ইসলামী দৃষ্টিতে বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন
- আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ*
(২য় কিস্তি)
১০. দরিদ্র হলেও বিয়ে করার প্রেরণা
ইসলামে দরিদ্র হওয়াকে বিয়ে থেকে বিরত থাকার কারণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য করা হয়নি। বরং শরী‘আহ অনুযায়ী, বিয়ে একটি সুন্নাত ও গুরুত্বপূর্ণ আমল, যা ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করে। দরিদ্র হলেও বিয়ে করার জন্য স্পষ্টভাবে উৎস ও প্রেরণা রয়েছে; আল্লাহ তা‘আলা নিজ অনুগ্রহে বিবাহিত দম্পতিকে রিযিক প্রদান করেন। মহান আল্লাহ বলেন, اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ‘তারা যদি দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদেরকে তাঁর অনুগ্রহে ধনী করে দেবেন’ (সূরা আন-নূর : ৩২)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
ثلاثةٌ كلُّهم حقٌّ على اللهِ عَونُهُ: الغازي في سبيلِ اللهِ، والمُكاتبُ الَّذي يريدُ الأداءَ، والنّاكحُ الَّذي يريدُ التَّعفُّفَ
‘তিন শ্রেণীর মানুষের উপর আল্লাহর সাহায্য অপরিহার্য। (১) আল্লাহর পথে যুদ্ধে গমনকারী, (২) যে দাস নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করে দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে চায় এবং (৩) যে বিয়ে করতে চায় সতীত্ব রক্ষার জন্য’।[১]
বিয়ে শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি ধর্মীয় কর্তব্য। দরিদ্রতা বিয়ে না করার কারণ হতে পারে না, বরং আল্লাহ তা‘আলা বিয়ের মাধ্যমে রিযিকের ব্যবস্থা করেন।
১১. বিয়ে দ্বীনের পূর্ণতার পরিচয়
ইসলামে বিয়ে শুধু একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, এটি দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনের অনিবার্য স্তম্ভ, যা ব্যক্তির ধর্মীয় দায়িত্ব ও নৈতিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই বিষয়ে আমাদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, إِذَا تَزَوَّجَ الْعَبْدُ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الدِّينِ فَلْيَتَّقِ اللهَ فِي النِّصْفِ الْبَاقِي ‘মানুষ যখন বিয়ে করে তখন সে তার ঈমানের অর্ধেক পূর্ণ করে, অবশিষ্টাংশ লাভের জন্য সে যেন আল্লাহভীতি অর্জন করে’।[২]
বিয়ে দ্বীনের পূর্ণতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ হওয়া মানে হলো যে, ব্যক্তি বিবাহের মাধ্যমে ইসলামের একটি মৌলিক আদেশ পূর্ণ করছে এবং নিজের নৈতিক ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করছে।
১২. নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের প্রতি নিরোৎসাহ
ইসলামে বিয়েকে এক বিশাল সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ইসলাম শুধুমাত্র বিয়েকে ব্যক্তিগত সুখের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং এটি দ্বীনের একটি পূর্ণতা ও মানবজাতির নিয়মানুগ চলার পথ হিসেবে বিবেচনা করে। যেকোনো ব্যক্তি যার বিবাহের সামর্থ্য আছে, তার জন্য চিরকুমার বা নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নেওয়া ইসলামিক পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং এ বিষয়ে সরাসরি সতর্কতা ও বিরোধ আছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীদের নিকট আগত তিন ব্যক্তির এক ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করার স্বার্থে বিয়ে না করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِىْ فَلَيْسَ مِنِّىْ ‘আমি নারীদেরকে বিয়ে করেছি (সুতরাং বিয়ে করা আমার সুন্নাত)। অতএব যে আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে আমার দলভুক্ত নয়’।[৩]
বিয়ে না করে চিরকুমার ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের অনুমতি ইসলামে নেই। সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
رَدَّ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ عَلَى عُثْمَانَ بْنِ مَظْعُوْنٍ التَّبَتُّلَ وَلَوْ أَذِنَ لَهُ اَخْتَصَيْنَا
‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উছমান ইবনে মাযঊনকে নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের অনুমতি দেননি। তাকে অনুমতি দিলে আমরা নির্বীর্য হয়ে যেতাম’।[৪]
ইসলামে বিয়েকে একটি নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিয়ে না করা কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা নয়, বরং দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা উপেক্ষা করা। সুতরাং যে সমাজে বিয়ে ব্যতীত অবাধে নারী-পুরুষের মেলামেশা চলে, সেখানে পারিবারিক বন্ধন নষ্ট হয় এবং বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। পরিশেষে অবৈধ মেলামেশার কারণে পরকালে এরা জাহান্নামের কঠিন আযাবের সম্মুখীন হবে।
বিবাহের হুকুম
অবস্থা ও পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে বিয়ের হুকুম ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন-
১. সুন্নাত : যার যৌন চাহিদা আছে কিন্তু যিনায় পতিত হওয়ার ভয় নেই, তার জন্য বিয়ে করা সুন্নাত। ইমাম ইবনে কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, إِنْ كَانَتْ لَهُ شَهْوَةٌ وَلَكِنْ يَأْمَنُ الزِّنَا فَالنِّكَاحُ فِي حَقِّهِ مُسْتَحَبٌّ ‘যদি কারও যৌন চাহিদা থাকে, কিন্তু যিনায় লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা না থাকে, তবে তার জন্য বিয়ে করা মুস্তাহাব’।[৫]
২. ওয়াজিব : যার শারীরিক শক্তিমত্তা, সক্ষমতা ও আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে এবং যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ ও পদস্খলনের আশংকা করে, তার জন্য বিবাহ করা ওয়াজিব। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, إِذَا خَافَ وَقُوعَ الزِّنَا لَزِمَهُ التَّزَوُّجُ ‘যে ব্যক্তি যিনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা করে, তার জন্য বিয়ে করা ওয়াজিব’।[৬]
৩. মুবাহ : যার যৌন চাহিদা নেই, যেমন পুরুষত্বহীন ও বয়স্ক ইত্যাদি লোকের জন্য বিয়ে করা বৈধ। ইমাম আল কাসানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, إِذَا لَمْ تَكُنْ لَهُ شَهْوَةٌ فَالنِّكَاحُ فِي حَقِّهِ مُبَاح ‘যার নিকট যৌন চাহিদা নেই, তার জন্য বিয়ে বৈধ’।[৭]
৪. হারাম : যার দৈহিক মিলনের সক্ষমতা ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণের সামর্থ্য নেই, তার জন্য বিবাহ করা হারাম। অনুরূপভাবে যিনি যুদ্ধের ময়দানে বা কাফির-মুশরিক দেশে যুদ্ধরত থাকেন, তার জন্য বিবাহ হারাম। কেননা সেখানে তার পরিবারের নিরাপত্তা থাকে না। ইমাম ইবনে হাম্মাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,مَنْ أَرَادَ الْإِقَامَةَ فِي دَارِ الْحَرْبِ لَا يُسْتَحَبُّ لَهُ النِّكَاحُ، بَلْ يُكْرَهُ ‘যদি কোনো ব্যক্তি দারুল হারবে গিয়ে সেখানেই স্থায়ী হতে চায়, তবে তার জন্য বিয়ে করা আবশ্যক নয়, বরং মাকরুহ’।[৮]
বিয়ের রুকন বা ভিত্তি
সালাফদের অভিমত অনুযায়ী বিয়ের রুকন তিনটি।
১. সকল প্রতিবন্ধকতা হতে পাত্র-পাত্রী উভয়ে মুক্ত হওয়া : বর ও কনে উভয়ের মধ্যে এমন কোনো সম্পর্ক থাকা যাবে না, যা বিয়ের ক্ষেত্রে স্থায়ী বা সাময়িকভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। যেমন- (ক) স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা : ঔরশগত (রক্তের সম্পর্ক), দুধ পানজনিত সম্পর্ক, অথবা শ্বশুরালীয় সম্পর্কের কারণে মাহরাম হয়ে যাওয়া। (খ) সাময়িক প্রতিবন্ধকতা : কনের ইদ্দত চলাকালে বিয়ে বা মুশরিক পুরুষের সাথে মুসলিম নারীর বিয়ে।
২. ইজাব বা প্রস্তাবনা : এটি মেয়ের অভিভাবক বা তার প্রতিনিধির পক্ষ থেকে পেশকৃত প্রস্তাবনামূলক বাক্য। যেমন বরকে লক্ষ্য করে বলা, ‘আমি আমার মেয়েকে তোমার সাথে বিবাহ দিলাম’। অথবা এ ধরনের অন্য কোন কথা।
৩. কবুল বা গ্রহণ : এটি বর বা বরের প্রতিনিধির পক্ষ থেকে সম্মতিসূচক বাক্য। যেমন বর বলবে, قبلت ‘আমি বিয়ে কবুল করলাম’ অথবা এ ধরনের অন্য কোন কথা। শায়খ মুহাম্মাদ ছলেহ আল-মুনাজ্জিদ একই মত প্রদান করেন।[৯]
তবে চার মাযহার সহ অনেকের মতে, বিয়ের রুকন দু’টি। যথা- ১. ইজাব (إيجاب) বা প্রস্তাবনা , ২. কবুল (قبول) বা গ্রহণ।[১০]
বিয়ের শর্তাবলী
ইসলামে বিয়ে বৈধ হওয়ার জন্য চারটি মৌলিক শর্ত রয়েছে; কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত।
১. বৈধ পাত্র-পাত্রী নির্বাচিত হওয়া
যাদের মধ্যে বিবাহ বৈধ, কেবল তাদের মধ্যে বিয়ে হবে। যাদের সাথে বিয়ে হারাম করা হয়েছে, তাদের সাথে কখনোই বৈধ হবে না। মহান আল্লাহ বলেন,
حُرِّمَتۡ عَلَیۡکُمۡ اُمَّہٰتُکُمۡ وَ بَنٰتُکُمۡ وَ اَخَوٰتُکُمۡ وَ عَمّٰتُکُمۡ وَ خٰلٰتُکُمۡ وَ بَنٰتُ الۡاَخِ وَ بَنٰتُ الۡاُخۡتِ وَ اُمَّہٰتُکُمُ الّٰتِیۡۤ اَرۡضَعۡنَکُمۡ وَ اَخَوٰتُکُمۡ مِّنَ الرَّضَاعَۃِ وَ اُمَّہٰتُ نِسَآئِکُمۡ وَ رَبَآئِبُکُمُ الّٰتِیۡ فِیۡ حُجُوۡرِکُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِکُمُ الّٰتِیۡ دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ ۫ فَاِنۡ لَّمۡ تَکُوۡنُوۡا دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ ۫ وَ حَلَآئِلُ اَبۡنَآئِکُمُ الَّذِیۡنَ مِنۡ اَصۡلَابِکُمۡ ۙ وَ اَنۡ تَجۡمَعُوۡا بَیۡنَ الۡاُخۡتَیۡنِ اِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا
‘তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতাদেরকে, তোমাদের মেয়েদেরকে, তোমাদের বোনদেরকে, তোমাদের ফুফুদেরকে, তোমাদের খালাদেরকে, ভাতিজীদেরকে, ভাগ্নীদেরকে, তোমাদের সে সব মাতাকে, যারা তোমাদেরকে দুধপান করিয়েছে, তোমাদের দুধবোনদেরকে, তোমাদের শ্বাশুড়ীদেরকে, তোমরা যেসব স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছ, সেসব স্ত্রীর অপর স্বামী থেকে যেসব কন্যা তোমাদের কোলে রয়েছে তাদেরকে, আর যদি তোমরা তাদের সাথে মিলিত না হয়ে থাক, তবে তোমাদের উপর কোন পাপ নেই এবং তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীদেরকে এবং দুই বোনকে একত্র করা (তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে)। তবে অতীতে যা হয়ে গেছে তা ভিন্ন কথা। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আন-নিসা : ২৩)।
অতএব, বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন, যা কেবল নির্দিষ্ট সীমা ও শর্তের মধ্যে বৈধ। আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, কার সাথে বিয়ে হারাম এবং কার সাথে বৈধ, যাতে পরিবার ও সমাজে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই এই বিধান মেনে চলা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক কল্যাণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ।
২. পাত্র-পাত্রী উভয়ের সম্মতি থাকা
ছেলে মেয়ে উভয়ের আন্তরিক সম্মতি ছাড়া বিবাহ বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, لا تُنْكَحُ الأيِّمُ حتّى تُسْتَأْمَرَ ولا تُنْكَحُ البِكْرُ حتّى تُسْتَأْذَنَ قالوا: كيفَ إذْنُها؟ قالَ: أنْ تَسْكُتَ ‘বিধবাকে তার অনুমতি না নিয়ে বিয়ে দেওয়া যাবে না, আর কুমারীকে তার সম্মতি না নিয়ে বিয়ে দেওয়া যাবে না। তারা জিজ্ঞেস করল, তার সম্মতি কীভাবে? তিনি বললেন, চুপ করে থাকাই তার সম্মতি’।[১১]
অতএব, পাত্র-পাত্রী কাউকে জোর করে বিয়ে দেওয়া জায়েয নেই। কুমারী ও অকুমারী উভয়ের অনুমতি নিবে। কুমারীর চুপ থাকা তার অনুমতি দেওয়া আর অকুমারীর মৌখিক সম্মতি নিতে হবে। পাগল ও নির্বোধের ক্ষেত্রে এটি শর্ত নয়।
৩. পাত্রীর ওলী থাকা
মেয়ের অভিভাবক (ওলী) ছাড়া তার বিবাহ বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ ‘ওলী ছাড়া কোনো বিয়ে নেই’।[১২]
বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের বাবা তার অভিভাবক হওয়ার সর্বাধিক যোগ্য, অতঃপর বাবার অছিয়তকৃত ব্যক্তি, অতঃপর তার দাদা, এভাবে ঊর্ধ্বতন দাদারা, অতঃপর তার ছেলে ও নিম্নতম ছেলেরা, তার সহোদর ভাই, অতঃপর তার বৈমাত্রেয় ভাই, অতঃপর এসব ভাইয়ের ছেলেরা, অতঃপর আপন চাচা, অতঃপর বৈমাত্রেয় চাচা, অতঃপর তাদের সন্তানেরা, অতঃপর বংশীয় নিকটাত্মীয়রা। উল্লেখ্য যে, যে মেয়ের ওলী নেই, তার ওলী হবেন সরকার। তবে ওলী বা অভিভাবক হওয়ার জন্য কিছু শর্ত আছে। যেমন,
(ক) সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন হওয়া (খ) প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া (গ) দাসত্বের শৃঙ্খল হতে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়া (ঘ) অভিভাবককে মেয়ের ধর্মের অনুসারী হওয়া। সুতরাং কোন অমুসলিম ব্যক্তি মুসলিম নর-নারীর অভিভাবক হতে পারবে না। অনুরূপভাবে কোন মুসলিম ব্যক্তি অমুসলিম নর-নারীর অভিভাবক হতে পারবে না (ঙ) ন্যায়বান হওয়া (চ) পুরুষ হওয়া। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, لَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ الْمَرْأَةَ وَلَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ نَفْسَهَا فَإِنَّ الزَّانِيَةَ هِيَ الَّتِي تُزَوِّجُ نَفْسَهَا ‘এক মহিলা আরেক মহিলাকে বিয়ে দিতে পারবে না। অথবা মহিলা নিজে নিজেকে বিয়ে দিতে পারবে না। ব্যভিচারিনী নিজে নিজেকে বিয়ে দেয়’।[১৩] এবং (ছ) বুদ্ধিমত্তার পরিপক্কতা থাকা। এটি হচ্ছে বিয়ের ক্ষেত্রে সমতা (কুফু) ও অন্যান্য কল্যাণের দিক বিবেচনা করতে পারার যোগ্যতা।
৪. দু’জন ন্যায়নিষ্ঠ সাক্ষী থাকা
বিয়েতে অন্তত দুইজন বিশ্বস্ত মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতি আবশ্যক। উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, لا نكاحَ إلا بوليٍّ وشاهدي عَدْلٍ ‘ওলী এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিয়ে নেই’।[১৪]
দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর শর্ত ইসলামের বিয়ে প্রথাকে শক্তিশালী করে, এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে সামাজিক স্বচ্ছতা, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং ধর্মীয় অনুগত্য। এটি শুধু একটি আইন নয়, বরং একটি শিক্ষা, যা মুসলমান সমাজকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* দাওরায়ে হাদীছ, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা। অধ্যয়নরত, আক্বীদা ও দাওয়াহ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
তথ্যসূত্র :
[১]. তিরমিযী, হা/১৬৫৫; নাসাঈ, হা/৩১২০, সনদ হাসান।
[২]. শু‘আবুল ঈমান, হা/৫১০০; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৬২৫; ছহীহুল জামি‘, হা/৬১৪৮, সনদ হাসান।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৬৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০১।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৭৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০২।
[৫]. ইবনু কুদামাহ, আল মুগনি, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৩৪১।
[৬]. ইমাম নববী, আল মাজমু’ শারহুল মিহযাব, ১৬তম খণ্ড, পৃ. ১২৩।
[৭]. ইমাম আল-কাসানী, বদায়িউস সানাঈ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৪৬।
[৮]. ফাতহুল কাদীর, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৪৬।
[৯]. শায়খ বিন বায, মাজমূউল ফাতাওয়া, ২০তম খণ্ড, পৃ. ৪২৮; শায়খ মুহাম্মাদ ছলেহ আল-মুনাজ্জিদ, ইসলাম কিউএ, ফাতাওয়া নং-২১২৭।
[১০]. আল হিদায়াহ, আল মারগিনানি, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৯৬; ইয়াহইয়া ইবনে শরফ আন নববী, আল মাজমু‘, ১৭তম খণ্ড, পৃ. ৩৫৯; ইমাম মালিক, আল মুদাওয়ানা আল কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃ. ২১৭; ইবনে কুদামাহ আল মাকদিসি, আল মুগনী, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৬।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫১৩৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪১৯।
[১২]. আবূ দাঊদ, হা/২০৮৫; তিরমিযী, হা/১১০১, সনদ ছহীহ।
[১৩]. ইবনু মাজাহ, হা/১৭৮২; ছহীহুল জামে’, হা/৭২৯৮, সনদ ছহীহ।
[১৪]. ছহীহুল জামে‘, হা/৭৫৫৮; বায়হাক্বী আল-কুবরা, ৭ম খণ্ড, পৃ. ১২৬, সনদ ছহীহ।