শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ১০:৫০ পূর্বাহ্ন

ছাহাবায়ে কেরামকে গালি দেয়া নিষিদ্ধ

- মূল : মুহাম্মাদ আল-মুনজেরী
- অনুবাদ : ড. মুযাফফর বিন মুহসিন


 
[উম্মতে মুহাম্মাদীর সেরা ব্যক্তিবর্গ হলেন ছাহাবায়ে কেরাম। তাঁরাই সম্মান ও সম্ভ্রমের দিক থেকে সর্বশীর্ষে। তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন খুলাফায়ে রাশেদীন আবু বকর, ওমর, উছমান ও আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)। তাদেরকে গালি দেয়া, ভর্ৎসনা করা, তাঁদের সম্পর্কে কটুক্তি করা, সমালোচনা করা, অতিভক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে সীমালংঘন করা সবই শরী’আতে নিষিদ্ধ। কিন্তু মুসলিম নামের কিছু সম্প্রদায় তাঁদের সম্পর্কে সমালোচনা করতে সোচ্চার। এদের অন্যতম হল, বহু সংখ্যক দল ও উপদলে বিভক্ত শী’আ সম্প্রদায়। তারা বিশেষ করে ‘মুহাররাম’ মাসের ১০ তারিখে আলী ও তদীয় পুত্র হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে অতিভক্তি দেখাতে গিয়ে অন্য ছাহাবীগণকে গালি দেয়, সমালোচনা করে এমনকি মুরতাদ, কাফের ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে থাকে। সেদিন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর নামে বকরী বেঁধে রেখে বেত্রাঘাত করে এবং বিভিন্নভাবে অস্ত্রাঘাতে রক্তাক্ত করে প্রতিশোধের নামে আত্মতৃপ্তি মেটায়। এই ধারণায় যে, আয়েশা ও আমর ইবনুল আছ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) উভয়ের চক্রান্তে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) প্রথম খলীফা নির্বাচিত না হয়ে আবুবকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাই তাঁরা ছিলেন কাফের?[১] বিশেষ করে তারা মু‘আবিয়াহ ও তাঁর পুত্র ইয়াযীদকে কাফের, মাল‘ঊন আখ্যায়িত করে এই ভেবে যে, ইয়াযীদের চক্রান্তে হুসাইনকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মতে, আবু বকর, ওমর ও উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) ছিলেন অবৈধ খলীফা।[২] অন্য এক উপদলের মতে তাঁরা ছিলেন কাফের। তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর আবু বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে ছাহাবীগণ বায়‘আত করে মুরতাদ হয়ে গেছেন।[৩] তাছাড়া তারা আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে আল্লাহ্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। অবশ্য তাঁর যুগে এটা প্রকাশ পাওয়ায় এই চরমপন্থীদের তিনি জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিলেন।
(قد ظهر هؤلاء في حياة على رضى الله عنه قد حرقهم على بالنار لإطفاء فتنتهم...) [৪]

হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে নবীদের মর্যাদা দেয়ার কারণে শী‘আরা তাঁর নামের শেষে (রাযিয়াল্লাহু আনহু) না বলে ন বলে থাকে এবং ১২ ইমামে বিশ্বাসী বলে তাঁর নামের প্রথমে ইমাম ব্যবহার করে থাকে, যা অন্য ছাহাবীদের বেলায় ব্যবহার করে না। দুর্ভাগ্য সুন্নী মুসলমানদের যে, তারা ভ্রান্ত আক্বীদাধারী শী‘আদের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে ১০ মুহাররামে সানন্দে তাদের অনুষ্ঠান পালন করে থাকে, অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ ৯ ও ১০ তারিখে দিনে ছিয়াম পালন ছাড়া[৫] হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর জন্ম-মৃত্যু, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, ইবাদত-ফযীলত ইত্যাদির শরী‘আতের সাথে কোন সম্পর্ক নেই, সবই বিদ‘আত।

অন্যদিকে ভ্রান্ত ফের্কা খারেজীদের ন্যায় কেউ কেউ মু‘আবিয়াহ ও আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এবং আয়েশা ও আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ সম্পর্কে কঠোর সমালোচনা করে থাকে। অথচ এগুলো হয়েছিল ইহুদীদের চক্রান্তের কারণে। তাছাড়া তারা ছাহাবী তাঁদের সম্পর্কে সমালোচনা করার অধিকার কেউ রাখে না। মূলত ছাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে কটুক্তির পরিণতি অবগত করানোই এই অনুবাদের একমাত্র লক্ষ্য - অনুবাদক]

নবী ও রাসূলগণের পর তাঁদের ছাহাবীগণই সৃষ্টিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, সর্বোত্তম যুগের অন্তর্গত, মুসলিমদের অনুকরণীয় আদর্শ, মুমিনদের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত, প্রমাদশূন্য অভ্রান্ত দ্বীনের ঝাণ্ডা উড্ডয়ণকারী এবং তার চৌহদ্দি সংরক্ষণে অতন্দ্রপ্রহরী। তাঁরা সঠিক পথের প্রকৃত প্রভাকর-জ্যোতি, বদান্যতা ক্ষরণে সত্যসন্ধ, শত্রুর প্রতিবাদে মুগেন্দ্র-সিংহ। মুমিনরা নিজেদের বাসনাকে রাতে-দিনে তাঁদের মর্যাদা বর্ণনায় সীমাবদ্ধ রাখে, সকাল-সন্ধ্যায় সুরেলা কণ্ঠে ধ্বনিত তাঁদের প্রশংসার সঙ্গীত শ্রবণে নিজেদের কর্ণকে রাখে অবারিত এবং স্ব স্ব অন্তরসমূহও সে দিকেই ধাবিত হয় মহব্বতে ও পরিশ্রান্তরূপে।

এই মর্যাদা যে অস্বীকার করে তার জন্য এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, সে যেন দিনের মধ্যাহ্নভাগে উদ্‌গম সূর্যকিরণকে অস্বীকার করে। অথচ মহা প্রতাপশালী পরাক্রমশীল আল্লাহ তা‘আলা তাঁদেরকে পবিত্র করেছেন এবং তাঁরই মনোনয়ন প্রাপ্ত রাসূল (ﷺ) তাঁদের মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। যেন আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের বিরুদ্ধাচারীর দৃষ্টিশক্তি বিলোপ সাধন করেন, তার চোখের উপর পর্দায় অন্ধকারাচ্ছন্ন করেন। ফলে সে হয়ে যায় সর্বস্ব অন্ধ ধূর্ত-নিকৃষ্ট আত্মাধারী এবং এর দ্বারা তার হৃদয়ের কুটিলতা ও আক্বীদাগত বিভ্রান্তিও সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

সুতরাং এ সমস্ত বিভ্রান্তিকর বিষয়াবলী থেকে ছাহাবায়ে কেরামকে রক্ষা করা শরী‘আত কর্তৃক অপরিহার্য কর্তব্য, দ্বীনি দায়িত্ব। তাঁদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো, সুপ্রসন্ন থাকা ও তাদের সম্পর্কে উত্তম আলোচনা করা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদার মূলনীতি সমূহের একটি। অতএব যে তাঁদের গালমন্দ করবে, কটু কথা বলবে, ভর্ৎসনা করবে অথবা তাঁদের দোষ-ত্রুটি উদ্ঘাটন করবে, সে বিভ্রমে নিপতিত হবে, পথভ্রান্তদের গহ্বরে অধঃপতিত এবং কপটতা, বর্বরতার অন্ধকারে হবে নিমজ্জিত। এ বিষয়ে তারা কেউ কেউ হবে পরস্পরের চেয়ে ঊর্ধ্বে। কারণ তাঁদের ও তাঁদের মর্যাদা সম্বন্ধে গালমন্দ করা যে হারাম, তা অনস্বীকার্য দ্বীনি আহকাম হতে সম্যকভাবে পরিজ্ঞাত। তাই একজন মূর্খ ব্যক্তিও তাঁদের সম্পর্কে সমালোচনা করাকে কোন অবস্থাতেও মেনে নিবে না। যে ব্যক্তি এ মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করতে প্রলুদ্ধ করবে, সে পূর্ববর্তী ন্যায়পরায়ণ উম্মত সালাফদের বিশ্বস্ততার সঙ্গে বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং কুফুরী ও ত্বাগূতী শক্তির সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে।

পক্ষান্তরে আল্লাহ্র জন্য ঐ সমস্ত ওলামায়ে কেরামের প্রতি অফুরন্ত রহমত দান করা অপরিহার্য হয়ে যায়, যারা ছাহাবায়ে কেরামের উপর দেয়া অভিযোগকে নস্যাৎ করেন, কুকুরের নৃশংস দংশন হতে রক্ষা করার ন্যায় জনসাধারণকে তাঁদের হতে বিমুখ হওয়া থেকে সাহায্য করেন। যে তাঁদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে তাকে সজোরে নিক্ষেপ করে অস্তিত্বহীন করেন, ভ্রান্ত বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সঠিক পন্থা বাতলে দেন। অতঃপর আল্লাহর কিতাব, রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাত ও ছাহাবীদের কর্মসূচীর উপর অঙ্গীকারাবদ্ধ করে আল্লাহর নির্দেশ অর্পণ করেন।

পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ হতে ছাহাবায়ে কেরানকে গালি দেয়া নিষিদ্ধ সংক্রান্ত দলীল সমূহ

وَ الَّذِيْنَ جَآءُوْ مِن بَعْدِهِمْ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَ لِاِخْوَانِنَا الَّذِيْنَ سَبَقُوْنَا بِالْاِيْمَانِ وَ لَا تَجْعَلْ فِيْ قُلُوْبِنَا غِلًّا لِّلَّذِيْنَ اٰمَنُوْا رَبَّنَاۤ اِنَّكَ رَءُوْفٌ رَّحِيْمٌ

(১) ‘যারা তাদের (ছাহাবীগণের) পরে এসেছে তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাগণকে ক্ষমা করুন এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু’ (সূরা আল-হাশর : ১০)।

(২) আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) একদা তাঁর বোনের ছেলে উরওয়া বিন যুবায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলেন, ‘হে যুবায়ের। যারা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছাহাবীগণকে গালি দিয়েছে তাদেরকে ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।[৬]

(৩) অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন,

وَ السّٰبِقُوْنَ الْاَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهٰجِرِيْنَ وَ الْاَنْصَارِ وَ الَّذِيْنَ اتَّبَعُوْهُمْ بِاِحْسَانٍ رَّضِيَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَ رَضُوْا عَنْهُ وَ اَعَدَّ لَهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِيْ تَحْتَهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِيْنَ فِيْهَاۤ اَبَدًا ذٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ

‘মুহাজির ও আনছারগণের মধ্যে যাঁরা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রতি প্রসণ্ন ও তারাও তাতে সন্তুষ্ট। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহমান, সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। ইহা এক মহা সাফল্য’ (সূরা আত-তাওবাহ : ১০০)।

(৪) আবু সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এরশাদ করেন,

لَا تَسَبُوْا أَصْحَابِيْ فَوَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لَوْانَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مَدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيْفَهُ

‘তোমরা আমার ছাহাবীগণকে গালি দিও না। আমি সেই সত্তার শপথ করে বলছি যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। নিশ্চয় তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড়ের সমপরিমাণ স্বর্ণ দান করে তবুও তাদের কোন একজনের (আমলের) সমপরিমাণ হবে না। এমনকি তার অর্ধেকও হবে না’।[৭]

(৫) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘কোন মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেক্বী, আর হত্যা করা কুফুরী’।[৮]

(৬) অন্যত্র নবী করীম (ﷺ) এরশাদ করেন, لَعَنَ اللهُ مَنْ سَبَّ أَصْحَابِيْ ‘আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির উপর অভিসম্পাত করেছেন, যে আমার ছাহাবীগণকে গালমন্দ-ভর্ৎসনা করে’।[৯]

(৭) বারা ইবনে আযেব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

اَلْأَنْصَارُ لَا يُحِبُّهُمْ إِلَّا مُؤْمِنٌ وَلَا يُبْغِضُهُمْ إِلَّا مُنَافِقٌ وَمَنْ أَحَبَّهُمْ أَحَبَّهُ اللهُ وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ أَبْغَضَهُ اللهُ متفق عليه

‘মুমিন ব্যক্তি ছাড়া আনছারদেরকে কেউ ভালোবাসে না আর মুনাফিক ছাড়া তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না। যে তাদেরকে ভালোবাসে আল্লাহ তা‘আলাও তাকে ভালোবাসেন। আর যে তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে আল্লাহ তা‘আলাও তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন।[১০] একই রাবী থেকে অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘আনছারদেরকে যে ভালোবাসে আল্লাহ তা‘আলাও তাকে ভালোবাসেন, আর যে আনছারদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে আল্লাহও তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন।[১১]

(৮) আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) এরশাদ করেন,

لَا يُبْغِضُ الْأَنْصَارَ رَجُلٌ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে কখনও আনছারদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না’।[১২]

(৯) আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,

آيَةُ الْإِيْمَانِ حُبُّ الْأَنْصَارِ وَآيَةُ النِّفَاقِ بُغْضُ الْأَنْصَارِ

‘ঈমানের নিদর্শন হল আনছারদের প্রতি প্রীতিময় শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা, আর মুনাফেকীর নিদর্শন হল আনছারদের প্রতি ক্রুদ্ধ হওয়া’।[১৩]

এ সম্পর্কে সালাফে ছালিহীনের বক্তব্য

(১) ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একদা এক বেদুইনের কাছে আসলে লক্ষ্য করেন যে, সে এক আনছারী ছাহাবীকে ভর্ৎসনা করছে। তখন তিনি তাকে লক্ষ্য করে বলেন,

لَوْلَا أَنَّ لَهُ صَحْبَةً مِّنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ مَا أَدْرِىْ مَا نَالَ مِنْهَا لَكَفَيْتُمُوْهُ وَلَكِنْ لَهُ صَحْبَةٌ مِّنْ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ

‘নিশ্চয় সে যদি (আনছারী ছাহাবী) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সংস্পর্শ পেয়ে থাকে, তাহলে আমি অবগত নই সে তাঁর সংস্পর্শে থাকা অবস্থায় কী অর্জন করেছে? তবে সে কতটুকু অর্জন করেছিল তোমাদের জন্য ততটুকুই যথেষ্ট। কেননা তবুও সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সংস্পর্শ পেয়েছিল’।[১৪]

(২) ইবনু আবী লায়লা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আবুবকর ও ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আত্তারিদ’ গোত্রের এক ব্যক্তি বলল, আবুবকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর চেয়ে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-ই উত্তম। এবার জারুল নামক ব্যক্তি বলল, না ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর চেয়ে আবুবকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-ই উত্তম। রাবী বলেন, ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে প্রথমোক্ত ব্যক্তিকে তিনি অসহনীয় বেত্রাঘাত করেন ও পদদলিত করেন। অতঃপর জারুল নামক ব্যক্তির দিকে অগ্রসর হন এবং বলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে তোমার প্রতি নির্দেশ হল- মনে রেখ, আবুবকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-ই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পর উম্মতের মধ্যে উত্তম এই এই কারণে। অতঃপর বলেন, এছাড়া অন্য কিছু কেউ যদি বলে তাহলে তার প্রতি ঐরূপ শাস্তির বিধান জারি করব যা অপবাদ দাতার প্রতি করে থাকি’।[১৫]

(৩) হাকাম ইবনে জাহ্ল (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলতে শুনেছি,

لَا يفْضُلُنِيْ أَحَدٌ عَلَى أَبِيْ بَكْرٍ وَعُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا إِلَّا جَلَّدْتُهُ حَدَّ الْمُفْتَرِي

‘আবুবকর ও উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর উপর আমাকে যেন কেউ মর্যাদা বা প্রাধান্য না দেয়। যদি কেউ এরূপ করে তাহলে অপবাদ দাতার ন্যায় শাস্তি প্রদান করব।[১৬]

(৪) আলকামা ইবনে ক্বাইস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একদা মিম্বারের দিকে নির্দেশ করে বলেন, আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একদা এই মিম্বারের উপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। প্রথমে তিনি আল্লাহ্র প্রশংসা করেন এবং যা নছীহত করার তা করেন। অতঃপর সতর্কতা স্বরূপ ঘোষণা করেন, ‘আমার কাছে এই মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, একটি সম্প্রদায় আমাকে আবুবকর ও উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এ চেয়ে বেশি মর্যাদা দিয়ে থাকে। মনে রেখ, মর্যাদার দিক দিয়ে যদি আমি অগ্রগামী হতে চাই তাহলে অবশ্যই পিছিয়ে যাব। কিন্তু আমি অগ্রগামী হতে গিয়ে পশ্চাতগামী হওয়াকে অপসন্দ করি। সুতরাং এর অতিরিক্ত যে কিছু বলবে সেই কুৎসা রটনাকারী। তাই কুৎসা রটনাকারীর শাস্তি তার উপর অর্পিত হবে। কারণ রাসূলের পর উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলেন আবুবকর, অতঃপর ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)।[১৭]

(৫) সাঈদ বিন আবদুর রহমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,

قُلْتُ لِأَبِيْ مَا تَقُوْلُ فِيْ رَجُلٍ سَبَّ أَبَا بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ؟ قَالَ يُقْتَلُ، قُلْتُ سَبَّ عُمَرَ قَالَ يُقْتَلُ

‘একদা আমি আমার পিতাকে বললাম, ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার অভিমত কি যে আবুবকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে গালি দেয়?  তিনি বললেন, তাকে হত্যা করতে হবে। আমি আবার বললাম, ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে গালি দিলে? তিনি উত্তরে বললেন, তাকেও হত্যা করতে হবে’।[১৮]

(৬) জাফর ইবনে মুহাম্মাদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,

بَرِىَ اللهُ مِمَّنْ تَبَرَّأَ مِنْ أَبِيْ بَكْرٍ وَعُمَرَ رضى الله عنهما

‘যে আবুবকর ও উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে (গালি দিয়ে) মুক্ত হয়ে যায়, আল্লাহ তাআলাও তার থেকে মুক্ত হয়ে যান’।[১৯]

(৭) ইমাম বায়হাক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) আব্দুল্লাহ ইবনে সাওয়ার আল-আনবারী (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমার আব্বার কাছে এক ব্যক্তি (কোন বিষয়ে) সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত হয়। তিনি তার সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করেন। পরক্ষণে ঐ ব্যক্তি এসে বলল, আপনি আমার সাক্ষ্য কেন প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি উত্তরে বললেন, ‘আমার কাছে এই মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছাহাবীগণ সম্পর্কে সমালোচনা কর অথবা তুমি তাদের প্রতি রুষ্ট। সে বলল, আমি আমর ইবনুল আছ ছাড়া অন্য কারো বিরুদ্ধে সমালোচনা করি না। তিনি বললেন, সে যেই হোক না কেন। সাবধান! তুমি তওবা না করা পর্যন্ত অবর্ণনীয় শাস্তি তোমার উপর বৃদ্ধি করতে থাকব’।[২০]

(৮) ত্বালহা ইবনে মু‘আররফ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘বলা হত যে, বনী হাশেমের প্রতি ক্রুদ্ধ হওয়া যেমন মুনাফেকী, তেমনি আবুবকর ও উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর প্রতি ক্রুদ্ধ হওয়াও মুনাফেকী। আর আবুবকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা সুন্নাহর প্রতি সন্দেহ পোষণ করারই নামান্তর’।[২১]

(৯) ইমাম আওযাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

مَنْ شَتَمَ أَبَا بَكْرِ الصِّدِّيْقَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فَقَدْ اِرْتَدَّ عَنْ دِيْنِهِ  وَ أَبَاحَ دَمَةُ

‘যে ব্যক্তি আবু বকর (রাহিমাহুল্লাহ)-কে গালি দিবে, সে মুরতাদ হয়ে যাবে এবং তার রক্ত হালাল হয়ে যাবে’।[২২]

(১০) আহমাদ ইবনে আব্দুল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল আযীয আত-তামীমী একদা কূফাতে একটি বাড়ী বিক্রি করে দেন এবং বলেন, ‘আমি চাই না যে, কূফা নগরীতে এমন কিছু প্রতিষ্ঠিত হোক যেখানে রাসূল (ﷺ)-এর ছাহাবীগণকে ভর্ৎসনা করা হবে’।[২৩]

(১১) বিশ্র ইবনে হারিছ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

مَنْ شَتَمَ أَصْحَابَ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فَهُوَ كَافِرٌ وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ

‘যে নবী করীম (ﷺ)-এর ছাহাবীগণকে গালি দেয় সে কাফের। যদিও সে ছিয়াম পালন করে, ছালাত আদায় এবং নিজেকে মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত বলে ধারণা করে’।

(১২) মুহাম্মান ইবনে বাশশার বলেন, আমি একদা আব্দুর রহমান বিন মাহদী (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করলাম,

أَحُضِرَ جَنَازَةُ مَنْ سَبَّ أَصْحَابَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَقَالَ لَوْ كَانَ مِنَ عَصَبَتِيْ مَا وَرَّثْتُهُ

‘যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছাহাবীগণকে গালি সে মারা গেলে তার জানাযায় উপস্থিত হওয়া যাবে? তদুত্তরে তিনি বলেন, (জানাযা পড়াতো দূরের কথা) এ ব্যক্তি যদি আমার পরিবারভুক্ত হয়, তাহলে আমি তাকে ওয়ারিছ হওয়া থেকে বঞ্চিত করব’।

(১৩) ইমাম ফিরয়াবী (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, এক আবু বকর (রাহিমাহুল্লাহ)-কে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস হয়েছিল, যে আবু বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে কটূক্তি করে। তিনি বলেন, সে কাফের। পুনরায় তাকে প্রশ্ন করা হল, তার জানাযা পড়া যাবে কি? উত্তরে বললেন, না। আবারো তাকে জিজ্ঞেস করা হল, তার সাথে কেমন করে এরূপ ব্যবহার করা যায়, অথচ সে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালেমা পড়েছে? উত্তরে বলেন,

لَا تَمَسُّوْهُ بِأَيْدِيْكُمْ، اِدْفَعُوْهُ بِالْخَشَبِ حَتَّى تُوَارُوْهُ فِي حَفْرَتِهِ

‘(বরং) তোমরা তাকে তোমাদের হাত দ্বারা স্পর্শ করো না; লাঠি দিয়ে গড়িয়ে তাকে গর্তের মধ্যে মাটি চাপা দিয়ে দাফন করো’।[২৪]

(১৪) আব্দুল্লাহ ইবনে মুছ‘আব (ﷺ) বলেন, এখন আমীরুল মুমিনীন আমাকে বলেন,

مَا تَقُوْلُ فِيْ الَّذِيْنَ يَشْتَمُوْنَ أَصْحَابَ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فَقُلْتُ زَنَادِقَةٌ يَا أَمِيْرَ الْمُؤْمِنِيْنَ

‘তাদের সম্পর্কে তোমার মতামত কি যারা নবী করীম (ﷺ)-এর ছাহাবীগণ সম্বন্ধে কুৎসা রটনা করে? আমি উত্তরে বললাম, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! নিঃসন্দেহে তারা নাস্তিক।[২৫]

(১৫) ইসমাঈল বিন ক্বাসিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আব্দুল্লাহ বিন সুলায়মান আমাকে বললেন, আবু বকর ও উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে যে গালি দেয় তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? আমি উত্তরে বললাম, তওবা না করলে সে হত্যার যোগ্য। তিনি আবার বললেন, আসলেই সে কি হত্যার যোগা? আমি আবারো জোর দিয়ে বললাম, অবশ্যই।[২৬]

মাসআলার হুকুম

কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফে ছালেহীন ও ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য উদ্ধৃতান্তে আমাদের নিকট সুস্পষ্ট হল যে, ছাহাবীগণ সম্পর্কে কুৎসা রটনাকারীর অবস্থা পাঁচটি ভাগে সীমাবদ্ধ। আর এই প্রত্যেকটিরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম।

প্রথমতঃ যে স্বীয় দৃঢ় বিশ্বাসে গালি দিবে সে মূলত ছাহাবীগণকে অস্বীকার করবে। তাই এটা সর্বসম্মতিক্রমে কুফুরী। এজন্যই তার প্রতি হত্যার নির্দেশ অর্পিত হবে। কারণ সে এমন বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করেছে যা দ্বীন-ইসলাম হতে অতীব গুরুত্বের সঙ্গে পরিজ্ঞাত হয়েছে। যেমন ছাহাবায়ে কেরামের উপর সমগ্র উম্মতের ঈমান আনয়ন, পবিত্র কুরআন ও মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদীছ হতে শাব্দিক ও আর্থিক উভয় দিক থেকে যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত এবং তাঁদের মর্যাদা ও অবস্থানগত শ্রেষ্ঠত্ব সবই প্রত্যাখ্যান করেছে। এটা কারো নিকটেই অস্পষ্ট নয়; এমনকি মুসলমানদের ছোট্ট শিশুদের কাছেও না। সুতরাং এরূপ মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি ঐ ব্যক্তির ন্যায়ই, যে স্বীয় মাতার সঙ্গে ব্যভিচার করাকে ও মদ্য পানকে হালাল মনে করে অথবা যে (অবৈধভাবে) কাউকে হত্যা করা বৈধ মনে করে। আর যে ব্যক্তি উক্ত বিষয়াবলীকে হালাল মনে করে সে যে সর্বসম্মতিক্রমে কাফের এতে কোন সন্দেহ নেই। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

وأما من جاوز ذلك إلى أن زعم أنهم ارتدوا بعد رسول الله صلى الله عليه وسلم إلا نفرًا قليلا لا يبلغون بضعة عشر نفسا أو أنهم فسقوا عامتهم فهذا لاريب في كفره لأنه مكذب لما نصه القرآن في غير موضع من الرضى عنهم والثناء عليهم

‘যে এ বিষয়ে (ছাহাবীদের মর্যাদা) সীমাতিক্রম করত ধারণা করবে যে, রাসূল (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর তাঁরা (ছাহাবীগণ) মুরতাদ হয়ে গেছেন বা ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করেছেন, তবে কিছু সংখ্যক ছাড়া, যাদের সংখ্যা এক দশমাংশও হবে না। অথবা এই মনে করবে যে, তাঁরা সর্বসাধারণের বিরুদ্ধাচারণ করেছেন। তাহলে সে কাফের হওয়াতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ছাহাবীগণের ব্যাপারে ভূয়সী প্রশংসা, মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব, সন্তুষ্টি প্রভৃতির যে বর্ণনা উপস্থাপিত হয়েছে সেগুলিকে সে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী।

তিনি আরো বলেন,

من اعتقد منهم ما يوجب إهانتهم (يعنى الصحابة) فقد كذب رسول الله ﷺ فيما أخبر من وجوب إكرامهم وتعظيمهم ومن كذبه فيما ثبت عنه قطعا فقد كفر

‘ছাহাবীগণের ব্যাপারে যদি কেউ এমন আকীদা পোষণ করে যাতে তাদেরকে লাঞ্ছনা করাই প্রমাণিত হয়, তাহলে সে রাসুল (ﷺ)-কে ঐ সংক্রান্ত বিষয়ে অবিশ্বাস করবে যা তিনি তাঁর ছাহাবীদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ ও সম্মান করা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে ঘোষণা করেছেন। আর ছাহাবীগণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে যা কিছু অকাট্যভাবে সাব্যস্ত হয়েছে, তাকে যে অবিশ্বাস করবে সে অবশ্যই কাফের হয়ে যাবে। আল্লামা সুবকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যদি কেউ সকল ছাহাবীকে গালি দেয়, তাহলে সে কাফের হওয়াতে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই’।

আল্লামা কাযী আয়ায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

من شت أحدا من أصحاب النبي ﷺ أبا بكر أو عمر أو عثمان أو معاوية أو عمروبن العاص فإن قال كانوا على ضلال وكفرقتل

‘কেউ যদি নবী করীম (ﷺ)-এর ছাহাবীগণের কোন একজনকে গালি দেয়, সে আবুবকর হৌক, উমর হৌক, উছমান, মুআবিয়াহ হৌক কিংবা আমর ইবনুল আছ হ হৌক। অথবা যদি বলে, তারা কুফুরী ও ভ্রান্ত পথে ছিল তাহলে সে অবশ্যই হত্যার যোগ্য’।

ইবনু আবেদীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ছাহাবীগণের কুফুরী সম্পর্কে যে বিশ্বাস স্থাপন করবে সে সর্বসম্মতিক্রমে কাফের’।

দ্বিতীয়তঃ যে সাধারণ বিশ্বাসে ছাহাবীগণকে গালমন্দ করবে সে অবশ্যই ফাসেক সাব্যস্ত হবে।

তৃতীয়তঃ যে আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় স্বীয় দৃঢ় বিশ্বাসে ছাহাবীগণকে গালি দেয় সে মূলতঃ তাঁদের প্রতি রুষ্ট। তাছাড়া ইহা ছাহাবীগণকে ফাসেক সম্বোধন করাই অপরিহার্য করে। সুতরাং ইহা এমন পর্যায়ের কুফুরী যা মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে দেয়। যেমন, আল্লামা ত্বাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

بغضهم كفر ونفاق وطغيان

‘তাঁদের (ছাহাবীদের) প্রতি ক্রুব্ধ হওয়া কুফুরী, মুনাফেকী সীমালংঘনেরই নামান্তর।[২৭] এছাড়া ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি স্বীয় অন্তরে ছাহাবীগণের মধ্যে কোন একজনের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে সকাল করবে তার প্রতি নিম্নের আয়াতের হুকুম অর্পিত হবে। আল্লাহ বলেন,

لِيَغِيْظَ بِهِمُ الَكُفَّارَ

‘আল্লাহ এরূপভাবেই কাফেরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন’ (সূরা আল-ফাতাহ : ২০)।

চতুর্থতঃ যে স্বীয় বিশ্বাসে ছাহাবীগণকে গালি দিবে সে অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলার কাঠগড়ায় দণ্ডিত হবে। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

وأما من لعن وقيح مطلقا فهذا محل الخلاف فيهم لتردد الأمرين لعن الغيظ ولعن الاعتقاد فإن كان للاعتقاد فهو كفر كما سبق

‘যে ব্যক্তি সাধারণভাবে তাদেরকে অভিশাপ করবে ও কটু কথা বলবে তার উপর হুকুম অর্পণের ব্যাপারে ওলামাদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। তাহল বিরাগমান অবস্থায় অভিশাপ ও সচেতনতার বিশ্বাসে অভিশাপের মাঝে। যদি সে স্বীয় সচেতনতার বিশ্বাসে অভিশাপ করে থাকে তাহলে তা কুফুরী যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

পঞ্চমতঃ যে সাধারণ বিশ্বাসে কটুবাক্য বলবে সেও আল্লাহর দরবারে সাজার সম্মুখীন হবে। এটা প্রকৃতপক্ষে ক্রোধের উন্মাদনা কিংবা মূর্খতায় মোহাচ্ছন্ন হওয়ারই পরিণাম। অথবা কার্পণ্যের বা কাপুরুষতার ফলাফল অথবা জ্ঞানের স্বল্পতা কিংবা আল্লাহ ভীরুতার অভাব।

শায়খুল ইসলাম বলেন, ‘এজন্য সে মূলত শিষ্টাচার ও সদুপদেশের প্রার্থী। সুতরাং তার মধ্যে এগুলোর শূন্যতার কারণে আমরা তাকে সরাসরি কুফুরীর হুকুম দিতে পারি না। ইহা তাদেরই বক্তব্যের শ্রুতি বহন করে যে সমস্ত ওলামায়ে কেরাম এ কারণে কুফুরীর হুকুম দেননি। সুতরাং কেউ যদি ছাহাবায়ে কেরামকে এমনভাবে গালি দেয়, যাতে তাদের দ্বীন ও ন্যায়পরায়ণতার দুর্নাম, অপবাদ ও ভর্ৎসনা করা সাব্যস্ত হয়- তাহলে এর দ্বারা তার কুফুরী করাই সাব্যস্ত হবে। পক্ষান্তরে যদি এমনভাবে সমালোচনা করা হয়, যাতে অপবাদ, ভৎসনা বা দুর্নাম করা হয় না, যেমন নিজের পিতা সম্পর্কে সমালোচনা করে অথবা যদি এমনভাবে সমালোচনা করে যাতে তার প্রতি বিরাগভাব প্রদর্শন উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তাকে কুফুরী বলা যাবে না।

[সৌজন্যে : মাসিক আল-ফুরক্বান (আরবী) কুয়েত, অক্টোবর’৯৪]


তথ্যসূত্র :
[১]. মুহাম্মাদ বিন আব্দুল করীম শহরজানী, আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, ১ম খণ্ড (বৈরূত ছাপা-১৯৯৮ইং), পৃ. ১৮৪ ও ১৮৬।
[২]. ইবনু হাযম, কিতাবুল ফিছাল ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল, ২য় খণ্ড (বৈরূত ছাপা-১৯০৩), পৃ. ১১৫।
[৩]. কিতাবুল আদইয়ান, (বৈরুত ছাপা), পৃ. ১৮১।
[৪]. শারহু আক্বীদাতুল ওয়াসেত্বিয়াহ, মুহাম্মাদ খলীল হারাস, মূল: ইবনু তাইমিয়াহ (রিয়াদ, ছাপা-১৯৯৪ইং), পৃ. ৮৬-৮৭।
[৫]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৩৪; মুসনাদে আহমাদ, তাহকীক, আহমাদ মুহাম্মাদ শাকের ৪/২১পৃঃ হা/২১৫৪ সনদ হাসান; ফাৎহুলবারী ৪/৩০৮ পৃ.  “আশূরার ছিয়ামের ফযীলত’ অনুচ্ছেদ: মাওলানা নূর মোহাম্মাদ আজমী, বঙ্গানুবাদ মেশকাত শরীফ, ৪র্থ খণ্ড, হা/১৯৪৩।
[৬]. ছহীহ মুসলিম শরহে নববীসহ ১৮/৩৫২ পৃ. হা/৭৪৫৫।
[৭]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৪০; আলবানী, তাহক্বীক্ব মিশকাত হা/৬০০৭।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৪; মিশকাত, হা/৪৮১৪ ‘আদর’ অধ্যায়।
[৯]. আস-সুন্নাহ, পৃ. ১৩৪।
[১০]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, ছহীহ বুখারী ৪/৫৯৬ পৃ. হা/৩৭৮৩; মিশকাত হা/৬২১৬।
[১১]. আলবানী, সিলসিলা ছহীহাহ, ২/৭২২ পৃ., হা/৯৯১; ঐ, ছহীহ ইবনু মাজাহ, ১/৭১ পৃ., হা/১৩৪।
[১২]. ছহীহ মুসলিম, পৃ. হা/৭৬।
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৭৮৪; মিশকাত, হা/৬২১৫।
[১৪]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, আল-ইছাবাহ ১/১১পৃ; আবু যার আল-হারুবী, আল-আরেম, পৃ. ৫৮৫; ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীছটির সনদ হাসান।
[১৫]. ইমাম আহমাদ, আল-ফাযায়েল, পৃ. ১৮৯; আস-সুন্নাহ, হা/১৩৬৪; ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লা, ১১/২৮৬ পৃ. ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সনদ ছহীহ।
[১৬]. আব্দুল্লাহ বিন ইমাম আহমাদ, যাওয়ায়েদ আলাল ফাযায়েল, মূল : ইমাম আহমাদ, হা/৪৯।
[১৭]. আব্দুল্লাহ বিন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ, হা/১৩৯৪; আল-মুহাল্লা, ১/২৮৬ পৃ., সনদ হাসান।
[১৮]. লালকাঈ, হা/১৩৭৮।
[১৯]. আল-ফাযায়েল, হা/১৪৩; আস-সুন্নাহ, হা/১৩০২; লালকাঈ, হা/২৩৯৩।
[২০]. ইমাম বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, ১০/২০৯ পৃ.।
[২১]. লালকাঈ, হা/২৩৮৯।
[২২]. আশ-শারহু ওয়াল ইবানা, পৃ. ১৬২।
[২৩]. তদেব, পৃ. ১৬৪।
[২৪]. আছ-ছারেমুল মাসলূল, পৃ. ৫৭০।
[২৫]. খতীব বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ, ১০/১৭৫ পৃ.।
[২৬]. মাকদেসী, আন-নাহী ‘আন সাব্বিল আছহাব কিতাব দ্র.।
[২৭]. শরহে ত্বাহাবী, ২/৬৮৯ পৃ.।





ইসলামী সংগঠন ও তরুণ-যুবক-ছাত্র - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
কালো কলপ ব্যবহারের শারঈ বিধান - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
বিদ‘আত পরিচিতি (৪র্থ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ফিলিস্তীন, হে মুসলিম! - শায়খ মতিউর রহমান মাদানী
রামাযানের শেষ দশকের গুরুত্ব ও করণীয় - মাইনুল ইসলাম মঈন
সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ এবং তার প্রতিদান - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৩য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইসলামী জামা‘আতের মূল স্তম্ভ (৮ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
ফাযায়েলে কুরআন (শেষ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইত্তিবাউস সুন্নাহর প্রকৃতি ও স্বরূপ - হাসিবুর রহমান বুখারী
ইসলামী পুনর্জাগরণের মূলনীতি (২য় কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ