মু‘তাযিলা মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ
-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম*
(২য় কিস্তি)
[এপ্রিল’ ২০২৫-এর পর]
মু‘তাযিলাদের বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করার কারণ
মু‘তাযিলা গোষ্ঠীর অনেক নাম রয়েছে। এর কিছু তাদের বিরোধীরা, তাদের অপমান বা কটাক্ষ করার উদ্দেশ্যে দিয়েছে, আবার কিছু নাম তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য নির্ধারণ করেছে। ইনশাআল্লাহ, আমরা এখানে এসব নামের কিছু উল্লেখ করব এবং প্রত্যেকটির নামকরণের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
১. মু‘তাযিলা (المعتزلة )
এই শব্দের অর্থ ‘বিচ্ছিন্ন বা আলাদা হয়ে যাওয়া গোষ্ঠী’। আমরা আগেই মু‘তাযিলা নামকরণের উৎস আলোচনা করতে গিয়ে এ নামকরণের কারণ ব্যাখ্যা করেছি।
২. জাহমিয়্যাহ (الجهمية)
মু‘তাযিলাদেরকে ‘জাহমিয়্যাহ’ বলেও ডাকা হতো। এই নামকরণের কারণ হলো ‘জাহম ইবন সফওয়ান’ নামক একজন চিন্তাবিদের অনুসারীরা, যারা ‘জাহমিয়্যাহ’ নামে পরিচিত, মু‘তাযিলাদের আগে কিছু মতবাদ প্রচার করেছিল। যদিও তাদের আবির্ভাব মু‘তাযিলাদের থেকে খুব বেশি আগের নয়, তবে তাদের অনেক মতবাদ মু‘তাযিলাদের মতের সঙ্গে মিল ছিল। যেমন : আল্লাহর দর্শন অস্বীকার, আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার ও কুরআনকে সৃষ্টি জ্ঞান করা।
এই মতাদর্শগত মিলের কারণে অনেক সময় দুই দলকে একত্রে গণ্য করা হতো। যেহেতু জাহমিয়্যাহ প্রথমে এসেছিল এবং তাদের মতবাদ অধিক বিস্তৃত ছিল এবং মু‘তাযিলারা তাদের কিছু মত গ্রহণ করেছিল, তাই অনেক ইমাম মু‘তাযিলাদের ‘জাহমিয়্যাহ’ বলে ডাকতেন। যেমন ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর “আল-রদ ‘আলা আল-জাহমিয়্যাহ” (জাহমিয়্যাহদের বিরুদ্ধে জবাব) নামক কিতাবে এবং ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর অনুরূপ কিতাবে মুলত: মু‘তাযিলাদেরই লক্ষ্য করেছিলেন। কারণ পরবর্তী কালে এই সব মতবাদের ক্ষেত্রে মু‘তাযিলারাই ছিল সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর “মিনহাজ আস-সুন্নাহ” কিতাবে বলেন, ‘তৃতীয় শতকের শুরুতে, খলীফা আল-মামুন, আল-মু‘তাসিম ও আল-ওয়াসিক্বের আমলে, জাহমিয়্যাহ তথা আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকারকারীরা যখন পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষকে তাদের মতবাদে আহ্বান জানাতে লাগল, তখন এই বিতর্ক শুধু মু‘তাযিলাদের সঙ্গে ছিল না, বরং জাহমিয়্যাহর অন্তর্ভুক্ত ছিল মু‘তাযিলা, নাজ্জারিয়া, দুরারিয়া ও কিছু মুরজিয়া ফের্কা। অতএব, প্রত্যেক মু‘তাযিলা জাহমিয়্যাহ, কিন্তু প্রত্যেক জাহমিয়্যাহ মু‘তাযিলা নয়। কারণ, জাহম ইবন সফওয়ান আরও চরমভাবে আল্লাহর নাম ও গুণাবলির অস্বীকার করতেন’।[১]
‘ফিরাকুল মু‘আছিরা’ গ্রন্থকার বলেন, ‘মু‘তাযিলা ও জাহমিয়া দলগুলোর মধ্যে আক্বীদার বিভিন্ন বিষয়ে মিল থাকার কারণে এবং যেহেতু জাহমিয়্যাহ দলটি আগে থেকে প্রকাশ পেয়েছিল, তাই ইসলামী পণ্ডিতগণ মু‘তাযিলা দলকে ‘জাহমিয়্যাহ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ, মু‘তাযিলারা যখন প্রথম উদ্ভব হয়, তখন তারা জাহমিয়্যাদের পুরনো মতামতগুলো পুনরায় জীবিত করে তোলে। তারা যেন সেই নিভে যাওয়া আগুনে নতুন করে ফুঁ দিয়ে আবার তা জ্বালিয়ে তোলে। এ কারণে মু‘তাযিলারা ‘জাহমিয়্যাহ’ নামে ডাকার যোগ্য হয়ে পড়ে। তবে মনে রাখতে হবে, জাহমিয়্যাহ নামটি মু‘তাযিলার চেয়ে ব্যাপকতর। অর্থাৎ প্রত্যেক মু‘তাযিলা একজন জাহমি, কিন্তু প্রত্যেক জাহমি মু‘তাযিলা নয়’।[২]
৩. ক্বাদারিয়্যা (القدرية)
মু‘তাযিলাদের আরেকটি নাম হচ্ছে ক্বাদারিয়্যা। ইমাম আল-বাগদাদি বলেন, মু‘তাযিলারা এই বিষয়ে একমত যে, মানুষই তাদের কাজের স্রষ্টা বা নির্ধারক এবং আল্লাহ্র কোনো ভূমিকা নেই মানুষের কাজ বা অন্যান্য জীবের আচরণে। এই বিশ্বাসের কারণে মুসলিমগণ তাদের ক্বাদারিয়্যা নামে আখ্যায়িত করেছেন।[৩] তবে মু‘তাযিলারা এ নামে (ক্বাদারিয়া) পরিচিত হতে সন্তুষ্ট নয়। তাই তারা বলে থাকেন, আসলে ‘ক্বাদারিয়া’ বলা উচিৎ তাদেরকে, যারা বিশ্বাস করে যে সবকিছু ভালো-মন্দ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। মুকবিলী এই প্রসঙ্গে মু‘তাযিলাদের পক্ষ নিয়ে তাদের ‘ক্বাদারিয়া’ নামে ডাকার বিরোধিতা করেন এবং এ নামকরণের যুক্তির জবাব দেন। তিনি বলেন, যদি ‘ক্বদর’ বলতে বোঝানো হয় আল্লাহর চিরন্তন জ্ঞান, তাহলে মু‘তাযিলাদের ‘ক্বদর অস্বীকারকারী’ বলা একটি ভুল অপবাদ, কারণ সব মু‘তাযিলা আল্লাহর পূর্বজ্ঞান (আযলী ইলম) স্বীকার করে এবং এর অস্তিত্ব মেনে নেয়। সুতরাং মু‘তাযিলারা মনে করে যে আল্লাহর জন্য ‘ক্বদর’ প্রমাণ করে, সেই-ই বরং এই ‘ক্বাদারিয়া’ নাম পাওয়ার উপযুক্ত নয়, বরং যারা আল্লাহর পক্ষ থেকে সব কিছু নির্ধারিত বলে, তাদেরই এই নামে ডাকা উচিৎ। তবে ইবনু কুতাইবা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বিরোধিতা করে বলেন,
أن المعتزلة نفوا القدر عن الله وأضافوه إلى أنفسهم، فوجب أن يسموا قدرية، لأن مدعي الشيء لنفسه أحق أن يدعى به
‘মু‘তাযিলারা আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্বদরের ধারণা অস্বীকার করেছে এবং তা নিজেদের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল বলে দাবী করেছে, তাই তাদের ‘ক্বাদারিয়া’ বলা যুক্তিযুক্ত। কারণ যে কেউ কোনো কিছুর দাবীদার, তাকেই সেই নামে ডাকা সবচেয়ে উপযুক্ত’।[৪]
৪. ছানাবিয়্যাহ ও মাজূসিয়্যাহ (الثنوية والمجوسية)
ইতিহাসবিদ আল-মাকরীযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, মু‘তাযিলাদের ‘ছানাবিয়্যাহ’ (দ্বৈতবাদী) বলা হয়, কারণ তারা বলে, ভালো হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর মন্দ হচ্ছে মানুষের পক্ষ থেকে। এ কথা দ্বৈতবাদী মাজূসী ধর্মাবলম্বীদের মতবাদের মতো, যারা মনে করে আলো (ভালো) ও অন্ধকার (মন্দ) দু’টি আলাদা উৎস থেকে আসে। এ কারণে, মু‘তাযিলারা তাদের অন্যান্য অনেক নামের পাশাপাশি ‘মাজূসী’ বলেও পরিচিতি লাভ করে।
নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মু‘তাযিলারা এই (ক্বাদারিয়া) নামটি কখনোই গ্রহণ করেনি। তারা এই নাম থেকে নিজেদের মুক্ত করার চেষ্টা করেছে এবং এই নামকে তীব্রভাবে অস্বীকার করেছে, মূলত ‘মাজূসী’ (অগ্নিপূজক) নামে আখ্যায়িত হওয়ার অপবাদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। কারণ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ‘ক্বাদারিয়া’ সম্প্রদায়কে এই উম্মতের মাজূসী বলে নিন্দা করেছেন।[৫]
‘ফিরাকুল মু‘আছিরা’ গ্রন্থকার বলেন, ‘তাদের অন্য একটি নাম ছানাবিয়্যাহ ও মাজূসিয়্যাহ। তাদেরকে ছানাবিয়্যাহ (দ্বৈতবাদী) এবং মাজূসিয়্যাহ (অগ্নি উপাসক) বলেও ডাকা হয়েছে। যদিও তারা এই নামগুলোকে ঘৃণা করে এবং স্বীকার করে না, তবে বিরোধীরা তাদের এই নামে আখ্যায়িত করেছে। এই নামকরণের কারণ হলো মু‘তাযিলা মতবাদ নিজেই এই ধরণের ধারণা দেয়, যা বলেঃ ভালো আল্লাহর পক্ষ থেকে আর মন্দ মানুষের পক্ষ থেকে। এই মতবাদটি দ্বৈতবাদীদের এবং অগ্নি উপাসকদের মতবাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কারণ তারা বিশ্বাস করত, একজন সৃষ্টিকর্তা আছে ভালোর জন্য এবং আরেকজন খারাপের জন্য’।[৬]
৫. খাওয়ারিজদের নপুংসক (مخانيث الخوارج)
মু‘তাযিলাদের একটি অপবাদমূলক নাম হলো “খাওয়ারিজদের নপুংসক”। এই নাম দেওয়ার পেছনের কারণ হলো মু‘তাযিলারা, বিশেষত তাদের প্রথম যুগের নেতা ওয়াছিল ইবনু ‘আতা এবং ‘আমর ইবন ‘উবাইদ কিছু বিষয়ে খাওয়ারিজদের সঙ্গে মিল রাখতেন। তারা বিশ্বাস করত, মহাপাপকারী চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, যা খাওয়ারিজদের মতের অনুরূপ। তবে তারা এটাও বলত, এরা কাফির নয়। অর্থাৎ তারা খাওয়ারিজদের মতো চরম অবস্থান নেয়নি। তারা অপরাধীকে চিরশাস্তির যোগ্য মনে করলেও তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়নি, ফলে এই দ্বৈত অবস্থানের কারণে তারা এই নামে পরিচিত হয়।[৭]
৬. ওয়া‘ঈদিয়া (الوعيدية)
মু‘তাযিলাদের আরেকটি নাম ‘ওয়া‘ঈদিয়া’, যা এসেছে আখেরাতে আল্লাহর শাস্তির (وعيد) বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করার কারণে। এই নামটি তাদেরকে দিয়েছে একজন মুরযিয়া কবি, যিনি আবু হাশিম আল-জুব্বায়ী-কে ব্যঙ্গ করে একটি কবিতা লিখেছিলেন।
يعيب القول بالإرجاء حتى ............يرى بعض الرجاء من الجرائر
وأعظم من ذوي الإرجاء جرما ........... وعيدي أصر على الكبائر
‘সে ইরজার মতবাদ নিন্দা করে, অথচ পাপের ক্ষেত্রে কিছু আশার (রহমতের) দিক রাখাই তো ইরজা।
কিন্তু যারা ইরজা অনুসারীদের চেয়েও বড় অপরাধী, তারা সেই ওয়া‘ঈদি (শাস্তিকামী), যারা মহাপাপের ব্যাপারে চরম অবস্থান নেয়’।
এই কবিতায় কবি ইঙ্গিত করেছেন যে, মু‘তাযিলারা গুনাহগারদের ওপর আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে এতটাই কড়া যে, তারা রহমতের কোনো দিক রাখে না, বরং কঠোর শাস্তির পক্ষেই অবিচল।[৮]
‘ফিরাকুল মু‘আছিরা’ গ্রন্থকার বলেন, ‘মূলত ‘ওয়া‘ঈদিয়া’ নামটি তাদের জন্য প্রসিদ্ধ হয়েছে তাদের সেই বিশ্বাসের কারণে, যেখানে তারা বলে, আল্লাহর ওয়াদা (ভালো প্রতিদান) ও ওয়া‘ঈদ (শাস্তির প্রতিশ্রুতি) অবশ্যই কার্যকর হবে, এতে কোনো ব্যতিক্রম নেই। তাদের মতে, আল্লাহ তাঁর ওয়াদা ও ওয়া‘ঈদে কখনোই ভুল করেন না বা তা ভঙ্গ করেন না। সুতরাং, কেউ যদি গুনাহ করে, তবে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। তবে একমাত্র শর্ত হলো, সে যদি মৃত্যুর আগে তাওবা করে, তাহলে সে শাস্তি থেকে রেহাই পেতে পারে’।[৯]
৭. আল-মু‘আত্তিলা (المعطلة)
আহলুস সুন্নাহ প্রথম যুগে আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকারকারী জাহমিয়্যাহদের ‘আল-মু‘আত্তিলা’ নামে ডাকত, কারণ তারা আল্লাহকে তাঁর গুণাবলি থেকে খালি করে দিত (তাঁর গুণগুলো অস্বীকার করত)। এই নামটি ছিল একটি নিন্দাসূচক শব্দ। উদাহরণস্বরূপ মাওয়ান ইবন মুহাম্মাদের পরাজয়ের পর, মাওসিলের লোকেরা তাঁকে গালি দিতো ‘‘হে মু‘আত্তিল (গুণবিচ্ছিন্নকারী)’, কারণ তিনি এই মতাদর্শ অনুসরণ করতেন।
যখন মু‘তাযিলারা জাহমিয়্যাহদের মতো আল্লাহর গুণ অস্বীকার করা শুরু করল, তখন তারাও ‘মু‘আত্তিলা’ নামে পরিচিত হতে লাগল। শাহরাস্তানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তা‘তীল অর্থ হলো কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট অর্থকে বাতিল করে এর অন্য ব্যাখ্যা করা’।
মু‘তাযিলারা যখন কোনো আয়াত তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে না, তখন তারা তাসবীর (রূপক ব্যাখ্যা) গ্রহণ করত। এই কাজও এক ধরণের তা‘তীল। তাই ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতো কিছু আহলুস সুন্নাহ আলিম মু‘তাযিলাদের ‘মু‘আত্তিলা’ বলতেন। ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘আছ-ছাওয়াইকুল মুরসালাহ’ লিখেছিলেন জাহমিয়্যাহ ও মু‘আত্তিলাদের বিরুদ্ধে, যেখানে মূলত মু‘তাযিলাদেরই উদ্দেশ্য করেছিলেন।[১০]
‘ফিরাকুল মু‘আছিরা’ গ্রন্থকার বলেন, ‘এই (মু‘আত্তিলা) নামটি মূলত জাহমিয়্যাদের জন্য ব্যবহার করা হতো। পরে এটি মু‘তাযিলা দলকেও দেওয়া হয়, কারণ তারা জাহমিয়্যাহদের সাথে আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার এবং তা নিষ্ক্রিয় করার ক্ষেত্রে একমত। তারা কুরআন ও হাদীছের যেসব অংশ তাদের মতবাদের সাথে মেলে না, সেগুলোর তা’বীল (অর্থ পরিবর্তন/রূপক ব্যাখ্যা) করে। এ কারণে, যারা আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করে বা স্থগিত রাখে, তাদেরকে ‘আল-মু‘আত্তিলাহ’ বলা হয়’।[১১]
মু‘তাযিলাদের কুরআন সম্পর্কে অবস্থান
মু‘তাযিলাদের যুক্তিনির্ভর চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তারা বুদ্ধিকে (আক্বল) বর্ণনার (নক্বল) ওপর প্রাধান্য দেয়। তাদের মতে, যদি কোনো কুরআনের আয়াত বা হাদীছের বাহ্যিক অর্থ যুক্তির (আক্বলের) সঙ্গে বিরোধ করে, তবে তা তায্উইল (রূপান্তরিত ব্যাখ্যা) করতে হবে, যাতে তা যুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তাদের মতে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের কাছে তিনটি দলীল বা প্রমাণ এনেছেন। যথা : ১. আক্বল ২. কিতাব এবং ৩. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)। অর্থাৎ আক্বল (বুদ্ধি), যার মাধ্যমে আল্লাহকে চেনা যায়। কিতাব (কুরআন), যার মাধ্যমে ইবাদতের পদ্ধতি জানা যায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ), যার মাধ্যমে বান্দাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর বার্তা পৌঁছায়।
তারা বলত, বুদ্ধিই এই শেষ দুই দলীলের মূল, কারণ : মানুষ কুরআন ও রাসূলের সত্যতা বুঝেছে আক্বল দিয়েই, কিন্তু কুরআন ও রাসূলের মাধ্যমে আক্বলকে চেনেনি। এইভাবে তারা আক্বলকে কুরআন ও সুন্নাহর বিচারক বানিয়েছে, যা কিছু আক্বলের সঙ্গে মিল আছে, তারা তা গ্রহণ করে, আর যা কিছু আক্বলের সঙ্গে বিরোধ করে, তা প্রত্যাখ্যান করে।[১২]
মু‘তাযিলাদের দৃষ্টিতে সুন্নাহ
ছহীহ সুন্নাহ হলো কুরআনের পর ইসলামী আইনব্যবস্থার দ্বিতীয় উৎস। এর অবস্থান কুরআনের পাশে, কারণ সুন্নাহ কুরআনের সংক্ষিপ্ত কথা ব্যাখ্যা করে, অস্পষ্ট বিষয় পরিষ্কার করে, সাধারণ বক্তব্যকে নির্দিষ্ট করে এবং যা অসীমভাবে বলা হয়েছে, তা সীমিত করে তুলে ধরে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি আপনার প্রতি যিকর (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, যেন আপনি মানুষের কাছে সে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা করে’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত : ৪৪)। এই দিক থেকে সুন্নাহর একটি নির্দিষ্ট প্রামাণ্যতা রয়েছে এবং মুসলিমদের জন্য এর নির্দেশ অনুযায়ী আমল করা ফরয।
পাশ্চাত্যের অনেক প্রাচ্যবিদ (orientalists) এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিল যে, সুন্নাহ ইসলামী শরী‘আতের দ্বিতীয় প্রধান উৎস। তাই তারা সবসময় সুন্নাহকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। তারা জানত, যদি সুন্নাহর ভিত্তি নষ্ট করা যায়, তাহলে ইসলামকেও দুর্বল করা যাবে। কারণ নবী (ﷺ)-এর হাদীছ বা জীবনীর ওপর আঘাত মানেই ইসলাম ধর্মের ওপর আঘাত, যা বিশ্বাস ও কর্ম উভয় দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই পাশ্চাত্য চিন্তাবিদরা মু‘তাযিলাদের পন্থায় সন্তুষ্ট ছিল, কারণ মু‘তাযিলারা আক্বল (বুদ্ধি)-কে কুরআন ও সুন্নাহর ওপরে স্থান দিয়েছিল। তারা মু‘তাযিলাদের প্রশংসা করত এবং তাদেরকে বলত,
ইসলামের মুক্তচিন্তার চিন্তাবিদ (free thinkers), চিন্তাজগতের আলোকিত পথপ্রদর্শক। বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ গোল্ডজিহার মু‘তাযিলাদের সম্পর্কে বলেছিলেন, “তারা ধর্মীয় জ্ঞানের উৎসকে বিস্তৃত করেছে এবং তাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন উপাদান বুদ্ধি (reason) অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা এতদিন পর্যন্ত ধর্মীয় বিশ্লেষণ থেকে অনেকটা দূরে ছিল।”[১৩]
মু‘তাযিলাদের নিকট সুন্নাহর কোন মূল্য নেই। তারা সুন্নাহর চাইতে আক্বল বা জ্ঞানকে প্রাধান্য প্রদান করে। মু‘তাযিলা গোষ্ঠী বুদ্ধিকে এতটা উচ্চ স্থানে নিয়েছিল যে তারা বলেছিল, যদি বুদ্ধি ও সুন্নাহ পরস্পর বিরোধী হয়, তবে বুদ্ধিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, কারণ বুদ্ধিই বর্ণনার ভিত্তি। তারা হাদীছের ব্যাপারে সন্দেহপ্রবণ অবস্থান গ্রহণ করত; কখনো হাদীছের সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করত, আবার কখনো তা অস্বীকার করত বা নিজের মতো ব্যাখ্যা দিত, কারণ তারা হাদীছকে বুদ্ধির আলোকে বিচার করত, হাদীছ দ্বারা বুদ্ধিকে নয়। তারা বলত, এক ব্যক্তির বর্ণিত হাদীছ (খবরে ওয়াহিদ) দ্বারাই বিশ্বাসগত বিষয় নির্ধারণ করা যায় না। তারা হাদীছ শিক্ষা গ্রহণকে নিন্দা করত এবং মানুষকে তা শিখতে নিষেধ করত, হাদীছের উপকারিতা ও দলীল হিসেবে এর গুরুত্বকে খাটো করে দেখাত এবং স্পষ্ট করে বলত যে হাদীছের প্রয়োজন নেই, কারণ মানুষ তার বুদ্ধি দ্বারাই সব কিছু বুঝে নিতে পারে এবং চিন্তাশক্তি হাদীছ ছাড়াও চলতে পারে।[১৪]
মু‘তাযিলাদের দৃষ্টিতে বুদ্ধি (আক্বল)
আক্বল বা বুদ্ধি মু‘তাযিলাদের মতে এমন একটি সূক্ষ্ম ও মূলগত অনুভূতি, যার দ্বারা মানুষ পশু থেকে পৃথক হয়। তারা বলেন, আক্বল হলো একগুচ্ছ বিশেষ জ্ঞান (মূলতঃ আবশ্যিক ও স্বাভাবিক জ্ঞান), যা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির (মুকাল্লাফ) মধ্যে পাওয়া গেলে, সে তখন সঠিকভাবে চিন্তা করতে, যুক্তি ব্যবহার করতে ও শরী‘আতের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়। এই সব জ্ঞান একত্রিত না হলে, তা আক্বল নামে গণ্য হয় না। আলাদা আলাদাভাবে থাকলে তা আক্বলের পরিচয়ে পৌঁছায় না। এই আক্বলের প্রতি এমন গুরুত্ব দেওয়ার কারণে মু‘তাযিলারা গ্রিক দার্শনিকদের চিন্তাধারায় ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল, গ্রিক পণ্ডিতদের পদাঙ্ক অনুসরণ করত, তাদের গ্রন্থ অধ্যয়ন করত এবং তা মহিমান্বিত মনে করত। তারা যুক্তিনির্ভর পদ্ধতিকে অবলম্বন করেছিল বরং আক্বলের ওপর কুরআন ও সুন্নাহর চেয়েও বেশি নির্ভর করত।
তারা যুক্তির দলীলকে (আক্বলি দলীল) শরী‘আতের দলীলের ওপরে স্থান দিয়েছিল। কোনো হাদীছ যদি যুক্তির সঙ্গে না মেলে তা যদি ছহীহ হাদীছও হয়, তাহলেও তারা তা অস্বীকার করত। কুরআনের কোনো আয়াত যদি তাদের যুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হতো, তাহলে তারা তা তায্উইল (অন্যভাবে ব্যাখ্যা) করত।
তারা বিশ্বাস করত যে, আক্বল নিজেই ভালো-মন্দ নির্ধারণ করতে পারে, এমনকি যদি শরী‘আতের কোনো নির্দেশনা না-ও আসে। তাদের মতে ভালো (হাসান) ও মন্দ (কবীহ) এই দুই গুণ বস্তুর নিজস্ব গুণ, এগুলো শরী‘আতের কারণে ভালো-মন্দ হয়নি বরং নিজস্বভাবে ভালো বা মন্দ।[১৫]
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* পি-এইচ. ডি গবেষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
তথ্যসূত্র:
[১]. শায়খ ‘আলওয়া ইবনু আব্দুল ক্বাদির, মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম (মাওক্বি‘উদ দুরারিস সানিয়্যাতি ‘আলাল ইনতারনিত), ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩২৬; মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নববিয়্যাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২০৪।
[২]. تسمية المعتزلة جهمية: ولهذا الاتفاق بين المعتزلة والجهمية في تلك المسائل العقدية، ولسبق الجهمية في الظهور، أطلق العلماء اسم الجهمية على المعتزلة، وذلك لأن المعتزلة هم الذين احيوا آراء الجهمية في مبدأ ظهورهم،حيث جاء المعتزلة ونفخوا في رمادهم وصيروها جمرا من جديد، ومن هنا استحق المعتزلة أن يطلق عليهم جهمية. فالجهمية أعم من المعتزلة فكل معتزلي جهمي، وليس كل جهمي معتزليا -দ্র. ড. গালিব ইবনু ‘আলী ‘আওয়াজী, ফিরাকুল মু‘আছিরা, ৩য় খণ্ড (জেদ্দা : আল-মাকতাবাতুল আছরিয়্যাহ, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪২২ হি.), পৃ. ১১৬৬।
[৩]. আব্দুল ক্বাহির ইবনু ত্বাহির আল-বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক্ব (বৈরূত : দারুল আফাক্ব, ২য় সংস্করণ, ১৯৭৭ হি.), পৃ. ৯৪।
[৪]. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩২৬; ফিরাকুল মু‘আছিরা, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১১৬৭।
[৫]. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩২৬।
[৬].ومن أسمائهم الثنوية والمجوسية: وهم ينفرون من هذا الاسم، والذي حمل المخالفين لهم على تسميتهم به هو مذهب المعتزلة نفسه، الذي يقرر أن الخير من الله والشر من العبد، وهو يشبه مذهب الثنوية والمجوس الذي يقرر وجود إلهين: أحدهما للخير والآخر للشر -দ্র. ফিরাকুল মু‘আছিরা, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১১৬৭।
[৭]. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩২৬।
[৮]. প্রাগুক্ত।
[৯]. الوعيدية: وهو ما اشتهروا به من قولهم بإنفاذ الوعد والوعيد لا محالة، وأن الله تعالى لا خلف في وعده ووعيده، فلابد من عقاب المذنب إلا أن يتوب قبل الموت -দ্র. ফিরাকুল মু‘আছিরা, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১১৬৭।
[১০]. মাওসূ‘আতুল ফিরাক্বিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩২৬।
[১১]. المعطلة: وهو اسم للجهمية أيضا ثم أطلق على المعتزلة لموافقتهم الجهمية في نفي الصفات وتعطيلها وتأويل ما لا يتوافق مع مذهبهم من نصوص الكتاب والسنة، -দ্র. ফিরাকুল মু‘আছিরা, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১১৬৮।
[১২]. ড. আব্দুল মাজীদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-ও‘আলান, মাওক্বিফুল মুসতাশরিক্বীন মিনাল মু‘তাযিলা, পৃ. ২১।
[১৩]. মাওক্বিফুল মুসতাশরিক্বীন মিনাল মু‘তাযিলা, পৃ. ২১।
[১৪]. মাওক্বিফুল মুসতাশরিক্বীন মিনাল মু‘তাযিলা, পৃ. ২১।
[১৫]. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫।