ইসলামী দৃষ্টিতে বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন
- আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ*
(৪র্থ কিস্তি)
(৬) পাত্র-পাত্রীর পারস্পরিক দর্শন
বিয়ের পূর্বে পাত্র-পাত্রী পরস্পরকে দেখে নেওয়া উচিত। মহান আল্লাহ বলেন, فَانۡکِحُوۡا مَا طَابَ لَکُمۡ مِّنَ النِّسَآءِ ‘তোমরা বিয়ে কর সেই নারীদেরকে, যাদেরকে তোমাদের ভালো লাগে’ (সূরা আন-নিসা : ৪/৩)। মুগীরা বিন শু‘বা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি জনৈক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব করলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেন,هَلْ نَظَرْت إلَيْهَا؟ قُلْتُ : لاَ، قَالَ فَانْظُرْ إلَيْهَا، فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا ‘তুমি কি তাকে দেখেছ? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তাকে দেখে নাও। কেননা এতে তোমাদের উভয়ের মধ্যে ভালোবাসা জন্মাবে’।[১]
আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, একজন লোক নবী করীম (ﷺ) এর নিকট এসে বলল যে, সে আনছারী একটি মেয়েকে বিয়ে করার ইচ্ছা করেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,هَلْ نَظَرْتَ إِلَيْهَا فَإِنَّ فِىْ عُيُوْنِ الأَنْصَارِ شَيْئًا ‘তুমি তাকে দেখেছ কি? কেননা আনছারদের লোকের চোখে দোষ থাকে’।[২]
আমাদের সমাজে প্রায় দেখা যায়, পাত্রী দেখার নামে পাত্রের আত্মীয়-স্বজনরা একত্রিত হয়ে ১০/১২ জনের একটি দল পাত্রীর বাড়ীতে যান। সেখানে তারা পাত্রীকে সবাইকে দেখানোর জন্য বসিয়ে দেন, মাথার কাপড় সরানো হয়, দাঁত ও হাঁটা দেখা হয়। এ ধরনের পদ্ধতি ইসলামের অনুসারে গ্রহণযোগ্য নয়।
বিয়ের আগে পাত্রী দর্শনের উদ্দেশ্য হলো পাত্র ও পাত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া সৃষ্টি করা, শুধুমাত্র পাত্রই তাকে দেখতে পারবেন। পাত্র ব্যতীত অন্যদের মাধ্যমে এমন পর্যবেক্ষণ করা ইসলাম অনুমোদন করে না। দুর্ভাগ্যবশত, অনেক সময় পাত্র-পাত্রীর ধর্মীয় চরিত্রের দিকে নজর না দিয়ে কেবল রূপ, বংশ বা সম্পদ দেখে বিয়ের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। কিন্তু প্রত্যেক মুসলিম পাত্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাত্রীর দ্বীনদারী ও চরিত্র। যদি কোনো মহিলার দ্বীনদারী সম্পূর্ণ থাকে, তবে রূপ, বংশ বা সম্পদে কিছু ঘাটতি থাকলেও তার সাথে বিয়ে করা উত্তম। এইভাবে বিয়ে করা হলে দুনিয়া ও আখেরাতে উভয় পক্ষের কল্যাণ নিশ্চিত হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, تُنْكَحُ المَرْأَةُ لأرْبَعٍ: لِمالِها ولِحَسَبِها، وجَمالِها، ولِدِينِها، فاظْفَرْ بذاتِ الدِّينِ، تَرِبَتْ يَداكَ ‘সাধারণতঃ নারীদেরকে চারটি গুণ দেখে বিয়ে করা হয়। তার ধন-সম্পদ, বংশ-মর্যাদা, সৌন্দর্য এবং দ্বীন। তোমরা দ্বীনদার মেয়েকে অগ্রাধিকার দাও। অন্যথায় তোমাদের উভয় হস্ত অবশ্যই ধূলায় ধূসরিত হবে’।[৩] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوْهُ إِلاَّ تَفْعَلُوْا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِى الأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيْضٌ
‘যখন তোমাদের নিকট কোন পাত্র বিয়ের প্রস্তাব দেয়, যার দ্বীনদারী এবং উত্তম আচরণে তোমরা সন্তুষ্ট, তার সাথে বিয়ে দাও। অন্যথায় জমিনে বড় বিপদ দেখা দিবে এবং সুদূরপ্রসারী বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে’।[৪]
এছাড়া পাত্রী দেখার নাম করে আমাদের সমাজে ছেলে-মেয়ের একসাথে একাকী সময় কাটানো, পার্কে বসে বসে আলাপ করা, হবু বধুকে নিয়ে নির্জনে চলে যাওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নবী করীম (ﷺ) বলেন, لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ، وَلاَ تُسَافِرَنَّ امْرَأَةٌ إِلاَّ وَمَعَهَا مَحْرَمٌ ‘কোন পুরুষ যেন অপর মহিলার সঙ্গে নিভৃতে অবস্থান না করে, কোন স্ত্রীলোক যেন কোন মাহরাম সঙ্গী ছাড়া সফর না করে’।[৫] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ما خلا رجل بامرأة إلا كان الشيطان ثالثهما ‘যখন কোন পুরুষ-মহিলা নির্জনে একত্রিত হয়, তখন তৃতীয়জন হিসাবে সেখানে শয়তান উপস্থিত হয়’।[৬]
(৭) সাক্ষী থাকা
বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য ন্যায়পরায়ণ ঈমানদার দু’জন সাক্ষী থাকা আবশ্যক। সাক্ষীগণ মোহরের পরিমাণ ও বরের স্বীকারোক্তি নিজ কানে শুনবেন। মহান আল্লাহ বলেন,
فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَاَمۡسِکُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ فَارِقُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ وَّ اَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ
‘যখন তারা ইদ্দতে পৌঁছে যায়, তখন যথাবিধি তাদেরকে রেখে দিবে, নতুবা তাদেরকে যথাবিধি বিচ্ছিন্ন করে দিবে এবং তোমাদের মধ্য হতে দু’জন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে’ (সূরা আত-তালাক্ব : ৬৫/২)। সাক্ষীগণ অবশ্যই পুরুষই হতে হবে। একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা কিংবা চারজন মহিলা হলেও চলবে না।[৭] কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, لاَ نِكَاحَ إِلاَّ بِوَلِىٍّ وَشَاهِدَىْ عَدْلٍ ‘বিয়ে সংগঠিত হবে না ওলী ও দু’জন সাক্ষী ব্যতীত’।[৮]
(৮) মোহরানা নির্ধারণ
ইসলামে বিয়ে একটি পবিত্র চুক্তি, আর এই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মোহরানা নির্ধারণ। মোহরানা বা মোহর হচ্ছে স্ত্রীর জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি আর্থিক অধিকার, যা আল্লাহ তা‘আলা ফরয করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন,وَ اٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ‘তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর খুশিমনে প্রদান কর’ (সূরা আন-নিসা : ৪/৪)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ‘তোমরা তাদের মোহর ফরয হিসেবে প্রদান কর’ (সূরা আন-নিসা : ৪/২৪)। বুঝা গেল, মোহর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং এটি স্ত্রীর প্রাপ্য ও স্বামীর উপর আবশ্যক দায়িত্ব।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মোহরের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন,أَحَقُّ الشُّرُوطِ أَنْ تُوفُوا بِهِ مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ ‘বিয়ের শর্তসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যার মাধ্যমে তোমরা স্ত্রীদেরকে হালাল করেছ’।[৯] সুতরাং বিয়ের আগে মোহরানা নির্ধারণ করা এবং বিয়ের পর তা স্ত্রীকে দিয়ে দেওয়া আবশ্যক।
মোহরের পরিমাণ নির্ধারণে ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারিত হয়নি; বরং স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী তা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সহজতা ও মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা উত্তম। স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে মোহরানা দিতে হবে। যখন আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে বিয়ে করেন, তখন নবী করীম (ﷺ) তাঁকে বললেন, তুমি ফাতিমাকে (মোহরানা স্বরূপ) কিছু দাও। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আমার নিকট কিছু নেই। নবী করীম (ﷺ) তাকে বললেন, তোমার হুতামী বর্মটি কোথায়’?[১০] অন্য বর্ণনায় এসেছে, নবী করীম (ﷺ) এক ব্যক্তিকে বললেন, تَزَوَّجْ وَلَوْ بِخَاتَمٍ مِنْ حَدِيْدٍ ‘তুমি বিয়ে কর, একটি লোহার আংটির বিনিময়ে হলেও’।[১১]
মোহর তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করা উত্তম হলেও, প্রয়োজনে তা পরবর্তীতে আদায় করা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে তা স্ত্রীর নিকট ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং যথাসম্ভব দ্রুত পরিশোধ করা স্বামীর জন্য আবশ্যক। মোহর পরিশোধ না করলেও বিবাহ শুদ্ধ থাকে এবং সন্তান বৈধ হয়, কারণ মোহর পরিশোধ করা বিবাহের শর্ত নয়, বরং স্ত্রীর অধিকার। তবে এ অধিকার অবহেলা করা মারাত্মক অন্যায়। বর্তমান সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, মৃত্যুর পূর্বে স্ত্রীর কাছ থেকে মোহর মাফ করিয়ে নেওয়ার প্রচলন রয়েছে, যা ইসলামসম্মত নয় এবং প্রতারণার শামিল। তাই মুসলমানদের উচিত, সুযোগ পেলেই সর্বপ্রথম স্ত্রীর মোহর পরিশোধ করা এবং এ বিষয়ে সততা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা। মোহর নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতীক, তাই এর যথাযথ বাস্তবায়ন একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণকর পারিবারিক জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
(৯) বিয়ের ঘোষণা দেওয়া
বিয়ে একটি পবিত্র ও সামাজিক বন্ধন। ইসলাম এটিকে গোপন না রেখে প্রকাশ্যে ঘোষণা করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। কারণ, এর মাধ্যমে সমাজে স্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং সম্পর্কের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা এ বিয়েকে প্রকাশ্যে ঘোষণা কর’।[১২] এজন্য বিয়ের সময় ইসলামে দফ বা একমুখা ঢোল বাজানোকে জায়েয বলা হয়েছে। রুবাই বিনতে মু‘আববিয ইবনু আফরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
جَاءَ النَّبِيُّ ﷺ فَدَخَلَ حِينَ بُنِيَ عَلَيَّ فَجَلَسَ عَلٰى فِرَاشِي كَمَجْلِسِكَ مِنِّي فَجَعَلَتْ جُوَيْرِيَاتٌ لَنَا يَضْرِبْنَ بِالدُّفِّ وَيَنْدُبْنَ مَنْ قُتِلَ مِنْ آبَائِي يَوْمَ بَدْرٍ إِذْ قَالَتْ إِحْدَاهُنَّ وَفِينَا نَبِيٌّ يَعْلَمُ مَا فِي غَدٍ فَقَالَ دَعِي هٰذِهৃ وَقُولِي بِالَّذِي كُنْتِ تَقُولِينَ
‘আমার বাসর রাতের পরের দিন নবী করীম (ﷺ) এলেন এবং আমার বিছানার ওপর বসলেন, আমার বিছানার ওপর বসলেন, যেমন বর্তমানে তুমি আমার কাছে বসে আছ। সে সময় আমাদের ছোট মেয়েরা দফ বাজাচ্ছিল এবং বদরের যুদ্ধে শাহাদাত প্রাপ্ত আমার বাপ-চাচাদের শোকগাঁথা গাচ্ছিল। তাদের একজন বলে বসল, আমাদের মধ্যে এক নবী আছেন, যিনি আগামী দিনের কথা জানেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এ কথা বাদ দাও, আগে যা বলছিলে, তাই বল’।[১৩] সুতরাং, বিয়ের ঘোষণা দেওয়া শুধু একটি প্রথা নয়, বরং এটি সুন্নাহসম্মত একটি আমল। এর মাধ্যমে সমাজে বিয়ের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং আনন্দ ভাগাভাগি করা হয়।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* দাওরায়ে হাদীছ, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা। অধ্যয়নরত, আক্বীদা ও দাওয়াহ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
তথ্যসূত্র :
[১]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮১৫৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৮৬৫; নাসাঈ, হা/৩২৩৫; তিরমিযী, হা/১০৮৭, সনদ ছহীহ।
[২]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪২৪।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৯০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৬৬।
[৪]. তিরমিযী, হা/১০৮৪, ১০৮৫; মিশকাত, হা/৩০৯০; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১০২২।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৩০০৬।
[৬]. তিরমিযী, হা/২১৬৫; ইবনে হিব্বান, হা/৪৫৫৭; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৪৩০।
[৭]. শারহুল মুমতি‘ আলা যাদিল মুসতাকনি, ১২তম খণ্ড, পৃ. ৯৭।
[৮]. ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৪০৭৫, সনদ হাসান; বায়হাক্বী, ৭ম খণ্ড, পৃ. ১১২; ইরওয়া, ১৮৪৪; শরহুল মুমতি‘, ১২তম খণ্ড, পৃ. ৯৪।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৫১৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪১৮।
[১০]. আবূ দাঊদ, হা/২১২৫, সনদ ছহীহ।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫১৫০।
[১২]. তিরমিযী, হা/১০৮৯; ইরওয়া, হা/১৯৯৩; সনদ হাসান গরীব।
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৫১৪৭।