ধর্মীয় সংস্কারের স্বরূপ ও প্রকৃতি
-ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
(৪র্থ কিস্তি)
[ডিসেম্বর’২৪ এর পর]
সংস্কারের ক্ষেত্র সমূহ
(Different areas of reform)
ইসলাম যেমন সর্বজনীন ও পূর্ণাঙ্গ, অনুরূপ মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে সংস্কারের বিচরণও পরিব্যাপ্ত। এর ব্যাপ্তি সুদূরপ্রসারী। মানব জীবনের সার্বিক দিক ও বিভাগে এর গুরুত্ব অত্যধিক। এমন কোন বিভাগ নেই, যেখানে সংস্কারের প্রয়োজন নেই। সমগ্র মানব জাতির নৈতিক, ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক সহ প্রত্যেকটি ক্ষেত্র যখন মিথ্যা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিজাতীয় চিন্তা-চেতনায় ব্যাধিগ্রস্ত হয়, তখন সংস্কারের প্রয়োজন হয়। এজন্য সংস্কার যেমন সকল দিক ও বিভাগে হতে পারে, আবার কোন বিশেষ ক্ষেত্রেও হতে পারে। কখনো ‘আকীদাহ ও আদর্শে সংস্কার হতে পারে, কখনো অর্থনৈতিক কাঠামোতে, কখনো সাহিত্য-সংস্কৃতিতে, আবার কখনো শিল্পে হতে পারে।[১] তবে যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে সংস্কার হবে, তখন সকল ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে। এছাড়া মানুষের জীবনে সকল কর্মক্ষেত্র কেবল আল্লাহ প্রদত্ত চূড়ান্ত সংবিধান আল-কুরআন এবং ছহীহ হাদীছের আলোকে পরিচালিত হবে। তার সকল কর্মপ্রচেষ্টা একমাত্র আল্লাহ্র জন্যই নিবেদিত হবে। যেমন একজন মানুষের শরীরের অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে। প্রত্যেকটির কাজ ভিন্ন ভিন্ন হলেও সবগুলোই পরিচালিত হয় হেড অফিস মাথা থেকে। অনুরূপ একটি দেশে নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সবকিছুই সংঘটিত হয় একক সংবিধানের আলোকে। তাই উম্মতে মুহাম্মাদীর উপর ফরয দায়িত্ব হল, সকলক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ প্রদত্ত সংবিধানের অনুসরণ করা।[২] আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ کَآفَّۃً ۪ وَ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ- فَاِنۡ زَلَلۡتُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَتۡکُمُ الۡبَیِّنٰتُ فَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের রাস্তাসমূহের অনুসরণ কর না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। তোমাদের নিকট স্পষ্ট দলীল আসার পরেও যদি পদস্খলিত হও, তাহলে জেনে রেখো- আল্লাহ মহা পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়’ (সূরা আল-বাকারাহ : ২০৮-২০৯)। অতএব ইসলামের প্রত্যেকটি বিধানকেই গ্রহণ করতে হবে কোন বিধানকে পরিত্যাগ করা যাবে না।[৩] উক্ত আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যায় ইমাম ত্বাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) (২২৪-৩১০ হি./৮৩৯-৯২৩ খ্রি.) বলেন,
اعملوا أيها المؤمنون بشرائع الإسلام كلها وادخلوا في التصديق به قولا وعملا ودعوا طرائق الشيطان وآثاره أن تتبعوها فإنه لكم عدو مبين لكم عداوته. وطريقُ الشيطان الذي نهاهم أن يتبعوه هو ما خالف حكم الإسلام وشرائعه ومنه تسبيت السبت وسائر سنن أهل الملل التي تخالف ملة الإسلام
‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইসলামের সমস্ত বিধি-বিধানের উপর ‘আমল কর এবং সত্যায়ন করার ভিত্তিতে কথা ও কর্মে প্রবেশ কর। আর শয়তানের পদঙ্কসমূহ ও তার প্রভাবের আনুগত্য বর্জন কর। নিশ্চয় সে শত্রুতার দিক থেকে তোমাদের জন্য প্রকাশ্য শত্রু। তাদেরকে শয়তানের রাস্তার অনুসরণ করতে নিষেধ করার অর্থ হল, সে যে বিষয়ে ইসলাম ও শরী‘আতের বিরুদ্ধাচরণ করে। তার মধ্যে শনিবারকে বন্দের দিন মনে করা এবং সমগ্র ধর্মের ঐ সমস্ত রীতিনীতি, যা মুসলিম মিল্লাতের বিরোধিতা করে’।[৪] শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) (৬৬১-৭২৮ হি./১২৬৩-১৩২৮ খ্রি.) বলেন, نَزَلَتْ فِي الْمُسْلِمِيْنَ يَأْمُرُهُمْ بِالدُّخُوْلِ فِيْ شَرَائِعِ الْإِسْلَامِ كُلِّهَا ‘(এই আয়াত) মুসলিমদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে ইসলামের যাবতীয় বিধি-বিধানের উপর ‘আমল করতে নির্দেশ করেছেন’।[৫] ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) (৭০১-৭৭৪ হি.) বলেন,
يَقُوْلُ تَعَالَى آمِرًا عِبَادَهُ الْمُؤْمِنِيْنَ بِهِ الْمُصَدِّقِيْنَ بِرَسُولِهِ: أنْ يَأْخُذُوْا بِجَمِيْعِ عُرَى الْإِسْلَامِ وَشَرَائِعِهِ وَالْعَمَلِ بِجَمِيْعِ أَوَامِرِهِ وَتَرْكِ جَمِيْعِ زَوَاجِرِهِ مَا اسْتَطَاعُوْا مِنْ ذَلِكَ
‘যে সমস্ত মুমিন বান্দা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সত্যায়ন করেছে, আল্লাহ তাদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, তারা যেন ইসলামের সকল দিক ও বিভাগ এবং বিধি-বিধানকে আঁকড়ে ধরে। আর তার নির্দেশ সমূহের প্রতি ‘আমল করে এবং যে সমস্ত বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে সেগুলোকে যেন সাধ্যানুযায়ী বর্জন করে’।[৬] তবে শরী‘আতের কিছু অংশ গ্রহণ করা এবং কিছু প্রত্যাখ্যান করা মহা অন্যায়। এর পরিণামও অত্যন্ত ভয়াবহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
اَفَتُؤۡمِنُوۡنَ بِبَعۡضِ الۡکِتٰبِ وَ تَکۡفُرُوۡنَ بِبَعۡضٍ ۚ فَمَا جَزَآءُ مَنۡ یَّفۡعَلُ ذٰلِکَ مِنۡکُمۡ اِلَّا خِزۡیٌ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ یُرَدُّوۡنَ اِلٰۤی اَشَدِّ الۡعَذَابِ ؕ وَ مَا اللّٰہُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ- اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ اشۡتَرَوُا الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا بِالۡاٰخِرَۃِ ۫ فَلَا یُخَفَّفُ عَنۡہُمُ الۡعَذَابُ وَ لَا ہُمۡ یُنۡصَرُوۡنَ
‘তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশের প্রতি ঈমান আনয়ন করবে, আর কিছু অংশের সাথে কুফরী করবে? তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করবে তাদের জন্য দুনিয়াবী জীবনে লাঞ্ছনা রয়েছে এবং ক্বিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোর শাস্তিতে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা কর সে বিষয়ে আল্লাহ অমনোযোগী নন। এরাই পরকালের বিনিময়ে দুনিয়াবী জীবনকে খরিদ করে নিয়েছে। অতএব তাদের শাস্তি হালকা করা হবে না এবং তাদেরকে সাহায্যও করা হবে না’ (সূরা আল-বাকারাহ : ৮৫-৮৬)। অতএব মানুষের জীবনের কোন ক্ষেত্রকে আল্লাহর হুকুমের আওতাবহির্ভূত করা যাবে না। সকল ক্ষেত্র ও স্থানের শারঈ নীতি নিরঙ্কুশভাবে অনুসরণ করতে হবে। যা তাওহীদের অনিবার্য দাবী।
শরী‘আত বিরোধী মানব রচিত মনগড়া আইনের ভিত্তিতে পরিবার, সমাজ ও দেশ পরিচালনা করা শরী‘আতের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কেননা আল-কুরআন ও ছহীহ হাদীছ হলো মহান আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশেষ ও চূড়ান্ত সংবিধান। এটা ব্যতীত কোন কিছুই চূড়ান্ত হতে পারে না। এমনকি কেউ যদি পূর্বের কোন নবী ও কিতাবেরও অনুসরণ করে তবুও তা গ্রহণযোগ্য হবে না, বরং সে পথভ্রষ্ট হবে। যেমন-
عَنْ جَابِرٍ ঃ قَالَ أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَتَى رَسُوْلَ اللهِ ﷺ بِنُسْخَةٍ مِنَ التَّوْرَاةِ فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ هَذِهِ نُسْخَةٌ مِنَ التَّوْرَاةِ فَسَكَتَ فَجَعَلَ يقْرَأ وَوَجْهُ رَسُوْلِ اللهِ يَتَغَيَّرُ فَقَالَ أَبُوْ بَكْرٍ ثَكِلَتْكَ الثَّوَاكِلُ مَا تَرَى مَا بِوَجْهِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فَنَظَرَ عُمَرُ إِلَى وَجْهِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فَقَالَ أَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ غَضَبِ اللهِ وَغَضَبِ رَسُوْلِهِ رَضِيْنَا بِاللهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِيْنًا وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ وَالَّذِىْ نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَوْ بَدَا لَكُمْ مُوْسَى فَاتَّبَعْتُمُوْهُ وَتَرَكْتُمُوْنِىْ لَضَلَلْتُمْ عَنْ سَوَاءِ السَّبِيْلِ وَلَوْ كَانَ حَيًّا وَأَدْرَكَ نُبُوَّتِىْ لَاتَّبَعَنِىْ
জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একদা তাওরাতের একটি কপি নিয়ে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! এটি তাওরাতের কপি। একথা শুনে তিনি চুপ থাকলেন। তখন ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) পড়তে শুরু করলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। তখন আবূ বাকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ‘উমারকে বললেন, তোমার ধ্বংস হৌক! তুমি কি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারার দিকে দেখছো না? তখন ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মুখের দিকে তাকালেন। অতঃপর বললেন, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ক্রোধ হতে আল্লাহর কাছে পরিত্রাণ চাচ্ছি। আমরা আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে নাবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, যার হাতে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রাণ রয়েছে, তাঁর কসম করে বলছি, যদি আজ মূসা (আলাইহিস সালাম) তোমাদের মাঝে আবির্ভূত হন আর তোমরা তাঁর অনুসরণ করো এবং আমাকে পরিত্যাগ করো, তবুও তোমরা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। আজ মূসা (আলাইহিস সালাম) যদি বেঁচে থাকতেন আর আমার নবুওয়াত পেতেন, তবে তিনিও আমার অনুসরণ করতেন’।[৭] অন্য বর্ণনায় এসেছে, একদা ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলেন,
[৮] إِنَّا نَسْمَعُ أَحَادِيْثَ مِنْ يَهُوْدَ تُعْجِبُنَا أَفْتَرَى أَنْ نَكْتُبَ بَعْضَهَا؟ فَقَالَ أَمُتَهَوِّكُوْنَ أَنْتُمْ كَمَا تَهَوَّكَتِ الْيَهُوْدُ وَالنَّصَارَى؟ لَقَدْ جِئْتُكُمْ بِهَا بَيْضَاءَ نَقِيَّةً وَلَوْ كَانَ مُوْسَى حَيًّا مَا وَسِعَهُ إِلَّا اتِّبَاعِىْ
‘আমরা ইহুদীদের নিকটে অনেক কাহিনী শুনি, যা আমাদেরকে মুগ্ধ করে। আমরা কি সেগুলোর কিছু অংশ লিখে রাখব? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ইহুদী-খ্রিস্টানরা যেভাবে দিশেহারা হয়েছে, তোমরা কি সেভাবে দিশেহারা হয়ে যাবে? অথচ আমি তোমাদের কাছে উজ্জ্বল ও পরিচ্ছন্ন দ্বীন নিয়ে এসেছি। শুনে রাখ, আজ যদি মূসা (আলাইহিস সালাম) বেঁচে থাকতেন, আমার আনুগত্য ছাড়া তাঁরও কোন গত্যন্তর থাকতো না’।
অতএব মানুষের জীবনের কোন ক্ষেত্রকে আল্লাহর হুকুমের আওতামুক্ত করা যাবে না। সে যখন যে ক্ষেত্রে অবস্থান করবে, তখন সেই স্থানের শারঈ নীতি নিরঙ্কুশভাবে অনুসরণ করবে। তাই উম্মাতের প্রত্যেকের উপর আবশ্যিক দায়িত্ব হলো, অনুকূল কিংবা প্রতিকূল সকল ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে মহান আল্লাহ প্রদত্ত বিধানাবলীর অনুসরণ করা। আর মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এভাবেই ধর্মীয় সংস্কারের পথ সুগম হবে।
(এক) নৈতিক সংস্কার (Moral reforms)
নৈতিকতা হলো নীতিবোধ ও জীবনচেতনার প্রথম সিঁড়ি। মূলত মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধের জাগরণকেই নৈতিকতা বলা হয়। এটা আত্মশুদ্ধি, আত্মার মুক্তি ও শান্তির বাতিঘর। মানবিক গুণাবলী বিকশিত হওয়ার এটাই একমাত্র পথ। জাতির সার্বিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য নৈতিকতার চর্চা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে নৈতিকতার স্থান সবার শীর্ষে। নৈতিক শক্তির দৃঢ়তা ইসলামের অন্যতম ভূষণ। নৈতিকতার উপরই সকল কাজ নির্ভরশীল।[৯] মানবতার সার্বিক সফলতা ও ব্যর্থতার মানদণ্ড হলো এই নৈতিকতা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَاَلۡہَمَہَا فُجُوۡرَہَا وَ تَقۡوٰىہَا- قَدۡ اَفۡلَحَ مَنۡ زَکّٰىہَا - وَ قَدۡ خَابَ مَنۡ دَسّٰىہَا
‘অতঃপর তাকে (মানুষকে) তার অসৎকর্ম ও তার সৎকর্ম (সম্পাদনের) জ্ঞান দান করেছেন, অবশ্যই সে সফলকাম হবে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে এবং সে ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষিত করবে’ (সূরা আশ-শামস : ৮-১০)। উক্ত আয়াত তিনটির মধ্যে قَدۡ اَفۡلَحَ مَنۡ زَکّٰىہَا এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ‘আব্দুর রহমান ইবনু নাসির আস-সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) (১৩০৭-১৩৭৬ হি.) বলেন,
طهر نفسه من الذنوب، ونقاها من العيوب، ورقاها بطاعة الله، وعلاها بالعلم النافع والعمل الصالح
‘নিজেকে পাপ থেকে পবিত্র করা, অপরাধ থেকে মুক্ত রাখা, আল্লাহর আনুগত্যে কোমল হওয়া এবং উপকারী ‘ইলম ও সৎ ‘আমলের মাধ্যমে নিজেকে উন্নত করা’।[১০] নবী-রাসূলগণের কর্মসূচির মধ্যে মানুষের নৈতিকতার জাগরণও অব্যাহতভাবে ছিল।[১১] হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
أَلَا وَإِنَّ فِى الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ أَلَا وَهِىَ الْقَلْبُ
‘সাবধান! নিশ্চয় শরীরের মধ্যে একটি টুকরা আছে। যদি সেই টুকরা সুস্থ থাকে, তাহলে পুরো শরীরটাই সুস্থ থাকে। আর যদি ঐ টুকরা অসুস্থ থাকে, তাহলে পুরো শরীরটাই অসুস্থ থাকে। মনে রেখ, সেটাই হল ‘কলব বা অন্তর’।[১২]
বর্তমানে এই উন্নত নৈতিকতার দুর্ভিক্ষ চলছে। সর্বত্র কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, লালসা, লোক দেখানো কাজ, অহংকার, মিথ্যা, গীবত-তোহমত, পরনিন্দা, হিংসা-বিদ্বেষ, অহমিকা, কৃপণতা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদির মত ঘৃণিত সব স্বভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আর সত্যবাদিতা, ন্যায়বোধ, দয়া, মহানুভবতা, পরোপকারিতা, ধৈর্য-সহনশীলতা, মিতাচার বা সংযম ইত্যাদি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। যা আত্মিক ও মানবিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। অতএব মানুষের উচিত কুপ্রবৃত্তি অর্থাৎ বদগুণগুলো মূলোৎপাট করে সুকুমারবৃত্তি[১৩] অর্থাৎ সৎগুণগুলো অর্জনের মাধ্যমে পূর্ণতা অর্জন করা। এভাবে নৈতিক শক্তির জাগরণ পূর্বক সংস্কার সাধন করা যরূরী।
(দুই) শিক্ষা সংস্কার (জবভড়ৎসং রহ বফঁপধঃরড়হ)
কোন জাতির সার্বিক উন্নতি ও অগ্রগতির মৌলিক উপাদান হল শিক্ষা। যে জাতি যতবেশি শিক্ষিত, সে জাতি ততবেশি উন্নত ও সুসংহত। শিক্ষা, শিক্ষার উপকরণ, কৌশল ও পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা শিক্ষা কার্যক্রমের মূল হাতিয়ার। জাতীয় উন্নতি, নৈতিকতা, নীতিবোধ, সত্য ও ন্যায়ের দিক-নির্দেশনার মূর্তপ্রতীক হলো এই শিক্ষা। ব্যক্তির চালচলন, গবেষণা, জীবন দর্শন, চৈতন্য ও সমাজবোধ পরিস্ফুটিত হয় তার অর্জিত ও পরিশিলীত মননের উপর। তাই শিক্ষা হতে হবে একদিকে যেমন নৈতিকতা, নীতিবোধ ও আদর্শের অনুসারী, অন্যদিকে সুস্থ প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান নির্ভর। অতএব দ্বীনচর্চা এবং প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান নির্ভরতা উভয়ের উপযুক্ত সমন্বয়ের ভিত্তিতে গঠিত শিক্ষানীতিই মূলত জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির মূল নেয়ামক। আবার জাতির আশা-আকাক্সক্ষা রুপায়ণ, সুনাগরিক তৈরিতে এবং স্থিতিশীল সমাজ গঠনে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য ইসলামে শিক্ষা অর্জনের ব্যাপারে জোরালো তাকিদ প্রদান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
اِقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الَّذِیۡ خَلَقَ- خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ عَلَقٍ - اِقۡرَاۡ وَ رَبُّکَ الۡاَکۡرَمُ- الَّذِیۡ عَلَّمَ بِالۡقَلَمِ - عَلَّمَ الۡاِنۡسَانَ مَا لَمۡ یَعۡلَمۡ
‘(হে মুহাম্মাদ!) আপনি পড়ুন! আপনার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিন্ড থেকে। পড়ুন! আর আপনার পালনকর্তা হলেন সর্বাধিক দয়ালু। যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না’ (সূরা আল-‘আলাক : ১-৫)। উক্ত পাঁচটি আয়াতে ইসলামের শিক্ষাদর্শন প্রস্ফুটিত হয়েছে। অর্থাৎ একজন কার নামে পড়বে? কী পড়বে? কিসের মাধ্যমে শিখবে? শিক্ষার বিষয়বস্তু কী হবে? চারটি বিষয়ের জওয়াব রয়েছে উক্ত পাঁচটি আয়াতে।
বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থায় অস্থিরতা বিদ্যমান। ব্রিটিশদের চালু করা শিক্ষানীতি, বিদেশ নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা, পাশ্চাত্য মডেলের শিক্ষা কার্যক্রম, ধর্ম বিবর্জিত শিক্ষার বাহুল্যতা, বস্তুবাদী ও ভোগবাদী শিক্ষা কারিকুলাম, ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী শিক্ষা এবং সহশিক্ষার কারণে শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য ব্যহ্যত হচ্ছে। ফলে নৈতিক মূল্যবোধ ধ্বংসের পথে। যা সংস্কারের দাবি রাখে।
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কারকে সম্ভাবনাময় পর্যায়ে নিয়ে আসতে গেলে সাধারণ ও মাদরাসা শিক্ষার মাঝে সমন্বয় সাধন করতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষার উভয় ধারায় উন্নত, মানসম্মত, সৎ ও সুনাগরিক গড়ে তোলার বাস্তবসম্মত শিক্ষা কাঠামো গঠন করতে হবে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সকল স্তরে যেমন ইসলামী শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে, তেমনি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার জন্য জ্ঞানের আধুনিক বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিমুখী শিক্ষার সমন্বয়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থাকে যেভাবে গুরুত্বে সাথে মূল্যায়ন করা হয় ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থাকেও অনুরূপ গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করতে হবে। উভয় শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সমন্বিত বাজেট ঘোষণার ক্ষেত্রেও বৈষম্য করা চলবে না।
সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সকল স্তরে ঈমান, শিরক-বিদ‘আত, কুফর, নিফাক, ইখলাস, ইহসান প্রভৃতি ‘আক্বীদাগত বিষয় সংযুক্ত করতে হবে। সাথে সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত, দান-সাদাক্বাহ, সহমর্মিতা, কুরআন, হাদীছ, হালাল-হারাম, নৈতিকতা, আখলাক-চরিত্র ইত্যাদি বিষয়ক জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অনুরূপভাবে ইসলামী পরিবারনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জনের সুযোগ থাকতে হবে। তদুপরি ইসলামের আলোকে সূদ-ঘুষ, যেনা-ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি, দুর্নীতি, কালোবাজারী, মজুদদারী, প্রতারণা, অবৈধ ব্যবসা, মদ্যপান, খুন, হত্যা, গুম, রাহাজানী, চাঁদাবাদী, ক্যাডারবাজী ইত্যাদি কর্মকাণ্ডগুলোর কুফল ও ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে আলোচনা থাকতে হবে। ঠিক মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাতেও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমগুলো সংযুক্ত করতে হবে। প্রচলিত অর্থনীতির সাথে ইসলামী অর্থনীতির সমন্বয় সাধনের জন্য যেমন উভয় ধারার অর্থনীতির শিক্ষাকে জোরদার করতে হবে, তেমনি প্রচলিত রাজনীতির সাথে ইসলামী রাজনীতির সমন্বয় সাধনের জন্য উভয় ধারার রাজনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান অর্জনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সাথে সাথে আধুনিক প্রচলিত আইন ও ইসলামী আইনের মাঝেও সমন্বয় সাধন করে উভয় আইনের শিক্ষার প্রতি জোরদারে পরিকল্পনা করতে হবে। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির নিত্য নতুন আবিষ্কারের ব্যবহারবিধি সম্পর্কেও আলোচনা থাকতে হবে। বিজ্ঞানের শাখা সমূহ যেমন রসায়ণ, জীববিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, গণিত প্রভৃতিকেও মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বস্ত্র শিল্প, তাঁতশিল্প, মুদ্রণ শিল্প, চামড়া শিল্প সহ শিল্প-কারখানার সকল বিষয়ও আধুনিক শিক্ষার সাথে সাথে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় সংযুক্ত করতে হবে। চিকিৎসা বিদ্যা সহ তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়কেও মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় সংযুক্ত করা উচিত। উড়োজাহায, ট্রেন, বাস, ট্রাক ইত্যাদি নির্মাণ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাকেও এ শিক্ষা ব্যবস্থায় সুযোগ থাকতে হবে। অর্থাৎ উভয় শিক্ষা ব্যবস্থার মাঝে এমন একটি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা গঠন করতে হবে, যার মাধ্যমে ঈমানদার, নির্লোভ, সচ্চরিত্রবান, সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও উদার মানসিকতা সম্পন্ন ভবিষ্যৎ সুনাগরিক গড়ে তোলা সম্ভব হয়। উল্লেখ্য, উভয় শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক উদ্দেশ্য থাকতে হবে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ও পরকালের মুক্তির উদগ্র বাসনা।
এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত উপায়গুলো প্রাধান্য দেয়া আবশ্যক।
- শিক্ষার প্রতিটি স্তরে ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।
- তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।
- সহশিক্ষা বাতিল করা। প্রয়োজনে পৃথক শিফটিং করে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা।
- পাশ্চাত্য, ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাতিল করা।
- সর্বোপরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে আল-কুরআন, ছহীহ হাদীছ ও সালাফে সালিহীনের মানহাজের ভিত্তিতে ঢেলে সাজানো।
বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থার উপরিউক্ত ধারা যদি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে ধর্মীয় সংস্কার কার্যক্রমের সফলতা অবশ্যম্ভাবী।
(তিন) পারিবারিক সংস্কার (Family reforms)
মানব সমাজের ভিত্তি পরিবার। যার সূচনা হয় স্বামী-স্ত্রীকে কেন্দ্র করে। আদম-হাওয়া (আলাইহিস সালাম)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রথম মানব পরিবার গড়ে ওঠে।[১৪] সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে আজও এ পরিবার প্রথা চালু আছে। সারা দিনের কর্মক্লান্তি, বিভিন্ন কারণে মানব মনে পাওয়া দুঃখ-বেদনায় যেখানে সবাই শান্তি খোঁজে সেটা হল পরিবার। যদি পরিবারে শান্তি-শৃংখলা থাকে তাহলে মানব জীবন সুখময় হয়। পক্ষান্তরে পরিবারে কাক্সিক্ষত শান্তি না থাকলে জীবন হয়ে ওঠে বিতৃষ্ণ, বিষাদময়। এজন্য দরকার একটি আদর্শ পরিবার। যা হবে মানুষের আরাম-আয়েশ ও সুখ-শান্তির আকর। তাই শান্তি-সুখের ঠিকানা আদর্শ পরিবার গঠনে করণীয় নির্ধারণ করা জরুরী। আল্লহ তা‘আলা বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَ اَہۡلِیۡکُمۡ نَارًا وَّ قُوۡدُہَا النَّاسُ وَ الۡحِجَارَۃُ عَلَیۡہَا مَلٰٓئِکَۃٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا یَعۡصُوۡنَ اللّٰہَ مَاۤ اَمَرَہُمۡ وَ یَفۡعَلُوۡنَ مَا یُؤۡمَرُوۡنَ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন হতে, যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম, কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা, যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদিষ্ট হয় তাই করে’ (সূরা আত-তাহরীম : ৬)। পারিবারিক ক্ষেত্রে দয়িত্ব ও কর্তব্যের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করার জন্য ইসলাম পরিবারের সদস্যদের জন্য আলাদা আলাদাভাবে পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্দেশ করেছে। যেমন মাতা-পিতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে,
وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ لَا تُكَلَّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا لَا تُضَارَّ وَالِدَةٌ بِوَلَدِهَا وَلَا مَوْلُودٌ لَهُ بِوَلَدِهِ
‘যে স্তন্য পানকাল পূর্ণ করতে চায় তার জন্য মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর স্তন্য পান করাবে। পিতার কর্তব্য যথাবিধি তাদের ভরণ-পোষণ করা। কাউকেও তার সাধ্যতীত কাজের ভার দেয়া হয় না। কোনো মাকে তার সন্তানের জন্য, কোনো পিতাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না’ (সূরা আল-বাকারাহ : ২৩৩)। সন্তানদের জন্য নির্দেশনা এসেছে, ‘তোমার প্রতিপালক আাদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত আর কারো ইবাদাত না করতে এবং মাতা-পিতার প্রতি সদ¦্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না; তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলো। মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত করো এবং বলো, হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করো যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন’ (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত : ২৩-২৪)। স্বামী-স্ত্রীর অধিকার নির্দেশ করে বলা হয়েছে, ‘পুরুষদের ওপর নারীদের তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আাছে তাদের ওপর পুরুষদের; কিন্তু নারীদের ওপর পুরুষদের মর্যাদা আছে’ (সূরা আল-বাকারাহ : ২২৮)। এভাবে পরিবার গঠন, পারস্পরিক দায়িত্ব ও অধিকারের সীমা নির্দেশ এবং নিবিড় মমতার কুরআনী বন্ধনে সদাচার ও শুভ কামনা দিয়ে ইসলাম পারিবারিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করেছে।
পারিবারিক সংস্কারের স্বরূপ
পরিবার হলো ইসলামের সকল দিক-নির্দেশনা বাস্তবায়নের সর্বাধিক উপযোগী স্থান। তাই এ সংস্কার কাজ পরিবার থেকেই শুরু করা উচিত। এজন্য সাত বছর বয়সে ছালাতের শিক্ষা, দশ বছর বয়সে ছালাত না পড়লে শাস্তি দেয়া, কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা দেয়া ইত্যাদির প্রতি ইসলাম জোরালোভাবে গুরুত্বারোপ করেছে।[১৫] এমনকি পরিবারকে আদব বা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার জন্য রাসূল (ﷺ) শিষ্টাচারের লাঠিকে উঠিয়ে রাখতে নিষেধ করেছেন।[১৬] এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত উপায়ে পারিবারিক ক্ষেত্রে সংস্কার হতে পারে:
(ক) স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য। যেমন, হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় থাকা, উত্তম কথা বলা এবং উত্তম কথা বলা[১৭], স্ত্রীর সাথে একান্তে বসা ও খোশগল্প করা[১৮], বাড়ীতে প্রবেশ করে স্ত্রীকে সালাম দেয়া[১৯], স্ত্রীকে সহযোগিতা করা এবং অসুস্থ হলে তার সেবা-শুশ্রƒষা করা[২০], স্ত্রীর প্রতি উত্তম ধারণা রাখা এবং তার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেয়া ও তার থেকে প্রাপ্ত কষ্টে ধৈর্যধারণ করা[২১], স্ত্রীর চাহিদা পূরণ করা এবং তার সাথে পরামর্শ করা ও তাকে গুরুত্ব দেয়া[২২], স্ত্রীকে দ্বীনী ইলম শিক্ষা দেয়া ও দ্বীনের ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া[২৩], স্ত্রীকে তার পরিবারের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া[২৪], বাড়ীতে ব্যতীত অন্যত্র স্ত্রীকে ছেড়ে না রাখা[২৫], উপদেশ দেয়া ও মারধর না করা[২৬], আশ্রয় দান ও ভরণ-পোষণ।[২৭]
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
তথ্যসূত্র :
[১]. সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী, অনুবাদ : আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী, ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রপথিক, ১ম খণ্ড (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, মে ১৯৮৭), ভূমিকা, পৃ.-ঢ।
[২]. মুহা. মুযাফফর হুসাইন, ইসলামী পুনর্জাগরণের পথ ও পদ্ধতি : একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (অপ্রকাশিত পি-এইচ.ডি অভিসন্দর্ভ), আরবী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জুন ২০১৬, পৃ. ৬৭।
[৩]. তাইসীরুল কারীমির রহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান, পৃ. ৯৪।
[৪]. জামি‘ঊল বায়ান ফী তা’বীলিল কুরআন, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৫৮।
[৫]. মাজমূ‘ঊল ফাতাওয়া, ৭ম খণ্ড, পৃ. ২৬৬।
[৬]. আবুল ফিদা ইসমা‘ঈল ইবনু ‘উমার ইবনু কাসীর আদ-দিমাষ্কী, তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম, ১ম খণ্ড (বৈরূত : দারুল কিতাব আল-‘আরাবী, ২০১১ খৃ.), পৃ. ৫৬৫।
[৭]. সুনানুদ দারিমী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২৬, হা/৪৩৫; মিশকাতুল মাসাবীহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪২, হা/১৯৪।
[৮]. মুসনাদুল ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৮৭, হা/১৫১৯৫; বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯৯, হা/১৭৬; মিশকাতুল মাসাবীহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৮, হা/১৭৭।
[৯]. ছহীহ বুখারী, পৃ. ১৯, হা/১; সহীহ মুসলিম, পৃ. ৬২৭, হা/১৯০৭; সুনানু আবী দাঊদ, পৃ. ৩৮৪, হা/২২০১; আল-মু‘জামুল আওসাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭, হা/৪০; সুনানুল বাইহাকী আল-কুবরা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪১, হা/১৮১; মুসনাদুল হুমাইদী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৬, হা/২৮; মিশকাতুল মাসাবীহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১, হা/১।
[১০]. তাইসীরুল কারীমির রহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান, পৃ. ৯২৬।
[১১]. সূরাহ আল-বাকারাহ : ১২৯; সূরাহ আল-জুমু‘আহ : ২।
[১২]. ছহীহ বুখারী, পৃ. ৩০, হা/৫২; সহীহ মুসলিম, পৃ. ৫১২-৫১২, হা/১৫৯৯; সুনানুদ দারিমী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩১৯, হা/২৫৩১; শু‘আবুল ঈমান, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৫০, হা/৫৭৪১; জামি‘উল উসূল ফী আহাদীসির রাসূল, ১০ তম খণ্ড, পৃ. ৫৬৬, হা/৮১৩৩; মিশকাতুল মাসাবীহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১২৪, হা/২৭৬২।
[১৩]. সুকুমারবৃত্তিগুলো হলো- ১. তাওবাহ অর্থাৎ গুনাহের জন্য অনুতাপ করা, ক্ষমা চাওয়া। ২. ইনাবাত অর্থাৎ আল্লাহর দিকে মনকে সর্বদা রুজু রাখা। ৩. জুহ্দ তথা দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত আশা পরিত্যাগ করা। ৪. অরা তথা সন্দেহজনক জিনিস থেকে বেঁচে থাকা। ৫. সাব্র বা ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করা। ৬. শুক্র অর্থ কৃতজ্ঞতা, উপকারীর উপকার স্বীকার করা। ৭. তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হওয়া। ৮. তাছলিম অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম-আহকাম, অনুগ্রহ ও বিপদাপদ সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়া এবং আল্লাহর নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। ৯. রিযা বা আল্লাহর ইচ্ছার উপর রাজি থাকা এবং ১০. কানা‘আত বা অল্পে তুষ্টি- বিস্তারিত দ্র. সালিহ ইবনু ‘আব্দিল্লাহ ইবনু হামীদ, নাযরাতুন না‘ঈম ফী মাকারিমি আখলাকির রাসূলিল কারীম (জেদ্দা : দারুল ওয়াসীলাহ, ৪র্থ সংস্করণ, তা.বি.) গ্রন্থটি।
[১৪]. আবুল লাইস নাসরুদ্দীন ইবন মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আস-সামরকান্দী আল-হানাফী, বাহরুল ঊলূম, ১ম খণ্ড (বৈরূত : দারুল ফিকর, তারিখ বিহীন), পৃ. ৭০; আবুল ফিদা ইসমাঈল ইবন ওমর ইবন কাসীর আদ-দিমাস্কী, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১ম খণ্ড (মিসর : দারু তাইয়েবা, ২য় সংস্করণ, ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.), পৃ. ২৩৪।
[১৫]. সুনানু আবী দাঊদ, পৃ. ৯১, হা/৪৯৫; মিশকাতুল মাসাবীহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২৬, হা/৫৭২।
[১৬]. মুসনাদুল ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল, ৫ম খণ্ড, পৃ. ২৩৮, হা/২২১২৮; মিশকাতুল মাসাবীহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৩, হা/৬১।
[১৭]. ছহীহ বুখারী, পৃ. ৯৮৩, হা/৬০২১; সহীহ মুসলিম, পৃ. ৩০৪, হা/১০০৫; আল-মুসতাদরাকু ‘আলাস সহীহাইন, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৭, হা/২৩১১; মিশকাতুল মাসাবীহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৩০, হা/১৯১০; সুনানু আবী দাঊদ, পৃ. ৭৩০, হা/৪০৮৪; তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৪২।
[১৮]. ছহীহ বুখারী, পৃ. ১৯৩, হা/১১৬১; সহীহ মুসলিম, পৃ. ২২৬, হা/৭৪৩; মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ইবন খুযায়মাহ আবু বকর আন-নায়সাপুরী, সহীহ ইবন খুযায়মাহ, ২য় খণ্ড (বৈরূত: আল-মাকতাবুল ইসলামী, ১৩৯০ হি./১৯৭০ খ্রি.), পৃ. ১৬৮, হা/১১২২।
[১৯]. আবুল কাসিম সুলাইমান ইবনু আহমাদ আত-তাবারানী, আল-মু‘জামুল আওসাত্ব, ৬ষ্ঠ খণ্ড (কায়রো : দারুল হারামইন, ১৪১৫ হি.), পৃ. ১২৪; সহীহ ইবনু হিব্বান, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৫১, হা/৪৯৯।
[২০]. ছহীহ বুখারী, পৃ. ১২২, ৫১০, হা/৬৭৬, ৩১৩০; মিশকাতুল মাসাবীহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৬৪, হা/৫৮১৬; মুহাম্মাদ ইবনু ফুতূহ আল-হামীদী, আল-জাম‘উ বায়নাস সহীহাইন, ৪র্থ খণ্ড (বৈরূত : দারু ইবনি হাযম, ১৪২৩ হি./২০০২ খ্রি.), পৃ. ১৫২, হা/ ৩৩৫৫; সহীহ ইবনু হিব্বান, ১২তম খণ্ড, পৃ. ৪৮৮, ৪৯০, হা/৫৬৭৫, ৫৬৭৭; মুসনাদুল ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২৫৬, ১২১, হা/২৪৯৪৭, ২৬২৩৭; মিশকাতুল মাসাবীহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৬৫, হা/৫৮২২; কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়ালি ওয়াল আফআল, ১১তম খণ্ড, পৃ. ৫৯০, হা/৩২৮২৬; মিশকাতুল মাসাবীহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩২৪, হা/৬০৭১; ছহীহ বুখারী, পৃ. ৯৪৮, পৃ. ৫৭৪৩; আল-জাম‘ঊ বায়নাল সহীহাইন, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১০৪, হা/৩২৫১।
[২১]. সূরাহ আল-হুজুরাত, আয়াত : ১২; সূরাহ আন-নূর, আয়াত : ১২; সহীহ মুসলিম, হা/১৪৬৯; মিশকাতুল মাসাবীহ, ২য় খণ্ড, হা/৩২৪০; আল-জাম‘ঊ বায়নাস সহীহাইন, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৩৩, হা/২৪০৭।
[২২]. ছহীহ বুখারী, পৃ. ৩১৭-৩১৮, পৃ. ১৯৭৫; সহীহ ইবনু হিব্বান, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৩৩৭, হা/৩৫৭১; মিশকাতুল মাসাবীহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৬৪, হা/২০৫৪; ছহীহ বুখারী, পৃ. ১৯, হা/৩; সহীহ মুসলিম, হা/১৬০।
[২৩]. সূরাহ তো-হা : ১৩২; ছহীহ বুখারী, পৃ. ৯৮১-৮২১, হা/৬০০৮ এবং পৃ. ১১৩৭, হা/৭০৬৯; সহীহ মুসলিম, পৃ. ২০৬, হা/৬৭৪; সহীহ ইবনু হিব্বান, ১ম খণ্ড, পৃ. ২০৬, হা/ ৩৯৭; ।
[২৪]. ছহীহ বুখারী, পৃ. ৪২৮-৪৩১, হা/২৬৬১; সহীহ মুসলিম, পৃ. ৮৭৭-৮৭৯, হা/২৭৭০; সহীহ ইবনু হিব্বান, ১৬তম খণ্ড, পৃ. ১৩, হা/৭০৯৯।
[২৫]. সুনানু আবী দাঊদ, পৃ. ৩৭২, হা/২১৪২; মিশকাতুল মাসাবীহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৪০, হা/৩২৫৯, সনদ হাসান সহীহ।
[২৬]. ছহীহ বুখারী, পৃ. ৮২৯, হা/৪৯৪২; মুহাম্মাদ ইবহু ইয়াযীদ আবু ‘আব্দিল্লাহ আল-কাযভীনী, সুনানু ইবনি মাজাহ, ১ম খণ্ড (বৈরূত : দারুল ফিকর, তা.বি.), পৃ. ৫৯৪, হা/১৮৫১।
[২৭]. সূরাহ আত-তালাক : ৬-৭; সুনানু আবী দাঊদ, পৃ. ৩৭২, হা/২১৪২; সুনানু ইবনি মাজাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৯৪, হা/১৮৫১; মুসতাদরাক ‘আলাস সহীহাইন, ২য় খণ্ড, পৃ. ২০৪, হা/২৭৬৪; মিশকাতুল মাসাবীহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৪০, হা/৩২৫৯।