সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব
-হাসিবুর রহমান বুখারী*
(শেষ কিস্তি)
উপসংহার
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সর্বসম্মত আক্বীদা হল- কুরআন ইসলামের প্রথম ও প্রধান উৎস। এটি আল্লাহ তা‘আলার কালাম, যা জিবরীঈল (আলাইহিস সালাম)-এর মাধ্যমে রাসূল (ﷺ)-এর উপর নাযিল হয়েছে। আক্বীদা, ইবাদত, হালাল, হারাম, নৈতিকতা- সব কিছুর মূল ভিত্তি কুরআন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
اِنَّ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنَ یَہۡدِیۡ لِلَّتِیۡ ہِیَ اَقۡوَمُ وَ یُبَشِّرُ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ الَّذِیۡنَ یَعۡمَلُوۡنَ الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ اَجۡرًا کَبِیۡرًا
‘নিশ্চয় এ কুরআন হিদায়াত করে সেই পথের দিকে যা সরল, সুদৃঢ় এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৯)।
ঠিক তেমনি হাদীছ/সুন্নাহ হল ইসলামের দ্বিতীয় উৎস। কুরআনের ব্যাখ্যা, বিস্তারিত নির্দেশনা ও বাস্তব প্রয়োগ সুন্নাহর মাধ্যমেই জানা যায়। বহু বিধান কুরআনে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু হাদীছে বিস্তারিত এসেছে- যেমন ছালাতের পদ্ধতি, যাকাতের নিছাব, হজ্জের বিধি-বিধান ইত্যাদি। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ مَاۤ اٰتٰىکُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡہُ ٭ وَ مَا نَہٰىکُمۡ عَنۡہُ فَانۡتَہُوۡا ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ
‘রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমারা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক এবং তোমারা আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে অত্যধিক কঠোর’ (সূরা আল-হাশর : ৭)। যদিও হাদীছ কুরআনের অধীন, কিন্তু অপরিহার্য। হাদীছ কখনো কুরআনের বিরোধী হতে পারে না। বরং হাদীছ কুরআনের ব্যাখ্যাকারী, বিস্তৃতকারী ও বাস্তব রূপ। উভয়কেই একসাথে মানাই ঈমান ও সঠিক ইসলামের দাবি। তৎসত্বেও হাদীছ সম্পর্কে আহলে বুরআনদের চক্রান্ত চলমান। তাদের ভ্রান্ত মতবাদগুলোর সংক্ষিপ্তসার হল-
(১) ‘কুরআনই যথেষ্ট’। আহলে কুরআনরা বলে, আমাদের জন্য শুধু কুরআনই যথেষ্ট, হাদীছের দরকার নেই। কিন্তু বাস্তবে এটি কুরআনেরই বিরোধিতা, কারণ কুরআন স্পষ্টভাবে রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্য ফরয করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَاۤ اٰتٰىکُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡہُ ‘রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ কর’ (সূরা আল-হাশর : ৭)। সুতরাং যে ব্যক্তি সুন্নাহ মানে না, সে এই আয়াতও মানে না।
(২) হাদীছকে ‘মানব রচিত’ বলে সন্দেহ ছড়ানো। তারা বলে, ‘হাদীছ ২০০ বছর পরে লেখা, বুখারী-মুসলিম মানুষের বই, হাদীছ নির্ভরযোগ্য নয়..। অথচ আমরা এই কুৎসিত চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচন করে প্রমাণ করেছি যে, হাদীছ মুখস্থ, লিখিত ও আমলভিত্তিকভাবে ছাহাবীদের যুগ থেকেই সংরক্ষিত। ইলমুল হাদীছ পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোর যাচাই-পদ্ধতি। কুরআনের ক্বিরাআত, তাফসীর, শানে নুযূল, নাসিখ ও মানসুখ, এমনকি আরবী ভাষা- সবই তো হাদীছের মাধ্যমেই সংরক্ষিত
(৩) হাদীছকে ‘কুরআনের বিরোধী’ বলে মিথ্যা অভিযোগ তুলা। তারা বলে- যে হাদীছ কুরআনের সাথে না মেলে, তা বাদ দিতে হবে। ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এ ধরনের কথা যিনদীক্বরা অর্থাৎ অবিশ্বাসী ও নাস্তিকরা বানিয়েছে’। কারণ কুরআন নিজেই রাসূল (ﷺ)-কে ব্যাখ্যাকারী বানিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لِتُبَیِّنَ لِلنَّاسِ ‘যেন আপনি মানুষের জন্য ব্যাখ্যা করে দেন’ (সূরা আন-নাহল : ৪৪)। ব্যাখ্যাকারীকে বাদ দিয়ে মূল গ্রন্থ বোঝা অসম্ভব।
(৪) মূলত এরা হাদীছকে অস্বীকার করার মাধ্যমে আমল ধ্বংসের গোপন চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। অথচ হাদীছ বাদ দিলে ছালাত থাকবে না! কারণ, কুরআনে রাক‘আত সংখ্যা, নির্ধারিত সময় ও বিস্তারিত পদ্ধতি ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়নি। যাকাত থাকবে না! কারণ, কুরআনে যাকাত প্রদান করার আদেশ দেয়া হলেও নিছাবের হিসাব নিকাশ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক আলোচনা হাদীছেই রয়েছে। হজ্জ থাকবে না! কারণ, হজ্জের যাবতীয় বিধিবিধান ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কর্মপদ্ধতি হাদীছেই বর্ণিত হয়েছে। হালাল-হারাম নির্ধারণ থাকবে না। অর্থাৎ ইসলাম থাকবে শুধু নামের মধ্যে, আমলে নয়। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সুন্নাহ প্রত্যাখ্যান করে, সে দ্বীনের ধ্বংস চায়’।
(৫) তারা ছাহাবীগণ ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে অভিযুক্ত করে। আহলে কুরআনদের বক্তব্যের ফল দাঁড়ায়, ছাহাবীরা নাকি দ্বীন ঠিকভাবে পৌঁছাননি! তাবিঈ ও ইমামরা নাকি ভুল পথে ছিলেন! ১৪শ বছর মুসলিমরা নাকি বিভ্রান্তির মধ্যে ছিল! এখন সাড়ে ১৪শ বছর পর তারা না-কি সঠিক ইসলামকে বুঝতে পেরেছে! এটি সরাসরি ইসলামকে অস্বীকার করার নামান্তর।
(৬) রাসূল (ﷺ) আগেই সতর্ক করে বলেছেন:
أَلَا إِنِّىْ أُوتِيْتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ أَلَا يُوْشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانُ عَلَى أَرِيْكَتِهِ يَقُوْلُ عَلَيْكُمْ بِهَذَا الْقُرْآنِ فَمَا وَجَدْتُمْ فِيْهِ مِنْ حَلَالٍ فَأَحِلُّوْهُ وَمَا وَجَدْتُمْ فِيْهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوْهُ أَلَا لَا يَحِلُّ لَكُمْ لَحْمُ الْحِمَارِ الأَهْلِىِّ وَلَا كُلُّ ذِىْ نَابٍ مِنَ السَّبُعِ
‘জেনে রাখ! আমাকে কুরআন এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু দেয়া হয়েছে। জেনে রাখ! এমন এক সময় আসবে যখন কোন প্রাচুর্যবান ব্যক্তি তার আসনে বসে বলবে, তোমরা শুধু এ কুরআনকেই আঁকড়ে ধর, তাতে যা হালাল পাবে তাকে হালাল হিসাবে এবং যা হারাম পাবে তাকে হারাম হিসাবে গ্রহণ কর। নবী (ﷺ) বলেন, জেনে রাখ! গৃহপালিত গাধা তোমাদের জন্য হালাল নয় এবং ছেদন দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র পশুও নয়’।[১] এই হাদীছই আজকের আহলে কুরআনদের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের পরিচয় স্পষ্ট করে। যে আহলে কুরআনদের চক্রান্ত হল- বাহ্যিকভাবে কুরআনের নাম নেয়া আর বাস্তবে রাসূল (ﷺ)-এর কর্তৃত্ব অস্বীকার করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইসলামকে আমলহীন করা।
মোদ্দাকথা হল- (ক) দ্বীনের শত্রুরা সব সময়ই বিভিন্ন রূপ ও কৌশলে আল্লাহ তা‘আলার মনোনিত দ্বীনের উপর আঘাত হানতে তৎপর থাকে। তারা সাধারণ মুসলিমদের মাঝে তাদের বিভ্রান্তি ও সন্দেহ ছড়িয়ে দেয়। ফলে দুর্বল ঈমানের কিছু লোক ও অজ্ঞ মুসলিমরা তাদের অনুসরণ করে বসে। অথচ এদের মধ্য থেকে যদি একজন সাধারণ মানুষও সামান্য চিন্তা করত, তবে বুঝতে পারত- তাদের এসব সন্দেহ ভিত্তিহীন এবং তাদের দলীল সম্পূর্ণ বাতিল। এই ভ্রান্ত সন্দেহের জবাব দেয়ার জন্য একজন সাধারণ মুসলিমের জন্য সবচেয়ে সহজ উপায় হল- নিজেকে দু’টি প্রশ্ন করা- (১) যোহরের ছালাত কত রাকা‘আত? (২) যাকাতের নিছাব কত? এ দু’টি প্রশ্নই অত্যন্ত মৌলিক, কোন মুসলিমই এগুলো থেকে অমুখাপেক্ষী নয়। অথচ সে এ দু’টির উত্তর আল্লাহর কিতাবে (কুরআনে) সরাসরি পাবে না। সে দেখতে পাবে- আল্লাহ তা‘আলা ছালাতের আদেশ দিয়েছেন, যাকাতের আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু সুন্নাহ না দেখলে সে এসব আদেশ কীভাবে বাস্তবায়ন করবে? এটা তো অসম্ভব! এই কারণেই কুরআনের সুন্নাহর প্রতি প্রয়োজন সুন্নাহর কুরআনের প্রতি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। যেমনটি ইমাম আওযাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, الكتاب أحوج إلى السنَّة من السنَّة إلى الكتاب ‘কিতাব সুন্নাহর প্রতি বেশি মুখাপেক্ষী, সুন্নাহ কিতাবের প্রতি ততটা মুখাপেক্ষী নয়’।[২]
(খ) যারা দাবি করে যে মুসলিমগণের জন্য সুন্নাহর কোন প্রয়োজন নেই এবং কেবল কুরআনই যথেষ্ট- তাদের জবাবের একটি বড় দিক হল- তারা নিজেরাই কুরআনের বহু আয়াত অস্বীকার করে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বহু আয়াতে রাসূল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আনুগত্য, তাঁর আদেশ গ্রহণ এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমারা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক’ (সূরা আল-হাশর : ৭)। তিনি আরো বলেন, ‘বলুন, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর’ (সূরা আন-নূর : ৫৪)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَ مَاۤ اَرۡسَلۡنَا مِنۡ رَّسُوۡلٍ اِلَّا لِیُطَاعَ بِاِذۡنِ اللّٰہِ ‘আমরা রাসূল এ উদ্দেশ্যেই প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে তার আনুগত্য করা হবে’ (সূরা আন-নিসা : ৬৪)।
তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হতে পারবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচারভার আপনার উপর অর্পণ না করে’ (সূরা আন-নিসা :৬৫)। এখন প্রশ্ন হল- যে ব্যক্তি বলে শুধু কুরআনই যথেষ্ট, সে এসব আয়াতের সাথে কী করবে? কীভাবে সে আল্লাহর এই আদেশগুলো পালন করবে? এ ছাড়াও প্রশ্ন আসে যে, সে কীভাবে ছালাত প্রতিষ্ঠা করবে? রাক‘আত সংখ্যা, সময়, রুকন, বাতিলকারী বিষয়গুলো কীভাবে জানবে? যাকাত, ছিয়াম, হজ্জ ও অন্যান্য বিধানই বা কীভাবে বাস্তবায়ন করবে? চুরির শাস্তির আয়াতে (৫ : ৩৮) বলা হয়েছে- হাত কাটতে হবে। কিন্তু নিছাব কত? হাতের কোন্ অংশ কাটা হবে? ডান না বাম? কী শর্তে? আর ঠিক একই কথা প্রযোজ্য হবে যিনা, ব্যভিচারের অপবাদ, লি‘আন এবং অন্যান্য হদ্দ (শরী‘আত নির্ধারিত দণ্ড) সম্পর্কেও। অকাট্য সত্য হল- এসবের উত্তর কেবল সুন্নাহতেই রয়েছে। বদরুদ্দীন আয-যারকাশী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘আর-রিসালাহ’ গ্রন্থে, রাসূল (ﷺ)-এর এর আনুগত্য ফরয হওয়ার অধ্যায়ে বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল’ (সূরা আন-নিসা : ৮০)। আল্লাহ তা‘আলা কিতাবে যে সকল ফরয নির্ধারণ করেছেন- যেমন হজ্জ, ছালাত ও যাকাত- রাসূল (ﷺ)-এর ব্যাখ্যা ছাড়া আমরা কখনোই জানতে পারতাম না কীভাবে সেগুলো আদায় করতে হবে। বরং তাঁর ব্যাখ্যা ছাড়া কোন ইবাদতই সঠিকভাবে আদায় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হত না। আর যখন শরী‘আতের মধ্যে রাসূলের অবস্থান এরকম গুরুত্বপূর্ণ, তখন প্রকৃত অর্থেই তাঁর আনুগত্য করা মানে আল্লাহরই আনুগত্য করা।[৩] আর একজন বিবেকবান মুসলিম স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে যে, যে ব্যক্তি দাবি করে সে আল্লাহর কিতাবকে সম্মান করে, অথচ কুরআনকেই একমাত্র দ্বীন ও বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট মনে করে- সে আসলে কুরআনের সবচেয়ে বড় বিরোধী এবং দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্নদের অন্তর্ভুক্ত।
(গ) আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী (ﷺ)-কে ইসলামসহ প্রেরণ করেছেন। আর এই মহান নে‘মত কেবল কুরআনই নয়, বরং তা হল- কুরআন ও সুন্নাহ- উভয়ই। আল্লাহ যখন উম্মাতের উপর দ্বীন পূর্ণ করার ও নে‘মত সম্পূর্ণ করার অনুগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তখন এর উদ্দেশ্য কেবল কুরআন নাযিল করাই ছিল না, বরং কুরআন ও সুন্নাহ- উভয়ের মাধ্যমে বিধানসমূহ সম্পূর্ণ করাই ছিল উদ্দেশ্য। এর প্রমাণ হল- আল্লাহ তা‘আলা দ্বীন পূর্ণ ও নে‘মত সম্পূর্ণ করার ঘোষণা দেয়ার পরও কুরআন মাজীদের কিছু আয়াত নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নে‘মত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৩)। বদরুদ্দীন আয-যারকাশী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আল্লাহর বাণী- ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম’-এর অর্থ হল- আমি তোমাদের জন্য বিধানসমূহকে পূর্ণ করেছি, কুরআনকে নয়, কারণ এর পরেও কুরআনের কিছু আয়াত নাযিল হয়েছে, যেগুলো বিধানসংক্রান্ত ছিল না’।[৪] আর ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীর মাধ্যমে- তাঁর নিজের কালাম এবং রাসূলের কালামের দ্বারা-তাঁকে যা আদেশ করা হয়েছে তার সবকিছু এবং যা থেকে নিষেধ করা হয়েছে তার সবকিছু, যা হালাল করেছেন তার সবকিছু, যা হারাম করেছেন তার সবকিছু এবং যেগুলোতে ক্ষমা করেছেন তার সবকিছু স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। আর এভাবেই তাঁর দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নে‘মত সম্পূর্ণ করলাম’।[৫]
(ঘ) নবী (ﷺ) স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, তিনি যে সুন্নাহ নিয়ে এসেছেন তাও আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকেই এসেছে, যেমনটি কুরআন এসেছে। অর্থাৎ উৎসের দিক থেকে, দলীল হওয়ার দিক থেকে এবং বান্দাদের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়ার দিক থেকে সুন্নাহ কুরআনেরই সমপর্যায়ভুক্ত। তিনি কেবল কুরআনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। যাতে মানুষ শুধু কুরআনের কথা গ্রহণ করে তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয়। তিনি এমন একটি হারামের উদাহরণও উল্লেখ করেছেন, যা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত, অথচ কুরআনে তার সরাসরি উল্লেখ নেই, বরং কুরআনে তার হালাল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আর এসব কথা তিনি একটি ছহীহ হাদীছেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। মিক্বদাম ইবনু মা‘দীকারিব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘জেনে রাখ! আমাকে কুরআন এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু দেয়া হয়েছে। জেনে রাখ! এমন এক সময় আসবে যখন কোন প্রাচুর্যবান ব্যক্তি তার আসনে বসে বলবে, তোমরা শুধু এ কুরআনকেই আঁকড়ে ধর, তাতে যা হালাল পাবে তাকে হালাল হিসাবে এবং যা হারাম পাবে তাকে হারাম হিসাবে গ্রহণ কর। নবী (ﷺ) বলেন, জেনে রাখ! গৃহপালিত গাধা তোমাদের জন্য হালাল নয় এবং ছেদন দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র পশুও নয়’।[৬] এভাবেই ছাহাবায়ে কিরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) আল্লাহর দ্বীনকে বুঝতেন। যেমন:
عَنْ عَبْدِ اللهِ، قَالَ لَعَنَ اللهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُسْتَوْشِمَاتِ وَالنَّامِصَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ وَالْمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللهِ .قَالَ فَبَلَغَ ذَلِكَ امْرَأَةً مِنْ بَنِيْ أَسَدٍ يُقَالُ لَهَا أُمُّ يَعْقُوْبَ وَكَانَتْ تَقْرَأُ الْقُرْآنَ فَأَتَتْهُ فَقَالَتْ مَا حَدِيْثٌ بَلَغَنِيْ عَنْكَ أَنَّكَ لَعَنْتَ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُسْتَوْشِمَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ وَالْمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللهِ فَقَالَ عَبْدُ اللهِ وَمَا لِيَ لَا أَلْعَنُ مَنْ لَعَنَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ وَهُوَ فِيْ كِتَابِ اللهِ فَقَالَتِ الْمَرْأَةُ لَقَدْ قَرَأْتُ مَا بَيْنَ لَوْحَىِ الْمُصْحَفِ فَمَا وَجَدْتُهُ . فَقَالَ لَئِنْ كُنْتِ قَرَأْتِيْهِ لَقَدْ وَجَدْتِيْهِ قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ ( وَمَاۤ اٰتٰىکُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡہُ ٭ وَ مَا نَہٰىکُمۡ عَنۡہُ فَانۡتَہُوۡا) فَقَالَتِ الْمَرْأَةُ فَإِنِّيْ أَرَى شَيْئًا مِنْ هَذَا عَلَى امْرَأَتِكَ الآنَ . قَالَ اذْهَبِيْ فَانْظُرِيْ. قَالَ فَدَخَلَتْ عَلَى امْرَأَةِ عَبْدِ اللهِ فَلَمْ تَرَ شَيْئًا فَجَاءَتْ إِلَيْهِ فَقَالَتْ مَا رَأَيْتُ شَيْئًا . فَقَالَ أَمَا لَوْ كَانَ ذَلِكِ لَمْ نُجَامِعْهَا .
আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নিজের শরীরে চিত্র অঙ্কনকারিণী এবং অন্যের শরীরে চিত্র অঙ্কনকারিণী, নিজের ভ্রƒর চুল উৎপাটনকারিণী এবং অন্যের ভ্রƒর চুল উৎপাটনকারিণী এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে দাঁতের মাঝে ফাঁক তৈরিকারিণী- যারা আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধনকারিণী- এদের আল্লাহ তা‘আলা অভিশাপ করেন। বর্ণনাকারী বললেন, বনী আসাদ গোত্রের এক মহিলার কাছে হাদীছটি পৌঁছল যাকে উম্মু ইয়াকূব নামে ডাকা হয়। তিনি কুরআন পাঠ করতেন। অতঃপর তিনি ইবনু মাসঊদের নিকট এসে বললেন, এই হাদীছটি কী ধরনের, যা আপনার পক্ষ থেকে আমার নিকট পৌঁছেছে যে, অবশ্য আপনি- নিজের শরীরে চিত্র অঙ্কনকারিণী এবং অন্যের শরীরে চিত্র অঙ্কনকারিণী, নিজের ভ্রুর চুল উৎপাটনকারিণী এবং অন্যের ভ্রƒর চুল উৎপাটনকারিণী এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে দাঁতের মাঝে ফাঁক তৈরিকারিণী- যারা আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধনকারিণী- এদের অভিশাপ করেছেন। আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, আমার পক্ষে কী যুক্তি থাকতে পারে যে, রাসূল (ﷺ) যাদের অভিশাপ দিয়েছেন, আমি সে ব্যক্তিদের অভিশাপ দিব না? অথচ তা আল্লাহর কিতাবে রয়েছে। অতঃপর মহিলা বললেন, মুছহাফ অর্থাৎ কুরআনের দুই মলাটের মধ্যবর্তী (আদ্যোপান্ত) সবটুকু আমি পড়েছি, তাতে আমি কোথাও কিছু পাইনি। অতঃপর তিনি বললেন, তুমি যদি (গভীর অভিনিবেশ সহকারে) তা পড়তে, তাহলে অবশ্যই তুমি তা পেতে। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,وَ مَاۤ اٰتٰىکُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡہُ ٭ وَ مَا نَہٰىکُمۡ عَنۡہُ فَانۡتَہُوۡا ‘আর রাসূল তোমাদের নিকট যা কিছু নিয়ে আসছেন তা ধরে রাখো এবং তিনি যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে দূরে থাকো’ (সূরা আল-হাশর : ৭)।
মহিলাটি বললেন, আমি নিশ্চিত যে, আপনার স্ত্রীর মধ্যে এর কোন বিষয় এখন গিয়ে দেখতে পাব। তিনি বললেন, তুমি যাও, দেখো আছে কিনা। বর্ণনাকারী বললেন, এরপর মহিলা আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর স্ত্রীর নিকট গেলেন, তবে কিছুই দেখতে পাননি। তারপর তিনি তার নিকটে ফিরে এসে বললেন, কিছুই দেখতে পেলাম না। বর্ণনাকারী বললেন, শোনো! যদি সে রকম হতো তাহলে আমি সহবাস করতাম না’।[৭] এভাবেই তাবিঈন ও ইসলামের ইমামগণ আল্লাহর দ্বীনকে বুঝেছেন। তারা এর বাইরে অন্য কিছু জানতেন না- কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে দলীল ও বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য নেই, বরং সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যাকারী ও স্পষ্টকারী। আওযাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) হাসসান ইবনু আতিয়্যাহ থেকে বর্ণনা করেন, ‘জিবরীল (আলাইহিস সালাম) রাসূল (ﷺ)-এর কাছে নাযিল হতেন। আর সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যা করত’। আইয়ূব আস-সাখতিয়ানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যখন কাউকে সুন্নাহ থেকে বাণী শোনানো হয়, আর সে বলে, ‘এগুলো ছেড়ে দাও, আমাদের কুরআন শোনাও, তবে জেনে রেখো- সে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্তকারী’।
আওযাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল’। আরো বলেন, ‘রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো’। তিনি ক্বাসিম ইবনু মুখাইমিরাহ থেকে বর্ণনা করে বলেন, ‘রাসূল (ﷺ) ইন্তেকাল করার সময় যা হারাম ছিল- তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত হারাম থাকবে। আর যা হালাল ছিল- তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত হালাল থাকবে’।[৮] বদরুদ্দীন আয-যারকাশী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাফিয দারেমী বলেছেন, ‘আমাকে কুরআন দেয়া হয়েছে এবং তার অনুরূপ আরেকটি জিনিসও দেয়া হয়েছে, এর অর্থ হল- সেই সব সুন্নাহ, যেগুলো কুরআনে সরাসরি শব্দে উল্লেখ নেই, কিন্তু সেগুলো আল্লাহর উদ্দেশ্যকে ব্যাখ্যা করে। যেমন গৃহপালিত গাধার গোশত ও দাঁতযুক্ত হিংস্র প্রাণী হারাম হওয়া, অথচ এগুলো কিতাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই’। আর ইবনু হিব্বান তাঁর গ্রন্থে রাসূল (ﷺ)-এর বাণী- بَلِّغُوْا عَنِّيْ ولو آيَةً ‘আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও, একটি আয়াত হলেও’।[৯] এ বিষয়ে অন্যত্র তিনি বলেন, ‘এতে প্রমাণ রয়েছে যে, সুন্নাহকেও ‘আয়াত’ বলা হয়’।[১০]
(ঙ) আলিমগণ কুরআনের প্রতি সুন্নাহর ব্যাখ্যামূলক ভূমিকা বোঝাতে একাধিক দিক উল্লেখ করেছেন। যেমন সুন্নাহ কখনো কুরআনের বক্তব্যের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে আসে। কখনো কুরআনের সাধারণ (মুত্বলাক্ব) নির্দেশনাকে সীমাবদ্ধ (মুক্বাইয়াদ) করে। কখনো তার সাধারণত্বকে (‘আম) নির্দিষ্ট (খাছ) করে। কখনো সংক্ষিপ্ত (মুজমাল) বিষয়কে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে। কখনো কোন বিধানকে রহিত করে এবং কখনো কুরআনে নীরব থাকা বিষয়ে নতুন কোন বিধান প্রতিষ্ঠা করে। কিছু আলিম এ সবগুলোকে তিনটি স্তরে সংক্ষেপ করেছেন। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, প্রত্যেক মুসলিমের জন্য যে আক্বীদাহ রাখা আবশ্যক তা হল, রাসূল (ﷺ)-এর ছহীহ সুন্নাহ সমূহের মধ্যে এমন একটি সুন্নাহও নেই যা আল্লাহর কিতাবের বিরোধী। বরং কিতাবুল্লাহর সাথে সুন্নাহর সম্পর্ক তিনটি স্তরে বিভক্ত। যথা-
- প্রথম স্তর : এমন সুন্নাহ, যা কুরআনের বক্তব্যের সাথে একেবারে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কুরআন যে বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছে, সেই বিষয়েই সাক্ষ্য দেয়।
- দ্বিতীয় স্তর : এমন সুন্নাহ, যা কুরআনের ব্যাখ্যা করে, আল্লাহর উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে এবং তার সাধারণ নির্দেশনাকে সীমাবদ্ধ করে।
- তৃতীয় স্তর : এমন সুন্নাহ, যা এমন কোন বিধান বহন করে, যে বিষয়ে কুরআন নীরব ছিল, অতঃপর সুন্নাহ তা স্বতন্ত্রভাবে স্পষ্ট করে।
এই তিন প্রকারের কোন একটিকেও প্রত্যাখ্যান করা বৈধ নয়। কিতাবুল্লাহর সাথে সুন্নাহর আর কোন চতুর্থ স্তর নেই। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) সেই ব্যক্তির কঠোর প্রতিবাদ করেছেন যে বলেছিল, ‘সুন্নাহ কুরআনের উপর ফয়সালা দেয়’ তিনি বলেছেন, বরং সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যা করে এবং তাকে স্পষ্ট করে।[১১] আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের কাছে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট সাক্ষ্যপ্রাপ্ত, তা হল- রাসূল (ﷺ) হতে বর্ণিত, এমন একটি ছহীহ সুন্নাহও নেই যা কুরআনের বিরোধিতা করে বা তার সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। কেননা রাসূল (ﷺ) হলেন কুরআনের ব্যাখ্যাকারী, তাঁর উপরই তা নাযিল হয়েছে, আল্লাহ্ তাঁকে এর মাধ্যমেই পথনির্দেশ দিয়েছেন এবং তাঁকে কুরআন অনুসরণের আদেশ দেয়া হয়েছে। তিনি সৃষ্টির মধ্যে কুরআনের তাফসীর ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী।
যদি কুরআনের বাহ্যিক অর্থ থেকে কারো বোঝার কারণে রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ প্রত্যাখ্যান করা বৈধ হত, তবে অধিকাংশ সুন্নাহই প্রত্যাখ্যাত হয়ে যেত এবং সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়ে যেত। যদি কারোর মতবাদ বা দলের বিপরীত কোন ছহীহ সুন্নাহ প্রমাণিত হয়, তবে সে অবশ্যই কুরআনের কোন সাধারণ বা অবাধ (মুত্বলাক্ব) আয়াতকে আঁকড়ে ধরে বলবে, ‘এই সুন্নাহ ঐ সাধারণ বা অবাধ আয়াতের বিরোধী, তাই এটি গ্রহণযোগ্য নয়’। এমনকি রাফিযিরাও- আল্লাহ তাদের কুৎসিত করুন- এই একই পন্থা অবলম্বন করে সুপ্রতিষ্ঠিত ও মুতাওয়াতির সুন্নাহ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা রাসূল (ﷺ)-এর এই হাদীছ প্রত্যাখ্যান করেছে, ‘আমরা (নবীগণ) উত্তরাধিকার রেখে যাই না, আমরা যা রেখে যাই তা ছাদাক্বাহ’।[১২] তারা বলেছে, এটি কুরআনের বিরোধী। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে আদেশ দেন- পুত্রের অংশ দুই কন্যার সমান’ (সূরা আন-নিসা : ১১)। জাহমিয়্যারা আল্লাহর গুণাবলী প্রমাণকারী বহু ছহীহ হাদীছ প্রত্যাখ্যান করেছে এই আয়াতের বাহ্যিক অর্থ ধরে, ‘তার মত কিছুই নেই’ (সূরা আশ-শূরা : ১১)।
খারিজিরা শাফা‘আত ও বড় গুনাহগার তাওহীদপন্থীদের জাহান্নাম থেকে বের হওয়ার বিষয়ে বহু হাদীছ প্রত্যাখ্যান করেছে কুরআনের বাহ্যিক অর্থ বোঝাপড়ার কারণে। জাহমিয়্যারা আল্লাহকে দেখার (রু’ইয়াত) বিষয়ে বহু ছহীহ ও অসংখ্য হাদীছ প্রত্যাখ্যান করেছে এই আয়াতের বাহ্যিক অর্থ ধরে, ‘দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না’ (সূরা আল-আন‘আম : ১০৩)। ক্বাদরিয়্যারা তাক্বদীর সম্পর্কিত সুপ্রতিষ্ঠিত হাদীছসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে কুরআনের বাহ্যিক অর্থ বোঝার অজুহাতে। এভাবে প্রত্যেক দলই কুরআনের বাহ্যিক অর্থে তাদের নিজস্ব বোঝাপড়ার মাধ্যমে সুন্নাহর একটি বড় অংশ প্রত্যাখ্যান করেছে। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) প্রমুখ সেই ব্যক্তিদের কঠোরভাবে নিন্দা করেছেন, যারা ‘ছেদন দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র পশু হারাম’ এই হাদীছগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে এই আয়াতের বাহ্যিক অর্থ ধরে : ‘বলুন, আমার প্রতি যা অহী করা হয়েছে, তাতে আমি কোন হারাম খুঁজে পাই না’ (সূরা আল-আন‘আম : ১৪৫)। রাসূল (ﷺ) নিজেই সেই ব্যক্তির প্রতিবাদ করেছেন, যে তাঁর এমন সুন্নাহ প্রত্যাখ্যান করেছিল, যা কুরআনে উল্লেখ নেই- অথচ সে কুরআনের সাথে বিরোধিতার দাবিও করেনি। তাহলে যে ব্যক্তি দাবি করে যে রাসূলের সুন্নাহ কুরআনের বিরোধী, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আরও কত বেশি কঠোর হবে! [১৩]
এছাড়াও শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর একটি রিসালাহ রয়েছে, ‘ইসলামে সুন্নাহর মর্যাদা এবং কুরআন দ্বারা সুন্নাহ থেকে অমুখাপেক্ষী হওয়া অসম্ভব’। সেখানে তিনি বলেন, আপনারা সকলেই জানেন যে, আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে নবুওয়াত দ্বারা মনোনীত করেছেন, রিসালাত দ্বারা বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন এবং তাঁর উপর কুরআন নাযিল করেছেন। আর কুরআনের মধ্যেই আল্লাহ তাঁকে আদেশ করেছেন মানুষের কাছে তা ব্যাখ্যা করার জন্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর আমি তোমার প্রতি যিকির (কুরআন) নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষের কাছে তা ব্যাখ্যা করে দাও যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে’ (সূরা আল-নাহল : ৪৪)। আমাদের দৃষ্টিতে, এই ‘ব্যাখ্যা’ দুই প্রকার। যথা : (১) কুরআনের শব্দ ও বিন্যাস পৌঁছে দেয়া, অর্থাৎ কুরআন গোপন না করা বরং যেভাবে নাযিল হয়েছে সেভাবেই উম্মাতের কাছে পৌঁছে দেয়া। এটিই আল্লাহর বাণীর উদ্দেশ্য- হে রাসূল! আপনার রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দিন’ (সূরা আল-মায়িদা : ৬৭)।
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তোমাকে বলবে যে মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর উপর অর্পিত কোন কিছু গোপন করেছেন! সে আল্লাহর বিরুদ্ধে মহা মিথ্যা আরোপ করেছে’। এরপর তিনি উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন।[১৪] (২) শব্দ, বাক্য বা আয়াতের অর্থ ব্যাখ্যা করা, যেসব বিষয়ে উম্মতের ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা হয় সংক্ষিপ্ত, সাধারণ বা অবাধ আয়াতে। তখন সুন্নাহ এসে সংক্ষিপ্ত বিষয়কে স্পষ্ট করে, সাধারণকে নির্দিষ্ট করে এবং অবাধকে সীমাবদ্ধ করে। এটি রাসূল (ﷺ)-এর কথা, কাজ ও অনুমোদনের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। উদাহরণস্বরূপ আল্লাহর বাণী : ‘পুরুষ চোর ও নারী চোরের হাত কেটে দাও’ (সূরা আল-মায়িদা : ৩৮)। এখানে ‘চোর’ ও ‘হাত’ উভয়ই অবাধ। সুন্নাহ প্রথমটিকে সীমাবদ্ধ করেছে রাসূল (ﷺ)-এর বাণীর মাধ্যমে : ‘এক চতুর্থাংশ স্বর্ণমুদ্রা (দীনার) বা ততোধিক চুরি করলে তবেই হাত কাটা যাবে’।[১৫]
আর ‘হাত’ কোন অংশ— এখানে সাধারণভাবে চুরি করলেই চোরের হাত কাটার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি তাঁর কাজ ও সাহাবীদের কাজের অনুমোদনের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন যে, কারোর ব্যাপারে তার নিজস্ব স্বীকারোক্তি অথবা গ্রহণযোগ্য যে কোনো দু’জন সাক্ষীর মাধ্যমে চৌর্যবৃত্তি প্রমাণিত হতে হবে। চোরা বস্তুটি যথাযোগ্য হিফাযতে থাকাবস্থায় চুরি হয়েছে এবং বস্তুটি তার মালিকানাধীন হওয়ার ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ থাকবে না। উপরে বর্ণিত শর্তসাপেক্ষে চোরের ডান হাত কব্জি পর্যন্ত কেটে ফেলা হবে, আবার চুরি করলে তার বাম পা, আবার চুরি করলে তার বাম হাত এবং আবার চুরি করলে তার ডান পা কেটে ফেলা হবে। যেমনটি হাদীছের কিতাবগুলোতে সুপরিচিত। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, ইসলামী শরী‘আতে সুন্নাহর গুরুত্ব কত মহান। উল্লেখিত উদাহরণগুলো এবং আরও বহু উদাহরণ পর্যালোচনা করলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, সুন্নাহ ছাড়া কুরআনের সঠিক অর্থ বোঝা সম্ভব নয়।[১৬] সুতরাং কারো জন্য বৈধ নয় যে, সে কুরআনকে সুন্নাহ থেকে আলাদা করে বিধান গ্রহণ করবে। যে ব্যক্তি তা করে, সে কুরআনে রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্যের নির্দেশনার বড় ধরনের বিরোধিতা করে। সুন্নাহ এসেছে কুরআনের সমর্থনে, তার ব্যাখ্যা দিতে, তার সাধারণ অর্থকে সীমাবদ্ধ করতে, তার ব্যাপক অর্থকে নির্দিষ্ট করতে এবং কখনো স্বতন্ত্রভাবে নতুন বিধান প্রতিষ্ঠা করতে, এসবই মুসলিমের জন্য গ্রহণ করা অপরিহার্য।
শেষ কথা ধরা যাক- আমাদের ও সেইসব লোকদের মধ্যে বিরোধ আছে, যারা কেবল কুরআনকেই যথেষ্ট মনে করে। আমরা তাদের বলি- আল্লাহ তা‘আলা নিজেই আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন বিরোধের সময় কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যেতে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যকার কর্তৃত্বশীলদের। অতঃপর যদি কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ হয়, তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী হও। এটিই উত্তম এবং পরিণামে শ্রেষ্ঠ’ (সূরা আন-নিসা : ৫৯)। এখন আমাদের প্রতিপক্ষরা এ আয়াতের সামনে কী করবে? যদি তা মেনে নেয়- তবে সুন্নাহ মানতে বাধ্য হবে, আর তাদের দাবি বাতিল হবে। আর যদি না মানে- তবে তারা নিজেই সেই কুরআনের বিরোধিতা করবে, যাকে সে যথেষ্ট বলে দাবি করে! আল্লাহ তা‘আলাই সর্বাধিক জ্ঞাত। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমস্ত জগতের রব।
* মুর্শিদাবাদ, ভারত।
তথ্যসূত্র :
[১]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৪-৪৬০৫; তিরমিযী, হা/২৬৬৩-২৬৬৪; ইবনু মাজাহ, হা/১২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৭৪, ১৭১৯৪।
[২]. আল-বাহহুল মুহীত্ব, ৬/১১; আল-আদাবুশ শারইয়্যাহ, ২/৩০৭ পৃ., তাবিঈ মাকহূল থেকে বর্ণিত।
[৩]. আল-বাহরুল মুহীত্ব, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৭৮।
[৪]. আল-মানসূর ফিল-ক্বাওয়াইদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৪২।
[৫]. ই‘লামুল মুওয়াক্কি‘ইন, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫০।
[৬]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৪-৪৬০৫; তিরমিযী, হা/২৬৬৩-২৬৬৪; ইবনু মাজাহ, হা/১২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৭৪, ১৭১৯৪, সনদ হাসান।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৩২-৫৯৩৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২১২২-২১২৭।
[৮]. আল-আদাবুশ শার‘ইয়্যাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩০৭।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৬১।
[১০]. আল-বাহরুল মুহীত্ব, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৭৮।
[১১]. ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৯৩১১১।
[১২]. ছহীহ বুখারী হা/৪০৩৫, ৪২৪০, মুসলিম হা/১৭৫৯।
[১৩]. আত্ব-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৬৫-৬৭।
[১৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৮৫৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭৭; তিরমিযী, হা/৩২৭৮।
[১৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৭৮৯, ৬৭৯০, ৬৭৯১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৮৪; নাসাঈ, হা/৪৯৪৩; তিরমিযী, হা/১৪৪৫; আবূ দাঊদ, হা/৪৩৮৪; ইবনু মাজাহ, হা/২৬৩৪।
[১৬]. মানযিলাতুস সুন্নাহ ফিল ইসলাম, পৃ. ৪-১২।
প্রসঙ্গসমূহ »:
সুন্নাত