বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন

তরুণদের বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে সতর্ক করা 

-মুহাম্মাদ ইবনু নাছির আল-উরাইনি (রাহিমাহুল্লাহ) 
-অনুবাদ : মাসউদুর রহমান* 


(৪র্থ কিস্তি)  

বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি 

একটি দেশের জনসংখ্যার কিছু ব্যক্তি, বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজ তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। নারী পুরুষ এবং শিশুরা বিভিন্ন স্থান ও জনসমাবেশে একত্রিত হয়ে, বিশাল মিছিল বের করে। অতঃপর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী তাদের কণ্ঠস্বর ও স্লোগানগুলো ভিন্নমুখী ও পরস্পরবিরোধী হয়ে ওঠে। তারা পরিবর্তন, সংস্কার, গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা দাবি করে। তাদের এই দাবিগুলো ইসলাম অনুমোদন করে না, কারণ এর মধ্যে থাকা মহা ক্ষতিকর  দিকগুলো সকলের কাছে স্পষ্ট এবং দুনিয়াতে এর প্রমাণ অহরহ। শরী‘আতের মূলনীতি হল : কল্যাণ অর্জনের চেয়ে মন্দ প্রতিরোধ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতীত, বর্তমান উভয় যুগে বিক্ষোভ সম্পর্কে ক্ষতি ও অনিষ্ট ছাড়া  আর কিছুই জানা যায় না।

অবস্থান কর্মসূচি হল, কোনো একটি নির্দিষ্ট মাঠ, সরকারি ভবনের সামনে বা অন্য কোথাও, ব্যক্তিগত বা জনসাধারণের বিষয়ে দাবি জানানো এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত স্থান ত্যাগ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া।

এই দাবিগুলো হতে পারে অবৈধ, অথবা বর্তমান সময়ে তা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব এবং এর পরিণতি চিন্তা করে  শাসকগোষ্ঠী জোরপূর্বক তা বানচাল করতে বাধ্য হন।  পাশাপাশি এই বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসুচি শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা  তারা অবাধ্যতা ঔদ্বত্যপূর্ণ আচরণ করে, যা দেশে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। খুঁটি বা স্তম্ভ ছাড়া যেমন ঘর তৈরি করা যায় না। ঠিক খুঁটির সুরক্ষা না থাকলেও কোন স্তম্ভ বা খুঁটি  টিকতে পারে না। এমনিভাবে নেতা ছাড়া যেমন জনগণ শৃঙ্খলায় থাকতে পারে না। একই ভাবে অজ্ঞরা যখন তাদের (নেতাদের)   শাসন করে, তখন নেতা ও টিকতে পারে না।

বর্তমান সময়ে সংঘটিত ফিতনার মধ্য হতে সব চেয়ে বড় ফিতনা হলো, এক বা একাধিক কারণে বিক্ষোভ এবং অবস্থান কর্মসূচি, যার শেষ পরিণতি এবং মন্দ দিকগুলি বিবেচনা করা হয় না।

এই সমস্যাগুলো চেনা জানা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে অথবা অপরিচিত কারো মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার জন্য করা হয়ে থাকে। এটাও বাস্তব যে, কখনো কখনো শাসকের যুলম, অত্যাচার ও সীমালঙ্ঘনের কারণে এগুলো হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ইসলামী বিধি-বিধান প্রয়োগ করা যরূরী। কেননা হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন ‘তোমরা জনগণ যেমন হবে, তোমাদের শাসক ও তেমনই হবে’।[১]

ইবনু উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, যদিও এই আছারে দুর্বলতা রয়েছে তবে সেটাকে শক্তিশালী করে মহান আল্লাহ তা‘আলার এই কথাটি, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ  کَذٰلِکَ نُوَلِّیۡ بَعۡضَ الظّٰلِمِیۡنَ بَعۡضًۢا بِمَا کَانُوۡا یَکۡسِبُوۡنَ ‘এমনিভাবেই আমি যালিমদেরকে (কাফিরদেরকে) তাদের কৃতকর্মের ফলে পরস্পরকে পরস্পরের উপর প্রভাবশালী ও কর্তৃত্বশালী বানিয়ে দিব’ (সূরা আল-আন‘আম : ১২৯)।

অন্যায় অত্যাচারের মোকাবিলা সব সময় তরবারি দিয়ে করা যায় না। বরং তাওবা, ক্ষমা প্রার্থনা এবং শাসকদের হেদায়েতের জন্য প্রার্থনা করার মাধ্যমেও করা যায়, যেমনটি আলেমরা বলেছেন। বিশেষ করে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

‘এই ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মত হল, তারা ইমামদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং তরবারি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা মর্মে বিশ্বাসী নয়, যদিও তারা অন্যায় করে। যা নবী (ﷺ) থেকে একাধিক ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। কেননা যুদ্ধ বিগ্রহ ছাড়া শাসকের শুধু যুলমের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্নীতি হয়, তার চেয়ে  অধিক পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্নীতি হয় শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিগ্রহ ও আন্দোলন করার মাধ্যমে। সুতরাং দুটি ক্ষতির মধ্য হতে ছোটটিকে মেনে নেয়ার মাধ্যমে বৃহত্তর ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকাই শ্রেয়। সাধারণত এমনই হয় যে, যখন কোন একটি দল শাসকের (সরকারের) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তখন দেখা যায়, তাদের সেই বিদ্রোহের ফলে যে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তা উক্ত অন্যায় ও অনাচারের চেয়েও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে, যা দূর করার জন্য তারা বিদ্রোহ করেছিল’।[২]

বিক্ষোভ মিছিল একটি বড় অনিষ্ঠ ও খারাপ বিষয়, যা ইসলামী বিধান ও বিবেক কোনটাই স্বীকৃতি দেয় না, পাশাপাশি এটা শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসাবে বিবেচিত হয়। আর শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ একটি মহাপাপ। কারণ এর ফলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, শত্রুদের হস্তক্ষেপ, অর্থ- সম্পদ নষ্ট, যুলম-অত্যাচার করা এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের ভয় দেখানো এবং দাঙ্গা হাঙ্গামা ও রক্তপাত ঘটে। শিরকের পরে উক্ত কর্মকাণ্ডগুলোই হল সবচেয়ে বড় অপরাধ। এমনকি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ-মিছিলগুলো মন্দের সূচনা বলে সাব্যস্ত করা হয়ে থাকে।

দুর্ভাগ্যবশত আমাদের মধ্য হতে যারা এ সকল কর্মকান্ডে আহ্বান করে থাকে, আমরাও তাদের ডাকে সাড়া দিতে শুরু করেছি । সুতরাং এ বিষয়ে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত । কেননা বাড়াবাড়ি- বিক্ষোভ ইত্যাদি প্রতিরোধ করার চেয়ে এর মূলনীতি ও মূলউৎস গুলো প্রতিরোধ করা যরূরী।

এই বিক্ষোভ মিছিলগুলো শান্তিপূর্ণ হলেও এর মধ্যে থাকা কতিপয় বিষয়ের কারণে তা নাজায়েজ সাব্যস্ত হয়। যেমন প্রকাশ্যে শাসকের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা ঘোষণা করা, যা সশস্ত্র যুদ্ধ, বিদ্রোহের দিকে পরিচালিত করে। যেমনটি বর্তমানে অনেক জায়গা বা দেশে দেখা যাচ্ছে।  ইমাম আব্দুল আযীয বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি নারী-পুরুষের বিক্ষোভকে নিরাময়- প্রতিষেধক হিসেবে দেখি না, বরং আমি এগুলোকে প্রলোভন ও মন্দের কারণ এবং কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে অপর কিছু ব্যক্তির প্রতি যুলম-অত্যাচার হিসেবে দেখি। তবে, প্রতিবাদের বৈধ উপায় হল চিঠিপত্র, উপদেশ এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে কল্যাণের দিকে আহ্বান, যে পদ্ধতি সুন্দরভাবে অনুসরণ করেছেন আলেমরা, নবী (ﷺ)-এর ছাহাবীরা এবং তাদের  অনুসারীরা। আর তা হল শাসক ও সুলতানের সাথে চিঠিপত্র এবং মৌখিক যোগাযোগের মাধ্যমে, তার সাথে যোগাযোগ করা, তাকে পরামর্শ দেওয়া। পাশাপাশি মেম্বারে উঠে বা যেকোনো জায়গায় লেখালেখি করার মাধ্যমে  শাসকের কোন অন্যায় বা ভুল কাজের জন্য জনসম্মুখে তাকে অপমান না করা’।

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমাদের কর্তব্য হলো যতটা সম্ভব উপদেশ দেওয়া। পক্ষান্তরে সংঘর্ষ এবং ভাঙচুর করে প্রতিবাদ করা এটা সালাফদের মানহাজ তথা পদ্ধতির পরিপন্থী। আপনারা জানেন যে, এই বিষয়গুলোর সাথে ইসলামি শরী‘আতের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা বিক্ষোভ, অবস্থান কর্মসূচি এবং অনুরূপ বিষয়গুলিকে মোটেও সমর্থন করি না। কেননা এগুলি ছাড়াই সংস্কার সম্ভব, তবে অভ্যন্তরীণ বা বহিরাগত কিছু গোপন শক্তি এই জিনিসগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে’ (সূত্র : আব্দুল মালিক আল-রামদানীর আলজেরিয়ায় রক্তপাত সম্পর্কে সিনিয়র পণ্ডিতদের ফাতাওয়া)।

ছালেহ আল-ফাওজান বলেছেন, ‘আমাদের ধর্ম, বিশৃঙ্খলার ধর্ম নয়;  বরং এটা শৃঙ্খলা এবং প্রশান্তির ধর্ম। বিক্ষোভ মুসলমানদের কর্মকাণ্ড নয় এবং তারা এগুলি সম্পর্কে অবগতও ছিল না। ইসলাম শান্তি ও করুণার ধর্ম; কোনও বিশৃঙ্খলা নেই, কোনও অশান্তি নেই এবং রাষ্ট্রদ্রোহের কোনও প্ররোচনা নেই। এটা ইসলামের বিধান। বৈধ উপায়ে অধিকার অর্জন করতে হয়, এই ধরণের পদ্ধতির মাধ্যমে নয়। এই বিক্ষোভগুলি প্রচুর সংঘর্ষ, রক্তপাত এবং সম্পত্তির ধ্বংসের কারণ হয়। অতএব, এই কর্মকাণ্ডগুলি অনুমোদিত নয়’।

১/৪/১৪৩২ হিজরিতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সঊদী আরবের সিনিয়র আলেমদের কাউন্সিলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু সঊদী আরব রাষ্ট্র কুরআন-সুন্নাহ, আনুগত্য এবং সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্যের বাধ্যবাধকতার উপর প্রতিষ্ঠিত, সেহেতু সংস্কার ও কল্যাণের নামে বিক্ষোভ এবং এমন কোনো পথ-পদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে না, যা বিদ্রোহকে উস্কে দেয় এবং সম্প্রদায়কে বিভক্ত করে। এই দেশের অতীত, বর্তমান উভয় সময়ের আলেমরা এটি হারাম বা নিষেধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং এর থেকে সতর্ক  করেছেন’।

বর্তমানে স্যাটেলাইট চ্যানেল বা অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচারের কারণে বিক্ষোভ এবং অবস্থান কর্মসূচির পরিণতি সকলের কাছে স্পষ্ট, এর মধ্যে কিছু এমনও আছে, যা  প্রচারের উদ্দেশ্যই হলো জনগণের মধ্যে বিদ্রোহ এবং বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দেওয়া। এই বিক্ষোভের ফলে সবচেয়ে বড় যে অপরাধ  সংঘটিত হয়, তা হল রক্তপাত ঘটানো, ইসলামে যার কোন অনুমতি নেই।

এজন্য ইসলামী আইনে মানুষ হত্যা করার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর সতর্কীকরণ রয়েছে। যাকে মহান আল্লাহ ন্যায়সঙ্গত কারণ ব্যতীত হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন, وَ لَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا ‘এবং তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই, মহান আল্লাহ তোমাদের প্রতি সর্বদা করুণাময়’ (সূরা আন-নিসা : ২৯)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَ لَا تَقۡتُلُوا النَّفۡسَ الَّتِیۡ حَرَّمَ اللّٰہُ  اِلَّا بِالۡحَقِّ ‘মহান আল্লাহ যাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা তাকে হত্যা করো না’ (সূরা বাণী ইসরাঈল : ৩৩)। মহান আল্লাহ আরও বলেন,وَ مَنۡ یَّقۡتُلۡ مُؤۡمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآؤُہٗ جَہَنَّمُ خٰلِدًا فِیۡہَا وَ غَضِبَ اللّٰہُ عَلَیۡہِ وَ لَعَنَہٗ وَ اَعَدَّ  لَہٗ عَذَابًا عَظِیۡمًا ‘আর কেউ যদি ইচ্ছা করে কোন মুমিনকে হত্যা করে তাহলে তার শাস্তি জাহান্নাম, তন্মধ্যে সে সদা অবস্থান করবে এবং আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন ও তাকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন’ (সূরা আন-নিসা : ৯৩)।

এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,مَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِشَىْءٍ عَذَّبَهُ اللهُ بِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ ‘আত্মহত্যা করা মহাপাপ, যে ব্যক্তি যে বস্তু দ্বারা আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামে সে বস্তু দ্বারা তাকে শাস্তি দেয়া হবে এবং মুসলিম ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।[৩] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন,

‘যে লোক পাহাড়ের উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের আগুনে পুড়বে, চিরকাল সে জাহান্নামের ভিতর ঐভাবে লাফিয়ে পড়তে থাকবে। যে লোক বিষপানে আত্মহত্যা করবে, তার বিষ জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তার হাতে থাকবে, চিরকাল সে জাহান্নামের মধ্যে তা পান করতে থাকবে। যে লোক লোহার আঘাতে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামের আগুনের ভিতর সে লোহা তার হাতে থাকবে, চিরকাল সে তা দিয়ে নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে।[৪] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন,لَنْ يَزَالَ الْمُؤْمِنُ فِي فُسْحَةٍ مِنْ دِينِهِ مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًا ‘মুমিন তার দ্বীনের ব্যাপারে পূর্ণ স্বস্তিতে থাকে, যে পর্যন্ত না সে কোন হারাম রক্তপাত ঘটায়’।[৫] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন, مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السِّلاَحَ فَلَيْسَ مِنَّا ‘যে ব্যক্তি আমাদের উপর অস্ত্র উত্তোলন করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’।[৬] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন,

وَمَنْ خَرَجَ عَلَى أُمَّتِى يَضْرِبُ بَرَّهَا وَفَاجِرَهَا وَلاَ يَتَحَاشَ مِنْ مُؤْمِنِهَا وَلاَ يَفِى لِذِى عَهْدٍ عَهْدَهُ فَلَيْسَ مِنِّى وَلَسْتُ مِنْهُ

‘আর যে ব্যক্তি আমার উম্মাতের বিরুদ্ধে তরবারি উত্তোলন করল এবং ভালো-মন্দ সকলকে নির্বিচারে আক্রমণ করতে লাগল। এমনকি তাত্থেকে আমার উম্মাতের কোনো মুমিনেরও পরোয়া করল না এবং আশ্রিত তথা নিরাপত্তায় অধিকারী ব্যক্তির সাথে যে অঙ্গীকার রয়েছে, তার চুক্তিও পূরণ করল না, সে আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তার সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই’।[৭] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন,لو ان اهل السماء والارض اشتركوا في دم مؤمن لا كبهم الله في النار ‘যদি আসমান ও যমিনের সকল বাসিন্দা একজন মুমিনকে হত্যা করার কাজে অংশগ্রহণ করত, তবে আল্লাহ তাঁদের সবাইকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতেন’।[৮] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন,لَزَوَالُ الدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللهِ مِنْ قَتْلِ رَجُلٍ مُسْلِمٍ  ‘আল্লাহর নিকট পৃথিবী ধ্বংস হওয়াটা অধিকতর সহজ ব্যাপার একজন মুসলিম খুন হওয়ার পরিবর্তে।[৯] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন,كُلُّ ذَنْبٍ عَسَى اللهُ أَنْ يَغْفِرَهُ إِلَّا الرَّجُلُ يَقْتُلُ الْمُؤْمِنَ مُتَعَمِّدًا أَوْ الرَّجُلُ يَمُوتُ كَافِرًا ‘প্রত্যেক গুনাহ আশা করা যায় আল্লাহ তা ক্ষমা করবেন, তবে ঐ ব্যক্তির গুনাহ ব্যতীত, যে ইচ্ছা করে কোন মুসলিমকে হত্যা করে অথবা কাফির হয়ে মৃত্যুবরণ করে’।[১০] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন,أَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي الدِّمَاءِ ‘ক্বিয়ামত দিবসে মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম খুনের বিচার করা হবে’।[১১]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন, ‘তোমাদের পূর্ব যুগে জনৈক ব্যক্তি আঘাত পেয়েছিল, তাতে কাতর হয়ে পড়েছিল। অতঃপর সে একটি ছুরি হাতে নিল এবং তা দিয়ে সে তার হাতটি কেটে ফেলল। ফলে রক্ত আর বন্ধ হল না। শেষ পর্যন্ত সে মারা গেল। মহান আল্লাহ্ বললেন, আমার বান্দাটি নিজেই প্রাণ দেয়ার ব্যাপারে আমার হতে অগ্রগামী হল। কাজেই, আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিলাম’।[১২] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন, ‘কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল, তিন-তিনটি কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করা বৈধ নয়। (যথা) জানের বদলে জান, বিবাহিত ব্যভিচারী, আর নিজের দ্বীন ত্যাগকারী মুসলিম জামা‘আত থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া ব্যক্তি’।[১৩] আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,إِنَّ مِنْ وَرَطَاتِ الْأُمُورِ الَّتِي لاَ مَخْرَجَ لِمَنْ أَوْقَعَ نَفْسَهُ فِيهَا سَفْكَ الدَّمِ الْحَرَامِ بِغَيْرِ حِلِّهِ ‘যেসব বিষয়ে কেউ নিজেকে জড়িয়ে ফেলার পরে তার ধ্বংস থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় থাকে না, সেগুলোর একটি হচ্ছে হালাল ছাড়া হারাম রক্ত প্রবাহিত করা (অর্থাৎ অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করা)’।

সম্মানিত পাঠক বৃন্দ! অন্যায়ভাবে একজন মুসলিমকে হত্যা করা কতই না খারাপ! এবং যারা মানুষকে আতঙ্কিত করে এবং তাদের রক্তপাতকে বৈধ বলে মনে করে তাদের জন্য এটি কতটা সহজ! অথচ ইসলাম এমন প্রাথমিক পদক্ষেপকেও নিষেধ করে, সেটা কথা বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেই হোক বা অন্য কোনভাবে, যা একজন মুসলিমকে হত্যা বা আতঙ্কিত করে তুলতে পারে।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. আল জামিউছ ছগির, হা/৫৪৮৮।
[২]. মিনহাজুস সুন্নাহ, ৩/৩৯০।
[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/২০৪।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৭৮।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৬২।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৭০৭০।
[৭]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪৮।
[৮]. ছহীহুল জামে‘, হা/২১৯।
[৯]. তিরমিযী, হা/১৩৯৫।
[১০]. আবূ দাঊদ, হা/৪২৭০; নাসাঈ, হা/৩৯৮৬, সনদ ছহীহ।
[১১]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৭৮।
[১২]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৬৩।
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৭৮।




প্রসঙ্গসমূহ »: শিশু-কিশোর
ইসলামী পুনর্জাগরণের মূলনীতি (৩য় কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
আল-কুরআনে বর্ণিত জাহেলি সমাজের দশটি চিত্র - তানযীল আহমাদ
মু‘তাযিলা মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
মসজিদ: ইসলামী সমাজের প্রাণকেন্দ্র (১১তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ধর্মীয় সংস্কারের স্বরূপ ও প্রকৃতি (৫ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ এবং তার প্রতিদান - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ইসলামে বিবাহের গুরুত্ব (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আবূ সাঈদ
তারুণ্যের উপর সন্ত্রাসবাদের হিংস্র ছোবল : প্রতিকারের উপায় (শেষ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ঈদে মীলাদুন্নাবী : একটি পর্যালোচনা - আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ
দলাদলির কুপ্রভাব : উত্তরণের উপায় (শেষ কিস্তি) - শায়খ মতিউর রহমান মাদানী
আল-কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত (৮ম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
প্রচলিত তাবলীগ জামা‘আত সম্পর্কে শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের অবস্থান - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির

ফেসবুক পেজ