রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কারে আলিমগণের গৃহীত মূলনীতিসমূহ: একটি পর্যালোচনা

- ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান


(শেষ কিস্তি)

১১. পাশ্চাত্য দর্শন ও মতবাদ হতে মুসলিম উম্মাহর সংরক্ষণ (Preservation of the Muslim Ummah from Western philosophy and doctrine)

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত ইসলাম পরিপূর্ণই থাকবে। এখানে কিছু সংযোজন-বিয়োজনের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু কালক্রমে মানব রচিত বিজাতীয় কিছু দর্শন ও মতবাদ আবিষ্কারের কারণে ইসলাম তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে। কোন কোন সময় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। বাংলাদেশেও পাশ্চাত্য দর্শন ও মতবাদের প্রভাবে ইসলামী ‘আক্বীদাহ-বিশ্বাস, রীতি-নীতি ও ইসলামের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য প্রভৃতি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বস্তুবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা-চেতনার বিষবাষ্পে এদেশের মুসলিম সমাজ অন্ধকার জগতে নিমজ্জিত হতে শুরু করে। তাই পাশ্চাত্য দর্শন ও মতবাদ হতে মুসলিম উম্মাহকে সংরক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা যরূরী। এদেশের ‘আলিমগণ যেকাজ ধারাবাহিকভাবে করে গেছেন।

বর্তমান গ্রীক ও রোমান সভ্যতার কারণে বস্তুবাদী পাশ্চাত্য দর্শনের আবির্ভাব ঘটেছে। যে দর্শন ধর্মীয় অনুভূতি ও আধ্যাত্মিকতা শূন্য এবং ভোগবাদিতা ও পার্থিব আরাম-আয়েশের প্রতি তীব্র আকর্ষণ করে।[১] রোমানরা ছিল স্বজনপ্রীতি, সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা ও জীবন সম্পর্কে নির্ভেজাল বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। এর পাশাপাশি গণতান্ত্রিক যুগের শেষ দিকে রোমে নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতন, পাশবিক কামনা-বাসনার অবাধ রাজত্ব এবং বিত্ত-বৈভবের এমন এক প্লাবন এসে দেখা দিল যে, রোমকরা তাদের মধ্যে একেবারে ডুবে গেল এবং সেই নৈতিক শৃঙ্খলা ও বিধানসমূহ- যেগুলো রোমক জাতির প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য ছিল, তা খড়কুটোর মত ভেসে গেল এবং সংহতির প্রাসাদে এমন কাঁপন সৃষ্টি করল, মনে হলো এই বুঝি তা ভূমিতে ধসে পড়বে!’[২]

অতঃপর গ্রীক ও রোমকদের উপরিউক্ত মতাদর্শে দিক্ষিত হয়ে ইউরোপীয় সমাজের লেখক, সাহিত্যিক, সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তাদের বস্তুবাদের ব্যাপকভাবে প্রচার শুরু করেন এবং মানুষের মন-মগজে বস্তুপূজার বীজ বপন করেন। তারা বস্তুবাদকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তারা কখনও উপযোগিতাবাদের দর্শন পেশ করেন আবার কখনও বা পেশ করেন ‘খাও দাও ফুর্তি কর’-এর দর্শন। কেউ ইতিপূর্বে ‘ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা’ এই দর্শন পেশ করেছিলেন। যার মূল থিওরি ছিল ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত বিষয়, তার সঙ্গে রাজনীতির কোন সম্পর্ক থাকবে না।[৩]

গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, তাহলো- বর্তমান পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং প্রাচীন গ্রীক ও রোমক সভ্যতা-সংস্কৃতির মধ্যে ব্যাপক সাদৃশ্য রয়েছে। গ্রীকরা যেমন ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা থেকে মুক্ত ছিল, তেমিন বর্তমান পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আধ্যাত্মিকতার দিক দিয়ে শূন্য। বর্তমানে পাশ্চাত্য সভ্যতায় যেমন খেল-তামাশা ও বস্তুবাদ সুস্পষ্ট, তেমনি সেটা গ্রীক ও রোমান সভ্যতায় বিদ্যমান ছিল। মূলত বস্তুবাদ ও বস্তুপূজাই হলো আজকের পাশ্চাত্য সমাজের মৌলিক দর্শন। অথচ এ পাশ্চাত্য দর্শনের করালগ্রাসে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। প্রখ্যাত গবেষক মুহাম্মাদ আসাদ পাশ্চাত্য সভ্যতার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে, ‘এতে কোন সন্দেহ নেই যে, পশ্চিমা দেশগুলোতে এখনও এমন বহু লোক পাওয়া যাবে, যারা ধর্মীয় ধারায় অনুভব করেন, চিন্তা করেন এবং প্রাণপণ চেষ্টা করেন তাদের ধর্ম বিশ্বাস ও সভ্যতার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে। কিন্তু তারা হচ্ছেন ব্যতিক্রম মাত্র। গণতন্ত্রী অথবা ফ্যাসিস্ট, পুঁজিবাদী অথবা সমাজতন্ত্রী বলশেভিক, দিনমজুর অথবা বুদ্ধিজীবীÑইউরোপের যেকোন সাধারণ ও মধ্যম শ্রেণীর মানুষ একটি মাত্র ইতিবাচক ধর্মকেই চেনে ও জানে। আর তা হলো- বস্তুবাদী উন্নতি-অগ্রগতির পূজা। তাদের বিশ্বাস, জীবনকে ক্রমাগত মুক্ত, বাধাবন্ধনহীন ও সহজতর করে তোলা ব্যতিরেকে জীবনের আর কোন লক্ষ্য নেই অথবা চলতি কথায় প্রকৃতি-নিরপেক্ষ হওয়াই তার ধর্ম। বিরাট বিরাট কারখানা, সিনেমা, রাসায়নিক গবেষণাগার, নাচঘর তথা নৃত্যকলা ভবন, পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে এ ধর্মের মন্দির আর তার পুরোহিত হলো ব্যাংকার, ইঞ্জিনিয়ার, অভিনেতা-অভিনেত্রী, শিল্পপতি ও অর্থবিত্তের অধিকারী কৃতবিদ্যা পুরুষ। ক্ষমতা ও আনন্দের এ নেশার অপরিহার্য পরিণাম হয়েছে যেখানে-সেখানে স্বার্থের সশস্ত্র দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। আর সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এর ফল হচ্ছে এমন এক ধরনের মানুষ সৃষ্টি, যাদের নীতিবোধ নিছক উপযোগবাদের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ এবং যার ভালো-মন্দের সর্বোচ্চ মাপকাঠি হচ্ছে একমাত্র বস্তুবাদী সাফল্য ও কামিয়াবী’।[৪]

প্রাচ্যের অন্যতম বিচক্ষণ ‘আলিম ও দার্শনিক বিখ্যাত পর্যটক ‘আব্দুর রহমান আল-কাওয়াকিবী (মৃ. ১৩২০ হি.) এর বাস্তবতা আরো সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পাশ্চাত্যের লোকেরা প্রকৃতিগবভাবেই বস্তুবাদী তথা বস্তুপূজারী, স্বভাবগতভাবে কঠিন হৃদয় ও লেনদেনের ব্যাপরে অত্যন্ত কঠোর। তারা স্বভাবত স্বার্থপর, বিদ্বেষপরায়ণ ও প্রতিশোধপরায়ণ। মনে হয়, উন্নত নীতি-নৈতিকতা ও মহৎ প্রেরণার ভেতর থেকে এখন তাদের কাছে কিছুই অবশিষ্ট নেই, যা প্রাচ্যের খ্রিষ্টধর্ম তাদের দিয়েছিল। একজন জার্মানীর কথাই ধরুন, মেজাজগতভাবে শুষ্ক ও প্রকৃতিগতভাবে রূঢ ও কর্কশ। তার মতে, একজন দুর্বল মানুষের বেঁচে থাকার কোনই অধিকার নেই। তার কাছে শক্তি, হ্যাঁ, কেবল শক্তিই শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য লাভের একমাত্র হাতিয়ার। আর শক্তির উৎস হলো অর্থ-বিত্ত। তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অবশ্যই মর্যাদা দেয়, কিন্তু তা দেয় অর্থ-বিত্তের খাতিরে। তারা সম্মান লাভে আগ্রহী, কিন্তু তা-ও অর্থ-বিত্তের স্বার্থে। গ্রীক ও ইতালিয়ানরা প্রকৃতিগতভাবে স্বার্থপর ও স্বাধীন মত প্রকাশকারী। তাদের মতে প্রজ্ঞা বা বুদ্ধিবৃত্তি স্বাধীনতা ও বল্গাহীনতার অপর নাম। আর জীবন বলা হয় বেহায়াপনাকে, সৌন্দর্য ও পোশাক-পরিচ্ছদের অপর নাম সম্মান এবং অপরের উপর প্রাধান্য ও বিজয় লাভ করাই হলো ইজ্জত লাভ’।[৫]

সুধী পাঠক! উপর্যুক্ত আলোচনায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতা সম্পূর্ণ বস্তুবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যেখানে তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতকে স্বীকার তো করাই হয় না, এমনকি তার প্রয়োজনও অনুভব করা হয় না। অথচ বাংলাদেশের মুসিলম সমাজ আজ এ পাশ্চাত্য বস্তুবাদী সভ্যতার দিকে ধাবমান। মুসলিমদের পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি সহ প্রত্যেক ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী মতবাদ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়েছে। গ্রীক-রোমানদের আদলে গড়ে উঠা পাশ্চাত্যের নোংরা বস্তুবাদী দর্শনের আলোকে এদেশের রাষ্ট্র ও জনগণ শাসিত হচ্ছে। তাদেরই চিন্তার ফসল হলো বর্তমানে প্রচলিত গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি। যেগুলো সবই ইসলামের চির শাশ্বত বিধানের পরিপূর্ণতা, স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, সৌন্দর্য এবং গৌরবান্বিত ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ভুলূণ্ঠিত করেছে। তাই বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন সফল করতে হলে পাশ্চাত্যের এসকল বস্তুবাদী দর্শনের ভয়াবহ আক্রমণ থেকে মুসলিমদেরকে সংরক্ষণ করতে হবে। পুনর্জ্জীবিত করতে হবে ইসলামের হারিয়ে যাওয়া জীবনাদর্শকে। আর এজন্য মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আদর্শের পরিপূর্ণ অনুসরণ, আনুগত্য ও সেখানে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কোন বিকল্প নেই। কেননা তিনি হলেন বিশ্ব মডেল। তাঁর আদর্শই পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। তাই সকল ধর্ম, দর্শন ও মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করে মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। যেমন ছাহাবায়ে কিরাম রাসূল (ﷺ)-কে মেনে নিয়েছিলেন।[৬]

সর্বশ্রেষ্ঠ ও অভ্রান্ত আদর্শ হলো মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আদর্শ। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আদর্শের শ্রেষ্ঠত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, لَقَدۡ کَانَ لَکُمۡ  فِیۡ رَسُوۡلِ اللّٰہِ  اُسۡوَۃٌ حَسَنَۃٌ  ‘নিশ্চয় তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মধ্যে’ (সূরা আল-আহযাব : ২১)। হাদীছে এসেছে, আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

كُلُّ أُمَّتِىْ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ، إِلَّا مَنْ أَبَى. قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَنْ يَأْبَى قَالَ ্রمَنْ أَطَاعَنِىْ دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِىْ فَقَدْ أَبَىز

‘আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে। কেবল ঐ ব্যক্তি ব্যতীত, যে অস্বীকার করে। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! কে অস্বীকার করে? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আমার অবাধ্যতা করবে, সেই অস্বীকারকারী’।[৭] শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলোভী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিখ্যাত ‘হুজ্জাতুল্লাহিলো বালিগাহ’ গ্রন্থে বলেন, ‘আমি বলছি, দ্বীনের শৃংখলা নির্ভরশীল হয়ে থাকবে নবী করীম (ﷺ)-এর সুন্নাতের অনুসরণের উপর। আর রাজ্যের রাজনৈতিক শৃংখলা নির্ভরশীল হয়ে থাকবে খুলাফায়ে রাশিদীনের আনুগত্যের উপর, যে বিষয়ে তাঁরা ইজতিহাদের মাধ্যমে প্রজাসাধারণকে নির্দেশ দান করেছেন জিহাদ প্রতিষ্ঠা এবং কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত করার ব্যাপারে এবং আরো অনুরূপ অন্যান্য ব্যাপারে, যা শরী‘আতের মধ্যে বিদ‘আত সৃষ্টি হবে না এবং শার‘ঈ দলীলের বিরোধী হবে না’।[৮]

অতএব বিশ্বে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আদর্শের কোন বিকল্প নেই। বিশ্বশান্তির অগ্রনায়ক মুহাম্মাদ (ﷺ) সম্পর্কে অমুসলিম পণ্ডিত মাইকেল এইচ, হার্ট বলেছেন,

"My choice of Muhammad to lead the list of the world’s most influential persons may surprise some readers and may be questioned by others, but he was the only man in history who was supremely successful on both the religious and secular levels." 

‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রভাবশালীদের তালিকায় আমি সর্বশেষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে মুহাম্মাদকে বেছে নিয়েছি। আমার এ পসন্দ কোন কোন পাঠককে বিস্মিত করতে পারে, আবার অনেকের মনে নানা প্রশ্নেরও উদ্রেক হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব, যিনি ধর্মীয় ও পার্থিব উভয় ক্ষেত্রেই সর্বাঙ্গীন সাফল্য অর্জন করেছেন’।[৯] খ্রিস্টান দার্শনিক জর্জ বার্নাড ‘শ বলেন,

"I believe that if a man like him (Muhammad) were to assume the dictatorship of modern world, he would succeed in solving its problems in a way that could bring it the much needed peace and happiness."  ‘আমি বিশ্বাস করি যে, মুহাম্মাদের মত একজন লোক যদি এই আধুনিক বিশ্বের একনায়কত্ব গ্রহণ করতেন, তবে এই জটিল সমস্যার এমন সুন্দর সমাধান করতেন, যা এনে দিত অত্যাবশ্যক সুখ ও শান্তি’।[১০]

১২. আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন (Qualification in modern science)

ইসলাম বিশ্বজয়ী ও সর্বজনীন জীবনাদর্শ। ইসলাম তার নিজস্ব শক্তিমত্তা ও অনুপম আদর্শের উপর ভিত্তি করে সমগ্র পৃথিবী শাসন করেছিল। পার্থিব শক্তির সকল ক্ষেত্রে ইসলামের ভারসাম্য ছিল অতুলনীয়। তাই বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন সফলতার জন্য কল্যাণকর পার্থিব সকল শক্তির সক্ষমতা অর্জন করা যরূরী। বিজ্ঞানের উৎকর্ষে প্রযুক্তি যখন এগিয়ে যাবে, তখন শক্তি, সামর্থ্য, শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্য সকল ক্ষেত্রে ইসলামেরও উৎকর্ষ সাধিত হতে হবে। একবিংশ শতাব্দীর উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের মুসলিমদেরকেও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে সক্ষমতা অর্জন করা আবশ্যক। তবে এক্ষেত্রে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

পার্থিব শক্তির সক্ষমতা এমনিতেই অর্জিত হবে না। এজন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত মূলনীতি, উদ্যম চেতনা, ঈমানী শক্তির দৃঢ়তা এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার মোকাবেলার জাগতিক শক্তির ভারসাম্যতা অর্জন করা প্রভৃতি। এজন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অগ্রাধিকাপ্রাপ্ত।

(ক) শিক্ষাগত সক্ষমতা অর্জন (Acquiring educational skills)

বাংলাদেশের মুসলিমদের সামগ্রিক অধঃপতনের অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো- শিক্ষাগত সক্ষমতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়া। তাই এদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন অভিন্ন পদ্ধতিতে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে, যা আল-কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এর উপর ভিত্তি করেই মুসলিম জাতি ইসলামের অভ্যুদয়ের পর কয়েক শতাব্দীতে তার জ্ঞানগত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং বিশ্বকে সভ্যতা-সংস্কৃতির এক আদর্শিক সংস্করণ উপহার দিয়েছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী সভ্য দুনিয়া ইসলামের জ্ঞানগত বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করেছে, তার কলম দিয়ে লিখেছে এবং তারই ভাষায় লেখালেখি করেছে, গ্রন্থ প্রণয়ন করেছে। এককথায় মুসলিমরাই দুনিয়াতে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক জাগরণ সৃষ্টি করেছিল। আল-কুরআন ও হাদীছের শিক্ষার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে।[১১] ইসলাম শিক্ষার উন্নয়নের ব্যাপারে এত বেশি তাকীদ প্রদান করেছে, যা অন্য কোন দর্শন কিংবা ধর্ম করেনি। এজন্য কল্যাণকর যেকোন সমসাময়িক বিষয়ের প্রতিযোগিতায় ইসলামের প্রাধান্য থাকা অপরিহার্য। Islam at the Crossroads-এর লেখক মুহাম্মাদ আসাদ বলেন, 

"History proves beyond any possibility of doubt that no religion has ever given a stimulus to scientific progress comparable to that of Islam. The encouragement which learning and scientific research received from Islamic theology resulted in the splendid cultural achievements in the days of the Umayyads and Abbasids and the Arab rule in Sicily and Spain".

‘ইতিহাস সন্দেহাতীতরূপে প্রমাণ করে যে, ইসলাম যেমন বিজ্ঞানে অগ্রগতির প্রেরণা দিয়েছে, অপর কোন ধর্মই কখনো তা দেয়নি। শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইসলামী ধর্মশাস্ত্র থেকে যে উৎসাহ পেয়েছে, তার ফলে উমাইয়া ও আব্বাসীয় খলীফাদের আমলে এবং স্পেনে আরব শাসনের যুগে গৌরবদীপ্ত সাংস্কৃতিক কৃতিত্ব অর্জন সম্ভব হয়েছিল’।[১২] একটু পরে তিনি পরামর্শমূলক বক্তব্য দিয়ে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ইসলামী তামাদ্দুনের গভীরতা ও সম্পদ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করে তাদের মধ্যে ভবিষ্যতের নতুন আশা-উদ্দীপনা সঞ্চারের উদ্দেশ্যে মুসিলম বিদ্যালয়সমূহে ইসলামী সাহিত্যের যুক্তিসংগত বাদবিচারণপূর্ণ শিক্ষা দ্বারা ইউরোপীয় সাহিত্যের বর্তমান স্থান পূরণ করা প্রয়োজন’। এমনকি তিনি প্রচলিত ইতিহাস শিক্ষার ধারাকেও সংশোধন করে বিশুদ্ধ ইতিহাস চর্চা ও ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করার কথা বলেছেন।[১৩] তাই বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন সফলতার জন্য শিক্ষাগত সক্ষমতা অর্জন করা খুবই যরূরী।

(খ) শিল্প-প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন (Acquisition of industrial-technical capabilities)

বাংলাদেশে শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রধান প্রধান শাখায় মুসলিম ছাত্র ও শিক্ষকদেরকে নেতৃত্ব প্রদান করা যরূরী। বিশেষ করে প্রকৌশল, ফলিত বিজ্ঞান, মাইক্রো-ইলেকট্রনিক্স, তথ্য-প্রযুক্তি, কৃষি ও প্রজনন-প্রকৌশল, জীব-প্রকৌশল, চিকিৎসা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সক্ষমা অর্জন করতে হবে। শত্রুর মোবাবেলা করার জন্য সকল প্রকার শক্তি অর্জন করার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাকে নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি বলেন,

وَ اَعِدُّوۡا لَہُمۡ مَّا اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ قُوَّۃٍ وَّ مِنۡ رِّبَاطِ الۡخَیۡلِ تُرۡہِبُوۡنَ بِہٖ عَدُوَّ اللّٰہِ وَ عَدُوَّکُمۡ  وَ اٰخَرِیۡنَ مِنۡ دُوۡنِہِمۡ ۚ لَا تَعۡلَمُوۡنَہُمۡ ۚ اَللّٰہُ یَعۡلَمُہُمۡ ؕ وَ مَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ شَیۡءٍ  فِیۡ  سَبِیۡلِ  اللّٰہِ  یُوَفَّ اِلَیۡکُمۡ  وَ  اَنۡتُمۡ  لَا  تُظۡلَمُوۡنَ

‘তোমরা কাফিরদের বিরুদ্ধে যথাসাধ্য শক্তি ও সদা সজ্জিত অশ্ব বাহিনী প্রস্তুত রাখবে, যা আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত করবে। এছাড়া অন্যদেরকেও করবে, যাদের সম্পর্কে তোমরা জান না; কিন্তু আল্লাহ জানেন। আর তোমরা যা কিছু আল্লাহর পথে ব্যয় কর, তার প্রতিদান তোমাদেরকে পুরোপুরি দেয়া হবে। তোমাদের উপর অত্যাচার করা হবে না’ (সূরা আল-আনফাল : ৬০)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ‘আব্দুর রহমান ইবন নাসির আস-সা‘আদী (১৩০৭-১৩৭৬ হি.) বলেন, ‘ঐ সমস্ত বিষয়, যার দ্বারা তোমরা বৃদ্ধিবৃত্তিক, দৈহিক ও যাবতীয় অস্ত্রশক্তিসহ এরূপ অন্যান্য বিষয়ে শক্তি অর্জন করতে পারবে, যার মাধ্যমে বিরোধী শক্তির সাথে সংগ্রাম করতে পারবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যাবতীয় ইন্ডাস্ট্রী, যাতে সব রকমের অস্ত্র ও প্রতিরক্ষার যন্ত্র, মেশিনগান, বন্দুক, জঙ্গী বিমান, জল ও স্থল পথের যুদ্ধ জাহাজ, দুর্গ, অপসারণযন্ত্র, পরিখা ও সংরক্ষণের যাবতীয় সরঞ্জাম তৈরি হবে। এছাড়া কূটনীতি ও রাজনীতিও এর অন্তর্ভুক্ত, যার দ্বারা মুসলিমরা অগ্রগতির শীর্ষে পৌঁছে যাবে এবং শত্রুদের আক্রমণকে প্রতিরোধ করতে পারবে। তাছাড়া তীর নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ, বীরত্ব প্রদর্শন এবং প্রতিরোধ কৌশলও এর অন্তর্ভুক্ত’।[১৪]

জামাল্দ্দুীন আফগানী (১৮৩৮-১৮৯৭ খ্রি.) তাঁর অনেক বক্তৃতায় ও লেখায় বিজ্ঞান ও কারিগরী ক্ষেত্রে মুসলিমদের অগ্রগতি না হওয়ার বিষয় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইউরোপীয় উপনিবেশিক শক্তিসমূহ যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা তাদের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির জন্যই করেছে। তাই মুসলিমদের বৈজ্ঞানিক ও কারিগরী জ্ঞান আহরণের প্রতি মনোযোগী হতে হবে’। তিনি আরো জোর দিয়ে বলেন, ‘উপনিবেশিক শক্তির কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মুসলিমদের বিজ্ঞান সাধনার পথেই অগ্রসর হতে হবে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার কোন বিকল্প নেই’।[১৫] এজন্য মুসলিমদেরকে সার্বিক শক্তি ও প্রশিক্ষণ, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-প্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিতে হবে। জীবনের প্রতিটি শাখায়, প্রতিটি বিভাগে এবং প্রতিটি প্রয়োজনে পাশ্চাত্যের আগ্রাসন থেকে মুক্ত ও আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। এমনকি নিজের পরিধেয় বস্ত্রে এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য খাদ্যে স্বয়ংসম্পর্ণূ হতে হবে। নিজেদের প্রয়োজনীয় অস্ত্র নিজেদেরকেই তৈরি করতে হবে। এভাবেই নিজেদের জীবন পরিচালনায় সকল জিনিস যেন নিজেরাই প্রস্তুত করতে পারে তার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এই সাথে সাথে নিজেদের জমিনের বুকে লুক্কায়িত খনিজ সম্পদ নিজেদেরকেই উত্তোলন ও তা যথাযথ ব্যবহারের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। নিজেদের দেশের সরকার নিজেদের লোক দিয়েও পরিচালনা করতে হবে। নিজেদের সমুদ্রসীমায় নিজস্ব জাহাজ, নৌ-বহর, যুদ্ধজাহাজ, কামান, অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করতে হবে। আমদানির চেয়ে রপ্তানী বেশী করতে হবে এবং পাশ্চাত্য থেকে সকল প্রকার ঋণগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।[১৬]

(গ) সামরিক শক্তির সক্ষমতা অর্জন (Acquiring military capabilites)

বাংলাদেশে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ইসলামের বিজয় সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে সামরিক সক্ষমতা অর্জন করা প্রয়োজন। এজন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী একদল প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনী আব্যশক। যারা প্রাচীন ও আধুনিক যুদ্ধ কৌশলে হবেন অভিজ্ঞ এবং দৃঢ়চিত্ত মনোবলের অধিকারী। কেননা ইহুদী-খ্রিষ্টান ও সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে যখন ইসলামের বিরুদ্ধে আক্রমণ করবে, তখন যেন সেই সামরিক শক্তি তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর জন্য দৃঢ়তার সাথে শক্তি প্রদর্শন করতে পারে এবং তাদের নাস্তানাবুদ করে ইসলামের বিজয় সুনিশ্চিত করতে পারে। তাইতো সম্মিলিত কাফির শক্তিকে পদানত করার জন্য আল্লাহর রাসূল (ﷺ)ও তাঁর ছাহাবীদেরকে সমর প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। যেমন,

عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ يَقُوْل وَأَعِدُّوْا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ منْ قُوَّةٍ أَلَا إِنَّ الْقُوَّةَ الرَّمْيُ أَلَا إِنَّ الْقُوَّةَ الرَّمْيُ أَلَا إِنَّ الْقُوَّةَ الرَّمْيُ

‘উক্ববা ইবনু ‘আমির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি মিম্বারের উপর দাঁড়িয়ে বলেছেন, তোমরা তোমাদের শত্রুদের জন্য যথাসাধ্য শক্তি অর্জন কর। জেনে রাখ, নিশ্চয় যুদ্ধের শক্তিই হলো তীর নিক্ষেপ করা, নিশ্চয় যুদ্ধের শক্তিই হলো তীর নিক্ষেপ করা, নিশ্চয় যুদ্ধের শক্তিই হলো তীর নিক্ষেপ করা’।[১৭] তিনি আরো বলেছেন, ‘অচিরেই তোমাদের জন্য কিছু সাম্রাজ্য বিজিত হবে। আর আল্লাহই তোমাদের জন্য যথেষ্ট। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন তীর পরিচালনা শিক্ষা করার মধ্যে অলসতা না করে’।[১৮] আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের নিকট আবূ সুফিয়ানের প্রত্যার্বতনের সংবাদ পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পরামর্শ করলেন। তখন সা‘আদ ইবনু ‘উবাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) দাঁড়িয়ে বললেন,

يَا رَسُوْلَ اللهِ ﷺ وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لَوْ أَمَرْتَنَا أَنْ نُخِيْضَهَا الْبَحْرَ لَأَخَضْنَاهَا وَلَوْ أَمَرْتَنَا أَنْ نَضْرِبَ أَكْبَادَهَا إِلَى بَرْكِ الْغِمَادِ لَفَعَلْنَا قَالَ فَنَدَبَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ النَّاسَ فَانْطَلَقُوْا حَتَّى نَزَلُوْا بَدْرًا

‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সে সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যদি আপনি আমাদেরকে সওয়ারীসহ সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে নির্দেশ করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ঝাঁপিয়ে পড়ব। আর যদি ‘বারকুল গিমাদ’ পর্যন্তও আমাদের সওয়ারীকে ছুটিয়ে যেতে আদেশ করেন, তাহলে অবশ্যই আমরা তা করব। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লোকদেরকে আহ্বান করলেন। তখন সকলেই রওয়ানা হলেন এবং বদর নামক স্থানে উপনীত হলেন’।[১৯] উল্লেখ্য, সামরিক শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে সামরিক সংখ্যা মূখ্য বিষয় নয়। কেননা পূর্ণ ইখলাছ, প্রদীপ্ত ঈমান ও শাহাদতের তামান্না যদি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিদ্যমান থাকে, তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের সাহায্য আসবেই। যেমন বদর প্রান্তে কাফিরদের ১০০০ জন বিরাট স্বশস্ত্র বাহিনীর মোবাবিলায় মাত্র ৩১৩ জন মুসিলম সৈন্য বাহিনীর মাধ্যমে আল্লাহ বিজয় দান করেন করেন।[২০]

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাওলনা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০ খ্রি.) আন্দোলন, সংগ্রাম, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও মহৎ কাজের জন্য শরীরকে সুস্থ রাখা আবশ্যক মনে করতেন। কেননা শরীর চর্চা দেহ গঠন ও সুস্থতার অনন্য ভূমিকা রাখে। তিনি বাংলার মুসলিমদেরকে শরীরচর্চার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জনান। তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াত[২১] উদ্ধৃত করে মুসলিম সমাজকে ধর্ম, ঈমান, স্বজাতি ও আত্মরক্ষার্থে নিয়মিত শরীরচর্চা করার উপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘যে মুছলমান জাতির শৌর্য-বীর্য ও রণ প্রতাপে এবং দিগি¦জয়ের দুন্দুর্ভি নিনাদে এককালে জগৎ প্রকম্পিত ও স্তম্ভিত হইয়াছিল, যাহাদের পদভারে মেদিনী চঞ্চলিত হইয়া পড়িত, তাঁহাদের বংশধরগণের জীর্ণ-শীর্ণ দেহ, উৎসাহ-উদ্যমহীন চালচলন দর্শনে প্রাণে নৈরাস্যের সঞ্চার হয়।

যেখানে প্রতিবেশী হিন্দু যুবকগণ শরীরচর্চা ও ব্যায়াম কৌশল লইয়া ব্যস্ত, সেখানে মোছলমান যুববগণ গল্প-গুজব, তাস ও পাশা লইয়া সময় নষ্ট করছে। যুবকগণের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে সর্বাগ্রে শারীরিক উন্নতির জন্য স্থানে স্থানে ব্যায়ামাগার স্থাপন এবং তাহাতে কুস্তি-কছরতের সুব্যবস্থা, লাঠি খেলা, তরবারী চালানো ইত্যাদি শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এতে ধন ঐশ্বর্য রক্ষা, ধর্ম্ম রক্ষা, দেশ রক্ষা সমস্তই সম্ভব হইবে’।[২২]

তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অভিন্ন শিক্ষা কাঠামো তৈরি, শিল্প-প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সামরিক প্রস্তুতির মধ্যেই ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন সফলতা নিহিত। যা অর্জন করা যেমন কঠিন, তেমনি পরিশ্রমলব্ধ বিষয়। সুতরাং এর জন্য প্রয়োজন সুশৃঙ্খল ঐক্যবদ্ধ চেষ্টা-সাধনা, পরিপূর্ণ প্রস্তুতি, ধৈর্য ও ত্যাগ স্বীকারের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন, দৃঢ়চিত্ত অবিচলতা এবং কঠোর ও প্রাণান্তকর সাধনা।

সুধী পাঠক! বর্তমান ইউরোপীয় সভ্যতার বিপরীতে বাংলাদেশে ইসলামের আলোকে ধর্মীয় সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। নব্য জাহিয়িাতের মুখোমুখি হয়ে ইসলামকে সর্বক্ষেত্রে প্রকৃত রূপ দেয়া বড়ই চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত বটে। এজন্য আলোচিত মূলনীতিগুলো যথাযথভাবে কার্যকর করা সম্ভব হলে আশা করা যায় নিশ্চিত ফল পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।
 

তথ্যসূত্র :
[১] Halide Edib, The conflict of east and west in turkey (Dilhi : Maktaba Jamia Millia Islamia, 1935), p : 226-227; WEH Lecky, History of European Morals (London : 1869), Vol :1, P-344-345.
[২] মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?, পৃ. ২০০।
[৩] মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?, পৃ. ২১৮-২১৯।
[৪] Muhammad Asad, Islam at the crossroads (Gibraltar : Dar al-Andalus, Without Date), p-44.
[৫] ‘আব্দুর রহমান আল-কাওকিবী, তাবাই‘ঊল ইসতিবদাদ ওয়া মাসায়ি‘ঊল ইতসি‘বাদ (মিসর : কালিমাত, তা.বি.), পৃ. ৭৩-৭৪।
[৬] আল-মুস্তাদরাক ‘আলাস সহীহাইন, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৮০, হাদীছ সংখ্যা-৪৪৫৫, ‘সাহাবীগণের মর্যাদা’ অধ্যায়, ‘আবূ বাকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মর্যাদা’ অনুচ্ছেদ। 
[৭] ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, পৃ. ১১৬৭, হাদীছ নং-৭২৮০, ‘কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা’ অধ্যায়-৯৬, অনুচ্ছেদ-২।
[৮] হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, পৃ. ৩৫৯।     
[৯] Michael H. Hart, The 100 : A Ranking of the most Influential Persons in History (Madras-India : Meeraa Press, 1991), p. 33.
[১০] George Bernard Shaw, The Genuine Islam, Voll. 1 (Without publishing place & asspciation,1936), p.8.
[১১] (ক) এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ - দ্রষ্টব্য : সূরাহ আয-যুমার : ৯।
(খ) এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَرْفَعِ اللهُ الَّذِيْنَ آمَنُوْا مِنْكُمْ وَالَّذِيْنَ أُوْتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِيْرٌ  -দ্রষ্টব্য : সূরাহ আল-মুজাদালাহ : ১১।
[১২] Islam at the crossroads, p-66.
[১৩] Ibid, p-70-72.
[১৪] তাইসীরুল কারীমির রহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান, পৃ. ৩২৪।   
[১৫] সেখ মোহাম্মদ ইসমাঈল ও কাজী জহুরুল হক, ইসলাম ও আধুনিক মুসলিম জাহান (ঢাকা : বিশ্ব সাহিত্য ভবন, আগস্ট ২০০১), পৃ. ১১০।   
[১৬] মাযা খাসিরাল ‘আলিমি বি ইনহিতাতিল মুসলিমীন, পৃ. ২৩৭।
[১৭] ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল, আল-মুসনাদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৫৬, হাদীছ নং-১৭৪৬৮; ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, পৃ. ৬৩০, হাদীছ নং-১৯১৭ ‘ইমারাত’ অধ্যায়-৩৩, অনুচ্ছেদ-৫২; ইমাম আবী দাঊদ, আস-সুনান, পৃ. ৪৪২, হাদীছ নং-২৫১৪; ইমাম ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ, ১১তম খণ্ড, পৃ. ৭, হাদীছ নং-৪৭০৯; মিশকাতুল মাসাবীহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৭৭, হাদীছ নং-৩৮৬১।
[১৮] ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল, আল-মুসনাদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৫৭, হাদীছ নং-১৭৪৬৯; ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, পৃ. ৬৩০, হাদীছ নং-১৯১৮; ইমাম ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ, ১০তম খণ্ড, পৃ. ৫৪৯, হাদীছ নং-৪৬৯৭; মিশকাতুল মাসাবীহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৭৮, হাদীছ নং-৩৮৬২।
[১৯] ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, পৃ. ৫৮৪, হাদীছ নং-১৭৭৯ ‘জিহাদ’ অধ্যায়-৩২, অনুচ্ছেদ-৩০; মিশকাতুল মাসাবীহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৭৭, হাদীছ নং-৫৮৭১।
[২০] সূরাহ আল-আনফাল : ১২-১৩।
[২১] সূরাহ আল-আনফাল : ৬০।
[২২] মনিরুজ্জামান (সম্পা.), মৌলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী রচনাবলী, ১ম খণ্ড (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩ খ্রি.), পৃ. ।




প্রসঙ্গসমূহ »: বিবিধ সমাজ-সংস্কার
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (১৪তম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
বিদ‘আত পরিচিতি (২০তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
মু‘তাযিলা মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৫ম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইসলামে মেহমানদারী : একটি পর্যালোচনা - আল-ইখলাছ ডেস্ক
প্রচলিত তাবলীগ জামা‘আত সম্পর্কে শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের অবস্থান (৪র্থ কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
যাকাত বণ্টনে সমস্যা ও সমাধান - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
হেদায়াত লাভের অনন্য মাস রামাযান - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ছালাতের সঠিক সময় ও বিভ্রান্তি নিরসন (শেষ কিস্তি) - মাইনুল ইসলাম মঈন
বাউল মতবাদ - গোলাম রহমান
জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : মুহাম্মদ ইমরান বিন ইদরিস
আল-কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত (৮ম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
বিদ‘আত পরিচিতি (৪র্থ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান

ফেসবুক পেজ