ইসলামী দৃষ্টিতে বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন
- আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ*
(৫ম কিস্তি)
দাম্পত্যসঙ্গী নির্বাচনে ইসলামী মানদণ্ড
ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে শুধুমাত্র সামাজিক চুক্তি বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবে নয়, বরং একটি পবিত্র বন্ধন ও ঈমানের অর্ধাংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
এই কারণে, জীবনসঙ্গী নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেখানে ইসলামী শারী‘আত স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। নিচে কুরআন ও হাদীছের আলোকে দাম্পত্যসঙ্গী নির্বাচনের ইসলামী মানদণ্ডগুলো ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো।
প্রথমত: স্ত্রী নির্বাচনে ইসলামী মানদণ্ড
দাম্পত্য জীবনে একজন ভালো স্ত্রীর গুরুত্ব অপরিসীম। স্ত্রী ভালো হলে সংসার জীবন সুখের, আর স্ত্রী খারাপ হলে সংসার জীবন খুবই দুঃখের। তাই স্ত্রী নির্বাচনে ইসলাম কিছু মানদন্ড দিয়েছে, সেগুলো অনুসরণ করলে দাম্পত্য জীবন হবে সুখ ও শান্তিতে ভরপুর। সেগুলো নিম্নরূপ,
(১) স্ত্রী নির্বাচনে ধর্মপরায়ণতা ও সচ্চরিত্রকে প্রাধান্য
স্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম সর্বাগ্রে ধর্মপরায়ণতা ও সচ্চরিত্রকে গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ ধর্মপরায়ণতা সুখী জীবনের আসল নিশ্চয়তা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
تُنْكَحُ المَرْأَةُ لأرْبَعٍ: لِمالِها ولِحَسَبِها، وجَمالِها، ولِدِينِها، فاظْفَرْ بذاتِ الدِّينِ، تَرِبَتْ يَداكَ
‘সাধারণতঃ নারীদেরকে চারটি গুণ দেখে বিয়ে করা হয়। তার ধন-সম্পদ, বংশ-মর্যাদা, সৌন্দর্য এবং ধর্ম। তুমি ধার্মিক মেয়েকে অগ্রাধিকার দাও। অন্যথায় তোমার হাত ধূলায় ধূসরিত হোক’।[১]
ইবনে হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, تربت يداك অর্থাৎ ‘তোমার হাত ধুলায় ধূসরিত হোক’, যা আরবদের রূপক ভাষায় দারিদ্র্যের ইঙ্গিতবাচক। এখানে এটি দু‘আমূলক বাক্য, আক্ষরিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়’।[২]
শায়খ ইবনে উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ধার্মিক স্ত্রী স্বামীকে আল্লাহর আনুগত্যে সাহায্য করে, সন্তানদেরকে সৎ পথে লালন করে, স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার মান ও সম্পদ রক্ষা করে। কিন্তু অধার্মিক স্ত্রী ভবিষ্যতে তার ক্ষতির কারণ হতে পারে’।[৩]
সৎ স্ত্রী এমন এক অনন্য নে‘মত, যা দুনিয়া ও আখিরাত; উভয় জগতেই কল্যাণ ও প্রশান্তি বয়ে আনে। তাই তো প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ ও ভোগ্যবস্তুর মধ্যে সর্বোত্তম সম্পদ হিসেবে সৎ স্ত্রীকে উল্লেখ করে বলেছেন, الدُّنْيا مَتاعٌ، وَخَيْرُ مَتاعِ الدُّنْيا المَرْأَةُ الصّالِحَةُ ‘দুনিয়া হলো একপ্রকার ভোগ্যবস্তু, আর দুনিয়ার সর্বোত্তম ভোগ্যবস্তু হলো সৎ স্ত্রী’।[৪]
সৎ স্ত্রী হলো সে নারী, যে ঈমান ও আমলের পথে স্বামীকে সহায়তা করে, দুঃসময়ে ধৈর্য ধরে, স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্মান ও সম্পদ রক্ষা করে, আর সুখে-দুঃখে তার পাশে থাকে। নিশ্চয়ই, এমন স্ত্রীই দুনিয়ার প্রকৃত শোভা ও আখিরাতের শান্তির কারণ। তাই স্ত্রী নির্বাচনে ধর্মপরায়ণতা ও সচ্চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া প্রত্যেক সচেতন মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য।
(২) স্ত্রী নির্বাচনে কুমারী মেয়েকে অগ্রাধিকার
নবী করীম (ﷺ) কুমারী নারীকে বিয়ের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন, কারণ এতে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে আন্তরিকতা, মমতা ও খেলাচ্ছলে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে জাবির! তুমি কি কুমারী নাকি অকুমারীকে বিয়ে করেছ? তিনি উত্তরে বললেন, অকুমারী। তখন নবী (ﷺ) বললেন,هلا تزوجت بكرا تلاعبها وتلاعبك ‘তুমি কুমারী মেয়ে বিয়ে করলে না কেন, যাতে তুমি তার সাথে ক্রীড়া-কৌতুক করতে এবং সেও তোমার সাথে ক্রীড়া-কৌতুক করতে পারত?’[৫] ছহীহ বুখারীর অন্য বর্ণনায় এসেছে, وتضاحكها وتضاحكك ‘এবং তুমি তাকে হাসাতে এবং সেও তোমাকে হাসাতে পারত?’[৬]
তবে প্রয়োজনে বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তকে বিয়ে করাও উত্তম হতে পারে, যেমন জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) -এর ক্ষেত্রে হয়েছিল। তিনি নবী করীম (ﷺ)-কে বলেছিলেন, আমার বাবা মারা গিয়েছে, এমতাবস্থায় তিনি সাত বা নয়জন কন্যা রেখে গিয়েছেন। তাই আমি এক বিধবা নারীকে বিয়ে করেছি, কারণ আমি চাচ্ছিলাম না আমার বোনদের মতো আরেকজন কুমারীকে তাদের কাছে নিয়ে আসতে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, بارك الله لك ‘আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দান করুন’।[৭] অন্য বর্ণনায় এসেছে। তিনি বলেছেন, أصبت ‘তুমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ’।
শায়খ ইবনে উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যদি কেউ যুক্তিসঙ্গত কারণে বিধবাকে পছন্দ করে, যেমন পারিবারিক দায়িত্ব বা সামাজিক প্রয়োজন, তবে সেটিই তার জন্য উত্তম’।[৮]
(৩) সন্তানপ্রিয় ও স্নেহশীলা স্ত্রী নির্বাচন
ইসলাম এমন স্ত্রীকে বেছে নিতে উৎসাহ দেয়, যে সন্তান জন্মদানে সক্ষম এবং স্বামীর প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ। এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি এমন এক নারীকে পেয়েছি, যার বংশমর্যাদা ও সৌন্দর্য রয়েছে; কিন্তু সে সন্তান জন্ম দিতে পারে না। আমি কি তাকে বিয়ে করব? নবী করীম (ﷺ) বললেন, না। সে ব্যক্তি দ্বিতীয়বার এলো, নবী (ﷺ) আবার তাকে নিষেধ করলেন। তৃতীয়বার এলে নবী (ﷺ) বললেন, تزوجوا الودود الولود فإني مكاثر بكم ‘স্নেহশীলা ও সন্তানপ্রসবক্ষম নারীকে বিয়ে করো, কারণ আমি (ক্বিয়ামতের দিন) তোমাদের সংখ্যায় গর্ব করব’।[৯]
(الودود) অর্থ এমন নারী, যিনি স্বামীকে ভালোবাসে, তার সন্তুষ্টির চেষ্টা করে এবং পারিবারিক সুখের জন্য নিজেকে নিবেদিত রাখে। (الولود) অর্থ সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারী; যার শারীরিক গঠন ও পারিবারিক প্রজনন ক্ষমতা দেখে তা বোঝা যায়। মেয়ের মা, বোন ও মহিলা নিকটাত্মীয়ের তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে এই দুটি গুণ সম্পর্কে একটা সু ধারণা পাওয়া সম্ভব।
তাই স্ত্রী নির্বাচনে সন্তানপ্রিয় ও স্নেহশীলা নারীকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
(৪) স্ত্রী নির্বাচনে উত্তম চরিত্র ও মর্যাদাবান পরিবারকে প্রাধান্য
ইসলাম স্ত্রী নির্বাচনে বংশ ও পারিবারিক মর্যাদাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেনি। বরং এটি এমন এক গুণ, যা ভালো চরিত্র ও দ্বীনদারিতার সঙ্গে মিললে পরিবার ও সমাজ উভয়ের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। নবী করীম (ﷺ) বলেছেন,
الناس معادن كمعادن الذهب والفضة، خيارهم في الجاهلية خيارهم في الإسلام إذا فقهوا
‘মানুষ ধাতুর মতো, যেমন সোনা ও রূপা; যারা জাহেলিয়াতকালে উত্তম ছিল, ইসলাম গ্রহণের পর যদি তারা জ্ঞানী হয়, তবে তারাই উত্তম’।[১০]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুরাইশ নারীদের প্রশংসা করেছেন তাদের তাঁদের মাতৃত্ববোধ, কোমলতা ও স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ততার জন্য। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, خيرُ نساءٍ ركبن الإبلَ: صالحُ نساءِ قريشٍ؛ أحناه على ولدٍ في صغره، وأرعاه على زوجٍ في ذاتِ يده ‘যেসব নারী উট চড়েছে, তাদের মধ্যে কুরাইশ নারীরাই সর্বশ্রেষ্ঠ, তারা ছোটবেলায় সন্তানদের প্রতি অধিক স্নেহশীলা, এবং স্বামীর সম্পদের ব্যাপারে অধিক যত্নশীলা’।[১১]
এর অর্থ হলো, নবী করীম (ﷺ) তাদের কুরাইশ নারীদের দুইটি বিষয়ে প্রশংসা করেছেন,
(ক) তাদের সন্তানদের প্রতি মমতা ও স্নেহ। অর্থাৎ, সন্তানদের প্রতি তাদের প্রচুর সহানুভূতি ও কোমলতা।
হাফিয ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘الحانية على ولده’ অর্থাৎ যে নারী তার সন্তানদের যত্ন নেয় তাদের অনাথ অবস্থায়; সে পুনরায় বিয়ে করে না। আর যদি সে বিয়ে করে, তবে সে ‘হানিয়াহ’ (অর্থাৎ মমতাময়ী মা) নয়।
(খ) তার স্বামীর প্রতি যত্ন ‘في ذات يده’ অর্থাৎ তার স্বামীর সম্পদের ব্যাপারে। এর মানে হলো, সে তার স্বামীর সম্পদ রক্ষা করে, বিশ্বস্ততার সঙ্গে তা সংরক্ষণ করে এবং ব্যয়ে অপচয় বা অযথা খরচ করে না।
এ কথার অর্থ এই নয় যে, বিধবা নারীর জন্য পুনরায় বিয়ে হারাম। বরং, তার জন্য বিয়ে করা বৈধ। তবে যদি সে তার সন্তানদের যত্ন নেওয়ায় নিজেকে নিবেদিত রাখে, তবে সেটিই তার জন্য উত্তম।
কিন্তু যদি সে নিজের উপর ফিতনার আশঙ্কা করে, তবে তার জন্য বিয়ে করাই উত্তম। আরব নারীদের মধ্যে যারা মর্যাদাসম্পন্ন, তাদের মধ্যে কুরাইশ নারীরা শ্রেষ্ঠ গুণে পরিপূর্ণ ছিলেন। অতএব, বিয়ের জন্য স্ত্রী নির্বাচনে উত্তম চরিত্র ও মর্যাদাবান পরিবারকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
(৫) স্ত্রী নির্বাচনে, যাকে দেখলে মন প্রফুল্ল হয়, এমন নারীকে অগ্রাধিকার
বিয়ে শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়; এটি জীবনভর সহচরিত্ব, ভালোবাসা, আস্থা ও দায়িত্বের একটি বন্ধন। একজন স্ত্রী কেবল সংসারের সঙ্গিনী নয়, সে জীবনের শান্তি, স্থিতি ও প্রশান্তির উৎসও হতে পারে।
তাই ইসলাম স্ত্রী নির্বাচনে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং চরিত্র, আনুগত্য ও নৈতিকতার ভারসাম্যপূর্ণ রূপকেই গুরুত্ব দিয়েছে। নবী করীম (ﷺ) স্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমন গুণাবলির দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, যা সংসারকে সুখ, নিরাপত্তা ও পরস্পরের সম্মানভিত্তিক সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
خيرُ النساءِ مَن إذا نظرتَ إليها سرّتْك، وإذا أمرتَها أطاعتْك، وإذا أقسمتَ عليها أبرّتْك، وإذا غبتَ عنها حفظتْك في نفسها ومالك
‘শ্রেষ্ঠ নারী সেই, যাকে দেখলে মন প্রফুল্ল হয়; তুমি তাকে আদেশ দিলে সে তা মান্য করে; তুমি কসম করলে সে তা পূর্ণ করে; আর তুমি অনুপস্থিত থাকলে সে নিজেকে ও তোমার সম্পদকে রক্ষা করে’।[১২]
স্ত্রী নির্বাচনে বাহ্যিক সৌন্দর্য যেমন প্রফুল্লতা আনে, তেমনি চরিত্র আনে স্থায়িত্ব। এক মুহূর্তের আকর্ষণ নয়, বরং আজীবনের প্রশান্তি বিবেচনা করে সঙ্গী নির্বাচন করতে হবে। একজন ভালো স্ত্রী স্বামীর চোখে শান্তির প্রতিচ্ছবি, হৃদয়ে প্রশান্তি ও জীবনে বারাকাহ নিয়ে আসে। তাই স্ত্রী নির্বাচনে, যাকে দেখলে মন প্রফুল্ল হয়, এমন নারীকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ, এমন নারীই প্রকৃত অর্থে একজন পুরুষের জীবনে দুনিয়ার প্রশান্তি ও আখিরাতের সাফল্যের কারণ।
দ্বিতীয়ত: স্বামী নির্বাচনে ইসলামী মানদণ্ড
একজন ভালো স্বামী কেবল জীবনসঙ্গী নয়, বরং তিনি স্ত্রীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রহমত। তিনি সংসারে শান্তি, মমতা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেন এবং স্ত্রীর প্রতি সদয়, ধৈর্যশীল ও ন্যায়পরায়ণ আচরণ করেন। কুরআন ও সুন্নাহ স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, সংসারে রহমত প্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠি হলো স্বামীর সৎ চরিত্র, সহানুভূতি এবং দায়িত্ববোধ।
বিয়ের মাধ্যমে কেবল ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনই গড়ে ওঠে না, বরং এটি একটি সুস্থ ও নৈতিক মুসলিম সমাজ গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে। ইসলামে স্বামী নির্বাচনের জন্য কিছু স্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, যা নিম্নরূপ:
(১) স্বামী নির্বাচনে দ্বীন ও চরিত্রকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া
স্বামী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার দ্বীন ও চরিত্র। শুধু সৌন্দর্য, সম্পদ বা বংশ-মর্যাদা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী সুখ এনে দিতে পারে না। একজন আদর্শ স্বামী হলো ন্যায়পরায়ণ, মুত্তাক্বী, পরহেযগার এবং আখলাক্ববান ব্যক্তি। নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) বলেছেন, إذا جاءكم من ترضون دينه وخلقه فزوجوه، إلا تفعلوه تكن فتنة في الأرض وفساد كبير ‘যখন তোমাদের কাছে এমন কেউ আসে যার দ্বীন ও আখলাক তোমাদের সন্তুষ্ট করে, তখন তাকে বিয়ে করো। যদি তা না করো, তবে পৃথিবীতে বিপর্যয় এবং বড় ধরনের অনাচার ছড়িয়ে পড়বে’।[১৩]
এটি নির্দেশ করে যে দ্বীন ও চরিত্রের প্রাধান্য না দিলে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
(২) স্বামী নির্বাচনে পরিবারের নৈতিক পরিবেশ ও বংশ-মর্যাদা বিবেচনা
একজন ব্যক্তির চরিত্র প্রায়শই তার পারিবারিক পরিবেশ ও নৈতিক শিক্ষা দ্বারা নির্ধারিত হয়। তাই স্বামী নির্বাচনের সময় তার পারিবারিক পটভূমি, পরিবারের আচার-আচরণ এবং সামাজিক মর্যাদা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,الناس معادن كمعادن الذهب والفضة، خيارهم في الجاهلية خيارهم في الإسلام إذا فقهوا ‘মানুষ ধাতুর মতো, যেমন সোনা ও রূপা; যারা জাহেলিয়াতকালে উত্তম ছিল, ইসলাম গ্রহণের পর যদি তারা জ্ঞানী হয়, তবে তারাই উত্তম’।[১৪]
এটি বোঝায় যে, পরিবারের নৈতিক পরিবেশ ও সুস্থ সামাজিক গঠন ভবিষ্যতের পরিবারের স্থায়িত্ব ও সন্তানের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
(৩) সন্তান জন্মদানে সক্ষম ও সুস্থ ব্যক্তিকে স্বামী নির্বাচন
ইসলামে সন্তানের জন্ম ও সমাজে সুস্থ ও শক্তিশালী প্রজন্ম গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শারীরিকভাবে সক্ষম ও স্বাস্থ্যবান স্বামী নির্বাচন করতে হবে। নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) বলেন, تزوجوا الودود الولود فإني مكاثر بكم ‘স্নেহশীলা ও সন্তানপ্রসবক্ষম নারীকে বিয়ে করো, কারণ আমি (ক্বিয়ামতের দিন) তোমাদের সংখ্যায় গর্ববোধ করব’।[১৫]
এটি প্রমাণ করে যে, বিয়ের উদ্দেশ্য শুধু যৌথ জীবন নয়, বরং সুস্থ ও জনবহুল মুসলিম সমাজ গড়ার লক্ষ্যেও পরিকল্পিত হতে হবে।
(৪) স্বামী নির্বাচনে আর্থিকভাবে সক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের যোগ্যতাকে গুরুত্বারোপ
একজন স্বামীর প্রধান দায়িত্ব হলো স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণ-পোষণ করা। মহান আল্লাহ বলেন, اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ وَّ بِمَاۤ اَنۡفَقُوۡا مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ ‘পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ একের ওপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে’ (সূরা আন-নিসা, ৪/৩৪)। ফাতিমা বিনতে ক্বায়েস (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বললাম, আমার কাছে মু‘আবিয়া ও আবু জাহম দু’জন প্রস্তাব দিয়েছে। তখন নবী (ﷺ) বললেন,وأما معاوية فصعلوك لا مال له ‘মু‘আবিয়া দরিদ্র, তার কোনো সম্পদ নেই’।[১৬]
এখান থেকে প্রমাণিত হয়, স্বামী যেন এমন না হয় যে, স্ত্রীর মৌলিক প্রয়োজন পূরণে অক্ষম। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সংসারের স্থায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তৃতীয়ত: দাম্পত্যসঙ্গী নির্বাচনে ওলীর কর্তব্য
ইসলাম বিয়েকে শুধু দুই ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক নয়, বরং সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। তাই এতে শুধুমাত্র পাত্র ও পাত্রীর সম্মতি নয়, অভিভাবকেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইসলামী শারী‘আত অভিভাবককে মেয়ের বিয়ে সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়েছে। দাম্পত্যসঙ্গী নির্বাচনে একজন ওলীর কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, যা নিম্নরূপ:
(১) দ্বীন ও চরিত্রভিত্তিক সমতা যাচাই করা অভিভাবকের প্রধান দায়িত্ব
বিবাহে পাত্র ও পাত্রীর মধ্যে সমতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সমতা সম্পদ, বংশ বা সামাজিক মর্যাদায় নয়; বরং দ্বীন ও চরিত্রে হওয়াই ইসলামী মানদণ্ড। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, وَانْكِحُوا الأَكْفَاءَ وَأَنْكِحُوا إِلَيْهِمْ ‘তোমরা উপযুক্তদের সঙ্গে বিয়ে কর এবং তোমাদের মেয়েদেরও উপযুক্তদের বিয়ে দাও’।[১৭]
ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ولكن يجب أن نعلم أن الكفاءة إنما هي في الدين والخلق فقط ‘আমাদের জানা আবশ্যক যে, সমতা কেবল দ্বীনদারী ও চরিত্রের ক্ষেত্রেই’।[১৮]
অতএব, একজন ওলী বা অভিভাবকের প্রথম দায়িত্ব হলো পাত্র যেন দ্বীনদার, চরিত্রবান ও দায়িত্বশীল হয়; পাত্র নির্বাচনে সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, مَنْ تَرْضَوْنَ دِيْنَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوْهُ ‘যার দ্বীনদারী ও উত্তম আচরণে তোমরা সন্তুষ্ট, তার সঙ্গে বিয়ে দাও’।[১৯]
(২) কন্যার কল্যাণে সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করা
অভিভাবককে কন্যার বিয়ের সিদ্ধান্তে আল্লাহভীতি, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা অবলম্বন করতে হবে। তিনি যেন এমন কাউকে কন্যার হাতে তুলে না দেন, যে দ্বীনের দিক থেকে দুর্বল, চরিত্রহীন, বা স্ত্রীর হক আদায়ে অক্ষম। শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল-মুকাদ্দিম বলেন, ‘অভিভাবকের উচিত, আল্লাহকে ভয় করে মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া। যেন এমন কাউকে বিয়ে না দেন যার চরিত্র খারাপ, দ্বীন দুর্বল, বা যে স্ত্রীর অধিকার পূরণে অক্ষম। কারণ, বিবাহ কিছুটা দাসত্বের মতো, এতে নারীর কল্যাণে সতর্কতা সবচেয়ে যরূরী’।[২০]
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* দাওরায়ে হাদীছ, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা। অধ্যয়নরত, আক্বীদা ও দাওয়াহ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৯০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৬৬।
[২]. ফাতহুল বারী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১৩৬।
[৩]. আশ-শারহুল মুমতি‘, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১১২।
[৪]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৬৭।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৭৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৭১৫।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৬৭।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৬৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৭১৫।
[৮]. আশ-শারহুল মুমতি‘, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১২৪।
[৯]. আবূ দাউদ, হা/২০৫০; নাসাঈ, হা/৩২২৭।
[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৫৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫২৬।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৮২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫২৭।
[১২]. নাসাঈ, হা/৩২৩১।
[১৩]. তিরমিযী, হা/১০৮৪; ইবনে মাজাহ, হা/১৯৬৭।
[১৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৫৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫২৬।
[১৫]. আবূ দাউদ, হা/২০৫০; নাসাঈ, হা/৩২২৭।
[১৬]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৮০।
[১৭]. ইবনে মাজাহ, হা/১৯৬৮; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১০৬৭।
[১৮]. সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১০৬৭-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
[১৯]. ইবনে মাজাহ, হা/১৯৬৭; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১০২২।
[২০]. আওদাতুল হিজাব, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৫৭।
প্রসঙ্গসমূহ »:
পরিবার