শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:০০ অপরাহ্ন

 যাদুটোনার শারঈ সমাধান 

-মূল: ড. আব্দুল মুহসিন ইবনে মুহাম্মাদ আল-কাসিম, ইমাম ও খত্বীব, মসজিদ নববী 
-অনুবাদ: মাসঊদুর রহমান* 


(৪র্থ কিস্তি) 

৯- প্রতিদিন সকালে সাতটি করে মদীনার আজওয়া খেজুর খাওয়া

আজওয়া হলো মদীনার খেজুরসমূহের মধ্য হতে এক প্রকার  খেজুর। এ মর্মে রাসূল (ﷺ) বলেন, مَنْ تَصَبَّحَ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعَ تَمَرَاتٍ عَجْوَةً لَمْ يَضُرُّهُ فِىْ ذَلِكَ الْيَوْمِ سُمٌّ وَلَا سِحْرٌ ‘যে ব্যক্তি ভোরে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন কোন বিষ ও যাদু-টোনা তার ক্ষতি করতে পারবে না’।[১]

১০- সকাল-সন্ধ্যায় পঠিতব্য দু‘আ ও যিকিরগুলো নিয়মিত আমল করা। নিম্নোক্ত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ যিকির উল্লেখ করা হলো:

(ক) আয়াতুল কুরসী পাঠ করা

اَللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ١ۚ اَلْحَيُّ الْقَيُّوْمُ١ۚ۬ لَا تَاْخُذُهٗ سِنَةٌ وَّ لَا نَوْمٌ١ؕ لَهٗ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِي الْاَرْضِ١ؕ مَنْ ذَا الَّذِيْ يَشْفَعُ عِنْدَهٗۤ اِلَّا بِاِذْنِهٖ١ؕ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ اَيْدِيْهِمْ وَ مَا خَلْفَهُمْ١ۚ وَ لَا يُحِيْطُوْنَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهٖۤ اِلَّا بِمَا شَآءَ١ۚ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ١ۚ وَ لَا يَـُٔوْدُهٗ حِفْظُهُمَا١ۚ وَ هُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيْمُ.

‘আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। তাঁর জন্যই আসমানসমূহে যা রয়েছে তা এবং যমীনে যা আছে তা। কে সে, যে তাঁর নিকট সুপারিশ করবে তাঁর অনুমতি ছাড়া? তিনি জানেন যা আছে তাদের সামনে এবং যা আছে তাদের পেছনে। আর তারা তাঁর জ্ঞানের সামান্য পরিমাণও আয়ত্ত করতে পারে না, তবে তিনি যা চান তা ছাড়া। তাঁর কুরসী আসমানসমূহ ও যমীন পরিব্যাপ্ত করে আছে এবং এ দু’টোর সংরক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ, মহান’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৫৫)।

(খ) সূরা আল-বাক্বারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করা

اٰمَنَ الرَّسُوْلُ بِمَاۤ اُنْزِلَ اِلَيْهِ مِنْ رَّبِّهٖ وَ الْمُؤْمِنُوْنَ١ؕ كُلٌّ اٰمَنَ بِاللّٰهِ وَ مَلٰٓىِٕكَتِهٖ وَ كُتُبِهٖ وَ رُسُلِهٖ١۫ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ اَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهٖ١۫ وَ قَالُوْا سَمِعْنَا وَ اَطَعْنَا١ٞۗ غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَ اِلَيْكَ الْمَصِيْرُ۰۰۲۸۵ لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا١ؕ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَ عَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ١ؕ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَاۤ اِنْ نَّسِيْنَاۤ اَوْ اَخْطَاْنَا١ۚ رَبَّنَا وَ لَا تَحْمِلْ عَلَيْنَاۤ اِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهٗ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِنَا١ۚ رَبَّنَا وَ لَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهٖ١ۚ وَ اعْفُ عَنَّا١ٙ وَ اغْفِرْ لَنَا١ٙ وَ ارْحَمْنَا١ٙ اَنْتَ مَوْلٰىنَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكٰفِرِيْنَؒ.

‘রাসূল তার রব হতে তার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং মুমিনগণও (ঈমান আনয়ন করে); তারা সবাই আল্লাহকে, তাঁর মালাইকাকে, তাঁর গ্রন্থসমূহকে এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতিও ঈমান আনয়ন করে; (তারা বলে) আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কাউকেও পার্থক্য করি না এবং তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং স্বীকার করলাম, হে আমাদের রব! আমরা আপনারই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনারই দিকে শেষ প্রত্যাবর্তন’। ‘কোন ব্যক্তিকেই আল্লাহ তার সাধ্যের অতিরিক্ত কর্তব্য পালনে বাধ্য করেন না; সে যা উপার্জন করেছে তা তারই জন্য এবং যা সে অর্জন করেছে তা তারই উপর বর্তাবে। হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই অথবা ভুল করি সেজন্য আমাদেরকে অপরাধী করবেন না। হে আমাদের রব! আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেরূপ গুরুভার অর্পণ করেছিলেন আমাদের উপর তদ্রƒপ ভার অর্পণ করবেন না। হে আমাদের রব! যা আমাদের শক্তির বাইরে ঐরূপ ভার বহনে আমাদেরকে বাধ্য করবেন না এবং আমাদের পাপ মোচন করুন ও আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আমাদেরকে দয়া করুন, আপনিই আমাদের আশ্রয়দাতা! অতএব কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে জয়যুক্ত করুন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৮৫-২৮৬)।

(গ) সূরা  নাস ও ফালাক্ব পাঠ করা। যথা: সূরা ফালাক্ব

قُلْ اَعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِۙ۰۰۱ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَۙ۰۰۲ وَ مِنْ شَرِّ غَاسِقٍ اِذَا وَقَبَۙ۰۰۳ وَ مِنْ شَرِّ النَّفّٰثٰتِ فِي الْعُقَدِۙ۰۰۴ وَ مِنْ شَرِّ حَاسِدٍ اِذَا حَسَدَؒ.

‘(হে নবী!) আপনি বলুন, আমি প্রভাতের রবের আশ্রয় চাচ্ছি। এমন প্রত্যেকটি জিনিসের অনিষ্টকারিতা থেকে, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন এবং রাতের অন্ধকারের অনিষ্টকারিতা থেকে, যখন তা ছেয়ে যায়। আর গিরায় ফুঁৎকারদানকারীদের (বা কারিনীদের) অনিষ্টকারিতা থেকে। আর হিংসুকের অনিষ্টকারিতা থেকে, যখন সে হিংসা করে’।

আর সূরা নাস হল-

قُلْ اَعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِۙ۰۰۱ مَلِكِ النَّاسِۙ۰۰۲ اِلٰهِ النَّاسِۙ۰۰۳ مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ١ۙ۬ الْخَنَّاسِ۪ۙ۰۰۴ الَّذِيْ يُوَسْوِسُ فِيْ صُدُوْرِ النَّاسِۙ۰۰۵ مِنَ الْجِنَّةِ وَ النَّاسِؒ.

‘(হে নবী!) আপনি বলুন, বলো, আমি মানুষের রবের নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। মানুষের বাদশাহ। মানুষের প্রকৃত মা‘বূদের কাছে। এমন প্ররোচনা দানকারীর অনিষ্ট থেকে, যে বারবার ফিরে আসে। যে মানুষের মনে প্ররোচনা দান করে। সে জিনের মধ্য থেকে হোক বা মানুষের মধ্য থেকে’।

(ঘ) সকাল ও সন্ধ্যায় নিম্নের (৩ বার) যিকির পাঠ করা। যথা:

بِسْمِ اللهِ الَّذِىْ لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَىْءٌ فِى الْأَرْضِ وَلَا فِى السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ

রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় তিনবার উক্ত যিকির পাঠ করবে সকাল হওয়া পর্যন্ত তার প্রতি কোন হঠাৎ বিপদ আসবে না। আর যে ব্যক্তি তা সকালে তিনবার পাঠ করবে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার উপর কোন হঠাৎ বিপদ আসবে না’।[২]

(ঙ) সন্ধ্যায় ৩ বার নিম্নোক্ত যিকির করা

খাওলাহ বিনতে হাকীম আস-সুলামিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

مَنْ نَزَلَ مَنْزِلًا فَقَالَ: أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ لَمْ يَضُرَّهُ شَيْءٌ حَتَّى يَرْتَحِلَ مِنْ مَنْزِلِهِ ذَلِكَ

‘যে ব্যক্তি কোন জায়গায় অবতরণ করে বলে, أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ ‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামসমূহের মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্ট সকল কিছুর অনিষ্টতা হতে আশ্রয় চাই; তাহলে তাকে কোন জিনিস অনিষ্ট করতে পারবে না তার ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত’।[৩]

(চ) নিম্নের দু‘আটি পাঠ করা। যথা:

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ اللاَّتِيْ لَا يُجَاوِزُهُنَّ بَرٌّ وَلَا فَاجِرٌ مِنْ شَرِّ مَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَشَرِّ مَا يَعْرُجُ فِيْهَا وَشَرِّ مَا ذَرَأَ فِي الْأَرْضِ وَشَرِّ مَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمِنْ فِتَنِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمِنْ طَوَارِقِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِلَّا طَارِقًا يَطْرُقُ بِخَيْرٍ يَا رَحْمَنُ

‘আমি আসমান হতে আগত ও আসমানের দিকে ধাবিত বস্তুর অমঙ্গল হইতে, মাটিতে সৃষ্ট ও মাটি হইতে বহির্গত বস্তুর অমঙ্গল হইতে, রাত-দিনের বালা-মুসিবত হইতে ও রাত-দিনের ঘটনাপ্রবাহ হইতে, তবে উত্তম ঘটনা হইতে নয়— হে দয়াময়! (আমি) আল্লাহর ক সেই পূর্ণ কলেমাসমূহের আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি, যাহা পুণ্যবান ও পাপী কেহই অতিক্রম করিতে পারে না।[৪]

(ছ)  সকাল-সন্ধ্যায় নিম্নের দু‘আটি পড়া

একদা আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন যা আমি সকালে ও বিকালে পড়তে পারি। তিনি বললেন, তুমি বল,

اللَّهُمَّ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ رَبَّ كُلِّ شَىْءٍ وَمَلِيكَهُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ نَفْسِى وَمِنْ شَرِّ الشَّيْطَانِ وَشِرْكِهِ

‘হে আল্লাহ! অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাত, আকাশ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা, প্রতিটি জিনিসের প্রতিপালক ও মালিক, আমি সাক্ষ্য দেই যে, তুমি ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই। আমি আমার শরীরের ক্ষতি হতে এবং শয়তানের ক্ষতি ও শি‌রকী কার্যকালাপ হতে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি’। রাসূলুল্লাহ ধ বললেন, তুমি এই দু‘আ সকালে, বিকালে ও শয্যা গ্রহনকালে পাঠ করবে।[৫]

(ঝ) দিনে একশ’ বার নিম্নের দুয়াটি পড়া। আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ، وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيْرٌ

‘আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই; রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও একমাত্র তাঁরই জন্য, আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। যে ব্যক্তি একশ’বার এ দু’আটি পড়বে, সে দশটি গোলাম আযাদ করার সমান ছাওয়াব পাবে। তার জন্য একশ’টি ছাওয়াব লেখা হবে এবং একশ’টি গুনাহ মিটিয়ে ফেলা হবে। ঐদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সে শয়তান হতে মুক্ত থাকবে। কোন লোক তার চেয়ে উত্তম ছাওয়াব অর্জন করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, ঐ ব্যক্তি সক্ষম হবে, যে এর চেয়ে ঐ দু’আটির আমল বেশি পরিমাণ করবে’।[৬]

সকাল-সন্ধ্যায় পঠিত দু‘আর ব্যপারে অমনোযোগী হওয়া ও অবজ্ঞা করাটাই শয়তান মানুষের ওপরে প্রভাব খাটানোর এবং মানুষের বদ নযর লাগার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণ। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মানুষের ওপর অশুভ আত্মার আধিপত্য বিস্তার লাভ করে কারণ হল- দ্বীনের প্রতি তাদের জ্ঞানের স্বল্পতা এবং জিহবা ও অন্তর যিকির শূন্য থাকা। পাশাপাশি নবী (ﷺ)-এর শিখানো দু‘আ থেকে বিরত থাকাও ঈমানগত দুর্বলতার কারণে’।[৭]

১৭- প্রত্যহ পঠিতব্য দু‘আগুলো শিশু ও নারীদের ওপর পাঠ করার পদ্ধতি

সকাল-সন্ধ্যা পঠিতব্য দু‘আগুলোর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি জীন ও মানুষের অনিষ্ট হতে নিরাপদে থাকে। এই দু‘আগুলো পাঠ করার সময় ফুঁ দেয়া শর্ত নয়। এমনকি যে এই ওযীফাগুলো পাঠ করবে, যা তাকে নিরাপত্তা দেবে, সেই ওযীফাগুলো পাঠ করার সময় স্ত্রী-সন্তান উপস্থিত থাকা শর্ত নয়। কেননা মূলক এই ওযীফাগুলো দু‘আ আল্লাহর নিকটে তাদের হেফাজতের জন্যই করা হয়ে থাকে। তাই তাদের ওপর ফুঁ দেয়া বা তাদের নিকটে গিয়ে পাঠ করা কোনটাই শর্ত নয়। স্ত্রী-সন্তান, নিকটতম আত্মীয় সহ অন্য যে করো ওপর পঠিতব্য দু‘আগুলো পাঠ করার পদ্ধতি নিম্নরূপ:

১. সকাল-সন্ধ্যায় নিম্নের দু‘আটি তিনবার পাঠ করা: أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ ‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামসমূহের মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্ট সকল কিছুর অনিষ্টতা হতে আশ্রয় চাই; তাহলে তাকে কোন জিনিস অনিষ্ট করতে পারবে না তার ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত’।[৮]

২. সূরা  নাস ও ফালাক্ব পাঠ করে তাদের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করা।

৩. নিম্নের এই দু‘আ পড়ে তাদের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করা। أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ ‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমার দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টির অনিষ্ঠ হতে পানাহ চাচ্ছি’; রাসূল (ﷺ) হাসান ও হুসাইন য-এর জন্য নিম্নোক্ত দু‘আ পড়ে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।[৯] এমনি ভাবে আরো যে দু‘আগুলো রয়েছে তা পাঠ করা।

১৮- যাদের ওপর যাদু প্রভাব ফেলে

যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জন করে বিপদ-আপদ ও অনিষ্টতার থেকে দূরে সরে যায়। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও তাকে বেশি স্মরণকারী ব্যক্তি খারাপ জিন ও মানুষের অনিষ্ট হতে নিরাপদে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা শয়তানকে লক্ষ্য করে বলেন,

اِنَّ عِبَادِيْ لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطٰنٌ١ؕ وَ كَفٰى بِرَبِّكَ وَكِيْلًا

‘নিশ্চয় আমার বান্দাদের উপর তোর কোন ক্ষমতা নেই; কর্ম বিধায়ক হিসাবে তোর রবই যথেষ্ট’ (সূরা বানী ইসরাঈল: ৬৫)।

যখন কোন ব্যক্তি আল্লাহর যিকির থেকে দূরে থাকে বা তার ইবাদত খুবই কম করে, শয়তানের জন্য তখন উক্ত ব্যক্তিকে পাকড়াও করা সহজ হয়। আল্লাহর যিকির ও আনুগত্য থেকে মুক্ত অন্তরগুলো যাদু দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়। ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘অধিকাংশ যাদু প্রভাবিত করে নারী, শিশু, মূর্খ, মরুবাসি-বেদুইনদের দ্বীনদারিতা, আল্লাহর প্রতি আস্থা ও তাওহীদ দুর্বলতার ওপর। অতঃপর যার মধ্যে দৈনন্দিন আমল, দু‘আ এবং নবী (ﷺ) কর্তৃক নিরাপত্তাসূচক দু‘আগুলোর চর্চা নেই তার ওপর’।[১০]

নারীদের ইবাদত ও যিকির আযকারের স্বল্পতার কারণে তাদের ওপরে যাদু বেশি পতিত হয়। এমনিভাবে পিতা-মাতা ও নিকটতম আত্মীয় বাচ্চাদের জন্য প্রত্যেহ দু‘আ না পড়ার কারণে তাদের ওপরও যাদু বেশি পতিত হয়। এছাড়া ফাসেক, অবাধ্য এবং শারই বিধান অস্বীকারকারী ব্যক্তির ওপরও যাদু বেশি পতিত হয়। অধিকাংশ বাড়ি যাদু ও বদ নযর দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাদের বাড়ি-ঘর বাদ্যযন্ত্র দ্বারা ভরপুর করে রাখার জন্য। কেননা  যাদু ও বদ নযর হয়ে থাকে খারাপ আত্মার কারণে। যে ব্যক্তি আল্লাহ থেকে  দূরে থাকে এবং অবাধ্যতার নিকটবর্তী হয় তার ওপর অতি সহজে যাদুর প্রভাব পতিত হয়। তবে এর বিপরীতে যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা চায়, তার অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা পূর্ণ রাখে, শয়তান তাকে দেখে ভয় পায়। আল্লাহ তা‘আলা শয়তানের ব্যপারে বলেন,

قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَاُغْوِيَنَّهُمْ اَجْمَعِيْنَۙ۰۰۸۲ اِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِيْنَ.

‘সে বলল, আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব। তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে নয়’ (সূরা ছোয়াদ: ৮২-৮৩)।

যাদুটোনার  সমাধান পদ্ধতি

১৯- যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর যে সকল  আয়াত পড়তে হয়

আল্লাহ তা‘আলা মহাগ্রন্থ আল কুরআনকে সব ধরনের রোগ-ব্যাধির জন্য আরোগ্য হিসাবে সাব্যস্ত করেছেন। কুরআন কারীমের প্রতিটি আয়াতের মধ্যে আরোগ্য রয়েছে। তার মধ্যে বিশেষ কিছু আয়াত রয়েছে যেগুলো আল্লাহ তা‘আলার আদেশে যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর প্রভাব ফেলে। যেমন:

(ক) সূরা ফাতিহা, যা কুরআন মাজীদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম সূরা।

(খ) আয়াতুল করসী, যা কুরআন মাজীদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন আয়াত।

(গ) সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত।

(ঘ) সূরা আ‘রাফে উল্লেখিত যাদু সংক্রান্ত আয়াত সমূহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ اَوْحَيْنَاۤ اِلٰى مُوْسٰۤى اَنْ اَلْقِ عَصَاكَ١ۚ فَاِذَا هِيَ تَلْقَفُ مَا يَاْفِكُوْنَۚ۰۰۱۱۷ فَوَقَعَ الْحَقُّ وَ بَطَلَ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَۚ۰۰۱۱۸ فَغُلِبُوْا هُنَالِكَ وَ انْقَلَبُوْا صٰغِرِيْنَۚ.

‘আমরা যখন মূসা-এর নিকট এই প্রত্যাদেশ পাঠালাম, আপনি আপনার লাঠিখানা নিক্ষেপ করুন, মূসা (আলা্) তা নিক্ষেপ করলে ওটা একটা বিরাট সাপ হয়ে সহসা ওদের অলীক (মিথ্যা) সৃষ্টিগুলোকে গিলে ফেলল। পরিশেষে যা হক্ব ছিল তা সত্য প্রামাণিত হল, আর যা কিছু বানানো হয়েছিল তা বাতিল প্রতিপন্ন হল। আর ফিরাঊন ও তার দলবলের লোকেরা মুকাবিলার ময়দানে পরাজিত হল এবং লাঞ্ছিত ও অপমানিত হল’ (সূরা আল-আ‘রাফ: ১১৭-১১৯)।

(ঙ) সূরা ইউনুসের আয়াতসমূহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ قَالَ فِرْعَوْنُ ائْتُوْنِيْ بِكُلِّ سٰحِرٍ عَلِيْمٍ۰۰۷۹ فَلَمَّا جَآءَ السَّحَرَةُ قَالَ لَهُمْ مُّوْسٰۤى اَلْقُوْا مَاۤ اَنْتُمْ مُّلْقُوْنَ۰۰۸۰ فَلَمَّاۤ اَلْقَوْا قَالَ مُوْسٰى مَا جِئْتُمْ بِهِ١ۙ السِّحْرُ١ؕ اِنَّ اللّٰهَ سَيُبْطِلُهٗ١ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِيْنَ۰۰۸۱ وَ يُحِقُّ اللّٰهُ الْحَقَّ بِكَلِمٰتِهٖ وَ لَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُوْنَ

‘আর ফিরআউন বলল, আমার কাছে সমস্ত সুদক্ষ যাদুকরদের উপস্থিত কর। অতঃপর যখন যাদুকররা এলো, তখন মূসা তাদেরকে বলল, নিক্ষেপ কর যা কিছু তোমরা নিক্ষেপ করতে চাও। অতঃপর যখন তারা নিক্ষেপ করল তখন মূসা বলল, যাদু এটাই, নিশ্চয় আল্লাহ এখনই এটাকে বানচাল করে দিবেন; (কেননা) আল্লাহ অশান্তি সৃষ্টিকারীদের কাজ সার্থক করেন না। আর আল্লাহ তাঁর বাণী অনুযায়ী সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন, যদিও পাপাচারীরা তা অপ্রীতিকর মনে করে’ (সূরা ইউনুস: ৭৯-৮২)।

(চ) সূরা ত্বো-হাতে বর্ণিত আয়াতসমূহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

قَالُوْا يٰمُوْسٰۤى اِمَّاۤ اَنْ تُلْقِيَ وَ اِمَّاۤ اَنْ نَّكُوْنَ اَوَّلَ مَنْ اَلْقٰى ۰۰۶۵ قَالَ بَلْ اَلْقُوْا١ۚ فَاِذَا حِبَالُهُمْ وَ عِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ اِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ اَنَّهَا تَسْعٰى۰۰۶۶ فَاَوْجَسَ فِيْ نَفْسِهٖ خِيْفَةً مُّوْسٰى۰۰۶۷ قُلْنَا لَا تَخَفْ اِنَّكَ اَنْتَ الْاَعْلٰى ۰۰۶۸ وَ اَلْقِ مَا فِيْ يَمِيْنِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوْا١ؕ اِنَّمَا صَنَعُوْا كَيْدُ سٰحِرٍ١ؕ وَ لَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ اَتٰى.

‘তারা বলল, হে মূসা! হয় তুমি নিক্ষেপ কর অথবা প্রথমে আমরাই নিক্ষেপ করি। মূসা বলল, বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। তাদের যাদুর প্রভাবে অকস্মাৎ মূসার মনে হল যে, তাদের দড়ি ও লাঠিগুলি ছুটাছুটি করছে। মূসা তার অন্তরে কিছু ভীতি অনুভব করল। (আল্লাহ বললেন,) আমরা বললাম, ভয় কর না, তুমিই প্রবল। তোমার ডান হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ কর, এটা তারা যা করেছে তা গ্রাস করে ফেলবে, তারা যা করেছে তাতো শুধু যাদুকরের কৌশল; যাদুকরেরা যাই করুক কখনও সফল হবে না’ (সূরা ত্বো-হা: ৬৫-৬৯)।

(ছ) সূরা নাস-ফালাক পড়া। কেননা যাদু দূর করা বা নষ্ট করার ক্ষেত্রে রাসূল (ﷺ)-এর ওপর নাযিলকৃত যা কিছু ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপকারী হলো সূরা নাস ও ফালাক । তাইতো হাদীছে এসেছে, لاَ يَتَعَوَّذُ النَّاسُ بِمِثْلِهِنَّ ‘কোন লোক এর মত কিছুর আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে না’।[১১] এমনিভাবে আয়াতুল কুরসি পাঠ করা। কেননা তা শয়তানকে বিতাড়িত করে।[১২] আয়েশা ম বলেন,

أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ  كَانَ إِذَا اشْتَكَى يَقْرَأُ عَلَى نَفْسِهِ بِالْمُعَوِّذَاتِ وَيَنْفُثُ فَلَمَّا اشْتَدَّ وَجَعُهُ كُنْتُ أَقْرَأُ عَلَيْهِ وَأَمْسَحُ بِيَدِهِ رَجَاءَ بَرَكَتِهَا.

‘যখনই নবী (ﷺ) অসুস্থ হতেন, তখনই তিনি ’সূরায়ে মু‘আব্বিযাত’ পড়ে নিজের উপর ফুঁক দিতেন। যখন তাঁর রোগ কঠিন হয়ে গেল, তখন বরকত অর্জনের জন্য আমি এই সূরাদ্বয় পাঠ করে তাঁর হাত দিয়ে শরীর মাসাহ (মাসাহ) করিয়ে দিতাম’।[১৩] ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,  ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) আয়াতুল কুরসি দারা চিকিৎসা করতেন। তিনি মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আয়াতুল কুরসি ও সূরা নাস ও ফালাক পড়তে আদেশ করতেন।[১৪]

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাউসা, হেদাতীপাড়া, বাঘা, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৪৪৫।
[২]. আবূ দাঊদ, হা/৫০৮৮।
[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭০৮।
[৪]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১৫৪৯৯; সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৮৪০।
[৫]. তিরমিযী, হা/৩৩৯২; মিশকাত, হা/২৩৯০, সনদ ছহীহ।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৩২৯৩।
[৭]. যাদুল মা‘আদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৯।
[৮]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭০৮।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৭১।
[১০]. যাদুল মা‘আদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১২৭।
[১১]. নাসাঈ, হা/৫৪৩১, সনদ ছহীহ।
[১২]. তাফসীর  ইবনে কাছীর, ১ম খণ্ড, পৃ. ২১৭।
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০১৬।
[১৪]. যাদুল মা‘আদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৯।




পরবর্তীদের তুলনায় সালাফদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব (৫ম কিস্তি) - অনুবাদ : আযহার বিন আব্দুল মান্নান
তাওহীদ প্রতিষ্ঠার উপায় (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ফাযায়েলে কুরআন (৩য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
বিদ‘আত পরিচিতি (৫ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
তাওহীদ প্রতিষ্ঠার উপায় - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
মাযহাবী গোঁড়ামি ও তার কুপ্রভাব (৪র্থ কিস্তি) - অনুবাদ : রিদওয়ান ওবাইদ
রজব মাসের বিধানসমূহ - অনুবাদ : ইউনুস বিন আহসান
প্রচলিত তাবলীগ জামা‘আত সম্পর্কে শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের অবস্থান (৪র্থ কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (১২তম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
জঙ্গিবাদ বনাম ইসলাম (শেষ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
যাদুটোনার শারঈ সমাধান (৩য় কিস্তি) - মাসঊদুর রহমান
ঈদুল ফিতরে করণীয় ও বর্জনীয় - আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ