কুরবানীর পরিচয়, হুকুম ও তার ইতিহাস
-আবু মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ*
ভূমিকা
ইসলামে কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত; যা ত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এক অনন্য মাধ্যম। এই ইবাদতের সূচনা নবী ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর আত্মত্যাগ ও নির্ধারিত আদেশ পালনের ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে। তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে আল্লাহর আদেশে কুরবানী করতে উদ্যত হওয়া ইতিহাস আজও প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে বিস্ময়, ভালোবাসা ও ঈমানের দীপ্তি ছড়ায়। ইসলাম কুরবানীকে শুধু পশু যব্হের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং এটিকে একটি গভীর শিক্ষার প্রতীক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই প্রবন্ধে কুরবানীর পরিচয় ও ইতিহাস তুলে ধরা হলো।
কুরবানীর পরিচয়
ক. আভিধানিক অর্থ
আরবী ‘কুরবান’ (قربان) শব্দটি ফার্সী বা উর্দূতে ‘কুরবানী’ রূপে পরিচিত হয়েছে। মুল ধাতু (قرب) থেকে নির্গত, যার অর্থ অধিক নৈকট্য, সান্নিধ্য, উৎসর্গ ইত্যাদি।
খ. পারিভাষিক অর্থ
- ইসলামী শরী‘আতের পরিভাষায়,
هو ما يُقدَّم طاعةً لله تعالى، وتعبيرًا عن الخضوع والتقرب، سواء كان ذلك بذبح الأنعام كالأضاحي والهدي، أو بالأعمال الصالحة والعبادات كالصلاة والصدقة والنذر
‘কুরবানী বলা হয় এমন জিনিসকে, যা আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য ও বন্দেগী প্রকাশের জন্য পেশ করা হয়। যেমন পশু যব্হ করা, যাতে কুরবানী ও হাদী অন্তর্ভুক্ত অথবা নেক আমল ও ইবাদত; যেমন ছালাত, ছাদাক্বাহ ও মানত ইত্যাদি’।[১]
- ইবনু মানযূর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
القُرْبَانُ ما يُتَقَرَّبُ به إلى الله من نَسِيكةٍ وغيرِها
‘কুরবানী হলো, যা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা হয়, হোক যব্হকৃত পশু বা অন্য কোন মাধ্যমে’।[২] সে হিসাবে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের জন্য যে কোন ত্যাগকে কুরবানী বলা যায়।
- ইমাম ত্বীবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
مَا يُذْبَحُ يَوم النَّحْرِ عَلَى وَجْهِ الْقُرْبَةِ
‘ঈদুল আযহার দিন আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য যে পশু যব্হ করা হয়, তাকে কুরবানী বলে’।[৩]
কুরবানীর বিধান চালু হওয়ার সময়
উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য কুরবানীর বিধান চালু হয়েছে ২য় হিজরীতে মদীনায় বনু ক্বায়নুক্বা যুদ্ধের পর, যা কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। এটি নবী (ﷺ)-এর কথা ও কাজ থেকে প্রমাণিত হয়েছে এবং এটির উপর মুসলিমদের আমল চালু রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَ انْحَرْؕ ‘অতএব, আপনার রবের জন্য ছালাত পড়ুন এবং কুরবানী করুন’ (সূরা আল-কাওছার: ২)। তিনি আরও বলেন,
وَ لِكُلِّ اُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِّيَذْكُرُوا اسْمَ اللّٰهِ عَلٰى مَا رَزَقَهُمْ مِّنْۢ بَهِيْمَةِ الْاَنْعَامِ
‘আমরা প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানীর বিধান দিয়েছি, যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে সেই পশুর উপর, যা তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে রিযিক হিসাবে দিয়েছেন’ (সূরা আল-হজ্জ: ৩৪)।
কুরবানীর হুকুম
জামহূর আলেমের মতে, চতুষ্পদ জন্তু (উট, গরু, ছাগল) কুরবানী করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। সবগুলোর নর ও মাদি। ভেড়া ও দুম্বা ছাগলের মধ্যে গণ্য এবং মহিষ গরুর মধ্যে গণ্য হবে (সূরা আল-আন‘আম: ১৪৩-৪৪)। অন্য একদলের মতে, সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য এটি ওয়াজিব। প্রসিদ্ধ চার ইমাম এবং শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) এ মতটি পসন্দ করেছেন (মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ, কুরবানী সংক্রান্ত ৬৭টি মাসআলা, পৃ. ২)। অতএব কোনো স্বচ্ছল ও সামর্থ্যবান মুমিন ব্যক্তির জন্য কুরবানীর ব্যাপারে অবহেলা করা উচিত নয়। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا
‘যার সামর্থ্য আছে কিন্তু কুরবানী দেয় না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে-কাছেও না আসে’।[৪]
তবে এটি অবশ্যক নয় যে, সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও যেকোন মূল্যে প্রত্যেককে কুরবানী করতেই হবে। লোকেরা যাতে এটাকে আবশ্যক মনে না করে, সেজন্য সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আবূ বকর ছিদ্দীক, উমর ফারুক, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, বেলাল, আবূ মাসঊদ আনছারী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) প্রমুখ ছাহাবীগণ কখনো কখনো কুরবানী করতেন না।[৫] উল্লেখ্য, যাকাত ফরয হয় এরূপ সম্পদ থাকলে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব, একথা ঠিক নয়। বরং সামর্থ্য থাকলে তিনি কুরবানী করবেন, অন্যথা করবেন না।[৬]
কুরবানী করার সময়সীমা
ঈদুল আযহার সারাদিন ও পরের তিন দিনের যেকোন সময় কুরবানী করা যাবে।[৭] তবে প্রথম দিন করাই উত্তম। সুতরাং মোট চারদিন কুরবানী করার অনুমতি রয়েছে।
কুরবানীর সঠিক ইতিহাস
মহান আল্লাহ বলেন,
وَ لِكُلِّ اُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِّيَذْكُرُوا
اسْمَ اللّٰهِ عَلٰى مَا رَزَقَهُمْ مِّنْۢ بَهِيْمَةِ الْاَنْعَامِ١ؕ
فَاِلٰهُكُمْ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ فَلَهٗۤ اَسْلِمُوْا١ؕ وَ بَشِّرِ الْمُخْبِتِيْنَۙ.
‘আর আমরা প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানীর বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা যব্হ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে এজন্য যে, তিনি চতুষ্পদ জন্তু থেকে তাদের জন্য রিযিক নির্ধারণ করেছেন। আর তোমাদের ইলাহ একজন। অতএব তাঁর নিকটে তোমরা আত্মসমর্পণ কর এবং আপনি বিনয়ীদের সুসংবাদ দেন’ (সূরা আল-হজ্জ: ৩৪)।
কুরবানীর সূচনা
আল্লাহর হুকুমে আদম (আলাইহিস সালাম) এর দুই পুত্র ক্বাবীল ও হাবীলের দেয়া কুরবানী থেকেই কুরবানীর ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে (সূরা আল-মায়েদাহ: ২৭)। এরপর থেকে বিগত সকল উম্মতের উপর কুরবানীর বিধান চালু ছিল। তবে সেই সকল কুরবানীর বিধান আমাদেরকে জানানো হয়নি। মুসলিম উম্মাহর উপর যে কুরবানীর বিধান নির্ধারিত হয়েছে, তা মূলত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) কর্তৃক পুত্র ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে আল্লাহ সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানী দেয়ার অনুসরণে- অনুকরণে।[৮] যা মুক্বীম ও মুসাফির সর্বাবস্থায় পালনীয়।[৯] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাদানী জীবনে নিয়মিত কুরবানী করেছেন।[১০] অতএব এটি পরিষ্কার যে, আদম সৃষ্টির পর থেকে পৃথিবীতে চতুষ্পদ জন্তু কুরবানীর বিধান রয়েছে। এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য উত্তম রিযিক হিসাবে নির্ধারিত। পূজার বস্তু হিসাবে নয়।
ইবরাহীমী কুরবানীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনা করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন,
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يٰبُنَيَّ اِنِّيْۤ
اَرٰى فِي الْمَنَامِ اَنِّيْۤ اَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَا ذَا تَرٰى ١ؕ قَالَ
يٰۤاَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ١ٞ سَتَجِدُنِيْۤ اِنْ شَآءَ اللّٰهُ مِنَ
الصّٰبِرِيْنَ۰۰۱۰۲ فَلَمَّاۤ اَسْلَمَا وَ تَلَّهٗ لِلْجَبِيْنِۚ۰۰۱۰۳ وَ نَادَيْنٰهُ اَنْ يّٰۤاِبْرٰهِيْمُ۠ۙ۰۰۱۰۴ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّءْيَا١ۚ اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِيْنَ۰۰۱۰۵ اِنَّ هٰذَا لَهُوَ الْبَلٰٓؤُا الْمُبِيْنُ۰۰۱۰۶ وَ فَدَيْنٰهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ۰۰۱۰۷ وَ
تَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْاٰخِرِيْنَۖ.
‘অতঃপর সে (ইসমাঈল) যখন তার পিতার সাথে চলাফিরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বললেন, ‘বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যব্হ করছি, এখন বল, তোমার অভিমত কী? সে বলল, ‘হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা আপনি প্রতিপালন করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। অতঃপর দু’জনেই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিল। আর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাকে উপুড় করে শুইয়ে দিল। তখন আমি তাকে ডাক দিলাম, ‘হে ইবরাহীম! স্বপ্নে দেয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করেই ছাড়লে। এভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। অবশ্যই এটা ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমরা এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে পুত্রটিকে ছাড়িয়ে নিলাম। আর আমরা তাকে পরবর্তীদের মাঝে স্মরণীয় করে রেখে দিলাম’ (সূরা আছ-ছাফফাত: ১০২-০৮)।
ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর ৮৬ বৎসর বয়সে ইসমাঈল বিবি হাজেরার গর্ভে এবং ৯৯ বছর বয়সে ইসহাক বিবি সারাহর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন।[১১] ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) সর্বমোট ২০০ বছর বেঁচে ছিলেন।[১২] আর ‘যবীহুল্লাহ’ ছিলেন ইসমাঈল; ইসহাক নন।[১৩]
সংক্ষেপে ঘটনা
ফার্রা বলেন, যব্হর সময় ইসমাঈলের বয়স ছিল ১৩ বছর। ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ঐ সময় তিনি কেবল সাবালকত্বে উপনীত হয়েছিলেন।[১৪] এ এমন সময় পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি তার একমাত্র সন্তান ইসমাঈলকে কুরবানী করছেন। নবীদের স্বপ্ন ‘অহী’ হয়ে থাকে। তাদের চর্মচক্ষু মুদিত থাকলেও অন্তরচক্ষু খোলা থাকে। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) একই স্বপ্ন পরপর তিনরাত্রি দেখেন। প্রথম রাতে তিনি স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে উঠে ভাবতে থাকেন, কী করবেন। এজন্য প্রথম রাতকে (৮ই যিলহজ্জ) ‘ইয়াউমুত তারবিয়াহ’ (يَوْمُ التَّرْوِية) বা ‘স্বপ্ন দেখানোর দিন’ বলা হয়। এদিন হজ্জের ইহরাম বেঁধে আরাফা ময়দানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে হয়। দ্বিতীয় রাতে পুনরায় একই স্বপ্ন দেখার পর তিনি নিশ্চিত হন যে, এটি আল্লাহর নির্দেশ। এজন্য এ দিনটিকে (৯ই যিলহজ্জ) ‘ইয়াউমু আরাফাহ’ (يوم عرفة) বা ‘নিশ্চিত হওয়ার দিন’ বলা হয়। আর এটি হল হজ্জের দিন। তৃতীয় দিনে পুনরায় একই স্বপ্ন দেখায় তিনি ছেলে (ইসমাইল)-কে কুরবানী করার সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য এ দিনটিকে (১০ই যিলহজ্জ) ‘ইয়াউমুন নাহর’ (يَوْمُ النَّحْر) বা ‘কুরবানীর দিন’ বলা হয়।[১৫]
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যখন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানীর জন্য নিয়ে যান, তখন শয়তান তাকে তিন স্থানে বাধা দেয়। ফলে তিনি শয়তানকে তিন স্থানে তিনবার সাতটি করে কংকর ছুঁড়ে মারেন। অতঃপর যখন তিনি ছেলেকে কুরবানীর জন্য মাটিতে উপুড় করে ফেলেন। তখন পিছন থেকে আওয়াজ আসে (يَا إِبْرَاهِيمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّءْيَا) ‘হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্ন সত্যে পরিণত করেছ’ (সূরা আছ-ছাফফাত: ১০৪)। হাদীছে যেমনটি বলা হয়েছে, فَالْتَفَتَ إِبْرَاهِيمُ فَإِذَا هُوَ بِكَيْشٍ أَبْيَضَ أَقْرَنَ أَعْينَ ‘ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাকিয়ে দেখেন একটি শিংওয়ালা সাদা দুম্বা দাঁড়িয়ে আছে’।[১৬] উক্ত সুন্নাত অনুসরণে উম্মতে মুহাম্মাদীও হজ্জের সময় তিন জামরায় তিনবার শয়তানের বিরুদ্ধে সাতটি করে কংকর নিক্ষেপ করে এবং প্রতিবারে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে থাকে।[১৭] নিঃসন্দেহে এখানে মূল উদ্দেশ্য যব্হ ছিল না, বরং উদ্দেশ্য ছিল পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর তাক্বওয়া ও আনুগত্যের পরীক্ষা নেয়া। সে পরীক্ষায় পিতা-পুত্র উভয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।
কুরবানীর উদ্দেশ্য
কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য হলো তাক্বওয়া অর্জন করা। যাতে করে এর মাধ্যমে মানুষ এ সত্য উপলব্ধি করে যে, আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহেই শক্তিশালী পশুগুলো মানুষের মত দুর্বল সৃষ্টির অনুগত হয়েছে। তাদের গোশত, অস্থি-মজ্জা ও অন্যান্য অংশে মানুষের জন্য যে উত্তম রিযিক নির্ধারিত হয়েছে, তা একান্তই আল্লাহর দয়ায়। জাহেলী যুগের আরবরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় তাদের তৈরি মূর্তিগুলোর নামে কুরবানী করত। এরপর সেই কুরবানীর গোশতের একটি অংশ মূর্তিগুলোর মাথায় রাখত এবং তার উপর রক্ত ছিটিয়ে দিত। কেউ কেউ সেই রক্ত কা‘বাগৃহের দেয়ালে লেপন করত। ইসলামে যখন কুরবানীর বিধান দেয়া হয়, তখন কিছু মুসলিম এই জাহেলী প্রথার অনুরূপ কিছু করার চিন্তা করলে আল্লাহ তা‘আলা একটি আয়াত নাযিল করেন, যাতে কুরবানীর প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন,
لَنْ يَّنَالَ اللّٰهَ لُحُوْمُهَا وَ لَا دِمَآؤُهَا وَ لٰكِنْ يَّنَالُهُ التَّقْوٰى مِنْكُمْ
‘তাদের গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, বরং তাঁর কাছে পৌঁছে কেবল তোমাদের তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি’ (সূরা আল-হজ্জ: ৩৭)।
কুরবানীর অন্তর্নিহিত শিক্ষা
- আল্লাহর রাহে আত্মোৎসর্গের প্রেরণা : মুমিনের হৃদয়ে আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গ করার জাযবা সৃষ্টি করে।
- ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর ত্যাগের আদর্শ স্মরণ : ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর তাঁর অনন্য ত্যাগপূর্ণ আদর্শের পুণ্য স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে।
- সামাজিক আনন্দ ও ভ্রাতৃত্ববোধ : উত্তম খানা-পিনার মাধ্যমে ঈমানদার সমাজে আনন্দধারা বইয়ে দেয়া।
- ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ : ভোগের বিপরীতে ত্যাগের চর্চা করে আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করা হয়।
- তাওহীদের বড়ত্বের ঘোষণা : কুরবানীর মাধ্যমে শিরকের বিরুদ্ধে তাওহীদের মহান বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়।
উপসংহার
ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর জীবনের ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, সত্যিকারের ত্যাগ কেবল তখনই সম্ভব, যখন একজন মুমিন আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে। কুরবানী আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ভোগের প্রতি নির্ভরশীলতার বিপরীতে আল্লাহর রাহে ত্যাগের এক মহিমান্বিত উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি একটি শিক্ষা, যা আমাদের হৃদয়ে পরিপূর্ণ আনুগত্য এবং মানবতার প্রতি ভালোবাসার আলোকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে পরিচালিত করে। কুরবানী শুধু পশু যব্হ করার বিষয় নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞান, যা আমাদের জীবনে ত্যাগের মহিমা, আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা এবং সত্যিকার সুখের সন্ধান এনে দেয়। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পন্থায় কুরবানী করার ও এর প্রকৃত শিক্ষা তাক্বওয়া ও ইখলাছ অর্জনের তাওফীক দান করুন-আমীন!
* দাওরায়ে হাদীছ, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা। অধ্যয়নরত, আক্বীদা ও দাওয়াহ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
তথ্যসূত্র :
[১]. রাগিব আল-আসফাহানী, মুফরাদাতু আলফাযিল কুরআন, পৃ. ৩৯৮; আল কুরতুবী, আল জামিঊ লি আহকামিল কুরআন, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২২০।
[২]. লিসানুল আরব, ১৫শ খণ্ড, পৃ. ১৪৫।
[৩]. মিরআতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতুল মাছাবীহ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৭১।
[৪]. ইবনু মাজাহ- ৩১৩৩।
[৫]. মিরআতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাছাবীহ, ৫ম খণ্ড, পৃ, ৭১-৭৩।
[৬]. ইবনু মাজাহ, হা/৩১২৩।
[৭]. মিরআতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাছাবীহ, ৫ম খণ্ড, পৃ, ১০৬।
[৮]. শাওকানী, নায়লুল আওত্বার, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২২৮।
[৯]. কুরতুবী, তাফসীর সূরা আছ-ছাফফাত: ১০৭; নায়লুল আওত্বার, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২৫৫।
[১০]. তিরমিযী, হা/১৫০৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৪৯৫৫।
[১১]. ইবনে কাছীর, তাফসীর সূরা আছ-ছাফফাত: ১০০-১১৩; কুরতুবী, তাফসীর সূরা বাক্বারাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৩২।
[১২]. ইবনে কাছর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭৪।
[১৩]. ইবনে কাছীর, তাফসীর সূরা আছ-ছাফফাত: ১০০-১১৩।
[১৪]. কুরতুবী, তাফসীর সূরা আছ-ছাফফাত: ১০২, ১৫শ খণ্ড, পৃ. ৯৯।
[১৫]. কুরতুবী, তাফসীর সূরা আছ-ছাফফাত: ১০২, ১৫শ খণ্ড, পৃ. ১০২।
[১৬]. মুসনাদেস আহমাদ, হা/২৭০৭, তাহক্বীক্ব: আহমাদ শাকের, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৯৭, সনদ সহীহ; আরনাউত্ব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এর সনদ ছহীহ; ইবনে কাছীর, তাফসীর সূরা আছ-ছাফফাত: ১০৪-১০৫, ৭ম খণ্ড, পৃ. ২৮।
[১৭]. ছহীহ বুখারী, হা/১৭৫০; ছহীহ মুসলিম, হা/১২৯৬।