ইসলামী দৃষ্টিতে বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন
-আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ*
ভূমিকা
বিয়ে মানবজীবনের একটি পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ বন্ধন। এটি শুধু নারী ও পুরুষের মিলন নয়, বরং জীবনের পূর্ণতা, মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক ভারসাম্যের এক অপরিহার্য ভিত্তি। মানুষ একা কখনো সম্পূর্ণ নয়; হৃদয়ের শান্তি ও আত্মার পরিতৃপ্তির জন্য প্রয়োজন একজন সঙ্গী, যার মাধ্যমে বিকশিত হয় ভালোবাসা, দায়িত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন দেখা দেয়। শিশুকালে খাদ্যের প্রয়োজন থাকে, বড় হতে হতে আরো অনেক চাহিদা সৃষ্টি হয়। পরিণত জীবনে বিবাহের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্যক্তিভেদে চাহিদা বিভিন্ন হলেও, বিয়ে একটি সাধারণ ও অপরিহার্য প্রয়োজন। বিয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠে পরিবার; সমাজের প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। পরিবারই ভালোবাসার জন্মভূমি, যেখানে লালিত হয় মূল্যবোধ এবং গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিক চরিত্র। দাম্পত্য জীবনের মধ্য দিয়ে মানুষ শেখে ত্যাগ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা; সুখ-দুঃখে পাশে থাকার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করে। বিয়ে শুধু একটি সামাজিক প্রথা নয়, এটি একটি পবিত্র অঙ্গীকার ও দায়িত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। এর মধ্যেই নিহিত থাকে জীবনের সৌন্দর্য, ভালোবাসার গভীরতা ও আত্মার প্রশান্তি। বিয়ে মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে এবং সমাজে শান্তি, সৌহার্দ্য ও মানবতার নির্মল ভিত্তি স্থাপন করে।
বিয়ের পরিচিতি
আভিধানিক অর্থ : বিয়ের আরবী হচ্ছে نكاح (নিকাহ); যা ن-ك-ح শব্দমূল থেকে নির্গত। আরবী ভাষার লুগাত গ্রন্থগুলোতে “نكاح” এর দু’টি প্রধান অর্থ পাওয়া যায় : الوطء বা যৌন সম্পর্ক/সহবাস, الضمّ والجمع বা মিলন, একত্রিত হওয়া। যেমন, (نَكَحَ فلانة) সে অমুক মহিলাকে বিয়ে করল (বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলো), (نَكَحَ امرأته) সে তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করল।[১]
পারিভাষিক অর্থ : পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদানে শায়খ মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
النكاح في الشرع تعاقد بين رجل وامرأة يقصد به إباحة استمتاع كل منهما بالآخر وتكوين أسرة صالحة ومجتمع سليم
‘ইসলামী শরী‘আতে বিয়ে হলো একজন পুরুষ ও একজন নারীর মধ্যে এমন একটি চুক্তি, যার মাধ্যমে তারা একে অপরের সাথে বৈধ উপায়ে উপভোগ করতে পারে এবং একটি সুষ্ঠু পরিবার ও সুস্থ সমাজ গঠনের উদ্দেশ্য থাকে’।[২] কেউ কেউ বলেন,
عقد يعتبر فيه لفظ إنكاح أو تزويج في الجملة والمعقود عليه منفعة الاستمتاع أو الازدواج أو المشاركة
‘বিয়ে হলো এমন একটি চুক্তি যাতে ‘বিয়ে দেওয়া বা বিয়ে করা’ ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে উপভোগ বা একত্রে থাকা বা পরস্পর অংশীদার হওয়া বুঝায়’।[৩]
ইসলামী শারী‘আতে বিয়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
সৃষ্টিগতভাবেই নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। নারী ছাড়া পুরুষ এবং পুরুষ ছাড়া নারীর জীবন অসম্পূর্ণ। মানুষকে স্বেচ্ছাচারী জীবনের উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে রক্ষা করতে বিবাহ বন্ধন এক অনন্য সমাধান। আল্লাহ তা‘আলা আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সৃষ্টি করার পর হাওয়া (আলাইহিস সালাম)-কে তাঁর জীবনসাথী হিসেবে সৃষ্টি করে দু’জনের মাঝে বিয়ে দিয়ে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে দেন। সেই ধারাবাহিতা পৃথিবীতে এখনো চলমান। ইসলামী শারী‘আতের পাশাপাশি মানবজীবনেও বিয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
১. বিয়ের ব্যাপারে মহান আল্লাহর নির্দেশ
মহান আল্লাহ পৃথিবীর সবকিছু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন (সূরা আয-যারিয়াত : ৪৯)। অতঃপর মহান আল্লাহ মানুষকে নারী-পুরুষে বিভক্ত করেছেন (সূরা আল-হুজুরাত : ১৩; সূরা আন-নিসা : ১) এবং একে অপরের প্রতি আকর্ষণীয় করে দিয়েছেন। ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন, বসবাস ও জৈবিক চাহিদা পূরণের একমাত্র পন্থা হিসেবে বিয়ের প্রচলন করা হয়েছে। এজন্য প্রত্যেক অভিভাবককে তাদের অধীনস্থদের বিয়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, وَ اَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَ الصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَ اِمَآئِکُمۡ ‘তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও’ (সূরা আন-নূর : ৩২)। মানুষের জীবনে বিয়ে একটি স্বাভাবিক ও অপরিহার্য বিষয়। এটি শুধু সামাজিক সম্পর্ক নয়, বরং ইবাদতেরও একটি অংশ। বিয়ে মানুষের চরিত্র সংরক্ষণ, সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং বংশধারা অটুট রাখার অন্যতম মাধ্যম। তাই মহান আল্লাহ বিয়ের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন।
২. বিয়ে করা সকল নবীদের সুন্নাত
বিয়ে করা নবী-রাসূলদের একটি সুন্নাত। পৃথিবীতে প্রেরিত প্রত্যেক নবী-রাসূলই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এমনকি আমাদের প্রিয়নবি মুহাম্মাদ (ﷺ) একাধিক বিয়ে করেছেন। সুতরাং বিয়ে শুধু সামাজিক প্রথা নয়, বরং নবীদের সুন্নাতও বটে। মহান আল্লাহ বলেন, وَ لَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا رُسُلًا مِّنۡ قَبۡلِکَ وَ جَعَلۡنَا لَہُمۡ اَزۡوَاجًا وَّ ذُرِّیَّۃً ‘আর আপনার পূর্বে আমরা অনেক রাসূল প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছিলাম’ (সূরা আর-রা‘দ : ৩৮)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)ও বিয়ে করেছিলেন এবং তা মুসলিম সমাজের জন্য সুন্নাত হিসেবে প্রবর্তিত করেছেন।
৩. সক্ষম ব্যক্তিকে বিয়ে করার নির্দেশ
ইসলামে বিয়ে কেবল একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং এটি নিজের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক নিরাপত্তা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যার অর্থনৈতিক ও শারীরিক সামর্থ্য আছে, তার জন্য বিয়ে একটি উত্তম ও নির্দেশিত কাজ। কারণ বিয়ে ব্যক্তির চরিত্র ও সমাজকে নিরাপদ রাখতে সহায়তা করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ
‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে। কেননা বিয়ে দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণকারী, যৌনাঙ্গের পবিত্রতা রক্ষাকারী। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সিয়াম পালন করে। কেননা সিয়াম হচ্ছে যৌবনকে সংবরণ করার মাধ্যম’।[৪]
বিয়ে করার আগে আর্থিক স্থিতিশীলতা থাকা প্রয়োজন, যাতে দাম্পত্য জীবনে দায়িত্বপূর্ণভাবে জীবন যাপন করা যায়। অনুরূপভাবে শারীরিক সক্ষমতা থাকতে হবে, যাতে দাম্পত্য সম্পর্ক সুস্থ ও সুন্দরভাবে পরিচালনা করা যায়।
৪. বিয়ে সৎ সন্তান লাভের একমাত্র মাধ্যম
ইসলামে বিয়ে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বরং এটি সমাজ ও প্রজন্মের পবিত্রতার জন্য একটি মহান ব্যবস্থা। কোনো ব্যক্তি যদি বৈধ উপায়ে সৎ সন্তান লাভ করতে চান, তাহলে তার জন্য বিয়ে করা আবশ্যক। বিয়ের মাধ্যমে সন্তান জন্ম নেয়, যা ইসলামী নৈতিকতার ভিত্তি ও সমাজের সুস্থ গঠন নিশ্চিত করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, تَزَوَّجُوا الْوَدُوْدَ الْوَلُوْدَ فَإِنِّىْ مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأُمَمَ ‘তোমরা স্নেহপরায়ণ বেশী সন্তান জন্ম দানকারিণীকে বিবাহ কর। কেননা আমি বেশী উম্মত নিয়ে (ক্বিয়ামতের দিন) গর্ব করব’।[৫]
সৎ সন্তান লাভের একমাত্র বৈধ পদ্ধতি হচ্ছে বিয়ে। বিয়ের মাধ্যমে সন্তান সামাজিক ও আইনগতভাবে পিতা-মাতা সম্পর্ক পায়। বিয়ে ছাড়া জন্ম নেওয়া সন্তানকে ইসলাম বৈধ সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
৫. বিয়ে রিযিকপ্রাপ্তির একটি মাধ্যম
ইসলামে রিযিক কেবল অর্থ বা জীবিকার সীমিত অর্থে নয়; এটি নিরাপত্তা, সুস্থ জীবন, সন্তুষ্টি ও বরকতের একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা। বিয়ে মহান আল্লাহর বিধান, যার মধ্যে রয়েছে রিযিকের আশ্বাস। যে ব্যক্তি বিয়ে করেন, মহান আল্লাহ তার জীবনে প্রয়োজনীয় যাবতীয় রিযিক প্রদান করবেন এবং তার জীবনকে বরকত ও শান্তিতে পূর্ণ করবেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَ اَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَ الصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَ اِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَ اللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ ‘তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা যদি দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদেরকে তাঁর অনুগ্রহে ধনী করে দেবেন। আল্লাহ প্রচুর দানকারী, সর্বজ্ঞ’ (সূরা আন-নূর : ৩২)। আল্লাহ বিয়েকে এমন একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যা শুধুমাত্র নৈতিক ও সামাজিক উপকার দেয় না, বরং অর্থ ও জীবিকারও উৎস সৃষ্টি করে।
৬. বিয়ে অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে রক্ষা করে
মানবজীবনে যৌবন হলো এক বিশেষ সময়, যখন স্বাভাবিকভাবে মানুষের দৃষ্টি ও প্রবৃত্তি আকর্ষণশীল হয়। এ সময় অনেকেই ভুল পথের দিকে ঝুঁকে যায়, বিশেষ করে অশ্লীলতা ও যিনার মতো গুনাহে পড়তে পারে। ইসলামিক দৃষ্টিতে বিয়ে হলো এমন এক সংবরণ ব্যবস্থা, যা এই বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ
‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে। কেননা বিয়ে দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণকারী, যৌনাঙ্গের পবিত্রতা রক্ষাকারী। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সিয়াম পালন করে। কেননা সিয়াম হচ্ছে যৌবনকে সংবরণ করার মাধ্যম’।[৬] অতএব, বিয়ে কেবল ব্যক্তিগত সুখের মাধ্যম নয়, বরং এটি যুবসমাজকে অশ্লীলতা, অনৈতিক সম্পর্ক ও গুনাহ থেকে রক্ষা করার এক অনন্য নৈতিক ব্যবস্থা। এটি সামাজিক ও আত্মিক নিরাপত্তার একটি মূল স্তম্ভ।
৭. সতীত্ব রক্ষা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি সৃষ্টি
বিয়ে শুধু দু’টি মানুষের যৌক্তিক সম্পর্ক নয়, বরং আল্লাহর প্রদত্ত এক মহৎ ব্যবস্থা, যা সতীত্ব রক্ষা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মহান আল্লাহ বলেন, وَ مِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَ جَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّ رَحۡمَۃً ‘তার নিদর্শনের মধ্যে এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে শান্তিতে থাকো এবং পরস্পরের মধ্যে দয়া ও সম্প্রীতি থাকে’ (সূরা আর-রূম : ২১)। বিয়ে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে স্নেহ, ভরসা ও আস্থা প্রতিষ্ঠা করে। এটি একটি সামাজিক বন্ধন, যেখানে একজন অপরজনকে মানসিক ও সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করে। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ہُنَّ لِبَاسٌ لَّکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّہُنَّ ‘স্ত্রীরা তোমাদের জন্য পোষাক, আর তোমরা তাদের জন্য পোষাক’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৭)। এ আয়াত নির্দেশ করে যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক একে অপরকে আড়াল, সুরক্ষা, সম্মান ও সহানুভূতি প্রদান করে, যা সতীত্ব ও সম্প্রীতির একটি নির্দিষ্ট ভিত্তি গড়ে তোলে।
৮. বিয়ে বংশগত ধারাবাহিকতা ও সামাজিক শান্তির মাধ্যম
বিয়ে কেবল ব্যক্তি জীবনের নয়, বরং সমাজ ও জাতির ধারাবাহিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিয়ের মাধ্যমে পরিবার গড়ে ওঠে, যা বংশগত ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে পিতৃপুরুষদের কৃতিত্ব ও মূল্য সংরক্ষিত থাকে এবং জাতি-ধর্মের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হয়। এ ছাড়াও বিয়ে পরিবার ও সমাজে শান্তি ও মমতা সৃষ্টি করে। স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন আল্লাহর একটি নিদর্শন, যা সমাজে একে অপরের প্রতি স্নেহ, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তি স্থাপন করে। মহান আল্লাহ বলেন, وَ مِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَ جَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّ رَحۡمَۃً ‘তার নিদর্শনের মধ্যে এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে শান্তিতে থাকো এবং পরস্পরের মধ্যে দয়া ও সম্প্রীতি থাকে’ (সূরা আর-রূম : ২১)।
অতএব, বুঝা গেল বিয়ে কেবল ব্যক্তিগত শান্তি নয়, বরং এটি সামাজিক শান্তির একটি মূল ভিত্তি। যখন পরিবারে শান্তি থাকে, তখন সমাজও শান্তিময় ও স্থিতিশীল হয়। বিয়ে এমন একটি বন্ধন, যা বংশগত ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, সমাজে মমতা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে এবং একটি সুশৃঙ্খল জাতি গঠনে অবদান রাখে।
৯. বিয়ে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার মাধ্যম
বিয়ে কেবল একটি সামাজিক ব্যবস্থা নয়, এটি একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানব জীবনের যৌবনকাল এমন একটি সময়, যখন শারীরিক ও মানসিক উত্তেজনা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ আল্লামা নাফীসী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘শুক্র প্রবল হয়ে পড়লে তা প্রায়শই অত্যন্ত বিষাক্ত প্রকৃতি ধারণ করে। এর ফলে মন ও মগজের দিকে এক প্রকার ক্ষতিকর বাষ্পের উত্থান ঘটে, যা বেহুঁশ হওয়া বা মৃগী রোগসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক অসুবিধা সৃষ্টি করে’।[৭] শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘জেনে রাখ, শুক্রের প্রজনন ক্ষমতা যখন দেহে অত্যধিক হয়ে যায় এবং তা নির্গত হতে না পারলে, তখন তা মগজে একটি ক্ষতিকর বাষ্পের সৃষ্টি করে’।[৮]
অতএব বিয়ে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত পথ। এটি শুধু ব্যক্তিগত সুখই নিশ্চিত করে না, বরং সামাজিক শান্তি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে তোলে।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* দাওরায়ে হাদীছ, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা। অধ্যয়নরত, আক্বীদা ও দাওয়াহ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
তথ্যসূত্র :
[১]. ইবনু মানযূর, নিসানুল আরব, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭৬৬; আল-ফিরুযাবাদী, আল-কামুসুল মুহীত, পৃ. ১৩৭৪।
[২]. ইবনু উছায়মীন, কিতাবুয যাওয়ায, পৃ. ১২।
[৩]. ড. ছলিহ ইবনু গনিম, রিসালাতু ফিল ফিক্বহিল মুয়াসসার (সঊদী আরব : ওযারাতুশ শুয়ূনিল ইসলামিয়্যাহ ওয়াল আওক্বাফি ওয়াদ দাওয়াতি ওয়াল ইরশাদি, ১৪২৫ হি.), পৃ. ১২২।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৬৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০০।
[৫]. নাসাঈ, হা/৩২২৭; আবূ দাঊদ, হা/২০৫০, সনদ হাসান ছহীহ।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৬৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০০।
[৭]. আল্লামা নাফীসী, ইসলামী পারিবারিক জীবন, পৃ. ৮৫।
[৮]. শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ, হুজ্জতুল্লাহিল বালিগাহ, পৃ. ১২০।
প্রসঙ্গসমূহ »:
পরিবার