা আল-ক্বলম: ৫২; সূরা আল-আ‘রাফ: ১৫৮; সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৮)।[৬]

৩. ব্যাপকতা (الشمول): ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থা শুধু শাসকের প্রয়োজন বা শাসিতের প্রয়োজন- কোন এক পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এমন একটি সর্বাঙ্গীন ব্যবস্থা, যা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব দিককে অন্তর্ভুক্ত করে। এ ব্যবস্থায় শাসকের দায়িত্ব ও অধিকার যেমন নির্ধারিত হয়েছে, তেমনি শাসিতদের দায়িত্ব ও অধিকারও নির্ধারিত হয়েছে। এছাড়াও, ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যান্য জাতি ও জনগোষ্ঠীর, চাই মুসলিম হোক বা অমুসলিম- পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে হবে, তাও এই ব্যবস্থায় সুস্পষ্টভাবে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে (সূরা আল-আন‘আম: ৩৮)।

৪.  বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য (مطابقة الواقع): এই দ্বীন মানবজীবনের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রবর্তিত হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এর অর্থ তিনটি বিষয় নির্দেশ করে। যেমন: (ক) এমন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে, যা বাস্তব মানবসমাজে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব।  (খ) শাসককে একজন মানুষ হিসাবে বিবেচনা করা, যার যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তার ওপর দায়িত্বও রয়েছে; এবং তার প্রাপ্য সীমার বাইরে তাকে এমন কোন অধিকার প্রদান না করা, যা তার জন্য নির্ধারিত নয়। (গ) শাসিত জনগণকেও মানুষ হিসাবে বিবেচনা করা, যার যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তার ওপর দায়িত্বও রয়েছে; এবং তার প্রাপ্য অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত না করা।

৫. মধ্যপন্থা (الوسطية): ইসলাম তার আক্বীদায় মধ্যপন্থী, শরী‘আতে মধ্যপন্থী- অতিরঞ্জন ও অবহেলার মাঝামাঝি ভারসাম্যপূর্ণ। একইভাবে তার ব্যবস্থাপনাগুলোও মধ্যপন্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত; এর অন্তর্ভুক্ত ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও। এটি না চরম স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা, না চরম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এ কারণেই এটি মানবজাতির পরিচিত সর্বোত্তম ব্যবস্থাগুলোর একটি। আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মাহকে মধ্যপন্থী বলে বর্ণনা করেছেন (সূরা আল-বাকারাহ: ১৪৩)।

ইসলামী রাষ্ট্রের আরকান বা ভিত্তিসমূহ

ইসলামী রাষ্ট্র চারটি মূল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তা হল: (১) আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দ্বারা শাসন করা। (২) জনগণ। (৩) ভূখণ্ড (রাষ্ট্রের ভূমি বা এলাকা) এবং (৪) উলুল আমর বা কর্তৃত্বশীল নেতৃত্ব বা শাসকগণ।

ইসলামে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূলনীতি

প্রথমতঃ الشورى বা শূরা (পরামর্শ): শূরা শব্দটি شور মূল ধাতু থেকে এসেছে। বলা হয়, সে হাতের ইশারায় তাকে নির্দেশ করল (অর্থাৎ ইঙ্গিত করল), অথবা তাকে মতামত দিয়ে পরামর্শ দিল। شرت العسل বা اشترتها বলা হয়, আমি মধু সংগ্রহ করেছি। المشار বলা হয়, সেই মৌচাককে, যেখান থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। আর الشوار হল ঘরের আসবাবপত্র বা গৃহসামগ্রী। الشوار ও الشارة হল পোশাক এবং বাহ্যিক অবয়ব বা সাজসজ্জা। আর شرت الدابة شوراً অর্থাৎ আমি জন্তুটিকে প্রদর্শন করেছি বা দেখার জন্য সামনে এনেছি। শূরা (পরামর্শ) শব্দের পারিভাষিক অর্থ হল- ‘কোন বিষয়ে মতামত দিয়ে পরামর্শ করা এবং তা আলোচনা করা, যাতে কোন বিষয়ের মধ্যে সর্বোত্তম সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়’। ইসলামে শূরার অত্যন্ত মহান গুরুত্ব রয়েছে। এটি ইসলামী শাসন ব্যবস্থার একটি মূল ভিত্তি। এর গুরুত্বের কারণে আল্লাহ তা‘আলা তার নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-কে শূরার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)। ইসলামে শাসক নির্বাচনে বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ নির্ধারণে শূরার গুরুত্ব অপরিসীম। যদি কেউ মুসলিমদের পরামর্শ ছাড়া কাউকে শাসক হিসাবে অনুমোদন বা বাই‘আত দেয়, তা ইসলাম অনুমোদন করে না এবং এর ফলে গুরুতর শাস্তির বিধান রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, مَنْ بَايَعَ رَجُلًا عَلَى غَيْرِ مَشُوْرَةٍ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ فَلَا يُتَابَعُ هُوَ وَلَا الَّذِىْ بَايَعَهُ تَغِرَّةً أَنْ يُقْتَلَا ‘যে ব্যক্তি মুসলিমদের পরামর্শ বা শূরা ছাড়া কাউকে (রাজত্বের জন্য) বাই‘আত দেয়, তাহলে সে ব্যক্তি এবং যাকে সে বাই‘আত দিয়েছে উভয়কেই হত্যা করা যেতে পারে’।[৭]

দ্বিতীয়তঃ العدل আদল বা ন্যায়পরায়ণতা: ‘আদল’ বা ন্যায়পরায়ণতা হল মানুষের মধ্যে এমনভাবে বিচার করা যা ইসলামের শরী‘আাহ অনুযায়ী সত্য এবং সঠিক; বিচার কোন পক্ষপাত, আবেগ বা অনুরূপ কোন কারণে ঝোঁক বা পক্ষপাত দ্বারা প্রভাবিত হবে না। ইসলামে আদল বা ন্যায়পরায়ণতার গুণ অর্জন করা আবশ্যক আর যুলম করা হারাম। আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম শাসকদের উপর আদল প্রতিষ্ঠা ফরয করেছেন। যাকে আল্লাহ কোন বৃহৎ বা ক্ষুদ্র জনসম্প্রদায়ের দায়িত্ব দিয়েছেন, তার জন্য শাসনের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালঙ্ঘন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর’ (সূরা আন-নাহল: ৯০)। নবী (ﷺ) বলেছেন, مَا مِنْ أَمِيْرِ عَشَرَةٍ إِلَّا يُؤْتَى بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَغْلُوْلًا لَا يَفُكُّهُ إِلَّا الْعَدْلُ أَوْ يُوْبِقُهُ الْجَوْرُ ‘যে কোন আমীর (শাসক) দশজন মানুষের শাসক হোক, ক্বিয়ামতের দিনে তাকে আলাদা করে আনা হবে। তার শৃঙ্খল কেবল আদল দ্বারা মুক্ত হবে, অন্যথা যদি সে অন্যায় বা পক্ষপাতিত্ব করে, তাহলে সে শাস্তি ভোগ করবে’।[৮]

তৃতীয়তঃ المساواة বা সমতা: সমতা (المساواة) শব্দের ভাষাগত অর্থ হল- سويت বা ساويت থেকে এসেছে। السواء মানে হল ন্যায় বা সমানতা। যেমন বলা হয়, ساويت بينهما বা سويت بينهما যার অর্থ হল- ‘আমি তাদের মধ্যে ন্যায় করেছি’ বা ‘সমতা প্রতিষ্ঠা করেছি’।[৯] ইসলামে নীতি হল- সকল মানুষের প্রতি ন্যায়পরায়ণ ও সমান আচরণ করা, যাতে কেউ বিশেষ জাতি, গোত্র, দেশ, অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থার কারণে অন্যদের চেয়ে উঁচু বা নিম্ন না থাকে। সমতা ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক নীতি। এই ব্যবস্থার ভিত্তি হল- মানুষের মধ্যে অধিকার ও কর্তব্যে সমতা প্রতিষ্ঠা, যা লিঙ্গ, বর্ণ, গোত্র বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে কোন বৈষম্য করবে না- যে বৈশিষ্ট্যগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণে নয়- অথবা যা তিনি এই দুনিয়ার সম্পদ, ধন-সম্পদ বা পদপদবী থেকে অর্জন করেছে। কুরআনুল কারীম এই নীতিকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার’ (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)। উল্লেখ্য, মানুষের মধ্যে সমতার মূল কারণ হল- আল্লাহ তা‘আলা সবাইকে একই মূল থেকে সৃষ্টি করেছেন, পুরুষ ও নারী থেকে; তাই সকল মানুষ আদম (আলাইহিস সালাম) ও হাওয়া থেকে উদ্ভূত।

ইসলামে মানুষের মধ্যে সমতা মানে হল- সব বিষয়ে সমতা নয়। বরং কিছু নির্দিষ্ট ভিত্তিতে মানুষদের মধ্যে পার্থক্য ও মর্যাদা নির্ধারিত হয়, যা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রতিপাদিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ:

১. تقوى বা আল্লাহভীতি অনুযায়ী পার্থক্য: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদা সম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী’ (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)।

২. জ্ঞান  অনুযায়ী পার্থক্য: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?’ (সূরা আয-যুমার: ৯)।

৩. ভালো কাজে এগিয়ে থাকার ভিত্তিতে পার্থক্য: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিজয়লাভের আগে (পূর্বে) ব্যয় করেছে এবং লড়াই করেছে, তারা যারা পরে ব্যয় করেছে এবং লড়াই করেছে তাদের সমান নয়; আর আল্লাহ উভয়কে সেরা প্রতিদান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ যা কিছু তোমরা কর, তাতে পূর্ণভাবে অবগত’ (সূরা আল-হাদীদ: ১০)।

৪. সদাচরণ অনুযায়ী পার্থক্য: আব্দুল্লাহ ইবনু আ‘মর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘নবী (ﷺ) কোনভাবেই অশ্লীল বা কটু ভাষী ছিলেন না এবং তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে যাদের নৈতিক চরিত্র সেরা, তারাই আল্লাহর কাছে প্রিয়’।[১০] অর্থাৎ, সদাচরণ ও নৈতিকতার ভিত্তিতেই মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয়।

৫. কুরআন শেখা ও শেখানোর ভিত্তিতে পার্থক্য: উছমান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেরা মানুষ হল যারা কুরআন শিখে এবং শেখায়’।[১১]

এছাড়া ইসলামের অন্যান্য বিষয়ের আলোচনা লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, মানুষের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের জন্য দুনিয়ার সম্পদ, পদপদবী বা সামাজিক অবস্থার ওপর কোন ভিত্তি নেই। বরং সব পার্থক্য ধর্মীয় কাজ, নৈতিক চরিত্র, জ্ঞান ও আল্লাহর পথে সৎ প্রচেষ্টা এর ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য নির্ধারণ হয় মানুষের দ্বারা অর্জিত ধর্মীয় কাজের মাধ্যমে।

চতুর্থতঃ الحرية বা স্বাধীনতা: ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ‘স্বাধীনতা’ বলতে বোঝায়, মানুষের এমন কোন বাঁধন থেকে মুক্ত থাকা, যা তার কাজ-কর্মে অবৈধ সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।

ইসলামে স্বাধীনতার প্রকৃতি

ইসলামের শত্রুরা ইসলামের প্রতি অভিযোগ এনেছিল যে, ইসলাম মানুষকে স্বাধীনতা দেয় না; এটি মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা এবং অন্যান্য কাজ-কর্মে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। এই অভিযোগ কেবল অমুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং কিছু মুসলিম সন্তানরাও যারা ইসলামের মাধুর্য্য স্বাদ গ্রহণ করেনি বা তাদের ধর্মের সঠিক জ্ঞান ছিল না, তারা এই ভুল ধারণায় ছিল। ফলে তারা ইসলামের কিছু শিক্ষাকে ত্যাগ করার চেষ্টা করেছিল, স্বাধীনতার খোঁজে এই ধর্মীয় বিধান থেকে বিচ্যুত হওয়ার নাম করে। প্রকৃতপক্ষে, ইসলামই মানুষের জন্য যথার্থ স্বাধীনতা এনেছে, যা অন্য কোন রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যবস্থা দিতে পারে না। অন্য ব্যবস্থাগুলো নিজেদেরকে স্বাধীনতার প্রবর্তক বলে দাবি করলেও, তারা বাস্তবে জনগণের উপর গুরুত্বপূর্ণ বাঁধন আরোপ করেছে, তা মানুষ অনুভব করুক বা না করুক। ইসলামে স্বাধীনতা বিভিন্ন দিক থেকে প্রকাশ পায়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হল:

(১) আল্লাহর ইবাদতের স্বাধীনতা (حرية العبودية لله): পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষেরই এমন এক সত্তা থাকে, যাকে সে ইবাদত করে। মানুষ বিভিন্ন যুগে এবং বিভিন্ন স্থানে নানান উপাস্যের ইবাদত করেছে। কেউ পাথরের পূজা করেছে, কেউ গাছের, কেউ সূর্য ও চাঁদের, কেউ নক্ষত্রের, কেউ ফেরেশতাদের- এভাবে অসংখ্য উপাস্যকে মানুষ উপাসনা করেছে, যাদের সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। অথচ এসব উপাস্য নিজেদের কোন উপকারই করতে পারে না, অন্যদের উপকার তো দূরের কথা। এমনকি যে ব্যক্তি দাবি করে যে, সে কিছুরই উপাসনা করে না- বাস্তবে সে তার নিজের প্রবৃত্তির উপাসনা করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اَفَرَءَیۡتَ مَنِ اتَّخَذَ  اِلٰـہَہٗ  ہَوٰىہُ وَ اَضَلَّہُ  اللّٰہُ  عَلٰی  عِلۡمٍ  وَّ خَتَمَ عَلٰی سَمۡعِہٖ وَ قَلۡبِہٖ وَ جَعَلَ عَلٰی بَصَرِہٖ  غِشٰوَۃً ؕ فَمَنۡ یَّہۡدِیۡہِ  مِنۡۢ  بَعۡدِ اللّٰہِ ؕ اَفَلَا  تَذَکَّرُوۡنَ

‘তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের মা‘বূদ বানিয়ে নিয়েছে? আল্লাহ জেনে শুনেই তাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং তার কর্ণ ও হৃদয়ে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তার চক্ষুর উপর রেখেছেন আবরণ। অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে হিদায়াত করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?’ (সূরা আল-জাছিয়া: ২৩)। এছাড়া, যে ব্যক্তি দাবি করে যে সে কিছুই উপাসনা করে না অথবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর উপাসনা করে- সে প্রকৃতপক্ষে শয়তানেরও উপাসনা করে। কারণ সে এতে শয়তানের আনুগত্য করেছে। এই কারণেই ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর পিতাকে এভাবে বলেছিলেন, যেমন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বক্তব্য বর্ণনা করেছেন,

یٰۤاَبَتِ لَا تَعۡبُدِ الشَّیۡطٰنَ ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ  کَانَ  لِلرَّحۡمٰنِ عَصِیًّا

‘হে আমার পিতা! শয়তানের ইবাদত কর না। শয়তান দয়াময়ের অবাধ্য’ (সূরা মারইয়াম: ৪৪)। অর্থাৎ, এসব মূর্তির উপাসনায় শয়তানের আনুগত্য করো না।[১২] শয়তানের আনুগত্যই শয়তানের ইবাদত। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اَلَمۡ  اَعۡہَدۡ  اِلَیۡکُمۡ یٰبَنِیۡۤ  اٰدَمَ اَنۡ  لَّا تَعۡبُدُوا الشَّیۡطٰنَ ۚ اِنَّہٗ  لَکُمۡ  عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ‘হে বানী আদম! আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ  দিইনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত কর না, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শক্র’ (সূরা ইয়াসিন: ৬০)। অর্থাৎ আমার অবাধ্যতায় তাকে অনুসরণ করো না।[১৩] এছাড়াও, আধুনিক যুগে এমন কিছু মানুষ রয়েছে যারা প্রকাশ্যভাবে শয়তানের উপাসনা করে, যারা ‘শয়তানপূজারী’ নামে পরিচিত। ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘নুনিয়্যা’ কাব্যে কত সুন্দরই না বলেছেন,

هربوا من الرق الذي خلقوا له *وبلوا برق لانفس والشيطان

‘তারা সেই দাসত্ব থেকে পালিয়ে গেল, যার জন্য তাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল কিন্তু তারা নিজেদের প্রবৃত্তি ও শয়তানের দাসত্বে বন্দী হয়ে গেল’।[১৪]

ইসলাম এসেছে আল্লাহ ছাড়া যেসব কিছুর ইবাদত করা হয়, সবকিছুকে অস্বীকার করে এবং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতকে প্রতিষ্ঠিত করতে। ইসলাম এমন সত্তার ইবাদত প্রতিষ্ঠা করেছে, যার হাতে উপকার ও অপকারের ক্ষমতা, যিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান, যিনি চোখের গোপন চাহনি এবং অন্তরের গোপন বিষয় জানেন। ইসলাম এমন সত্তার ইবাদত প্রতিষ্ঠা করেছে যার ইবাদত মানুষের জন্য উপকারী। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اِنَّمَا تَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ  اَوۡثَانًا وَّ تَخۡلُقُوۡنَ  اِفۡکًا ؕ اِنَّ الَّذِیۡنَ تَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ لَا یَمۡلِکُوۡنَ لَکُمۡ رِزۡقًا فَابۡتَغُوۡا عِنۡدَ اللّٰہِ الرِّزۡقَ وَ اعۡبُدُوۡہُ وَ اشۡکُرُوۡا لَہٗ ؕ  اِلَیۡہِ تُرۡجَعُوۡنَ

‘তোমরা তো আল্লাহ ব্যতীত শুধু মূর্তিপূজা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের পূজা কর তারা তোমাদের রুযীর মালিক নয়। সুতরাং তোমরা রুযী কামনা কর আল্লাহর কিনট এবং তাঁরই ইবাদত কর ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে’ (সূরা আল-‘আনকাবূত: ১৭); তাহলে দাসত্বের স্বাধীনতা কার জন্য? যে নিজেকে এমন কিছুর উপাসনায় বেঁধে রাখে, যা তার কোন উপকার বা অপকারের মালিক নয়- তার জন্য, না-কি সেই ব্যক্তির জন্য, যে নিজের প্রবৃত্তির দাস হয়ে গেছে? না, প্রকৃত স্বাধীনতা তো একমাত্র আল্লাহর ইবাদতে- যিনি ইবাদতের প্রকৃত যোগ্য।

ইসলামে দাসত্বের স্বাধীনতা এই অর্থে নয় যে, মানুষ যা খুশি উপাসনা করবে, অথবা এই ধর্মের দাওয়াত ও আল্লাহর পথে জিহাদ থেকে বিরত থাকবে এই বলে যে- لَاۤ اِکۡرَاہَ فِی الدِّیۡنِ ‘ধর্মের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৫৬)। কোন মুফাসসির এ অর্থ গ্রহণ করেননি। বরং এ আয়াত সম্পর্কে বিভিন্ন মত এসেছে, যেমন: ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, এটি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল, যখন যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হয়নি। পরে ‘আয়াতুস সাইফ’ (যুদ্ধের আয়াত) দ্বারা তা রহিত হয়েছে।[১৫] ক্বাতাদা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এটি আহলে কিতাবদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে- যদি তারা জিযিয়া গ্রহণ করে, তাদের সঙ্গে যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা ইসলাম গ্রহণ করে অথবা জিযিয়া প্রদান করে। যারা জিযিয়া দেয়, তাদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হবে না’।[১৬] ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কাউকে ইসলামে প্রবেশ করতে বাধ্য করো না। কারণ ইসলাম স্পষ্ট, তার দলীল-প্রমাণ সুস্পষ্ট- এতে কাউকে জোর করার প্রয়োজন নেই’।[১৭]

ইবনু সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) لَاۤ اِکۡرَاہَ فِی الدِّیۡنِ ‘ধর্মের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই’- এই আয়াত এবং মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বানকারী আয়াতগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে বলেন, ‘এটি ইসলামী দ্বীনের পরিপূর্ণতার প্রমাণ। কারণ এর দলীল-প্রমাণ পূর্ণ, নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্ট এবং এটি বুদ্ধি ও জ্ঞানের দ্বীন, স্বভাবজাত প্রবৃত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দ্বীন, প্রজ্ঞার দ্বীন, কল্যাণ ও সংস্কারের দ্বীন, সত্য ও সঠিক পথের দ্বীন। এই পরিপূর্ণতা এবং মানবস্বভাবের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতার কারণে এতে প্রবেশ করাতে জবরদস্তির প্রয়োজন হয় না। কারণ জোর-জবরদস্তি সাধারণত সেই বিষয়ে করা হয়, যা মানুষের অন্তর অপসন্দ করে, যা সত্য ও বাস্তবতার বিরোধী, অথবা যার প্রমাণ ও নিদর্শন অস্পষ্ট। অতএব, যার কাছে এই দ্বীন পৌঁছায়, তারপরও সে যদি তা প্রত্যাখ্যান করে এবং গ্রহণ না করে, তবে তা তার জেদের কারণেই। কারণ সঠিক পথ ভ্রান্ত পথ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে। তাই কেউ যদি এটিকে প্রত্যাখ্যান করে ও গ্রহণ না করে, তবে তার জন্য আর কোন অজুহাত বা প্রমাণ অবশিষ্ট থাকে না। এই অর্থের সঙ্গে জিহাদ ফরয হওয়ার বহু আয়াতের কোন বিরোধ নেই। কেননা আল্লাহ যুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছেন- যাতে দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ধর্মের ওপর আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করা যায়। মুসলিমদের মধ্যে এ ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে যে, জিহাদ নেককার ও পাপী- উভয়ের সঙ্গেই অব্যাহত থাকবে এবং এটি একটি স্থায়ী ফরয। জিহাদ কথা ও কাজ- উভয়ভাবেই সংঘটিত হয়। অতএব, যারা মনে করেন যে, এই আয়াত জিহাদের আয়াতগুলোর বিরোধী এবং তাই এটিকে রহিত (মানসূখ) বলা উচিত- তাদের এ বক্তব্য শব্দগত ও অর্থগত উভয় দিক থেকেই দুর্বল। যে ব্যক্তি গভীরভাবে এই মহান আয়াত নিয়ে চিন্তা করবে, তার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে’।[১৮]

ইবাদতের স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে, কোন মুসলিম তার ধর্ম ত্যাগ করতে পারবে। বরং যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম থেকে ফিরে যায় (মুরতাদ হয়), তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এ বিষয়টি রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। ছহীহ বুখারীতে ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ‘আমি যদি তাদের স্থানে থাকতাম, তবে আমি তাদের আগুনে পোড়াতাম না; কারণ মুহাম্মদ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর শাস্তি দ্বারা শাস্তি দিও না’। বরং আমি তাদের হত্যা করতাম, যেমন নবী (ﷺ) বলেছেন, مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ ‘যে ব্যক্তি তার ধর্ম পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা কর’।[১৯]

(২) উত্তম চরিত্রের স্বাধীনতা (حرية الخلق الكريم)

ইসলাম এমন স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করে না, যা একজনের জন্য অন্যজনের ক্ষতির কারণ হয়, কিংবা একজনের স্বাধীনতা অন্যদের স্বাধীনতা নষ্ট করে। বরং ইসলাম ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সমাজের সামষ্টিক স্বাধীনতার পরিসরের মধ্যেই নিশ্চিত করে। তাই ইসলাম উত্তম নৈতিকতা ও সুন্দর আচরণ নিয়ে এসেছে, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করে। উদাহরণস্বরূপ, ইসলাম মিথ্যা বলা, গীবত, অপবাদ রটানো, গালি দেয়া, কষ্ট দেয়া এবং কথা ও কাজে অশ্লীলতা- এসবকে হারাম করেছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُ بِالۡعَدۡلِ وَ الۡاِحۡسَانِ وَ اِیۡتَآیِٔ ذِی الۡقُرۡبٰی وَ یَنۡہٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ  وَ الۡمُنۡکَرِ وَ الۡبَغۡیِ ۚ یَعِظُکُمۡ   لَعَلَّکُمۡ   تَذَکَّرُوۡنَ

‘নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়, সৎকর্ম এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর’ (সূরা আন-নাহল: ৯০)। এসব বিধানের মাধ্যমে অন্যদের স্বাধীনতা ও মর্যাদা সংরক্ষিত হয়। আর যারা মনে করে ইসলাম নৈতিকতা থেকে মুক্ত হওয়াই স্বাধীনতা- তারা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার শত্রু। কারণ তারা মানুষকে শয়তান ও প্রবৃত্তির বন্ধনে পতিত হতে আহ্বান করে। তদুপরি, তারা এমন স্বাধীনতা চায় যা কিছু মানুষের জন্য, কিন্তু অন্যদের অধিকার ও স্বাধীনতার ক্ষতির বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়।

(৩) সঠিক লেনদেনের স্বাধীনতা (حرية التعامل السليم)

মানুষের পারস্পরিক লেনদেন- যেমন ক্রয়-বিক্রয়, নেয়া-দেয়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে ইসলাম উভয় পক্ষের জন্য স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার মধ্যে প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা, ধোঁকাবাজি বা অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ ভোগ করার সুযোগ নেই- যেমন সূদ, জুয়া বা শরী‘আতে নিষিদ্ধ অন্যান্য লেনদেনের মাধ্যমে সম্পদ গ্রহণ করা হারাম। এটাও স্বাধীনতা নয় যে, একজন মানুষ অন্যদের সঙ্গে এমনভাবে লেনদেন করবে যাতে তাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ হয়- নিজের ব্যক্তিগত লাভ বা স্বার্থ অর্জনের জন্য। যদিও কিছু মানবপ্রণীত ব্যবস্থায় এটিকে লেনদেনের স্বাধীনতা হিসাবে গণ্য করা হতে পারে, ইসলামে তা গ্রহণযোগ্য নয়।

(৪) সম্পত্তির মালিকানার স্বাধীনতা (حرية التملك)

ইসলাম ব্যক্তি মানুষের জন্য সম্পত্তির মালিকানার স্বাধীনতা প্রদান করেছে, চাই সে পুরুষ হোক বা নারী, ছোট হোক বা বড়। নারীর সম্পত্তির অধিকার পুরুষের মতই। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলার বাণী প্রমাণ বহন করে। তিনি বলেন, لِلرِّجَالِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا اکۡتَسَبُوۡا ؕ وَ لِلنِّسَآءِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا اکۡتَسَبۡنَ ‘পুরুষদের জন্য তাদের অর্জিত সম্পদের অংশ রয়েছে, আর নারীদের জন্যও তাদের অর্জিত সম্পদের অংশ রয়েছে’ (সূরা আন-নিসা: ৩২)। ছোটদের (অপ্রাপ্তবয়স্কদের) সম্পত্তির অধিকার প্রমাণ করে আল্লাহ তা‘আলার এ বাণী,

اِنَّ الَّذِیۡنَ یَاۡکُلُوۡنَ اَمۡوَالَ الۡیَتٰمٰی ظُلۡمًا اِنَّمَا یَاۡکُلُوۡنَ فِیۡ بُطُوۡنِہِمۡ نَارًا ؕ وَ سَیَصۡلَوۡنَ  سَعِیۡرًا

‘যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমদের সম্পদ ভোগ করে, তারা আসলে নিজেদের পেটে আগুন ভরে নিচ্ছে এবং তারা অচিরেই জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে’ (সূরা আন-নিসা: ১০)। ইয়াতীম তো ছোটই হয়; তবুও আল্লাহ তা‘আলা তার সম্পত্তির মালিকানা স্বীকার করেছেন এবং অন্যায়ভাবে তার সম্পদ ভোগ করা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তাকে তার সম্পদে ইচ্ছামত স্বাধীনভাবে ব্যয় করতে দেয়া হবে। বরং তার সম্পদ রক্ষার জন্য বিচারকের পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক নিযুক্ত করা হয়, যতক্ষণ না সে পরিপক্ব ও বিচক্ষণ হয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَاِنۡ اٰنَسۡتُمۡ مِّنۡہُمۡ رُشۡدًا فَادۡفَعُوۡۤا اِلَیۡہِمۡ اَمۡوَالَہُمۡ ‘অতঃপর যখন তোমরা তাদের মধ্যে প্রজ্ঞা ও পরিপক্বতা দেখতে পাবে, তখন তাদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দাও’ (সূরা আন-নিসা: ৬)। এভাবে তাদের সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে সংরক্ষণ করা হয়।

(৫) চিন্তার স্বাধীনতা (حرية التفكير)

ইসলাম চিন্তার স্বাধীনতা দিয়েছে; বরং মানুষকে চিন্তা-ভাবনা করতে উৎসাহিত করেছে। কারণ এতে মানুষের উপকার রয়েছে। এর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ তা‘আলার নে‘মতসমূহ সম্পর্কে জানতে পারে এবং তাঁর ক্ষমতা ও মহিমা উপলব্ধি করতে পারে, যা মানুষকে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা উপলব্ধি করে তাঁকে মহান মনে করতে উদ্বুদ্ধ করে। পবিত্র কুরআনে চিন্তা-ভাবনার আহ্বান জানিয়ে বহু আয়াত এসেছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ ہُوَ الَّذِیۡ مَدَّ الۡاَرۡضَ وَ جَعَلَ  فِیۡہَا رَوَاسِیَ وَ اَنۡہٰرًا ؕ وَ مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ جَعَلَ فِیۡہَا زَوۡجَیۡنِ اثۡنَیۡنِ یُغۡشِی الَّیۡلَ النَّہَارَ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ  یَّتَفَکَّرُوۡنَ

 ‘আর তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন, তাতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা ও নদীসমূহ; এবং প্রত্যেক ফলের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন দু’ধরনের জোড়া। তিনি রাত দ্বারা দিনকে আচ্ছাদিত করেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে’ (সূরা আর-রা‘দ: ৩)। অন্যত্র তিনি বলেন,

اَفَلَا یَنۡظُرُوۡنَ  اِلَی الۡاِبِلِ کَیۡفَ خُلِقَتۡ -  وَ  اِلَی السَّمَآءِ کَیۡفَ رُفِعَتۡ- وَ  اِلَی الۡجِبَالِ کَیۡفَ نُصِبَتۡ-وَ  اِلَی الۡاَرۡضِ کَیۡفَ سُطِحَتۡ.

‘তারা কি উটের দিকে তাকিয়ে দেখে না- কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে? আর আকাশের দিকে- কীভাবে তা উঁচু করা হয়েছে? আর পাহাড়ের দিকে- কীভাবে তা স্থাপন করা হয়েছে? আর পৃথিবীর দিকে- কীভাবে তা বিস্তৃত করা হয়েছে?’ (সূরা আল-গাশিয়াহ: ১৭-২০)।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানবজীবনের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য ন্যায়, ভারসাম্য ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ শাসনব্যবস্থা। এটি ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের অধিকার সংরক্ষণ করে এবং নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। অতএব, ইসলামী রাজনৈতিক নীতিমালা শুধু তাত্ত্বিক ধারণা নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের জন্য একটি কার্যকর ও অর্থবহ দিকনির্দেশনা প্রদান করে।


তথ্যসূত্র :
[১]. মুহাম্মাদ ইবনু মুকাররম ইবনু আলী আল-ইফরীকী, লিসানুল আরব, ৬ষ্ঠ খণ্ড (বৈরূত: দারু সাদর, ৩য় সংস্করণ, ১৪১৪ হি.), পৃ. ১০৮।
[২]. ইবনু নুজাইম, আল-বাহরুর রায়িক, ৫ম খণ্ড (কায়রো: ১৩১১ হি.), পৃ. ৭৬।
[৩]. ইবনু আবিদীন, হাশিয়া রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৪র্থ খণ্ড (বৈরূত: দারুল ফিকর, ১৩৯৬ হি.), পৃ. ১৫।
[৪]. আস-সিয়াসাহ আশ-শারঈয়্যাহ, পৃ. ১৭।
[৫]. ইবনুল কাইয়িম, আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ ফিস সিয়াসাতিশ শার‘ঈয়্যাহ, পৃ. ১৯-২০।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৫২১।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৩০।
[৮]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৫৭০; দারেমী, হা/২৫১৫, সনদ ছহীহ।
[৯]. আল-জাওহারী, আছ-ছিহ্হাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৩৩৮৪-৩৩৮৫।
[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৫৫৯।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০২৭; আবূ দাঊদ, হা/১৪৫২।
[১২]. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১২৪।
[১৩]. ইমাম কুরতুবী, আল-জামিঊ লি আহকামিল কুরআন, ১৫শ খণ্ড, পৃ. ৩২।
[১৪]. শাইখ মুহাম্মাদ খালীল হাররাস, আল-কাসীদাতুন নূনিয়্যাহ আল-মাতবূ‘আহ মা‘আ শারহিহা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৩২।
[১৫]. আবূ বকর আল-জাযাইরী, আইসারুত তাফাসীর লি কালামিল ‘আলিয়্যিল কাবীর, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৪৭, টীকা-২ দ্র.।
[১৬]. ইমাম বাগাভী, মা‘আলিমুত তানযীল ফী তাফসীরিল কুরআন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫০।
[১৭]. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৮২।
[১৮]. তাইসীরুল কারীরিম রহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান, পৃ. ৯৫৪।
[১৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৩০১৭; আবূ দাঊদ, হা/৪৩৫১।




বাউল মতবাদ (শেষ কিস্তি) - গোলাম রহমান
অল্পে তুষ্ট - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
বাংলাদেশে সমকামিতার গতি-প্রকৃতি : ভয়াবহতা, শাস্তি ও পরিত্রাণের উপায় অনুসন্ধান - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
আল-কুরআন তেলাওয়াতের আদব - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
শিক্ষাদানে নববী পদ্ধতি ও কৌশল - হাসিবুর রহমান বুখারী
স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের আলোকে ছিয়াম সাধনা - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা (৩য় কিস্তি) - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
সুন্নাতের আলো বিদ‘আতের অন্ধকার - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
ইসলামে রোগ ও আরোগ্য (৩য় কিস্তি) - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
মসজিদ: ইসলামী সমাজের প্রাণকেন্দ্র (২য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
আধুনিক যুগে দাওয়াতী কাজের পদ্ধতি (শেষ কিস্তি) - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ