তরুণদের বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে সতর্ক করা
- মুহাম্মাদ ইবনু নাছির আল-উরাইনি (রাহিমাহুল্লাহ)
- অনুবাদ : মাসঊদুর রহমান*
(৯ম কিস্তি)
শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
এটা সুবিদিত যে, শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা নাজায়েয, তারা যতই অন্যায়কারী ও অত্যাচারী হোক না কেন, এমনকি তারা কাফের হলেও, তবে শক্তি-সামর্থ্য ও ক্ষমতা থাকলে ভিন্ন কথা। কেননা এই বিদ্রোহের ফলে কঠিন খারাপ পরিস্থিতির হয়, যেমনটি বর্তমানে আমাদের চারপাশের বেশ কয়েকটি দেশে দেখা যাচ্ছে, যে দেশগুলো এই ফিতনা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, ইহা কখন শেষ হবে তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন।
আবুল-হারিস আস-সাইগ বলেন, ‘আমি আবূ আব্দুল্লাহ আহমদ ইবনে হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-কে বাগদাদে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, যেখানে কিছু লোক বিদ্রোহ করার পরিকল্পনা করছিল। আমি বললাম, ‘হে আবূ আব্দুল্লাহ, এই লোকদের বিদ্রোহ করার ব্যাপারে আপনি কী বলেন?’ তিনি এর বিরোধিতা করলেন এবং বলতে থাকলেন, ‘সুবহানাল্লাহ! রক্তপাত রক্তপাত! আমি এটাকে জায়েজ মনে করি না, আর এ মর্মে আদেশও দিই না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের ধৈর্যধারণ করা ফিতনার চেয়ে উত্তম, যেখানে রক্তপাত হয়, সম্পদ লুণ্ঠিত হয় এবং পবিত্রতা লঙ্ঘিত হয়। আপনি কি জানেন না, লোকেরা ফিতনার সময় কিভাবে দিন অতিবাহিত করতো?’ আমি বললাম, হে আবূ আব্দুল্লাহ, লোকেরা কি আজও ফিতনার মধ্যে নেই? তিনি বললেন, ‘যদি তা হয়েও থাকে, তবে তা কেবল একটি নির্দিষ্ট ফিতনা। কিন্তু যদি তরবারি কোষমুক্ত হয়, তাহলে ফিতনা ব্যাপক আকার ধারণ করবে এবং সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যাবে’। সুতরাং এহেন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা এবং ঈমানকে অক্ষুণ্ণ রাখাই তোমার জন্য উত্তম’।[১]
এটি আহলুস-সুন্নাহর ইমামের পক্ষ থেকে ধৈর্য ধারণ এবং বিদ্রোহের উস্কানি পরিহার করার আহ্বান। এটিই নবুয়তি পদ্ধতি। হাদীছে এসেছে
عن ابْنَ عَبَّاسٍ عَنْ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ مَنْ رَأَى مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا يَكْرَهُهُ فَلْيَصْبِرْ عَلَيْهِ فَإِنَّهُ مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ شِبْرًا فَمَاتَ إِلاَّ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّة
ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, যে লোক নিজ আমীরের কাছ থেকে অপছন্দনীয় কিছু দেখবে সে যেন তাতে ধৈর্য ধারণ করে। কেননা, যে লোক জামা‘আত থেকে এক বিঘতও বিচ্ছিন্ন হবে, তার মৃত্যু হবে অবশ্যই জাহিলী মৃত্যুর মত।[২]
ইরাকের শাসক মামুন, ওয়াসিক এবং মু‘তাসিমের দ্বারা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উপর চাপানো যুলুম নির্যাতনের কারণে তিনি নিজে প্রচণ্ড কষ্ট ভোগ করেছিলেন, যারা তাঁকে কুরআনের সৃষ্টিতত্ত্বের মতবাদ প্রচারে বাধ্য করেছিল। তবুও, তিনি তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করার ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছিলেন, কারণ এর ফলে রাষ্ট্রে কি ধরনের ফেতনা ও ভয়ংকর পরিণতি ঘটতে পারে, তা তিনি খুব ভালভাবেই জানতেন।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘শাসকদের অবিচারের প্রতি ধৈর্য ধারণ করা এবং তাদের সাথে যুদ্ধ ও বিদ্রোহ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে নবী (ﷺ) যা আদেশ করেছেন, তাই আল্লাহর বান্দাদের জন্য ইহকাল ও পরকালের জন্য সর্বোত্তম কর্মপন্থা। যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে এর বিরোধিতা করে, সে তার কর্মের দ্বারা কোনো কল্যাণ অর্জন করে না, বরং ব্যত্যয় ঘটায়’।[৩]
ইবনে আবিল ইয আল-হানাফি (রাহিমাহুল্লাহ) (আক্বীদা ত্বহাবীর ব্যাখ্যায়) বলেন, ‘তারা অত্যাচারী হলেও তাদের আনুগত্য করার বাধ্যবাধকতার কারণ হলো, তাদের অবাধ্যতার পরিণতি তাদের অবিচারের পরিণতির চেয়ে বহুগুণ বেশি। বরং তাদের অবিচারের প্রতি ধৈর্য ধারণ পাপ মোচন করে এবং প্রতিদান বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়, কারণ মহান আল্লাহ আমাদের কর্মের ব্যত্যয়ের কারণেই তাদেরকে আমাদের উপর ক্ষমতা দিয়েছেন এবং প্রতিদান কর্মের অনুরূপ’।
ইমাম হাসান বাছরি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আল্লাহর কসম, মানুষ যদি তাদের শাসকদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে ধৈর্য ধারণ করত, তবে মহান আল্লাহ শীঘ্রই তাদের থেকে সেই কষ্ট দূর করে দিতেন। অথচ তারা শুধুমাত্র তরবারির ক্ষেত্রে সাহায্য চায় এবং এর উপরই নির্ভর করে’।[৪]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই হলো ক্বিয়ামত পর্যন্ত সকল মন্দ ও বিবাদের মূল’।[৫]
হাফিজ ইবনে আব্দুল বার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সত্যের অনুসারীগণ, যারা সুন্নাহর অনুসারী, তারা বলেছেন, এটাই পছন্দ যে, ইমাম হবেন সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু। যদি তিনি তা না হন, তবে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে ধৈর্যের সাথে তার আনুগত্য করাই শ্রেয়’।
কারণ তার সাথে বিতর্ক ও বিদ্রোহে নিরাপত্তার পরিবর্তে ভয় আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে দেশে রক্তপাত, আক্রমণ ও বিপর্যয় নেমে আসে, যা তার অন্যায় ও অনৈতিকতা সহ্য করার চেয়ে মারাত্মক। এই ক্ষেত্রে মূলনীতি ও ধর্মীয় পদ্ধতি হলো যে, এই দুটি অপছন্দনীয় বিষয়ের মধ্যে যেটা বেশি ক্ষতিকর, সেটা পরিত্যাগ করাই শ্রেয়’।[৬]
বিদ্রোহ না করে আনুগত্য করার ব্যাপারে ইমাম বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য নিম্নরূপ:
‘পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বিশ্বজগতের পালনকর্তা। মহান আল্লাহর শান্তি ও বরকত বর্ষিত হোক তাঁর রাসূল, তাঁর পরিবার, তাঁর ছাহাবীগণ এবং তাঁর পথনির্দেশ অনুসরণকারী সকলের উপর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَ اَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ وَ اُولِی الۡاَمۡرِ مِنۡکُمۡ ۚ فَاِنۡ تَنَازَعۡتُمۡ فِیۡ شَیۡءٍ فَرُدُّوۡہُ اِلَی اللّٰہِ وَ الرَّسُوۡلِ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ ذٰلِکَ خَیۡرٌ وَّ اَحۡسَنُ تَاۡوِیۡلًا.
‘হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর ও রাসূলের অনুগত হও এবং তোমাদের জন্য যারা বিচারক তাদের; অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে কোন মতবিরোধ হয়, তাহলে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তিত হও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে থাক; এটাই কল্যাণকর ও শ্রেষ্ঠতর পরিসমাপ্তি’ (সূরা আন-নিসা : ৫৯)।
এই আয়াতে শাসক ও আলেমদের আনুগত্য করার বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর ছহীহ সুন্নাহ এই অর্থকে স্পষ্ট করে। আয়াতটি ইঙ্গিত করে যে, শুধুমাত্র ন্যায়সঙ্গত কাজের ক্ষেত্রেই তাদের আনুগত্য করা আবশ্যক। যদি তারা আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ দেয়, তবে সেই অবাধ্যতার ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা যাবে না। তবে, কোনো কারণেই তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা জায়েজ নয়। যেমন নবী (ﷺ) বলেছেন,
أَلاَ مَنْ وَلِيَ عَلَيْهِ وَالٍ فَرَآهُ يَأْتِي شَيْئًا مِنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ فَلْيَكْرَهْ مَا يَأْتِي مِنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ وَلاَ يَنْزِعَنَّ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ
‘তবে যার উপর কোন শাসক নিয়োগ করা হবে, আর সে তাকে আল্লাহর কোন নাফরমানী করতে দেখবে, তখন ঐ শাসক যতক্ষণ আল্লাহর নাফরমানীতে থাকবে ততক্ষণ তাকে ঘৃণা করতে থাকবে; কিন্তু আনুগত্যের হাত গুটিয়ে নেবে না’।[৭] ওপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,مَنْ خَرَجَ مِنَ الطَّاعَةِ وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ فَمَاتَ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً ‘যে ব্যক্তি আনুগত্য ত্যাগ করে, উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যুবরণ করে, সে অজ্ঞতার মৃত্যু বরণ করে’।[৮] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ فِيمَا أَحَبَّ وَكَرِهَ إِلاَّ أَنْ يُؤْمَرَ بِمَعْصِيَةٍ فَإِنْ أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلاَ سَمْعَ وَلاَ طَاعَةَ .
‘মুসলিম ব্যক্তির অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হচ্ছে শোনা ও মানা তার প্রতিটি প্রিয় ও অপ্রিয় ব্যাপারে যতক্ষণ না তাকে আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ করা হয়। যদি আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ তাকে দেয়া হয়, তাহলে তা শুনবেও না এবং মানবেও না’ (যদি তিনি অবাধ্যতার আদেশ দেন, তবে তাঁর প্রতি কোনো আনুগত্য বা আত্মসমর্পণ থাকে না)।[৯]
অতঃপর ছাহাবী তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, যখন তিনি উল্লেখ করলেন যে, এমন শাসক থাকবেন যাদের আপনি চিনবেন এবং অপছন্দও করবেন, ‘তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন?’ তিনি বললেন,أَدُّوا إِلَيْهِمْ حَقَّهُمْ وَسَلُوا اللهَ حَقَّكُم ‘তাদের প্রাপ্য দাও এবং আল্লাহর কাছে তোমাদের প্রাপ্য প্রার্থনা করো’।[১০] উবাদাহ ইবনে ছামিত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
بَايَعْنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ عَلَى السَّمْعِ والطَّاعَةِ في العُسْرِ واليُسْرِ، والمَنْشَطِ وَالمَكْرَهِ، وَعَلَى أثَرَةٍ عَلَيْنَا، وَعَلَى أنْ لاَ نُنازِعَ الأمْرَ أهْلَهُ إلاَّ أنْ تَرَوْا كُفْراً بَوَاحاً عِنْدَكُمْ مِنَ اللهِ تَعَالَى فِيهِ بُرْهَانٌ،
‘আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এই মর্মে বাই‘য়াত করলাম যে, দুঃখে-সুখে, আরামে ও কষ্টে এবং আমাদের উপর (অন্যদেরকে) প্রাধান্য দেওয়ার অবস্থায় আমরা তাঁর পূর্ণ আনুগত্য করব। রাষ্ট্রনেতার বিরুদ্ধে তার নিকট থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার লড়াই করব না; যতক্ষণ না তোমরা (তার মধ্যে) প্রকাশ্য কুফরী দেখ, যে ব্যাপারে তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে দলীল রয়েছে’।[১১]
এটি ইঙ্গিত করে যে, শাসকদের কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্ক করা বা তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা তাদের জন্য বৈধ নয়, যতক্ষণ না তারা সুস্পষ্ট কুফর দেখতে পায়, যার সপক্ষে তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রমাণ রয়েছে। এর কারণ হলো, শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব্যাপক ফিতনা ও কঠিন অনিষ্টের জন্ম দেয়, যা নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, অধিকার হরণ করে, অত্যাচারীকে নিবৃত্ত করা বা অত্যাচারিতকে সমর্থন করা অসম্ভব করে তোলে এবং রাস্তাঘাট দখল ও নিরাপত্তাহীনতার দিকে পরিচালিত করে। সুতরাং, শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব্যাপক দুর্নীতি ও বহু অমঙ্গলের কারণ হয়। তবে মুসলমানরা যদি সুস্পষ্ট কুফর দেখতে পায়, যার সপক্ষে তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রমাণ রয়েছে। পাশাপাশি যদি তাদের ক্ষমতা থাকে, তবে এই শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু, যদি তাদের ক্ষমতা না থাকে, তাহলে বিদ্রোহ করবে না। তবে যদি বিদ্রোহ করাটা বড় ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে জনসাধারণের কথা বিবেচনা করে বিদ্রোহ করা উচিত নয়। কেননা এক্ষেত্রে শারঈ মূলনীতি হলো : ‘বড় অনিষ্টর মাধ্যমে ছোট অনিষ্ট বা ক্ষতি দূর করা বৈধ নয়’। বরং, আবশ্যক হলো মন্দকে তার সমপরিমাণ মন্দ কাজ দিয়ে দূর করা বা প্রশমিত করা।
কেননা মুসলিমদের সর্বসম্মত মতানুসারে, বড় মন্দ বা খারাপের মাধ্যমে ছোট মন্দ নিবারণ করা জায়েজ নয়।
যদি এই দলটি, যারা প্রকাশ্য কুফরীকারী শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়, তাদের এমন ক্ষমতা থাকে যে, তারা একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ নেতাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, পাশাপাশি ফিতনার মধ্যেও যদি বড় কোনো ফিতনার সৃষ্টি না হয়, তাহলে এমন পরিস্থিতিতে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ।
কিন্তু, যদি বিদ্রোহের ফলে ব্যাপক দুর্নীতি, নিরাপত্তার অবনতি, জনগণের প্রতি অবিচার, হত্যার যোগ্য নয় এমন ব্যক্তিদের হত্যা, এই ধরনের বড় বড় ফেতনা সংঘটিত হয়, তবে এটি জায়েজ নয়।
বরং তাদের অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে, কল্যাণকর ভালো কাজে আনুগত্য করতে হবে, শাসকদের উপদেশ দিতে হবে, তাদের কল্যাণের জন্য দু‘আ করতে হবে এবং ক্ষতি হ্রাস ও কল্যাণ বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট হতে হবে। এটাই সঠিক পথ যা অনুসরণ করা আবশ্যক, কারণ এটি সাধারণভাবে সকল মুসলিমের স্বার্থ রক্ষা করে এবং ক্ষতি হ্রাস ও কল্যাণ বৃদ্ধি করে। যেহেতু এটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং মুসলিমদের বৃহত্তর ক্ষতি থেকে রক্ষা করে, তাই আমরা আল্লাহর কাছে সকলের জন্য সাফল্য ও হেদায়েত প্রার্থনা করি।
(উৎস: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতার আইনশাস্ত্রের পর্যালোচনা)।
শায়েখ ছালেহ আল ফাওজান মুসলিম শাসকের সাথে আমাদের আচরণের বিষয়ে বলেন, ‘মুসলিমদের ওপর আবশ্যক হলো শাসককে আল্লাহর আনুগত্যের বিষয়ে অবশ্যই মান্য করা । যদি তিনি আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ দেন, তবে সেই বিষয়ে, অর্থাৎ অবাধ্যতার বিষয়ে, তাকে মান্য করা যাবে না। তবে, অবাধ্যতা জড়িত নয় এমন অন্যান্য বিষয়ে তাকে মান্য করতে হবে। পক্ষান্তরে একজন কাফের শাসকের সাথে আচরণের বিষয়টি পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হবে। যদি মুসলিমদের শক্তি ও সামর্থ্য থাকে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার, তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করার এবং একজন মুসলিম শাসক প্রতিষ্ঠা করার, তবে তাদের জন্য তা করা ফরজ। এটাই আল্লাহর পথে জিহাদ। কিন্তু যদি তারা তাকে অপসারণ করতে অক্ষম হয়, তবে তাদের জন্য অত্যাচারী ও কাফেরদের উস্কানি দেওয়া জায়েজ নয়, কারণ এটি মুসলিমদের উপর ক্ষতি ও ধ্বংস ডেকে আনে’।
নবী (ﷺ) তাঁর নবুওয়াত শুরু হওয়ার পর তেরো বছর মক্কায় বসবাস করেছিলেন এবং সেখানকার শাসনভার ছিল কাফেরদের হাতে। তাঁর সাথে তাঁর সেইসব ছাহাবী ছিলেন যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করেননি। বরং, এই সময়ে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করতে তাঁদের নিষেধ করা হয়েছিল। নবী (ﷺ)-এর হিজরতের আগ পর্যন্ত তাঁদের যুদ্ধ করার কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি। অতঃপর যখন ইসলামী রাষ্ট্র গঠন হলো, যুদ্ধ করার মতো একটি সেনা দল তৈরি হলো, যাদের মাধ্যমে তিনি কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করতে সক্ষম হন তখন মহান আল্লাহ তাঁকে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছিলেন’।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি হলো এই যে, যদি মুসলিমরা কোনো অমুসলিম রাষ্ট্রের শাসনাধীনে থাকে এবং তা অপসারণ করতে না পারে, তবে তারা তাদের ইসলাম ও ঈমানকে আঁকড়ে ধরে থাকবে, নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না’। [পূর্ববর্তী উৎস]
আলেমদের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, কোনো মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা জায়েজ নয়, এমনকি যদি তিনি অন্যায়কারী বা অত্যাচারীও হন। বরং, তাঁর ভালো কাজে আনুগত্য করাই ফরজ। আর যে শাসক কাফের, যার কুফুরী আল্লাহ কর্তৃক সুস্পষ্ট, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কেবল তখনই জায়েজ, যদি তাকে অপসারণ করে তার জায়গায় একজন সৎ নেতা প্রতিষ্ঠা করার সামর্থ্য থাকে এবং এর ফলে মুসলিমদের মধ্যে কোনো ফিতনা ও ক্ষতি না হয়। এই সামর্থ্য ছাড়া বিদ্রোহ করলে তা অনিবার্যভাবে হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, সম্পদ লুণ্ঠন, সম্মানহানি এবং অন্যান্য মন্দ কাজের দিকে নিয়ে যাবে। যারা কাফের শাসকের দ্বারা আক্রান্ত, তাদের জন্য ধৈর্য ধারণ করা, আন্তরিক উপদেশ দেওয়া, ইসলামের দিকে আহ্বান করা এবং ক্ষতি হ্রাস ও কল্যাণ বিস্তারের জন্য চেষ্টা করা ফরজ।
আমাদের প্রবৃত্তির চাহিদা আমাদেরকে যেন কষ্ট না দেয় এবং আমাদের যেন পদস্খলন না হয়, সেজন্য আমাদের অবশ্যই সৎ ও সরল পথে অবিচল থাকতে হবে এবং আন্তরিক, কল্যাণকামী আলেমদের অনুসরণ করতে হবে। আমাদের উচিত আলেমদের সাথে অবস্থান করে তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের জ্ঞান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং তাঁদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করা, বিশেষ করে যখন মতের অমিল ও মতবিরোধের বিষয় থাকে, যেমনটি আজ আমাদের ক্ষেত্রে ঘটছে। কারণ তাঁরা তা বোঝেন যা আমরা বুঝি না; তাঁরা গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিষয়গুলোর পরিণতি উপলব্ধি করতে পারেন, যা আমরা পারি না।
ইমাম আওযাই (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘নিয়ম-নীতির ব্যাপারে ধৈর্য ধরো, মানুষেরা যেখানে অবস্থান করে তুমিও সেখানে অবস্থান করো, তারা যা বলে তোমরাও তাই বল, তারা যা থেকে বিরত থাকে, তুমিও তা থেকে বিরত থাকো এবং তোমাদের নেককার পূর্বপুরুষদের পথ অনুসরণ করো, কারণ যা তাঁদের জন্য যথেষ্ট ছিল, তা তোমাদের জন্যও যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ’ (উসূলুল ই’তিকাদ)।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. আল-খাল্লাল, আস-সুন্নাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৩২-১৩৩।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৭০৫৪।
[৩]. মিনহাজুস সুন্নাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৫৩১।
[৪]. ইমাম আর্জুরি, আশ-শারী‘আহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫৮।
[৫]. ই‘লামূল-মূওয়াক্কিইন, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪।
[৬]. ফাৎহুল-বার বি তারতিবি তামহিদ ইবনে আব্দুল বার, ১ম খণ্ড, পৃ. ১১১।
[৭]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৫৫।
[৮]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪৮।
[৯]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৩৯।
[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/৭০৫২।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/১৭০৯।