ইসলামী নেতৃত্বের গুণাবলী ও নির্বাচন ব্যবস্থা
- ড. আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম*
নেতৃত্বের সংজ্ঞায় বলা হয় যে, নেতৃত্ব হচ্ছে সেই কার্যক্রম, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং তাদের এমন একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করে, যা তারা অর্জন করতে চায়। অন্যভাবে বলা যায় যে, নেতৃত্ব হলো দলীয় সদস্যদের আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করা, তাদের প্রচেষ্টাকে সমন্বয় করা এবং কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাদের পরিচালনা করার ক্ষমতা। নেতৃত্ব তিনটি মৌলিক উপাদান নিয়ে গঠিত। ১. একটি দল বা মানুষের সমষ্টি থাকা। ২. সেই দলের মধ্যে এমন একজন থাকা, যিনি তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করেন। ৩. এমন কিছু যৌথ লক্ষ্য থাকা, যা তারা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে।
ইসলামে নেতৃত্বের ধারণা বলতে বোঝায়, ‘দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের সময় খলীফা বা নেতার পদে থাকা ব্যক্তি যে আচরণ করেন, সেটাই নেতৃত্ব। এটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগের একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্যদেরকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেয় এবং তাদের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ইসলামী নেতৃত্ব স্বৈরাচার বা বিশৃঙ্খলা চেনে না। মুসলিম নেতা ইসলামের দৃঢ় নীতিমালা ও নিজের ঈমান-আক্বীদার ভিত্তিতে পরিচালিত হন। তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনুসারীদের সঙ্গে শূরা (পরামর্শ) নীতির উপর নির্ভর করেন ন্যায়, নিরপেক্ষতা ও সততার সাথে এবং তাঁর উদ্দেশ্য থাকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।
মুসলিম নেতার বৈশিষ্ট্যসমূহ
নেতা হলো জাতির সেবক। অর্থাৎ নেতা হলো সেই ব্যক্তি, যিনি দলের মানুষের সেবা করেন, তাদের কল্যাণে কাজ করেন এবং তাদের লক্ষ্য অর্জনের পথে নেতৃত্ব দেন। ইসলামী নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো :
১. নেতা ও অনুসারীদের আল্লাহর প্রতি আনুগত্য।
২. নেতার কাছে কাজের উদ্দেশ্য এবং প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ ইসলামের উচ্চ লক্ষ্য অনুযায়ী বোঝা থাকা।
৩. শারী‘আত ও ইসলামী আচরণের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা।
৪. আমানতদারি। নেতা আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপর যেসব দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তা সৎভাবে পালন করবে। এর মধ্যে ন্যায় এবং দয়া প্রদর্শন করাও অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন, اَلَّذِیۡنَ اِنۡ مَّکَّنّٰہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَوُا الزَّکٰوۃَ وَ اَمَرُوۡا بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ نَہَوۡا عَنِ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَ لِلّٰہِ عَاقِبَۃُ الۡاُمُوۡرِ ‘তারা এমন যাদেরকে আমরা যমীনে ক্ষমতা দান করলে তারা ছালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৪১)। উপরিউক্ত আয়াত উল্লেখ পূর্বক উমর ইবনু আব্দুল আজিজ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
‘এই আয়াতটি কেবল গভর্নর বা নেতার জন্য নয়, বরং নেতা এবং তার অধীনস্থ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। নেতার উপর জনগণের অধিকার হলো, তিনি যেন আল্লাহর অধিকার অনুযায়ী তোমাদেরকে দায়িত্বপূর্ণভাবে পরিচালনা করেন, তোমাদের মধ্যে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন এবং যথাসাধ্য সম্ভব তোমাদেরকে সঠিক ও সঠিক পথে পথপ্রদর্শন করেন। আর তোমাদের (জনগণের) কর্তব্য হলো, নেতা বা সরকারের প্রতি আনুগত্য করা, যা স্বেচ্ছাসেবী হতে হবে, জোর করে নয়, ছেদ বা বাধ্যকরণের মাধ্যমে নয় এবং নেতা বা সরকারের প্রতি তোমাদের গোপন অসহযোগিতা প্রকাশ্যভাবে প্রকাশ করা যাবে না’।[১]
অতএব বলা যায়, নেতা কেবল ক্ষমতা ব্যবস্থাপক নয়, বরং তিনি ন্যায়, দয়া ও আল্লাহভক্তির মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে কাজ করেন।
আল-কুরআনের আলোকে ইসলামী নেতৃত্বের গুণাবলী
মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য যুগে যুগে নেতা নির্বাচন করেছেন এবং তাদের মাধ্যমে মানুষকে তাওহীদ তথা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহব্বান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমরা অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং পরিহার কর তাগূতকে’ (সূরা আন-নাহল : ৩৬)।
এ আয়াত থেকে একটি সত্য স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, প্রত্যেক নবীর মিশনই ছিল তাওহীদের। সবাই তাওহীদের আহ্বান জানিয়েছেন এবং তাগূত ও শিরক থেকে তাদের উম্মতদেরকে সাবধান করে গেছেন। এ ব্যাপারে প্রত্যেকের দাবী ছিল এক। কোন হেরফের ছিল না। নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা (আলাইহিস সালাম) ও মুহাম্মাদ (ﷺ) প্রত্যেকেই তাওহীদ তথা একমাত্র এক আল্লাহর ইবাদত করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং আল্লাহ ব্যতীত যাবতীয় উপাস্য পরিত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এজন্য প্রত্যেক নবী-রাসূলগণ ছিলেন স্ব-স্ব জাতির মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত নেতা। মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে বলেন, ‘আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীমকে তার রব কয়েকটি বাণী দিয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর সে তা পূর্ণ করল। তিনি বললেন, আমি তোমাকে মানুষের জন্য নেতা বানাব’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১২৪)।
মূলত নবী-রাসূলগণের তাওহীদের নিকট আত্মসমর্পণ এবং শিরক, জাহিলিয়াতের বিরুদ্ধে আপোষহীনতা এবং এগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাই ছিল তাদের নেতৃত্বের অন্যতম গুণ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৩১, ১৩২; সূরা আল-মায়িদাহ : ৪৪; সূরা ইউনুস : ৭২, ৮৪; সূরা ইউসুফ : ১০১; সূরা আন-নামল : ৪৪; সূরা আল-মুমতাহিনা : ৪)।
তাছাড়া নেতৃত্ব দানের জন্য যে যোগ্যতা প্রয়োজন ও যরূরী, তা নবী-রাসূলগণের ছিল। মহান আল্লাহ তাদেরকে সেই যোগ্যতা দান করেছিলেন। নবী-রাসূলগণও আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতার ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তিদেরকে মজুর নিযুক্ত করতেন। শু‘আইব (আলাইহিস সালাম)-এর ঘটনা সেটাই প্রমাণ করে। মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন মাদইয়ান অভিমুখে যাত্রা করলেন এবং মাদইয়ান কূপের নিকট পৌঁছালেন। তখন দেখলেন, একদল লোক তাদের পশুগুলোকে পানি পান করাচ্ছে এবং তাদের পেছনে দু’জন নারী তাদের পশুগুলোকে আগলাচ্ছে। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, তোমাদের কী ব্যাপার? তারা বললেন, আমরা আমাদের পশুগুলোকে পানি পান করাতে পারি না, যতক্ষণ রাখালেরা তাদের পশুগুলোকে নিয়ে সরে না যায়। মূসা (আলাইহিস সালাম) তখন তাদের পক্ষে পশুগুলোকে পানি পান করালেন। শু‘আইব (আলাইহিস সালাম)-এর মেয়েরা বাড়িতে চলে গেলেন এবং তাদের একজন বলল, یٰۤاَبَتِ اسۡتَاۡجِرۡہُ ۫ اِنَّ خَیۡرَ مَنِ اسۡتَاۡجَرۡتَ الۡقَوِیُّ الۡاَمِیۡنُ ‘হে পিতা! আপনি তাকে মজুর নিযুক্ত করুন, কারণ আপনার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সে ব্যক্তি, যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত’ (সূরা আল-ক্বাছাছ : ২৬)।
মূসা ও হারূণ (আলাইহিস সালাম)-এর পরে বানী ইসরাঈলরা বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেয় এবং নানাবিধ অনাচারে লিপ্ত হয়। তখন মহান আল্লাহ তাদের ওপর পুনরায় আমালেকা জাতি চাপিয়ে দেন। বানী ইসরাঈলরা আবার নিগৃহীত হতে থাকে। এভাবে বহু দিন কেটে যায়। এক সময় শামাবীল নবী (আলাইহিস সালাম)-এর যুগ আসে। তারা এ নবীর কাছে একজন বাদশা নির্ধারণের দাবি জানায়, যাতে তার নেতৃত্বে পূর্বের ঐতিহ্য[২] ফিরে পেতে পারে এবং তাদের দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে পারে। মহান আল্লাহ তাদের দাবি মতে নেতা হিসেবে তালূতকে প্রেরণ করেন। মহান আল্লাহ তালূতকে বাদশাহ নিযুক্ত করেছিলেন এবং তাকে জ্ঞান ও দৈহিক শক্তিতে অধিক প্রবৃদ্ধি করেছিলেন। যা নেতৃত্বের অন্যতম গুণ। মহান আল্লাহ বলেন,
وَ قَالَ لَہُمۡ نَبِیُّہُمۡ اِنَّ اللّٰہَ قَدۡ بَعَثَ لَکُمۡ طَالُوۡتَ مَلِکًا ؕ قَالُوۡۤا اَنّٰی یَکُوۡنُ لَہُ الۡمُلۡکُ عَلَیۡنَا وَ نَحۡنُ اَحَقُّ بِالۡمُلۡکِ مِنۡہُ وَ لَمۡ یُؤۡتَ سَعَۃً مِّنَ الۡمَالِ ؕ قَالَ اِنَّ اللّٰہَ اصۡطَفٰىہُ عَلَیۡکُمۡ وَ زَادَہٗ بَسۡطَۃً فِی الۡعِلۡمِ وَ الۡجِسۡمِ ؕ وَ اللّٰہُ یُؤۡتِیۡ مُلۡکَہٗ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ
‘আর তাদের নবী তাদেরকে বললেন, আল্লাহ অবশ্যই তালূতকে তোমাদের জন্য বাদশাহ নিযুক্ত করেছেন। তারা বলল, আমাদের ওপর কিভাবে তার বাদশাহী হতে পারে? বাদশাহীর ব্যাপারে তো তার চেয়ে আমরাই অধিক হক্বদার। আর তাকে তো অধিক মাল দেয়া হয়নি। নবী বললেন, আল্লাহ তোমাদের জন্য তাকেই মনোনীত করেছেন এবং জ্ঞান ও দৈহিক শক্তিতে তাকে অধিক প্রবৃদ্ধি দিয়েছেন। আল্লাহ তো যাকে চান তাকেই তার রাজত্ব দিয়ে থাকেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রশস্ত ও সর্বজ্ঞানী’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৪৭)।
পরবর্তীতে মহান আল্লাহ দাঊদ (আলাইহিস সালাম)-কে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন। দাঊদ যখন যালূতকে হত্যা করেছিলেন, তখন তিনি নবী ছিলেন না। তালূতের একজন সাধারণ সৈন্য ছিলেন। পরে মহান আল্লাহ তাকে নবুওত ও রাজত্ব উভয়টি দান করেন। মহান আল্লাহ বলেন,
فَہَزَمُوۡہُمۡ بِاِذۡنِ اللّٰہِ ۟ۙ وَ قَتَلَ دَاوٗدُ جَالُوۡتَ وَ اٰتٰىہُ اللّٰہُ الۡمُلۡکَ وَ الۡحِکۡمَۃَ وَ عَلَّمَہٗ مِمَّا یَشَآءُ ؕ وَ لَوۡ لَا دَفۡعُ اللّٰہِ النَّاسَ بَعۡضَہُمۡ بِبَعۡضٍ ۙ لَّفَسَدَتِ الۡاَرۡضُ وَ لٰکِنَّ اللّٰہَ ذُوۡ فَضۡلٍ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ
‘তখন তারা আল্লাহর ইচ্ছায় যালূতের সৈন্যদেরকে পরাজিত করল এবং দাঊদ যালূতকে নিহত করল এবং আল্লাহ দাঊদকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করলেন এবং তাকে ইচ্ছানুযায়ী শিক্ষা দান করলেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৫১)।
মুসলিম উম্মাহর নেতা হলেন মুহাম্মাদ (ﷺ)। নেতৃত্ব ও মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ আদর্শ। কুরআনে এমন বহু আয়াত রয়েছে, যা জীবনের নানা ক্ষেত্রে রাসূল (ﷺ)-কে পথনির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَقَدۡ کَانَ لَکُمۡ فِیۡ رَسُوۡلِ اللّٰہِ اُسۡوَۃٌ حَسَنَۃٌ لِّمَنۡ کَانَ یَرۡجُوا اللّٰہَ وَ الۡیَوۡمَ الۡاٰخِرَ وَ ذَکَرَ اللّٰہَ کَثِیۡرًا ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, তার জন্য যে আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে’ (সূরা আল-আহযাব : ২১)।
আবার রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি আল্লাহর আরেকটি দিকনির্দেশনা হলো, মহান আল্লাহ বলেন,
فَبِمَا رَحۡمَۃٍ مِّنَ اللّٰہِ لِنۡتَ لَہُمۡ ۚ وَ لَوۡ کُنۡتَ فَظًّا غَلِیۡظَ الۡقَلۡبِ لَانۡفَضُّوۡا مِنۡ حَوۡلِکَ ۪ فَاعۡفُ عَنۡہُمۡ وَ اسۡتَغۡفِرۡ لَہُمۡ وَ شَاوِرۡہُمۡ فِی الۡاَمۡرِ ۚ فَاِذَا عَزَمۡتَ فَتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُتَوَکِّلِیۡنَ
‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছিলেন। যদি আপনি কঠোর ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত। অতএব আপনি তাদের ক্ষমা করুন, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজকর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করুন’ (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)।
অতএব বলা যায় যে, আল-কুরআনের দৃষ্টিতে একজন আদর্শ নেতা ১. ওহির নির্দেশের নিকট আত্মসমর্পণকারী হবেন ২. শক্তিশালী হবেন ৩. বিশ্বস্ত হবেন ৪. জ্ঞানী হবেন ৫. দৈহিক শক্তিতে সম্পৃদ্ধ হবেন ৬. প্রজ্ঞাবান হবেন ৭. দয়ালু ও নম্র হবেন ৮. কঠোর ও কঠিন হৃদয়ের হবেন না ৯. ক্ষমাশীল হবেন ১০. অধিনস্তদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন ১১. পরামর্শ গ্রহণ করবেন ১২. সিন্ধান্ত গ্রহণ করে আল্লাহর উপর ভরসা করবেন এবং ১৩. সর্বদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আদর্শ অনুসরণ করবেন।
কাউকে নেতা হলে এ গুণগুলো সর্বপ্রথম অর্জন করতে হবে। তবেই তিনি সত্যিকার অর্থে নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জন করতে সক্ষম হবেন।
সুন্নাহর আলোকে ইসলামী নেতৃত্বের গুণাবলী
নবী করীম (ﷺ)-এর হাদীসসমূহ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছে। আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,وَلاَ يَحِلُّ لِثَلاَثَةِ نَفَرٍ يَكُونُونَ بِأَرْضِ فَلاَةٍ إِلاَّ أَمَّرُوا عَلَيْهِمْ أَحَدَهُمْ ‘তিনজন ব্যক্তি যখন কোনো জনশূন্য প্রান্তরে অবস্থান করবে, তখন তারা যেন নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে নেতা নিযুক্ত করে’।[৩] আবূ সাঈদ খুদুরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, إِذَا خَرَجَ ثَلاَثَةٌ فِى سَفَرٍ فَلْيُؤَمِّرُوا أَحَدَهُمْ ‘তোমরা যখন তিনজন সফরে বের হবে, তখন তোমাদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর (নেতা) নির্ধারণ কর’।[৪]
উপরের দুটি হাদীছ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, দল বা জামা‘আত নিজেরাই তাদের নেতা নির্বাচন করবে। এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হবে, যিনি যোগ্যতা ও গুণাবলির কারণে নেতৃত্বের উপযুক্ত, শক্তি প্রয়োগ বা জবরদস্তির মাধ্যমে নয়।
প্রকৃত নেতৃত্ব সেটিই, যা দলের সন্তুষ্টি ও আস্থার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এমন নেতাই সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম হন এবং দলকে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছে তাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করেন।
আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন ইসলামী সমাজের জন্য শ্রেষ্ঠ নেতা ও উত্তম আদর্শ। যারা তাঁর রিসালাতে ঈমান এনেছিল, তাঁর দাওয়াত আঁকড়ে ধরেছিল এবং তাঁর দ্বীনের প্রচারে নিজেদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করেছিল, তাদের জন্য তিনি ছিলেন অনুকরণীয় পথপ্রদর্শক। নেতৃত্ব সম্পর্কে উম্মাহকে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ فَالْإِمَامُ الَّذِيْ عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল। আর তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। সুতরাং জনগণের শাসকও একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। ক্বিয়ামতের দিন তার দায়িত্ব সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে।[৫]তিনি (ﷺ) আরও বলেছেন, اسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَإِنِ اسْتُعْمِلَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ حَبَشِىٌّ كَأَنَّ رَأْسَهُ زَبِيبَةٌ ‘শোনো এবং মান্য করো, যদিও তোমাদের ওপর এমন একজন হাবশী দাসকে নেতা করা হয়, যার মাথা কিশমিশের মতো’।[৬] তিনি (ﷺ) আরও বলেন,
اللَّهُمَّ مَنْ وَلِىَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِى شَيْئًا فَشَقَّ عَلَيْهِمْ فَاشْقُقْ عَلَيْهِ وَمَنْ وَلِىَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِى شَيْئًا فَرَفَقَ بِهِمْ فَارْفُقْ بِهِ
‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের কোনো ব্যক্তি যদি তাদের কোনো দায়িত্বে নিযুক্ত হয়ে তাদের ওপর কঠোরতা করে, তবে তুমি তার ওপর কঠোরতা করো; আর যে ব্যক্তি তাদের প্রতি কোমল আচরণ করে, তুমি তার প্রতি কোমল হও’।[৭] তিনি (ﷺ) আরও বলেন,
مَنْ أَطَاعَنِى فَقَد أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ عَصَانِى فَقَدْ عَصَى اللَّهَ وَمَنْ أَطَاعَ الأَمِيرَ فَقَدْ أَطَاعَنِى وَمَنْ عَصَى الأَمِيرَ فَقَدْ عَصَانِى
‘যে আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল; আর যে আমার অবাধ্য হলো, সে আল্লাহর অবাধ্য হলো। আর যে আমীরের আনুগত্য করল, সে আমার আনুগত্য করল; আর যে আমীরের অবাধ্য হলো, সে আমার অবাধ্য হলো’।[৮]
এগুলো থেকে বোঝা যায়, ইসলামে নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব, ন্যায়পরায়ণতা, মানুষের কল্যাণচিন্তা এবং শাসিতদের প্রতি কোমল ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা।
নিশ্চয়ই, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) গভর্নর ও প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সূক্ষ্মতা ও সতর্কতার পরিচয় দিতেন। তিনি এমন ব্যক্তিদেরই নির্বাচন করতেন, যাদের চরিত্র ছিল উত্তম, জ্ঞান ছিল বিস্তৃত এবং যারা যোগ্যতা ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ ছিলেন। এজন্যই আমরা দেখি, ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে নেতা নির্বাচন করা হতো ন্যায়পরায়ণতা, সামর্থ্য ও সততার ভিত্তিতে।
ইসলামী নেতৃত্ব শূরা বা পরামর্শের নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত, আল্লাহ তা‘আলার এ বাণীর অনুসরণে: ‘তাদের পারস্পরিক কাজকর্ম পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়’ (সূরা আশ-শূরা : ৩৮)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজেও মুসলমানদের নেতৃত্ব ও পরিচালনায় এই নীতি বাস্তবে প্রয়োগ করতেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাহাবাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী, দূরদর্শী ও বিচক্ষণ ছিলেন, তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন এবং তাদেরকে আল্লাহর হক্ক, বান্দার হক্ব বিষয়ে নাছীহা করতেন।[৯] তাছাড়া মানুষকে সর্বপ্রথম তাওহীদের দাওয়াত দানে উৎসাহিত ও আদেশ করতেন। ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী করীম (ﷺ) মু‘আয (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে ইয়ামানের দায়িত্বশীল করে প্রেরণ করার সময় বলেন,
إِنَّكَ تَقْدَمُ عَلَى قَوْمٍ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوْهُمْ إِلَى أَنْ يُوَحِّدُوا اللهَ تَعَالَى فَإِذَا عَرَفُوْا ذَلِكَ فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ اللهَ فَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِىْ يَوْمِهِمْ وَلَيْلَتِهِمْ
‘তুমি আহলে কিতাবের এক সম্প্রদায়ের নিকট গমন করছ। অতএব তাদের প্রতি তোমার প্রথম আহ্বান হবে- তারা যেন আল্লাহর একত্বকে মেনে নেয়। তারা তা মেনে নিলে তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ দিনে রাতে তাদের প্রতি পাঁচ বার ছালাত ফরয করে দিয়েছেন’।[১০]
এ থেকে বোঝা যায়, ইসলামে নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা নয়; বরং তা হলো ন্যায়, যোগ্যতা, পরামর্শ ও আমানতদারিতার উপর প্রতিষ্ঠিত একটি মহান দায়িত্ব।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নেতৃত্বদানের অসাধারণ ক্ষমতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। এর মধ্যে ছিল মক্কা ও মদিনার সমাজে ইসলামী দাওয়াতের পরিকল্পনা, আনছার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন, অমুসলিমদের সঙ্গে চুক্তি ও সন্ধি সম্পাদন এবং ‘মুয়াল্লাফাতুল কুলুব’ বা যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা দরকার, তাদের প্রতি বিশেষ সদাচরণ ও দান-ছাদাক্বাহ দিয়ে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা।
তাঁর নেতৃত্বের আরেকটি অনন্য দিক ছিল, আরব গোত্রের প্রতিনিধিদলগুলোকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা, তাদের আপ্যায়ন করা এবং সুন্দর আচরণের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াতে আকৃষ্ট করা। তেমনি হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় তাঁর মহান নেতৃত্ব আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেখানে তিনি কোমলতা, ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
এই সন্ধির ফলাফল ইসলামী দাওয়াতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হয়েছিল। কারণ, এর ফলে মুসলমান ও মুশরিকরা একসঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পায়, মুসলমানদের জীবনযাপন ও তাদের ঈমানের দৃঢ়তা তারা কাছ থেকে দেখতে পারে। এতে অনেক মুশরিক ইসলাম সম্পর্কে অনুপ্রাণিত হয়ে মক্কা বিজয়ের আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নেতৃত্ব ছিল দূরদর্শিতা, দয়া, ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার অনন্য সমন্বয়, যা আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য আদর্শ ও পথনির্দেশ।
খোলাফায়ে রাশেদীনগণও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নেতৃত্বের পদ্ধতিই অনুসরণ করেছিলেন। বিশেষ করে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খেলাফতের সময় ইসলামী প্রশাসন এমন নেতৃত্বের নীতিমালা বাস্তবায়ন করে, যার মূল ছিল, দ্বীনের বার্তা প্রচার, উম্মাহর দেখভাল এবং ন্যায়ভিত্তিক শাসন।
তিনি শাসনকার্যে উত্তম আদর্শ স্থাপন করেন এবং শরী‘আতের বিধান আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। তাঁর শাসনের ভিত্তি ছিল মানুষের সাথে ন্যায়পূর্ণ আচরণ এবং পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত (শূরা)। তিনি মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল, তাদের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন এবং ভুয়া নবুওতের দাবিদারদের দমন করেন। এভাবে তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের স্থিতি ও নিরাপত্তা রক্ষা করেন।
যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে থাকেন, তবে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সেই রাষ্ট্রকে সুদৃঢ় ও স্থিতিশীল করেন। তাঁর শাসননীতি ও পদ্ধতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল খেলাফত গ্রহণের পর দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে, যেখানে তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي قَدْ وُلِّيتُ عَلَيْكُمْ وَلَسْتُ بِخَيْرِكُمْ، فَإِنْ ضَعُفْتُ فَقَوِّمُونِي، وَإِنْ أَحْسَنْتُ فَأَعِينُونِي، الصِّدْقُ أَمَانَةٌ، وَالْكَذِبُ خِيَانَةٌ، الضَّعِيفُ فِيكُمُ الْقَوِيُّ عِنْدِي حَتَّى أُزِيحَ عَلَيْهِ حَقَّهُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ، وَالْقَوِيُّ فِيكُمُ الضَّعِيفُ عِنْدِي حَتَّى آخُذَ مِنْهُ الْحَقَّ إِنْ شَاءَ اللَّهُ، لَا يَدَعُ قَوْمٌ الْجِهَادَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِلَّا ضَرَبَهُمُ اللَّهُ بِالْفَقْرِ، وَلَا ظَهَرَتْ - أَوْ قَالَ: شَاعَتِ - الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ إِلَّا عَمَّمَهُمُ الْبَلَاءُ، أَطِيعُونِي مَا أَطَعْتُ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، فَإِذَا عَصَيْتُ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَلَا طَاعَةَ لِي عَلَيْكُمْ، قُومُوا إِلَى صَلَاتِكُمْ يَرْحَمْكُمُ اللَّهُ
‘হে মানুষ! আমাকে তোমাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, অথচ আমি তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নই। যদি আমি দুর্বল হয়ে পড়ি, তবে আমাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে দাও; আর যদি আমি ভালো কাজ করি, তবে আমাকে সাহায্য করো। সত্য হলো আমানত, আর মিথ্যা হলো বিশ্বাসঘাতকতা। তোমাদের মধ্যে দুর্বল ব্যক্তি আমার কাছে শক্তিশালী, যতক্ষণ না আমি তার প্রাপ্য অধিকার তাকে ফিরিয়ে দিই, ইনশাআল্লাহ। আর তোমাদের মধ্যে শক্তিশালী ব্যক্তি আমার কাছে দুর্বল, যতক্ষণ না আমি তার কাছ থেকে অন্যের হক্ব আদায় করি, ইনশাআল্লাহ। কোনো জাতি যদি আল্লাহর পথে জিহাদ ত্যাগ করে, তবে আল্লাহ তাদের ওপর দারিদ্রতা চাপিয়ে দেন। আর কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা প্রকাশ পেলে, তাদের ওপর সর্বব্যাপী বিপদ নেমে আসে। তোমরা আমার আনুগত্য করো যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করি; কিন্তু যদি আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হই, তবে আমার আনুগত্য তোমাদের ওপর আবশ্যক নয়। এখন তোমরা ছালাতের জন্য দাঁড়াও, আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করুন’।[১১]
এই ভাষণ ইসলামী নেতৃত্বের মূলনীতি, নম্রতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও জনগণের পরামর্শ, স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর পর মুসলিমদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু), যখন আবূ বকর সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে এই দায়িত্বে মনোনীত করেন। তিনি তাঁর যোগ্যতা ও উত্তম রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখে তাঁকে নির্বাচন করেছিলেন। উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন প্রজ্ঞাবান, ন্যায়পরায়ণ ‘ফারুক’; তাঁর শাসনামল ইসলামের স্বর্ণযুগগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হয়।
তিনি শূরা বা পরামর্শব্যবস্থায় দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বলতেন, ‘হে মানুষ! তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও’। তিনি মানুষের সহযোগিতা নিতেন এবং গভর্নর ও সেনাপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাদের সাথে পরামর্শ করতেন। এরপর তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তর ও ব্যবস্থাপনা সুসংগঠিত করেন এবং বায়তুলমালে আগত বিপুল অর্থ কীভাবে কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা যায়, সে জন্য ‘দিওয়ান’ ব্যবস্থা চালু করেন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি কেন্দ্রীয় পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন; কারণ তখন ইসলামী রাষ্ট্র গঠনপর্বে ছিল এবং সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর সংগঠন প্রয়োজন ছিল। আর তা একক কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ছাড়া সম্ভব ছিল না। এ প্রসঙ্গে সুলাইমান আত-তামাওয়ী বলেন,
وكلنا يجد أنَّه لم يكن أمام عمر وسيلةٌ أخرى غيرها، بل لا نبالغ إذا قلنا: إنَّه لولا تركيز السُّلطات في يد الخليفة، وهيمنته التامَّة على جميع الأمور في أطراف الدولة، لَمَا استطاع عمر ولا المسلمون أنْ يُحقِّقوا ما حقَّقوه من معجزات في هذا الزمن القصير
‘আমরা সবাই বুঝতে পারি যে, উমরের সামনে এ পথ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। বরং আমরা যদি বলি, খলীফার হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র তাঁর পূর্ণ কর্তৃত্ব না থাকলে, উমর বা মুসলমানরা এত অল্প সময়ে যে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছিলেন, তা অর্জন করা সম্ভব হতো না, তাহলে অতিরঞ্জন হবে না’।[১২]
তিনি একটি স্বতন্ত্র বিচারব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠা করেন। বিচারকের পদে তিনি কেবল বড় বড় ফক্বীহদেরই নিয়োগ দিতেন, যারা উত্তম সুনাম, সুন্দর চরিত্র এবং দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানসম্পন্ন হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তাঁর শাসনামলে ইসলামী রাষ্ট্রে আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাঠামো সুস্পষ্টভাবে বিকশিত হয়। রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীলদের মধ্যে ছিলেন : গভর্নর (ওয়ালি), আমিল (প্রশাসনিক কর্মকর্তা), কাজী (বিচারক), দিওয়ানের লেখক এবং বায়তুল মালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
কোনো গভর্নর বা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার সময় তাঁর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। তিনি একটি লিখিত নিয়োগপত্র (আহদ) প্রদান করতেন, যাতে নিয়োগের ঘোষণা ছাড়াও তার দায়িত্ব, কর্তব্য, ক্ষমতা ও এখতিয়ার স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকত। এরপর তিনি নিজের সরকারি সিলমোহর দিয়ে তা অনুমোদন করতেন এবং শূরার সদস্য মুহাজির ও আনছারদের মধ্যে যারা উপস্থিত থাকতেন, তাদের সাক্ষী রাখা হতো।
খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর দায়িত্ব কেবল কর্মকর্তা নির্বাচন বা তাদের দিকনির্দেশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তিনি এমন নিশ্চয়তা বিধান করতেন, যাতে তাদের শাসন জনগণের জন্য রহমত, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার কারণ হয়। কোনো গভর্নর নিয়োগের সময় তিনি তাকে বলতেন,
إِنِّي لَمْ أَسْتَعْمِلْكَ عَلَى دِمَاءِ الْمُسْلِمِينَ وَلَا عَلَى أَعْرَاضِهِمْ، وَلَكِنِّي اسْتَعْمَلْتُكَ عَلَيْهِمْ لِتَقْسِمَ بَيْنَهُمْ بِالْعَدْلِ وَتُقِيمَ فِيهِمِ الصَّلَاةَ
‘আমি তোমাকে মুসলমানদের রক্ত বা তাদের সম্মান-ইজ্জতের ওপর কর্তৃত্ব করার জন্য নিয়োগ করিনি; বরং তোমাকে নিয়োগ করেছি, যাতে তুমি তাদের মধ্যে ছালাত কায়েম কর, ন্যায়সংগতভাবে সম্পদ বণ্টন কর এবং তাদের মাঝে ইনসাফের সঙ্গে বিচার কর’।[১৩]
আর তিনি তার ওপর এ শর্তও আরোপ করতেন যে, সে উৎকৃষ্ট (বাছাইকৃত ও বিলাসী) খাদ্য ভক্ষণ করবে না, কোমল ও বিলাসবহুল পোশাক পরবে না, দামী ঘোড়ায় (রাজকীয় বাহনে) আরোহণ করবে না এবং মানুষের প্রয়োজনের সময় নিজের দরজা তাদের জন্য বন্ধ করবে না। এ শর্তগুলো দ্বারা তিনি প্রশাসকদের সরল জীবনযাপন, জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেন।[১৪]
এরপর আগমন করেন তৃতীয় খলীফা ওছমান ইবনু আফফান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও চতুর্থ খলীফা আলী ইবনু আবি তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)। তারাও নেতৃত্ব নির্বাচনে একই নীতি অবলম্বন করেন। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) উপদেষ্টা নির্বাচনে যোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন এবং পরামর্শ, মতামত ও নাছীহার ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা গ্রহণের প্রতি জোর দেন।
তিনি উপদেষ্টাদের যে গুণাবলি উল্লেখ করেছেন তা হলো, আমানতদারিতা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা, বিষয়সমূহ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, মতপ্রকাশে সাহসিকতা এবং উত্তম চরিত্র ও সুন্দর জীবনাচার।
চতুর্থ খলীফা আলী ইবনু আবি তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন মালিক আল-আশতার-কে মিসর ও তার অধীনস্থ অঞ্চলের গভর্নর নিযুক্ত করেন, তখন তিনি তাঁর কাছে একটি দীর্ঘ নির্দেশনাপত্র প্রেরণ করেন। প্রশাসনিক নেতৃত্বের মৌলিক নীতিমালা একত্রে সংকলিত এই দলীলটি ঐতিহাসিকভাবে অন্যতম বিস্তৃত প্রশাসনিক অঙ্গীকারনামা হিসেবে বিবেচিত।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* সহকারী সম্পাদক, মাসিক আল-ইখলাছ।
তথ্যসূত্র :
[১]. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম, তাহক্বীক্ব : সামী ইবনু মুহাম্মাদ (দারুত ত্বয়্যিব, ১৪২০ হি.), ৫ম খণ্ড, পৃ. ৪৩৭।
[২]. এ আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর পরবর্তী যুগের একটি জাতির ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সাগরডুবি থেকে নাজাত পেয়ে মূসা ও হারূন (আলাইহিস সালাম) বানী ইসলাঈলের নিয়ে শামে এসে শান্তিতে বসবাস করতে থাকলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে পিতৃভূমি ফিলিস্তীন ফিরে গিয়ে আমালেকা জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তা পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দেয়া হয়, সাথে এ ওয়াদাও দেয়া হল- যুদ্ধ করলেই বিজয় দান করা হবে (সূরা আল-মায়িদাহ : ২৩)। কিন্তু তারা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে পরিস্কার জানিয়ে দিল- ‘তুমি ও তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে রইলাম’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ২৪)। ফলে শাস্তি স্বরূপ তারা তীহ ময়দানে ৪০ বছর উদ্ভান্ত অবস্থায় ঘুরতে থাকল। পরে ইউশা বিন নূনের নেতৃত্বে ফিলিস্তীন দখল করা হলেও বানী ইসরাঈলের পুনরায় বিলাসিতায় এবং নানাবিধ অনাচারে লিপ্ত থাকায় আবারও আমালেকা জাতিকে চাপিয়ে দেয়া হয় এবং বানী ইসরাঈলরা নিগৃহীত হতে থাকে। এভাবে বহু দিন কেটে যায়। এক সময় শামাবীল নবী (আলাইহিস সালাম)-এর যুগ আসে। তারা এ নবীর কাছে একজন বাদশা নির্ধারণের দাবি জানালে যাতে তার নেতৃত্বে পূর্বের ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে এবং বর্তমান দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে পারে। মহান আল্লাহ তাদের দাবি মতে নেতা হিসেবে তালূতকে প্রেরণ করেন।
[৩]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৬৪৭, সনদ ছহীহ।
[৪]. আবূ দাঊদ, হা/২৬০৮, সনদ হাসান ছহীহ।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৩৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮২৯।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৪২।
[৭]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮২৮।
[৮]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৯০০৩।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৭৩।
[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৭২।
[১১]. আবূ বকর আব্দুর রাযযাক, আল-মুছান্নাফ, ১০ম খণ্ড (দারুত তা’ছীল, ২য় সংস্করণ, ১৪৩৭ হি.), পৃ. ৩৫৭, হা/২১৭৬৮; মা‘মার ইবনু রাশিদ আল-আযদী, আল-জামিঊ, ১১তম খণ্ড (বৈরূত : আল-মাকতাবাতুল ইসলামী, ১৪০৩ হি.), পৃ. ৩৩৬।
[১২]. সুলাইমান আত-তামাওয়ী, উমর ইবনুল খাত্বাব ওয়া উছূলুস সিয়াসাতু ওয়াল ইদারাতুল হাদীছাতি, পৃ. ২৮৯।
[১৩]. ইবনু আবী শায়বাহ, আল-মুছান্নাফ, ৬ষ্ঠ খণ্ড (রিয়াদ : মাকতাবাতুর রুশদ, ১৪০৯ হি.), পৃ. ৪৬১, হা/৩২৯২০।
[১৪]. প্রাগুক্ত।