শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী: মুসলিম বিশ্বে তার অবদান
- ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী*
(২য় কিস্তি)
শিক্ষা-সাংস্কৃতিক অবস্থা
মুসলিমদের শিক্ষা ও চিন্তাধারার ইতিহাস এবং তাদের রচনা ও গবেষণাকর্মের বিশাল ভাণ্ডার অধ্যয়ন করলে জানা যায়, তাদের শিক্ষা ও চিন্তাগত জীবন ও তৎপরতা, তাদের রচনাবলি ও গবেষণাকর্ম, রাজনৈতিক উত্থান, রাজত্বের উন্নতি ও বিজয়ের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। যেমনটি অধিকাংশ অমুসলিম জাতি ও রাষ্ট্রের ইতিহাসে দৃষ্টিগোচর হয়। কারণ তাদের রাজনৈতিক পতন, রাজত্বের বিপ্লব এবং অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার সাথে তাদের শিক্ষাগত পতনের সম্মুখীন হতে হয় এবং মনীষী এবং বুদ্ধিজীবীরও অভাব দেখা দেয়। কিন্তু মুসলিমদের ক্ষেত্রে এমনটি দেখা যায় না। মুসলিমদের অবস্থা এর থেকে ভিন্ন। বরাবরই তাদের রাজনৈতিক পতন এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার মুহূর্তেও এমন সুযোগ্য ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছেন, যাদের দেখে পতন ও অবনতির যুগে জন্মগ্রহণকারী বলে মনে হয় না। সপ্তম শতকের শেষভাগে বাগদাদের পতন এবং তাতারীদের আক্রমণের পরে পাশ্চাত্যের মুসলিমবিশ্বকে তছনছ করে দিয়েছিল এবং সেসব রাষ্ট্রে ধূলির ঝড় বয়ে গিয়েছিল, যেগুলো শত শত বছর ধরে ইলম ও জ্ঞানের কেন্দ্রস্থলরূপে সফল ভূমিকা রেখে আসছিল। অষ্টম শতকে শায়খুল ইসলাম তাক্বীউদ্দীন ইবনু দাক্বীক্ব আল-ঈদ (মৃত্যু: ৭০৪ হিজরি)-এর মতো মুহাদ্দিছ, আল্লামা আলাউদ্দীন আল-রাজী (মৃত্যু: ৭১৪ হিজরি) এর মতো বিদগ্ধ উছূলবিদ ও তার্কিক, শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়া (মৃত্যু: ৭২৮ হিজরি)-এর মতো ইমাম ও মুজতাহিদ, আল্লামা শামসুদ্দীন যাহাবী (মৃত্যু: ৭৪৮ হিজরি)-এর মতো মুহাদ্দিছ ও ঐতিহাসিক আলেম-উলামার প্রদীপ্ত নক্ষত্ররাজি দেখা যায়। তার কারণ, দীন ও ধর্মীয় জ্ঞানে দক্ষতা সৃষ্টি করা।
কাজেই এই যুগ যদিও সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার যুগ এবং বড় বড় মুসলিম শক্তি এমনকি উছমানী সাম্রাজ্যের পতনের আলামত দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল, বিভিন্ন রাষ্ট্র এমনকি ইসলামের কেন্দ্রস্থল হিজাযে পর্যন্ত ক্ষমতা ও নেতৃত্ব লাভের জন্য পরস্পর টানাপোড়েন ও লড়াই চলছিল। কিন্তু মিসর, সিরিয়া, ইরাক, হিজায ও ইয়ামান, ইরান ও হিন্দুস্তান সর্বত্রই আলেমগণ পঠন-পাঠনে ব্যস্ত, শিক্ষানুরাগীগণ রচনা-সংকলনে তৎপর এবং বিভিন্ন তরীকার মাশায়েখ আত্মশুদ্ধি ও তাযকিয়ায়ে নফসে গভীর নিমগ্ন এবং আধ্যাত্মিক যোগ্যতা ও উন্নতিতে সুসজ্জিত ছিলেন। হাদীছ শাস্ত্রের কথাই যদি বলা যায়, এক্ষেত্রে আল্লামা আবুল হাসান সিন্ধী আল-কাবীর (মৃত্যু: ১১৩৮ হিজরি)-এর মতো মুহাদ্দিছ পরিলক্ষিত হয়, যিনি দীর্ঘকাল হারামে বসে হাদীছের দরস দিয়েছেন। ‘কুতুবুস সিত্তাহ’র উপর তার রচিত টীকা ‘আল-হাওয়ামিশুস সিত্তা’ নামে প্রসিদ্ধ। মাওলানা মুহাম্মদ হায়াত সিন্ধীও (মৃত্যু: ১১৬৩ হিজরি) এ যুগের গৌরব। সিরিয়ার শায়েখ ইসমাইল আল-আজলুনী ওরফে আল-জারহী ছিলেন উঁচু মাপের একজন মুহাদ্দিছ। তার রচিত کشف الخفاء ومزيل الإلباس عما اشتهر من الاحاديث على السنة الناس উপকারী ও পূর্ণাঙ্গ একটি কিতাব, যা দুর্বল ও জাল হাদীছসমূহের বলা যায় সবচেয়ে বৃহৎ সংকলন। এই গ্রন্থের মাধ্যমে তার দৃষ্টির প্রশস্ততা ও ন্যায়নিষ্ঠার অনুমান করা যায়। তাতে দুর্বল ও জাল হাদীছগুলো ছাড়া সেসব হাদীছও রয়েছে, যেগুলো সাধারণের মাঝে প্রসিদ্ধ। অথচ এগুলোর নির্ভরযোগ্য কোনো তাখরিজ বা উদ্ধৃতি পাওয়া যায় না।
হাদীছশাস্ত্রের বড় শিক্ষাকেন্দ্র ছিল হারামাইন শরীফাইন, যেখানে দরস দিতেন আবু তাহের কাওরানী আল-কুর্দী ও শায়েখ হাসান আল-উজাইমী। আর সুলাইমান ইবনে ইয়াহইয়া আল-আহদল (মৃত্যু: ১১৯৭ হিজরি)। ইয়ামান শহরের প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ এবং সমকালের হাদীছ বিশারদ ছিলেন। মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইস্ফারায়েনী (মৃত্যু: ১১৮৮ হিজরি) ছিলেন বিখ্যাত গ্রন্থ الدرر المصنوعات في الأحاديث الموضوعات এর রচয়িতা। ইয়ামানে আমির মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-হাসানী আস-সান‘আনী (মৃত্যু: ১১৪২ হিজরি) ছিলেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ও গবেষক। যার প্রমাণ তার বুলূগুল মারামের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘সুবুলুস সালাম’ এবং ‘তানকীহুল আনযারের শরাহ তাওযীহুল আফসার’। এই শতাব্দীতেই আল্লামা মুহাম্মদ সাঈদ সুম্বুল (মৃত্যু: ১১৭৫ হিজরি)-এর নামও দৃষ্টিগোচর হয়, যার রচিত আওয়ায়েলে কুতুবে হাদীছের উপর হাদীছশাস্ত্রের শায়েখ ও পণ্ডিতদের হাদীছের ইজাযত বেশিরভাগ নির্ভরশীল। ঐতিহাসিকগণ আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে আবুল বাকী যুরকানীকে (মৃত্যু: ১১২২ হিজরি) মিসরের সর্বশেষ মুহাদ্দিছ বলে অভিহিত করেছেন। ইলম ও জ্ঞানের গভীরতা, ব্যাপক শিক্ষাদান ও উপকারিতা এবং প্রচুর রচনা ও সংকলনের দিক থেকে শায়েখ আব্দুল গনী নাবলুসীকে ‘উসতাযুল আযম’ নামে ভূষিত করা হয়। বর্ণিত আছে, তার রচনাবলির সংখ্যা ২২৩ টি। এ যুগেই জন্ম নিয়েছিলেন আল্লামা ইসমাইল হাক্কী (মৃত্যু: ১১২৭ হিজরি), যিনি তাফসীরে কুরআনের উপর ‘রুহুল বয়ানে’র রচয়িতা, যা ‘তাফসীরে হাক্কী’ নামেও প্রসিদ্ধ। বাগদাদের আলেমদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে হুসাইন আস-সুদ্দীও (মৃত্যু: ১১৭৪ হিজরি) অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন।[১]
জামিয়া আযহার মিসর, জামিয়া যাইতুনা তিউনিস এবং জামিয়াতুল কারবীন ফাস প্রভৃতি প্রাচীন মাদরাসা ছাড়াও দামেশকের মাদরাসায়ে হাফেযিয়া, আল-মাদরাতুশ শাল্লিয়াহ ও মাদরাসাতুল আযরাবিয়ার নাম পাওয়া যায়। এসব সিলসিলার মাশায়েখকে তুরস্ক থেকে নিয়ে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ছড়ানো-ছিটানো দেখা যায়। তবে এ যুগের শিক্ষিত মহলের বেশি আগ্রহ ছিল সাহিত্য, কাব্যচর্চা, শিক্ষা-সেমিনার এবং ধাঁধা ও কৌতুকের প্রতি। এতেও বড় কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্য মনে হয় না। ছন্দতাল ও অন্ত্যমিলের প্রাচুর্য আর লৌকিকতা ব্যাপক। তাই বলা যায় রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অধঃপতন এবং অপর্যাপ্ত অর্থনীতি ও তার বিপর্যয় থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা, যোগ্যতা-দক্ষতা, সাহিত্য ও কাব্যচর্চা ছিল চোখে পড়ার মত। যার অধিকাংশই ছিল ব্যক্তিগত। এ শতাব্দীতে বহু সুযোগ্য ব্যক্তিত্ব জন্মগ্রহণ করেছেন। অতঃপর তাদের সফল চেষ্টা-সাধনার ফসল হিসেবে পরবর্তীতে অসংখ্য বড় বড় শিক্ষিত, মুহাদ্দিছ, ফক্বীহ, মুফাসসির প্রভৃতি জন্ম লাভ করেন। ভারতবর্ষের এ শিক্ষা এবং এ বিপর্যস্ত যুগে এমন জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিবর্গের বহিঃপ্রকাশ একটি রুগ্ন ও পতনোন্মুখ সমাজের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ শক্তির স্বাক্ষর এবং মুসলিম গড়ার যোগ্যতার প্রমাণ বহন করে। শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নতি ও অগ্রগতির কারণে এ যুগে যে সকল মহামনীষীর জন্ম ভারতবর্ষে হয়েছিল তার একটি তালিকা নিম্নে উল্লেখ করা হল:
>> ‘নূরুল আনওয়ার ও তাফসীরাতে আহমাদিয়া’-এর প্রণেতা আহমাদ ইবনু আবূ সাঈদ ওরফে মোল্লাজিওন আমিঠবী (১০৪৭-১১৩৫ হি.)।
>> শারহে সুল্লাম বা মোল্লা হামদুল্লাহ রচয়িতা মোল্লা হামিদুল্লাহ সিন্ধিলভী (মৃ. ১১৬০ হি.)।
>> রুস্তম আলী কানুজী (মৃ. ১১৭৮ হি.)
>> শায়খ সিফাতুল্লাহ খায়রাবাদী (মৃ. ১১৫৭ হি.)
>> শায়খ আলী আসগার কানুজী (মৃ. ১১৪০ হি.)
>> গোলাম আলী আযাদ বলগারামী (১১১০-১২০০ হি.)
>> গোলাম নকশবন্দী লাখনোভী (মৃ. ১১২৬ হি.)
>> সুল্লামুল ‘উলূম ও মুসাল্লামাতুস সুবুত গ্রন্থদ্বয়ের রচয়িতা কারী মুহিব্বুল্লাহ বিহারী (মৃ. ১১১৯ হি.)।[২]
>> কাজী মুবারক গোপামবী (মৃ ১১৬২ হি.)
>> শারহে সুন্নালম বা কাজীখান রচয়িতা কাজী মাওলানা মুহাম্মদ আলা থানবী
>> কাশশাফে ইসতিরলাহতুল ফুনূন (শাস্ত্রীয় পরিভাষার বিশ্লেষণ)-এর রচয়িতা মোল্লা নিযামুদ্দীন লাখনোবী (মৃ. ১১৬১ হি.)। শায়খের নির্বাচিত শিক্ষাক্রম ও শিক্ষাব্যবস্থা ভারতবর্ষ থেকে বুখারা-সমরকন্দ পর্যন্ত চালু ছিল। যাকে ‘নুযহাতুল খাওয়াতির’ রচয়িতা غيث الافادة الهتون العالم بالربع المسكون استاذ الأساتذة وإمام الجهابذة উপাধিতে ভূষিত করেন।[৩]
এভাবে এ সময়ে তাদের মতো নির্মোহ, বিচক্ষণ, দূরদর্শী, দেশের গৌরব ও যুগশ্রেষ্ঠ আলিম অধ্যাপক, লেখক-গবেষক, যথার্থ শিক্ষাগত চেতনা, শিক্ষকতা ও দীক্ষাদানের ময়দানের সিপাহসালারগণ ছিলেন অন্যতম। যাদের ইলমের নিকট গোটা মুসলিম জাহান ঋণী।[৪]
ধর্মীয় অবস্থা
শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ) (১১১৪-১১৭৬ ৭৬ হি.) সমসাময়িক মুসলিমদের ধর্মীয় অধঃপতনের সূচনা অবশ্য অনেক পূর্বেই হয়েছিল, যখন মুসলিম সমাজে অমুসলিমদের আমদানী করা বিষাক্ত চিন্তা-দর্শন ইসলামী আক্বীদা-আমলের উপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব বিস্তার করে। ফলে মুসলিম সমাজ নানা ফিরকা ও মাযহাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তারপর থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে মুসলিমানদের ধর্মীয় জীবনে এই অধঃপতনের ধারা অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ওছমানীয় সাম্রাজ্যের পতন যখন আসন্ন হয়ে উঠে, তখন পরিস্থিতি হয়ে পড়ে আরো নাজুক। ধর্মীয় এই অধঃপতনের পিছনে শাসক সমাজের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। তারা কোনরূপ সংস্কারধর্মী ও সংশোধনমূলক চিন্তাকে স্বাগত জানাতেন না; বরং এরূপ চিন্তাধারার লোকদের তারা প্রায়শই কাফির বলে সাব্যস্ত করতেন। যেমনভাবে তারা জিহাদী আন্দোলনকেও ইসলাম বহির্ভূত সাব্যস্ত করেছিলেন। অথচ অপরদিকে তারা বিদ‘আতী ও ছূফীদের বিশেষভাবে প্রশ্রয়দান করেন, যাতে ছূফীদের প্রতি অনুরক্ত জনগণের কাছে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। ফলে ছূফীবাদীরা একই সাথে শাসক ও জনগণের প্রশ্রয় পেয়ে তাদের বিদ‘আতী আক্বীদা ও আমল প্রচারের উর্বর ক্ষেত্র পেয়ে যায়। এভাবে তাদের দৌরাত্ম্যে ওছমানীয় খেলাফতের সর্বত্র শিরক ও বিদ‘আতের বাধাহীন প্রসার ঘটে। ফলশ্রুতিতে ইসলামী রাষ্ট্রগুলো থেকে তাওহীদ ও সুন্নাহ ভিত্তিক আক্বীদা-আমল বিলীন হতে থাকে। বিভিন্ন দেশে একের পর এক গড়ে উঠতে থাকে ওলী-আওলিয়াদের সুরম্য মাযার। এসব কবর-মাযারের প্রাচুর্য মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে সরিয়ে নিয়ে ওলী-আওলিয়ামুখী করে তুলে। আল্লাহর পরিবর্তে মাযারের ওলীর উপরই তারা সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং সেখানে গিয়ে দু‘আ-দরূদ, নযর-নেওয়ায, কুরবানী ইত্যাদি পেশ করতে থাকে। আর নানা অলীক ধ্যান-ধারণা, কুসংস্কার তো আছেই। মানুষ শিরক ও বিদ‘আতকেই ইসলাম ভেবে একনিষ্ঠতার সাথে পালন করতে থাকে। ফলে তাদের জীবনাচরণে তাওহীদ ও সুন্নাতের খুব সামান্য নিদর্শনই অবশিষ্ট ছিল।[৫]
রাসূল (ﷺ) দুনিয়ার বুকে যে তাওহীদের নীতি বাস্তবায়ন করেছিলেন, তা আবৃত হয়ে পড়েছিল ছূফীবাদের খোলসে ও কুসংস্কারের বিস্তৃত চাদরে। মসজিদগুলো হয়ে পড়েছিল মুছল্লীশূন্য। সমাজে মূর্খ দ্বীন প্রচারক ও ফকীর-দরবেশের দল ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল, যারা গলায় তাবীয-কবজ-তসবীহ ঝুলিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াত। তারা মানুষের মধ্যে মিথ্যা-অলীক, রহস্যময় সব কুসংস্কার ঢুকিয়ে দিয়ে তথাকথিত ওলী-আওলিয়াদের কবরে তীর্থযাত্রার জন্য প্ররোচিত করত এবং কবরে দাফনকৃত মানুষগুলোর শাফা‘আত বা সুপারিশ লাভের মিথ্যা প্রলোভন দেখাত।...খোদ মক্কা ও মদীনার অবস্থাও ছিল মুসলিম বিশ্বের আর সব এলাকার মতই। মোটকথা মুসলিমরা আত্মপরিচয় হারিয়ে যেন পরিণত হয়েছিল অমুসলিমে। পতিত হয়েছিল অধঃপতনের অতল তলে।[৬]
ধর্মীয় অবস্থার এমন অবনতি দেখা গিয়েছিল যে, শিরক ও বিদ‘আতের নোংরা আবর্জনায় হারিয়ে গিয়েছিল তাওহীদ ও সুন্নাতের মর্মবাণী। বিভ্রান্ত ছূফীবাদীদের আধিপত্যে আদি ইসলামের দিশা পাওয়া ছিল নিতান্ত ভাগ্যের ব্যাপার। মানুষ আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে কবর, খানক্বাহ, গাছ, পাথর, ওলী নামধারী মূর্খ পাগল-ফকীরের ইবাদতে লিপ্ত ছিল। তারা তাদের নামে পশু কুরবানী করত ও নযর-নেয়াজ পাঠাত।[৭]
এমন পরিস্থিতি চলে আসছিল যুগের পর যুগ। অতঃপর মহান সংস্কারক রূপে আবির্ভূত হন শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিপ্লবী সমাজ সংস্কার আন্দোলন নিয়ে। তাঁর এই দাওয়াতী কাফেলার ফলশ্রুতিতে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধর্মীয় কুসংস্কার, কবর পূজা, মাযার পূজা, গাছ পূজা, যাবতীয় শিরক-বিদ‘আত ও মাযহাবী গুড়ামি দূরীভূত হয়ে তাওহীদ ও ছহীহ সুন্নাহ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে- ফালিল্লাহিল হামদ।
আক্বীদাগত দুর্বলতা ও শিরকের আড্ডা
আক্বীদাগত দুর্বলতা বা শিরক-বিদ‘আতের জোয়ার এ দুই-ই সামাজিক ও চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে অধিক ভয়াবহ। আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত এবং প্রকৃত শক্তি থেকে রিক্তকারী ক্রটি হল, আক্বীদা বা বিশ্বাসগত দুর্বলতা। কুরআনুল কারীমের ঘোষণা,
اَلَا لِلّٰہِ الدِّیۡنُ الۡخَالِصُ ؕ وَ الَّذِیۡنَ اتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اَوۡلِیَآءَ ۘ مَا نَعۡبُدُہُمۡ اِلَّا لِیُقَرِّبُوۡنَاۤ اِلَی اللّٰہِ زُلۡفٰی ؕ اِنَّ اللّٰہَ یَحۡکُمُ بَیۡنَہُمۡ فِیۡ مَا ہُمۡ فِیۡہِ یَخۡتَلِفُوۡنَ ۬ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یَہۡدِیۡ مَنۡ ہُوَ کٰذِبٌ کَفَّارٌ
‘জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্য করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্য এনে দিবে। তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করেছে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফায়সালা করে দিবেন। আর যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না’ (সূরা আয-যুমার : ৩)। অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই এই তাওহীদের বিপরীত জীবন যাপন, মুসলিম সমাজে বিদ‘আতের জোয়ার, হিন্দু ও শী‘আদের নানান রসম-রেওয়াজ ও অভ্যাসের অনুকরণ চলছিল। সুস্পষ্ট শিরকের একাধিক রূপরেখা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যেত। যেগুলোর জ্ঞানগত কোন ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। প্রকাশ্যে কবরপূজা, মাশায়েখের সম্মানে তাদের সিজদা করা, বিভিন্ন মাজারকে হারামাইনের মতো সম্মানপ্রদর্শন করা, কবরের উপর লাল শালু চড়ানো, তাতে মান্নত মানা, বুযুর্গদের নামে কুরবানী করা, মাজার ত্বাওয়াফ করা, মখমলযুক্ত গেলাফ দিয়ে ভুয়া কবরকে মোড়ানো, ক্বিবলা বা কা‘বার ন্যায় সেদিকে মুখ করে ইবাদত করা, সেখানে মেলার আসর বসানো, উৎসবের দিন ধার্য করা, নৃত্য-গীত করা। এক কথায় এগুলোকে শেষ আশ্রয়স্থল ও ঠিকানা মনে করা সহ এমন কোন জঘণ্য কর্ম ছিল না, যা করা হত না। এগুলো দেখার জন্য বহুদূর থেকে দর্শকরা আসত এবং বরকত মনে করে সেখানে ভীড় করত।
মহররমের তাযিয়া কার্যক্রমসহ অনৈসলামিক অনুষ্ঠানগুলো জাঁকজমকের সাথেই আয়োজন করা হতো। রোগ-ব্যাধি দূর করার লক্ষ্যে পাপাত্মা ও অলীক দানবের সন্তষ্টি কামনা করা, নেককার অলীদের জন্য মান্নত মানা ও কুরবানী করা। এ সবই মুসলিমদের ধর্মীয় রীতি হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিল। আলীবখশ, হোসাইনবখশ, পীরবখশ, মাদারবখশ নামগুলো সেসময় ব্যাপক প্রচলিত ছিল। এ বিশাল অঞ্চলে তাওহীদের বিশ্বাস এমনভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল যে, তাদের ধারণা নিঃসন্দেহে আল্লাহই আসমান-যমীন ও পুরো বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা, তিনিই প্রকৃত উপাস্য, বড়বড় সব কাজ তিনিই আঞ্জাম দেন। কিন্তু জগতের কিছু দায়িত্বভার তার গ্রহণযাগ্যে বান্দাদের অর্পণ করেছেন। যারা সেসবের মালিক ও স্বাধীন কর্তা, তারা তার ভালো-মন্দ দেখাশুনা করেন। তাদের সরাসরি ইবাদত ও সিজদারও উপযুক্ত মনে করা। মোটকথা, বারো শতকে ভারতবর্ষ রাজনৈতিকভাবে, আইন-শৃঙ্খলা, চারিত্রিক ও আক্বীদাগতভাবে চরম অধঃপতন ও বিপর্যয়ের নিম্ন স্তরে নেমে গিয়েছিল। ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর পতন এবং মুসলিম সমাজের অধঃপতনের ভয়াবহ ও বীভৎস চিত্র দেখা যেত।[৮]
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* প্রিন্সিপ্যাল, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, অনুবাদ: শাহ আব্দুল হালীম হুসাইনী, সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস, ৫ম খণ্ড (ঢাকা: মাকতাবাতুল হেরা, ১ম সংস্করণ, ১৪৩৭ হি./২০১৬ খ্রি.), পৃ. ৩৫-৩৬।
[২]. যিনি প্রায় এক শতক পর্যন্ত ভারতবর্ষের ‘আলিম-‘উলামা ও অধ্যাপকদের এই দুই গ্রন্থের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও টীকা-টিপ্পনীতে ব্যস্ত রেখেছে এবং যার রচিত গ্রন্থাবলী মিসরীয় ‘আলিম ও আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।
[৩]. আল্লামা আশ-শারীফ আব্দুল হাই ফাখরুদ্দীন আল-হাসানী, আল-‘ইলামু বিমান ফী তারীখিল হিন্দী মিনাল ‘আলাম, ৬ষ্ঠ খণ্ড (বৈরূত: দারু ইবনি হাযম, ১ম সংস্করণ, ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.), পৃ. ৮৫১।
[৪]. সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৫৯-৬০।
[৫]. উবাইদুর রহমান খান নদভী, “ওয়াহাবী আন্দোলন ও সমাজ সংষ্কার”, দৈনিক ইনকিলাব, ঢাকা, ১ জানুয়ারী, ২০২১।
[৬]. আল-ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদিদছ দেহলভী ইবন আব্দুর রহীম, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, প্রথম খণ্ড (বৈরূতা: দারু ইবন কাছীর, ১৪৩১ হি./২০১০ খৃ.), পৃ. ২৬৫।
[৭]. ড. নূরুল ইসলাম, “বিপ্লবী সমাজ সংস্কারক মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী (রহ.)”, মাসিক আত-তাহরীক (রাজশাহী: হাদীছ ফাণ্ডেশন বাংলাদেশ, মে ২০০৩, ৬ষ্ঠ বর্ষ, ৮ম সংখ্যা), পৃ. ২৩।
[৮]. ওয়ালিউল্লাহ মুহাদিদছ দেহলভী ইবনু আব্দুর রহীম, আল-জুযউল লাতীফ ফী তারজাতিল আবদিয যঈফ, তা‘লীক: শায়খ মুহাদ্দিছ আবুত তাইয়িব আতাউল্লাহ ইবন হুসাইন আস-সালাফী আল-ফুজিয়ানী, তাবি, পৃ. ২।
প্রসঙ্গসমূহ »:
মুসলিম জাহান